৩০
রাত দুটো।
নিউজ চ্যানেল চলছে। রেকর্ডেড প্রোগ্রাম দেখাচ্ছে।
টিভিতে ডিপার্টমেন্টের বদনাম হচ্ছে। তিলজলা থানার ওসি নীল বাগচী চা খাচ্ছিল। একজন বেশ চিৎকার করছেন। নীলের খারাপ লাগে না। সে মজা পায়। ভালো কথা শুনলেই বরং অবাক লাগে।
দরজা ঠেলে অরিত্র ঢুকল, ‘আমি বেশ কিছুক্ষণ বাইরে বসে আছি। একটু আর্জেন্ট ছিল।’
নীল বলল, ‘ওহ, হ্যাঁ, আমাকে বলেছিল। এক্সট্রিমলি সরি। বসুন প্লিজ।’
অরিত্রকে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। সে বলল, ‘আমি একটা বিপদে পড়ে এসেছি স্যার। আমার ওয়াইফকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্লু বেঙ্গল হোটেলে পার্টি ছিল। ওখানে যাবার পর থেকে ফোনে পাইনি। হোটেলে পৌঁছনোর পর দেখা গেল যে পার্টিতে যাওয়ার কথা ছিল, সেটায় যায়নি। সিসিটিভি দেখতে চাওয়ায় জানা গেল ক্যামেরা খারাপ আছে। আমি কী করব?’
নীল বলল, ‘মিসিং ডায়েরি করুন। ডিটেলস দিয়ে যান। আমি দেখছি কী করা যায়।’
অরিত্র বলল, ‘হোটেল বলছে সিসিটিভি খারাপ। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। একটা কিছু করে জানা যায় না? জোর করে? ওরা মিথ্যে বলতে পারে তো?’
নীল জলের গ্লাস এগিয়ে দিল, ‘আপনি বসুন। জল খান। একটু শান্ত হন। আমি দেখছি।’
অরিত্র বলল, ‘বসতে পারছি না। শান্ত হব কী করে বলুন তো? কাদের না কাদের পাল্লায় পড়েছে, কেউ যদি কিছু করে ফেলে?’
নীল বলল, ‘প্লিজ বসুন।’
অরিত্র বসল। একবারে গ্লাসের পুরো জল শেষ করে বলল, ‘কতগুলো ইরেসপন্সিবল লোক। আমি বার বার বলেছিলাম যেও না। কে শুনবে কথা? এবার কী হবে?’
নীল বলল, ‘শুরু থেকে বলুন। আপনার ওয়াইফের নাম কী?’
অরিত্র বলল, ‘এণাক্ষী। মায়ের শপথ সিরিয়ালে ছিল। সিরিয়াল দেখলে অনেকেই চিনতে পারবে। আমার সঙ্গে কয়েকদিন ধরে মনোমালিন্য চলছে। আমি একরকম রাগ করেই ওকে বলেছিলাম সংসার থেকে চলে গেলে আমার কোনও সমস্যা নেই। ও ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে হোটেলে গেছিল পার্টিতে জয়েন করতে। আমার পরে অনুতাপ হয়। আমি ওকে খুঁজতে হোটেলে গিয়ে দেখি একজন অরগানাইজারকে ও ওর ব্যাগটা দিয়ে দেয়। তারপর ওর পার্টিতে ঢোকার কথা ছিল। কিন্তু আর ঢোকেনি বা ওকে কেউ দেখেনি। আমি যখন হোটেলে গিয়ে বললাম আমাকে সিসিটিভি দেখাতে, বলছে ক্যামেরা খারাপ।’
নীল বলল, ‘ছবি দেখান।’
অরিত্র ফোন বের করে নীলকে ছবি দেখাল। নীল ছবি দেখেই বলল, ‘এইতো, এনাকে তো আমি চিনি। আমার স্ত্রী সিরিয়াল দেখেন। ও যখন দেখে আমিও দেখেছি। ইনি নিখোঁজ?’
