৫৫
ঝাপসা একটা রাত কাটছে যেন। এমন একটা রাত, যার জন্য কোনওদিন সে প্রস্তুতি নেয়নি।
প্রস্তুতি তো সে রাতটারও নেওয়া ছিল না। সবার সঙ্গে মিষ্টভাষী, ভদ্র সভ্য ছেলেটা যখন ফুলসজ্জার রাতে ঢুকেছিল।
খুব ভালোভাবে বলেছিল, ‘তুমি খুব ক্লান্ত। ঘুমিয়ে পড়।’
কোনও অসভ্যতা না, কোনও কিচ্ছু না।
সে চমৎকৃত হয়েছিল। প্রত্যুষদা না থাক, কেউ একজন অন্তত এল, যে তার খেয়াল রাখবে। প্রথম রাতের কথা সে ভুলতে পারবে না কোনদিন। সেই ভদ্র সভ্য মানুষটাই ধীরে ধীরে পরিণত হয়ে গেল রাক্ষসে। এমন এক ভয়াবহ রাক্ষস, যার ছায়া পড়লেও সে চমকে উঠত। আতঙ্কিত হতো। ভয়ে কাঁপত। যে তাকে বিন্দুমাত্র ভালো থাকতে দেয়নি। প্রতিটা সময় কখনও গায়ে হাত তুলেছে, কখনও তীব্র লাঞ্ছনা দিয়েছে।
রুমা বসে আছে ঘরের মধ্যে। তেল চিটচিটে একটা বিছানার চাদর। দেওয়ালে মা কালীর ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডার। এই জায়গাটাতেও ঈশ্বর আছেন? আছেন হয়তো। শমিতা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
রুমা শমিতার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এখানে কীরকম ট্রেনিং হবে?’
শমিতা পান খাচ্ছিল। হেসে বলল, ‘খদ্দের সামলানোর ট্রেনিং দেব। খদ্দের সামলাতে পারবি না?’
রুমা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। শমিতা জানলা খুলে পানের পিক ফেলে বলল, ‘তোর মরদটা কি পাগল?’
রুমা বলল, ‘ওরকমই।’
শমিতা বলল, ‘পুলিশে বলিসনি?’
রুমা শূন্য চোখে তাকাল, ‘কী করতাম? থাকব কোথায়?’
শমিতা বলল, ‘তাও ঠিক। আমাদের সবার তো ওই একটাই চিন্তা থাকে। থাকব কোথায়? আমাদের এখানে কতজন আছে, তোর মতোই অবস্থা। কাউকে কাউকে শ্বশুরবাড়ি থেকেই বেচে দিয়েছিল। আমাদের এখানে এসে উঠেছে। ওই যে পারুল, তোর বর যার পায়ে হাতুড়ি মেরেছে, তাকে তার বাপ বেচে দিয়েছিল।’
রুমা মাথা নিচু করে বসে নিজের পায়ের নখ দেখছিল। বলল, ‘আমার বাবা-মা তো ভদ্রবাড়ির লোক। তারাও আসলে আমাকে বেচেছে। কিন্তু সেটা বাইরের লোক বুঝতে পারবে না। বেড়াল তাড়িয়েছিল তারা আমার বিয়ে দিয়ে। বিয়ে দেওয়াটাই সব।’
শমিতা বলল, ‘তুই জানিস, তোকে শেখানোর জন্য আমি হোটেলেও যেতে পারতাম। তোকে এখানে পাঠিয়েছে কেন?’
রুমা ঘেন্নায় সিঁটিয়ে যাচ্ছিল, ‘আমি কারো সঙ্গে কিছু করতে পারব না। আমাকে ছেড়ে দাও।’
শমিতা রুমার পাশে এসে বসল। কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘সব সময় ওই পাগলের সঙ্গে থেকেছিস। তোকে মেরেছে। আমি যা শেখাচ্ছি, ভালো করে শেখ, তোকে কেউ মারতে আসবে না। সবাই ভালোবাসবে। আমি কি তোকে বলেছি এই রিকশাওয়ালা, ভ্যানওয়ালা, চানাচুরওয়ালার সঙ্গে শুতে হবে? কখন বলিনি। তোর কাছে অনেক বড় বড় লোক আসবে রে। তাদের অনেক চাহিদা। আমি কি অত শেখাতে পারব? সে শেখানোর অন্য লোক আছে। আমি তোকে একটা জিনিস শেখাব। সেটা কী বলত?’
