১০
‘তুই আমাকে চিনিস না। তাও গুলি করে দিলি? তোর একবারও মনে হল না, কাজটা ঠিক হচ্ছে না? টাকা পেলে তুই সব করে দিবি? এভাবে তুই আমাকে খুন করে ফেললি?’
ধড়মড় করে উঠে বসল রাণা। আজ তারেক দুঃস্বপ্নে হানা দিয়েছিল। এভাবেই কেউ না কেউ হানা দিয়ে রাতের ঘুমটার দফারফা করে দেয়। ঘাম হচ্ছে রীতিমতো। রাণা উঠে ফ্রিজ থেকে জলের বোতল নিয়ে অনেকটা জল খেয়ে নিল। অস্বস্তি হচ্ছে।
ঘড়ি দেখল। রাত তিনটে বাজে। বাংলাদেশি সময় রাত তিনটে মানে ভারতে এখন রাত আড়াইটা। সময়ের দিক থেকে বাংলাদেশ আধ ঘণ্টা এগিয়ে আছে। জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল রাণা। রাস্তার গাড়ি চলাচল এখন নেই। মাঝে মাঝে ছুটকো-ছাটকা এক-আধটা গাড়ি যাচ্ছে। এ কথাটা আজকাল প্রায়ই মনে হয় তার। এত এত গ্রহ আছে চারদিকে। অথচ এই পৃথিবীতে সে একটা মানব জন্ম পেয়েছে। কাজ না পেয়ে সে কী করে? আরেকটা মানুষকে খুন করে! খুন করতে তার হাত কাঁপেনি কোনদিন। আগুপিছু কোনদিন ভাবেনি।
তবে আজকাল রাতের মধ্যে সেই লোকগুলো হানা দেয় কেন? ঘুমোতে দেবে তো! ঘুমটা তো তার দরকার!
ব্যালকনির দরজাটা চোখে পড়ল। রাণা দরজা খুলে ব্যালকনিতে গেল। চেয়ার রাখা আছে। ক্লান্ত শরীরে একটা চেয়ারে বসল সে। সামনের রাস্তায় বেশ কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। শহরে জায়গা এতটাই অপ্রতুল যে মানুষ রাস্তাতেই গাড়ি রেখে দেয়।
হঠাৎ রাণা নড়ে-চড়ে বসল। একটা কালো গাড়ির ভেতর লাইটার জ্বালিয়েছে কেউ। সিগারেট ধরাল। এই গাড়ির ভেতরে লোক আছে? এই ফ্ল্যাটের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছে কেন? সাদিকের লোক কি এখনও এখানে আছে? গাড়িটার দরজা খুলে গেল। রাণা অবাক হয়ে দেখল, গাড়ি থেকে অমল নামছে। তার মানে অমল এতক্ষণ গাড়িটায় ছিল?
রাণা যে ব্যালকনিতে আছে সেটা দেখেনি এখনও। অমল নামতেই গাড়িটা চলে গেল। অমল চোখের আড়াল হতে সঙ্গে সঙ্গে রাণা ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকে ব্যালকনির দরজা বন্ধ করে ছোট ঘরে ঢুকে গেল। বাইরের দরজা খোলার শব্দ হল। ঘরের ভেতর অমলের চলে যাবার শব্দ।
রাণা চুপ করে শুয়ে পড়ল। এত রাতে অমল বাইরে গেছিল? চোখ খুলে ভাবতে ভাবতেই কখন যেন দুচোখে ঘুম নেমে এসেছিল তার।
ঘুম ভাঙল অমলের ডাকে, ‘আরে ভাই ওঠ, আর কত ঘুমোবে? সকাল ন’টা বেজে গেল তো!’
ধড়মড় করে উঠে বসল রাণা। ন’টা বেজে গেল? অদ্ভুত তো! বহুদিন ন’টা অবধি ঘুমোয়নি সে। তবে কি পথের ক্লান্তিতেই, রাতে ঘুম ভাঙার পর এতক্ষণ ঘুমোল?
অমল বলল, ‘ফ্রেশ হয়ে নাও। ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করছি।’
রাণা বলল, ‘কোথাও বেরোবেন?’
অমল বলল, ‘হ্যাঁ…বেরোব। তোমাকেও নিয়ে যাব। কয়েকটা জায়গা চিনতে হবে তোমাকে। ইন কেস, ইমারজেন্সি সিচুয়েশন অ্যারাইভস…’ অমলের ফোন শব্দ করে উঠল।
অমল সচকিত হল, ‘কেউ আসছে। সেন্সর বেজে উঠল।’ অমল ফোনের স্ক্রিনে দেখে অবাক হয়ে গেল, ‘সাদিক আসছে। এখানে চলে এল?’
