৩০
রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। অন্য ঘরগুলো ভর্তি হয়ে গেছে। গানের শব্দ ভেসে আসছে। রুমা দরজা বন্ধ করে বসে আছে।
অস্বস্তি হচ্ছে একটা। ছায়ামূর্তিটাকে ভোলা যাচ্ছে না। তার পিছু নিয়েছিল কেন? খবরটা জানাতে হবে। না জানালে অন্য সমস্যা তৈরি হতে পারে। বেরোলে এখনই বেরোতে হবে। সকালে বেরোনোর অনেকরকম সমস্যা আছে। তাকে যে দুবাইতে নিয়ে যেতে চাইছে সাদিক, সেটা তো জানানোই গেল না তখন।
জরিনা শুয়ে আছে মেঝেতে। রুমা উঠে দাঁড়াল। বোরখা পরে নিয়ে দরজা খুলল। ছেলেগুলো ঘরে আছে। বারান্দায় কেউ নেই।
সে বাইরের দরজা ঠেলে রাস্তায় এল। সন্তর্পণে চারদিকে তাকাল। না। কোথাও কেউ নেই। ধীরপায়ে হেঁটে বড় রাস্তায় পৌঁছল। দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ফুটপাথের লোকজন শুয়ে পড়েছে।
রুমা মাথা নিচু করে অন্ধ ভিখারির উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করল। সোনার দোকান, তার সামনে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে লোকটা। তার কাছেই রিপোর্টিং-এর অর্ডার ছিল।
হাঁটতে হাঁটতে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা লোকটার কাছে এসে দাঁড়াল সে। একটা পুঁচকে তার মাকে জড়িয়ে শুয়ে আছে খানিকটা দূরে।
চাদর জড়ানো লোকটার পায়ে পা দিয়ে আলতো করে ঠেলা দিল সে। সাড়া পেল না। গলা খাকরে রুমা বলল, ‘পাখি পালানোর তালে আছে।’
তাকে চমকে দিয়ে চাদর সরে গেল। রুমা চমকে উঠে দেখল তার দিকে একটা রিভলভার তাক করে রাখা। লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে রুমার চুলের মুঠি ধরে বলল, ‘চল।’
রুমা বিস্মিত হয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। সে এতটাই বিস্মিত হয়ে গেছিল, ন্যূনতম প্রতিরোধটুকুও করতে পারল না।
খেয়াল হল রাস্তায় একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
অসম্ভব তৎপরতায় তাকে গাড়িটায় টেনে তুলল লোকটা। রুমার চুলে ব্যথা লাগছিল। বমি পাচ্ছে। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। রুমা বলল, ‘কে আপনি?’
লোকটা বলল, ‘তুই কে?’
রুমা বলল, ‘আমি সাকিনা। সাদিক শেখের বাসায় থাকি। আপনারা জানেন না সাদিক শেখ কে।’
লোকটা সিগারেট ধরাল, ‘খুব ভালো করে জানিস এসব ঢপের কথা বলে পার পাওয়া যাবে না। যত তাড়াতাড়ি তুই বলে দিবি এখানে তুই কী করতে এসেছিস, তত তাড়াতাড়ি ছাড় পাবি। নইলে তোর কপালে যে কী আছে, তুই নিজেও ঠিক করে জানিস না।’
রুমা জোরে শ্বাস নিল। লোকটা যে বাজে কথা বলছে না স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
সে চুপ করে বসে রইল। গাড়ির মধ্যে সিগারেটের গন্ধ মাথা ধরিয়ে দিচ্ছে।
জানলার বাইরে দেখার চেষ্টা করল রুমা। কিছু বোঝা যাচ্ছে না। রাতের শহরে গাড়ির গতিবেগ অনেকটাই বেশি।
বেশ খানিকটা পথ যাবার পর অলসভাবেই লোকটা পকেট থেকে একটা স্প্রে বের করে রুমার নাকি ছিটিয়ে দিল।
রুমা জ্ঞান হারাল।
.
