৪৫
টিভিতে খবরটা মাঝে-মাঝেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখাচ্ছে। কুড়িজন ছাত্রসহ বাস নিখোঁজ হয়ে গেছে। বৃষ্টি নেমেছে। বাইরেটা সাদা হয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির ধোঁয়ায়।
নির্মল তার স্ক্র্যাপ বুক বের করল। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খবর সে এই স্ক্র্যাপবুকে আঠা দিয়ে চিপকে রাখে।
মৌলানা বজলুদ্দিনের একটা উক্তি সে নিজেই লিখে রেখেছিল। বজলুদ্দিন একটা সময়ে আওয়াজ তুলেছিল, এ দেশ পাকিস্তানকে ফিরিয়ে দিতে হবে নিজের সৈনিকদের জন্য। তখনই একটা সমাবেশে বজলুদ্দিন একটা কথা বলেছিল, ‘আমাদের সৈন্য দরকার। ছোট থেকে যেখানে যত লোক আছে, তাদের জড়ো করো। বিরাট সৈন্য দরকার। তাদের একসঙ্গে এনে পাকিস্তান তৈরি করতে হবে।’
নির্মল নিজের মনেই বলল, ‘একজ্যাক্টলি সেম মডেল ফলো করছে। কোনও ছেলে হারায়নি। এরা এদের ব্রেন ওয়াশ করে কোথাও পাঠাবে এবার। কোথায় পাঠাবে? কে রিকুইজিশন করেছে? এতগুলো ছেলেকে কোনও জায়গায় পাঠাতে গেলে প্রচুর টাকা লাগবে। টাকার সোর্স কে? সাদিক?’ উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়াল সে। পায়চারি করতে শুরু করল, ‘সাদিক টাকা একসঙ্গে করছে, বা সাদিকের কাছে টাকা আসছে। সে টাকা যাচ্ছে এই ধরনের ছেলেদের ট্রেনিং-এর কাজে। ট্রেনিং অনেকেই দিতে পারে, আইসিস হতে পারে বা এই ধরনের কোনও সংগঠন। উফ! আমি কী করব এবারে?’
দেওয়ালে জোরে ঘুষি মারল নির্মল। এভাবে হবে না। ঘরে বসে থাকলে কিছুতেই হবে না। মোখলেসকে ফোন করল সে। মোখলেস সঙ্গে সঙ্গে ফোন তুলল, ‘জি স্যার।’
নির্মল বলল, ‘সাদিকের বাড়ি থেকে কত দূরে আছ?’
মোখলেস বলল, ‘ফুটপাথেই আছি। ঝুপড়ির ভিতরে। কেউ নাই এখন।’
নির্মল বলল, ‘আমার সেসব জানার দরকার নেই। পাখি বেরিয়েছে?’
মোখলেস বলল, ‘না স্যার। পাখি সকাল থেকে বেরোয় নাই।’
নির্মল একটু থমকে গিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। রাখছি।’
সাদিকের কারখানাগুলোর তালিকা করেছে সে। শহরের বাইরে একটা কারখানা আছে। বাস যদি সেখানে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তো অসুবিধা হবার কথা না! কিন্তু নিশ্চিত হবে কী করে যে সাদিকের কাছেই গেছিল?
তার মাথায় সাদিক ছাড়া অন্য কেউ আসছে নাই বা কেন? হতেই পারে সাদিক কিছু করেনি এখানে। কুড়িটা ছেলেকে নিয়ে বাসটা কেউ অপহরণ করেছে। করলে অবশ্য এতক্ষণে মুক্তিপণের দাবি আসত। তাও খটকার জায়গা হল, কিডন্যাপাররা কিডন্যাপ করলে বড়লোকদের বাড়ির বাচ্চাদের কিডন্যাপ করবে। গরিব, আধা এতিম, দুঃস্থ মাদ্রাসা ছেলেদের কেন কিডন্যাপ করতে যাবে? ধাঁধার উত্তর একটাই, বাস হারায়নি। ছেলেগুলো অন্য কোথাও গেছে।
ঘরে থাকতে ইচ্ছে করছে না। অথচ ধরা পড়লে সোবাহান সাহেব অন্য সমস্যায় ফেলতে পারেন। কী যে করে!
