২০
পূর্বের কথা
‘হরি, ও হরি!’
মিনু চিৎকার করে ডাকল। হরি ছুটছিল বাড়ির সামনে। মা’র ডাক শুনে দৌড়ে এল। মিনু ঝাঁটা নিয়ে তাড়া করতে যাচ্ছিল। হরি তাড়াতাড়ি ঘরে সেঁধিয়ে গেল।
গজগজ করতে লাগল মিনু, ‘কাম নাই কাজ নাই, সারাদিন খালি খেইলা যাইতাসে। তর বাপ আসুক। তরে দেখাব কেমন লাগে।’
হরি কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, ‘মা, কারা আইতাসে। কত লোক।’
মিনু বলল, ‘কারা আসে?’
হরি বলল, ‘মনে হয় পাকিস্তানি সেনা। অনেক লোক নিয়া আইতাসে।’
মিনুর মুখ শুকিয়ে গেল। সে বলল, ‘গ্রামে ঢুকসে?’
হরি ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ, ঢুকসে। আমি দেখলাম সব মসজিদে ভিড় করসে।’
মিনু তড়িঘড়ি ঘরের বাইরে বেরিয়ে গিয়ে কাপড় চোপড় তুলে ঘরের মধ্যে নিয়ে এসে বাইরে থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে পেছনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে জানলা দরজা সব বন্ধ করে দিল।
হরি কেঁদে ফেলল, ‘ওরা কি মাইরা ফেলব মা?’
মিনুর বুক ধড়ফড় করছিল। বলল, ‘চুপ থাক। শব্দ করবি না। ওরা যেন ভাইবা লয়, আমরা এখানে নাই।’
হরি বলল, ‘ঠিক আছে।’
মিনিট দুয়েক পরে হরি হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল।
মিনু ভয় পেল, ভাবল আতঙ্কে ছেলে পাগল হয়ে গেল কি না। বলল, ‘কী হইল?’
হরি বলল, ‘মজা করসি। কেউ আসে নাই।’
মিনু হরির পিঠে দুম দুম করে কিল মারল। ‘মজা করার বিষয় এইডা?’
হরি তাও হেসে যাচ্ছে খিল খিল করে। মিনু বিরক্ত হয়ে উঠল। আবার দরজা খুলে দিল। কাপড় মেলতে মেলতে বলল, ‘তর বাপ আসুক। মজা দেখাব নে, বুঝবি কারে মজা কয়।’
হরি ফিক ফিক করে হাসতে শুরু করল।
রাস্তায় একটা কুকুর ডেকে উঠল। মিনু চমকে তাকাল। প্রায় পঞ্চাশজনের একটা ছোটখাটো বাহিনি তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। মিনু ভীতচোখে হরির দিকে তাকাল।
হরি চমকে উঠেছে। দুজনের কেউই ভাবেনি মজাটা এভাবে সত্যি হয়ে গেছে। সেনারা তাদের বাড়ি ঘিরে দাঁড়াল।
রাজাকার লতিফ চৌধুরী তার মেহেন্দি করা দাড়িতে হাত বুলিয়ে মেজরকে বলল, ‘মালাউন ঘর।’
মেজর খানের ফরসা চেহারা। হাসিমুখে মিনুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ক্যায়সে হো? সব ঠিক?’
মিনু কাঁদো কাঁদো মুখে খানের দিকে তাকাল।
মেজর এগিয়ে এসে মিনুর হাত ধরে বলল, ‘চলো।’
মিনু পালাতে গেল। মেজর মিনুর পিঠে সজোরে ঘুষি চালাল।
মিনু মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। পাক সেনা আর রাজাকারের দল হেসে উঠল। হরি মেজরকে মারতে এল। মেজর রিভলভর বের করে হরির মাথায় গুলি করল।
গুলি খেয়ে দশ বছরের বাচ্চাটা মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। মিনু হাহাকার করে উঠল। মেজর মিনুর মাথার চুল ধরে টানতে টানতে মিনুকে ঘরের ভেতর নিয়ে গেল।
লতিফ চৌধুরী একটা বিড়ি ধরাল। মিনুর আর্তস্বর বাইরেও শোনা যাচ্ছে। লতিফ তার দাড়িতে হাত বুলিয়ে এক সেনাকে বলল, ‘বিড়ি লেঙ্গে? আচ্ছা লাগতা সাব।’
সেনা লতিফের হাত থেকে বিড়ি নিল। লতিফ আগ্রহ ভরে সে বিড়ি ধরিয়ে দিল। কয়েক মিনিট পর বেল্ট ঠিক করতে করতে মেজর বেরিয়ে এসে চিৎকার করল, ‘মুদাসসর।’
মুদাসসর নামের জওয়ান বলল, ‘জি জনাব।’
মেজর বলল, ‘যা।’
মুদাসসর আগ্রহসহকারে ভেতরে চলে গেল। মেজর লতিফের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ক্যা হাল হে আপকা? খোয়াইশ হে?’
