অপারেশন ট্রেইটর – ৪০

৪০

দু-দিন আগের কথা

লতিফ চৌধুরী গম্ভীর হয়ে বসে আছে।

তার সামনে মাদ্রাসার প্রধান মজনুদ্দিন বসে বসে জানলার বাইরের প্রকৃতি দেখছে।

লতিফ বলল, ‘কী খবর আপনের?’

মজনুদ্দিন বলল, ‘চলতেছে।’

লতিফ বলল, ‘কথা কম বলতেছেন?’

মজনুদ্দিন হাসার চেষ্টা করল, ‘জি জনাব। অধিক কথা কওন ভালা না।’

লতিফ বলল, ‘ভালো। পাকিস্তান গড়ার লক্ষ্যে আপনের মতো মানুষ দরকার। আপনি পাকিস্তান গড়ার একজন কারিগর। ভুলবেন না।’

মজনুদ্দিন বলল, ‘জি জনাব। আপনের অসীম করুণা।’

লতিফ বলল, ‘আমায় বলবেন না। তারে বলুন। তিনিই সব কিছুর মালিক। আমার কুড়িজন ছেলে লাগবে মজনুদ্দিন সাহেব।’

মজনুদ্দিন ঘাবড়ে গেল, ‘কুড়িজন?’

লতিফ ঠান্ডা চোখে মজনুদ্দিনকে দেখল, ‘কেন? পারবেন না? কুড়িটা ছেলে পাকিস্তান গড়ার জন্য দিতে পারবেন না? তাহলে এত এত টেকা পাঠানো হয় কী জন্য?’

মজনুদ্দিন বলল, ‘জনাব, আমারে হিসাব করতে দেন। এতিম ছেলে জোগাড় করতে হবে তো! বাপ-মায়ে থাকলে অনেক ঝামেলা করে।’

লতিফ বলল, ‘বাপ-মা থাকা ছেলেই জোগাড় করবেন। আপনারে শুধু ছেলে মানুষ করার জন্য টেকা পাঠানো হয় না। ছেলে, তার অভিভাবক, তার পাড়া প্রতিবেশী, সবাই যেন পাকিস্তান গড়ার লক্ষ্যে দীক্ষা পায়, তার জন্য টেকা পাঠানো হয়। টেকাগুলান আপনার ভুঁড়ি বাড়ানোর জন্য পাঠানো হয় না।’

মজনুদ্দিন বলল, ‘জি জনাব। আমি এক মাসের মধ্যে আপনারে তালিকা পাঠাইতেছি।’

লতিফ রাগী গলায় বলল, ‘একমাস না। আমার এখন লাগবে তালিকা। আমাকে জায়গামতো জবাব দিতে হয়। বোঝঝেন মিয়াঁ?’

মজনুদ্দিন বিষম খেল। লতিফ বলল, ‘বিষম খাইলে তো হবে না। কর্তারা আসছেন, তাগো হিসাব দিতে হইব। এত এত টেকা আসে, সৌদি থিকা আসে, বাইরে থিকা আসে, তার তো হিসাব লাগব না? এমনি এমনি তারা টেকা পাঠায়? চরিত্র তৈরি করতে পাঠায়, যখন লাগব, তখন সে ছেলেদের কামে পাঠাইতে হইব। হইব না?’

মজনুদ্দিন বলল, ‘ছেলেরা এখনও ছোট জনাব।’

লতিফ চোখ ছোট করল, ‘কত ছোট?’

মজনুদ্দিন বলল, ‘বারো-তেরো বছরের ছেলে। এদের দিয়া কী হইব?’

লতিফ বলল, ‘সেইডা কে ঠিক করবেন? আপনে?’

মজনুদ্দিন বলল, ‘রাজনৈতিক বিষয় আছে জনাব। এলাকা থিকা একসঙ্গে এত গুলান ছেলে লা পাতা হইলে অনেক জবাবদিহি করতে হইব।’

লতিফ বলল, ‘ঢাকা বেড়াইতে লইয়া আইবেন। যাদের নির্বাচিত করবেন, তাদের আলাদা বাসে রাখবেন। সে বাস মিসিং হইয়া যাইব। বোঝঝেন?’