কলিং বেল বেজে উঠল। অমল দ্রুতপায়ে গিয়ে দরজা খুলল। দরজায় আসগরকে নিয়ে সাদিক দাঁড়িয়ে আছে। হাসিমুখে বলল, ‘এই দিক দিয়ে যাচ্ছিলাম রুমানভাই, ভাবলাম আপনাদের সঙ্গে দেখা করে যাই।’
অমল বলল, ‘আসুন আসুন, ভিতরে আসুন।’
সাদিক আসগরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই গাড়িতে গিয়ে বোস।’ আসগর একটাও বাক্যব্যয় না করে চলে গেল। সাদিক ঘরে ঢুকে সোফায় বসে বলল, ‘গৌতমভাইয়ের পাসপোর্ট করাইতে হবে রুমানভাই। আমার একখান পার্সেল আনাইতে হইব।’
রুমান বলল, ‘হ্যাঁ, আমি ওকে সেই কথাই বলছিলাম কাল রাতে।’
সাদিক রাণার দিকে তাকাল, ‘আপনার কোন নাম পছন্দ ভাই? আপনি বলেন। যে নাম বলবেন, সেই নামে পাসপোর্ট বানায়ে দিমু।’
রাণা বলল, ‘আপনার যে নাম পছন্দ আপনি সেটাই দিন।’
সাদিক অমলের দিকে তাকাল, ‘দেখলেন মিয়াঁ, কী কয়? এই জন্যই ভাইরে আমার পছন্দ হইসে। কইরা দি তাইলে আমার খুশিতে?’
রুমান বলল, ‘করে দিন। কোনও ব্যাপার না।’
.
১১
পড়ন্ত বিকেলের আলো পড়ছে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে।
আলম হোসেন সিগারেট ধরিয়ে চুপ করে বসে আছে। স্নান করবে ভেবে এসেছিল। আর ইচ্ছে করেনি। সারাদিন বসেই কেটে গেল। মুখটা কেমন টক টক লাগছে। অ্যাসিড হয়েছে বোধহয়। অ্যাসিড হলে এরকম টক ভাব আসে।
দূরে একজন হেঁটে আসছে। তার দিকে চোখ পড়ায় আলম সিগারেট ফেলে উঠে দাঁড়াল। বিরক্ত মুখে সেদিকে চেয়ে রইল। ঈষৎ হেলে হাঁটা লোকটা সরাসরি আলমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আদাব।’
বিরক্তভাব কিছুতেই যাচ্ছিল না আলমের। সে বলল, ‘এখানে কী মরতেও আসতে দেবে না? কী হয়েছে?’
লোকটা বলল, ‘সিগারেট এনেছি। নেবেন সাহেব?’
আলম বলল, ‘দাও।’
লোকটা সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিল। সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে উর্দু লেখা দেখে আলম বালিতে আবার বসে পড়ে বলল, ‘বোস।’
লোকটা আলমের পাশে বসল।
আলম বলল, ‘কোথায় গেছিলে রিয়াজ?’
রিয়াজ বলল, ‘এক জায়গায় গেলে তো বলব। শুরুতে ডাকল করাচীতে। গিয়ে শুনি হুজুর লাহোর চলে গেছেন। আমি ছুটলাম লাহোরে। সেখানেও নেই। তারপর মুজফফরাবাদে গিয়ে দেখা হল।’
আলম প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাল। সিগারেটে লম্বা টান মেরে বলল, ‘কী আদেশ এল?’
রিয়াজ বলল, ‘আর না ঘুমিয়ে থাকার আদেশ এল।’
আলম মাথা নাড়ল, ‘আচ্ছা। তুমি সমুদ্রে স্নান করবে? সাগর পারে আইসা তোমার মাতাল মাতাল লাগে না?’
রিয়াজ বলল, ‘না। লাগে না। যতক্ষণ আমার ভাইরা কষ্টে আছে, ততদিন আমার কিছুই লাগে না।’
আলম বলল, ‘আহ্। তুমি বড় উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছ। তোমাকে এত উত্তেজিত হতে আমি বলিনি। আমি শুধু বলেছি স্নান করতে ভালো লাগে নাকি?’
