দিন প্রতিদিন – ৫

দুজনে বাড়ি ফেরার পর দিব্যেন্দু দরজা বন্ধ করে বেডরুমে গিয়ে রুমাকে ডাকল, ‘এদিকে এসো।’

বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা হয়েছে। গরমের তেজটা নেই, ঘামটাও চলে গেছে।

রুমা দিব্যেন্দুর সামনে এসে দাঁড়াল।

দিব্যেন্দু বলল, ‘গোয়া যাবে?’

রুমা বলল, ‘তুমি গেলে যাব।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘কী বলছিল ওই মুটকিটা? বলভদ্রর বউকে কী বলেছ?’

রুমা বলল, ‘বলিনি কিছু।’

দিব্যেন্দু রুমার ডান হাতটা ধরল। নিজের হাতের মধ্যে হাতটা নিয়ে খেলতে খেলতে বলল, ‘গোয়া ভালো জায়গা। তোমাকে বিকিনি কিনে দেব। বিকিনি কিনে বিচে বসবে। সব লোক তোমার শরীর দেখবে। ভালো লাগবে, তাই না?’

রুমা বলল, ‘তুমি না গেলে আমি যাব না।’

দিব্যেন্দু রুমার হাত মুচড়ে দিল, ‘যাবে না কেন? যাবে। ভালো লাগবে। রাতে বুড়োটাকে তোমার ঘরে পাঠিয়ে দেব। আরও ভালো লাগবে।’

রুমা যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করল। কিন্তু কোনও শব্দ বেরোল না তার মুখ দিয়ে।

দিব্যেন্দু রুমার হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘তোমার বাবা-মা আসবে কাল। ঘর-দোর পরিষ্কার রাখবে।’

রুমা কিছু বলল না।

দিব্যেন্দু জানলার পর্দা সরিয়ে বৃষ্টি দেখতে শুরু করল। ভালো লাগে বৃষ্টি দেখতে। মফস্‌সলে গাছপালা বেশি। অফিসে থাকলে বৃষ্টি দেখাও যায় না।

রুমা ঠাকুর ঘরে গেল। ফোনটা বের করে আবার নাম্বারটা ডায়াল করল। প্রত্যুষের ফোন যে সুইচড অফ, তিনটে ভাষায় শুনিয়ে দিল।

পায়ে যন্ত্রণা ছিল। দিব্যেন্দু হাত মুচড়ে দেওয়ার পর পায়ের যন্ত্রণাটা কম লাগছে। হাতের ব্যথাটা অনেক বেশি মনে হচ্ছে। পলা বলেছিল কাপড়ের উপর দিয়ে মারলে কম লাগে। হাত মুচড়ালে কাপড় দিয়ে কী হবে?

একটা ভিডিও দেখেছিল আফগানিস্তানের। বোরখার উপর দিয়ে মারছে। বোরখা পরে ছিল বলে কি মারটা কম লেগেছে? তা তো হবে না। ঠিকই লেগেছে। ভিডিওটা দিব্যেন্দুই পাঠিয়েছিল। পাঠিয়ে লিখেছিল ‘দেখো তুমি কত ভালো আছ। এসব জায়গায় মেয়েদের অনেক বেশি মারা হয়।’

একটা মেয়েকে পশ্চিমী পোশাক পরেছিল বলে গুলি করে মারা হয়েছিল। এগুলো পরা ঠিক না। দিব্যেন্দু বলেছিল অনেক ভালো রাখা হয় তাকে।

‘শোন।’

দিব্যেন্দু ডাকছে আবার।

তাড়াতাড়ি উঠল রুমা। বেশি দেরি করলে সমস্যা বাড়বে।

দিব্যেন্দু শুয়ে আছে।

সে ঘরে ঢুকতে বলল, ‘আমার চাকরিটা চলে যেতে পারে। সেরকম হলে তোমাকে রোজগার করতে হবে। কী পারবে? লোকের সঙ্গে শুতে পারবে? তাহলে তো দারুণ ব্যাপার হবে। আনন্দে আনন্দে টাকা আসবে।’

রুমা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এই কথাটার মানে কী? তাকে পরীক্ষা করছে?