লতিফ লজ্জিত মুখে বিড়ি ফেলে দিয়ে আধো উর্দুতে যা বোঝাল, তার মানে দাঁড়ায় হুজুরের যদি দয়া হয়, তাহলে সেও মালাউন মেয়েকে চেখে দেখতে চায়।
মেজর জানাল মুদাসসরের হয়ে গেলে সে যেতে পারে। লতিফ খুশি হয়ে অনেক শুক্রিয়া দিল।
.
বর্তমান সময়
.
‘বুঝলা রুমানভাই, কী সময় কাটাইছিলাম?’
বৃদ্ধ লতিফ চৌধুরী হাসি হাসি মুখে গল্পটা শোনাচ্ছিল অমলকে।
অমল চুপ করে লতিফের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভিতরটা জ্বলে যাচ্ছে। অথচ এখন তার অভিনয় করার কথা!
.
২১
রাণা গাড়িতে অপেক্ষা করছিল। অমল লতিফের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে বলল, ‘বাস্টারড।’
রাণা অবাক হল, ‘কী হয়েছে?’
অমল রাগী গলায় বলল, ‘৭১-এর গল্প বলছিল জানোয়ারটা। বিরাট কিছু কাজ করে ফেলেছে। এ শুয়োরগুলোর ধারণা এরা খুব ভালো কাজ করেছিল। কাফেরদের মেরে পুণ্য করেছে ভাবে। জাস্ট নেওয়া যায় না।’
রাণা বলল, ‘তাহলে এদের উড়িয়ে দেওয়া হয় না কেন?’
অমল বলল, ‘কতজনকে ওড়াবে? প্রচুর মানুষ এটাই ভাবে। এদেশে কতজন রাজাকারদের সমর্থন করে, তোমার কোনও ধারণা আছে? ধর্ম মানুষকে মানুষ রাখে না আর। তাছাড়া এ লোকটাকে এখনই মারলে হবে না। বড় মাছেরা ওদেশ থেকে আসবে। এ লোকের ডাক পড়বে। একে হাতে রাখলে ভেতরের অনেক খবর পাওয়া যাবে।’
রাণা বলল, ‘কাজ হয়ে গেলে? তখন?’
অমল গাড়ি স্টার্ট দিল, ‘তখন তোমাকে হ্যান্ডওভার করে দেব। যা করার করে নিও।’
রাণা ঠান্ডা চোখে জানলার বাইরে তাকাল। কাজ হয়ে গেলে অমলকেও ওড়ানোর আদেশ আছে। অমল সেটা জানে? জানলে তার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারত? যা বোঝা যাচ্ছে, ঢাকায় আই এস আই এখন প্রবলভাবে সক্রিয় হবার চেষ্টা করছে। অমল সেসব খবরই বের করছে। আরও কতখানি খবর পেলে অমলকে সরানো যাবে, সেটা তাকে ঠিক করতে হবে। তাকে এখানে থাকতে হবে। সে পারবে? তারপর একদিন তাকেও ওড়াতে এভাবেই কাউকে পাঠাবে উস্তাদ? অস্বস্তি হচ্ছিল।
অমল বলল, ‘সাদিক কিন্তু খুঁজে বেড়াচ্ছে। যেভাবে হোক ও ট্র্যাক করতে চাইছে আসগরকে কে উড়িয়েছে। আমাদের এখন সাদিকের কাছে থাকতে হবে। কিপ ইয়োর এনিমিস ক্লোজ এই মন্ত্র মেনে চলতে হবে।’
রাণা বলল, ‘কত ক্লোজে যাব? আমার লোকটাকে দেখলেই মাথা গরম হয়ে যায়।’