রিয়াজ রাগী গলায় বলল, ‘না, লাগে না। আমার কিছুই ভালো লাগে না। তবে মুজফফরাবাদ থেকে আমাকে একটা বিষয়ে জানতে চেয়েছে।’
আলম জোরে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘কী?’
রিয়াজ বলল, ‘সাদিক সেখ কক্সবাজারে একজন জেনানা নিয়ে এসেছিল। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সে কোথায় আছে?’
আলম কয়েক সেকেন্ড থমকে গিয়ে আবার সিগারেটে টান দিয়ে বলল, ‘সেটা আমি কী করে জানব? তুমি জানো না, ওরা এখানে কী হারাম কাজকর্ম করতে আসে?’
রিয়াজ বলল, ‘আমি সব জানি। এও জানি সাদিক আপনার কাছে এসে ওঠে। আপনার বাসায় থাকে। এই এলাকার সব কিছু আপনার নখদর্পণে। তার পরেও সে মেয়ে গুম হয়ে গেল কী করে?’
আলম বলল, ‘জানি না। আমাকে জরুরি কাজে চিটাগাং যেতে হয়েছিল সেদিন। সিসিটিভিতেও কিছুই পাওয়া যায়নি।’
রিয়াজ বলল, ‘সিসিটিভি খারাপ ছিল। তাই না?’
আলম বলল, ‘হ্যাঁ। খারাপ ছিল। ঠিক করা হয়েছে। আর আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না, একটা বেশ্যা মারা যাওয়ার জন্য মুজফফরাবাদ এত চিন্তায় পড়ে গেছে কেন?’
রিয়াজ বলল, ‘সেটাও জানতে পারবেন খুব শিগগিরি। তবে এর মধ্যে যদি আপনার কোনও ইনভলভমেন্ট পাওয়া যায়, তাহলে আমি জানি না আপনাকে কুরবানি হওয়া থেকে বাঁচাতে পারব কিনা।’
আলম রেগে গেল, ‘তুমি আমাকে হুমকি দিচ্ছ? তোমার তো সাহস কম না’!
রিয়াজ বলল, ‘আমার সাহস কমই। আমি শুধু আমার কম সাহসের কথাগুলোই আপনাকে বললাম সাহেব। আপনি জানেন, ওরা কী করতে পারে। সাদিক সেখ জেনানার বুকে মাথা গুঁজে পড়ে থাকতে পারে, হুজুর কিন্তু তা করে না। তারা রেগে আছে। সাদিকের উপরে যতটা রেগে আছে, তার থেকে অনেক বেশি আপনার উপর রেগে আছে।’
আলমের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। সে বলল, ‘আমি কিছু জানি না বিশ্বাস করো। আমি চিরকাল হুজুরের পায়ের তলায় পড়ে আছি। আমি কোনও দোষ করব না।’
রিয়াজ বলল, ‘সাদিকের এক নতুন পাখি এসেছে। তাকে চেনেন তো?’
আলম ঘাড় নাড়ল, ‘ন-না…না। আমি চিনি না।’
রিয়াজ ঠান্ডা চোখে আলমের দিকে তাকিয়ে থাকল। আর কিছু বলল না। সমুদ্র থেকে একটা ঝোড়ো হাওয়া আসছে। তা সত্ত্বেও আলম দরদর করে ঘামতে শুরু করল…
.
১২
রাণার একটা অস্বস্তি হচ্ছে। প্রবল অস্বস্তি। কিন্তু কী হচ্ছে সে বুঝতে পারছে না। বিরক্তিও লাগছে। সে কেন সাদিকের কথা শুনবে? অথচ না শুনে চললেও যে সমস্যা আছে, তা বোঝা যাচ্ছে।
সাদিক বলল, ‘আজ যাইতে পারবেন গৌতমভাই?’
রাণা অবাক হল, ‘আজকেই?’
সাদিক বলল, ‘হ্যাঁ। রাতের ফ্লাইট আছে ভাই। কুয়ালালামপুর। কী আছে কন? প্লেনে উঠবেন। পৌঁছাইবেন, থাকবেন, খাইবেন, খাম নেবেন, চলে আসবেন। আমি ভাবতেছিলাম রুমানভাইরে কমু, তারপর মনে হইলো এইডা ছোট কাজ। আপনার বিসমিল্লাহও হইয়া যাইব।’
রাণা অমলের দিকে তাকাল। অমল বলল, ‘আপনি না সাদিকভাই, শুধু চমক দেন। কাল বললেই পারতেন। তাহলে দোস্তো তৈরি হবার সময় পাইত। আসগররে পাঠায়ে দেন না।’
সাদিকের চোয়াল শক্ত হল। পরক্ষণেই হালকা গলায় জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল, ‘আরে না রে ভাই। এক লাইন ইংলিশ বলতে আসগর হাইগা দিবো নে। আমার তো ওই ইংলিশ বলার লোকেরই অভাব। বোঝেন না মিয়াঁ?’