মজনুদ্দিন অবাক চোখে কয়েক সেকেন্ড লতিফের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘বুঝছি।’

লতিফ বলল, ‘দেশ গড়া বোঝেন? দেশ গড়তে কত বলিদান লাগে জানেন? ছহি ইসলামি পাকিস্তান গড়তে হইব আমাদের। চারদিকে ন্যাংটা পুলাপান ভরতি হইয়া গেছে। কায়ামতের দিন করিব চইলা আইসে। কেন হইসে এরূপ? আমরা আর পাকিস্তান নাই বইলা। দেশরে ইন্ডিয়ার কাছে বেইচা দিলে হইব? হইব না। দেশ গড়ার জন্য ছেলে লাগব।’

মজনুদ্দিন বলল, ‘জনাব, কুড়ি জন ছেলের বাবা-মায়ের লগে কথা বইলা নিমু?’

লতিফ হাত দিয়ে মাছি তাড়াবার ভঙ্গি করল, ‘দরকার নাই। গরিব হতদরিদ্র ঘরের ছেলে তারা। তাগো খাওন-দাওন সব আমরা দিতেছি। পরিবর্তে আমাগোও যা লাগব, তাগো তা দিতে হইব। আপনি জানেন, পাকিস্তান সরকারের লোকেরা আপনার নাম জানবে, যদি আপনি এই কাজ ঠিক কইরা করতে পারেন তবে?’

মজনুদ্দিন বলল, ‘জনাব, আপনি যা বলবেন, তাই মেনে চলার চেষ্টা করি। তবু এই কামটা বড় ছোট কাম না জনাব। একসঙ্গে কুড়িজন ছেলে, এলাকায় ঝামেলা হইবে, পুলিশ আইব, অনেক রকম সমস্যা হইব।’

লতিফ বলল, ‘পুলিশ আমি বুইঝা নিমু নে, আপনি মিডিয়ারে সামলাইবেন। উলাঝুলা মুখে কান্না করবেন শুধু। বুঝঝেন?’

মজনুদ্দিন বলল, ‘বুঝছি জনাব। এই ছেলেরা কী করবে জনাব?’

লতিফ ঠান্ডা চোখে বলল, ‘পাকিস্তান গড়বে। আপনারে কবার কওন লাগব? আপনি চান না পাকিস্তান জিতুক? চান না?’

মজনুদ্দিন ঘাবড়ে গিয়ে মাথা নাড়ল, ‘চাই জনাব। ইনশাল্লাহ তাই হবে।’

লতিফ খুশি হল। বলল, ‘ঢাকার ট্যুর দেন। তারপর বাকি কথা কমু। ফান্ডে টেকা পৌঁছায়ে যাইব। কুড়িজন পাইলে কেউ হিসাব চাইব না মনে রাখবেন।’

মজনুদ্দিন শুকন মুখে বলল, ‘জি জনাব।’

.

৪১

বর্তমান সময়

দুপুর আড়াইটা।

বৃষ্টি পড়ছে। নির্মল নিস্তেজ হয়ে ঘরে শুয়ে আছে। অফিস যায়নি সে। টিভিটা একঘেয়ে খবর পরিবেশন করে যাচ্ছে।

কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। সোবাহান সাহেবের কথাগুলো মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, ‘ইন্ডিয়ার দালাল।’

এই কথাগুলো অনেকবার শুনেছে সে। ঠারে ঠোরে তাকে এটাই বোঝানো হয়েছে বরাবর। আনোয়ার সাহেব যেদিন এসেছিলেন, সেদিন একটা কথা বলেছিলেন, ‘নির্ভয়ে কাজ করো। যদি তুমি সততার সঙ্গে কাজ করো, আর কেউ কোনদিন না থাকে, আমি থাকব।’

ছিলেনও। বিনা প্রশ্নে যখন সে যা বলেছে, তাই শুনেছেন। প্রকৃত অভিভাবকের মতো মাথার উপর ছিলেন। সে মানুষ নেই ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে।

সোবাহান সাহেবের কথা শুনে বোঝা গেল উনি আনোয়ার সাহেবকে ভারতের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছেন। সোবাহান সাহেব বরাবরই পাকিস্তানপন্থী। কথাবার্তায় পাকিস্তান প্রায়ই বেরিয়ে আসে। প্রায়ই বলেন এ দেশকে ভারত নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। দেশকে ভারতের নিয়ন্ত্রণ থেকে দূরে রাখা দরকার। প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্য বা পাকিস্তানের থেকে সুযোগ-সুবিধা নিতে হবে।

