৪৫
কামরায় উঠে চুপ করে বসে আছে দিব্যেন্দু। মাথা ধরে আছে। তাপসদা নেই, কামরুল নেই। কেউ নেই। এই ট্রেনে সে কাউকে চেনে না।
লুকা তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে একটা হোমে নামিয়ে দিল। বলল, ‘মামু, তুমি এখানে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়াও। তারপর তোমার ছুটি।’
দিব্যেন্দু তাই করল। হঠাৎ করে একজন এসে তাকে বলল, ‘চলো, তোমায় স্টেশনে ছেড়ে দিয়ে আসি।’
তাই করল। শেয়ালদায় নামিয়ে দিয়ে গেল। পকেটে হাজার টাকা গুঁজেও দিয়েছে। দিব্যেন্দুর নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস হচ্ছিল না।
সে বেঁচে আছে? বেঁচে থাকার তো কথা না!
একই ট্রেনে পরিচিত মানুষজন না থাকলে কেমন অপরিচিত লাগে। যে ট্রেনে সে এতদিন ধরে যায়, সেই ট্রেনেই সে আছে, শুধু অন্য সময়ে, অন্য লোকজনের সঙ্গে। ওই তো, কোণে চারজন তাস পিটোচ্ছে, কিন্তু তাদের সে চেনে না।
এই সময়টা অফিস টাইম না। ভিড়ও নেই। জানলার কাছে বসে আছে। হাওয়া এসে ঝাপড় মারছে কেমন! একটু বৃষ্টিও হয়ে গেল বিধাননগর পেরনোর পর। জল এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেল।
একটার পর একটা স্টেশন পেরোচ্ছে। হকার উঠছে। দিব্যেন্দু চুপ করে বসে আছে। সবাইকে দেখে যাচ্ছে শুধু।
এই ট্রেনটা বনগাঁ অবধি গিয়ে আবার ফিরবে। শেয়ালদায় গিয়ে আবার বনগাঁ যাবে। এই করতে থাকবে কারশেডে যাওয়ার আগে অবধি। লোক উঠতেই থাকে। ট্রেন যতই বাড়ুক, এখানে ভিড় কখনও কমে না। কামরা বাড়লেও ভিড় কমে না। তাপসদা বলে বাংলাদেশের লোকেরাও কাঁটাতার পেরিয়ে এসে বনগাঁ থেকে ট্রেনে উঠে পড়ে। সীমান্ত থেকে কলকাতা যাবার শর্টেস্ট রুট। শেয়ালদায় পুলিশ থাকে, আর পি এফ থাকে। বোকারা শেয়ালদায় নামে। চালাক লোকজন বিধাননগর বা দমদমেই নেমে যায়। তারপর ভিড়ে মিশে গেলেই হল। এভাবেই অনুপ্রবেশকারীরা এসে মিশে যাচ্ছে এ-দেশে।
তার স্টেশনে এসে ট্রেন দাঁড়াল। দিব্যেন্দু ট্রেন থেকে নামল। সাইকেল স্ট্যান্ড থেকে সাইকেল নিল। ধীরেসুস্থে প্যাডেল করা শুরু করল।
বাড়ির সামনে এসে সাইকেল রেখে ঘরে ঢুকল।
কেউ নেই কোথাও। সে আলমারির জিনিস মেঝেয় ফেলে রেখে গেছিল। সব জিনিস সেভাবেই পড়ে আছে। কেমন একটা অদ্ভুত হাহাকারের মতো ব্যাপার হচ্ছে। যে মেয়েটার উপর সব হতাশা ঝাড়ত, সেই মেয়েটাই নেই। কেমন বিচ্ছিরি ব্যাপার! সোফায় চুপ করে বসে কিছুক্ষণ টিভি দেখল। গা হাত পা ব্যথা শুরু হল আবার।
কলিং বেল বাজছে। দিব্যেন্দু বিরক্ত মুখে উঠে দরজা খুলল। বলভদ্র দাঁড়িয়ে আছেন। দিব্যেন্দুকে দেখে বললেন, ‘কী একটা খবর শুনলাম! তোমার চোখে কালো দাগ কীসের?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘আসুন।’
বলভদ্র ঘরের ভিতর ঢুকে চোখ কপালে তুললেন, ‘এসব কী?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘বউ পালিয়েছে। কী করব? ভাবলাম ওর নামে ইনসিউরেন্স করব। তার আগেই পালিয়ে গেল।’
বলভদ্র বললেন, ‘পালিয়ে গেল? বেশি মারতে নাকি?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘খুব বেশি কিছু না তো!’
