১৫
ফোনটা নিয়ে ঠাকুরঘরে চুপচাপ বসে আছে রুমা। ঠাকুরঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে রেখেছে। মাকে বলেছে পাঁচালি পড়বে।
দিব্যেন্দু অফিসে গেছে।
বুকটা কেমন ঢিব ঢিব করছে।
কয়েক মিনিট আগে একটা নাম্বার থেকে ফোন এসেছিল। সে ধরতে ও পাশ থেকে একজনের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘আমি শুনলাম আপনার বর আপনাকে মারে?’
রুমা ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘কে বলছেন আপনি?’
‘আমি কে, তা জানার দরকার নেই। আপনি আমাকে শুধু বলুন, আপনার জীবন কি খুব খারাপ হয়ে গেছে?’
রুমা সতর্ক হল। দিব্যেন্দুই কাউকে দিয়ে ফোন করাতে পারে। সে বলল, ‘রঙ নাম্বার।’
‘শুনুন, শুনুন। কাটবেন না। আমার কথা শুনুন। আপনি একজনকে ফোন করেছিলেন তো? আপনি কাউকে একটা খুঁজছিলেন। সিম নিয়েছে নতুন? তাই তো?’
রুমা এবার নিশ্চিত হল। বলল, ‘আপনি কে বলছেন?’
‘আমি কে বলছি তা জানার দরকার নেই। এটা বলতে পারি যে, আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি। আপনি কি বাড়ি ছেড়ে পালাতে চান? একটা নিশ্চিন্ত জীবন পেতে চান?’
রুমা ফোন কেটে দিল। লোকটার কথাগুলো কেমন টেলি কলারের মতো শোনাচ্ছে।
লোকটা আবার ফোন করছে। রুমা ধরল না। লোকটা হাল ছাড়েনি। চেষ্টা করেই যাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে ধরল রুমা, ‘আপনাকে আমি চিনি না। আপনি আমাকে বার বার ফোন করবেন না।’
‘শুনুন ম্যাম, আপনাকে আমি হেল্প করতে পারি। আপনি জীবন থেকে কী চান? একটু শান্তি তো? আমি দেব।’
‘মানে? কেন দিতে যাবেন অজানা অচেনা কাউকে?’
‘কারণ আপনি একজন মানুষ। আমাদের কাছে একজন মানুষও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ ব্যাপারটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা লোক জড়ো করছি। আমরা খুঁজছি, কারা আমাদের সঙ্গে জুড়তে পারে। সবাই তো আর সব কিছু ছেড়ে চলে আসার পরিস্থিতিতে থাকে না। কেউ সন্তান থাকার কারণে সব কিছু ছেড়ে আসতে পারে না। পড়ে পড়ে মার খায়। আপনার তো কেউ নেই? আছে?’
রুমা বলল, ‘না। আমার বাবা-মা থেকেও নেই। আমি শুধু মার খাই। দুবেলা ভাত খাবার জন্য আমাকে মার খেতে হয়।’
‘আপনি আপনার লোকেশনটা পাঠান। আমরা আপনাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসব।’
‘উদ্ধার করে কোথায় নিয়ে যাবেন?’
ও প্রান্ত থেকে হাসির শব্দ এল। লোকটা হেসে বলল, ‘ভালো থাকবেন, কেউ মার খাবে না, এটুকু নিশ্চিত করতে পারি। তারপরেরটা না-হয় তার পরে দেখা যাবে?’
রুমা ফোন কেটে অফ করে রেখে দিল।
মা বাইরে ঘুর ঘুর করছে। তাকে দেখে বলল, ‘শোন, একজন ভালো ডাক্তার পাওয়া গেছে। তোর এই যে বাচ্চা হচ্ছে না, সেটার ব্যাপারে কথা বলা যাবে। ডাক্তারবাবুকে দেখা। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।’
রুমা অবাক গলায় বলল, ‘আমার বাচ্চা হচ্ছে না কে বলল তোমায়?’
