দিন প্রতিদিন – ৩৫

৩৫

‘জাল নোট! জার্মানিতে থেকে বাপি জাল নোটের কারবার করে নাকি রে?’ হতভম্ব গলায় বলল নুরুল।

পূর্ণর মাথা ভোঁ-ভোঁ করছিল। সে বলল, ‘আমি জানি না। কেমন কপাল আমার। ভাবলাম কদিন একটু শান্তিতে থাকতে পারব, তাও গেল।’

নুরুল বলল, ‘তুই সব টাকা যেমন ছিল, তেমন রেখে দে। ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করে তো লাভ নেই। খামোখা বদনামের ভাগীদার হবিই বা কেন?’

পূর্ণ মাথা নাড়ল, ‘ঠিকই বলেছিস। দিয়ে আসি।’

নুরুলের থেকে টাকাগুলো নিয়ে আবার পকেটে ঢুকিয়ে চুপ করে বসল পূর্ণ। চায়ের খদ্দের এসে গেছে। নুরুল ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পূর্ণ উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল।

নুরুল ডাকল, ‘এই পুন্ন, চা খেয়ে যা আরেক কাপ। আমি খাওয়াচ্ছি।’

পূর্ণ ম্লান মুখে তাকাল। নুরুল বলল, ‘আয় আয়। বোস।’

পূর্ণ চুপ করে বসে চা হাতে নিয়ে বসল। এলাকা জমজমাট। মেলা হবে। মাঠে বাঁশ পড়ছে। গাড়ি আসছে। ঘোর বর্ষায় মেলা চলবে। ভিড় করে আসবে লোকে। কাঁদায় আছাড়ি পিছাড়ি খাবে। তবু লোকের মেলা দেখার পুরকিই আলাদা।

খদ্দের চলে গেলে নুরুল বলল, ‘টাকাগুলো ঘরে রেখে দিয়েছিল কেন রে?’

পূর্ণ বলল, ‘কে জানে। কী করতে রেখেছে।’

বাক্সর মতো আরও কী সব দেখেছে, কিছু বলল না পূর্ণ।

নুরুল বলল, ‘কাউকে বলার দরকার নেই। শুধু তুই ফাঁসিস না।’

পূর্ণ বলল, ‘কাজ ছেড়ে দেব। এখানে কাজ করব না।’

নুরুল বলল, ‘তা কেন? কে খাওয়াবে তোকে? মাস গেলে কিছু টাকা তো পাবি।’

পূর্ণ বলল, ‘সেগুলো জাল হয় যদি?’

নুরুল বলল, ‘হবে না। আমার মনে হয় না সেগুলো জাল হবে।’

মন মরা হয়ে কিছুক্ষণ বসে চা শেষ করে পূর্ণ উঠে পড়ল।

এলাকায় টোটো গিজগিজ করছে। আগে রিক্সা চলত। ভ্যান চলত। এখন টোটো চলে। প্রথমদিকে টোটো ভাড়া এত ছিল না। ইদানীং প্রচুর বেড়ে গেছে। তার সঙ্গে টোটোচালকদের রোয়াবও বেড়েছে।

পূর্ণ একজনকে জিগ্যেস করল, কত নেবে। বলে সত্তর টাকা। আগে কুড়ি টাকা নিত। সব কিছুর দাম বেড়ে গেছে। নুরুল ঠিকই বলছিল। দু’লাখ টাকায় কিছু হয় না। এক দিকে ভালোই হয়েছে।

ফোন রিং হচ্ছে। বাপিদা ফোন করছে। ধরল সে, ‘বল।’

বাপিদা বলল, ‘ক্যামেরার লোক বাড়িতে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তুমি কোথায়?’

পূর্ণ বলল, ‘বাজারে এসেছিলাম। যাচ্ছি। কুড়ি মিনিট পরে আসতে বল।’

বাপিদা রেগে গেল, ‘তোমাকে না বলেছিলাম, বাড়ি ফাঁকা রাখবে না। কেন আমাদের ওখানে সব্জিওয়ালা যায় না?’

পূর্ণ উত্তর দিল না। চুপ করে রইল।

বাপিদা বলল, ‘কী হল? চুপ করে আছ কেন?’