জ্ঞান যখন ফিরল, রুমা দেখল একটা ঘরে ধবধবে সাদা খাটে তাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। উঠে বসল সে।
তার সামনে প্রফেসরের মতো একটা লোক সোফায় বসে আছে। এত সুন্দর মানুষ হতে পারে, তার ধারণা ছিল না। রিমলেস চশমা পরে কেমন কবির মতো মুখ করে তার দিকেই তাকিয়ে বসে ছিল। তার জ্ঞান ফিরেছে দেখে লোকটা উঠে দাঁড়াল।
শান্ত মুখে একটা ছোট ব্লেড নিয়ে এসে রুমার হাতে চালিয়ে দিল। রুমা বিস্মিত হবার সময়টুকু পেল না। রক্ত পড়তে শুরু করেছে হাত থেকে।
লোকটা পকেট থেকে একটা ছোট কাগজ বের করে ক্ষতস্থানে চেপে ধরল। কী অসহ্য যন্ত্রণা! রুমা আর্তনাদ করে উঠল। সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই দিনগুলো যখন দিব্যেন্দু ঠিক এই ধরনের কাজগুলোই দিনের পর দিন করে যেত তার সঙ্গে। সে চিৎকার করে উঠল, ‘কে? কে আপনি?’
লোকটা ফিস ফিস করে বলল, ‘আমি? আই এস আই। গিয়াস। আই এস আই কা নাম তো সুনাহি হোগা, নেহি?’
রুমা শিউরে উঠল।
.
৩১
একটা ডায়েরি খুলে বসে আছে অমল। কথা বলতে বারণ করেছে। রাণা চোখ বন্ধ করে শুয়েছে ঘুপচি ঘরটাতে। কোনমতে দিন কেটেছে। সন্ধে হয়েছে। দুপুরের দিকে রাণার ঘুম পেয়েছিল। উঠে দেখল অমল তখনও ডায়েরিতে লিখে যাচ্ছে। সে জিগ্যেস করল, ‘বাথরুম যেতে হবে।’
অমল বলল, ‘বাইরে বেরিয়ে করিডোরের শেষে।’
রাণা বাথরুম থেকে ঘুরে এল। বাথরুম অপরিষ্কার। অভ্যাস আছে তার। ফিরে এসে বলল, ‘আমরা কি ঢাকায় থাকব?’
অমল বলল, ‘না। বেরোতে হবে। থাকা যাবে না হয়তো।’
রাণা বলল, ‘ডায়েরিতে কী আছে?’
অমল বলল, ‘বেশ কিছু কন্ট্যাক্ট। সবক’টা ঝালিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে। আপাতত চলো বেরোই।’
তৈরি হতে বেশিক্ষণ লাগল না। অমল দুজনেরই ভোল পাল্টে ফেলেছিল।
স্টেশন পৌঁছে রাজশাহীর ট্রেনে উঠে বসল। অমলের নির্দেশমতো রাণা খানিকটা দূরত্ব রেখে বসল।
ট্রেনে রাণার পাশে বসে থাকা ভদ্রলোক বেশ কয়েকবার ভাব জমাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে শেষমেশ রাণার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন।
রাণা বারণ করল না। বিরক্ত লাগছে। নিজেকে অসহায় লাগছে। এখানে কিছু করার নেই তার। অমলের নির্দেশে চলা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। অমল এতটাই গম্ভীর হয়ে আছে, ওর সঙ্গে কথা বলার কথাও ভাবতে পারছে না সে।
জানলার বাইরে দেখল রাণা। ট্রেন নিজের গতিতে চলছে। কয়েকটা স্টেশন একবারে ফাঁকা। ট্রেনে কেউই উঠল না এত রাতে।
রাত দেড়টা নাগাদ উল্লাপুর স্টেশনে এসে পৌঁছল। অমল হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ইশারা করল নেমে যেতে।
রাণা উঠল। ট্রেন থেকে বেশ কয়েকজন নামল।
অমল হন হন করে এগিয়ে যাচ্ছে। রাণা খানিকটা দূরত্ব রেখে অমলকে ফলো করল। স্টেশনের বাইরে কয়েকটা অটো দাঁড়িয়ে আছে। সি এন জি গ্যাসে চলে বলে এখানে সে নামেই ডাকা হয়। অমল সি এন জি চালককে তুলল। চালক ঘুম চোখে উঠে বলল, ‘কোথায়?’
অমল বলল, ‘চৌধুরী পাড়া।’ অটো স্টার্ট হবার সঙ্গে সঙ্গে রাণা অটোতে উঠে বসল। সি এন জি চালক অটো দাঁড় করিয়ে দিল। অমল চাপা গলায় বলল, ‘চলেন, উনি আমার লগেই আছে।’
.
নিস্তব্ধ পাড়া। মোড়ের কাছে তাদের নামিয়ে অটো চলে গেল। পাড়ার কুকুরগুলো ছুটে এল। অমল অদ্ভুত একটা শিস দেওয়া শুরু করল। কুকুরগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো চুপ করে গেল। রাণা বিস্মিত হল। এ ক্ষমতা সবার থাকে না। অমলের মধ্যে একজন ম্যাজিশিয়ানও লুকিয়ে আছে তবে? অদ্ভুত তো!