বিরক্ত হয়ে স্ক্র্যাপবুকটাই ঘাটতে শুরু করল সে। আরেকটা নিজের হাতে বানানো নোট পেল, জাহির স্যারের, ‘সমস্যায় পড়লে ফোন করবে। আমি আছি।’
জাহির…ইনি আনোয়ার সাহেবের বন্ধু। এক পার্টিতে দেখা হয়েছিল। জাহির বলেছিলেন নির্মলকে তার পছন্দ হয়েছে। পরে কথা বলবেন। পরে আর কথা বলা হয়নি। এঁর সঙ্গে কি কথা বলবে? অনেক উঁচু পদে আসীন। কথা বলবে? না বলবে না? বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নির্মল ঠিক করল ফোন করবে। ফোনবুকে নাম্বার পাওয়া গেল। সে খানিকটা ইতস্তত করেই ফোন করল, কয়েকটা রিং হবার পর জাহির ফোন ধরলেন, ‘বলুন নির্মল।’
নির্মল বিস্মিত হল, ‘আমার নাম্বার আপনার ফোনে সেভ আছে স্যার?’
জাহির হাসলেন, ‘তুমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। তোমার নাম্বার সেভ থাকবে না, তা কি হয়? বলো কী হয়েছে।’
নির্মল বলল, ‘স্যার দেখা করা যাবে?’
জাহির বললেন, ‘শিওর। কখন বলো।’
নির্মল বলল, ‘এখনই?’
জাহির বললেন, ‘আমার অফিসে চলে এস। বুঝতেই পারছি খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনও কথা হবে। চলে এস।’
ফোন রেখে নির্মল দ্রুত তৈরি হয়ে বেরিয়ে গাড়ি স্টার্ট করল। হৃদস্পন্দন বেড়ে চলেছে তার, কেমন জ্বর জ্বর লাগছে।
খানিকটা পথ যেতে ফোন বাজতে শুরু করল। নির্মল দেখল সোবাহান ফোন করছে। ধরল সে, ‘হ্যালো।’
‘তুমি অফিস ছুটি নিলে হঠাৎ?’
নির্মল বলল, ‘শরীর ভালো লাগছে না স্যার।’
‘বেরিয়েছ কেন?’
নির্মল থমকে গেল। তার ফোন ট্যাপ হয়েছে? এখন ফলো করছে তাকে?
.
৪৬
তুষার চুপ করে বসে আছেন।
অনিল শেখাওয়াত বেশ কয়েকবার ফোন করেও দিল্লিতে কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।
তুষার বললেন, ‘অকারণ চেষ্টা করে যাচ্ছ। তোমার সঙ্গে কেউ কন্ট্যাক্ট করবে না। আমি চার্জ হ্যান্ডওভার করে নিতে চাইছি। দেরি করলে ক্ষতিটা আমাদেরই। তোমার পাঠানো এক এজেন্ট আই এস আইয়ের হাতে পড়েছে। জানো সেটা?’
শেখাওয়াত হাল ছেড়ে দিলেন। ফোনটা খাটে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ। জানি। আমার আরেক এজেন্টকে মেরেও দিয়েছে।’
তুষার বললেন, ‘এরা কেউ স্লিপিং ছিল না? সব স্লিপিং সেলগুলোকে তুলে নিয়েছ নাকি?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘কী করতাম? আই এস আই ম্যাক্সিমাম ম্যান পাওয়ার তুলতে শুরু করছে বাংলাদেশ থেকে। আমরা বসে থাকব?’
তুষার ভ্রু কুঁচকালেন, ‘কবে থেকে হচ্ছে এসব? এগুলো মিনিস্ট্রি জানে?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘তুমি সব মিনিস্ট্রিকে জানাও? পলিটিকাল লোকেরা সব জানলে তোমার চলবে তো?’
তুষার শ্বাস ছাড়লেন, ‘ওকে। তা ঠিক করেছ। তোমার এজেন্টকে ওরা ধরল কেন?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘আমি জানি না কীভাবে ধরল। ধরার কথা না। নিশ্চয়ই বোকার মতো কাজ করেছে মেয়েটা।’
তুষার চোখ বড় বড় করলেন, ‘মেয়ে? বাংলাদেশে কোন মেয়ে আছে? আমি কোনও মেয়েকে ট্রেইন করিনি বাংলাদেশের জন্য। কবে হয়েছে এসব?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘আমি ট্রেন করে পাঠিয়েছি। নতুন মেয়ে।’
তুষার বললেন, ‘নতুন মেয়ে? কত দিনের ট্রেনিং?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘ছ’মাস। এনাফ ফর হার। শি ইজ টাফ।’
তুষার বললেন, ‘ওকে। কোথায় পাঠিয়েছ?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘সাদিক শেখের ব্রথেলে।’
তুষার কয়েকসেকেন্ড শেখাওয়াতের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যদি কোনও রোগ ধরে, তখন?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘ওহ, কোন যুগে পড়ে আছ তুমি? দেশের জন্য এটুকু করতে পারবে না?’
