অপারেশন ট্রেইটর – ৩৫

৩৫

ধানখেতের পাশে কারো বাড়ি হলে জানলা খোলা থাকলে ভোরবেলা যে হাওয়াটা আসে, সেটার তুল্য বোধহয় আর কিছু হতে পারে না। অমল জানলা খোলা রেখে ঘুমোতে বলেছিল। ভোরবেলা জানলার বাইরে তাকিয়ে রাণার মনে হল এই দৃশ্যটা দেখার জন্যই হয়তো সে এখনও বেঁচে আছে। সবুজ ধানের ওপরে ভোরের আলো পড়ছে। পাখির ডাক ভেসে আসছে। রাণা বেশ কিছুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে রইল।

অমল ঘুমোচ্ছে। ক্লান্তির ঘোরেই ঘুমোচ্ছে। রাণা উঠে বাইরে এল। ইমতিয়াজ দাঁতন ঘষছে দাওয়ায় বসে। তাকে দেখে বলল, ‘ঘুম হল?’

রাণা বলল, ‘হ্যাঁ।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘দিনের বেলায় বেরোবে না। ঠিক আছে?’

রাণা বলল, ‘হ্যাঁ।’

ইমতিয়াজ তার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, ‘কতদিন কাজ করছ?’

রাণা বলল, ‘বেশিদিন না। এখানেই প্রথম।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘ট্রেনিং?’

রাণা বলল, ‘কোনও ট্রেনিং হয়নি।’

ইমতিয়াজ বিস্মিত হয়ে বলল, ‘এরকম হয় নাকি?’

রাণা বলল, ‘হ্যাঁ, এরকমই হয়েছে।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘কে পাঠিয়েছে তোমায়?’

রাণা বলল, ‘জানেন না?’

ইমতিয়াজ মাথা নাড়ল।

রাণা বলল, ‘তাহলে আর জেনে কী করবেন? আপনি এখানে ক’দিন আছেন?’

ইমতিয়াজ বলল, ‘বছর দশেক। তার আগে ঢাকায় ছিলাম। এখন তো রিটায়ারমেন্ট হয়ে গেছে।’

রাণা অবাক হল, ‘মানে? আপনি ইন্ডিয়ার লোক নন?’

ইমতিয়াজ বিরক্ত হল, ‘গলা নামিয়ে কথা বলো। না আমি ইন্ডিয়ার লোক নই।’

রাণা বলল, ‘তবে?’

ইমতিয়াজ বলল, ‘সময়ে ঠিক জানবে। অত জেনে কী করবে তুমি?’

রাণা চুপ করে গেল। ইমতিয়াজ বলল, ‘ওখানে নিম ডাল আছে। দাঁতন করে নাও। অ্যাডের টুথপেস্টের থেকে অনেক ভালো।’

রাণা তাই করল। গ্রামে থাকতে এ অভ্যাস তার ছিল। দাঁতন করতে করতে বলল, ‘অমলদাকে কত দিন ধরে চেনেন?’

ইমতিয়াজ বলল, ‘অমলকে বর্ডার পার করে আমিই এনেছিলাম। এদিকে কে আসত তখন? সব তো যাচ্ছে। আউট গোয়িং। বাংলাদেশের ইম্পরট্যান্সটা দিল্লি ঠিকই বুঝত, তাও খুব বেশি বাজেট ছিল না। ধীরে ধীরে আই এস আই যত বেড়েছে, ওদিকেও টনক নড়েছে।’

রাণা বলল, ‘প্রথম দিকের তাহলে?’

ইমতিয়াজ বলল, ‘বললাম তো, সব একবারে বলব না। এত কথা হওয়াও ঠিক হল না। ভোরের দিকে মুড ভালো থাকে। তোমার কি মনে হয়, এই জায়গায় আমার থাকতে ভালো লাগে? না আছে কোনও উত্তেজনা, না আছে কিছু। এর থেকে পাকিস্তানে থাকা ভালো। কত রকম রিস্ক থাকে। এই আছি, এই নেই। মনে হয় ম্যাজিক চলছে।’

ইমতিয়াজ টেনে টেনে হাসল। কল থেকে জল নিয়ে মুখ ধুয়ে তার সামনে এসে বসল, ‘একটা রুল সব সময় আছে মনে রাখবে। আই এস আইকে কোনদিন হালকাভাবে নিতে নেই। ওদের দেশের লোক না খেয়ে মরলেও ওরা ওদের মতো করে স্ট্র্যাটেজি বানিয়েই যাবে।’

রাণা বলল, ‘আমি অত কিছু বুঝি না। বোঝার দরকার নেই।’

ইমতিয়াজ অবাক হয়ে বলল, ‘তাহলে তুমি এখানে কী করছ?’