সে বলল, ‘চাকরি চলে যাবে কেন?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আছে অনেক ব্যাপার। কোম্পানির অবস্থা ভালো না। লোক ছাটাই চলছে। বিরাট কেচ্ছা।’

রুমা কিছু বলল না।

দিব্যেন্দু বলল, ‘সারাদিন ঘরে থাকব তখন। ভালো হবে। তাই না?’

রুমা মাথা নেড়ে ‘হু’ বলল।

দিব্যেন্দু সন্দিগ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘হু? মানে খুশি হওনি তাই না? খুশি হওনি?’

রুমা বলল, ‘হয়েছি।’

দিব্যেন্দু খাট থেকে নেমে রুমার থুতনি ধরে বলল, ‘তাহলে হাসছ না কেন? হাসো। হাসো। হাসো বলছি।’

রুমা হাসার চেষ্টা করল।

দিব্যেন্দু বলল, ‘খুশি তো কম হবেই। আমি গেলেই তো সে ছেলেটা আসে।’

রুমা বলল, ‘আসে না। তুমি তো সিসিটিভি লাগিয়েছ। দেখতে পাও না?’

দিব্যেন্দু লাল চোখে বলল, ‘ঠিক দেখতে পাই। আমার চোখে ফাঁকি দিয়ে অভিসারে যাওয়া তো? একদিন ঠিক ধরা পড়বে। তারপর পুঁতে রাখব। এই ঘরের মধ্যেই পুঁতে রাখব।’

রুমা আবার চুপ করে গেল।

দিব্যেন্দু রুমাকে ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘বাপকে জিগ্যেস কর কী খাবে, মাছ না মাংস।’

রুমা বলল, ‘রাতে করব।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘করে রাখ। আমাকে কিনতে যেতে হবে তো।’

রুমার বলল, ‘করছি।’

দিব্যেন্দু খাটে এসে শুল। কাল অফিসের ছাঁটাইয়ের লিস্ট বেরোনোর কথা। তার নাম থাকার সম্ভাবনা আছে।

সে ঠ্যাঙের উপর ঠ্যাং রেখে পা দোলাতে শুরু করল।

‘ক’টাকা ভাই?’

সিম লাগছে নতুন ফোনে। বাপ্পার দোকান। বাপ্পার মেজাজ সবসময় তিরিক্ষি হয়ে থাকে।

পূর্ণ যে প্রশ্নটা জিগ্যেস করল, বাপ্পা কোনও উত্তরই দিল না। মন দিয়ে সিম লাগিয়ে স্ক্রিন মুছতে শুরু করে দিল।

পূর্ণ বলল, ‘কী রে বাপ্পা? টাকা নিবি না?’

বাপ্পা হাই তুলল, ‘সাত হাজার পাঁচশো। কিছুক্ষণ পর সিম চালু হবে। তখন ফোন করতে পারবে।’

পূর্ণ পকেট থেকে টাকা বের করে শো কেসের উপর নামিয়ে রেখে বলল, ‘গুনে নে।’

বাপ্পা টাকা গুনছে। থুতু দিয়ে দিয়ে টাকা গুনছে। একবার গুনল।

এবার উল্টো করে গুনছে। পূর্ণ বলল, ‘কতবার গুনবি রে?’

‘ঠিক আছে ঠিক আছে। যাও এবার।’

পূর্ণ বলল, ‘দেখাবি না, কী করে ফোন চালায়? আমি কি অত জানি?’

বাপ্পা বলল, ‘ফোন ধরতে আর কাটতে জানো তো, তাহলেই হবে। এখন কেটে পড় তো। অনেক কাজ আছে আমার।’

পূর্ণ বলল, ‘পানু লোড করলি ভাই?’

বাপ্পা বলল, ‘পুলিশ ধরতে পারলে তোমায় হুড়কো দিয়ে দেবে। পানু ফানু নিষেধ এখন।’

পূর্ণ অবাক হল, ‘বলিস কী? পানু দেখলে বুঝে যাবে?’

বাপ্পা বলল, ‘হ্যাঁ। ফোন থেকে হাত বেরিয়ে কান ধরে থানায় নিয়ে যাবে।’

পূর্ণ একগাল হেসে বলল, ‘যাহ্‌। ইয়ার্কি মারিস না।’

বাপ্পা বলল, ‘ওই দেখো। ইয়ার্কি মারব কেন? সত্যি কথা।’

পূর্ণ বলল, ‘এই ফোন থেকে হাত বেরিয়ে আসবে? কোথায়, হাত কোথায় আছে?’