পূর্ণ বলল, ‘খুব গরম পড়েছে। হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি তো। চলে যাচ্ছি।’

বাপিদা বলল, ‘যাও। আর মই টইগুলো দেখে নিও। এবারে যেন ভেঙে না পড়ে। আমি না থাকলে কিছুই হয় না দেখছি।’

পূর্ণ বলল, ‘দেখব দেখব। চিন্তা কোরো না। দরকার হলে আমি মই ধরে রাখব। চিন্তার কোনও কারণ নেই।’

বাপিদা বলল, ‘আজকের মধ্যে সব কাজ যেন হয়ে যায়। আর ঠাকুরঘরেও একটা ক্যামেরা লাগাতে বলবে। ঠিক আছে?’

পূর্ণ থমকে গেল, ‘ঠাকুরঘরে?’

বাপিদা বলল, ‘হ্যাঁ। বাথরুম ছাড়া সব ঘরেই লাগানো থাক। আমি তাহলে এখান থেকে সব দেখে রাখতে পারব। তুমিও যখন ইচ্ছে বাজার যেতে পারবে। চিন্তার কিছু থাকবে না।’

পূর্ণ বলল, ‘ঠিক আছে। বলে দেব।’ ফোন কেটে দিল বাপিদা।

পকেটে টাকাগুলো যেন মরে পড়ে আছে। অথচ বাজার যাবার পথে তার পকেট কেমন গরম মনে হচ্ছিল। বুকটাও উত্তেজনায় জোরে জোরে ধুকপুক করছিল। ব্যাজার মুখে পূর্ণ হাঁটতে থাকল।

৩৬

‘লগ ঠিকই আছে। এদের ক্যামেরা খারাপ।’

চিন্তিত মুখে বলল নীল।

অরিত্র বলল, ‘তাহলে কী হবে?’

নীল বলল, ‘আমি আপনার স্ত্রীর ফোনটা ট্রেস করতে দিয়েছি। দেখা যাক, কিছু পাওয়া যায় নাকি। তার আগে আপনি বলুন, ওর আচরণে সন্দেহজনক কিছু দেখেছিলেন?’

অরিত্র নীলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনাকে তো বলেছি ওর সিরিয়াল করা নিয়ে একটা ঝামেলা চলছিল।’

নীল বলল, ‘বলেছেন?’

অরিত্র বলল, ‘বলিনি? জানি না, মনে করতে পারছি না। তাহলে এখন বলি, ওর এই সিরিয়াল করা, রাত করে বাড়ি ফেরা, লেট নাইট পার্টি করা, এসব নিয়ে আমার আপত্তি আমি জানিয়েছিলাম। রাগ করেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। কিন্তু তা বলে এত তাড়াতাড়ি ব্যাগ রেখে কোথাও চলে যাওয়ার মেয়ে ও নয়। আমি নিশ্চিত এণাক্ষী কোনও সমস্যায় পড়েছে।’

নীল মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে, সেকেন্ড ব্যাঙ্কোয়েটের প্রাইভেট পার্টির আরও ডিটেলস আমি বের করার চেষ্টা করছি। যেখানে যেখানে যা যা জানানোর, আমি তাও জানিয়ে দিচ্ছি। আপনি বাড়ি চলে যান। রেস্ট করুন। এখানে সেখানে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়িয়ে তো কোনও লাভ হবে না, তাই না?’

অরিত্র অন্য দিকে তাকাল। বলল, ‘বুঝতে পারছি সবটাই। কিন্তু ওর কোনও ক্ষতি হলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। ও খানিকটা ঝোঁকের মাথাতেই…’

নীল অরিত্রর কাঁধে হাত রাখল, ‘আরে এরকম তো হয়। আমারও হয়। স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া তো করবেই। তাছাড়া, ব্যাপারটা তো এমন না যে আপনি ওয়াইফকে বাড়িতে খুন করে এসে এখানে একটা সিন তৈরি করছেন। সুবীরবাবু আপনার ওয়াইফকে দেখেছে। তাই আপনি সেদিক থেকে সেফ।’

অরিত্র চমকে নীলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মানে! এ আবার কী কথা বলছেন?’

নীল বলল, ‘এরকম ভাবে রিয়্যাক্ট করার কিছু হয়নি। তদন্তে নামলে সবদিক যাচাই করে দেখতে হয়। সবার আগে আপনার সব রকম অভিযোগ থেকে ফ্রি হওয়া দরকার। আপনারা যেখানে থাকেন, সেখানের এন্ট্রান্স বা এক্সিটে সিসিটিভি আছে তো?’