আনোয়ার অন্য কথা বলতেন। বার বার বলতেন, দেশ স্বতন্ত্রভাবে চলা উচিত। কোনও ধর্মাবলম্বী নয়, যে দেশ ধর্মনিরপেক্ষ, কোনও ধর্মকে অনুসরণ করে না, সে দেশের উন্নতি অনেক বেশি হয়। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ সে দেশের উন্নতির পদে বাধা দেয় সব সময়। স্বাধীনতার পর ভারত যতটা এগিয়েছে, পাকিস্তান ততটাই পিছিয়েছে। কূটনৈতিক ভাবে তারা ধর্মীয় জঙ্গি সন্ত্রাসবাদী সংস্থাগুলোকে ভারতের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। ফলে বাঘের পিঠে উঠতে হয়েছে। এই বাঘ তাদেরও খেতে শুরু করেছে এবারে। গোটা দেশটাকে খাবার পর সে বাঘ যেন বাংলাদেশেও না আসে, সেটা আটকাতে হবে বাংলাদেশকেই। কথাগুলো সোবাহানসহ অনেকেরই ভালো লাগত না। তবে আনোয়ার সাহেবকে টলানো যায়নি কোনদিন। এ জন্যই হয়তো সরতে হল।

নির্মল জরিনার কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করল। সাকিনা কে? সে নিরুদ্দেশ হয়েছে? সাদিকের সঙ্গে সাকিনার কী সম্পর্ক ছিল?

পর পর একগাদা প্রশ্ন মাথায় আসছে।

ফোন বাজছে। আলমের ফোন। নির্মল সঙ্গে সঙ্গে ধরল, ‘বল।’

আলম বলল, ‘দোস্ত, তোমারে একখান কথা কই।’

নির্মল বলল, ‘বল। তোমার কথা শোনার জন্যই তো বসে আছি।’

আলম বলল, ‘সাদিক একটা পক্ষী বুঝলা।’

নির্মল অবাক হল, ‘মানে?’

আলম বলল, ‘ঘুঘুপক্ষী। এক্কেরে দারুণ এক ঘুঘুপক্ষী। যে পক্ষীর এত ডানা আছে, সে সব ডানার নাগাল পেতে আমার কালঘাম ছুইটা গেছে।’

নির্মল বলল, ‘যেমন?’

আলম বলল, ‘চার খান ফাইল আছে তার। দুটো সাদা, দুটো কালো। কালো ফাইলগুলান আবার আলাদা জায়গায় রাখা। আমি তার মধ্যে একটা ফাইলের ছবি তুলতে পারসি। আরেকখান এখনও নাগালে নাই।’

নির্মল উত্তেজিত হয়ে দেওয়ালে ঘুষি মারল, ‘ইয়েস। কী পাওয়া গেল?’

আলম বলল, ‘ইস্তানবুল, করাচী, কুয়ালালামপুর, কলম্বো, কাঠমান্ডুতেও তিনি ব্যবসা করেন। এক্সপোর্ট দেখানো হইছে। ক্লাসিফায়েড টেক্সটাইল। মানে কী?’

নির্মল বলল, ‘মানে জানার দরকার নেই। কত ডলারের ট্রানজাকশান?’

আলম বলল, ‘শুধু এই অর্থবর্ষে একশো সাতাশ কোটি বাংলাদেশি টাকা।’

নির্মল বিস্মিত হয়ে বলল, ‘কী? এত টাকা? সম্ভব? এ দেশের ধনী লোকেদের তালিকায় তার নাম কোথায়?’

আলম হাসল, ‘ভাইরে, তালিকা বাইরে গেলে তাইলে তো ধনী হবে সে। সমস্ত ট্রানজাকশানই হিডেন।’

নির্মল বলল, ‘তোমাদের ডিপার্টমেন্টের একটা চক্র যতক্ষণ না তাকে সরাসরি হেল্প করবে, ততদিন ও এ কাজ করতে পারবে না। এর মানে হল তোমাদের একটা অংশ এর সঙ্গে জড়িত।’

আলম বলল, ‘সন্দেহ নাই। এ দেশের অনেক রাঘববোয়ালদের ফাইলই এভাবে আছে। সাহেবেরা তাদের মতো করে এসব হ্যান্ডেল করে। তবে সাদিক ভাই ইজ টুরু লাভ রে ভাই। এত টাকা সবার কাম না।’

নির্মল বলল, ‘টাকাটা তো এখানেও শেষ হয়নি। আরেকটা ফাইলও তো আছে।’

আলম বলল, ‘রাতটা দাও। বের করছি। আনুমানিক এই সংখ্যাটাকেই দুই দিয়ে গুণ করে খুশি থাকো।’

নির্মল বলল, ‘খুশি থাকতে পারছি কোথায়? যে পার্টিগুলোর সঙ্গে ট্রানজাকশান হয়েছে, সেগুলিও লাগবে তো। এ দেশে টাকা পাঠায় কোথাও?’