অমল ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘বেশিদূর হাঁটতে হবে না। এই তো।’
একটা দরজার সামনে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে অমল কলিং বেল টিপল। রাণার মনে হল সত্যিই অমল কাউকে চেনে তো? নাকি হুট করে বেল টিপে দিল?
তার আশঙ্কা অমূলক প্রমাণ করে একজন মাঝবয়েসি লুঙ্গি পরা লোক খালি গায়ে বেরিয়ে এল। অমল সঙ্গে সঙ্গে হাসল, ‘কী চাচা? কেমন আছ?’
লোকটা সভয়ে চারদিক দেখে নিয়ে বলল, ‘এসো এসো ভেতরে এসো।’
অমল রাণার দিকে তাকাল, ‘ইমতিয়াজ চাচা। চিন্তা নেই। এসো।’
রাণাকে নিয়ে অমল ঘরের ভেতর ঢুকতেই ইমতিয়াজ তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘এখানে কী করতে এলে তোমরা?’
অমল বলল, ‘জল খাওয়াও। কী আছে খাওয়াও, খিদে পেয়েছে।’
ইমিতিয়াজ ফ্রিজ থেকে মিষ্টি নিয়ে এল। ঠান্ডা জলের বোতল দিল। দুজনে সেসব খেয়ে নিল তাড়াতাড়ি।
অমল বলল, ‘ঢাকায় মনে হচ্ছে হুলিয়া বেরিয়ে গেছে। ধরা পড়ে যাব। আপাতত এখানেই আন্ডারগ্রাউন্ড থাকতে হবে।’
ইমতিয়াজ ঘাবড়ে গেল, ‘কী করেছ?’
অমল হাই তুলে বলল, ‘জানো না? আসগরকে উড়িয়ে দিয়েছি। ধরে নাও ব়্যাব এবার সাদিকের গুষ্টি খুঁজে ফেলবে।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘জানি না তো!’
অমল বিরক্তগলায় বলল, ‘খবর দেখো না?’
ইমতিয়াজ বলল, ‘অনেকদিন দেখা হয় না।’
অমল বলল, ‘কেউ খবরও দেয়নি?’
ইমতিয়াজ মাথা নাড়ল, ‘নাহ্। এবার কী হবে?’
অমল বলল, ‘দুটো উপায় আছে। হয় তোমার বাড়িতেই এক বছর থাকব। নয় রাতের মধ্যে ইন্ডিয়া পালিয়ে যেতে হবে।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘পালিয়ে যাও। আমি তোমাদের একবছর ধরে টানতে পারব না। এগুলো ছোট জায়গা। লোকজন খোঁজ খবর নেয়। পারলে ঘরের ভেতর চলে আসে। এখানকার কালচারটাই ওরকম। মাঝখান দিয়ে আমিও ধরা পড়ে যাব।’
অমল রাণার দিকে তাকাল, ‘তাহলে? তোমার আর চিন্তা নেই। দেশে ফিরে যাবে।’
রাণা বলল, ‘তাহলে ঢাকায় ফিরে গিয়ে সাদিককে উড়িয়ে দিয়ে দেশে ফিরলেই তো হত।’
ইমতিয়াজ অবাক হয়ে রাণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এত রাগ কেন আপনার?’
অমল বলল, ‘ওকে ঠান্ডা বিরিয়ানি খাইয়েছে, ওটাই ওর রাগের কারণ।’
রাণা বলল, ‘না। ওটা রাগের কারণ না। কিছু কিছু মানুষ আছে যারা অন্য মানুষের সঙ্গে চাকরের মতো ব্যবহার করে। এ ধরনের মানুষ দেখলে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না। সাদিক হল এই ধরনের মানুষ।’
অমল ইমতিয়াজকে বলল, ‘সাকিনা ছাড়া এই মুহূর্তে আর কেউ সাদিকের খবর দিতে পারবে না। সাকিনাকে কন্ট্যাক্ট করতে হবে।’
ইমতিয়াজ গম্ভীর মুখে বলল, ‘তোমরা বোস। আমি আসছি একটু।’
ইমতিয়াজ ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, ‘সাকিনাকে কন্ট্যাক্ট করা যাচ্ছে না। রাত বলে হয়তো।’
অমল হাই তুলে বলল, ‘ঠিক আছে। আপাতত ঘুম দরকার। বালিশ বিছানা লাগবে।’
ইমতিয়াজ কটমট করে অমলের দিকে তাকাল।
.