অমল হাসল, ‘এরকম মাথা গরম হয়ে যায় দেখলে টাইপ লোকেদের নিয়েই আমাদের কাজ করতে হবে। কিছু করার নেই। সাদিকের অনেক ব্যবসা আছে। তার মধ্যে একটা ব্যবসা হল, ও এদেশের আট-নয় বছরের ছেলেমেয়েদের তুলে নিয়ে আরবে পাচার করে। সে বাচ্চাদের একটা অংশ আইসিসে যায়। ওরা ওই বাচ্চাদেরকেই নিয়ে শোয়। জাস্ট ইমাজিন।’
রাণা বলল, ‘এসব আমাকে বলছেন কেন? আমি রেগে যাচ্ছি। রেগে গেলে আমার মাথা ঠিক থাকে না।’
অমল বলল, ‘তোমায় মাথা ঠান্ডা রাখাটাও শিখতে হবে রাণা। তুমি এফিসিয়েন্ট। তুমি ভালো। কিন্তু আরও ভালো হতে হবে। আসল তো মাথা। এ কাজে আসল হল রিপু। আমাদের নিজেদের কন্ট্রোল করা জানতে হবে। নইলে সমূহ বিপদ। আসগরের কেসটা আমাদের কি ফ্রন্টফুটে রেখেছে? রাখেনি। বরং অনেকটা ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। এটা তোমার মাথা গরম করার ফলাফল। দয়া করে এ কাজে সেটা কোরো না।’
রাণা বলল, ‘বাচ্চাদের নিয়ে এসব করবে, আর কিছু বলব না?’
অমল বলল, ‘বলব। অ্যাক্ট করব। তার সময় আছে। বাঘের টোপ ফেলার মতো অপেক্ষা করাটাই আমাদের কাজ। তার আগে টোপ সাজাও। টোপ চিৎকার করুক, গন্ধ ছড়াক। মজা তো তখনই। একটা জিনিস ভালো হল না খারাপ হল, বুঝতে পারছি না। আসগর নেই বলে সাদিক তোমাকে কলম্বো পাঠাবে না। তুমি বেঁচে গেলে। কিন্তু কলম্বোর কোডটাও তো দরকার ছিল। সেটা কী করে পাব?’
রাণা বলল, ‘দু-দিন পরে আবার শুরু হবে নিশ্চয়ই।’
অমল চিন্তিত গলায় বলল, ‘দেখা যাক। যাহ্, ঢাকার বিখ্যাত জ্যাম শুরু হয়ে গেল। এবার কী হবে?’
রাস্তায় একটার পর একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে তাল মিলিয়ে রিক্সা। সুদৃশ্য কত রকমের রিক্সা। রাণা বলল, ‘আমরা এখন কোথায় যাচ্ছিলাম?’
অমল বলল, ‘সাদিকের বাড়িতে। যেতে তো হবেই ভাই। বসে থাকলে হবে না।’
রাণা বলল, ‘আবার? কী করে যাব?’
অমল হতাশ গলায় বলল, ‘জানি না।’
.
২২
নির্মল হন্তদন্ত হয়ে আনোয়ার সাহেবের চেম্বারে ঢুকে বলল, ‘স্যার, আসগর আলির নাম শুনেছেন?’
আনোয়ার সাহেব চিন্তিতমুখে বললেন, ‘শোনা শোনা লাগছে। কেন বল তো?’
নির্মল বলল, ‘সকালে ওকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অদ্ভুতভাবে এ বুলেটটাও বিদেশী।’
আনোয়ার সাহেব হাতের ইশারায় নির্মলকে বসতে বলে বললেন, ‘আসগরের হিস্ট্রি কী?’
নির্মল বলল, ‘সাদিকের কাছে কাজ করত। সাদিক হোসেন। টেক্সটাইল কিং উইথ নো ক্রিমিনাল হিস্ট্রি।’
আনোয়ার সাহেব বিস্মিতগলায় বললেন, ‘বলো কী? এত বড় কিং লোক, তার ক্রিমিনাল হিস্ট্রি নেই?’
নির্মল মাথা নাড়ল, ‘নেই স্যার।’
আনোয়ার বললেন, ‘আসগরকে কী করে…?’