আলম বলল, ‘জি পাঠায়। নোয়াখালি, চিটাগাং-এর অনেক মাদ্রাসাতেই পাঠায়।’

নির্মল ভ্রু কুঁচকাল, ‘মাদ্রাসায়?’

তাকে অবাক করেই যেন টিভিতে সংবাদ পরিবেশক বলে উঠল, ‘ব্রেকিং নিউজ। নোয়াখালি থেকে ঢাকায় শিক্ষামূলক ভ্রমণের জন্য আসা মাদ্রাসার তিনটি বাসের একটি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছে। ঘটনাটি জানা গেছে একটু আগে যখন বাসগুলোর একটির সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন জানার পর মজনুদ্দিন সাহেব বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যোগাযোগ করেন। আমরা এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত খবর নিয়ে আসছি খুব শিগগিরি। সঙ্গে থাকুন।’

নির্মল ফোন রেখে চিন্তিত মুখে টিভির দিকে তাকিয়ে রইল।

.

৪২

সকাল দশটা।

এয়ারপোর্ট থেকে নেমে গাড়িতে উঠলেন দুজনে।

মাথুর আগেই ফোন অন করেছিলেন। খানকে বললেন, ‘পীযূষ ফোন করতে বলেছে।’

আশরফ ইশারায় বোঝালেন সেফ হাউজে পৌঁছে ফোন করবেন।

গাড়ি প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে একটা দরজির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দুজনে নেমে গিয়ে দোকানের ভেতরে প্রবেশ করলেন। দোকানদার বলল, ‘কী চাই?’

খান বললেন, ‘ভাত খাব। ইলিশ দিয়ে। টাকা এনেছি।’

একটা দশ টাকার বাংলাদেশি নোট এগিয়ে দিলেন খান। তার কোণটা ছেঁড়া।

দোকানদার নোট হাতে নিয়ে দেখে বললেন, ‘আসুন। ট্রায়াল রুম এদিকে।’

দোকানের পেছনের দিকে একটা ছোট ঘর। দুজনে সে ঘরে ঢুকলেন।

খান মোবাইলের টর্চ জ্বেলে দেওয়ালে কিছু একটা খুঁজতে শুরু করলেন। কয়েক সেকেন্ড পরেই তার মুখে হাসি ফুটল। একটা সুইচে হাত দিলেন। গোপন দরজা খুলে গেল। দুজনে ঢুকতে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। একটা ছোট খাটো ঘর। অ্যাটাচড বাথরুম। এসি চালালেন খান। আলো জ্বালিয়ে বললেন, ‘দেখি, পীযূষ কী বলে।’

মাথুর খাটে বসে বললেন, ‘ফোন করো।’

খান পীযূষকে ফোন করলেন। পীযূষ ফোন তুলেই বললেন, ‘একটা অডিও পাঠাচ্ছি। শোন। ফ্রেশ রিলিজ।’

খান বললেন, ‘পাঠাও। ওকে দেখছি।’

ফোনটা কেটে খান মেসেজ বক্স দেখলেন। অডিও মেসেজটা এসেছে। অন করলেন খান,

.