মা বলল, ‘জামাইই তো বলল। তোর নাকি কী সব সমস্যা আছে?’
রুমা স্তম্ভিত হয়ে বলল, ‘আমার সমস্যা আছে? এ কথা বলল?’
মা বলল, ‘হ্যাঁ। তুই ভাবিস না। আমি কথা বলে রেখেছি। রবিবার তোকে দেখিয়ে আনবো। অনেক রকম উপায় আছে এখন।’
রুমা ঘরে এসে মাথায় হাত দিয়ে বসল। মা তার পিছন পিছন এসে বলল, ‘ছেলেটা এত ভালো। তোর জন্য সব সময় ভেবে যাচ্ছে।’
রুমা অন্যমনস্ক গলায় বলল, ‘হু।’
মা বলল, ‘কানেরটা দেখেছিস? অনেকটা সোনা দিয়ে করা। কত ভালোবাসে। আর তুই কোথাকার একটা জঞ্জালের সঙ্গে পালাবি ভেবে বসেছিলিস। ছি-ছি। কী হতো বলত? কোনও একটা বস্তিতে ঘুটে কুড়ানির কাজ করতে হতো। ভাবতেও লজ্জা লাগে। আমি তো তোর বাবাকে বলি, তোর বোনের জন্য জামাইয়ের মতো একটা ছেলে খুঁজতে হবে।’
রুমা জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। হাসি পেয়ে গেল হঠাৎ করে। খিলখিল করে হেসে উঠল।
মা বলল, ‘তুই খোলা চুলে বাইরে গেছিলি না? আমি আগে থেকেই জানি, তোর উপর কিছু একটা ভর করেছে। তোকে ঝাড়াতে হবে ভালো করে। তার ব্যবস্থাও করছি।’
রুমা আরও জোরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে গেল একেবারে…
১৬
শমিতার ঘরটা ভেতরের দিকে। লোকটাকে সুখেন ছেড়ে দিয়ে এল দরজার সামনে। লোকটা নক করল দরজায়। শমিতা লোকটাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে দিল।
এইসব জায়গায় কাজ করতে হলে চোখ-কান খোলা রাখতে হয়। সুখেনের তা বরাবর প্রখর। লোকটা শমিতার কাছে কেন এলো, তা জানার কৌতূহল হচ্ছিল তার।
বাইরে থেকে যে মেয়েগুলো আসে, তারা প্রথমে কয়েকদিন এসে শমিতার কাছে থাকে। শমিতা তাদের ট্রেনিং দেয়, কী করে খদ্দেরের সামনে দাঁড়াতে হয়, কথা বলতে হয়। এত লোক থাকতে এই লোকটা শমিতার কাছে এসেছে বলেই সুখেনের অস্বস্তি হচ্ছিল। বীথিকার ঘরটা শমিতার ঘরের কাছেই। সুখেন বীথিকার ঘরের সামনে বসল। বীথিকা তাকে দেখে বলল, ‘কী হল? এখানে কী করছিস তুই?’
সুখেন বিড়ি ধরিয়ে বলল, ‘কিছু না। লোকজন কম আসছে বলে ব্যবসা ভালো নেই।’
বীথিকা বলল, ‘ভালো হবে কী করে? কচি কচি সব ধরে আনছে কোত্থেকে। এবার আর আমাদের কেউ নেবে? আর তো কোনও কাজও জানি না ছাই।’
সুখেন বিড়িতে টান দিল। বলল, ‘অনেক লোকই আছে তোদের মতো বুড়ি পছন্দ করে। নিয়ে আসব। ভাবিস না।’
বীথিকা সুখেনকে কনুই দিয়ে ঠ্যালা দিল, ‘এই হারামজাদা। আমি বুড়ি? আমার তিরিশও হয়নি।’
সুখেন বলল, ‘তাই নাকি? জানতাম না তো?’
লোকটা বেরোল শমিতার ঘর থেকে। সুখেন বলল, ‘এই বীথিকা, দেখ তো, এ লোকটাকে চিনিস?’