তুষার শ্বাস ছাড়লেন, ‘দেশের নাম করে আর কী কী করেছ তুমি? জাল নোট ছড়ানোর কাজ করেছিলে বর্ডারে, আমি সেটা জানি। সেটা কেন করেছিলে?’
শেখাওয়াত কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘ওই সাদিকের বিশ্বাস অর্জনের জন্যই। বড় মাছ। খুব বড় মাছ। ঢাকায় আই এস আই ছাড়াও অনেক কিছুর সঙ্গে যুক্ত। আমার এজেন্টরা ওর গতিবিধির রিপোর্ট আমার কাছে পাঠায়। তোমাকে সব দিয়ে দেব, দেখে নিও।’
তুষার বললেন, ‘আর কোনও এজেন্ট?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘অমল।’
তুষার উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন, ‘তুমি অমলকে অ্যাক্টিভেট করে দিয়েছ?’
শেখাওয়াত পকেট থেকে একটা চিউইং গাম বের করে তার মোড়ক খুলে গামটা অর্ধেক করে তুষারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘চিবোও। উত্তেজিত হচ্ছ কেন? শোন যেটা বলছি।’
তুষার চিউইং গামটা নিয়ে চিবোতে শুরু করলেন, ‘কবে করেছ?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘ঢাকার চার্জ নিয়েই। অমলকে আমার দরকার ছিল। অমল ছাড়া সাদিক আর তারেকের কীর্তি কেউ জানত না। অমল ওর মতো করে সাদিকের দলে ভিড়েছে। সাদিকের হয়ে কাজ করে, সাদিকের হোয়ার অ্যবাউটস আমাদের পাঠায়।’
তুষার পায়চারি শুরু করলেন, ‘অমল কোথায় এখন?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘জানি না।’
তুষার দাঁড়িয়ে গেলেন সঙ্গে সঙ্গে, ‘জানো না মানে?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘সাদিকের এক সাগরেদকে অমল আর রাণা উড়িয়েছে। ওর ডেরায় রেইড হবার পর থেকে ওরা নিখোঁজ আপাতত।’
তুষার বিস্ফারিত চোখে বললেন, ‘অমলের কভার এক্সপোজ হয়ে গেছে?’
শেখাওয়াত আমতা আমতা করে বললেন, ‘সেটা এখনও কনফার্ম নই।’
তুষার বললেন, ‘আর এই রাণা কে?’
শেখাওয়াত কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, ‘ওকেও নতুন পাঠানো হয়েছে। কাজ শেখানোর জন্য।’
তুষার শেখাওয়াতের সামনে বসলেন, ‘কতদিন ট্রেনিং?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘একদিনও না। অমল শেখাবে বলে পাঠানো হয়েছে।’
তুষার বললেন, ‘তোমার নতুন রিক্রুটদের ব্যাপারে অ্যাপ্রুভালগুলো কে করেছিল?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘তার কেন দরকার হবে? আমরা ইন্ডিপেন্ডেন্ট বডি। আমায় কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না।’
তুষার হাত দিয়ে মাথার চুল ঠিক করতে লাগলেন। শেখাওয়াত বললেন, ‘রাণা ইজ গুড। ভেরি গুড। ওই তারেককে সরিয়েছিল।’
তুষার বললেন, ‘তারেককে কন্ট্র্যাক্ট কিলার সরিয়েছিল।’
শেখাওয়াত বললেন, ‘এই সেই কন্ট্র্যাক্ট কিলার।’
তুষার আবার উঠে দাঁড়ালেন। চুইং গামটা মুখ থেকে বের করে ডাস্টবিনে ফেলে ইলেকট্রিক কেটলিতে জল গরম করে চা বানালেন। টি ব্যাগ গরম জলে নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘এজেন্সির অবস্থা এত খারাপ ছিল জানতাম না তো! কন্ট্র্যাক্ট কিলার পাঠিয়ে দিচ্ছ, মেয়েটার হেলথের কেয়ার না করে সাদিকের ব্রথেলে পাঠিয়ে দিলে, এবার কী হবে? মেয়েটার কী হবে?’