নির্মল বলল, ‘ফ্ল্যাটে ঢুকে, ভোরবেলায়। সিকিউরিটিকেও হালকা জখম করেছে। আমাদের কাছে সেরকম কোনও সিসিটিভি ফুটেজ নেই।’
আনোয়ার বললেন, ‘রাস্তার ফুটেজ? ভোরবেলায় কত গাড়ি চলে?’
নির্মল হতাশ গলায় বলল, ‘অনেক স্যার। সেভাবে কিছু বোঝা সম্ভব না।’
আনোয়ার বললেন, ‘নজর রাখো। আর এই সাদিক সাহেবের ব্যাপার কী জানা আছে?’
নির্মল বলল, ‘কিছু না। আমার শুধু একটাই অবাক লাগছে, এত বড় এম্পায়ার সামলাচ্ছে, অথচ একটা ছাড়া আর কোনও কালো দাগ নেই।’
আনোয়ার বললেন, ‘কী সেই কালো দাগ?’
নির্মল বলল, ‘পুরান ঢাকায় ওর একটা ব্রথেল আছে। মেয়ে পোষে। নিজস্ব মেয়েছেলে।’
আনোয়ার হাত দিয়ে কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করে বললেন, ‘ওটা কালো দাগ হিসেবে আইডেন্টিফাই করা যাবে না। আরও খোঁজো। খোচর লাগিয়ে দাও। সাদিক কি তারেক হোসেনের ভাই?’
নির্মল বলল, ‘জি স্যার।’
আনোয়ার বললেন, ‘তারেক হোসেন ইন্ডিয়ায় খুন হয়েছিল। ওই লোকের খবর আসার পর অনেকে নড়েচড়ে বসেছিল। তারপর সব ঠান্ডা হয়ে গেল। বলা হল তারেকের কাছে ওদেশের কোনও তোলাবাজ টাকা চেয়ে না পাওয়ায় কাণ্ডটা ঘটায়। অদ্ভুতভাবে সেটা নিয়ে কেউ কোনও কথাও বলল না। সাদিক তারেকের ভাই, তার সাগরেদকে কেউ ফজরের সময়ে…ইন্টারেস্টিং নির্মল! সাউন্ডস ভেরি ইন্টারেস্টিং! ছাই পেয়েছ, ওড়াতে শুরু করো। দেরি কোরো না।’
নির্মল বলল, ‘স্যার, সাদিকের ফোন ট্র্যাক করার পারমিশন পাওয়া যাবে?’
আনোয়ার বললেন, ‘আহ্, আবার জিগ্যেস করছ কেন? যা খুশি করো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করো। সাদিক ইজ এ বিগ ফিস। হতে পারে নিজের লোককে নিজেই…কোনও কথা শোনেনি বলে…’
নির্মল বলল, ‘স্যার, আমার মনে হয় না এখানে সাদিক ইনভলভড আছে। নিজের লোক হলে লোকটা গুম করে দিতে পারতো। এভাবে কাজ করত না।’
আনোয়ার ভ্রু কুঁচকে নির্মলের দিকে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে থেকে বললেন, ‘তাও ঠিক। সাদিকের অ্যান্টি কে আছে?’
নির্মল মাথা নাড়ল, ‘নো আইডিয়া স্যার। রেকর্ড বলছে সাদিকের শত্রু নেই। অজাতশত্রু। নিজের কাজটা মন দিয়ে করে। অন্য কোনও বিষয়ে মাথা ঘামায় না।’
আনোয়ার হাসলেন, ‘হতে পারে না। বাঙালি অজাতশত্রু হতে পারে না, আনলেস হি ইজ এ মহাপুরুষ। টেক্সটাইল এম্পায়ারের মালিক অজাতশত্রু হওয়া সম্ভব না। তার অ্যান্টি গ্যাংগুলোর ব্যাপারে জানতে হবে।’
নির্মল ঘাড় নাড়ল, ‘রাইট স্যার। আপনি যা বলবেন।’
আনোয়ার বললেন, ‘দেখো দেখো। দেরি কোরো না।’
নির্মল আনোয়ার সাহেবের চেম্বার থেকে বেরিয়ে নিজের ডেস্কে এসে বসল। সাদিকের ফাইলটা বের করে আবার পড়তে শুরু করতেই তার ফোন বেজে উঠল। নির্মল দেখল দীপা ফোন করছে। দীপা এখন রাগ করে আছে। সে তড়িঘড়ি ধরল, ‘বলো।’
দীপা বলল, ‘তুমি কি বাসায় আসতে পারবে?’