বীথিকা আগেই দেখেছিল। বলল, ‘অনেক দিন আগে দেখেছিলাম। আজ এলো আবার। আমি তো ডেকেওছিলাম, শমিতা তো আমার থেকেও বুড়ি, ওর কাছে গেছিল কেন কে জানে!’
সুখেন দাঁড়াল, বলল, ‘সেই।’
লোকটা এগোচ্ছে। গলি দিয়ে সিধে হেঁটে চলেছে। সুখেন একটু দূরত্ব রেখে লোকটার পেছন পেছন হাঁটতে লাগল। বড় রাস্তার কাছে এসে লোকটা ঘুরে দাঁড়াল। তাকে হাতছানি দিয়ে ডেকে বলল, ‘বল ভাই, কিছু জানতে চাও?’
সুখেন থতমত খেয়ে বলল, ‘না তো। আমি তো এইদিকেই আসছিলাম, খদ্দের ধরার জন্য।’
লোকটা পকেট থেকে একটা লম্বা সিগারেট বের করে ধরিয়ে বলল, ‘খদ্দের? তাই নাকি?’
সুখেনের পাড়ায় এসে সুখেনকে গরম নিচ্ছে লোকটা। কিন্তু সুখেন তাও কিছু করতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে এ লোকটার বড় কোনও জাহাজে দড়ি বাঁধা আছে। নাকি লোকটাই একটা জাহাজ? কে জানে।
সুখেন বলল, ‘হ্যাঁ। শমিতার সঙ্গে কাজ মিটেছে?’
লোকটা তার মুখে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘তা জেনে তোমার কী হবে? যত কম জানবে, তত ভালো থাকবে। বুঝেছ?’
সুখেন ভালো ছেলের মতো মাথা নাড়ল। লোকটা চলে গেলে সুখেন শমিতার ঘরে ঢুকল। শমিতা তাকে দেখে বলল, ‘কীরে? কাউকে নিয়ে এসেছিস, না তোরই লাগবে আজ?’
সুখেন বলল, ‘এই লোকটা যে এসেছিল, কে রে?’
শমিতার মুখটা একমুহূর্তের জন্য ফ্যাকাসে হয়ে গেছিল। সে তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে বলল, ‘কোন লোকটা? সারাদিন কত লোক আসছে!’
সুখেন চারদিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘তুই জানিস কোন লোকটার কথা বলছি। কে লোকটা? পার্টির নাকি পুলিশের?’
শমিতা রেগে গেল, ‘যেই হোক, তোর কী তাতে? ফোট এখান থেকে।’
সুখেন বলল, ‘রোজ রাতে তোর ঘরে চার পাঁচটা মেয়ে আসছে। এরা কোথাকার? সবক’টাকে বাঙালি বলে মনেও হচ্ছে না।’
শমিতা বলল, ‘গায়ে খুব জ্বালা ধরে তোদের না রে? আমি রোজগার করছি, তোদের জ্বলছে। বেশি বাড়িস না সুখেন, আমি কিন্তু বুঝে নেব তোকে। বেরো এখান থেকে।’
সুখেন বেরিয়ে গেল। সমিতির অফিসে শম্পা একা বসে ছিল। সুখেনকে দেখে বলল, ‘কী রে? কী হয়েছে?’
সুখেন বলল, ‘শমিতার ঘরে অনেক মেয়ে আসছে। খবর পেয়েছ?’
শম্পা অবাক হল, ‘না তো। কেউ বলেনি কিছু। কোত্থেকে আসছে মেয়েগুলো?’
সুখেন বলল, ‘বাইরে থেকে। রেজিস্ট্রেশন বা হেলথ চেক আপ করায়নি কারো?’
শম্পা ঠোঁট ওল্টালো, ‘আমি জানি না। মাইনর ধরে ধরে আনছে নাকি?’