৩২
‘ঠিক কোন জায়গা থেকে তুলেছে তোকে? পশ্চিম বাঙ্গাল?’
উর্দুতে প্রশ্ন করল গিয়াস। একটা চেয়ারে হাত বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে রুমাকে। কেটে যাওয়া জায়গাটায় অসহ্য ব্যথা করছে। রুমা বাঙাল ভাষাতে বলল, ‘আমাকে ছাইড়া দেন। আমি কিছু করি নাই।’
গিয়াস চোখ ছোট ছোট করে বলল, ‘তাহলে ওই খবরিটার কাছে অত রাতে কী করছিলিস?’
রুমা বুঝল গিয়াস বাংলা ভালো বোঝে। সে কাঁদার অভিনয় করল, ‘উনি তো ঔষধ দেন আমায়। উনি দিনে ভিক্ষা করেন, রাইতে ঔষধ দেন। আমি তাই আনতে গেছিলাম।’
গিয়াস বলল, ‘ওষুধ দেয়? কীসের ওষুধ দেয় আজহার তোকে?’
রুমা বলল, ‘আমি ওর নাম জানি না। আমি শুধু জানি, আমার যখন খুব শরীল খারাপ লাগে, বাবার এঁটো খাবার খেলে সে অসুখ সেরে যায়। সবার এঁটো খাবার পর বাবা কিছু খাবার রেখে দেয়, আমি সেটা আনতে যাই।’
গিয়াস তীক্ষ্ণ চোখে রুমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল, ‘কক্সবাজারে যে মেয়েটাকে মারা হয়েছিল, তোকে এখানে আনার জন্যই তো?’
রুমা সজোরে মাথা নাড়ল, ‘না ছার। আপনি খোঁজ নেন। আমি খুব গরিব একজন মাইয়া। আমার কুনো দোষ নাই।’
গিয়াস চেয়ার এগিয়ে নিয়ে এসে রুমার কাছে বসে বলল, ‘হয় তুই সত্যি বলছিস, নয় তুই ভীষণ ওয়েল ট্রেইন্ড। কে ট্রেনিং দিয়েছে তোকে? তুষার রঙ্গনাথন? আশরফ খান? নাকি সায়ক বড়াল? বল।’
রুমা আকাশ থেকে পড়ার ভান করল, ‘কীসব বলতাসেন আপনি! এরা কারা?’
গিয়াস চোখ নামিয়ে রুমার বাঁ-পায়ের বুড়ো আঙুল দেখল। বলল, ‘তোর পায়ে কী হয়েছে?’
রুমা গিয়াসের চোখে চোখ রেখে বলল, ‘উনি খুব অত্যাচার করতেন।’
গিয়াস উঠে রুমার হাত খুলে দিল। হাতে সিগারেটের ছ্যাকা দেখে বলল, ‘এটা?’
রুমা বলল, ‘উনি করতেন।’
গিয়াস রুমার চুলের মুঠি ধরে বলল, ‘কেন করত? কী করতিস তুই?’
রুমা বলল, ‘আমি কিছু করতাম না। এমনি মারতেন।’
গিয়াস হিস হিস করে বলল, ‘তুই শালী সাদিকের বেশ্যা, আমাকে বোঝাচ্ছিস তুই কিছু করতিস না? বেশ্যাগিরি করতিস তাই তো? বেতমিজ আওরাত, তোর বর কী করে মারা গেছিল?’
রুমা কাঁদতে শুরু করল। সজোরে কাঁদতে লাগল। গিয়াস রুমার গালে চড় কষিয়ে বলল, ‘বল কী করে মারা গেছিল?’
রুমা বলল, ‘খুন হয়েছিল। কে নাকি ওর মাথায় হাতুড়ি মেরে খুন করে ছিল ওকে।’
গিয়াস বলল, ‘কে মেরেছিল? আমি নামটা জানতে চাই।’
রুমা বলল, ‘আমি জানি না। বিশ্বাস করুন।’
গিয়াস বলল, ‘কী করতে পাঠিয়েছে তোকে র?’
রুমা বলল, ‘সেটা কী?’