নির্মল অবাক হয়ে ঘড়ি দেখল, ‘এখন?’
দীপা রাগী গলায় বলল, ‘তোমায় বলেছিলাম না ইন্ডিয়া থেকে আমার মামারা আসবে? বলেছিলাম তো?’
নির্মল বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ। এসে গেছেন?’
দীপা বলল, ‘বাস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়ে আছে। দয়া করে ওদের রিসিভ করে আনা যাবে কি?’
নির্মল আমতা আমতা করে বলল, ‘শোন না, খুব বড় কাজে ফেঁসে আছি। যাও না প্লিজ।’
দীপা ফোন কেটে দিল।
.
২৩
‘স্যার আসব?’ আনোয়ার আলির চেম্বারে নক করল নির্মল।
আনোয়ার বললেন, ‘এসো, বোস বোস।’
নির্মল চেম্বারে ঢুকে বসে বলল, ‘স্যার সাদিককে ইন্টারোগেট করা দরকার। আমার মনে হচ্ছে দেরি করা ঠিক হবে না।’
আনোয়ার বললেন, ‘বেশ তো। সাদিকের বাসায় চলে যাও। গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করো।’
নির্মল অবাক হয়ে বলল, ‘এত সোজা? সমস্যা হবে না?’
আনোয়ার বললেন, ‘তুমি যাও। আমি বুঝব।’
নির্মল ঘাড় নাড়ল। এইজন্য আনোয়ার স্যারকে এত ভালো লাগে। কোনরকম সিদ্ধান্ত নিতে একটু দেরি করেন না।
আনোয়ারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে নির্মল চার জনকে নিয়ে সাদিকের বাড়ির দিকে রওনা দিল। আকাশ মেঘলা করে আছে। যেকোনও সময় বৃষ্টি নামতে পারে। দীপা এখনও কথা বলছে না। ভীষণ রাগ করে আছে। কাজের যন্ত্রণায় সংসার মাথায় উঠেছে। রোজ কিছু না কিছু সমস্যা লেগেই আছে। কোনদিন সময়ে বাড়ি ফিরতে পারে না। দীপা জানে তার কাজ এরকমই। বিয়ের আগেও জানত। তারপরেও এরকম করবে। ইন্ডিয়া থেকে দীপার মামারা এসেছে। এখন বায়না ধরেছে, ওদের নিয়ে দেশ ঘোরাতে হবে। নির্মল যতবার বলেছে ছুটি পাবে না, ততবার কথা বন্ধ করে দিচ্ছে।
সাদিক শেখ বাড়িতেই ছিল। ডেকে নিয়ে আসতে হল। তাকে দেখে বলল, ‘থানা থেকে আসছিল তো। যা বলার বলে দিয়েছি।’
নির্মল বলল, ‘আমি থানা থেকে আসি নাই। অন্য জায়গা থেকে এসেছি।’
সাদিক বলল, ‘কোত্থেকে আসছেন স্যার? ব়্যাব?’
নির্মল বলল, ‘ওরকমই।’
সাদিক গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলল, ‘আসগর আমার কর্মচারী ছিল। এর বেশি কোথায় কী করেছে, তা তো আমি বলতে পারি না স্যার।’
নির্মল সাদিকের দিকে তাকিয়ে হাসল, ‘আমি তো একবারও বলিনি আসগরের ব্যাপারে এসেছি। আপনি আসগরের প্যাঁচাল পাড়তে শুরু করে দিলেন কেন?’
সাদিক বলল, ‘আমি ছোট ব্যবসায়ী স্যার। এছাড়া আর কোন কারণেও আমার কাছে ব়্যাব আসবে ক্যান?’
নির্মল বলল, ‘আপনার রেকর্ড কিন্তু তা বলছে না সাদিক।’
সাদিক ভ্রু কুঁচকাল, ‘রেকর্ড কী বলছে?’
নির্মল বলল, ‘রেকর্ড বলছে আপনার ব্যবসা বেশ ভালোই ছড়িয়েছে। মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড। এর মধ্যে অনেকবার আপনার যাতায়াত হয়েছে।’
সাদিক বলল, ‘জি স্যার, এই কান্ট্রিগুলোতেই আমার ব্যবসা। বাংলাদেশের ব্যবসা এখন গ্লোবাল হতে যাচ্ছে। আমাদের গর্ব করা উচিত। তাই না মিয়াঁ?’