বলভদ্র জোরে জোরে মাথা নাড়ালেন, ‘না। বেশি মারতে। মারার মাপ আছে। ঠিক ঠাক মারতে পারলে পালাবে না। ডোজ বেশি হয়ে গেলে পালায়। ঠিক আছে, কিছুদিন যাক, আরেকটা বিয়ে কর। কমবয়সি। সেটাকে কী করবে, আমি বলে দেব। ওভাবে ডোজ বাড়াতে নেই। লোক জানবে কেন? আর্ট তো ওতেই।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি আর বিয়ে করব না।’
বলভদ্র বললেন, ‘ওরকম সবাই বলে। একা থাকা সম্ভব নাকি? কেউ তো থাকবে যে খিদমত খাটবে। যা বলবে তাই করবে। রান্না করবে, ঘর ঝাঁট দেবে, ঘর মুছে দেবে, পুজো দেবে আবার রাতে বিছানা গরম করবে। কাজের মেয়ে থেকে রাঁধুনি হয়ে বেশ্যা, সব এক প্যাকেজ। বুঝলে না?’
দিব্যেন্দু শক্ত হয়ে বলল, ‘আমি বিয়ে করব না, বললাম তো। মাগী চলে গেলে অনেক ঝামেলা। আমি অত ঝামেলা নিয়ে পারব না।’
বলভদ্র শ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘তাহলে আর কী? একটা ইনসিউরেন্স করে নাও।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘নমিনি কে হবে? আপনার বাবা?’
বলভদ্র বললেন, ‘রেগে গেলে কেন? কী হয়েছে?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘কিছু না। আপনি যান তো। ভালো লাগছে না।’
৪৬
—আপনিই অরিত্রবাবু?
—হ্যাঁ।
অফিসার তীক্ষ্ণ চোখে অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শুনলাম কাল রাতে আপনি অনেকটা সিন ক্রিয়েট করেছেন।’
অরিত্র অফিসারের দিকে তাকিয়ে আছে। রাস্তায় ঝামেলা করেছে সে। প্রথমে পুলিশ এসে তাকে স্থানীয় থানায় নিয়ে গেছিল।
বেশ খানিকক্ষণ তাকে বসিয়ে রেখে অন্য একটা ইনভেস্টিগেশন সেন্টারে তুলে নিয়ে এসেছে। অরিত্রর মাথা এতটাই ঘেঁটে আছে, সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না যে তাকে কোথায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
অফিসার বলল, ‘করেছেন তো ঝামেলা? কাল রাতে?’
অরিত্র বলল, ‘ইচ্ছে করে তো করিনি। আমার ওয়াইফকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিলজলা থানায় গিয়ে মিসিং ডায়েরি করেছি। হোটেলে গেছি। এটাকে ঝামেলা বলে কি?’
অফিসার বলল, ‘বলে। আমার কাছে রিপোর্ট আছে। আপনার চালচলন, কথাবার্তা অন্য সন্দেহ তৈরি করছে। আপনি সেটা বুঝতে পারছেন?’
অরিত্র অবাক হয়ে বলল, ‘কী সন্দেহ তৈরি করছে?’
অফিসার বলল, ‘হতে পারে আপনি কোনও কন্ট্রাক্ট কিলার দিয়ে আপনার স্ত্রীকে খুন করেছেন।’
অরিত্রর মাথা ঘুরে গেল। সে চিৎকার করতে শুরু করল, ‘এ সব কী বলছেন আপনি? আমি আমার স্ত্রীকে খুন করতে যাব কেন?’
অফিসার শান্ত গলায় বলল, ‘এফেক্ট অফ ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স। এরকম হতেই পারে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কখনও কখনও সন্দেহ এতটাই বেড়ে যায় যে হাজব্যান্ড ওয়াইফকে খুন করে ফেলে। বাইরে নাটক করতে গিয়ে অনেকটা বেশি হয়ে যায়, সেটা হাজব্যান্ড বুঝতে পারে না।’
অরিত্র বলল, ‘আপনি এরকম আজে বাজে কথা বলে যাচ্ছেন কেন? আমি কেন এণাক্ষীকে খুন করতে যাব? এক মিনিট, এক মিনিট। খুন হয়েছে মানে কী? কী বলতে চাইছেন?’
অফিসার বলল, ‘আমরা সব অপশন যাচাই করে দেখছি। হতেই পারে আপনি কোথাও গুম করে রেখেছেন ওকে। রাস্তাঘাটে অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা লাগিয়ে ফেলছেন যাতে আপনার উপরে কোনও সন্দেহের তির না আসে।’
অরিত্র মাথা ঠান্ডা করার চেষ্টা করল, ‘শুনুন অফিসার। আপনার কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে আপনি আমাকে হেকল করতে চাইছেন। আমার স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কোথায় একটা ঠিকঠাক ইনভেস্টিগেশন করে ওকে খুঁজে বের করবেন, তা না, আপনি উল্টোপাল্টা অ্যালিগেশন করে যাচ্ছেন। তিলজলা থানার অফিসার নীল কিন্তু জানেন আমার হোয়ার অ্যাবাউটস। আমাকে অযথা অ্যাটাক না করে সেই এনার্জি এণাক্ষীকে খুঁজতে ব্যবহার করলে ভালো হতো না?’