রাণা স্থির চোখে কয়েক সেকেন্ড ইমতিয়াজের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাংলাদেশ ঘুরতে এসেছি। ঘুরে চলে যাব।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘মজা করো? আমার সঙ্গে মজা করো? আমি কত সিনিয়ার জানো? তোমার ইয়ারবন্ধু ভেবেছ নাকি?’

রাণা কলের জলে মুখ ধুতে শুরু করল। ইমতিয়াজ বলল, ‘কমবয়সি ছেলেদের এই হল সমস্যা। সিনিয়রদের সম্মান করতে জানে না।’

রাণা মুখ ধুয়ে বলল, ‘আমি আপনাকে রাগানোর জন্য কিছু বলিনি। আমার ব্যাপারটা এরকমই। অত ভেবে কিছু করি না। যেটা মনে হয় করি। আমার মনে হয় না পাকিস্তানকে নিয়ে এত চিন্তা করার কিছু আছে বলে। কী করবে আই এস আই? কোনও ক্ষমতা নেই। অকারণ হাওয়া দিয়ে ফোলানো হচ্ছে এই ব্যাপারগুলোকে।’

ইমতিয়াজ ফিক ফিক করে হাসতে শুরু করল, ‘ভালো লোক পাঠিয়েছে তো! কোত্থেকে তুলল তোমাকে?’

রাণাও হেসে ফেলল ইমতিয়াজের কথা শুনে, ‘ওই, তুলে পাঠিয়ে দিয়েছে আর কী!’

ইমতিয়াজ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল, ‘ঠিক আছে। তুমি ঘরে চলে যাও। বেরিও না আর। এলাকার লোক যেন তোমাদের বাইরে না দেখে।’

.

৩৬

রাত দশটা।

সোবাহান সাহেব এসেছেন। নির্মলের বেঁধে দেওয়া হাত খুলে দিচ্ছে নুরুল।

মেয়েগুলো কেমন কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে।

একটু দূরে জরিনা দাঁড়িয়ে নির্মলকে দেখছে।

বাড়িটা থেকে বেরিয়ে গলিতে এসে সোবাহান চারদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নির্মল।’

নির্মল বলল, ‘জি স্যার।’

সোবাহান বললেন, ‘তুমি এখানে কী করছিলে?’

ঠোঁটের পাশটা নোনতা লাগছে। রক্তটা দেখা যাচ্ছে কি? নির্মলের অস্বস্তি হচ্ছিল। এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে? সাদিক সোবাহানকে ডেকে তাকে নিয়ে যেতে বলেছে। তাও সশরীরে আসেনি, ফোন করেছে। সোবাহান তাতে এরকম কুকুরের মতো চলে এসেছে। সোবাহানের প্রশ্নের উত্তরে নির্মল বলল, ‘একটা ঠিকানা খুঁজতে এসেছিলাম।’

সোবাহান বললেন, ‘ঠিকানা? কীসের ঠিকানা?’

নির্মল বলল, ‘আমার এক বন্ধু থাকে এদিকেই। সাদিক আলম নাম।’

সোবাহান বাকিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এগিয়ে যাও সবাই।’

সোবাহানের সঙ্গে যারা এসেছিল তারা গলির মুখের দিকে হাঁটতে শুরু করল। সাদিকের ঘরটার বাইরে যে ছেলেগুলো দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে সোবাহান বললেন, ‘আমাকে তোমার কী মনে হয় নির্মল?’

নির্মল বলল, ‘কিছু না স্যার। আমি পার্সোনাল কাজে এসেছিলাম, বললাম তো।’

সোবাহান বললেন, ‘পেছনে লাথ মেরে ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে দেব তোকে। ইন্ডিয়ার দালাল। তোর লজ্জা লাগে না? এদেশের খাস আর ইন্ডিয়ার হয়ে কাজ করিস?’