রাণা বলল, ‘ঠিক আছে। আপনি আমার পাসপোর্ট আর ভিসার ব্যবস্থা করে দিন। আমি ঘুরে আসব।’
সাদিক খুশি হয়ে বলল, ‘এই তো চাই। আপনি আমার লগে চলেন। আমার বাসায় থেকে আপনাকে তৈরি করায় দি।’
অমল বলল, ‘দুপুরে যাব তো ভাই। গৌতমভাইরে নিয়েই যাব। আপনি ব্যস্ত হবেন না।’
সাদিক বলল, ‘ব্যস্ত কী আর সাধে হই রে ভাই? একটার পর একটা কাজ যখন তখন চইলা আসে। আমার আর কী দোষ? দোস্তো সবে আইলো, কোথায় দেশ ঘুরামু, তা না, পাঠাইতে হইতাসে। আপনে ফিরে আসেন, আপনেরে নিয়া আমি কক্সবাজার যামু। সাকিনা ক্যান, সাকিনার থিক্যাও ভালো ভালো জিনিস নিয়া যামু।’
সাদিক চোখ মেরে উঠে দাঁড়াল, ‘রুমানভাই, ভাইরে নিয়া চলে আসবেন কিন্তু। খুব দরকার। আজ যাইতেই হইব।’
অমল বলল, ‘আপনি বললেন, সেটা হুকুম। নিশ্চিন্তে যান। আমরা দুপুরের মধ্যে চলে যাব।’
সাদিক বেরিয়ে গেল। অমল চিন্তিত হয়ে বসে পড়ে রাণাকে বলল, ‘তুমি পারবে?’
রাণা বলল, ‘ওর এত ইম্পরট্যান্ট কাজ, আমাকে কী করে বিশ্বাস করছে?’
অমল বলল, ‘বিশ্বাস করছে না। কাজটা এমন, যে তুমি ধরা পড়লে ওর ডিজওন করতে অসুবিধা হবে না। দিস ইজ এ ব্যাড সিচুয়েশন। উস্তাদের সঙ্গে কথা বলে নেবে?’
রাণা মাথা নাড়ল, ‘না। দরকার নেই। উনি কী বলবেন? সাদিককে যখন দরকার, তখন ওর কাজটা করব।’
অমল বলল, ‘ব্যাপারটা অত সোজা না। কাজ করার মধ্যেও অনেক সমস্যা আছে। জানিয়ে করতে হবে এ কাজ। সাদিক ইজ ভেরি ডিস্টারবিং। পিছনে লেগে আছে এঁটুলির মতো। তুমি ফ্রেশ হয়ে এস। আমি উপরমহলে কন্ট্যাক্ট করি।’
রাণা ফ্রেশ হয়ে এল বাথরুম থেকে।
অমল বলল, ‘সাদিকের কথা শুনে চলার ইন্সট্রাকশান এসেছে তোমার কাছে। যেরকম বলবে, সেরকম করতে হবে।’
রাণা বসল। বলল, ‘ঠিক আছে। আমি তৈরি।’
অমল বলল, ‘জিগশ পাজল দেখেছ? একটা একটা করে জুড়তে হয়। সাদিক একটা একটা করে লিংক জুড়ছে। এখন ওদের ঘুঁটি সাজাতে অসুবিধা হচ্ছে। প্রথমত, কাশ্মীরে কড়াকড়ি অনেক বেড়ে গেছে। ঠিক করে টেরর ফান্ডিং করতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, ডিজিটালাইজেশন বাড়ছে, সিসিটিভির যুগ চলে এসেছে। ওরা ফোনে কন্ট্যাক্ট করতেও ভয় পাচ্ছে। এখন ব্যাক টু ওল্ড এজে চলে গেছে সব। আগেকার দিনে ঘোড়ায় করে খবর দিতে যেত। এখন ধরে নাও সেই প্রচলনটাই আবার শুরু হয়েছে। সাদিক আমাদের ঘোড়া হিসেবে ব্যবহার করছে। যেই মুহূর্তে ওরা আমাদের অরিজিন জানবে, আশা করি বুঝতে পারছ তখন কী হতে পারে!’