গিয়াস কিছুক্ষণ একা একা দাপাল। রুমাকে আরও কয়েকটা চড় কষাল। কোনও লাভ হল না। রুমার পেট থেকে একটা কথাও বের করতে পারল না। তার ফোন বাজছিল। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল সাদিক ফোন করছে। সে ফোন তুলল, ‘বলো।’
সাদিক নরম গলায় বলল, ‘জনাব, আমার খুব কাছের একজন আওরাতকে পাওয়া যাচ্ছে না। শুনলাম আপনি নাকি তাকে তুলে নিয়ে গেছেন। আমি কিন্তু খুব ভালো করে জানি সে নির্দোষ।’
গিয়াস গালাগাল দিতে শুরু করল, ‘তোদের লজ্জা লাগে না? আমাদের কাছ থেকে এত ডলার নিচ্ছিস, আর এ দেশে বসে মেয়েবাজি করে যাচ্ছিস? এভাবে জিহাদ আসবে?’
সাদিক বলল, ‘জনাব, ও মেয়ে খুবই ভালো মেয়ে। দুঃখী মেয়ে। আপনি ওকে কষ্ট দিয়েন না। আপনাকে আনন্দ দিবে। সাত দিন রেখে দেন। তারপরে না হয় ছেড়ে দেন। কিন্তু ওরে অত্যাচার করেন না। এদেশে ভালো মাইয়া পাওয়া যায় না, কোথায় সাকিনার মতো ভালো মাইয়া আছে?’
গিয়াস বলল, ‘বুঝলাম। তার আগে বল আগের মেয়েটা কক্সবাজারে হারিয়ে গেছিল কী করে?’
সাদিক বলল, ‘জনাব, আমার কথা শুনেন। ও মেয়েকে আটকায়া রাখা যাইত না। সব দিয়েছিলাম, তারপরেও অন্য দিকে যাওয়ার আসক্তি ছিল। পূর্ব পরিচিত এক ছেলের সঙ্গে এক ঘরে ছিল জনাব। আমি মাথা ঠিক রাখতে পারিনি, উড়ায় দিছিলাম। কিন্তু এ মেয়ে একবারে পবিত্র।’
গিয়াস বলল, ‘পবিত্র?’
সাদিক বলল, ‘জি জনাব।’
গিয়াস বলল, ‘এক দিনের মধ্যে এ মেয়ের যেখানে বাড়ি, সেখানকার লোকেদের দিয়ে একে চিনিয়ে আনার ব্যবস্থা কর। লোকাল লোক যদি এই মেয়েটাকে চেনে, আমি ছেড়ে দেব। নইলে বাকিটা আমি বুঝব।’
সাদিক বলল, ‘এটা একটা কথা জনাব? আমি এখনই দেখছি। কিন্তু আপনি সাকিনারে কষ্ট দিয়েন না।’
গিয়াস ফোন কেটে দিল।
রুমার গোটা শরীর যন্ত্রণায় জ্বলছে। সে শুধু একটা কথাই মনে করে চলেছে। গিয়াস দিব্যেন্দুর তুলনায় কিচ্ছু না।
.
৩৩
ট্রেনিং সেন্টারে জয়েন করে নির্মল হতাশ হয়ে বসে রইল। কোনও কাজ নেই। এখন নিউ ট্রেনিও নেই। একটা ঘরে সারাদিন একা একা বসে বাড়ি চলে যেতে হবে। মানুষ তো হতাশাতেই মরে যাবে এই ডিপার্টমেন্টে এসে! বোঝাই যাচ্ছে পানিশমেন্ট পোস্টিং এটা।
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে নির্মল মোখলেসকে ফোন করল। মোখলেস বলল, ‘আপনারে সরায় দিসে শুনলাম। আনোয়ার স্যারের খবরের পর থেকে মাথা কাজ করতাসে না স্যার। পুরা আউলাইয়া গেছি। আমি কি করুম সার?’
নির্মল বলল, ‘কী খবর ওদিকে?’
মোখলেস বলল, ‘আজ তো মাল হেবি ব্যস্ত। তিনবার বাইরাইসে।’
নির্মল বলল, ‘আর? কেউ এল?’