শেখাওয়াত চুপ করে রইলেন। তুষার চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘সাত আট নাম্বারের ব্যাটসম্যানকে হঠাৎ করে ফার্স্ট ডাউনে ব্যাট করতে পাঠানো হতো কয়েকটা শট খেলার জন্য। তাদের বলা হতো পিঞ্চ হিটার। ঢাকায় তুমি পিঞ্চ হিটার পাঠালে কেন? কাকে মারতে?’
শেখাওয়াত একটু চমকে উঠে সামলে নিয়ে বললেন, ‘মারতে পাঠাইনি। ছেলেটার কাজ ক্লিন। আমি দেখেই নিয়েছি। হি ইজ গুড, বিলিভ মি।’
তুষার সন্দিগ্ধ চোখে শেখাওয়াতের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তার মনে প্রশ্নের ঝড় উঠছে। কিছু একটা জিগ্যেস করতে গিয়েও চুপ করে গেলেন তিনি।
তার মনে হল শেখাওয়াত কিছু একটা লুকোচ্ছে। কী লুকোচ্ছে সেটাই বুঝতে চাইছিলেন তিনি…।
.
৪৭
ইমতিয়াজ গাড়ি চালাচ্ছে। অমল ইমতিয়াজের পাশে বসে আছে।
রাণা গাড়ির পেছনে। তার পকেটে ইমতিয়াজের দেওয়া রিভলভার। যন্ত্রটা পকেটে এলেই রাণার হাত নিশপিশ করতে থাকে। মানুষের জীবনটা বড় অদ্ভুত। একটা সময় অবধি মানুষ একটা পিঁপড়ে অবধি মারতে ভয় পায়। সেই মানুষটাই যখন রক্তের স্বাদ পায়, তখন আরেকবার রক্তের স্বাদ না পাওয়া অবধি সে ছটফট করতে থাকে।
রাণা বুঝতে পাচ্ছিল তার অস্বস্তি হচ্ছে। তার রক্তই তাকে সব কিছু ভুলিয়ে দিচ্ছে।
ইমতিয়াজ বলল, ‘চার ঘণ্টার ব্যাপার। বেশিক্ষণ লাগার কথা না। তাও রাস্তার কথা তো বলা যায় না। কখন মামাদের ইচ্ছে হবে গাড়ি সার্চ করার। রাণা ঘাবড়িও না।’
রাণা পাত্তা দিল না। ভয় পাবার কিছু নেই। অহেতুক ভয় পেতে যাবে কেন? অমল তখন বাইরের ঘরে ছিল। ইমতিয়াজ গলা নামিয়ে বলল, ‘রাস্তায় কাজটা করতে চাইলে করতে পারো। আমি সামলে নেব। উস্তাদকে বলে না হয় তোমাকে ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দেব কিছুদিনের জন্য।’
রাণা অবাক হয়ে বলেছিল, ‘আর সাকিনা?’
ইমতিয়াজ বলল, ‘ও দিল্লি সামলে নেবে।’
রাণা কিছু বলেনি। চুপ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছিল।
এখন অমলের সঙ্গে কেমন সুন্দর করে কথা বলছে ইমতিয়াজ। অমল কি জানে ইমতিয়াজ আসলে তাকে মারতে বলছে? অদ্ভুত একটা পরিস্থিতি তো! লাইব্রেরিতে পড়া ঠগিদের গল্প মনে পড়ে গেল তার।
ঠগিরা তো এমনই ছিল। সর্বক্ষণ বন্ধুর মতো পাশে থাকত। গল্প করত। একসঙ্গে খেত। তাদের শিকারকে তারা তারিয়ে তারিয়ে খেলাত। তাদের ওভাবেই আত্মগোপন করে বন্ধু সেজে শিকারের সঙ্গে ঘুরতে ভালো লাগত। একটা সময় মওকা বুঝে পেছন থেকে গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে দিত। অদ্ভুত একটা ঠান্ডা টাইপের দল ছিল তাদের। নিজেকে ঠগি বলে মনে হচ্ছিল রাণার।
অমল চিন্তিত গলায় বলল, ‘ঢাকায় গিয়াস এলে কোথায় থাকতে পারে? সাদিকের কাছে থাকার রিস্ক কি ও নেবে? আসগরের ঘটনার পর সাদিকের ক্রেডিবিলিটি কমার চান্স আছে।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘সাদিককে ফোন করতে পারো তো। খোঁজ নাও।’
অমল বলল, ‘করব?’