রাণা বলল, ‘কিন্তু এসব কাজে এক্সটেনসিভ ব্যাকগ্রাউন্ড চেকিং করে ওরা। আপনি এত বিশ্বস্ত হলেন কী করে?’
অমল বলল, ‘সময় লেগেছে। সেভাবে কভার তৈরি করতে হয়েছে। এক্ষেত্রে একটাই অ্যাডভান্টেজ ছিল আমার। সাদিকের এ কাজ করার মতো লোক নেই। বিশ্বাস একদিনে তৈরি হয় না। ওই বাড়িটা তৈরি করতে প্রতিটা ইট মূল্যবান। তুমি যেমন প্রথমেই ওর কাছে চলে গেছ, আমি পারিনি। সময় লেগেছে। এখন টার্গেটের এত কাছে এসে গেছি, আর রিস্ক নেওয়ার কথা ভাবতে পারছি না।’
রাণা মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে। দেখা যাক কী হয়…।’
.
১৩
জাহির হোসেন বসে আছেন ওয়েটিং রুমে। টিভি চলছে। এসির তাপমাত্রা শীতলতম। জাহিরের ঠান্ডা লাগছে। অ্যালার্জি হয়েছে। নাক কুঁচকে হাঁচি আসতে পারে যেকোনও সময়। জাহির এটাই ভয় পাচ্ছেন। একবার হাঁচি দিতে শুরু করলে হাঁচি আসতেই থাকবে। একটার পর একটা হাঁচি শুরু হয়ে যাবে। সেটা যদি ম্যাডামের ঘরে ঢোকার পর শুরু হয়ে যায়, তাহলে বিপদের শেষ থাকবে না।
জাহির প্রাণপণে অন্য কথা ভাবছেন। শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট টিম খেলতে এসেছে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের খেলা আছে। জাহির ভাবছেন, কী কী করলে শ্রীলঙ্কাকে হারানো যেতে পারে। মাথায় অন্য কথা এলে হাঁচিটা ডিরেইল হবার চান্স থাকে।
এত চেষ্টা করেও অবশ্য কোনও লাভ হল না। জাহিরের হাঁচি শুরু হল। ভয়াবহ হাঁচি। একটার পর একটা হয়েই যাচ্ছে। রুমাল বের করলেন। নাক দিয়ে শব্দ আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলেন।
‘আপনি মাস্ক পরে আসেন।’
ম্যাডামের আপ্তসহায়ক এসে দাঁড়িয়েছেন দরজায়। জাহির উঠলেন। মাস্ক পরে নিলেন। হাঁচিটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
ফাইল হাতে জাহির বড় ঘরটায় ঢুকলেন। দেওয়ালে জাতির পিতার ছবি টাঙানো। জাহির কয়েক সেকেন্ড দেখলেন।
‘এস। খুব ব্যস্ত হয়ে এসেছ বুঝতে পারছি। অ্যালার্জির খবর কী তোমার?’ ম্যাডাম সস্নেহে বললেন।
ম্যাডাম বসতে বলেননি, জাহিরের খেয়াল ছিল না। আগে বসে পড়েছিলেন। পরক্ষণেই উঠে দাঁড়ালেন, ‘এক্সট্রিমলি সরি ম্যাডাম, আপনি বসতে বলেননি, তাও বসে পড়লাম।’
ম্যাডাম বললেন, ‘ধুর, তুমি আমার সাথে ফর্মালিটি করছ কেন? বোস বোস। লজ্জা দিও না। কী খবর এনেছ বল।’
জাহির বললেন, ‘ম্যাডাম করিডর থার্টি টু নড়বড় করছে। খবর ভালো না।’
ম্যাডাম চিন্তিতমুখে বললেন, ‘সে কী?’
জাহির বললেন, ‘হ্যাঁ ম্যাডাম। অনেক অনুপ্রবেশকারী আসছে শোনা যাচ্ছে।’
ম্যাডাম বললেন, ‘পাকিস্তানিই তো? মিডল ইস্ট কিংবা সিরিয়ার লোক না তো?’
জাহির বললেন, ‘না ম্যাডাম। আইসিস আছে, তবে স্লিপার সেল হিসেবে। এখানে আই এস আই-ই অপারেট করে যাচ্ছে। রাজাকার বিরোধী লিস্ট তৈরি করার খবরটাও বেরিয়ে গেছে। কোনও খবরই চাপা থাকছে না আর কী!’