‘প্রিয় বন্ধুরা,

উপরওয়ালার প্রিয়তম বান্দারা,

আমাদের বন্ধুরা যারা এতদিন আমাদের হয়ে কথা বলত, তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একটার পর একটা আইন। আমাদের ভাইদের বেঁচে থাকাটাকেই দুষ্কর করে দিয়েছে সবাই। দেশের প্রতিটা অঞ্চলের ভাইরা জানে, কাশ্মীরে কী হচ্ছে। এত সহজে আমরা কাশ্মীর ছেড়ে দেব না। দুটো সেনা রেখে যারা ভেবেছে কাশ্মীর দখল হয়ে যাবে, তারা ভুল ভেবেছে। আমরা জড়ো হব, আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধে, এই জিহাদে আমরা কাশ্মীরকে মুক্ত করবই। লড়াই ছাড়লে চলবে না বন্ধুরা। আমাদের প্রত্যেকের রক্ত চায় এ জেহাদ। জিততে আমাদের হবেই।

কণ্ঠরোধ করে কাশ্মীরকে চুপ করে রাখবেন ভেবেছেন? অত সোজা হবে? হতে দেব না। এত সহজে হতে দেব না…আমরা আসছি। বেঁচে থাকাটাই কঠিন করে দেব। প্রতিটা রক্তের হিসেব নেব আমরা। বুঝে নেব সবটা।’

.

মাথুর ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘সে কী গো? গলাটা চেনা লাগছে না?’

আশরফ বললেন, ‘হু। হাসান মাকসুদের গলা। রেকর্ডেড।’

মাথুর বললেন, ‘তুমি শিওর হাসান মাকসুদকে আমরা সেই শাস্তিই দিয়েছি? জানা গেছে কি কিছু?’

খান মাথা নাড়লেন, ‘না। এখনও কিছুই জানি না। ক্লাসিফায়েড ইনফরমেশন। তুষার স্যার জানতে পারেন।’

মাথুর বললেন, ‘জিগ্যেস করো। ফোন করো।’

খান বললেন, ‘জেনে কী করবে?’

মাথুর বিরক্তগলায় বললেন, ‘এখন আমাদের আবার ওই হাসান মাকসুদের ভূত তাড়া করবে? জেনে নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যেত না?’

খান চেয়ার টেনে বসলেন, ‘ঠিকই। তুষার স্যারকে ফোন করি। দেখা যাক কোনও ইনফো দেন নাকি।’

মাথুর খানের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বললেন, ‘করো।’

খান তুষারের নাম্বার ডায়াল করে ফোন স্পিকারে দিলেন।

ফোন রিং হচ্ছে। একবার পুরো রিং হয়ে যাবার পরেও তুষার ফোন ধরলেন না। খান আবার ফোন করলেন। এবার তুষার ফোন ধরলেন।

খান বললেন, ‘স্যার, পীযূষের অডিওটা পেয়েছেন?’

তুষার বললেন, ‘আমিই পাঠাতে বলেছি। তোমাদের মনে প্রশ্ন উঠেছে, তাই তো?’

খান বললেন, ‘বুড়োটার বেঁচে থাকার দরকার ছিল না স্যার। দয়া-মায়া দেখিয়েছেন কি? ওর অডিও বেরোল কী করে এখন?’

তুষার বললেন, ‘জ্যোতির্ময়ের অডিও নিয়ে ভেবো না। এ আই এর জমানায় তোমার বেসুরো গলা দিয়ে কিশোর কুমারের গান গাওয়ানো যাবে। এভ্রিথিং ইজ পসিবল।’

খান হাঁফ ছাড়লেন, ‘ওকে স্যার। মাথা থেকে এটা সরালাম। আমাকে জানান, এখন আমরা কী করব?’

তুষার বললেন, ‘সেল অ্যাক্টিভেট করো, গিয়াস কোথায় আছে খোঁজো। আমাদের যে এজেন্টই ওর কাছে থাকুক, আজ রাতের মধ্যে তাকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে হবে। প্রাইমারি টার্গেট এটাই।’

খান বললেন, ‘রাইট স্যার। কাজ শুরু করছি।’

তুষার বললেন, ‘ওখানে আমাদের যারা আছে, লিস্ট পাঠাচ্ছি। কতজনের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করতে পারছ দেখো। বাকিটা আমি পরে বলছি।’

খান বললেন, ‘রাইট স্যার।’

তুষার ফোন কাটলেন। খান দেখলেন, তার ফোনে একটা লিস্ট চলে এসেছে। দুজনে ফোন নিয়ে বসে গেলেন।

.

৪৩

‘ঠিক কত দিন ঢাকার পরিচিতি বানাতে লেগেছে আমার, জানো? রুমান নামের চরিত্রটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে?’