রুমা বলল, ‘কী?’
শমিতা বলল, ‘লজ্জা কাটাতে শেখাব। লজ্জা পেলে হবে? তোর কাছে সব থেকে বড় অস্ত্র আছে। এমন এক অস্ত্র, যেটা থাকলে একটা পুরুষ মানুষ তার সব কিছু তোর পায়ে লুটিয়ে দিতে পারবে। আমি যা শেখাব, তুই শুধু তাই শেখ। নইলে ওই শুয়োরটার সঙ্গে ঘর করবি নাকি রে মাগী? কী হবে ওই ভাবে বেঁচে?’
রুমা বলল, ‘কোন জীবন ভালো?’
শমিতা বলল, ‘আমি জানি না। আমার জানার দরকার নেই। কিন্তু তোকে জানতে হবে। তোর সে রূপ আছে। তোকে শিখতে হবে। দেখ, ঘর থেকে বেরো। তোর বরকে বসিয়ে রেখেছে একটা ঘরে। ওর বাড়িতে গিয়ে ঠিক করে তো ভাতও পাবি না। পরিবর্তে জুতো, লাঠি সব খাবি। নিজেই বল, গিয়ে কি কোনও লাভ হবে?’
রুমা জোরে শ্বাস নিয়ে সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘তোমরা যা বলবে, আমি করতে রাজি আছি। তবে আমার একটা শর্ত আছে।’
শমিতা বলল, ‘বল।’
.
কিছুক্ষণ পর বারান্দায় দিব্যেন্দুকে টেনে নিয়ে আসা হল।
দিব্যেন্দু অবাক গলায় বলল, ‘কী হল?’
লুকা সিগারেট টানছিল। বলল, ‘বোস। হাঁটু গেড়ে বোস।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘কেন?’
লুকা বলল, ‘দানা খাবি কি? কপালের মাঝ বরাবর দেব, একদম ছবি হয়ে যাবি। যা বলছি কর। বোস।’
দিব্যেন্দু বসল। রুমা শমিতার ঘর থেকে বেরোল। তার চোখে আগুন জ্বলছে।
লুকা চেয়ারে বসে বলল, ‘শুরু কর।’
দিব্যেন্দু অবাক হয়ে রুমাকে দেখছে। রুমা দিব্যেন্দুর স্থির চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। দিব্যেন্দু বলল, ‘কী হল? কী দেখছ?’
রুমা এগোতে শুরু করল দিব্যেন্দুর দিকে।
তার হাতে দিব্যেন্দুর সেই হাতুড়ি…!
.
৫৬
তিন মাস পরের কথা
বৃষ্টি পড়ছে। পুরাতন ঢাকার গলি দিয়ে একটি মেয়ে বোরখা পরে হেঁটে যাচ্ছে। বৃষ্টি থামছে না। বেড়ে চলছে। কালো আকাশে মাঝে মাঝেই বিদ্যুৎ চমক দেখা যাচ্ছে।
মেয়েটার কানে কয়েকটা কথা ভেসে আসছে, ‘মনে রাখবে, এমন একটা দেশে যাচ্ছ, যেখানে মেয়েদের জীবনের কোন মূল্য নেই। একবারে এটাই বাস্তব সত্যি। চরম পুরুষতান্ত্রিক দেশ। ছেলেদের কোনও দোষ নেই। ভিক্টিম ব্লেমিং হয় রেপের পরে। আমাদের দেশেও হয়। কিন্তু ও দেশে সব সীমা পরিসীমার উপরে গিয়ে হয় যা হওয়ার। বুঝতে পারছ, কী বলছি আমি?’