নির্মল বলল, ‘আসগরকে নিয়ে কিছু বলুন।’
সাদিক বলল, ‘খারাপ পথে ছিল। রাস্তা থেকে তুইলা নিয়া মানুষ করেছি জানেন? মগবাজারে ফ্ল্যাট কিনে দিলাম। আগের জীবন পিছু ছাড়ল না। অনেক খারাপ লাগে।’ সাদিক মন খারাপের মুখ করল।
নির্মল বলল, ‘আলম নামে কাউকে চেনেন?’
সাদিক চমকে সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিল, ‘চিনি। কেন বলুন তো?’
নির্মল বলল, ‘এমনি জিগ্যেস করলাম।’
সাদিক অবাক হয়ে নির্মলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী করেছে আলম?’
নির্মল বলল, ‘খুন হয়েছে, জানেন না?’
সাদিক বলল, ‘আমি কী করে জানব ভাই? আমার উপর দিয়ে কী যাচ্ছে বলেন তো! সকালে পুলিশ আসে, বিকালে ব়্যাব আসে। আমার কাজ-কাম মাথায় উঠসে। আলমের লগে অনেকদিন কন্ট্যাক্ট নাই। আসগরই তো ওদের সব খোঁজ খবর রাখত।’
বলতে বলতে হঠাৎ করে কাঁদতে শুরু করল, ‘আসগর, ভাইরে, আমাগো ছাইড়া তুই কোথায় চলে গেলি রে!’
নির্মল তীক্ষ্ণচোখে সাদিকের দিকে চেয়ে রইল। অতি শোক চোরের লক্ষণ বলে মনে হচ্ছে।
সে বলল, ‘আমাদের হেড অফিসে না জানিয়ে আপনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। আপনার পাসপোর্ট আমাদের কাছে জমা করে দেবেন।’
সাদিক রেগে গেল, ‘এসব কী বলেন আপনি? আমার বেশিরভাগ কাজই তো বাইরে। দেশের বাইরে না যাইতে পারলে কী হবে?’
নির্মল বলল, ‘এটা আমার ডিসিশন না। তদন্তের স্বার্থে আপনাকে এটুকু সহযোগিতা করতেই হবে।’
সাদিক বিরক্ত মুখে বলল, ‘জি আচ্ছা। আসগরের খুনিরে ধরতে পারলে আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনারে পুরস্কার দিমু, কইয়া দিলাম সার।’
নির্মল উঠে দাঁড়াল, ‘ব্যক্তিগত পুরস্কারের লোভে আমি চাকরি করি না। তবে খোঁজ পেলে হয়তো আপনি জানতে পারবেন।’
সাদিক গম্ভীর মুখে বসে।
নির্মল সাদিকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল। এখন আবার দীপার মামাদের রিসিভ করতে ছুটতে হবে। জীবনে একটুও শান্তি নেই।
.
২৪
রাণা অমলের সঙ্গে বসে টিভি দেখছিল। কিছুক্ষণ আগে জ্যাম থেকে মুক্তি পেয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকেছে তারা। সাদিকের ফ্ল্যাটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে।
অমলের ফোনে মেসেজ টোন বাজল। অমল মেসেজ টোন দেখে বলল, ‘সর্বনাশ।’
রাণা বলল, ‘কী হল?’
অমল বলল, ‘সাদিক ব়্যাবের নজরে পড়ে গেছে।’
রাণা বলল, ‘সেটা কী করে জানা গেল?’
অমল বলল, ‘সাদিকের বাড়ির কাছে আমাদের লোক রাখা আছে। সেই খবর দিল। একজন ইনফরমার আরেকজন ইনফরমারকে খুব ভালো করে চেনে।’
রাণা বলল, ‘তাহলে তো আপনার ইনফরমারও ধরা পড়ে যাবে।’
অমল চিন্তিতগলায় বলল, ‘ঠিকই। ধরা পড়ে যাবার চান্স খুব বেশি। তাকে সরে যাবার ইন্সট্রাকশন দিয়ে দিই তবে।’
অমল মেসেজ করে দিল।
রাণা বলল, ‘তাহলে আমরা কী করব? সাদিকের বাড়ি যাব না?’