নির্মলের কান মাথা ঝাঁ-ঝাঁ করছিল। সোবাহান যে এই কথাটা বলবে, সে ভাবতে পারেনি। সে বলল, ‘এগুলো কী বলছেন আপনি?’

সোবাহান বললেন, ‘ঠিক বলছি। তুই র-এর হয়ে কাজ করিস, তাই না? আনোয়ার তাই করত, তুই তো ওর সঙ্গেই ছিলিস। ওর চামচা। ও যেভাবে বলত, তুই সেভাবে কাজ করতিস। এখন দেখছিস আমি এসেছি, তোর পাখনাগুলো কাটতে শুরু করেছি, তাতে তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে, তাই না?’

নির্মল কাতর গলায় বলল, ‘একবারে বাজে কথা স্যার। আমি আনোয়ার স্যারকে চিনতাম। উনি দেশের বাইরে কোনদিন কিছু ভাবেননি। আমিও ভাবিনি। ইন্ডিয়ার হয়ে কাজ করতে যাবই বা কেন? এদেশে আমার সাতপুরুষ থাকে, আমি জন্মেছি এদেশে, আমাকে অন্য কোনও দেশের হয়ে কাজ করতে হবেই বা কেন? আমি ইনভেস্টিগেশনে এসেছিলাম স্যার, সাদিকের এখানে কতগুলো মেয়ে থাকে, সেগুলো দেখতে এসেছিলাম।’

সোবাহান আঙুল দিয়ে নিজের ঠোঁটে দিলেন, ‘একদম চুপ থাক। একদম চুপ। তোর ভাগ্য ভালো যে তোকে জেলে না নিয়ে গিয়ে বাইরে নিয়ে বোঝাচ্ছি। যা বলছি, মন দিয়ে শুনে রাখ। বাসায় যাবি, খাবি দাবি, ঘুমাইয়া পড়বি। কাল থেকে তুই একটা অন্য মানুষ। তোকে যেন কেউ সাদিক বা ওর লোকজনের ধারে কাছে দেখতে না পায়। সাদিক এ দেশের সম্পদ। ও কী করবে, না করবে, সব আমি বুঝব। আমি দেখব। তোকে দেখতে হবে না, ক্লিয়ার?’

নির্মল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সোবাহান এবার গলা তুলল, ‘ক্লিয়ার কি না?’

নির্মল বলল, ‘ক্লিয়ার স্যার।’

সোবাহান বললেন, ‘ওয়েল অ্যান্ড গুড। চল এবার।’

সোবাহান হাঁটতে শুরু করলেন। নির্মল একবার ঘাড় ঘুরিয়ে বাড়িটার দিকে তাকাল। জানলা দিয়ে জরিনার মুখটা দেখা যাচ্ছে। পর্দা তুলে দেখছে তাদের। কয়েক সেকেন্ড থেমে রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করল সে। গাড়িতে উঠে সোবাহান তাকে তার পাশে বসালেন। ড্রাইভারকে বললেন, ‘নির্মল স্যারকে ওর বাসায় নামিয়ে দাও আগে।’

ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করল। নির্মল চোখ বন্ধ করল। জরিনা ফিসফিস করে তাকে তখন বলল, ‘সাকিনা আপুরে কে জানি তুইলা নিয়া গেছে। আপনি জানেন সে কোথায় আছে?’ মোখলেস যে মেয়েটার কথা বলছিল, মেয়েটার নাম তবে সাকিনা?

বাইরে থেকে ছেলেগুলো ছুটে এল তখন। চিৎকার করে জরিনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যা, ঘরের ভিতর যা। বাইরে যেন না দেখি।’

জরিনা ভীত চোখে তার দিকে তাকিয়ে চলে গেল। নির্মলকে একটা ছেলে এসে চড় মেরেছিল। নির্মল ছেলেটার মুখ মনে করার চেষ্টা করতে লাগল। মনের ভিতর রিক্যাপ দরকার। খুব জরুরি রিক্যাপগুলো। মাথার ভেতর সোবাহানের ‘ইন্ডিয়ার দালাল’ শব্দগুলো ভাসছে। সেটা যেন মনে প্রভাব না ফেলে। মনের রিক্যাপটা ওর মতো করে হোক। দাঁতে দাঁত চিপল সে। সোবাহানের অপমানটা সে কোনদিন ভুলবে না।

.