মেয়েটা দাঁড়িয়ে গেল। রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা সিএনজি চালকের একজোড়া চোখ তার উপর নজর রাখছে। সামান্য উৎকণ্ঠা দেখা দিল মেয়েটার মধ্যে? সেকেন্ড পাঁচেক দাঁড়িয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল সে।
গলিটা যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, সেই দরজায় টোকা মারল।
দরজা খুলে গেল। লোকটার ঠোঁটের কাছটা কাটা। তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী দরকার?’
মেয়েটা বলল, ‘মজিদ ভাই পাঠাইসে। বলল সাদিক সাহেবরে সালাম দিবি।’
লোকটা তার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বাইরের দিকে দেখল। সিএনজিটা এখন আর নেই। গলিতেও বৃষ্টির জন্য ভিড় কম। লোকটা বলল, ‘ভিতরে আসেন।’
মেয়েটা ভেতরে ঢুকল। লোকটা তাকে একটা ছোট ঘরে বসাল। ছোট টিভি চলছে একটা। ঘরে আর কেউ নেই।
ফোন বের করে লোকটা ঘরের বাইরে চলে গেল। মেয়েটা চুপ করে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর লোকটা এসে বলল, ‘ভাই আসছে। আপনাকে খেতে দিতে বলল।’
মেয়েটা কাঁদতে শুরু করল, ‘এটা কোন জায়গা? আমার ভয় লাগছে।’
কান্নাটা ইচ্ছাকৃত। এমনই নির্দেশ আছে। বোঝাতে হবে যে সে অথৈ জলে পড়ে গেছে। লোকটা বলল, ‘ভাই আসছে তো। জরিনা! এই জরিনা!’
একজন সতেরো আঠেরো বছর বয়সি মেয়ে ঘরে ঢুকল। লোকটা জরিনাকে বলল, ‘খেয়াল রাখ। ভাই আসবে আজ।’
লোকটা বেরিয়ে গেল।
জরিনা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বোরখা তোল আপা।’
মেয়েটা বোরখা তুলল।
জরিনা গালে হাত দিয়ে বলল, ‘মাশাল্লাহ, আপনে খুব সুন্দর।’
মেয়েটা কাঁদছে। জরিনা বলল, ‘কাঁদেন না আপা। এখানে থাকবেন। খাবেন, দাবেন, ঘুমাইবেন। চিন্তা নাই। আফনের নাম কী?’
মেয়েটা বলল, ‘সাকিনা। ঘরের লোক আরব গেছে। এখন শুনি বেঁচে নাই। মজিদ ভাই বলল সাদিক সাহেবের লগে দেখা করতে।’
জরিনা গলা নামিয়ে বলল, ‘দেখা করতে কইছে? তুমি জানো দেখা করার মানে কী?’
সাকিনা বিহ্বল হবার অভিনয় করল, ‘মানে কী?’
জরিনা ফিক ফিক করে হাসতে শুরু করল। সাকিনাকে ঠেলল কনুই দিয়ে ‘তোমারে শোয়াইবে। বোঝ না?’
বাইরে একজনের চিৎকার শোনা গেল, ‘কই তোরা? কীরে জরিনা?’
জরিনা তড়িঘড়ি বাইরে গেল। কয়েক সেকেন্ড পরে একজন সুখী সুখী চেহারার লোক ঘরের ভিতর প্রবেশ করল।
সাকিনা বোরখা পরে ছিল। লোকটা গম্ভীর গলায় বলল, ‘মজিদ পাঠাইছে তোমায়?’