ইমতিয়াজ বলল, ‘হ্যাঁ, করো। বেশি দূরে থাকলে সন্দেহ বাড়বে। অবশ্য জানি না এখন কী সিচুয়েশন আছে।’
অমল পকেট থেকে ফোন বের করে সাদিককে ফোন করল। একবার রিং হতেই সাদিক ফোন ধরল, ‘সালাম ওয়ালাইকুম রুমানভাই। আপনি নেই, আমার অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারছি না কী করে সামাল দিব।’
গলাটা আন্তরিকই শোনাল। অমল বলল, ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম। কী আর বলি বলেন তো ভাই, আমার ফ্ল্যাটে পুলিশ দেখার পর থেকে আমার মাথার ঠিক নাই। খুব ভয় লাগতাসে ভাই।’
সাদিক বলল, ‘আপনেরা আমার কাছে চলে আসেন মিয়াঁ। কুনো হালার পুত আপনাগো গায়ে হাত দিতে পারব না। আমি কইতাছি। আমার ওয়াদা রইল। কই আছেন কন, আমি গাড়ি পাঠাইতেছি।’
অমল বলল, ‘দরকার নাই ভাই। আমি আসতাছি আপনার বাসায়।’ অমল গলায় কান্না নিয়ে এল, ‘আসগরের লইগা খুব মন খারাপ লাগে ভাই।’
সাদিক বলল, ‘ভাববেন না ভাই, আপনি আসেন। আমি সব সামলায়ে নিতাছি। অনেক কাম আছে ভাই, আপনি ছাড়া হবে না।’
অমল বলল, ‘আইতাছি ভাই। আইতাছি।’
ইমতিয়াজ আয়নায় রাণার দিকে তাকাল। রাণার চোখে পড়ল ইমতিয়াজ তাকে দেখছে। ইমতিয়াজ চোখ নামিয়ে বলল, ‘খুব ভালো সেটিং করে ফেলেছ যাই হোক।’
অমল বলল, ‘নাটক নাকি বুঝতে পারলাম না। হি ইজ আ টাফ নাট টু ক্র্যাক। দু-তিন বার দেখেছি, এভাবেই নিজের লোকেদের ডেকে এনে হাপিশ করে দিত। ভেরি শ্রুড ব্রেইন। ওকে অত তাড়াতাড়ি পড়ে নেওয়া অসম্ভব।’
ইমতিয়াজ হঠাৎ গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল রাস্তার পাশে। অমল বলল, ‘কী হল?’
ইমতিয়াজ দাঁত বের করল, ‘হালকা হই।’ ইমতিয়াজ গাড়ি থেকে নেমে গেল।
অমল বলল, ‘সাদিকের কাছে যাওয়া ঠিক হবে রাণা? তোমার কী মনে হয়?’
রাণা বলল, ‘আমার থেকে আপনি ওকে বেশিদিন চেনেন। আপনি যা বলবেন তাই করা যাবে।’
অমল বলল, ‘তোমার ইন্সটিংক্ট কী বলছে?’
রাণা বলল, ‘সাকিনাকে বাঁচাতে হলে যেতেই হবে। না গিয়ে উপায় নেই। ওকে ছাড়া সাকিনার কাছে পৌঁছনোর উপায় আছে কি?’
অমল ঘাড় নাড়ল, ‘রাইট। মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে। ওভাবে জানোয়ারদের হাতে মেয়েটাকে ছাড়া যাবে না।’
রাণা আরও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। অমল ঠিক কী করেছে যার জন্য এরা এভাবে…?
.