ম্যাডাম বললেন, ‘যা করতে হয় করো। ভোটের অজুহাতে এ হবে আমি জানতাম। কোনটাই ভাবিনি, এমন নয়।’
জাহির বললেন, ‘বিরোধী পক্ষ ভোট চায়। তাদের দিকে পাল্লা ভারি। সেটাও একটা সমস্যা।’
ম্যাডাম বললেন, ‘ভোট চায়, ভোট হবে। চিন্তার কিছু নেই। আমার কথা হল, এসবের অজুহাতে আবার একটা হোলি আরটিজান হবার ঝুঁকি আমি নিতে পারব না।’
জাহির বললেন, ‘লড়াই জারি আছে ম্যাডাম। তাছাড়া আপনার সিকিউরিটিও জোরদার করার ব্যাপারে বলে দিয়েছি।’
ম্যাডাম বললেন, ‘ওসব ভয় পাই না। যার পরিবারের বেশিরভাগ মানুষ রাজাকারদের হাতে মরেছে, সে যখন আবার একই পথে এসেছে, তার অত ভয় মানায় না।’
জাহির বললেন, ‘না ম্যাডাম, থ্রেট আছে। আমি রিস্ক নেব না।’
ম্যাডাম হাল ছেড়ে দিলেন, ‘ঠিক আছে। তুমি তোমার মতো করে এগিয়ে যাও। প্রয়োজনে ব্যাপকহারে ধরপাকড় শুরু করো। র আর কিছু ইনপুট দিয়েছে?’
জাহির বললেন, ‘না। তবে অন্য একটা জায়গা থেকে শুনেছি, র-এর অন্য একটা উইংস এখন এ-দেশে অপারেট করছে। তারা অন্য ধরনের। নিষ্ঠুর টাইপ।’
ম্যাডাম ভ্রু কুঁচকালেন, ‘নিষ্ঠুর টাইপ মানে?’
জাহির বললেন, ‘যেন তেন প্রকারেণ কাজ আদায় করাটাই ওদের লক্ষ্য। এথিকস মানে না। এই ইউনিট নিয়ে ঝামেলা আছে। এরকম কোনও ইউনিট ঢাকায় সক্রিয় হওয়া আমাদের জন্য সুবিধের হবে না।’
ম্যাডাম মাথা নাড়লেন, ‘ইন্ডিয়ার সঙ্গে কথা বলছি। আমরা তো আলোচনার দরজা সব সময় খোলা রেখেছি। এখানে ওদের সমস্যা হবার কথা না। কথা কি?’
জাহির হাসলেন, ‘না ম্যাডাম।’
ম্যাডাম বললেন, ‘নিজের খেয়াল রাখো।’
জাহির ঘাড় নাড়লেন, ‘জি ম্যাম।’
জাহির উঠতে যাচ্ছিলেন, ম্যাডাম বললেন, ‘সাদিক শেখ নামে কাউকে চেন?’
জাহির থমকে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, ‘না ম্যাডাম।’
ম্যাডাম কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওকে। এস। খোদা হাফেজ।’
.
১৪
এহসান খান। রাণার পাসপোর্টের নাম। এই নামে ভিসাও করে দিয়েছে সাদিক। কী করে করেছে সেটা জানা সম্ভব না। তবে দুরুদুরু বক্ষে রাণা আবিষ্কার করল সব মসৃণভাবে হয়ে গেল। প্লেনে বসে সে দেখল পাঁচটা সিট দূরে আসগর বসে আছে। সে অবাক হল। এ কথা তো ছিল না। কথা ছিল কাজ হয়ে গেলে সে ফিরে আসবে। সাদিক আবার আসগরকে পাঠাল কেন?
বিরক্ত মুখে আসগরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সে। আসগর তার দিকে তাকাল না। মাথা নিচু করে ঘুমনোর ভান করছে।
রাণার মনে হল, অমল আর সাদিক আসগরের মাধ্যমে তাকে পথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করছে না তো? নাহ্, যা হবে দেখা যাবে। বিমান সেবিকাদের ইন্সট্রাকশান অনুযায়ী বেল্ট বেঁধে নিল সে।
প্লেন যখন টেক অফ করল, তখন ঢাকার সময় রাত সাড়ে বারোটা। কুয়ালালামপুর পৌঁছতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে। রাণা চোখ বুজল।
ঘুমের মাঝে অবশ্য একবার সে দেখে নিল আসগরও ঘুমোচ্ছে। ঘুমোতে ঘুমোতে পাশের প্যাসেঞ্জারের গায়ে পড়ে যাচ্ছে।
.