বাপ্পা বলল, ‘ও ঠিক আছে। তুমি এখন বুঝবে না, পানু দেখলেই বেরিয়ে আসবে। এটাই এখন স্লোগান। না পানু দেখুঙ্গা, না দেখনে দুঙ্গা।’

পূর্ণ মাথা চুলকিয়ে দোকান থেকে বেরোল। হাতে ব্যাগ। নতুন ঝাঁ চকচকে ফোন।

ফোন কেনার টাকা দিয়েছে বাপিদা। বাপিদার বাড়ি দেখভাল করতে হবে। বাপিদা জার্মানিতে থাকে। এর আগের কেয়ারটেকার পালানোর পরে পূর্ণকে রাখা হয়েছে। পূর্ণর একটাই কাজ। সারাদিন বাপিদার বাড়িতে থাকা। এই ফোনে ভিডিও কল করে বাপিদা আপডেট নেবে বলেছে। যখন ফোন করবে তখনই ধরতে হবে। নইলে চাকরি নট। আগের কেয়ারটেকার ছেলেটা একটা জিনিস ছিল। মাঝে মাঝেই রাতে বাড়িতে বাইরের ছেলেপিলে নিয়ে এসে মধুচক্রের আসর বসাত। পুলিশ রেইড হবার দিন ছেলেটা পালাল।

পাড়ার কেষ্টু-বিষ্টুদের ফোন করে বাপিদা পূর্ণকে রিক্রুট করেছে। বেশ বড় বাড়ি।

পূর্ণ বাড়ির ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে ঘরে ঢুকে সোফায় বসল। খুব বেশিদিন এই স্বাধীনতা পাওয়া যাবে না। বাপিদা বলে দিয়েছে, ঘরে বাইরে সিসিটিভি বসবে। সব জার্মানি থেকে দেখবে। পূর্ণ খি-খি করে হাসল। আগে ক্যামেরা লাগানো থাকলেই ভালো হতো। তাহলে ঘরে মধুচক্র চলত আর জার্মানি থেকে বাপিদা দেখত। ভারি মজা। যারা পানু বন্ধ করে দিয়েছে, তারা কি আর এটা বন্ধ করতে পারত? দিব্বি জমে যেত তাহলে।

ফোনটা বেজে উঠল। ইরিব্বাস, এখনও তো বাপিদাকে নাম্বার দেওয়া হয়নি, নাম্বার পেয়ে গেল নাকি? কী সর্বনাশ!

সে তাড়াতাড়ি ফোন ধরল, ‘হ্যালো…বাপিদা?’

ওপ্রান্ত থেকে মহিলা কণ্ঠ ভেসে এল, ‘প্রত্যুষদা, আমি…উফ্‌, এতদিন পরে তুমি ফোন অন করেছ?’

পূর্ণ বলল, ‘জার্মানিতে ঠান্ডা কেমন গো?’ এই কথাটা জিগ্যেস করবে আগে থেকেই ভেবে নিয়েছিল পূর্ণ। এবারের শীতেই তার সব কিছু জমে গেছিল, জার্মানিতে নাকি হেবি শীত। ওখানে কী করে টিকে থাকছে বাঙালির ছেলে বাপিদা, এটাই তো লাখ টাকার প্রশ্ন।’

‘কে? প্রত্যুষদা? শুনতে পাচ্ছ? আমি রুমা।’

পূর্ণ অবাক চোখে ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘রুমা? সেটা কে রে বাপ?’

‘প্রত্যুষদা, আমার ভারি বিপদ, আমায় বাঁচাও। যেভাবেই হোক, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। প্লিজ, আমি তোমার পায়ে পড়ি। আমার বর আমায় মেরে ফেলবে।’

পূর্ণ ভিরমি খেল। মেরে ফেলবে? বলে কী করে? বলল, ‘কে? কে বলছেন? আমি পুন্ন বলছি।’

‘একী! এটা তো প্রত্যুষদার নাম্বার? কে আপনি?’