অরিত্র বলল, ‘হ্যাঁ।’
নীল বেল বাজাল। কনস্টেবল আলম এল। অরিত্র বলল, ‘ওর কাছ থেকে ডিটেলস নিয়ে একটা মিসিং ডায়েরি করান।’
অরিত্র বলল, ‘আর কিছু করার নেই?’
নীল বলল, ‘আপনি ছবিটা আমাকে হোয়াটস অ্যাপ করুন।’
অরিত্র বলল, ‘আর হোটেল?’
নীল চিন্তিত মুখে বলল, ‘সেটা ঠিকই বলেছেন। আচ্ছা আগে ডায়েরিটা করুন। তারপর যাব।’
অরিত্র বলল, ‘ঠিক আছে।’
নীল ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলে দিল।
মিসিং ডায়েরি করার পরে নীল অরিত্রকে বলল, ‘চলুন। যাওয়া যাক।’
রাতের কলকাতা। রাস্তা একবারে ফাঁকা। নীল বলল, ‘আপনি ফোন করতে পারতেন। এতটা এলেন কেন?’
অরিত্র বলল, ‘আমার মাথা কাজ করছে না। আমি কী করব কিছু বুঝতে পারছি না। এত রাতে…বুঝতে পারছেন তো?’
নীল বলল, ‘পার্টি কি এখনও চলছে?’
অরিত্র বলল, ‘না মনে হয়। তখনই অনেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সুবীরের থাকার কথা। বলেছিল দেখছে।’
হোটেলের সামনে গাড়ি এসে দাঁড়াল। সুবীর বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল। অরিত্র ডাকল, ‘সুবীর।’
সুবীর এগিয়ে এল। চিন্তিতমুখে বলল, ‘কোনও খবর পেলে?’
অরিত্র মাথা নাড়ল, ‘না। কিচ্ছু পাইনি।’
নীল বলল, ‘আপনার কাছে ব্যাগ দিয়ে গেছিলেন?’
সুবীর বলল, ‘হ্যাঁ।’
নীল বলল, ‘চলুন দেখি।’
রিসেপশনে পৌঁছে নীল রিসেপশনিস্টকে বলল, ‘সিসিটিভি কবে থেকে খারাপ?’
রিসেপশনিস্ট অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বুঝল অরিত্র নীলকে নিয়ে এসেছে। বলল, ‘দু-দিন হয়ে গেল। আমরা টেকনিশিয়ানকে খবর দিয়েছি। কাল অ্যাটেন্ড করবে বলেছে।’
নীল বলল, ‘ব্যাপারটার কিন্তু ইনভেস্টিগেশন হবে। আপনি জড়িত থাকলে ফাঁসবেন। আপনি ঠিক বলছেন তো?’
রিসেপশনিস্ট বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। আমাদের সিস্টেম লগে সব লেখা থাকে।’
নীল বলল, ‘লগ দেখান।’
রিসেপশনিস্ট বলল, ‘আপনি এপারে চলে আসুন স্যার। সিস্টেমেই আপডেট হয়েছে দেখাচ্ছি। লগ দেখলেই বুঝতে পারবেন এখানে কোনওরকম ম্যানিপুলেশন করা অসম্ভব।’
নীল বলল, ‘আরেকটা পার্টি হচ্ছিল কাদের?’
রিসেপশনিস্ট বলল, ‘প্রাইভেট পার্টি।’
নীল বলল, ‘ডিটেলস দিন।’
অরিত্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামছে। তার হঠাৎ করে খুব অসুস্থ লাগতে শুরু করেছে…
৩১
মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে বিড়ি টানছিল সুখেন। দুপুর দেড়টা বাজে।
চা খেতে ইচ্ছে করছিল। এই সময় ভাত খাবার কথা। দিনের বেলায় চা খেয়েই কাটিয়ে দেয় সে।
চা খেলে খিদে চাপা দেওয়া যায়। নইলে কে আবার দুপুরে ঝুপড়িতে গিয়ে রান্না চাপাতে যাবে?
বিল্লু জোর পায়ে দোকানের দিকে আসছে। রাস্তার ওপার থেকেই ডাক ছাড়ল, ‘এই সুখেন, এদিকে আয়।’
সুখেন বলল, ‘কী হয়েছে?’