অরিত্র বলল, ‘আছে। তা বলে আপনি আমাকেই…’

নীল বলল, ‘ঠিক আছে। ওই ফুটেজ এটা প্রমাণ করে দেবে যে স্ত্রীর নিখোঁজে আপনার ডিরেক্ট কোনও হাত নেই। দ্যাটস ফাইন। ওর কোনও শত্রু? কারো সঙ্গে ঝামেলা?’

অরিত্র বলল, ‘না। আমার অন্তত জানা নেই। তবে লাস্ট কয়েক মাসে ওর অনেক নতুন লোকজনের সঙ্গে পরিচিতি হয়। তারা কে কী করেছে, তাদের সঙ্গে কী রিলেশন ছিল, কী কথা হতো, আমি কিচ্ছু জানি না।’

নীল বলল, ‘দু-তিন দিন সময় দিন, এর মধ্যে না ফিরলে সব জেনে যাব আমরা। আপনাকে এসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আপনি বাড়ি যান। উনি যদি বাড়ি চলে আসেন, আমাকে জানাবেন, নাম্বারটা নিয়ে নিন।’

নীল নাম্বার বলল। অরিত্র কাঁপা কাঁপা হাতে নাম্বার সেভ করে নিল।

নীল অরিত্রকে দেখে বলল, ‘শুনুন, আমার মনে হয় না এত রাতে এই টেন্সড অবস্থায় আপনার ড্রাইভ করে যাওয়া ঠিক হবে। আপনার গাড়ি তো থানাতেই থাকল, আপনাকে বরং আমি নামিয়ে দিয়ে আসি। কাল গাড়িটা নিয়ে যাবেন।’

অরিত্র আপত্তি করল, ‘না অফিসার, তার দরকার নেই।’

নীল বলল, ‘দরকার আছে। আপনি বেশ আন্সটেবল হয়ে গেছেন। বেশি চিন্তা করে ফেলছেন। অত ভাবার কিছু হয়নি। চলুন।’

অরিত্রকে একপ্রকার জোর করেই নীল জিপে তুলল। গাড়ি স্টার্ট হতেই বলল, ‘আপনাদের স্বামী-স্ত্রী মনোমালিন্য হচ্ছিল, সে কথা এই শুটিং পার্টিরা জানে?’

অরিত্র বলল, ‘জানে। হয়তো জানে না। আমি ঠিক বলতে পারব না। অনেক মেয়ের বাড়িতেই ঝামেলা হয়। লাইনটা তো সুবিধার না।’

নীল বলল, ‘এরকম ধারণা কেন হল আপনার?’

অরিত্র বলল, ‘অন্য লোক এসে আপনার বউয়ের হাত ধরবে, তার কোমরে হাত রেখে নাচবে, সবসময় ভালো লাগে আপনার? আমি অত উদার হতে পারিনি, কী করব?’

নীল হেসে ফেলল।

৩৭

রুমা খাটে শুয়ে টিভি দেখছে। কী যে আরাম লাগছে! এসি চলছে। ঘরটা ঠান্ডা হয়ে আছে। ঘরের ভেতর কত কিছু আছে। টি ব্যাগ আছে, চিনি আছে, দুধ আছে, কফি আছে। গরম জল করার ইলেকট্রিক কেটলি আছে। দিব্যেন্দু একবার এরকম টি ব্যাগ নিয়ে এসেছিল। তাকে গরম জল করে দিতে বলত। নিজে চা বানিয়ে খেত। রুমার ইচ্ছে করত টি ব্যাগের চা খেতে, লজ্জায় বলতে পারেনি কখনও। তাছাড়া বললে যদি আজেবাজে কথা বলত, কিংবা গায়ে হাত তুলত! ‘শখ? শখ হয়েছে? শখ বের করে দেব, জুতোর তলায় থাকবি হারামজাদি!’