মোখলেস বলল, ‘না। কেউ আসে নাই।’
নির্মল বলল, ‘ঠিক আছে। নজর রাখো। ধরা পড়ে যেও না যেন।’
মোখলেস হাসল, ‘নিশ্চিন্তে থাকেন স্যার।’
ফোন রেখে নির্মল পায়চারি শুরু করল। সাদিকের উপর নজরদারি রাখা দরকার ছিল। কিছুই হল না। ট্রেনিং-এর বস রাসেল সাহেব পাশের চেম্বারে আছেন। জয়েনিং-এর সময় বলে দিয়েছেন সে কোথাও গেলে যেন তাকে বলে যায়। নির্মল দরজার ফাঁক থেকে দেখল রাসেল সাহেব ঘুমোচ্ছেন। এখানে হয়তো এটাই কাজ।
সে কিছুক্ষণ এদিক সেদিক করে রাসেল সাহেবকে না বলে সেন্টার থেকে বেরিয়ে গেল। সি এন জি নিয়ে সরাসরি আয়কর দফতরে চলে গেল।
আলম টেবিলেই ছিল। নির্মল ইশারা করে তাকে রাস্তায় ডেকে নিল। আলম বেরিয়ে আসতে অফিসের রাস্তার পাশের ছোট গলিতে ঢুকে এল।
আলম এসে বলল, ‘কী হল দোস্ত? এত লুকিয়ে চুরিয়ে ডাকো কেন? এরকম লুকায় লুকায় দেখা করার কী হল?’
নির্মল বলল, ‘অনেক কারণ আছে। আনোয়ার স্যারকে খুন করা হয়েছে শুনেছ তো?’
আলম বলল, ‘হ্যাঁ।’
নির্মল বলল, ‘আমার মনে হয় সাদিক শেখের কেসটার জন্য। আমার গাড়িতেও ইট মেরে আমাকে হুশিয়ারি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে ভালো কোনও সমস্যা আছে। তুমি সাদিকের স্টেটমেন্ট বের করেছিলে। সেটা আছে?’
আলম অবাক হয়ে বলল, ‘আরে কী হয়েছে শোন। আজকেই আমাকে অর্ডার দেওয়া হল সাদিকের ফাইল ঘাঁটার দরকার নেই। কুমিল্লায় কোনও এক ব্যবসায়ী আছে, তার প্রোফাইল পাঠিয়ে দিয়েছে। আমি তো এতক্ষণ ধরে এটাই ভাবছিলাম যে এ আবার কী হল?’
নির্মল বলল, ‘মানে? তোমার কাছে এখন সাদিকের ফাইলের অ্যাক্সেস নেই?’
আলম বলল, ‘তা থাকবে না কেন? এ কি আমেরিকা পাইসো ভাই? সব পাইয়া যাইব। কী লাগবো কী?’
নির্মল বলল, ‘সব লাগবে। যা পাবে তাই। বিশেষ করে ফরেন ট্রানজাকশান। ওর ফাইল সব হোয়াইট। ওর কোথাও কোনও সমস্যা নেই। এর থেকে সন্দেহজনক আর কী হতে পারে?’
আলম বলল, ‘ঠিক আছে। আমি ব্যবস্থা করে দেব। তুমি ভেবো না।’
নির্মল বলল, ‘ভাবাভাবি বাদ দাও ভাই, তুমি যে এটা করছ, কাউকে ঘুণাক্ষরেও বোল না। এখানে সব জায়গায় ওদের লোক সাজানো আছে। ভীষণ কনফিডেন্সিয়ালি এগোতে হবে আমাদের।’
আলম বলল, ‘ঠিক আছে। তুমি ভেবো না।’
নির্মল বলল, ‘আমি যাই। তুমি মাথায় রেখো।’
আলম বলল, ‘ঠিক আছে। যাও।’
অফিসে ফিরে এসে নির্মল দেখল রাসেল সাহেব থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে দেখে বললেন, ‘কোথায় গেছিলে?’
নির্মল বলল, ‘বাসায় গেছিলাম স্যার। ভাবলাম গ্যাস বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছে । তাই চেক করতে গেছিলাম।’
রাসেল বললেন, ‘আমি কিন্তু তোমাকে বলেছিলাম কোথাও গেলে আমাকে বলে যেতে। বলেছিলাম না?’
নির্মল বলল, ‘জি স্যার। আর হবে না।’
রাসেল বললেন, ‘তোমার বাসায় তোমার স্ত্রী ছিল না? তাকে ফোন করে জিগ্যেস করে নিলেই তো হতো।’
নির্মল বলল, ‘না স্যার, ওর আত্মীয়রা এসেছে, ও এখন নেই।’
রাসেল বললেন, ‘তুমি চাকরি করতে এসেছ। যথেষ্ট সিনিয়র অফিসার। তোমাকে এখন অফিস ডেকরাম শেখানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। আশা করব, ভবিষ্যতে তুমি আমাকে জানিয়ে যাবে।’
নির্মল মাথা নাড়ল, ‘জি স্যার।’
রাসেলের থেকে ছাড়া পেয়ে চেম্বারে এসে বসল সে। মোবাইলে মোখলেস ছবি পাঠিয়েছে। সাদিকের বাড়ি থেকে গাড়িটা বেরিয়েছে।
নির্মল গাড়ির নাম্বার দিয়ে সার্চ করল। সাদিকের নামেই এ গাড়িটার রেজিস্ট্রেশন করা আছে। সাদিক এটা নিয়ে কী করছে? এ গাড়িটা নিয়ে তো কোনও দিন বাইরে যায়নি!