সাকিনা কাঁদতে শুরু করল।
লোকটা বিব্রত হল, ‘আহা কান্দো ক্যান? আমার কাছে আইসা পড়সো যখন, তখন তোমার চিন্তা নাই। দেখি, বোরখা তোল।’
সাকিনা বোরখা তুলল। লোকটা ফিসফিস করে বলল, ‘মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ। তোমার তো চিন্তার কিছু নাই। আমি আছি তো। আমার কাছে আইছো যখন, তখন তুমি চিন্তামুক্ত। তুমি থাকবা আমার কাছে? টেকা দিমু নে। তার চিন্তা করতে লাগবো না, মজিদ যখন পাঠাইছে, তখন তো চিন্তার কিছুই নাই। এই নাও, এই নাও, টেকা নাও।’
পকেট থেকে টাকার গোছা বের করে সাকিনার কোলে ছুঁড়ে মারল লোকটা।
সাকিনাকে শক্ত থাকতে হবে। আসল পরীক্ষা শুরু হবে এখন।
‘জরিনা, ও জরিনা…’ সাদিক বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ হাঁক ডাক করে ঘরের ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করল।
‘দেখি, সব খুলে ফেলাও দেখি, আমি আছি যখন, তোমার কুনো চিন্তা নাই। রানী কইরা রাখব তোমায়…’
রুমা একটু থমকে গেল। সাদিক ধৈর্য ধরতে পারল না। নিজেই এগিয়ে এসে রুমার বোরখা খুলতে শুরু করল…
.
৫৭
টাকা। ভারতীয় টাকা না। বাংলাদেশী টাকা। তাও কম হবে না ভারতীয় মুদ্রায়। বেশ কয়েকটা নোটের বান্ডিল তার নগ্ন শরীরের উপর রেখে চলে গেছে সাদিক। রাত দেড়টা বাজে। রুমা আর শাড়ি পরেনি। চুপ করে শুয়ে আছে। এখানে থাকার জন্যই তো এত ট্রেনিং। এত কিছু। কত ভাবে তাকে বোঝানো হল, নিজেই ভুলে গেছিল সে।
শেষমেশ সাদিক তাকে ছুঁল। অভ্যস্ত শরীর। শরীর বিদ্রোহ করলেও সে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে গেছে। খুব একটা অসুবিধা হবেই বা কেন? এরকমই তো হয় অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। একটা অচেনা অজানা লোক এসে জামা কাপড় খুলিয়ে মেয়েটার সঙ্গে শারীরিক মিলনে লিপ্ত হয়।
সাদিকের বউ হবে না সে। এই বাড়িতে একজন রক্ষিতার মতো থাকবে। বাড়িটা সাদিকের হারেমের মতন। তার সঙ্গে যারা কাজ করে, তাদের আমোদ প্রমোদের জন্য এই বাড়িটা রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে যে কারো সঙ্গে শুয়ে পড়তে হবে।
পাখি পড়ানোর মতো করে রুমাকে বোঝানো হয়েছিল। অসুবিধা হবার কথা নয়। রুমা বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে বাথরুমে গিয়ে কল চালিয়ে বমি করল যাতে তার বমির শব্দ বাইরে না যায়। একটা ময়লা শাড়ি ছিল। সেটা পরেই বাথরুম থেকে বেরোল।
ঘরের দরজায় জরিনা এসে দাঁড়াল, ‘সাহেব বলে গেছে এটাই তোমার ঘর। তুমি এখানে থাকবা।’
রুমা বলল, ‘তুই এখানে কতদিন আছিস?’
জরিনা বলল, ‘ছোট থেকেই। আমার মা সাহেবের কাছে থাকত। তারপর কী হইসিল জানি না।’
রুমা বলল, ‘সাহেবের কাছে যাস না তুই?’
জরিনা দাঁত বের করল, ‘না। উনি আমারে নেন না।’
রুমা বলল, ‘আর কে থাকে এখানে?’
জরিনা বলল, ‘থাকে আরও। তারা তোমার মতো না। তোমার নাম হবে। আমি বলে দিলাম। মিলায়ে নিও।’
রুমার মাথাটা দপ দপ করছে। জরিনা বলল, ‘তুমি ঘুমায়ে পড়। কাল সকালে তোমারে সবার সঙ্গে আলাপ করাব।’
রুমা বলল, ‘কেন? বাকিরা কোথায়?’