আরাম লাগছে। ইচ্ছে হচ্ছে দিনের পর দিন সে শুয়ে থাকে। একটা সময় সে সারাদিন শিউরে উঠত। সর্বক্ষণ মনে হতো, এই বোধহয় দিব্যেন্দু এসে গায়ে হাত দেবে। রুমা একবার স্টেশনে চলে গেছিল। অনেকক্ষণ চুপ করে স্টেশনে বসে থাকার পর বাড়ি ফিরে এসেছিল। মনে হয়েছিল, কোথায় যাবে? তার কোথাও যাবার তো নেই।

বেল বাজল। উঠে দরজা খুলল রুমা। এণাক্ষী ফ্যাকাসে মুখে তার ঘরে ঢুকল।

রুমা বলল, ‘কী হয়েছে?’

এণাক্ষী বলল, ‘এটা সুবিধার জায়গা মনে হচ্ছে না। আমি কিছুতেই অরিত্রকে ফোনে পাচ্ছি না। এরা ভালো লোক না।’

রুমা বলল, ‘আপনি বসুন। এরকম অস্থির হয়ে যাবেন না।’

এণাক্ষী বলল, ‘বসব? বসব মানে? এখানে আমাকে আটকে রাখবে আর আমি বসে থাকব?’

রুমা বলল, ‘তাহলে কী করবেন? কিছু কি করার আছে?’

এণাক্ষী সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি ওদের দলে আছেন, তাই না?’

রুমা বলল, ‘আমি নিজেই জানি না, কার দলে আছি। কিন্তু এখানে আমি ভালো আছি। আমি বাড়ি যাব না।’

এণাক্ষী বলল, ‘আমি কী করব? আমাকে বাড়ি যেতে হবে।’

রুমা বলল, ‘আপনি দেখুন না কী হয়। আমার তো ভয়ের কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে না।’

রুমের দরজা খুলে দুজন মহিলা ঢুকল। এণাক্ষীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনাকে বলা হয়েছিল নিজের রুমে থাকতে। আপনি বেরিয়েছেন কেন?’

এণাক্ষী রেগে গেল, ‘কেন? আমি কি জেলখানায় আছি?’

দুজন মহিলার কেউ আর কোনও কথা বলল না। একজন এগিয়ে এসে এণাক্ষীর হাত ধরে টান মারল। এণাক্ষী আর্তনাদ করে উঠল, ‘এ কী? এসব কী অসভ্যতা হচ্ছে?’

রুমা বলল, ‘ওকে ছাড়ুন। ধরে নিয়ে যাচ্ছেন কেন?’

দুজনের কেউই উত্তর দিল না। এণাক্ষীকে টেনে ঘর থেকে নিয়ে রুমার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। রুমার ফোন বেজে উঠল।

রুমা সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরল, ‘হ্যালো।’

‘তুমি ভেতর থেকে রুম লক করে রাখো। যে কেউ তোমার রুমে ঢুকে পড়লে সেটা কি তোমার নিরাপত্তার জন্য ভালো হবে?’

রুমা বলল, ‘কিন্তু উনি তো আমার ক্ষতি করতে আসেননি?’

‘সেটা তুমি জানো? কেউ কি জানে কার কী উদ্দেশ্য? কতক্ষণের আলাপ তোমাদের?’

রুমা চুপ করে রইল।

‘রুম লক করে দাও। এখনই। আর আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বে। কাল থেকে তোমার স্পেশাল ট্রেনিং আছে।’

‘কী ট্রেনিং?’ রুমা আগ্রহী কণ্ঠে জিগ্যেস করল।

উত্তর এল না। ফোন কেটে গেল।

রুমা উঠে দরজা বন্ধ করল। সে ঠিক করেছে, এরা যেই হোক, যেমন লোকই হোক, যা বলবে, সে তাই মেনে চলবে।

টিভি বন্ধ করে দিল সে। চোখ বুজল।

বেশ কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল এর আগে। এখন আর ঘুম এল না। এপাশ ওপাশ করতে লাগল। আবার টিভি চালাল। একটাই চ্যানেল চলছে। বাংলা সিরিয়াল হয়ে চলেছে। কিছুক্ষণ সে আগ্রহ নিয়ে দেখল।

উঠে চা বানিয়ে খেল। জানলার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। রাস্তা দিয়ে একটার পর একটা গাড়ি চলে যাচ্ছে। একটা দোকান দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু দোকানের নামটা যে ভাষায় লেখা, সেটা চিনতে পারল না।

৩৮

এপাশ ওপাশ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল রুমা।

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল ঘরের মধ্যে কারো অস্তিত্ব আছে। রুমার স্পষ্ট মনে পড়ল সে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করেছিল। অবশ্য ঘরে ছিটকিনি নেই। তার রুমের চাবি অন্য কারো কাছে থাকলে সে ঘরে ঢুকতে পারবে।

রুমা ভয়ে ভয়ে বলল, ‘কে?’