বিল্লু বলল, ‘আয় না।’
সুখেন দু’দিক দেখে রাস্তা পেরোল। বিল্লু বলল, ‘শমিতা ডাকছে।’
সুখেন বলল, ‘কেন? কী হয়েছে?’
বিল্লু মুখ টিপে হাসল, ‘চল দেখতে পাবি কী হয়েছে।’
সুখেন বিরক্ত হল, ‘দূর, কী হয়েছে বলবি তো। এখানে রাখঢাকের কী আছে? আমি কি তোর কুটুম নাকি?’
বিল্লু বলল, ‘তুই একটা লোক নিয়ে এসেছিলি না?’
সুখেন বলল, ‘আমি নিয়ে যাইনি। লোকটা শমিতার খোঁজ করছিল।’
বিল্লু মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ বে। সে মাল কী করেছে জানিস?’
সুখেন দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘কী করেছে?’
বিল্লু বলল, ‘পারুলের পায়ে হাতুড়ি মেরে দিয়েছে।’
সুখেন স্তম্ভিত হয়ে বলল, ‘সে কি? চল চল।’
দৌড়তে শুরু করল সুখেন। বর্ষার সময় বর্ষা না হয়ে রোদ থাকলে বিচ্ছিরি গরম পড়ে যায়। দৌড়তে-দৌড়তেই সুখেন বুঝতে পারছিল কাহিল হয়ে গেছে। শমিতার ঘরের সামনে গিয়ে সে কাশতে শুরু করল। দরজা খোলাই ছিল।
বাড়ির ভেতর ঢুকে দেখল দিব্যেন্দুকে বারান্দায় বসিয়ে রাখা হয়েছে। দিব্যেন্দু গম্ভীর মুখে মেঝেয় বসে আছে। পারুল চিৎকার করছে, ‘ওরে বাবা রে, মারে, মরে যাব!’
শমিতা তাকে দেখে ছুটে এল, ‘কীরে, ইচ্ছে করে এই পয়মালটাকে নিয়ে এসেছিলি নাকি?’
সুখেন দেখল দিব্যেন্দু টুথপিক দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছে। সে দিব্যেন্দুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল, ‘এটা কী হল দাদা?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি মেয়েটার মধ্যে আমার বউকে খুঁজছিলাম। আমার বউ পালিয়েছে রাতে। ওকে হাতুড়ি দিয়ে মারতাম, একেও মেরেছি।’
শমিতার হাতে ঝাঁটা ছিল। সে মনে হয় এর আগেও দিব্যেন্দুকে দু-চার বাড়ি দিয়েছে। এ কথাটা শুনে ঝাঁটা পেটা শুরু করে দিল। দিব্যেন্দু নির্বিকারভাবে বসে বসে মার খেতে লাগল।
সুখেন হাত তুলল, ‘মারতে হবে না। আমার মনে হয় একে পার্টির ছেলেদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত। লোকটা পাগল। ছিট আছে।’
দিব্যেন্দু জ্বলে উঠল, ‘তোর বাবার ছিট আছে শুয়োরের বাচ্চা।’
শমিতা আঙুল তুলল দিব্যেন্দুর দিকে, ‘শোন, আমি এখনও কাউকে বলিনি। যদি বলি না, তোর কপালে দুঃখ আছে। আমাদের মেয়েটাকে মেরেছিস তুই। এখানকার লোক জানতে পারলে তোর কপালে বিরাট দুঃখ আছে। ডাকবো দেখবি?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘ডাকো। আমার আর কী? বউ পালিয়েছে। মারলে মারবে।’
শমিতা কাঁদো কাঁদো মুখে সুখেনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী করব?’
সুখেন বলল, ‘আমার মনে হয় বউ পালিয়ে গেছে বলে লোকটার কোনও সমস্যা হয়েছে। বসিয়ে রাখ এখন। না না, তা না, এটাকে ঘরে আটকে রাখা যাক। এই চল তো।’ দিব্যেন্দুর হাত ধরে টানল সুখেন। দিব্যেন্দু বাধা দিল না। সুখেনের সঙ্গে হাঁটতে থাকল। একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে দিব্যেন্দুকে বাইরে থেকে আটকে দিল সে।
শমিতা কপালে হাত দিয়ে বলল, ‘এক একটা এসে জোটেও। পারুলকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।’
সুখেন বলল, ‘আমিই নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু একে কী করবি?’