৩৭

মাটিতে পড়ে আছে রুমা। মাথার ভেতরে কেমন একটা আচ্ছন্ন ভাব। গায়ে হাতে পায়ে অসহ্য ব্যথা করছে।

দরজা খুলে গেল।

‘একী? এরকম অবস্থা করসে তোমার?’

সাদিকের গলা। কোনওমতে চোখ খুলল রুমা। চোখ ভারি হয়ে ফুলে গেছে। গিয়াস চোখে ঘুষি মেরেছিল।

সাদিক তার কাছে এসে বসল। গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করল।

রুমা কথা বলতে পারছে না।

এই লোকটা তার সঙ্গে কত রাত কাটিয়েছে। কত আদর করেছে। তাকে কি উদ্ধার করবে?

কথাটা ভাবতে ভাবতেই মাথায় তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করল সে। সাদিক তার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরেছে, সাপের মতো গলায় হিসহিস করে বলল, ‘কে তুই? তুই তো সাকিনা না। তোর দেওয়া ঠিকানায় তোর ছবি দেখে কেউ চিনতে পারেনি। সত্যি করে বল তুই কে।’

এইভাবে দুঃস্বপ্ন সত্যি হয়ে যাবে সে ভেবেছিল, এত তাড়াতাড়ি সত্যি হবে ভাবেনি। বলল, ‘কোনও ভুল হইতাসে আপনাগো, আমি সাকিনা। আমার গ্রামের লোক চিনবে না ক্যান আমারে?’

গিয়াসের গলা পাওয়া গেল, ‘চিনবে না, কারণ তুই ইন্ডিয়ান, আমি শুরুতেই বুঝেছিলাম। এবার তুই বলবি তোকে কে পাঠিয়েছে। নইলে তোর কী হতে পারে তুই জানিস না। তুই চাইবি তোর মৃত্যু হোক, কিন্তু হবে না। বুঝতে পারছিস?’

রুমা বিহ্বল গলায় কেঁদে উঠল, ‘আমারে এরকম কইরেন না, আমি একটা দুঃখী মেয়ে, এরকম কইরেন না। ও সাদিক সাহেব, আপনি আমারে এরকম করতাসেন?’

সাদিক হাতের মুঠি আলগা করল, রুমার চুল ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘ধরে নিলাম তুই ইন্ডিয়ান না, তাহলে মিজানরে ফিট করসিলি কী কইরা?’

রুমা বলল, ‘মিজানভাইরে জিগান।’

সাদিক বলল, ‘তুই জানিস না মিজান মার্ডার হইসে?’

রুমা আকাশ থেকে পড়ার ভান করল, ‘আল্লাহর কসম খাই, জানি না। আমি তো ঘর ছাইড়া কোথাও যাই নাই। মিজান ভাইয়ের খবর আমি কেমনে পামু?’

সাদিক বলল, ‘সন্দেহটা ওই জন্যই তো হচ্ছে। মিজান একা মরেনি, যাদের যাদের তোর সঙ্গে যোগ থাকার কথা, সবাই মরসে। তোর গ্রামের লোক তোর ছবি দেখে চিনতে পারে নাই। আমারে কী ভাবোস, গাধা?’

রুমা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘হায় আল্লাগো, আপনাগো কেমনে বিশ্বাস করাই, গেরামে আমি বোরখা পইরা থাকতাম, আমারে কে কী কইরা চিনবে? আমি কঠিন পর্দা করতাম, আমারে ওরা দেখবে কেমনে?’

গিয়াস বলল, ‘শি ইজ লাইং সাদিক। সি ইজ ভেরি স্টেডি। আমার কথা শোন, ওকে আমি দেশে নিয়ে যাই। তারপর দেখছি ওকে কী করা যায়।’

সাদিক দ্বিধাগ্রস্থ গলায় বলল, ‘আমাকে একটু দেখতে দেন। তারপর নিয়া যাইবেন।’

গিয়াস রাগী গলায় বলল, ‘কী দেখবে?’