কেউ কোনও সাড়া দিল না। রুমা উঠে বসল। খাট থেকে নামতে যেতেই কেউ তার মুখে হাত দিল। রুমা ছাড়াতে চেষ্টা করল, পারল না।

তাকে জড়িয়ে ধরে খাটে শুইয়ে দিল।

রুমা অশক্ত নয়। দিব্যেন্দুর মার খেয়ে খেয়ে তার সহ্যক্ষমতা এতদিনে বেশ ভালোই হয়ে গেছে। খাটে পড়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সে সরে গেল।

রুমা চিৎকার করল, ‘কে?’

তাড়াতাড়ি হাতড়ে সুইচগুলো খুঁজতে যাচ্ছিল, এমন সময় আরেকজন এসে তাকে খাটে ফেলে হাত-পা বেঁধে দিল। রুমা চিৎকার করায় তার মুখে কাপড় দিয়ে দিল।

আলো জ্বলে উঠল। রুমা দেখল সকালের লোকটা আর ডাইনিং হলের ম্যাডাম দাঁড়িয়ে আছেন। ম্যাডাম রুমার মুখের কাপড় সরিয়ে দিল। রুমা আর্তনাদ করে উঠল, ‘এগুলো কী?’

লোকটা রুমার হাতের দড়ি খুলে দিতে দিতে বলল, ‘অসহায় লাগছিল না? মনে হচ্ছিল না সব শেষ হয়ে যাচ্ছে?’

রুমা জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছিল। বলল, ‘এগুলো কী ধরনের অসভ্যতা?’

লোকটা বলল, ‘অসভ্যতা না। এটা পার্ট অফ ট্রেনিং।’

রুমা বলল, ‘কীসের ট্রেনিং?’

লোকটা বলল, ‘সব সময় সচেতন থাকার। যেকোনও সময় আঘাত আসতে পারে। প্রস্তুত না থাকলে কী হতে পারতো?’

রুমা বলল, ‘তা বলে এভাবে? কী করতে হবে আমাকে যে এরকম সচেতন থাকতে হবে?’

লোকটা সোফায় বসে বলল, ‘আমাদের হয়ে কাজ করতে হবে। করবে?’

রুমার বুকের ধুকপুকুনি কমছিল না। বলল, ‘কী এমন কাজ যাতে রাতে ঘরে লোক ঢুকে যাবে?’

লোকটা পায়ের উপর পা রেখে বলল, ‘তোমাকে যে কাজ করতে হবে, সে কাজকে বলা হয় হানি ট্র্যাপ। হানি ট্র্যাপের নাম শুনেছ?’

রুমা অবাক হয়ে বলল, ‘মানে?’

লোকটা বলল, ‘বাঘ মারার জন্য হরিণকে বেঁধে রাখা হয়। বাঘ সেই হরিণের গন্ধ পেয়ে তাকে মারতে আসে। শিকারি অপেক্ষা করে মাচায়। শিকারির কাজ হয় বাঘকে ওই সময়ে মেরে ফেলা। তোমাকে হরিণ হতে হবে।’

রুমা বড় বড় চোখ করে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল।

লোকটা বলল, ‘বাঘের আঁচড়ে হরিণ আহত হয়, মরেও যেতে পারে। কিন্তু সে মরে গিয়ে একটা গোটা গ্রাম বা শহরকে বাঁচিয়ে দিয়ে যায়। কাজে প্রচুর রিস্ক। কিন্তু সফল হতে পারলে তার থেকে ভালো আর কিছু হতে পারে না। তুমি সুন্দরী, তোমার অনেক দূর যাওয়ার ক্ষমতা আছে। তোমার হাজব্যান্ড তোমাকে প্রচুর যন্ত্রণা দিয়েছে। আমরা সুযোগ দিচ্ছি। তুমি কি এ সুযোগ নিতে প্রস্তুত?’

রুমা মাথা নিচু করল। কয়েক সেকেন্ড পর মাথা তুলে বলল, ‘তার মানে আমাকে শরীর বেচতে হবে। তাই তো?’