সুখেন বলল, ‘তাই তো মনে হয়। খোঁজ নাও।’
শম্পা বলল, ‘আমি নিতে পারব না। আমার অত আগ্রহ নেই ভাই। কারা কোথায় কী করে বেড়াচ্ছে, তার দায় কি আমার নাকি? শমিতার ঘরে অনেকেই আসে। সব জানার দরকার নেই আমার। আর তোকেও বলি, এত কিছু জানার ইচ্ছা ভালো না। কম জানলে ভালো থাকবি।’
সুখেন ছোট ছোট চোখ করে শম্পার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবল। কিন্তু কিছু বলল না।
১৭
‘বাড়ি যাবি এখন?’
অফিস থেকে বেরোতেই সুদেব পিছু ডাকল। দিব্যেন্দু বলল, ‘হ্যাঁ।’
সুদেব বলল, ‘প্রমোশন পেয়েছিস, সেলিব্রেট করবি না?’
দিব্যেন্দু জানে, সুদেব একটু এদিক সেদিক যায়। তবু প্রথমে বুঝতে পারল না সুদেব কী বলতে চাইছে। সে বলল, ‘সেরকম কিছু করার কথা ভাবিনি।’
সুদেব এসে ফিসফিস করে বলল, ‘এরিয়া টুয়েন্টিতে চল। নতুন ফ্রেশ স্টক এসেছে। ভালো লাগবে।’
দিব্যেন্দু ঘড়ি দেখল। সুদেবের ভাট বকা শুনলে চলবে না। সে বলল, ‘পরে যাব। এখন তাড়া আছে।’
সুদেব মুখে বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘আরে ভাই, কতদিন আর বাচ্চা ছেলে থাকবি, বড় হ।’
দিব্যেন্দু দাঁড়াল না। সুদেব এর আগেও বলেছে। অফিস থেকে ওই পাড়াতেই চলে যায় ও।
সে স্টেশনে এসে শেষ মুহূর্তে ট্রেন ধরল। তাপস বলল, ‘অ। বাঙাল এসে গেছে? আমি তো ভেবেছিলাম আসবে না।’
দিব্যেন্দুর জন্য রুমাল দিয়ে জায়গা রাখা ছিল। সে বসে তাস হাতে নিয়ে বলল, ‘এক কলিগ ধরেছিল। তোর জন্মস্থানে নিয়ে যাবে বলে। গেলাম না।’
তাপস বলল, ‘আমার জন্মস্থান মানে?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘ওই যে, যেখানে সব লাইন দিয়ে দাঁড়ায়।’
তাপসের চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। বাকি রাস্তাটা তাপস যখনই খাপ খুলতে গেল, দিব্যেন্দু প্রতিবারই বাক্যাঘাতে তাকে তছনছ করে দিল। কামরুল পর্যন্ত বলে ফেলল, ‘বিরাট উন্নতি তো? প্রমোশনের জন্য নাকি?’
দিব্যেন্দু কাউকেই পাত্তা দিল না। তাপসকে পরপর দু’দিন কোণঠাসা করে দেওয়া গেছে। বিরাট ব্যাপার।
ট্রেন দাঁড়াতে সাইকেল নিতে দৌড়ল সে। মফস্সলে সন্ধ্যা নেমেছে। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে বোধহয়। রাস্তাঘাট ভেজা। হলদে আলোয় পিচের রাস্তায় সাইকেল চালাচ্ছে দিব্যেন্দু। মনে একটা আনন্দ হচ্ছে। শ্বশুর শাশুড়ি আছে। ওরা থাকলে রুমা আর কাউকে ফোন করতে পারবে না! ভাবতেই ঠোঁটের কোণে হাসি চলে আসছে তার। আজ বেগ আসেনি। চপের দোকানের সামনে সাইকেল দাঁড় করাল সে। গরম গরম বেগুনি ভাজছে। জলপাইয়ের চপ। ভেজিটেবল চপ। ডিমের চপও আছে। একটা আস্ত ডিম দেয় এ দোকানে। সে প্রত্যেকের জন্য দুটো করে ভেজিটেবল চপ আর ডিমের চপ নিল। দোকানদার বিটনুন ছড়িয়ে দিচ্ছে চপের উপরে। শসা পেঁয়াজ কুঁচো করে কাটা। সেটাও দিয়ে দিল। হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে সাইকেলটা চালিয়ে খানিকটা যাবার পর হঠাৎ করে একটা কুকুর এসে পড়ল চাকায়। দিব্যেন্দু সাইকেল থেকে পড়ে গেল। রাস্তার কাঁদায় চপ মাখামাখি খাচ্ছে। চারপাশে কেউ নেই। ব্যথা করছে পায়ে। দাঁতে দাঁত চেপে দিব্যেন্দু সাইকেল নিয়ে উঠে দাঁড়াল। কুকুরটা দূর থেকে তাকে করুণ চোখে দেখছে। জামা ঠিক করে আবার সাইকেলে উঠল সে। ধীরে ধীরে সাইকেল নিয়ে বাড়িতে এল। সামনের ঘরে শ্বশুর বসে আছে। দিব্যেন্দু শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে হেসে বাথরুমে ঢুকে গেল। স্নান সেরে বেরোতে রুমা বলল, ‘মুড়ি দেব?’