৪৮
জাহির হোসেন চেম্বারেই ছিলেন। তার সেক্রেটারিকে গিয়ে নাম বলায় চেম্বারে প্রবেশের অনুমতি মিলল।
জাহির নির্মলকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন, ‘এস এস। কী সৌভাগ্য আমার, তুমি এখানে এসেছ।’
নির্মল লজ্জা পেল, ‘এরকম বলবেন না স্যার। আমি নিতান্ত নিরূপায় হয়েই আপনার কাছে এসেছি।’
জাহির বললেন, ‘বোস।’
নির্মল বসল। জাহির বললেন, ‘বলো কী হয়েছে।’
নির্মল একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘স্যার, আমার মনে হয় না আনোয়ার সাহেবের মৃত্যুটা স্বাভাবিক।’
জাহির ভ্রু কুঁচকালেন, ‘কেন এরকম মনে হচ্ছে?’
নির্মল বলল, ‘সাদিক শেখের নাম জানেন?’
জাহির বললেন, ‘কে সে?’
নির্মল বলল, ‘একজ্যাক্টলি স্যার। সাদিক শেখ এই সেদিনও কী করত আমরা কেউ জানতাম না। আমি জানলাম, আনোয়ার সাহেব জানলেন, তার ঠিক পরেই সাহেবের অকস্মাৎ মার্ডার…তারপর থেকে ক্রমাগত আমি থ্রেট পাচ্ছি একটা জায়গা থেকে, আমাকে হঠাৎ করে ট্রান্সফার করে দেওয়া হয়েছে। আমি বুঝতেই পারছি না আমি ঠিক কী করব এখন। এত কিছুর পরে আবার আজকে দেখলাম কুড়িটা ছাত্র নিয়ে একটা বাস নিখোঁজ হয়ে গেছে। আমি কোনও দিশা না পেয়েই আপনার কাছে এলাম স্যার।’
জাহির পেপারওয়েট হাতে নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, ‘তুমি বলছ আনোয়ার সাহেব সাদিক শেখের ব্যাপারে জানার পর মার্ডার হলেন। সাদিক শেখটা কে?’
নির্মল বলল, ‘যার কয়েক কোটি টাকা ব্ল্যাক ট্রানজাকশান চলছে বিদেশের কয়েকটা দেশের সঙ্গে অথচ আমাদের কর দফতর যার ব্যাপারে লিস্ট ইন্টারেস্টেড। যখনই আমি ওর সাগরেদ আসগর খুনের পর কেসটা তদন্ত করতে শুরু করি, একটার পর একটা অদ্ভুত তথ্য সামনে আসতে শুরু করল। কিন্তু বাধা পাচ্ছি প্রতি মুহূর্তে। এখন মনে হচ্ছে আমারই বোধ হয় লাইফ থ্রেট…’
জাহির জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, ‘একবারেই না, ওসব ভেব না। ভালো হয়েছে তুমি আমার কাছে এসেছ। আমি বিষয়টা দেখছি। বাই দ্য ওয়ে, সোবাহানকে তো টেম্পোরারি পোস্ট দেওয়া হয়েছে, সে তো রীতিমত পাকিস্তানপন্থী লোক, সবাই জানে সেটা। সে লোক তোমার পেছনে লাগবে সেটা জানা কথা…ওয়েট।’
জাহির সোবাহানকে ফোন করে ফোন স্পিকারে দিলেন। সোবাহান ধরলেন, ‘সালাম ওয়ালাইকুম সাহেব।’
জাহির প্রত্যুত্তরে সালাম জানিয়ে বললেন, ‘ম্যাডাম আপনার খবর নিচ্ছিলেন জনাব।’
সোবাহান বললেন, ‘ম্যাডাম মানে? পিএম?’
জাহির বললেন, ‘হ্যাঁ। কেমন চলছে ইত্যাদি। উনি কয়েকজন পাকিস্তানপন্থী রাজাকারদের ব্যাপারে ইতিমধ্যেই বেশ বিরক্ত হয়েছেন। কয়েকটা সিক্রেট রিপোর্ট এসেছে ওর কাছে। আপনি জানেন তো?’
সোবাহান উত্তেজিত গলায় বললেন, ‘আপনার কাছে মালাউনটা গেছে, না? আমি জানি তো, ও আপনার কান ভারি করছে।’
জাহির গলা খাকরে বললেন, ‘মালাউন? আপনি ওই পদে থেকে এই শব্দটা ইউজ করছেন? আপনি জানেন তো এই শব্দটার ব্যাপারে ম্যাডাম কতটা স্ট্রিক্ট?’