‘ইল্লি আর কী? টাকা দিয়ে ফোন কিনলাম, টাকা দিয়ে সিম কিনলাম, উনি বলতে এয়েচেন এটা আমার ফোন না। তোর বাপের ফোন নাকি রে?’

‘আপনি প্রত্যুষদা না? নাকি ওর ফোন চুরি করেছেন?’

‘তোর বাপ চোর হারামজাদি। কারে কী বলিস তুই?’

‘আপনি প্রত্যুষদা নন?’

‘তোর বাপ প্রত্যুষ।’

ফোনটা কেটে গেল। পূর্ণ রাগী চোখে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকল। এ কী রে? প্রথম দিন থেকেই এসব ঝামেলা শুরু হয়ে গেল?

শেয়ালদায় ট্রেন পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে দৌড় শুরু হয়ে যায়। সবাই দৌড়চ্ছে। সমগ্র ভিড়টার একটাই লক্ষ্য। যেভাবে হোক স্টেশন চত্বর থেকে দৌড়তে হবে। ট্রেন থেকে নেমে ব্যাগটা বুকে নিয়ে রোজের মতোই দৌড় শুরু করল দিব্যেন্দু।

পার্থক্য একটাই। আজ বুক ধুকপুকুনি অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেকটা বেশি। চাকরিটা চলে যেতে পারে আজ।

এটা গেলে বিকল্প কিছু একটা করতে হবে। কী করতে হবে মাথায় এখনও আসেনি। আসবে নিশ্চয়ই। প্রত্যেকটা সমস্যার সমাধান আছে। এই সমস্যারও কিছু না কিছু সমাধান একটা থাকবেই। চাকরি গেলে অনেকের বড় সমস্যা হবে। পালদার যেমন। পালদার আর দশ বছর চাকরি আছে। বড় সংসার। সামনে আবার মেয়ের বিয়ে।

ভিড়টা বাজার পেরোচ্ছে। তাদের সঙ্গে দিব্যেন্দুও। রোদ উঠেছে। মেঘ কোথায় যেন উবে গেছে। এই সময় রোদ, মানে গরম অনেক বেশি লাগবে। দিব্যেন্দুর ঘাম বেশি হচ্ছে। সে জোর পায়ে রাস্তার কাছে এসে পার হল। এবার হাঁটা। রাস্তা ঘাট, দোকান বাজার সব পেরিয়ে সে জোর পায়ে হেঁটে অফিসে এলো।

থমথম করছে চারপাশ। পালদা জল খাচ্ছে। দিব্যেন্দু সিটে বসে বলল, ‘লিস্ট বেরিয়েছে?’

পালদা বলল, ‘ওই তো, দেখো না। মিটিঙে ঢুকেছে সব। আজকেই জানিয়ে দেবে। উফ। আমার শরীর খারাপ লাগছে।’

দিব্যেন্দু অন্যদিকে তাকাল। রঘু সামন্ত টেবিলে মাথা রেখে বসে আছে। অমর বাগদীর মুখ শুকনো।

মিটিং শেষ হয়ে গেছে। সাহেবরা সব নিজেদের চেম্বারে সেঁধিয়ে গেলেন।

‘দিব্যেন্দু রায়। স্যার ডাকছেন।’

পিওন ডেকে গেল। দিব্যেন্দু দুরুদুরু বুকে সাহেবের চেম্বারে প্রবেশ করল।

‘বোসো রায়।’ সাহেব কম্পিউটার মনিটরের দিকে তাকিয়ে কথাটা বললেন।

দিব্যেন্দু বসল। সাহেব তার দিকে তাকালেন, ‘রায়।’

‘হ্যাঁ স্যার।’

‘তোমাকে যদি বলা হয় একজন নন পারফর্মিং স্টাফকে বাদ দিতে, তুমি কাকে বাদ দেবে?’

দিব্যেন্দু সাহেবের দিকে তাকাল। সাহেব কেমন অন্যমনস্কভাবে প্রশ্নটা করলেন। উত্তরে কী বলবে সে? সাহেব কি তার নামই শুনতে চাইছেন?

সে গলা খাকড়িয়ে বলল, ‘স্যার আপনি কি আমার মুখ থেকে আমারই…’

‘যেটা প্রশ্ন করছি, শুধু সেটার উত্তর দেবে। নন পারফর্মিং স্টাফ। একজনের নাম বল।’

দিব্যেন্দু সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পালদা স্যার।’

‘কেন?’