লোকটা মাথা নাড়ল, ‘শরীরকে শরীরের মতো দেখলে তাই মানে দাঁড়ায় বইকি। তুমি যার সঙ্গে সংসার করছিলে, সেখানেও কি একরকম শরীর বেচতে হয়নি?’

রুমা বলল, ‘এই জন্যই আমাকে এত দয়া করে নিয়ে এসেছিলেন, খেতে দিয়েছিলেন, এত ভালোভাবে রেখেছেন, তাই তো?’

লোকটা বলল, ‘খানিকটা তাই। আবার খানিকটা না। তোমাকে আমি অপশন দেব।’

রুমা কৌতূহলী হল, ‘কী অপশন?’

লোকটা বলল, ‘তোমাকে আমরা একটা হোমে পুনর্বাসন দিতে পারি। সারাদিন ওখানে হাতের কাজ করবে, একটা নিশ্চিন্ত জীবন পাবে। নিজের মতো করে থাকতে পারবে। অথবা, আরেকটা জীবন দিতে পারি, যেখানে তুমি নিজের জীবনের বিনিময়ে অসংখ্য মানুষের কাজে আসতে পারবে।’

রুমা বলল, ‘আমি হোমে যাব। এই কাজ করব না। এভাবে একেকজন এসে শরীর নিয়ে জ্ঞান দেবে, আমি শুনব না। কিছুতেই না।’

লোকটা হাসি মুখে রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাল সকালেই তোমাকে একটা ভালো সরকারি হোমে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। ভালো থেকো রুমা।’

রুমা অবাক হয়ে বলল, ‘এত তাড়াতাড়ি রাজি হয়ে গেলেন? কোনও জোর করলেন না?’

লোকটা বলল, ‘কাজটা জোরের নয়। তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তোমাকে এই কাজে নামাব না।’

রুমা বলল, ‘আর ওই মহিলাকে? যাকে আটকে রেখে দিয়েছেন?’

লোকটা বলল, ‘বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এতক্ষণে রওনা হয়ে গেছেন।’

রুমা বলল, ‘বিশ্বাস করছি না। এখন আমার আপনাদের বিশ্বাস হচ্ছে না।’

লোকটা উঠে দাঁড়াল, ‘তুমি হোমে যেতে চাইছ রুমা। আমার কথায় বিশ্বাস কর আর না কর, তাতে কিছু যায় এসে না। ভালো থেকো। আমি আসি।’

ম্যাডামকে নিয়ে লোকটা বেরিয়ে গেল। রুমা হতভম্ব হয়ে বসে রইল।

৩৯

ভাত খেয়ে দিব্যেন্দু কার্ড বোর্ডের উপরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। এত ক্লান্ত ছিল, একবারও ঘুম ভাঙেনি।

সুখেন ডেকে দিল, ‘ওঠো। মামা ওঠো। ঘুমিয়ে থাকলে হবে না। পালাও।’

দিব্যেন্দু ধড়মড় করে উঠে বসল, ‘কেন? কী হয়েছে?’

সুখেন বলল, ‘এখানকার লোকজন তোমায় খুঁজছে মানে খবর আছে। এখন ভোর হচ্ছে। এখানে রাত শুরু হবে। এরা এখন ঘুমোবে। তুমি কেটে পড়। নইলে তোমায় কোথায় নিয়ে কী চুলকে দেবে কেউ জানে না। লুকা সাঁতরাকে তো চেনো না।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘লুকা সাঁতরা কে?’

সুখেন বলল, ‘আছে একজন। চুলকানি পাবলিক। ঠিক ঠাক চুলকে দিলে সারাজীবন পৃথিবীর সব চুলকানির মলম লাগালেও সে ব্যথা কমবে না। চল। তুমি ঢ্যামনা হতে পারো, কিন্তু চোখের সামনে একটা লোকের মার গাঁড়া যাবে, সেটা আমি দেখতে পারব না। চল চল।’

দিব্যেন্দুকে টানতে টানতে ঝুপড়ি থেকে বের করল সুখেন। দিব্যেন্দু ক্ষীণ গলায় বলল, ‘আমার হাগা পেয়েছে।’

সুখেন বলল, ‘উফ! কী ঝামেলা! যাও, ওই রাস্তার হাই ড্রেনে গিয়ে ঝেড়ে আসো। কেউ নেই এখন। যাও যাও।’

দিব্যেন্দু কাতর চোখে তাকাল। সুখেন বলল, ‘কিছু করার নেই, আমরাও এভাবেই করি। সব ইতর লোক এখানে। যাও মামা।’

সুখেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানতে লাগল।

দিব্যেন্দু মিনিট পাঁচেক পরে ধুঁকতে ধুঁকতে এল। সুখেন বলল, ‘হাত ধুয়েছ?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘সাবান কোথায়?’