সাদিক বলল, ‘ওর কথা মিথ্যা নাও হইতে পারে। আমাদের গ্রামগুলোতে অনেক মাইয়াই কঠিন পর্দা করে। তাগো চিনতে পারে না অনেকেই।’

গিয়াস বলল, ‘হতে পারে না। এত ধার্মিক তোমরা নও।’

সাদিক গলা নরম করে বলল, ‘জনাব। এই মাগীরে আমারে দিয়া দেন। যদি দেখা যায় মাগী মিথ্যা কয়, আমি নিজের হাতে ওরে শেষ করুম। কিন্তু জনাব, যদি মাগী দোষী না হয়, তাহলে অকারণ ওরে শাস্তি দেওন হইবে না?’

গিয়াস বলল, ‘তোমার মেয়ের অভাব? কোথাকার মেয়ে লাগবে তোমার? তুমি আমার সঙ্গে পাকিস্তানে চলো, কত মেয়ে লাগবে তোমার আমি দেখব।’

সাদিক বলল, ‘জনাব, আমি তো কইতাসি আপনেরে, আমার হাতে ছেড়ে দেন, আমি বুইঝা নিমু। আপনি চিন্তা কইরেন না।’

গিয়াস বলল, ‘আমি চিন্তা করব নাকি সেটা আমার ব্যাপার। আমার কাজ আমাকে করতে দাও। তুমি চলে যাও। আমি দেখছি ওকে।’

সাদিক অনুনয় বিনয় করতে লাগল, ‘জনাব। ছাইড়া দেন জনাব। আমার মনে হয় না সাকিনা মিথ্যা কইতাসে।’

গিয়াস গম্ভীর গলায় বলল, ‘তোমার সঙ্গে এই বিষয়ে আমি আর কোনও কথা বলব না। জাস্ট গেট লস্ট ইউ ফুল।’

সাদিক শ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। রুমার দিকে একবার তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল…।

.

৩৮

নতুন দিল্লি। রাত দুটো। তুষার ঘুমোচ্ছিলেন।

ফোনটা বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠে ফোন রিসিভ করলেন। ওপাশ থেকে ভেসে আসল, ‘বেকারার করকে হামে…রিমেকের বাজার হিট হয়ে গেছে নাকি?’

তুষার হাসলেন, ‘রিমেকেরই তো বাজার। সব পুরোনো জিনিস নতুন মোড়কে চলে এসেছে।’

‘বলছি কী, বলিউডের চাহিদা তো সব দিকেই আছে, তবে শুনছিলাম, ইস্টার্ন সাইডে নাকি বলিউডের কোনও সিঙ্গার প্রোগ্রাম করতে গিয়ে চোক করে গেছেন।’

তুষার সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসলেন, ‘ইস্ট?’

‘হ্যাঁ।’

‘ওটা আমাদের স্টুডিওর জুরিসডিকশনে নেই এখন।’

‘শুনেছি। স্টুডিও ভেঙে গেছে। হিট গান এখন আর স্টুডিওতে রেকর্ড হচ্ছে না। সমস্যা হল, এর ফলে প্রতিযোগী স্টুডিওর গান হিট হয়ে যাবে। সিঙ্গার এখন তাদের কাছে আছে।’

‘স্টুডিওর ঠিকানা?’

‘আপাতত ইস্টার্ন রিজিয়নেই। কিন্তু ওয়েস্টার্ন সাইডে গেলে সিঙ্গার উইল বি ইন বিগ ট্রাবল। প্রোডিউসারদের খুব তাড়াতাড়ি যা করার করতে হবে। গুড নাইট।’

ফোন কেটে গেল। তুষার তৎক্ষণাৎ খানের নম্বরে ফোন করলেন। তিনবার রিং হবার পর আশরফ খান ফোন ধরলেন, ‘হ্যাঁ স্যার।’

তুষার বললেন, ‘বড়াল কল্ড। বাংলাদেশে আমাদের কেউ আই এস আইয়ের হাতে আছে। এখনও বাংলাদেশেই আছে, তাকে পাকিস্তান নিয়ে যেতে পারলে সমস্যা ভয়াবহ হয়ে যাবে।’