শমিতা বলল, ‘টাকা পয়সা কী আছে দেখি। থাকলে ছেড়ে দেব। নইলে পার্টির লোকেদের হাতে দিয়ে দেব। জেলের হাওয়া খেয়ে আসুক।’
সুখেন বলল, ‘এসেই মেরে দিল?’
শমিতা বলল, ‘হ্যাঁ। আমি ঢোকালাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি পারুল চিৎকার শুরু করে দিয়েছে। আমি ভাবলাম গাঁতিয়ে লাগাচ্ছে। পারুলের চিৎকার দেখি থামেই না। তারপর দরজা খুলে পারুল বেরিয়ে এল।’
সুখেন বলল, ‘বাকি মেয়েগুলো কোথায়?’
শমিতা হকচকিয়ে গিয়ে বলল, ‘ওরা বেরিয়েছে।’
সুখেন অবাক হয়ে বলল, ‘সবাই?’
শমিতা বলল, ‘হ্যাঁ।’
সুখেন পারুলের দিকে তাকালো, ‘চল রে। তোকে নেয়নি কেউ, তোর কপালই খারাপ যা দেখছি।’
শমিতা হাত তুলল, ‘থাক। তোকে যেতে হবে না। আমি দেখছি কী করা যায়।’
৩২
‘আপনাকে একটা ভিডিও দেখাব রুমা। দেখবেন?’
খেয়ে ওঠার পর কখন যে ঘুম চলে এসেছিল, বুঝতে পারেনি রুমা। ঘুম ভেঙে দেখল সে একটা সোফায় বসে আছে। তার সামনে একজন ভদ্রলোক পায়চারি করছেন।
সে বলল, ‘আপনি কে?’
লোকটা হাসল, ‘ভুলে গেলেন? আমিই আপনাকে উদ্ধার করে নিয়ে এলাম তো।’
রুমা বলল, ‘ওহ্। আপনি? আপনাকেই আমি ফোন করেছিলাম? আপনিই নিয়ে এসেছিলেন?’
লোকটা মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ। আমিই এনেছিলাম।’
রুমা বলল, ‘আচ্ছা আমার সঙ্গে যাকে এনেছিলেন, তার কী হল? সে বাড়ি যেতে চাইছিল যে?’
লোকটা হাসিমুখেই বলল, ‘আমরা দেখছি ব্যাপারটা। কী করা যায়, ঠিক করা হবে।’
রুমা অবাক হয়ে বলল, ‘মানে? কী করা হবে?’
লোকটা বলল, ‘সেটা পরে আপনি জানতে পারবেন। তার আগে যেটা বলছিলাম, ভিডিও দেখবেন? অলমোস্ট রিসেন্ট ভিডিও।’
রুমা বলল, ‘দেখান।’
লোকটা একটা ট্যাব তার দিকে এগিয়ে দিল। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে দিব্যেন্দু একটা ঘরে ঢুকে আচমকা একটা মেয়ের পায়ে হাতুড়ি মেরে দিয়েছে। রুমা শিউরে উঠল। আরেকটু হলেই তার হাত থেকে ট্যাবটা পড়ে যাচ্ছিল। সে কোনও মতে বলল, ‘এটা কোথায়?’
লোকটা বলল, ‘রেড লাইট এরিয়ায়। ইনিই আপনার হাজব্যান্ড তো?’
রুমা দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে ছিল। কোনমতে বলল, ‘হ্যাঁ।’
লোকটা বলল, ‘বুঝতে পারছি কোন নরক থেকে আপনাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়েছে। এবার বাকি জীবনটা আপনি কী চান, তা আপনাকেই ঠিক করতে হবে।’
রুমা বলল, ‘কী চাই মানে?’