জরিনা বলল, ‘সব আছে। একদিনে সব জানবা নাকি? এই তো ছোট একটা খানকি বাড়ি, তার বিষয়ে জানতে বেশিক্ষণ লাগব না। তুমি ঘুমাও। এখানে কুনো সমেস্যা নাই। ভালো থাকবা।’
রুমা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে বলল, ‘ঠিক আছে। তুই যা।’
জরিনা বলল, ‘দরজা বন্ধ কইরা দাও। এখানের পোলাগুলান ভালা না। তুমি দরজা খুইলা রাখবা, ঘরের ভিতর ঢুইকা যাইব।’
রুমার সেই ঘটনাটা মনে পড়ল। সে ঘুমোচ্ছিল হোটেলের ঘরে, আর ওই লোকটা ঢুকে এসেছিল। রুমা বলল, ‘তুই আমার লগে ঘুমা।’
জরিনা রাজি হল। দরজা বন্ধ করে রুমার পাশে শুয়ে পড়ল।
রুমা চুপ করে শুয়ে রইল। তার ঘুম পাচ্ছে না। মাথার মধ্যে কত কিছু ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে তার। নতুন পরিচয়, কোথায় থাকত, সব কিছু পাখি পড়ার মতো করে পড়তে হয়েছে। সাদিকের একটাই দোষ, মেয়ে মানুষের। সাদিকের একমাত্র মেয়ে সাপ্লায়ার মজিদ। তাকে মজিদের মাধ্যমে এখানে পাঠানো হয়েছে। সামনে কী আছে, কে জানে! শেষ রাতে ঘুম এল।
চোখ খুলে দেখল জরিনা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। কোত্থেকে একটা হিন্দি গান ভেসে আসছে। রাতে এল, সাদিকের শয্যাসঙ্গিনী হয়ে গেল, এর বাইরে কিছুই তো সে চেনে না।
জরিনাকে তুলবে? না থাক। ঘুমাক। এইটুকু মেয়ে। অযথা বিরক্ত করে লাভ নেই। খাট থেকে উঠে চুপ করে বসে থাকবে সে।
অদ্ভুত কিছু নির্দেশ আছে। সাদিক যা করছে, তাকে করতে দিতে হবে। সময় এলে তারপর কী করতে হবে বলে দেওয়া হবে। কতদিন তাকে এই নরকে পড়ে থাকতে হবে?
ভাবতে পারছে না কিছুই। দিব্যেন্দুর মুখটা ভেসে উঠল মনের মধ্যে।
সেই ভয়টা আবার ফিরছে। সিঁটিয়ে দেওয়া, কুঁকড়ে দেওয়া ভয়টা…
.
৫৮
‘রাবণের কাছ থেকে সীতা ফিরে এল। তারপর রাম কী করেছিলেন?’
অরিত্র টিভি দেখছিল। এণাক্ষী হঠাৎ কথাটা বলে উঠল।
অরিত্র ভ্রু কুঁচকাল, ‘মানে? এরকম বললে কেন?’
এণাক্ষী বলল, ‘তোমার মনে সারাক্ষণ ধরে এই কথাটাই ঘুরপাক খাচ্ছে না? ওই দিনগুলোতে আমি কী করেছি?’
অরিত্র বলল, ‘তোমার মেডিকাল রিপোর্ট বলছে তুমি একদম ঠিক আছ। আমি অকারণ অন্য কথা ভাবতে যাবই বা কেন?’
এণাক্ষী শ্বাস ছাড়ল, ‘মনে হল। সারাক্ষণই মনে হয় আমার।’
অরিত্র বলল, ‘কী মনে হয়?’
এণাক্ষী বলল, ‘মনে হয়, আমি তোমায় ঠকিয়েছি।’
অরিত্র বলল, ‘চুপ করো তো। কিচ্ছু ঠকাওনি। চাইলে তুমি শ্যুটেও যেতে পারো। আমি আটকাবো না।’
এণাক্ষী বলল, ‘এরকম ব্যাপার? এত স্বাধীন?’