কুয়ালালামপুর পৌঁছতে ভোর হয়ে গেল। পাসপোর্টটা আরেকবার দেখে নিল রাণা। এখানে তো আর ঢাকার পুলিশ নেই! সাদিকের লোকজনও নেই। এখানে ধরা পড়লে সমস্যা হবে। মরতে ভয় পায় না সে, তবে আজীবন কোনও বদ্ধ কুঠুরিতে আটক হয়ে থাকতে তার আপত্তি আছে।
মজার ব্যাপার হল, কুয়ালালামপুরেও কোনও অসুবিধা হল না। ইমিগ্রেশন পেরিয়ে সে দিব্যি এয়ারপোর্টের বাইরে বেরোতে পারল। লাইনে আসগর অনেকটা পেছনে ছিল। আসগর বেরোনোর আগেই সে বেরিয়ে গেল।
সাদিক বলে দিয়েছিল ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে চেক ইন করতে। রাণা একবার ভাবল আসগরের জন্য অপেক্ষা করবে।
পরক্ষণে সে প্ল্যান ক্যান্সেল করল। আসগর যদি তাকে ফলোই করে, তাহলে সাদিকের সেটা তাকে বলা উচিত ছিল। বলেনি যখন, তখন আসগর কী করবে, সেটা দেখার দায়িত্ব তার নয়। তড়িঘড়ি একটা ক্যাবে উঠে বলল, ‘আমাকে কাছাকাছি কোনও একটা পিসিওতে নিয়ে চলো।’
কুয়ালালামপুর আধুনিক শহর। দিনের ব্যস্ততা এখনও শুরু হয়নি। ক্যাব ড্রাইভার একটা পিসিওর সামনে দাঁড়াতে ক্যাব থেকে নেমে লোকটার নাম্বারে ফোন করল সে। রিং হতেই ও-প্রান্ত থেকে ফোন ধরল লোকটা, ‘স্পিকিং।’
রাণা বলল, ‘সাদিক আমাকে কুয়ালালামপুর পাঠিয়েছে।’
‘জানি। অমলের সঙ্গে কথা হয়েছে।’
‘আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। অমল এত অসংখ্য ব্যাপারে জড়িয়ে আছে, আমাকে ঠিক কোন পথে এগোতে হবে, কত তাড়াতাড়ি সব কিছু জানতে পারব, তার কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘সেটাই স্বাভাবিক। ওখান থেকে কখন বেরোবে?’
‘একটা ঠিকানা দিয়েছে। দুপুরে ওই ঠিকানা থেকে একটা খাম নিয়ে ফিরব। এর মধ্যে সাদিক ওর একটা সাগরেদকে পেছন পেছন পাঠিয়ে দিয়েছে।’
‘ও কি এখনও তোমাকে ফলো করছে? ফোন করতে দেখছে?’
‘না। ওকে কাটিয়ে চলে এসেছি। তবে আমি কোন হোটেলে যাব, ও জানে। আমায় কি এভাবেই এ দেশ সে দেশে ঘুরে বেড়াতে হবে?’
‘তোমার যতক্ষণ না মনে হচ্ছে তুমি প্রস্তুত, ততক্ষণ তাই করতে হবে। আর যেকোনও আনপ্রোটেক্টেড নাম্বার থেকে এভাবে ফোন করার দরকার নেই।’
‘শুনুন শুনুন।’
‘বলো।’
‘মাঝরাতে অমল বেরিয়েছিল। একটা গাড়ি এসেছিল।’
‘ওকে। বাই।’
রাণা বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে দিল। লোকটা ইচ্ছে করে তাকে এরকম একটা পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। ক্যাবে উঠে বসে সে বিরক্ত গলায় ড্রাইভারকে বলল, ‘হোটেল স্টার ইন্টারন্যাশনাল।’
বস্তি অঞ্চলে হোটেলটা। সরু রাস্তার পাশে স্যাঁতস্যাঁতে একটা ছোট হোটেল।
রিসেপশনে তার পাসপোর্ট দেখাতে ঘরের কার্ড পেয়ে গেল রাণা। ছোট একটা ঘুপচি হোটেল। ঘরগুলো অপরিষ্কার।
বিরক্ত মুখে ঘরে ঢুকে সোফায় বসল সে। দুপুর অবধি অপেক্ষা করতে হবে।
টিভি আছে। বেশ কিছুক্ষণ টিভি দেখল সে। সকাল দশটা নাগাদ ফোনে মেসেজ টোন বেজে উঠল।
ঠিকানা এসেছে। শ্বাস ফেলল সে। যাক, দুপুর অবধি অপেক্ষা করতে হবে না।