অমল চায়ে চুমুক দিয়ে বলল।

রাণা জিজ্ঞাসুচোখে অমলের দিকে তাকাল। ইমতিয়াজ গাড়ির ব্যবস্থা করতে বেরিয়েছে। কিছুক্ষণ পরে গাড়ি এলে তারা ঢাকা রওনা দেবে।

অমল বলল, ‘তেরো বছর! উনচল্লিশ বছর বয়স আমার। তেরো বছর আগে আমি এ দেশে এসেছিলাম।’

তেরো বছর? রাণার কত দিন হল? সবে এল! তাও এত বড় একটা কাজে? সে সংকুচিত হল।

অমল বলে চলল, ‘ওল্ড স্কুল মেথড বুঝলে? ওই সময়টা চারদিকে এত ক্যামেরা ছিল না। ভিড়ে মিশতে সুবিধে হয়েছিল। হাতের তালুর মতো চিনতে হবে শহর। প্রথম পোস্টিং কোথায় ছিল জানো?’

রাণা বলল, ‘কোথায়?’

অমল হাসল, ‘মগবাজার। ভিক্ষা করতাম ছেঁড়া জামা পরে। জিগ্যেস করতাম কী হবে স্যার ভিক্ষা করে? কাউকে ফলো করতে হবে? উত্তর আসতো, না। কাউকে মারতে? উত্তর এল, না। তাহলে কী করতে? বিস্মিত হয়ে জিগ্যেস করতাম। একটাই উত্তর আসতো। করে যাও। আমাকে কেউ কোনও কাজ দিত না। হঠাৎ করেই সাদিকের কাজটা এল। সব তৈরি করে ওর বিশ্বাস অর্জন করলাম। সব এত সহজে চলে যাবে?’

রাণা বলল, ‘আসগরের জন্য আপনি কি আমাকে দোষ দিচ্ছেন?’

অমল মাথা নাড়ল, ‘না। দিচ্ছি না। দিলে শুরুতে বাধা দিতাম। মনে করে দেখো, আমিও তোমাকে ওকে মারতে বলেছিলাম, বাধা দিইনি। হিসেব করে দেখতে গেলে ও ব্যাটাকে আমিও অনেকদিন ভেবেছি উড়িয়ে দিই। তোমার গিল্ট ফিলিং হতে পারে, ভেবো না, যা করেছ ঠিক করেছ। পাচার করার আগে ওই বিকৃতমনস্ক আসগর সাত-আট বছরের বাচ্চাদের সঙ্গে যা করত, তার বিস্তারিত বিবরণ দিলে তোমার সব গিল্ট ফিলিং চলে যাবে। ওসব নিয়ে ভেবো না।’

রাণা বলল, ‘কিন্তু সাদিক আপনাকে সন্দেহ করতে পারে। সাকিনা যদি নাম বলে দেয়?’

অমল রাণার দিকে তাকাল, ‘কী আর হবে? মরে যাব? মেরে ফেলবে? মারুক। এর বেশি আর কী হতে পারে? মরতে ভয় পাই না। পাবো না।’

রাণার অস্বস্তি হচ্ছিল। অমল তার টার্গেট? কী করে হয়? ঠিক কী করেছে অমল যে উস্তাদ তাকে অমলকে মারতে পাঠিয়েছেন? মানুষের সঙ্গে থাকলে তার কুকীর্তিগুলো বাইরে আসতে শুরু করবেই একটা সময়ে, অথচ অমলের সঙ্গে থাকার পর কী হয়েছে? এক রাতে অজ্ঞাতপরিচয় কারো সঙ্গে দেখা করেছিল। করতেই পারে। এরকম কাজে অনেকের সঙ্গেই গোপনে দেখা হতে পারে। সেটা নিয়ে অভিযোগ করার কোনও কারণ নেই। জিগ্যেস করবে? না থাক। এখনও সে সময় আসেনি।

ইমতিয়াজ ব্যস্ত হয়ে ঢুকল, ‘গাড়ির ব্যবস্থা করেছি। আমি দিয়ে আসব। ভেক ধরবে না? এইভাবেই বেরোবে?’

অমল বলল, ‘আধ ঘণ্টা লাগবে। চলো রাণা, তোমাকেও তৈরি করে দিই।’

আধঘণ্টাই লাগল। রাণাকে বয়স্ক লোক বানিয়ে দিল অমল। নিজের বয়স সামান্য বাড়িয়ে নিল। রাণাকে বলল, ‘চাচা ভাতিজা। ঠিক আছে না? চলো।’

রাণা হাসল। চাচা সাজতে হবে ভাবেনি কোনও দিন।

গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে ইমতিয়াজের বাড়ির সামনে। ইমতিয়াজ বলল, ‘আমার মনে হয় না তোমাদের পথে কোনও সমস্যা হবে। তবে হলে জিনিস আছে তো?’