‘ওর বয়স হয়েছে। চাপ নিতে পারছেন না, বোঝা যাচ্ছে।’

‘গুড।’

সাহেব মাথা দোলালেন। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, ‘ম্যানেজমেন্ট লোক কমাতে চায় রায়। আবার কয়েকজনকে প্রমোশনও দিতে চায়।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আমাকে কি বাদ দিচ্ছেন স্যার?’

সাহেব বললেন, ‘তোমার কি মনে হয় আমি এখানে বিগবসের ভোটাভুটি করতে এসেছি? তোমার থেকে একজনের নাম নেবো, আরেকজনের থেকে তোমার নাম নেবো, সারাদিন এই করে যাব?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘না মানে স্যার…সেটা ভাবিনি…’

সাহেব বললেন, ‘অ্যাকচুয়ালি এটা ভেবে থাকলে ঠিকই ভেবেছ। আমি এভাবেই করতে চাই। দেখছিলাম বিগবসের ফরম্যাটটা। চমৎকার ফরম্যাট। লোক কমাতে বলছে, লোক কমানোর কাজ, একটা মজা করে তো কমানোই যায়, কী বল?’

দিব্যেন্দু মাথা নিচু করল। সাহেব বললেন, ‘তোমার কি রাগ হচ্ছে?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘না স্যার। রাগ হচ্ছে না।’

সাহেব বললেন, ‘তাহলে তোমার ভোট পালবাবুর দিকে। তাই তো?’

দিব্যেন্দু মাথা তুলল, ‘হ্যাঁ স্যার।’

সাহেব পেপারওয়েট নিয়ে খেলতে খেলতে বললেন, ‘স্কুল টিচারে অ্যাপ্লাই করনি?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘না।’

সাহেব বললেন, ‘আমার শালা পেয়েছে। শালা বলে কথা, টাকা দিতেই হল। আমি দিয়েছিলাম। এখন বলছে চাকরি থাকবে না। তোমাদের মতোই ব্যাপার, তাই না?’

দিব্যেন্দু চুপ করে রইল।

সাহেব বললেন, ‘ঠিক আছে। তুমি যাও। পালবাবুকে পাঠিয়ে দাও। দেখি কাকে ভোট দেন।’

দিব্যেন্দু ঘর থেকে বেরিয়ে পালবাবুকে পাঠিয়ে দিল। এভাবে এক এক করে সবাইকেই ডাকলেন সাহেব।

দুপুর একটা নাগাদ দিব্যেন্দু জানতে পারল তাকে একজনও ভোট দেয়নি। তার চাকরিটা থাকবে।

পালবাবুর চাকরিটাই গেল। সব থেকে বেশি ভোট পেয়েছেন পালবাবু।

খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে পালবাবু বুকে হাত দিয়ে মেঝেতে পড়ে গেলেন।

দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়েছে।

পালবাবুর টেবিলটা সুন্দর। বেশ ভালো লাগে তার।

দিব্যেন্দু তার ব্যাগটা পালবাবুর টেবিলের উপর রাখল। এর পর থেকে এটায় বসবে সে।

কাতলা, ভেটকি, ইলিশ, চিতল।

রুমার বাবা মাছ খেতে ভালোবাসেন বলে দিব্যেন্দু চার রকম মাছ নিয়ে এসেছিল।

রুমার মা সেটা দেখে বললেন, ‘দেখেছ? জামাইটা এতো ভালো। এই জন্যই তো আমি সব সময় বলি, তোদের মধ্যে যদি কোনও ঝামেলা হয়, আমি সব সময় জামাইয়ের দিকে থাকব। কপাল করলে এমন ছেলে পাওয়া যায়।’

রুমা আলু কাটছিল। কিছু বলল না। রুমার বাবা টিভি দেখছেন।

রুমার মা বললেন, ‘একবছর তো হল। জামাইয়ের বাড়ির লোকেরা কিছু বলে না? বাচ্চা কাচ্চা নেওয়ার ব্যাপারে?’

রুমা মাথা না তুলে বলল, ‘চুপ করো না মা। তুমি বাবার সঙ্গে টিভি দেখো গিয়ে।’

রুমার মা বললেন, ‘কেন রে? কী হয়েছে? ঠিক করে জামাইয়ের দেখাশোনা করিস তো? ঝগড়া করেছিস নাকি?’