দিব্যেন্দু ঘরে যেতে যেতে বলল, ‘একবার এসো।’
রুমা তার পেছন পেছন ঘরে ঢুকল। দিব্যেন্দু রুমার চুলের মুঠি ধরে চাপা গলায় বলল, ‘রাস্তায় কুকুর চলে এসেছিল। তোর পোষা?’
রুমার কাছে রাস্তার কয়েকটা কুকুর এসে খায়। উচ্ছিষ্ট খাবারগুলো রুমা খাওয়ায়। দিব্যেন্দুর হঠাৎ নেমে আসা আক্রমণে সে হতচকিত হয়ে বলল, ‘আমি জানি না।’
দিব্যেন্দু রুমার গলা টিপে ধরে বলল, ‘তুইই পাঠিয়েছিলিস। আমি জানি।’
রুমা দিব্যেন্দুর হাত ধরল। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। দিব্যেন্দু রুমার গলা ছেড়ে দিল। রুমা কাশতে কাশতে বলল, ‘ওভাবে কুকুর পাঠানো যায় নাকি?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘সব যায়। তুই সব পারিস। যা বাজার থেকে চপ নিয়ে আয়। আটটা ভেজিটেবিল, আটটা ডিম।’
রুমা ঘাড় নেড়ে বলল, ‘টাকা দাও।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘টাকা নেই। তুই কীভাবে আনবি, তুই জানিস।’
রুমা কিছুক্ষণ বিহ্বল চোখে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
১৮
অন্যান্য দিন রাত একটার পর আর তার বিশেষ কাজ থাকে না। নিজের ঝুপড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে সুখেন। খাওয়া বলতে চাল ডাল ফুটিয়ে নেওয়া। কিছুদিন আগে পেটের সমস্যা হয়েছিল। হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়েছিল গিয়ে। ডাক্তারবাবু স্পষ্ট বলে দিয়েছেন তেল খেলে মরতে হবে। তারপর থেকে সুখেন নিজেই রান্না করে, যত রাত হোক।
এ দিন সুখেন একটার পর পাপিয়ার ঘরে বেল বাজাল। পাপিয়া বেরিয়ে এসে বিরক্ত গলায় বলল, ‘কাস্টোমার নেই। ঘুমাব ভাবলাম। তোর কী হল? কাউকে এনেছিস?’
সুখেন ইতস্তত করে বলল, ‘একটু চা খাওয়াবি?’
পাপিয়া অবাক হয়ে বলল, ‘কী হয়েছে তোর? এত রাতে চা খাবি?’
সুখেন দাঁত বের করল, ‘কী করব বল? ভালো লাগছে না। কেমন গলা ব্যথা করছে।’
পাপিয়া বলল, ‘আয়।’
ছোট একটা ঘুপসি ঘর। এত কিছুর মধ্যেও পাপিয়া ঘরটা কেমন সাজিয়ে রেখেছে। ঘরের মধ্যে আবার এক কোণে ঠাকুরও আছে। এই ঘরেই বাইরের লোক আসে। পাপিয়া স্টোভে চা বসিয়েছে। বলল, ‘আদা দিলে ভালো হতো। যা দাম। কী যে করিস? ওষুধ খাবি?’