অরিত্র বলল, ‘হ্যাঁ। এরকমই ব্যাপার এবং ঠিক এতটাই স্বাধীন। চিন্তার কিছু নেই। চিন্তা করিও না। তুমি আজেবাজে ভেবো না। তিন মাস কেটে গেল। এবার মূল স্রোতে ফেরো। নইলে কাউন্সেলিং করাতে চাইলে করাও। থাক, তুমি তো কোনদিন চাইবে না, আমিই দেখছি।’
এণাক্ষী বলে উঠল, ‘না না, তার দরকার নেই। অনেক টাকা নিয়ে নেয়। দরকার নেই।’
অরিত্র বলল, ‘টাকাটা বড় কথা না। তোমার সুস্থ থাকাটা বড় কথা।’
এণাক্ষী অরিত্রর কাছে ঘেঁষে বসল, ‘তুমি খুব চিন্তায় পড়ে গেছিলে, বলো?’
অরিত্র বলল, ‘ভীষণ। আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছিল। যেটা কোনওদিন করি না, তাও করে ফেললাম। মারপিট। ভাবতে পারছ?’
এণাক্ষী চোখ বড় বড় করে বলল, ‘সত্যি। আমি ভাবতে পারছি না। কী সব করে বসেছ। এত ভালোবাস আমায়?’
অরিত্র হাসল, ‘একদম। তোমায় ছাড়া আমি পাগল হয়ে যাব।’
এণাক্ষী বলল, ‘তারপর তো আমি মরলে আরেকটা বিয়ে করতে। তখন বলতে পাগলে কী না বলে।’
অরিত্র এণাক্ষীকে জড়িয়ে ধরল, ‘না। কোনদিন বলব না। চল কোথাও ঘুরে আসি। কাছে পিঠে। কোনও শপিং মলে। যাবে? সারাদিন ল্যাপটপে কাজ করে মাথাটা জ্যাম হয়ে গেছে।’
এণাক্ষী বলল, ‘চল। আমি রেডি হয়েনি তাহলে। তুমিও একটা ভালো জামা পরো। রাতে বাইরে খাব।’
অরিত্র উঠল, ‘একদম। চল।’
দুজনে বেরোল কিছুক্ষণ পরে। দুজনকেই ঝকঝকে লাগছে। অরিত্রর পাশে এণাক্ষী বসল। ড্রাইভ করতে করতে অরিত্র বলল, ‘আমার আজকাল সব স্বপ্ন মনে হয়। তোমার ফিরে আসাটা আমি এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারি না। আমার মনে হয়েছিল আর কোনদিন তোমাকে ফিরে পাব না। ছি ছি, কী যা-তা বলেছিলাম।’
এণাক্ষী বলল, ‘থাক। বার বার আমার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে না। আমি কত লাকি যে তোমাকে পেয়েছিলাম। অত ঝগড়ার পরে আমার জন্য ছুটে এসেছিলে।’
অরিত্রর চোখে জল। রাতের মোহময়ী শহরে কিছুক্ষণ পর অরিত্র এক শপিং মলে পার্ক করল। মাইনাস টু ফ্লোরে তারা দাঁড়িয়ে আছে লিফটের জন্য। লিফট এসে দাঁড়াল। একজন স্যুট পরিহিত ভদ্রলোক লিফট থেকে বেরোলেন। লিফটে তারা দুজন উঠল। লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। পারফিউমের গন্ধটা নাকে যাওয়া মাত্র এণাক্ষী নাক কুঁচকে ছিল। হঠাৎ লাফিয়ে উঠে বলল, ‘তাই ভাবছি এই গন্ধটা আমি কোথায় পেয়েছি। মনে পড়েছে।’
অরিত্র চমকে উঠল, ‘কী মনে পড়েছে?’