সুখেন বলল, ‘ফাইভ স্টারে এয়েচো মামা? মাটিতে হাত মুছে কলে হাত ধোও।’

দিব্যেন্দু সুখেনের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে তাই করল। সুখেন বলল, ‘আজিব চিজ মাইরি একটা। হাতুড়ি মেরে বেড়ায়। চল।’

সুখেন হাঁটতে শুরু করল। দিব্যেন্দু সুখেনের পেছন পেছন হাঁটছিল। কিছুক্ষণ পরে বড় রাস্তায় উঠে সুখেন সন্তর্পণে চারদিকে তাকাল। বলল, ‘নাহ্‌। ঠিক আছে। এস। বাস স্ট্যান্ডে বোস। বাস এলে চলে যাবে।’

দিব্যেন্দু বাস স্ট্যান্ডে বসল। সুখেন বলল, ‘চলে যেতে পারবে তো?’

দিব্যেন্দু বিড় বিড় করে বলল, ‘টাকা নেই। সব নিয়ে নিয়েছে।’

সুখেন বিরক্ত মুখে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে একশো টাকার একটা নোট বের করতে যাচ্ছিল, এমন সময় একটা টাটা সুমো এসে দাঁড়াল। সুখেন সুমোটার দিকে তাকিয়েই, ‘মাড়িয়েছে’ বলে তেড়ে দৌড় মারল। দিব্যেন্দু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিল। গাড়ির দিকে তাকাল। দুজন ষণ্ডা লোক গাড়ি থেকে নেমে কলার ধরে কুকুরের মতো করে দিব্যেন্দুকে গাড়িতে তুলল। দিব্যেন্দু চিঁচিঁ করে বলল, ‘ছেড়ে দাও আমাকে। আমি কিছু করিনি। ছেড়ে দাও।’

সুখেন দৌড়ে খানিকটা দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। গাড়ির ভেতর থেকে একজন চিৎকার করল, ‘তুই কাল ঢপ মারলি তো? তোকে দাদা বুঝে নেবে।’

সুখেন কান ধরল। গাড়ি স্টার্ট দিল। দিব্যেন্দু চিৎকার করল, ‘আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? পুলিশ! পুলিশ।’

মাথায় একটা গাট্টা পড়ল তার, ‘চিল্লাবি না। চিল্লালে মটকা গরম হয়ে যায়। তোকে ভালো জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘কোথায়? কিডনি বেচবেন? চোখ বেচবেন? আমার কিডনি ঠিক নেই, বিশ্বাস করুন। দিনে অনেকবার হিসি পায়।’

গাড়ির ভেতরে সব লোক হো হো করে হেসে উঠল। একজন তার গাল টিপে দিয়ে বলল, ‘সোনা আমার, মানিক আমার। তোমায় কেন বেচবো? তোমার বিচি খুলে নিয়ে আমরা মারবেল খেলব। একদম চিন্তা কোরো না সোনা। তোমাকে তোমার মামা বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আমার মামা-মামি সব মরে গেছে। মাইরি বলছি, বিশ্বাস করুন।’

গাড়ির ভেতর সবাই জোরে জোরে হাসতে শুরু করল।

কেউ কেউ দিব্যেন্দুর চুল টানতে লাগল, কেউ আবার গাল টিপে দিল। কেউ হঠাৎ করে দিব্যেন্দুর গালে চুমু খেল। দিব্যেন্দু চিৎকার করতে লাগল, ‘এটা ভালো হচ্ছে না কিন্তু। কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়?’

একজন বলল, ‘গরিলা দিয়ে তোমায় মাড়াবো বাওয়া।’

দিব্যেন্দু ভয়ে সিঁটিয়ে গাড়ির মধ্যে বসে রইল।