লোকটা বলল, ‘আমাদের জীবন এক একটা সময় এমন একটা জায়গায় চলে যায়, যেখান থেকে আমরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারি না। আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি না, বেঁচে থেকে আমাদের কী লাভ।’
রুমা মাথা নিচু করল, ‘হ্যাঁ, আমার সব সময় মনে হতো, মরে গেলেই ভালো হতো।’
লোকটা বলল, ‘আপনি কিন্তু মরে যাননি। আপনি বেঁচে আছেন। আপনি একটা নতুন জীবন পেয়েছেন। প্রতিদিনের নরক যন্ত্রণার হাত থেকে বেঁচে গেছেন। আপনি নিশ্চয়ই সেই জীবনে আর ফিরে যেতে চান না?’
রুমা মাথা নাড়ল, ‘চাই না।’
লোকটা বলল, ‘আপনি আপনার বাবার বাড়ি ফিরতে চান?’
রুমা বলল, ‘আমার সে রাস্তা বন্ধ। ওরা কিছুতেই আর আমাকে ফেরত নেবে না। আমার থেকে ভালো কেউ জানে না সেটা।’
লোকটা বলল, ‘আমি আপনাকে একটা অফার দেব রুমা। আপনি যদি চান, কাজটা করবেন না, আমি জোর করব না। কিন্তু আপনার মতো মেয়েরা, যারা জীবনে এতটা সহ্য করে এসেছে, তারা অনেক কাজ করতে পারে। এমন কাজ করতে পারে, যেটা কেউ ভাবতেও পারবে না।’
রুমা বিহ্বল চোখে তাকাল, ‘আমি যে কিছু জানি না। আমি কী করে কোনও কাজ করব?’
লোকটা বলল, ‘জানবেন। একদিনে কিছু হবে না। তার জন্য সময় লাগবে। আমরা আপনাকে তৈরি করব।’
রুমা বলল, ‘কী কাজ?’
লোকটা তার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, ‘সেটা এখনই বলব না। আপনার ট্রেনিং শুরু হবে কাল থেকে। দেখুন, আপনি কীভাবে সেটা গ্রহণ করেন। তারপর আমরা আরেকবার কথা বলব না হয়। ঠিক আছে?’
রুমা বলল, ‘ট্রেনিং হবে? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আমাকে কি আমার শরীর বেচতে হবে?’
লোকটা বলল, ‘শরীর? শরীর কী? এতদিন তুমি কী করেছ শরীর দিয়ে?’
লোকটার যেন একটা অদ্ভুত সম্মোহিনী ক্ষমতা আছে। লোকটা যেন তার মাথায় ঢুকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। তার মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলছে যেন। আপনি থেকে তুমিতে চলে গেছে, রুমা বুঝতেও পারল না।
রুমা লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তা বলে…’
লোকটা বলল, ‘তোমার কাছে যা আছে, তা সবার কাছে থাকে না। তুমি নিজেই জানো না, তুমি কী করতে পারো। আমরা কেউই জানি না। তুমি আমার কথা শুনে চলো, শুনে দেখ আমি যা বলছি। শুনবে?’
রুমা মাথা নাড়ল, ‘শুনব। আমার তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। আমার আর কিছু করারও নেই।’
লোকটা এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত দিল, ‘আমি জানি তুমি পারবে। তোমাকে পারতেই হবে।’
রুমা বলল, ‘আমাকে মেরে ফেলবে না তো কেউ?’
লোকটা হাসল, ‘আমরা সবাই একদিন মরে যাই রুমা। তার আগে বেঁচে থাকার মতো বাঁচা দরকার। তাই না?’
৩৩
‘টাকা ভালো না খারাপ?’
‘জানি না। ভালোই হবে। টাকা ছাড়া তো কিছু হয় না।’
‘আর অতিরিক্ত টাকা?’