এণাক্ষী বলল, ‘এই যে লোকটা নেমে গেল লিফট থেকে, এই লোকটাই ছিল সেদিন। শিগগিরি চল বেসমেন্টে। শিগগিরি।’
লিফট উপরে যাচ্ছিল। অরিত্র মাইনাস টু দিল। থার্ড ফ্লোর থেকে ঘুরে আবার নীচে নামতে বেশ খানিকটা সময় চলে গেল। মাইনাস টুতে লিফট নামতেই এণাক্ষী সঙ্গে সঙ্গে নেমে গিয়ে দৌড়ে চারদিকে দেখল। নাহ্, কোথাও কেউ নেই। পারকিং ফ্লোরের এক কোণ থেকে অন্য কোণে দৌড়ে গেল এণাক্ষী। পাগলের মতো খুঁজতে লাগল। কাউকে দেখতে পেল না।
অরিত্র কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এণাক্ষী বেশ কিছুক্ষণ খুঁজে অরিত্রর কাছে এসে অরিত্রর হাত ধরে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘লোকটা ছিল। এই লোকটাই সেদিন তুলে নিয়ে গেছিল।’
অরিত্রর চোখে পড়ল তার গাড়ির উইন্ডশিল্ডে একটা কাগজ সেঁটে রয়েছে। এগিয়ে গিয়ে কাগজটা হস্তগত করল সে, তাতে লেখা, ‘এণাক্ষী ম্যাম, ভাগ্যিস আপনার হাজব্যান্ড আপনাকে ভালোবাসেন…ভালো থাকবেন। হ্যাভ এ ব্লাস্ট। ভবিষ্যতে আর কোনদিন আমাদের দেখা হবে না…।’
.
৫৯
ঝাঁ চকচকে আধুনিক একটা বিল্ডিং। সতেরো তলা। প্রতিটা ফ্লোরে সিসিটিভি ক্যামেরা। প্রতিটা ঘরে অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা। এসি। মেডিকাল ফেসিলিটি। নিউট্রিশনিস্ট নির্দেশিত খাবার। পঁয়তাল্লিশ লাখ টাকা ডিপোজিট। প্রতি মাসে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা।
লোকটা রিসেপশনে বসে শুনছে, সুবেশ সেলসম্যান এন আর আই ছেলে আর তার বউকে বৃদ্ধাশ্রমের সুযোগ-সুবিধা বোঝাচ্ছে। এন আর আইকে বলছে, ‘স্যার, আপনি একবারে নিশ্চিন্ত থাকুন। এই ডিপোজিটটা আপনার বাবা এক্সপায়ার করার সঙ্গে সঙ্গে আপনার অ্যাকাউন্টে ব্যাক করবে। আমরা সে চুক্তিও করে নেব। এই প্রশ্নটা বার বার আমাদের করে আপনি বিব্রত করবেন না প্লিজ।’
রিসেপশনে বসে থাকা লোকটা সেলসম্যানকে ইশারায় ডাকল। সেলসম্যান লোকটার কাছে গিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার।’
লোকটা বলল, ‘বিপ্র পালিত। সাতশো সতেরো। অ্যাক্সেস কী দিন। আপনাদের রিসেপশনিস্ট অনেকক্ষণ তার সিটে নেই। এরপর আমি কমপ্লেইন করতে বাধ্য হব।’
সেলসম্যান বলল, ‘শিওর স্যার। আমি একবার বিপ্রবাবুর সঙ্গে কথা বলেনি?’
লোকটা ঘাড় নাড়ল, ‘শিওর।’
সেলসম্যান বলল, ‘আপনার নামটা স্যার?’
লোকটা বলল, ‘বলুন ওর বন্ধু সুমিত এসেছে পাটায়া থেকে।’
সেলসম্যান বলল, ‘ওকে স্যার।’
সেলসম্যান বিপ্রকে ফোন করল। কথা বলে লোকটার হাতে অ্যাক্সেস কী এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘লিফট ডান দিকে স্যার। ভালো থাকবেন।’
লোকটা সেলসম্যানকে আর পাত্তাও দিল না। অ্যাক্সেস কী নিয়ে লিফটে উঠল। লিফটে অ্যাক্সেস কী-টা স্ক্যান করাতে হয়। স্ক্যান করানোর পর সাত টিপলে লিফট চলতে শুরু করল। সাত নম্বর ফ্লোরে লিফট দাঁড়িয়ে গেল। লোকটা লিফট থেকে নেমে সাতশো সতেরো নাম্বারের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল টিপল। সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল। লোকটা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। এসি চলছে। বেশ ঠান্ডা হয়ে গেছে ঘর।
বিপ্র বলল, ‘চা চলবে স্যার?’