রুমা কেঁদে ফেলল। মা ভীত গলায় বললেন, ‘কী হয়েছে?’

রুমা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘ও খুব মারে মা।’

মা সঙ্গে সঙ্গে রুমার কাছে এসে গলা নামিয়ে বললেন, ‘আস্তে বল। বাবা শুনতে পাবে। পাঁচ হাজার টাকা পেনশন পায়। এখনও ছোটটার বিয়ে দেওয়া বাকি। তোর কথা শুনলে তোকে নিয়ে চলে যাবে।’

রুমা বলল, ‘তাই নিয়ে যাও না। আমি না হয় কিছু একটা করে নেবো।’

মা রেগে গেলেন, ‘কী করবি তুই? কী জানিস তুই? চাকরি করবি? চাকরি আছে? রাস্তায় নামিয়ে দেবে। আর ছেলেরা ওরকম সবাই গায়ে হাত তোলে। তুই কি ভাবিস তোর ওই দেবতুল্য বাবা কোনদিন গায়ে হাত তোলেনি? হুহ্‌, কতবার মেরেছে আমায়। ও সব প্রথম প্রথম হয়। পুরুষ মানুষ শুরুতে একটু গরম দেখাবে। তারপর দেখবি ধীরে ধীরে ঠান্ডা হবে। বউ ছাড়া চলবে না। তোর বাবাকে দেখিস না? আমাকে ছাড়া এখন কোথাও যাবে?’

রুমা আবার আলু কাটতে শুরু করল, ‘জানতাম তুমি এটাই বলবে। যেদিন আমি মরে যাব, সেদিন তোমাদের বুক জুড়াবে।’

রুমার মা বললেন, ‘কিচ্ছু হবে না। মেয়েদের বেড়ালের প্রাণ। ও দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। তোকেই তো মারে। তাও ঘরের ভেতরে। বাড়ির বাইরে গিয়ে কোনদিন লোকের সামনে বাজে ব্যবহার করেছে কি? করবে না। আমাদের জামাই সে ছেলেই না। কত সম্মান করে। এই তো, আমি তো শুনলাম অফিসে নাকি ওর ভালো অবস্থা না। তাও দেখ কত বাজার করে দিয়ে গেছে। সম্মান না করলে কি ওসব হয়?’

রুমা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘ও সব লোক দেখানো।’

রুমার মা রেগে গেলেন, ‘ওরে মুখপুড়ি, তুই কারো পাল্লায় পড়েছিস নাকি বল তো? আমাদের মুখে চুনকালি দিবি নাকি? শোন রুমা, আমি কিন্তু ভালোর ভালো, খারাপের খারাপ। এত বড় বাড়িতে থাকিস। ছেলের বাবা-মা নেই। গোটা বাড়িতে শাসন করিস। এখন যদি আবার ওই ছোঁড়াটাকে এখানে জুটিয়ে এনে কোনও ঝামেলা করতে দেখেছি, তাহলে তোর কপালে অশেষ দুঃখ আছে।’

রুমা বলল, ‘ঠিক আছে। তুমি টিভি দেখো। তোমাকে অত ভাবতে হবে না। আমার এই পা দেখেছ? হাতুড়ি দিয়ে মেরেছে।’

রুমার মা বললেন, ‘হাতুড়ি দিয়ে মারেনি। অন্য কোনভাবে চোট পেয়েছিস। এখন আমার কাছে গল্প দিচ্ছিস। তোর ধান্দা তো আমি জানি। তোকে পেটে ধরেছি, আমি জানবো না তুই কী চাস? তুই ওই আগের রসটা ভুলতে পারিসনি। বাড়ি যাবি সব সর্বনাশ করে, তারপর ওই ছেলেটার সঙ্গে পালাবি, তাই না? এই তো তোর প্ল্যান? আমি তো জানি। শুরু থেকেই তুই এই প্ল্যান করেই চলছিস। আজকের তো গল্প না এটা। সেই কবেকার গল্প।’

রুমা ক্লান্তচোখে মা-র দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গল্প দিচ্ছি? এটা হাতুড়িতে মারা, বুঝতে পারছ না তুমি?’