‘সেটা একটা কথা। আমাদের পাড়ায় একটা বাড়ি ছিল। রোজ সকালে উঠে সে বাড়িতে খেলতে যেতাম। চার-পাঁচটা ভাই। একটা উনুন ছিল। রান্না হচ্ছে। সকালে ডাল আর রুটি করত। আমাকেও দিত। দেখতাম সবাই মিলে খাচ্ছে। সাদামাটা খাবার, তাই কী ভালো লাগত খেতে। দিনে দিনে সবাই দাঁড়িয়ে গেল। রান্নাঘর আলাদা হয়ে গেল। সবাই আলাদা থাকে। সবার টাকা আছে। ভালো আছে কি তারা?’
দুটো লোক কথা বলছে নুরুলের চায়ের দোকানে। পূর্ণ চুপ করে বসে আছে। তার পকেটে এক তাড়া দু’হাজার টাকার নোট। এত টাকা সে কোনও কালে একসঙ্গে দেখেনি। কী করবে এই টাকাটা নিয়ে বুঝতে পারছে না।
আকাশ কালো করেই আছে। একটু আগে ঝির ঝির বৃষ্টি হয়েছে। এখন বন্ধ আছে। আবার শুরু হবে হয়তো।
টাকাটা পাবার পর থেকে বাপিদার ফোনের ভয়টাও কমেছে তার। টাকার জন্যই তো বাপিদার বাড়িতে থাকতে গেছিল সে। সেই টাকাটাই পেয়ে গেলে আর চিন্তার কী আছে?
উদাস মুখে বিড়ি ধরাল সে। লোক দুটো চলে গেলে নুরুল বলল, ‘কীরে পুন্ন, টাকা দিবি না? তোর অনেক বাকি হয়ে আছে রে।’
পূর্ণ বলল, ‘কত বাকি? হিসেব করেছিস?’
নুরুল ডায়েরি বের করল। চোখ ছোট ছোট করে সেদিকে দেখে বলল, ‘দেড়শো টাকা।’
নুরুল ভালো মানুষ। কোনও দিন টাকার জন্য চা দেওয়া বন্ধ করেনি। পূর্ণ বলল, ‘আজকেই দিয়ে দেব বন্ধু। তুই ভালো বন্ধু। আমার দুঃখের দিনে আমাকে খাইয়েছিস। কত দিন না খেয়ে ছিলাম, তুই ডিম টোস্ট করে খাইয়েছিস। তোকে টাকা না দিয়ে কোথায় যাব রে ভাই?’
নুরুল খুশি হল, ‘কী হয়েছে রে তোর? এত ভালো ভালো কথা বলছিস কেন?’
পূর্ণ উঠে নুরুলের কাছে গিয়ে বলল, ‘টাকা পেয়েছি ভাই। কোত্থেকে পেয়েছি, জিগ্যেস করিস না। তবে পেয়েছি। সমস্যা হল, টাকাগুলো দু’হাজারের নোটে আছে। পালটাবো কী করে?’
নুরুল চারদিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাপির বাড়িতে?’
পূর্ণ মাথা উপর নিচ করল।
নুরুল বলল, ‘লোকের টাকা। চোর অপবাদ দেবে যে?’
পূর্ণ বলল, ‘সারারাত ভেবেছি। কত লোকের অগাধ টাকা। আর আমাদের মতো লোকের কিছু নেই। যাদের অগাধ টাকা, তাদের থেকে একটু নিলে তারা কি দেখতে পাবে? সব তো নেবো না। একটু নেবো। তুই তোর মতো করে দোকান দাঁড় করাবি। আমায় খাওয়াবি। আমার তো বউ নেই। সংসার নেই। আমাকে একটু খাওয়াতে পারবি না সারাজীবন? দেখ না, টাকাগুলো যদি কিছু করা যায়?’
নুরুল বলল, ‘কত টাকা?’
পূর্ণ বলল, ‘দু’লাখ।’
নুরুল হেসে ফেলল, ‘দু’লাখ? ওতে আজকালকার দিনে কিছু হয় নাকি? তুইও একটা পাগল। দিয়ে দিস। আমার ব্যাঙ্কেই ঢুকিয়ে দিয়ে আসব। তারপর তোকে পাঁচশোর নোট দিয়ে দেব না হয়।’
পূর্ণ চোখ কপালে তুলে বলল, ‘সে কী রে ভাই? দু’লাখ টাকায় কিছু হয় না?’