লোকটা বলল, ‘শিওর।’
বিপ্র ইলেকট্রিক কেটলে গরম জল বসাল।
লোকটা বলল, ‘এরকম সুন্দর বৃদ্ধাশ্রম থাকতে লোকে বাড়িতে থাকবে কেন? ফাইভ স্টার হোটেলকে এর কাছে শিশু মনে হচ্ছে। ছেলেমেয়ের কাছে কে থাকবে? সারাজীবন চাকরি করে টাকা জমিয়ে এখানে চলে এলেই তো হয়।’
বিপ্র হাসল, ‘হ্যাঁ স্যার। ঠিকই বলেছেন।’
লোকটা বলল, ‘আমরা তোমার জন্য এত গাদা গাদা টাকা খরচ করে এখানে রেখেছি, তোমায় বাড়ি করে দিয়েছি। পরিবর্তে তুমি কী করেছ বিপ্র, যদি একটু বলো।’
বিপ্রর মুখ শুকিয়ে গেল, ‘স্যার, আপনারা যেভাবে বলছেন, আমি সেভাবেই তো সব করছি। অ্যাসেট বাংলাদেশ চলে গেছে। তার নিখুঁত কভার তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। সাদিকের দালালকে ম্যানিপুলেট করা হয়েছে, যা যা বলেছেন, তাই তো করেছি।’
লোকটা রিমোট নিয়ে টিভির চ্যানেল পাল্টে বলল, ‘টেল মি অ্যাবাউট অমল।’
বিপ্র বলল, ‘অমল বেশ কয়েকদিন রিপোর্ট করেনি। সাদিকের সঙ্গে ওর মেলামেশা বেড়েছে।’
লোকটা শিস দিয়ে উঠল, ‘গুড। মেলামেশা বাড়বে, সেটা আমি চাই। ওকে সেজন্যই ওখানে পাঠানো হয়েছে।’
বিপ্র বলল, ‘সাদিকের কাজ করতে সাদিকের দেওয়া ফেক আইডি নিয়ে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, বাহরিনের মতো দেশগুলোতে যাওয়ার কথা কি বলা হয়েছিল?’
লোকটা টেবিলের উপর চায়ের কাপ রাখল, ‘তার কারণ কী দেখিয়েছে?’
বিপ্র বলল, ‘বলেছে সাদিকের বিশ্বাস অর্জন করতে চায়। এটা করলে কী ধরনের বিশ্বাস অর্জন হবে? আমার তো ভয় লাগছে এর ফলে অমলের কভারটাই না নষ্ট হয়ে যায়। তখন কী হবে?’
লোকটা বলল, ‘ওকে। টেল অমল টু কন্ট্যাক্ট রুমা। পারবে?’
বিপ্র বলল, ‘মেসেজ পাঠাচ্ছি। দেখা যাক কী রিপ্লাই করে।’
লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আর রুমার সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করতে না পারলে অমলকে বলে দাও, বাংলাদেশের সব কাজ বন্ধ করে ইমিডিয়েটলি দিল্লিতে রিপোর্ট করতে। ওকে ওখানে কিছু করতে হবে না।’
বিপ্র খুশি হল, ‘আমি সেটাই বলতে চাইছিলাম স্যার।’
লোকটা বলল, ‘পেটে এক আর মুখে এক রাখবে না। তোমাকে এখানে এত টাকা দিয়ে ইয়ার্কি মারতে রাখা হয়নি।’
বিপ্র অপ্রতিভ হয়ে বলল, ‘স্যার, তাতে আপনিই আমার উপর রেগে যেতে পারতেন। আপনি কী ডিসিশন নেবেন, সেটা আমার বলে দেওয়া ঠিক হবে না।’
লোকটা চিন্তিত মুখে বলল, ‘অ্যান্ড, বাই দ্য ওয়ে, পূর্ণ নাম না লোকটার? কোথায় আছে এখন?’