সুখেনের হঠাৎ করে কেমন কান্না পেয়ে গেল। মা-র কথা মনে পড়ে গেল। এই জায়গাতেও ওরা নিজের পৃথিবী তৈরি করে নিয়েছে। এটাই তাদের জীবন। এভাবেই তারা সারাজীবন কাটিয়ে দেবে। অথচ এই জায়গাতেও মেয়েটা তার গলা ব্যথার জন্য আদা দেওয়ার কথা ভাবল। গলা ধরে এল হঠাৎ করেই। পাপিয়া যাতে সেটা বুঝতে না পারে, তাড়াতাড়ি একটু কেশে নিয়ে বলল, ‘সকালে একটা লোক এসে শমিতার ঘরে গেছিল। শমিতা আমাকে কিছুই বলতে চাইল না। কিন্তু জানিস তো, আমার মনে হচ্ছে ডাল মে কুছ কালা হয়। কত কমবয়সি মেয়ে এ পাড়ায় ঢুকে যাচ্ছে।’
পাপিয়া বলল, ‘তুই বেশি ভাবিস না বাবা। ওদের অনেক ক্ষমতা। কী দরকার আছে এসব নিয়ে বেশি ভাবার? কাউকে কিছু বলেছিস নাকি?’
সুখেন মাথা নাড়ল, ‘না। বলিনি। কিন্তু ওই মেয়েগুলোকে দেখলে মায়া হয়। কাদের কাদের সব নিয়ে আসছে। শমিতা মোটা টাকা পাচ্ছে।’
পাপিয়া বলল, ‘পাক। তোকে ভাবতে হবে না। ভাবিস না। বোকামি করিস না। ওরা একবার কিছু বুঝে গেলে তোর বিপদ আছে। এ জায়গা ছাড়তে হবে।’
সুখেন বলল, ‘কী করব বল এ জায়গায় থেকে? কী লাভ হয়? কী করছি আমি? কীভাবে পেট ভরছি। সবাই দালাল বলে ডাকে।’
চা হয়ে গেছিল। পাপিয়া চায়ের কাপ এনে তার হাতে দিয়ে বলল, ‘বেশ করেছিস দালালি করেছিস। তুই দালালি না করলে আমরা কী করে খেতাম? আমরাও তো তোর জন্যই বেঁচে আছি। কে কী বলল, তা শোনার দরকার নেই।’
বড় গাড়িটা এসে দাঁড়াল। জানলা দিয়ে সেটা দেখে সুখেন বলল, ‘ওই দেখ। কতগুলো মেয়ে ঢুকছে। দেখছিস?’
পাপিয়া বলল, ‘তোকে না বলেছি এগুলো নিয়ে ভাববি না?’
সুখেন চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘কিছুই ভাবছি না। আমার আর ভাবতে ভালোও লাগছে না। সেই লোকটাকে ঠিক লাগল না বলেই মনে কেমন খটকা লাগছে।’
পাপিয়া বলল, ‘তার জন্য পুলিশ আছে। দেশে আইন-কানুন আছে। তোকে সেসব নিয়ে ভাবতে হবে না। তুই তোর কাজ করে যা।’
সেই লোকটাকে দেখতে পেয়ে উঠে দাঁড়াল, ‘ওই দেখ। ওই লোকটাও এসে গেছে। বড় কোনও ব্যাপার আছে বলে মনে হচ্ছে।’
পাপিয়া কড়া গলায় বলল, ‘তুই কোথাও যাবি না। চা খা বসে বসে।’
সুখেন বলল, ‘তুই একবার গিয়ে দেখে আয় না মেয়েগুলোকে নিয়ে কার ঘরে ঢোকাচ্ছে? শমিতার ওখানে তো এত জায়গা নেই।’
পাপিয়া তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘বড় জ্বালাতন করিস তুই। ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। আমি যতক্ষণ না ফিরছি, তুই কিন্তু এখান থেকে নড়বি না। তুই এ ঘরের বাইরে গেলে ওরা কেন, আমিই তোর বারোটা বাজিয়ে দেব।’
সুখেন হাসল, ‘ঠিক আছে। তুই গিয়ে খোঁজ নিয়ে আয়।’
পাপিয়া বাইরেটা দেখে সন্তর্পণে বেরোল। কিছুক্ষণ পরে এসে বলল, ‘হ্যাঁ। তুই ঠিকই বলেছিলিস। শমিতার ঘরেই গেছে। আরেকটা ব্যাপার হল, আর কয়েকটা মেয়ে শমিতার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, বাজারের গলিটা দিয়ে ওদের নিয়ে গেল।’
সুখেন বলল, ‘তার মানে দেওয়া-নেওয়া চলছে। কী ব্যাপার বল তো?’