নুরুল বলল, ‘এই যে দোকানটা দিয়েছি, এর জন্য পার্টির লোকেদের মাসে সাত হাজার টাকা করে দিতে হয়। বুঝতে পারিস? সাত হাজার টাকা। মাসে সাত হাজার। বছরে চুরাশি হাজার টাকা। তার উপর আছে বাজার সমিতির বিশ্বকর্মা পুজো, কালি পুজো, দুর্গা পুজোর চাঁদা। আরও কত চাঁদা আছে। শেতলা পুজো হবে, গণেশ পুজো হবে, একটার পর একটা কিছু না কিছু চলতেই থাকবে। বছরে এক লাখ টাকা তো তোলা দিতেই চলে যায়। আর দু’লাখ। ধুস।’
পূর্ণ বলল, ‘টাকার কোনও দাম নেই?’
নুরুল বলল, ‘নেই। সত্যি নেই। দু’লাখে সারাজীবন চলবে না। হ্যাঁ, তুই একলা মানুষ। সাত-আট বছর রোগ-ভোগ না থাকলে খাবার টাকা উঠবে। এটুকুই।’
পূর্ণ পকেট থেকে নোটের তাড়া বের করে নুরুলের হাতে দিয়ে বলল, ‘রাখ তবে। এটা দিয়ে যা করার করতে হবে।’
নুরুল সন্তর্পণে চারদিকে তাকিয়ে টাকাগুলো তাড়াতাড়ি নিজের বাক্সে রাখল। তারপর একটা নোট বের করে দেখে নিয়ে বলল, ‘টাকাটা জাল মনে হচ্ছে রে।’
পূর্ণ চমকে উঠল, ‘সে কী?’
৩৪
একটা মাছি ঘুর ঘুর করছে চোখের সামনে। দিব্যেন্দুর অস্বস্তি হচ্ছে। মাছিটা ঘুরে ঘুরে আসছে। চোখের নীচে ব্যথা করছে। প্রবল ব্যথা। মাথাটা ঘোরাচ্ছে।
সুখেন তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিড়ি টানছে। দিব্যেন্দুর জ্ঞান ফিরেছে দেখে বলল, ‘ভাই কি পুরো মেন্টাল? না হাফ?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘মানে?’
সুখেন বলল, ‘আমি তো জানি এ পাড়ায় লোকে লাগাতে আসে। হাতুড়ি মারতে আসে, তা তো প্রথম দেখলাম। সমস্যা কী জীবনে?’
দিব্যেন্দু লাল চোখে সুখেনের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। কী বলবে বুঝতে পারল না। রাত হয়েছে। মোড়ের মাথায় অনেকেরই আনাগোনা বেড়েছে। সুখেনের যেতে ইচ্ছে করছিল না। এরকম চিজ রোজ রোজ আসে না। একে পুরোপুরি মাপতে না পারলে পরে নিজেকেই দোষারোপ করতে হবে।
সুখেন বলল, ‘তোমার কপাল ভালো। বেঁচে থাকাটাই এ যুগে চ্যালেঞ্জ। তুমি বেঁচে আছ, এত কিছু করে, হালকা ক্যাল্যানি খেয়ে, এর থেকে ভালো তো আর কিছু হতে পারে না। বাড়িতে কে কে আছে?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘কেউ নেই। বউ ছিল। পালিয়েছে।’
সুখেন বলল, ‘বউকে এভাবে ক্যালাতে?’