সোবাহান বললেন, ‘জনাব আপনি আমার কথা শুনুন। আমি যেটা বলছি, সেটা শুনুন। আমরা একসঙ্গে বসতে পারি। কথা বলতে পারি। সাহেব, দেশটা তো আমারও, তাই না?’
জাহির বললেন, ‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি ভুলে যাচ্ছেন কেন আপনি যে পদে আছেন সে পদটা আপাতত টেম্পোরারি? সাদিক শেখের ফাইলগুলো কোথায়?’
সোবাহান আমতা আমতা করতে শুরু করলেন। জাহির বললেন, ‘এখন দুপুর দুটো বাজে। আমি তিনটে অবধি আমার চেম্বারেই বসে আছি। আপনি সশরীরে এসে সাদিকের সম্পর্কে রিপোর্ট দিয়ে যাবেন।’
সোবাহান বললেন, ‘আপনার কাছে নির্মল বসে আছে তো? ওর কাছেই সাদিকের সব রিপোর্ট আছে।’
জাহির ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘একজন এফিশিয়েন্ট অফিসারকে আপনি অকারণে হ্যারাস করছেন, তাকে ফলো করছেন, সম্ভবত তার ফোন ট্যাপও করছেন। আপনি যদি ভেবে বসে থাকেন যা ইচ্ছে তাই করবেন, আপনার হাতে অগাধ ক্ষমতা আছে, তাহলে আপনি মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। আমার ডেস্কে দুপুর তিনটের মধ্যে সাদিক সম্পর্কিত সব ডকুমেন্ট চাই। নইলে আপনি ওই সময়েই পদত্যাগ করবেন প্রেস ডেকে। অ্যাম আই ক্লিয়ার?’
বলেই ফোন কেটে দিলেন। জাহির নির্মলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ভয় কমেছে?’
নির্মল হেসে ফেলল।
জাহির বললেন, ‘নির্ভয়ে কাজ করো। আমি আছি। এসব সোবাহান দিয়ে বাংলাদেশ চলবে না। ওসব গল্প একাত্তরেই শেষ হয়ে গেছে। রাইট?’
নির্মল ঘাড় নাড়ল, ‘রাইট স্যার।’
.
৪৯
জল পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা।
বাথরুমের মেঝেতে পড়ে আছে রুমা। সাদা ধবধবে টাইলসের উপরে সে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে শুয়ে।
চোখ খুলতে কষ্ট হচ্ছে। কোনমতে চোখ খুলে দেখল তাকে বাথরুমে ফেলে রেখে গেছে। হাতটা কি ভেঙে গেছে? কী প্রবল যন্ত্রণা হচ্ছে!
শরীরটা ঘষে ঘষে কলের তলায় পৌঁছে মাথা দিল সে।
চুলটা একটু একটু করে ভিজছে।
দিব্যেন্দুর কথা মনে পড়ছে। দিব্যেন্দুও একবার তাকে বাথরুমে আটকে রেখেছিল। বিয়ের প্রথম প্রথম। সেদিনই সম্ভবত বলে দিয়েছিল তার প্রথম প্রেমের কথা। আবেগের বশে। দিব্যেন্দুকে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করেনি সে! কী ভালো ভালো কথা বলত ছেলেটা!
‘এ তো কিছুতেই হতে পারে না তোমার জীবনে আমিই প্রথম পুরুষ। মানুষের জীবন দীর্ঘ হয়। সে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে এই সময় দেখা করে। তোমারও নিশ্চয়ই কারো না কারো সঙ্গে দেখা হয়েছিল। হতেই পারে। এ নিয়ে চিন্তার তো কিছু নেই। হিংসার কথা তো থাকতেই পারে না!’
রুমা গড় গড় করে বলে দিয়েছিল। দিব্যেন্দু শুনে হাসি হাসি মুখে বসে রইল।
.
রাত দশটা নাগাদ রুমা টিভি দেখতে বসেছিল। বৃষ্টি হচ্ছিল তখন বাইরে। বাজ পড়ছে। কী মনে হতে উঠে টিভি বন্ধ করে সবে প্লাগটা খুলেছে, হঠাৎ পিঠে কে যেন সজোরে চাপড় মারল। সে ছিটকে গিয়ে মেঝেতে পড়ল।
‘খানকি মেয়েছেলে, আমার সঙ্গে বিয়ে করেছিস তুই? চরিত্রহীন কোথাকার!’