অমল বলল, ‘না। রাণার কাছে ছিল, সে হারিয়ে বসে আছে।’

ইমতিয়াজ অদ্ভুত চোখে রাণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী করতে এদেশে এসেছ, তাও ভুলে গেছ নাকি?’

রাণা চমকে ইমতিয়াজের দিকে তাকাল। ইমতিয়াজ হাসি হাসি মুখে তার দিকে চেয়ে আছে। রাণা মাথা ঠান্ডা করে বলল, ‘ভুলিনি।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘দাঁড়াও। নিয়ে যাও।’

অমল আপত্তি করল, ‘না, না। দরকার পড়বে না।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘তোমার না লাগতে পারে, রাণার জন্য দিচ্ছি। রাণা, এসো।’

রাণা অমলের দিকে তাকাল। অমল বলল, ‘নিয়ে নাও। ইমতিয়াজ ভাই বললে দরকার আছে তার মানে!’

ইমতিয়াজ ঘরের ভেতর গেল। পেছন পেছন রাণা। ইমতিয়াজ আলমারি খুলতে খুলতে বলল, ‘ভুলে গেছ, কেন এসেছ?’

রাণা চাপা গলায় বলল, ‘আপনি কী করে জানলেন?’

আলমারি থেকে একটা অটোমেটিক রিভলভার রাণার হাতে দিয়ে ইমতিয়াজ বলল, ‘তোমায় যিনি পাঠিয়েছেন, তিনি আমায় এ কথাটা তোমাকে জিগ্যেস করতে বললেন।’

রাণা বলল, ‘ভুলিনি। সময় লাগবে। আমি এখনও কিছু শিখিনি।’

ইমতিয়াজ হাসি মুখে রাণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যাত্রা শুভ হোক। যাও।’

.

৪৪

কলকাতা বিমানবন্দর। তুষার ফ্লাইট থেকে নেমে লাগেজ নেওয়ার ভিড়ে গেলেন না। তাঁর লাগেজ নেই। সরাসরি এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠলেন।

ড্রাইভার তাকে নিতে এসেছিল। রাঘব নাম। তুষারের পূর্বপরিচিত। তুষার বললেন, ‘কেমন আছ রাঘব?’

রাঘব বলল, ‘ভালো স্যার। আপনি ঠিক আছেন তো?’

তুষার বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক তো থাকতে হয়। আচ্ছা শোন, তুমি এই ঠিকানাটা চেন নাকি দেখো তো।’

রাঘবের দিকে ফোনটা এগিয়ে দিলেন তুষার।

রাঘব বলল, ‘লোকেশন দেখে চলে যাচ্ছি স্যার। অসুবিধা হবে না।’

তুষার খুশি হলেন, ‘ফাইন।’

গাড়ি চলতে শুরু করল। তুষার পকেট থেকে পেন বের করে নোটপ্যাডে লিখলেন, ‘আছে? না নেই? কিপিং মাই ফিঙ্গারস ক্রসড। থাকতেই হবে যে করে হোক।’

কিছুক্ষণ পর গাড়িটা নিউটাউনের অত্যাধুনিক বৃদ্ধাশ্রমে প্রবেশ করল। গাড়ি থেকে নেমে কোনদিকে না তাকিয়ে তুষার রিসেপশনে গেলেন।

রিসেপশনে একজন ছেলে আর একজন মেয়ে বসে আছে। তুষারকে দেখে দুজনেই হেসে বলল, ‘স্যার, হাউ মে উই অ্যাসিস্ট ইউ?’