দিব্যেন্দু মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ।’
সুখেন পকেট থেকে টুথপিক বের করে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বলল, ‘তুমি লিজেন্ড আদমি আছ। বউকে মনে পড়ছিল বলে পারুলকে হাতুড়ি মেরে দিয়েছ। আমার মনে হচ্ছে তোমার মগজের সব স্ক্রু ঢিলা হয়ে গেছে। ঠিক মনে হচ্ছে তো মামা?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি বাড়ি যাব।’
সুখেন বলল, ‘সে তো যাবে। এখন রাত সাড়ে বারোটা বাজে। রাতটা কাটিয়ে যেও। যা খেয়েছ, একা একা তো ফিরতে পারবে না। চল দেখি, আমার ঝুপড়িতে।’ দিব্যেন্দু কোনওমতে উঠতে গিয়ে পড়ে গেল। সুখেন তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে দিব্যেন্দুকে ধরল, ‘এখন একজনের কাঁধে চল। আরেকটু হলে চারজনের কাঁধে যেতে হতো।’
দিব্যেন্দু যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতে সুখেনের ঝুপড়িতে ঢুকল। সুখেন বলল, ‘কার্ডবোর্ডের উপর শুয়ে পড়।’
মেঝেতে কার্ডবোর্ড পাতা ছিল। দিব্যেন্দু তার উপরে শুয়ে পড়ল। সুখেন বলল, ‘ভাত বসাচ্ছি। খেয়ে নাও কোনমতে। কাল সকালে দেখা যাবে কী করব।’
দিব্যেন্দু উল্টে শুয়ে আছে। সুখেন চাল চাপাল। বলল, ‘তোমার পকেটে যে টাকা ছিল, ওরা সব নিয়ে নিয়েছে। ভালো লোকের ঘরে গিয়ে পাঙ্গা নিয়েছ। শমিতা হল এখানকার ডন। আর তুমি তার ঘরের মেয়ের পায়েই মেরে দিয়েছো। এর থেকে ট্রেনের সামনে গিয়ে ঝাঁপ দিতে। কম ঝামেলায় হয়ে যেত।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘ট্রেন থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। সবাই মিলে আটকে দিল।’
সুখেন বড় বড় চোখ করে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বটে? বউয়ের দুঃখে এত কষ্ট হচ্ছে?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘একবার সামনে পাই, মাথায় ইট মেরে মেরে শেষ করব! কত বড় সাহস! বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে! কোন নাগরের সঙ্গে পালিয়েছে কে জানে। যখন খুঁজে পাবো, দুটোকে একসঙ্গে মারব।’
দিব্যেন্দু এমনভাবে কথা বলছে, যেন কোনও বিষাক্ত সাপ ফোঁস ফোঁস করছে। সুখেন শিস দিয়ে উঠল, ‘বাঃ গুরু, তোমার হবে। তুমি হেবি ভিলেন হবে।’
দিব্যেন্দু নিজের মনে বলে চলল, ‘শালি পালিয়ে গেল। ভেবেছে পালিয়ে বাঁচতে পারবে। দাঁড়া না, আমি তোকে ঠিক খুঁজে বের করব। তারপর কীভাবে বিষ ঝাড়ব, তুই নিজে দেখতে পাবি।’
সুখেনের ফোন বাজছিল। সুখেন দেখল শমিতা ফোন করছে। সে ফোন নিয়ে বাইরে গেল। শমিতা থমথমে গলায় বলল, ‘মালটাকে তুই নাকি নিয়ে গেছিস?’
সুখেন বলল, ‘কেন?’
শমিতা বলল, ‘কোথায় নিয়ে গেছিস?’
সুখেন অম্লানবদনে মিথ্যে বলে দিল, ‘ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে এলাম তো। কেন?’
শমিতা চিৎকার করে উঠল, ‘উফ্, আমাকে জিগ্যেস করবি না?’
সুখেন বলল, ‘কেন? কী হয়েছে?’
শমিতা বলল, ‘মালটাকে খুঁজতে লোক পাঠিয়েছে।’
সুখেন বলল, ‘কে পাঠিয়েছে?’
শমিতা বলল, ‘সেটা তুই জেনে কী করবি? কোথাকার ঠিকানা বলেছিল?’
সুখেন বলল, ‘মানিকতলা শুনলাম।’
ফোন কেটে গেল। সুখেন ঘরের ভেতরে ঢুকে বলল, ‘তোমার তো হেবি ডিমান্ড গুরু। খোঁজে লোকও চলে এসেছে।’
দিব্যেন্দু সুখেনের কথার পাত্তাও দিল না। নিজের মনে বিড়বিড় করে যেতে লাগল।