রুমার মা বললেন, ‘না। কোনভাবেই হাতুড়িতে মারা না। তুই মিথ্যে কথা বলছিস। সোনার টুকরো ছেলেটার নামে কলঙ্ক দিচ্ছিস। আমি তো সব জানি। স্কুলের পেছনের মাঠে সন্ধেবেলায় তোকে ওই হারামজাদাটার সঙ্গে আমিই তো ধরেছিলাম। তুই তার শোধ নিচ্ছিস।’

রুমা কিছু বলল না আর। চুপ করে রইল।

বাড়ি-ঘর শখের জিনিস। সবার কি আর সে ভাগ্য হয়? কেউ অনেক টাকা রোজগার করে দামি বাড়ি বানিয়েও শান্তিতে থাকতে পারে না। কেউ কম টাকা রোজগার করে ভাড়ার ঝুপড়িতে থেকেও সুখী।

বাপিদা কোন ক্যাটাগরিতে পড়বে, সেটাই ভাবে পূর্ণ। জার্মানিতে তো ভালোই থাকে। আর হয়তো এ জন্মে এ দেশে ফিরবে না। একটা বিলিতি মেম বিয়ে করবে। সে মেম কাগজ দিয়ে পেছন মুছবে।

এমন লোক এ দেশে বাড়ি করে থাকতে তো পারবে না। তাহলে সুখটা কীসে? বাড়ি বানানোর সুখ? টাকা থাকলে মানুষ কত কিছু করতে পারে। বাথরুমে আবার কাচের ঘর আছে। সিনেমায় যেমন দেখায়। কাচের ঘরের ভেতর ল্যাংটা হয়ে চান করবে পাবলিক। পূর্ণ প্রথম দিনই স্নান করে দেখে নিয়েছে। গরম ঠান্ডা জিনিসটা সড়গড় হয়নি বলে ঝামেলা হয়ে গেছে। প্রথমে ঠান্ডা জলে দিব্যি শাওয়ার ছেড়ে স্নান করছিল সে। কখন গরম জলের নল চালিয়ে দিয়েছিল। গা হাত পা যেন পুড়ে গেল। ‘ওরে বাবা রে মারে’ বলে বেরিয়ে এসেছে কোনও রকমে।

বড় লোকেদের এই সমস্যা নেই। তারা জানে কোন কল দিয়ে ঠান্ডা জল বেরোবে, কোনটা দিয়ে গরম বেরোবে। পূর্ণ তো আর জানে না। চিড়বিড়ে গরম আগুন জলে স্নান করার কোনও মানে হয়?

যাই হোক, পূর্ণর সারাদিনে তেমন কাজ নেই। বাপিদার বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখে। দোতলা বাড়ি। অনেক কায়দা করে করা। সব ঘর তালা দেওয়া। বসার ঘর বাদে। তালা চাবি তার কাছেই থাকে। সব ঘরেই তালা খুলে খুলে দেখে পূর্ণ। ফ্যান চালিয়ে নরম বিছানায় ছাদের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকে। এত সুখ কি সইবে? সইবে না। তার পোড়া কপালে এত সুখ বেশিদিন সইবে না, পূর্ণ ঠিকই বোঝে।

বাপিদা পড়াশুনায় বিরাট কিছু ভালো ছিল না। হঠাৎ করেই চাকরি পেয়ে চলে গেল। তারপর এসব অশৈলী কাণ্ডকারখানা হল। এত বড় বাড়ি করল। পাড়ার সবাই দেখল। বাইরে গেলেই নাকি টাকা। এ পোড়া দেশে টাকা কোথায়? টাকার নামগন্ধ নেই। শুধু ঝামেলা। পূর্ণ ক’টা দিন টোটো চালিয়ে দেখেছে। অনেক ঝামেলা। লাইনে সবাই টোটো চালায়। এলাকায় চড়ার লোকের থেকে এখন চালানোর লোক বেশি। শিক্ষিত অশিক্ষিত সবাই হয় টোটো চালায়, নয় খাবার ডেলিভারি দেয়। তার থেকে বাপিদার চাকরিটাই ভালো। দিব্যি চাকরি। এক বছর এ বাড়িতে টিকে গেলে কি বাপিদা তাড়িয়ে দেবে? সামনে থাকলে তো পায়ে পড়ে যেত! নাহ, এসব নিয়ে বেশি ভাববে না সে।

তিনতলায় একটা ছোট ঠাকুর ঘর আছে। পূর্ণ ঠাকুরঘরের তালাও খুলল।

বড় লোকদের লক্ষ্মী ঠাকুর? এই ঠাকুর কি তার ঘরে থাকেন না? বাপিদাদের জন্য কি আলাদা ঠাকুর আছে? কে জানে!