পাপিয়া কড়া গলায় বলল, ‘তোর চা খাওয়া হয়েছে?’
সুখেন বলল, ‘হ্যাঁ। হয়েছে।’
পাপিয়া বলল, ‘নিজের ঝুপড়িতে গিয়ে ঘুমো। আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবর রাখতে হবে না। যা।
সুখেন হাসল, ‘ঠিক আছে, যাচ্ছি রে বাবা যাচ্ছি।’
১৯
একটা সময় তো তাদের কাছেই টাকা চাইতে যেত। কিন্তু এত বড় হয়ে কি আর টাকা চাওয়া যায়? রুমা টাকা চাইতে পারেনি। প্রবল যন্ত্রণা হচ্ছিল মাথায়। ছোট্ট একটা ব্যাগে একশো টাকা রাখা ছিল। কবে যেন টাকাটা রেখেছিল সে। আপদকালীন টাকা।
পালানোর জন্য রাখা। দিব্যেন্দু তাকে একটা টাকাও দেয় না। রুমা কোনওদিন দিব্যেন্দুর পকেট থেকে টাকা নেয়নি। সন্ধে নেমেছে। রুমা যেন ঘোরের মধ্যে চপের দোকানে গেল। চপ নিয়ে ফিরে এসে দিব্যেন্দুকে দিল।
প্যাকেটটা দেখেই দিব্যেন্দু বলল, ‘দেখলি? ঠ্যাকায় পড়লে সব ব্যবস্থা হয়ে যায়। যা কুচো কুচো করে শশা কাট। পেঁয়াজ কাট। মুড়ি দিয়ে চপ দিয়ে দে।’
রুমা রান্নাঘরে গিয়ে শশা কাটতে শুরু করল। আগে চোখ থেকে জল বেরোত। এখন সেটাও বেরোচ্ছে না। সুন্দর করে মুড়ি মেখে দিব্যেন্দুকে দিল। দিব্যেন্দু রাগ দেখাল, ‘আগে বাবা-মাকে দে।’
রুমা তাই দিল। সব কিছু দিয়ে ঠাকুরঘরে গিয়ে ফোন অন করল। লোকটার নাম্বারে ফোন করল। রিং হতেই ধরল লোকটা, ‘হ্যাঁ, ডিসিশন হল?’
রুমা বলল, ‘আমি কোথায় থাকি, কী করে বুঝবেন?’