হোটেল রুম তালা বন্ধ করে রাস্তায় নামল রাণা। ঠিকানাটা বার্ড পার্কের টিকিট কাউন্টারের দেওয়া হয়েছে।
রোদ উঠছে। তবে আকাশে বেশ খানিকটা মেঘ আছে। বৃষ্টি হতে পারে। রাণা চারদিকে দেখল।
কোনও বিল্ডিং-এর ছাদ থেকে যদি তাকে নজরে রাখে, তাহলে সেটা দেখা সম্ভব না। রাণা ঠিক করল আসগরকে খুঁজে সময় নষ্ট করবে না।
ইদানীং তার সঙ্গী আগ্নেয়াস্ত্রটিকে বড় মিস করছে রাণা। যন্ত্রটা সঙ্গে না থাকলে নিরাপত্তাহীনতা চলে আসে। সঙ্গে থাকলে মনে হয় সে যা ইচ্ছে করতে পারে। কেউ তাকে আটকাতে পারবে না।
হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাব ড্রাইভারকে জিগ্যেস করল, বার্ড পার্ক যাবে নাকি। ড্রাইভার বলল, গাড়িতে উঠে বসতে। রাণা গাড়িতে উঠে বসল।
তার ফোনে আরেকটা মেসেজ এল। মেসেজে শুধু লেখা, ৩ নাম্বার বেঞ্চ, কোড তাজমহল।
রাণা শ্বাস ছাড়ল। কী কুক্ষণে যে এসব ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ল সে।
বস্তি পেরোতেই আবার ঝাঁ চকচকে শহরের রাস্তায় নামল গাড়িটা। কোনও শহরেরই বাইরের রূপ দেখে বোঝা যায় না, সে শহরের বস্তিবাসীরা কীভাবে জীবনধারণ করছে। ঝাঁ চকচকে শহুরে আলোর তলায় ঢাকা পড়ে থাকে এসব অন্ধকারময় রাস্তাগুলো।
রাণার হঠাৎ করে মনে হল, সে যদি এই শহরে হারিয়ে যায়, তাহলে সাদিক বা উস্তাদ কিংবা অমল, কেউই তাকে খুঁজে পাবে না। কিন্তু সে এখানে বেঁচে থাকবে কী করে? কিচ্ছু চেনে না সে। সাদিক নিশ্চয়ই এর পরে তাকে এমন কোনও শহরে পাঠাবে যেখানে সে অনায়াসে হারিয়ে যেতে পারে।
এরকম কোনও শহরে তাকে গা ঢাকা দিতে হবে। দেশপ্রেমী হোক কিংবা দেশদ্রোহী, এদের ধরার কাজ তার নয়। সে পারবে না। এই দু-তিন দিনেই কেমন অস্বস্তি লাগছে। এরকম জীবন সে চায় না। চায়ওনি কোনওদিন।
বার্ড পার্কের সামনে পৌঁছতে এগারোটা বেজে গেল।
টিকেট কাউন্টারের সামনে পর পর পাঁচটা বসার বেঞ্চ আছে। প্রত্যেকটাতেই নম্বর দেওয়া। রাণা মেসেজটার কথা মাথায় রেখে তিন নম্বর বেঞ্চে বসল। বাকি কোনও বেঞ্চেই কেউ বসেনি। টিকেট কাউন্টারে ট্যুরিস্টদের লাইন শুরু হয়েছে।
প্রায় ছ ফুট লম্বা এক বোরখা পরিহিতা মহিলা তার পাশে এসে বসে বলল, ‘মহল।’
রাণা কোনও কিছু না ভেবেই বলল, ‘তাজমহল।’
মহিলাটি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল। কোনও খাম বা কিছু ফেলে গেল না। রাণা কী করবে বুঝতে না পেরে ফলো করল।
একটা লাল রঙের সেডান দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায়। মেয়েটা সেটায় উঠে দরজা খোলা রেখে দিয়েছে। কিছু না ভেবে রাণা সেটায় উঠে পড়ল। মেয়েটা প্রায় তার গায়ের উপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
গাড়ি স্টার্ট হল। রাণা প্রস্তুত ছিল না একবারেই। মেয়েটা হ্যান্ডব্যাগে হাত ঢুকিয়ে একটা ছোট বোতল বের করে রাণার মুখে কিছু একটা স্প্রে করতেই রাণা জ্ঞান হারাল।
.