অমল বলল, ‘আমাকে জিগ্যেস করছ কেন? তুমি আসগরকে ওড়ানোর ডিসিশন নিলে। সমস্ত সাজানো প্ল্যান ভেস্তে গেল। এবার তুমিই ঠিক করো কী করবে? দেখলে তো? এরকম ভুল ডিসিশনের জন্য হাতের কাছে চলে আসা জিনিসগুলো কেমন দূরে চলে যায়? এবার ব়্যাবের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। আর যদি সেটা করতে হয়, তাহলে দিল্লিকে দিয়ে ঢাকায় কন্ট্যাক্ট করাতে হবে! উফ্, মহা ঝামেলা।’
রাণা বলল, ‘তাহলে বোধহয় আমাদেরও এখন আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেলেই ভালো হয়।’
অমল বলল, ‘তুমি পারবে? দু’দিন আন্ডারগ্রাউন্ড থাকার পর তিন দিনের দিনই তুমি বলবে আমার মাথা কাজ করছে না, কাউকে একটা ওড়াতে হবে।’
রাণা বলল, ‘আমরা সাদিকের বাড়ি না গেলেই সাদিক সন্দেহ করবে। আপনি নিশ্চয়ই সাদিককে বলতে যাবেন না যে ওকে ব়্যাব টার্গেট করেছে?’
অমল দু’হাতে মাথা চেপে বসে থেকে বলল, ‘সব গেল। আমার গোটা কাজটা নষ্ট হয়ে গেল। যে ক’টা কো-অরডিনেট সাদিকের কাছে আছে, ওরা সেগুলো আর ইউজ করবে না এর পরে।’
থমথমে মুখে অমল ফোন করল। ও-প্রান্ত ফোন ধরতে অমল সবটা জানিয়ে বলল, ‘এবার কী করব?’
ও-প্রান্ত থেকে উত্তর এল, ‘যেখানে আছ, সে জায়গা ছেড়ে দাও। ঢাকায় অন্য কোনও জায়গায় চলে যাও।’
অমল বলল, ‘সেক্ষেত্রে সাদিক সতর্ক হয়ে যাবে।’
‘তোমাদের ধরা পড়ার রিস্ক দিল্লি নিতে পারবে না।’
রাণা জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। একটা পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়াল রাস্তার উপর। চার-পাঁচজন গাড়ি থেকে নেমে অমলের গাড়িটা দেখতে শুরু করল। রাণা অমলকে ইশারা করল। অমল জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে ফোন রেখে রাণাকে বলল, ‘হয়ে গেল, মামারা এসে গেছে। এখনই বেরোতে হবে। চলো।’
তড়িঘড়ি তৈরি হল তারা। বেশ কিছু কাগজ ঘরের মধ্যেই আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়ে একটা ব্যাগে জিনিসপত্র নিয়ে নিল অমল। ফ্ল্যাটের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তারা দেখলো পুলিশ গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ফোন করছে। অমল বলল, ‘আমাকে ফলো করো।’
ফ্ল্যাটের পেছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে সি এন জি ধরে উঠে বসল। অমল বলল, ‘উত্তরা যাব।’
সি এন জি চালক বলল, ‘উত্তরা যাব না।’
অমল বলল, ‘ঠিক আছে। কমলাপুর যাবা? না তাও যাবা না?’
সি এন জি চালক গম্ভীর মুখে বলল, ‘যাব। একশো টাকা বেশি লাগব।’
অমল বলল, ‘দিমু নে। চলো।’
সি এন জি চলতে শুরু করল। অমল পিছনের দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত হল। রাণা বলল, ‘কোথায় যাচ্ছি?’
অমল রাণার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল, ‘এখন কোনও কথা নয়।’
কমলাপুর পৌঁছতে কুড়ি মিনিট লাগল। সি এন জি থেকে নেমে অমল বলল, ‘রাজশাহী এক্সপ্রেস দাঁড়িয়ে আছে। চলো ওতে উঠে বসি।’
অমল টিকেট কাটল। ট্রেনে উঠে বসার জায়গা পাওয়া গেল।
অমল বিরক্তভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘ব্লান্ডার করে ফেললাম। তোমার কথাটা কেন যে শুনতে গেলাম!’
.