ভারি মিষ্টি মুখখানা। পূর্ণ কিছুক্ষণ ঠাকুরের সামনে বসে থাকল। ভালো লাগে তার। তাও তো কারো সামনে ভক্তিভরে বসে থাকা যায়। বাপিদার কঠিন নির্দেশ আছে এ বাড়িতে কাউকে ঢোকানো যাবে না। একা থাকতে হবে তাকে। প্রণাম সেরে পূর্ণ উঠতে গিয়ে দেখল ঠাকুর আসনের পাশে স্টিলের আলমারি রাখা। কী আছে এতে? চাবির থোকা থেকে চাবি বের করে চেষ্টা শুরু করল। না। একটাতেও খুলছে না।

ঠাকুর ঘরের বাসনকোসনই থাকবে। ধুস, অত দেখার কী আছে? তারও আজকাল সব কিছুতে বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে।

চাবিগুলো আবার পকেটে নিয়ে ঠাকুরঘর থেকে বেরোতে গিয়ে চোখ পড়ল আসনের ড্রয়ার আছে। ঠিক তো। এটা চোখে পড়েনি।

সে বসল। ড্রয়ার ঘাঁটতে ড্রয়ারের ভেতরেই আরেকটা গোপন কুঠুরি খুঁজে পেল। অন্য কেউ হলে পেতো না। পূর্ণ পেল। কিছুদিন একটা ফার্নিচারের দোকানে কাজ করেছিল।

ওই কুঠুরি খুলতেই আলমারির চাবি পাওয়া গেল।

পূর্ণ থম মেরে কিছুক্ষণ বসে রইল। পরের বাড়ি তাকে দেখাশুনা করতে দিয়ে গেছে, বিশ্বাস করেই তো। এটা কি ধর্মে সইবে?

পরমুহূর্তে মনে হল, দেখতে কী হয়? দেখে শুনে আবার না হয় যেখানকার চাবি সেখানে রেখে দেবে?

দ্বিতীয় যুক্তিটা জিতে গেল। কিন্তু তাতেও বাধা এসে গেল। চাবিটা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে যেতেই ফোনটা আবার বাজতে শুরু করল।

‘ধুত্তোর’ বলে ফোন ধরল সে, ‘হ্যালো।’

‘হ্যালো, প্রত্যুষদা…হ্যালো…প্লিজ শোন। আমি জানি এটা তুমিই। আমাকে বাঁচাও। আমাকে মেরে ফেলবে। বিশ্বাস কর, আমি বাঁচব না। ও আমাকে মেরে ফেলবে। আমার মাকে তো তুমি চেনো বল। আমি মেয়ে তো, মেয়ে সন্তানদের বিন্দুমাত্র দাম নেই, শুনতে পাচ্ছো?’

‘আরে আপনাকে বললাম না, এটা নতুন নাম্বার! কী আজে বাজে ফোন করে যাচ্ছেন বলুন তো?’

‘আপনি ফোন চুরি করেছেন। তাই না? প্রত্যুষদার ফোনটা আপনি চুরি করেছেন।’

‘তুই চোর। তোর বাপ চোর। তোর চোদ্দ গুষ্টি চোর।’

পূর্ণ চিৎকার করে উঠল।

‘শুনুন না, আমার ভারি বিপদ, যার ফোন, তাকে একটু দেখুন না দেওয়া যায় নাকি?’

‘কারো ফোন না। এটা আমার ফোন।’

‘আপনার ফোন? তা কী করে হয়? এটা কোথায়?’

‘এটা তোমার মুন্ডু।’ রেগেমেগে ফোন কেটে চাবিটা আবার ড্রয়ারেই রেখে দিল পূর্ণ। কাজে যখন বাধা এসেছে, তখন সে কাজ না করাই ভালো।