তুষার বললেন, ‘আমার বন্ধু আছে এখানে। দেখা করতে চাই।’

মেয়েটা বলল, ‘নাম বলুন স্যার।’

তুষার বললেন, ‘অনিল শেখাওয়াত। কোন ফ্ল্যাটে থাকে, কোন ঘরে, কিছু জানি না। আপনারা হেল্প করলে সুবিধা হয়।’

দুজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। ছেলেটা গম্ভীর হয়ে বলল, ‘সরি স্যার, ওই নামে এখানে কেউ থাকে না।’

তুষার হেসে ফেললেন, ‘যে আপনাদের এসব লুকোতে বলেছে, তাকে বরং একবার ফোন করুন। বাকিটা আমি বুঝে নেব না হয়।’

ছেলেটার হাসি কমল। বলল, ‘কেউ বলেনি স্যার। সত্যিই এখানে কেউ থাকে না।’

তুষার ছেলেটার দিকে স্থির চোখে চেয়ে থেকে বললেন, ‘কৌশিক সেন। আধার নাম্বার ৩৪৫২*৪২৫*৫। বাঁ হাতি, বাড়ি বাগুইহাটি, বাবা মা-র এক ছেলে। অথচ কলেজ লাইফে একবার পরীক্ষা না দিয়ে পালিয়ে গেলে। সেই থেকে ড্রপ আউট। বাবা-মা আছেন। দিদির বিয়ে হয়েছে পাটনাতে। মাঝে মাঝে এখানে ঢপ মেরে ছুটি নিয়ে পাটনায় দিদির সঙ্গে দেখা করে আস। ডান পায়ে হাঁটুর কাছে একটা কাটা দাগ আছে, ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়ে হয়েছিল। কলেজ লাইফে প্রেম করতে, কিন্তু তুমি ড্রপ আউট জেনে প্রেমিকা কেটে গেল। ব্রাউজারে রাত দশটার পর ইনকগনিটো মোডে পর্ণ সাইট দেখো।’

ছেলেটা আর মেয়েটা হাঁ করে তুষারের দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা বলল, ‘আপনি কে?’

তুষার বললেন, ‘কথা বাড়াচ্ছ কেন কৌশিক? আমার হাতে বেশি সময় নেই। তুমি নিয়ে যাবে না আরও নতুন কোনও ইনফো দেব? দেরি করলে তোমার সমস্যা বাড়বে এটুকু বলতে পারি। আর হ্যাঁ, শেখাওয়াতকে কোনও ফোন করবে না।’

কৌশিকের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি ডেস্ক থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ‘চলুন স্যার। আমি নিয়ে যাচ্ছি।’

তুষার কথা বাড়ালেন না। কৌশিকের পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করলেন।

কয়েক মিনিট পরে একটা দরজার সামনে নিয়ে গিয়ে ছেলেটা বলল, ‘এই রুমটা। আমি আসি।’

তুষার মাথা নাড়লেন, ‘ওকে।’

কৌশিক চলে গেল। তুষার কলিং বেল টিপলেন।

দরজা খুলে গেল। যে দরজা খুলল তিনি তুষারের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘মনে হচ্ছিল আপনি আসবেন। আসুন।’

তুষার ঘরে ঢুকে বললেন, ‘তোমরা মিনিস্ট্রিকে কনভিন্স করে অর্গানাইজেশনকে ভাগ করলে, মেনে নিলাম। নিজেদের জন্য সব রকম স্বাধীনতা চাইলে, তোমাদের তাও দেওয়া হল। এবার দয়া করে কি বলবে ঢাকায় ঠিক কী চলছে?’

শেখাওয়াত ঘাড় নাড়লেন, ‘কিছু না তো। এভ্রিথিং ইজ নর্মাল।’

তুষার মৃদু হাসলেন, ‘ওকে। তুমি যা বলবে, তাই মেনে নিতে হবে। বাই দ্য ওয়ে, তোমার কী খবর শেখাওয়াত? কাউকে কোনও রিপোর্ট করার প্রয়োজন বোধ করছ না, আমরা জানি তুমি থাইল্যান্ডে সেটল করে গেছ অথচ দেখা যাচ্ছে কলকাতায় এরকম একটা বৃদ্ধাশ্রমে একা একা বসে আছ। সমস্যাটা কী?’

শেখাওয়াত বললেন, ‘আমি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তোমাকে দিতে বাধ্য নই।’

তুষার পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে কয়েক সেকেন্ড কাজ করে ফোনটা শেখাওয়াতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মিনিস্ট্রি অর্ডার। আমার আগের সমস্ত চার্জ রিস্টোর হয়েছে। আমি বাংলাদেশও দেখব তার অর্ডার আছে। এবার কি তুমি আমাকে বলবে ঢাকায় কী হচ্ছে?’

শেখাওয়াত থমথমে মুখে তুষারের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

.