নির্মল চিন্তিত মুখে বসে রইল। মোখলেস আবার ফোন করছে। ধরল সে, ‘হ্যাঁ বল।’
‘সার, আমাদের মিয়াঁর পুরান ঢাকায় একটা বাড়ি আছে। ওখানে মেয়ে পোষে।’
‘জানি এটা। নতুন কিছু বল।’
‘একটা ডেরাইভার এখানে চা খায়। কথা শুনে বুঝলাম মাইয়াটারে কোথায় নাকি লইয়া গেছে।’
‘গুড। কোথায় নিয়ে গেছে?’
‘জানি না সার। এদের চলা ফেরা দেখলে কিছু বোঝন যায় না।’
‘কিছুই বোঝা যায় না?’
‘না সার। খুব ব্যস্ত আর সিরিয়াস। সবাই খুব দৌড়াইতাসে।’
‘ঠিক আছে। গুড জব।’
ফোন রেখে নির্মল সাদিকের পুরান ঢাকার ঠিকানাটা বের করল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হল। ছুটির এখনও কত সময় বাকি!
.
৩৪
রাত আটটা। বাইকটা বড় রাস্তায় রেখে মোখলেসের দেওয়া ঠিকানা খুঁজতে খুঁজতে বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখছিল। এর মধ্যে ফোন বেজে উঠল তার। সোবাহান ফোন করছেন। ভ্রু কুঁচকে সেটার দিকে তাকিয়ে ধরল সে, ‘জি জনাব।’
সোবাহান বললেন, ‘আরে, আমি তোমার খবর নেওয়ার জন্য ফোন করছিলাম। সারাদিন ধরেই ভাবছিলাম তোমার খোঁজ নেই, কিন্তু সময় পাইনি, এত কাজের চাপ। তারপর বলো, নতুন ডিপার্টমেন্ট কেমন লাগছে?’
নির্মল বলল, ‘ভালো স্যার।’
সোবাহান বললেন, ‘কোনও সমস্যা নেই, তাই না?’
নির্মল বলল, ‘না, স্যার, ঠিক আছে।’
সোবাহান বললেন, ‘নির্মল, আমায় একটা কথা বলো, এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে যদি কোনও অফিসার কাজ করে, তাহলে কি আমার চুপ করে থাকা উচিত?’
নির্মল বুঝল সোবাহান কেন ফোন করছেন। সে বলল, ‘বুঝলাম না স্যার।’
সোবাহান বললেন, ‘না মানে এক অফিসার আছে, আমি দেখছি সে বড় বাড়াবাড়ি শুরু করেছে, অতিসক্রিয়তা দেখাচ্ছে। আমার না এই অতিসক্রিয় মানুষদের একদম পছন্দ না বুঝলে না? কে জানে কখন রিমান্ডে নিয়ে নিতে হয়। ভালো লাগে না রে ভাই, সব সময় এত জটিলতা ভালো লাগে না। যাই হোক, তুমি ঠিক করে কাজ করো, ডিপার্টমেন্টের নাম উজ্জ্বল করো। রাখি বুঝলে?’
নির্মলের কান মাথা জ্বলছিল। সে বলল, ‘জি স্যার।’
সোবাহান ফোন কেটে দিলেন। নির্মল আলমকে ফোন করল, আলম একবারেই ধরল, ‘বল দোস্তো। কেন ফোন দিলা?’
নির্মল বলল, ‘কেন আর দেব? খোঁজ পেলে কিছু?’