রুমা শিউরে উঠেছিল। পিঠে কী ব্যথা করছে তখন। কিছুই বুঝতে পারছে না! পাগলের মতো তার গায়ে লাথি মারছে তখন দিব্যেন্দু, ‘শুওরের বাচ্চা, আমাকে ঠকিয়ে দিলি? কেন আগে বলতে কী হয়েছিল? এতদিন পরে আমি কেন জানতে পারব তুই কী করে এসেছিস? শুয়েছিলি লোকটার সঙ্গে? কী রে? শুয়েছিস?’
রুমা ‘মা গো’ বলে চিৎকার করে উঠছিল। দিব্যেন্দু চুলের মুঠি ধরে বলেছিল, ‘নাটক মাড়াচ্ছিস? এখন সিমপ্যাথি আদায় করার চেষ্টা না? কী ভেবেছিস? আমি কিছুই বুঝতে পারব না? চল…চল।’
চুল ধরে টানতে টানতে তাকে বাথরুমে ছুঁড়ে ফেলে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে দিয়েছিল দিব্যেন্দু। এখানেই তো সে দুপুরে স্নান করেছিল! সাবান শ্যাম্পুর গন্ধটা তখনও আছে। অবিশ্বাস আর যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে রুমা শুয়ে পড়েছিল। ঘুম ভেঙেছিল মাঝরাতে। তার ভীষণ ভূতের ভয় করতে শুরু করল। সে দরজা ধাক্কাল, ‘খোলো, দরজা খোলো না।’
দরজা খুলল না। ধাক্কাতে ধাক্কাতে একসময় ক্লান্তিতে মেঝেতে বসে পড়ল সে।
সকালে দরজা খুলে দিব্যেন্দু অফিস চলে গেল।
তার জ্বর এল। জ্বর নিয়েই কোনমতে ঘরের বাইরে গিয়ে মেঝেয় অনেকক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে ছিল রুমা।
মা-র কথা মনে পড়ছিল তার, ‘শ্বশুর বাড়িতে অনেক কিছু হতে পারে। বর গায়ে হাতও তুলতে পারে। তা বলে রাগারাগির তো কিছু নেই। তোর বাবা আমার গায়েও কত হাত তুলত। নতুন বউ সংসারে পাগলা হাতির মতো। তাকে বশ করার জন্য গায়ে মাথায় চড়-চাপড় মারতেই পারে। ওগুলোকে ধরে বসে থাকলে হবে না। বুঝতে হবে ওই সংসারটাই তো সারাজীবন করতে হবে। বর যেভাবে বলবে, তোকে তেমনভাবেই চলতে হবে। আমি কোনও কথা শুনব না।’
চোখের জলও কখন যেন শুকিয়ে গিয়েছিল। একটা সময় সে উঠে রান্না বসিয়ে খেয়েও নিল।
অফিস থেকে দিব্যেন্দু যখন ফিরল, একবারে স্বাভাবিক। মিষ্টি কিনে এনেছিল। হাসিমুখে প্যাকেটটা তার হাতে দিয়ে বলল, ‘নতুন দোকান খুলেছে। খেয়ে দেখো তো।’
যেন কিছু হয়ইনি। রুমা বলতে গেছিল, ‘তুমি কি আমার উপর রেগে আছ?’
দিব্যেন্দু হাত নেড়ে বলেছিল, ‘ধুস, কী যে বলো!’
প্যাকেট খুলে একটা মিষ্টি মুখেও দিয়েছিল সে। হঠাৎ আঁতকে উঠে দেখল, দিব্যেন্দু তার গলা টিপে ধরেছে, ‘খুব নোলা? আমি এনেছি, আমাকে না দিয়ে নিজে নিজে খেয়ে নিচ্ছিস?’
দম বন্ধ হয়ে উঠছে তার, বমি উঠে আসছে…দিব্যেন্দুর সেই রূপ, সে এখনও, এতদিন পরেও কিছুতেই ভুলতে পারেনি।
…
বাথরুমের দরজা খুলে গেল।
একটা কাপড় তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে গিয়াস বলল, ‘গেট রেডি।’
কাপড়টা হাতে নিয়ে চুপ করে বসে থাকল রুমা…।
.