খান বললেন, ‘কিন্তু স্যার, আমরা কী করব এখানে? বাংলাদেশের কোনও আপডেটও তো নেই।’

তুষার বললেন, ‘সব জানি। কিন্তু এসব জানার পরে হাতে হাত রেখে বসতে পারছি না। আমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি মিনিস্ট্রিতে কন্ট্যাক্ট করছি। তুমি তৈরি হও।’

খান হাসলেন, ‘আগে আপনি কথা বলুন স্যার। কলকাতার মতো লজ্জার ব্যাপার হলে ভালো লাগবে না। বাংলদেশে কোড সেভেন অ্যাক্টিভেট করা আছে। আমরা কাজ করতে গেলেই ঝামেলা হবে।’

তুষার বললেন, ‘আমি বুঝে নেব, বললাম তো। শেখাওয়াত লাস্ট কবে কন্ট্যাক্ট করেছিল?’

খান বললেন, ‘দু’মাস হয়ে গেল। পুওর কমিউনিকেশনটা একটা প্রবলেম তো বটেই। ওর মতো হুইমজিকাল একটা লোক কী করে ইস্টার্ন রিজিওন সামলাচ্ছে আমি সত্যি জানি না স্যার।’

তুষার বললেন, ‘হিস্ট্রি ঘেঁটে লাভ নেই। তুমি কি মাথুরকে নেবে?’

খান বললেন, ‘আপনি যা বলবেন। মাথুর অরুণাচল থেকে আজকেই ফিরেছে। ওর যাওয়াটা কি ঠিক হবে?’

তুষার বললেন, ‘কথা বলো। যেতে চাইলে নিয়ে যাও। অবশ্য যেতে চাইবে না, তা নয়। শেখাওয়াত কাকে ঢাকা পাঠিয়েছিল, তাও জানি না। সায়ক জেনে গেল, অথচ আমরা জানতে পারলাম না।’

খান বললেন, ‘আপনি কী করবেন স্যার, আপনি এই ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করলে নিশ্চয়ই জানতেন। আপনি কথা বলে নিন। তারপর মাথুরকে ফোন করে নেব।’

তুষার ফোন কাটলেন। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে জানলার বাইরে তাকালেন। সবাই ঘুমোচ্ছে। কেউ জানেও না দেশের এক সন্তান এই মুহূর্তে আই এস আইয়ের হাতে বন্দী। তুষার চোখ বন্ধ করলেন। যারা জানে না, তারা ভাবতেও পারবে না আই এস আই কী ভয়ানক অত্যাচার করে। ছেলে হলে একরকম, মেয়ে হলে আরেকরকম। কিছুদিন আগে মুজফফরাবাদে এক এজেন্টের শরীর থেকে একটু একটু করে চামড়া আলাদা করে দিয়েছিল। সারা শরীর ক্ষত আর ঘায়ে ভর্তি হয়ে উঠেছিল সে এজেন্টের, সে শরীরের উপর দিয়ে নুন লঙ্কার মিশ্রণ প্রয়োগ করে অত্যন্ত শীতে বরফের উপরে তাকে ফেলে দিয়ে গেছিল। ভারতীয় সেনা যখন সে শরীর উদ্ধার করে, মানসিকভাবে অত শক্তিশালী সেনারাও ও দৃশ্য নিতে পারেনি।

বাংলাদেশে ঠিক কী অবস্থা তৈরি হয়ে আছে এখন? তুষার শেখাওয়াতকে ফোন করার চেষ্টা করলেন। লাভ হল না। শেখাওয়াত ফোন ধরলেন না। তুষার সরাসরি প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে হটলাইনে ফোন করলেন। মন্ত্রীকে ফোনে পেতে মিনিট পাঁচেক লাগল। ঘুমঘোরে বললেন, ‘বলুন।’

তুষার বললেন, ‘স্যার, আই এস আইয়ের হাতে আমাদের এক এজেন্ট বন্দী হয়েছে বাংলাদেশে। এই মুহূর্তে আমরা অন্য কোনও অর্গানাইজেশনের হাতে বাংলাদেশ ছাড়তে পারব না। আমি বাংলাদেশের পরিস্থিতির কন্ট্রোল হাতে নিয়ে নিতে চাই। শেখাওয়াতকে কন্ট্যাক্ট করতে পারিনি। আমার কাছে আর কোনও অপশন নেই। কোড সেভেন ব্রেক করার অর্ডার দিন স্যার।’

মন্ত্রী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, ‘আর ইউ সিওর?’