‘আমাকে হোয়াটস অ্যাপে লোকেশন পাঠান। হোয়াটস অ্যাপে গিয়ে…’
‘পারি। কিন্তু আমার নেট নেই।’
‘ভরিয়ে দিচ্ছি। লোকেশন পাঠান। বাকিটা দেখছি।’
ফোন কেটে গেল। রুমার ঘাম হচ্ছিল। দিব্যেন্দু জানতে পারলে সত্যি সত্যি তাকে পুঁতে দেবে। কিন্তু আর না। আর পারা যাচ্ছে না। অনেক হয়েছে। এবার এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে।
নেট প্যাকের এসএমএস এল।
রুমা সঙ্গে সঙ্গে হোয়াটস অ্যাপ খুলে লোকটাকে লোকেশন পাঠিয়ে দিল। ফোন ভাইব্রেট করে উঠল, ফোন ধরতেই লোকটা বলল, ‘দু’ঘণ্টা লাগবে। রাত এগারোটার পর বাড়ির বাইরে একটা কালো গাড়ি দাঁড়াবে। উঠে চলে আসুন।’
রুমা বলল, ‘শুনুন শুনুন।’
‘আপনি চলে আসুন। না আসতে চাইলে আসবেন না। গাড়িটা দশ মিনিট দাঁড়াবে। দেখুন কী করবেন।’
ফোন কেটে গেল। রুমা ফোন সাইলেন্ট করে রেখে দিল।
‘কী হল? কোথায় গেলে?’
দিব্যেন্দু চিৎকার করছে। রুমা ঘরে ঢুকল, ‘বল।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘রাতে কী রান্না আছে?’
রুমা বলল, ‘রুটি মাংস।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘মাংস কে আনল?’
রুমা বলল, ‘বাবা।’
দিব্যেন্দু খুশি হল, ‘গুড। আয়, কোলে আয়।’
রুমা দরজার দিকে তাকাল।
দিব্যেন্দু বলল, ‘কী হয়েছে? এসো সোনা। আমাদের বাড়িতে তো আমরা যা খুশি করতেই পারি।’
রুমা আরেকবার দরজার দিকে তাকিয়ে দিব্যেন্দুর কাছে গেল।
দিব্যেন্দু কানে কানে বলল, ‘ডাক্তার দেখাবি। তোর মাকে বলে দিয়েছি। বাচ্চা চাই আমার।’
রুমা ঘাড় নাড়ল।
দিব্যেন্দু হাতে চিমটি কাটল। ঘাড়ে চিমটি কাটল। রুমা কিছু বলল না। চুপ করে বসে রইল। ঘরের মধ্যে হঠাৎ রুমার মা ঢুকল। তাদের দেখামাত্র জিভ বের করে বাইরে বেরিয়ে গেল। রুমা ছিটকে গিয়ে বলল, ‘এবাবা।’
দিব্যেন্দু শক্ত করে রুমার হাত ধরে বলল, ‘আমার বাড়ি। আমি যা খুশি করব। এখানে বোস।’
রুমা মাটিতে মিশে যেতে যেতে বসল।
দিব্যেন্দু বলল, ‘মা-বাবা কাল চলে যাবে। তারপর আবার শুরু করবি তুই?’
রুমা বলল, ‘আমি কিছু করি না।’
দিব্যেন্দু রুমার পেট খামচে ধরল, ‘আবার মিথ্যে কথা?’
রুমার ব্যথা লাগছিল। দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইল। দিব্যেন্দু হঠাৎ পেট থেকে হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘যা। রুটি কর।’
রুমা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মা রান্নাঘরে ছিল। তাকে দেখে বলল, ‘কী লজ্জার ব্যাপার হয়ে গেল? আমারই দোষ। জামাই আবার কী মনে করবে?’
রুমা মা’র দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে আটার প্যাকেট বের করল।
রুমার মা বলল, ‘ডাক্তারটা কাল আমরা যাওয়ার আগে দেখিয়ে নে। দেখা যাক কী বলে?’
রুমা কিছু বলল না। চুপ করে রান্না করল। সবাইকে খেতে দিল।
রাত হল। দিব্যেন্দু ঘুমিয়ে পড়ল। বাকিরাও ঘুমিয়েছে। সে পা টিপে টিপে বাইরে বেরিয়ে দেখল একটা কালো গাড়ি সত্যি সত্যিই এসে দাঁড়িয়ে আছে।
রুমা দ্বিতীয় কোনও কথা ভাবল না। হাঁটতে হাঁটতে এক বস্ত্রে গাড়িটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা খুলে গেল।
সে গাড়িতে উঠে বসতেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