আলম বলল, ‘এত তাড়াতাড়ি হবে না। অফিসে এখনও অনেকে আছে। আরেকটু রাতের দিকে দেখছি। তুমি যে কাবাবের খোঁজ করতাস, ওইটা খাইতে অনেক দূর যাইতে হইব।’
নির্মল বলল, ‘ঠিক আছে। জানিও।’
ফোন রাখার পর নির্মল কয়েকমুহূর্ত ভাবল। আলম কি সন্দেহ করছে তাদের ফোন ট্যাপ হচ্ছে? ট্যাপ না হবার তো কিছু নেই। বরং তারই সতর্ক হওয়া উচিত ছিল সোবাহানের সঙ্গে কথা বলার পরে।
মোখলেসের দেওয়া ঠিকানার বাড়ির সামনে আবার কিছুক্ষণ ঘুরে, চারপাশ দেখে নিয়ে দরজায় নক করল নির্মল।
জরিনা দরজা খুলল, ‘জি, বলেন।’
নির্মল বলল, ‘সাদিক সাহেব আছেন?’
জরিনা নির্মলের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, ‘জি উনি তো এখানে থাকেন না’!
নির্মল মুখে বিস্মিতভাব ফুটিয়ে বলল, ‘সে কী? উনি তো আমাকে এখানে আসতে বলেছিলেন।’
জরিনা বলল, ‘ঠিক আছে, আপনি বসেন, আমি দেখছি।’
নির্মলকে সামনের ঘরে বসিয়ে জরিনা ভেতরের ঘরে গেল।
রঙচটা একটা বিছানার চাদর খাটে পাতা। একটা প্লাস্টিকের চেয়ার। টিভি চলছে। চটুল বলিউডি গান চলছে টিভিতে। ভেতরের ঘরে যাবার দরজাটা ভেজানো। নির্মল দরজা ঠেলতেই খুলে গেল। বাড়ির মাঝে বড় একটা বারান্দা ঘিরে চারটে দরজা। কোথাও কেউ নেই। জরিনা কোথায় গেল?
‘কী চাই?’
একটা লম্বামতো লোক কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে দেখতে পায়নি নির্মল। ঘুরে দাঁড়াতেই লোকটার সামনে পড়ে গেল সে। অপ্রস্তুত না হয়ে বলল, ‘সাদিক এখানে আসতে বলেছিলেন।’
লোকটা সন্দিগ্ধ মুখে তাকে দেখে বলল, ‘না। এখানে কারো আসার কথা নাই।’
নির্মল বলল, ‘ফোন করেন। দেখেন।’
ফোন বের করতে যেতেই নির্মল লোকটাকে জোরে ঠেলে ফেলে দিল। লোকটা খাটের উপর পড়ল। নির্মল পালাতে গেলেই লোকটা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ধরল। নির্মল লোকটাকে সামলাতে যাবার আগে আরেকজন দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। নির্মল কিছুক্ষণ দুজনের সঙ্গে লড়লেও অসম লড়াইয়ে তাকে অচিরেই পরাস্ত হতে হল। নির্মলকে মাঝের বারান্দায় বাঁধা হল।
দ্বিতীয় পুরুষটি চিৎকার করল, ‘জরিনা? এই জরিনা।’
জরিনা ছুটে এল, ‘হ ভাইজান।’
‘কোথায় থাকস? বাইরে থিক্যা লোক ঢুইকা যায় ভিতর? কী করস তোরা?’
জরিনা বলল, ‘আমি কী করুম? কইসিল সাদিক সাহেবরে চেনে।’
লোকটা ছুটে গিয়ে জরিনাকে জোরে একটা চড় কষাল। মেয়েগুলোর মধ্যে একজন বলল, ‘একী জব্বার ভাই, ওরে মারো ক্যান?’
জব্বার বলল, ‘মারুম না? আমি কী বলসিলাম? কাউরে ঢুকতে দিবি না? বলসিলাম?’
নির্মলের পিঠে ব্যথা করছিল। তার হাত-পা বাঁধা হয়েছে। গা হাত পা ব্যথা করছে। হাত-পা বাঁধা না-হলে সে লড়াই করার জায়গায় থাকত।
খায়রুল বাইরে থেকে এসে নির্মলের দিকে ঝুঁকে বলল, ‘সত্যি করে বল। তুই কে? নইলে আজ এইখান দিয়ে তুই বাইচা ফিরতে পারবি না।’
নির্মল দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসল, ‘আটকে রাখিস না। সমস্যায় পড়বি। খোল।’
নির্মলকে নির্লিপ্ত থাকতে দেখে দুজনে অবাক হল এবার। দুজন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করে বাইরে বেরিয়ে গেল।
জরিনা তাড়াতাড়ি নির্মলের কানের কাছে এসে বলল, ‘সাকিনা আপুর কোনও খবর আছে? আপনারে কি উনি পাঠাইসে?’
নির্মল অবাক হয়ে জরিনার দিকে তাকাল।
.