তুষার বললেন, ‘আপনার কাছে এখনও অবধি বাংলাদেশ রিলেটেড এরকম কোনও ইন্টেল এসেছে? আপনি জানেন ওখানে আমাদের এজেন্ট ধরা পড়েছে?’

মন্ত্রী বললেন, ‘না।’

তুষার বললেন, ‘আমি ঝুঁকি নিতে চাইছি না। আমার কন্ট্রোল চাই।’

মন্ত্রী বললেন, ‘গিভ মি ফাইভ মিনিটস।’

তুষার বললেন, ‘ওকে স্যার।’

ফোন কেটে গেল। মিনিট পাঁচেক পরে মন্ত্রীই ফোন করলেন, ‘শেখাওয়াত ফোন ধরছে না তুষার। আমাকে কোন খবরও দেয়নি।’

তুষার বললেন, ‘স্যার প্লিজ, আপনি আমাদের এগোতে বলুন। আর দেরি করা যাবে না।’

মন্ত্রী বললেন, ‘ওকে। গো অ্যাহেড।’

তুষার বললেন, ‘থ্যাংক ইউ স্যার। আর প্লিজ, এর পর শেখাওয়াত যে ঝামেলা করুক…।’

মন্ত্রী বললেন, ‘আমি বুঝে নেব। ইউ গো অ্যাহেড।’

তুষার খুশি হলেন, ‘ওকে স্যার।’

.

৩৯

সকাল ন’টা বাজে।

পরোটা আর আলুভাজা করে দিয়েছে ইমতিয়াজ।

অমল ওঠেনি। রাণা টিভি দেখছিল। ইমতিয়াজ রাণার সামনে বসে বলল, ‘আমি কিছুতেই সাকিনাকে ফোনে পাচ্ছি না। কী হতে পারে?’

রাণা বলল, ‘ওর সাথে আমার তেমন যোগাযোগ হয়নি। অমল বলতে পারবে হয়তো।’

ইমতিয়াজ চিন্তিত গলায় বলল, ‘সমস্যার ব্যাপার হল। অমল উঠবে না? ওকে তুলি?’

রাণা বলল, ‘না তোলাই ভালো মনে হচ্ছে। পরিশ্রম হয়েছে।’

ইমতিয়াজ কাঁধ ঝাঁকাল, ‘ঠিক আছে। যা ভালো বোঝো। তুমি খেয়ে নাও।’

রাণা বলল, ‘ঠিক আছে।’

একটা ফোন বাজার শব্দ হল। ইমতিয়াজ সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল, ‘ওরে বাবা, এই ফোনটা বাজে কেন আবার?’

ব্যস্ত হয়ে ইমতিয়াজ ঘরের ভেতর চলে গেল। রাণা দেখল ইমতিয়াজ বেশ নিচু স্বরে কথা বলছে। এমনিতে ইমতিয়াজের গলার স্বর অনেকটা চড়া। সে লোক গলা নামিয়ে কথা বলছে মানে চিন্তার ব্যাপার।

মিনিট পাঁচেক পরে ইমতিয়াজ ফোন রেখে এসে অমলকে ঠেলে তুলে দিল, ‘ওঠো ওঠো।’

অমল ঘুমচোখে উঠে বসে বলল, ‘কী হয়েছে?’

ইমতিয়াজ বলল, ‘হাই অ্যালার্ট ফোন এসেছে দিল্লি থেকে। আমাদের কোনও এজেন্ট নাকি আই এস আইয়ের হাতে আটকে পড়েছে। এদিকে আমি সাকিনাকেও ফোনে পাচ্ছি না। দিল্লি থেকে একটা টিম এসে যাবে আজ। কী করব?’

অমল বলল, ‘সাকিনাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না?’

ইমতিয়াজ ঘাড় নাড়ল, ‘না।’

অমল রাণার দিকে চাইল, ‘আমাদের ঢাকা যেতেই হবে। সাকিনাকে তুলে নিয়ে গেলে সমস্যা আছে।’

ইমতিয়াজ রেগে গেল, ‘মাথা খারাপ হয়েছে? এখন ঢাকা যাবে?’

অমল বলল, ‘এছাড়া কী করব? আচ্ছা, আমি সাকিনার কাছে লোক পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। গিয়ে দেখে আসুক। তারপর দেখছি কী করা যায়।’

অমল পকেট থেকে ফোন বের করে নাম্বার ডায়াল করল। মিনিটখানেক কথা বলে ফোন রেখে বলল, ‘সাকিনাকেই তুলেছে যা মনে হচ্ছে। বাজারের ওখানে সাকিনার সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করার জন্য আমাদের একজনকে বসানো ছিল। তার বডি পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সাকিনাও মিসিং। দুইয়ে দুইয়ে চার হতেই হবে।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘কার কার নাম জানে সাকিনা?’

অমল ইমতিয়াজের দিকে তাকিয়ে দেখল, ‘অলমোস্ট অল। ঢাকার গোটা অপারেশন ওর উপর টিকে আছে।’

ইমতিয়াজ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘আমার নাম?’

অমল ঘাড় নাড়ল, ‘জানে।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘বলে দেবে কি?’

অমল বলল, ‘না বলার চান্স আছে। কিন্তু আমি তো ওই চান্সের দিকে যেতে চাইছি না। ওর লাইফ রিস্ক হয়ে গেছে। আই এস আইয়ের গিয়াসের আসার কথা আছে। গিয়াসের সামনে সাকিনা পড়লে চাপ আছে।’

ইমতিয়াজ ভীত গলায় বলল, ‘করাচীর গিয়াস? হাতে মাথা কাটে যে? কোয়েটাতে বালোচ লিবারেশনের চারজনকে নিজের হাতে মেরেছিল ছেলেটা। ওর হাতে সাকিনা পড়া মানে…’

অমল বলল, ‘হ্যাঁ। ধরে নিলাম সাকিনা গিয়াসের হাতে পড়েই গেছে। গিয়াসের কাছে থাকা মানে সমস্যা তৈরি হয়ে গেছে এর মধ্যেই। ওকে বের করতেই হবে। দিল্লি থেকে কে আসছে? উস্তাদ আসবে?’

ইমতিয়াজ বলল, ‘উস্তাদের সাথে কন্ট্যাক্ট করতে পারছি না। কথা শুনে বুঝলাম খান আর মাথুর আসবেন। ওরা এখানকার সব রিপোর্ট নিতে চাইছেন।’

অমল বলল, ‘কে রিপোর্ট দেবে? আমি? আমি এখান থেকে কী রিপোর্ট দেব? আমার ঢাকায় যাবার ব্যবস্থা করতে হবে।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘সাকিনাকে নিয়ে যাবার প্ল্যান করছে। সেটার কথাও ভাবতে হবে।’

অমল বলল, ‘নেপাল হয়ে নিয়ে যাবার প্ল্যান করবে। সব দিকে রেড অ্যালার্ট জারি করে দিতে হবে। দিল্লি সে কাজ করবে জানি, তাও তুমি একবার দিল্লিকে জানিয়ে দাও সে কথা। সমস্যা হল উস্তাদ ছাড়া সাকিনার এই অপারেশনের কথা দিল্লির কেউ জানে না। সাকিনা পুরোপুরি উস্তাদের আবিষ্কার। সাকিনার ব্রিফ দিতে হবে যে টিম আসবে তাকে। আমি এখান থেকে সেটা কী করে দেব?’

ইমতিয়াজ বলল, ‘আমি গাড়ির ব্যবস্থা করছি। দুপুরের মধ্যে ঢাকা রওনা দেব।’

অমল ঘাড় নাড়ল, ‘বেটার। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।’

অমল উঠে বাথরুমের দিকে রওনা দিল। ইমতিয়াজ রাণার দিকে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে বলল, ‘আমার বরাবরের আতঙ্ক এটাই। কভার উড়ে যাওয়া। সাকিনা এখন আমাদের থ্রেট’!

রাণা উত্তর দিল না। কে যে কার থ্রেট! এসব কাজে মানুষের উপর থেকে বিশ্বাসই উঠে যেতে বসেছে…

.