একটা বাল্ব জ্বলছে। অফিসার উঠে বাল্বের সুইচটা বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘সব রকম সন্দেহ আপনার উপরে আসছে। আপনি বুঝতে পারছেন না। ঠিক আছে, আপনি বাড়ি যান।’
অরিত্র বলল, ‘কোনরকম সন্দেহই আমার উপরে আসছে না। আপনারা জোর করে আমার উপর কোনও কিছু প্ল্যান্ট করার তালে আছেন। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি।’
অফিসার অরিত্রর দিকে তাকিয়ে চোখ ছোট করে বলল, ‘আপনি বাড়ি চলে যান। আপনার গাড়িটা আটক হবে। পরে দেখছি কী করা যায়।’
অরিত্র বলল, ‘আপনারা সিসিটিভিতে দেখেননি? আমার কোনও দোষই ছিল না। খামোখা আমার গাড়িটা আটকে রাখছেন কেন? আমার স্ত্রীকে খুঁজতে গাড়িটা দরকার ছিল। প্লিজ গাড়িটা ছেড়ে দিন।’
অফিসার বলল, ‘বললাম তো, আমরা সব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছি। কিন্তু এই মুহূর্তে আপনার যা অবস্থা, আমরা আপনাকে গাড়ি চালাতে দিতে পারি না। দেখছি কী করা যায়।’
অরিত্র বলল, ‘আর এণাক্ষী? ওর কোনও খবর পাওয়া গেছে?’
অফিসার অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি শিওর, জানেন না আপনার স্ত্রী কোথায়?’
অরিত্র বলল, ‘আমাকে বার বার একই প্রশ্ন করে যাচ্ছেন কেন বলুন তো?’
অফিসার বলল, ‘আপনি এখন ভদ্রভাবে বাড়ি চলে যান। মনে রাখবেন, অতিরিক্ত সক্রিয়তা বিপদের কারণ হতে পারে।’
কথাটা বলে অফিসার হাসল। অরিত্র অবাক চোখে অফিসারের দিকে তাকিয়ে রইল। অতিরিক্ত সক্রিয়তা মানে?
৪৭
খারাপ সময় এলে কি মাথার উপর শকুন ঘুরে বেড়ায়? কাক চিলে তার শরীর নেবে বলে ঝগড়া শুরু করে? এরকমই তো শুনেছিল ছোটবেলায়।
কোত্থেকে একটা পাখি এসে মাথার উপরে ঘুরছে। বাজারসুদ্ধ লোক নুরুলের দোকানের দিকে দৌড়চ্ছে। পূর্ণ হতবাক হয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।
ফোন বাজছে। পূর্ণ ফোন ধরল, ‘হ্যাঁ।’
বাপিদা বলল, ‘বাড়ি যাচ্ছ?’
পূর্ণ বলল, ‘আরে বাড়ি যাব কী, নুরুলকে কে খুন করে দিয়েছে!’
বাপিদা হাসল, ‘তাই নাকি?’
পূর্ণ বলল, ‘হাসছ তুমি? এটা হাসার বিষয়? তুমি এখানে থাকতে না? নুরুলকে চেনো না তুমি? জানো না ওর পরিবার আছে?’
বাপিদা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘আমার জানার দরকার নেই। আমি শুধু এটুকু জানি, তুমি যদি ওই টাকার ব্যাপার আর কাউকে বলো, তার অবস্থাও নুরুলের মতো হবে। তুমি কি সেটা চাও?’
পূর্ণ হতভম্ব হয়ে বলল, ‘মানে? তুমি করিয়েছ?’
বাপিদা বলল, ‘বাড়ি যাও। অনেক কাজ আছে। বাজারে দাঁড়িয়ে থেক না। ইমন পেইন্টের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছ, যাও। ফিরে যাও।’
পূর্ণ বলল, ‘তুমি দেখতে পাচ্ছ কী করে?’
বাপিদা বলল, ‘ইচ্ছে করলে সব দেখা যায়। যা বলছি করো।’
ফোন কেটে গেল। পূর্ণ বোকাসোকা মানুষ। বেশি বুদ্ধি তার কোনকালেই ছিল না। কিন্তু বাপিদার কথা শুনে সে ভয় পেয়ে গেল। চেনা জানা মানুষটা কেমন যেন অচেনা হয়ে গেছে।
টোটো যাচ্ছিল একটা। পূর্ণ তাতেই উঠে বাপিদার বাড়ির ঠিকানা বলল। টোটোওয়ালা বলল, ‘নুরুলদা মার্ডার হয়েছে, শুনেছেন?’
পূর্ণ বিড়বিড় করে বলল, ‘হ্যাঁ, শুনেছি বাপু। তুমি তাড়াতাড়ি চলো। বাড়িতে অনেক কাজ।’
টোটোওয়ালা বক বক করে যেতে লাগল, ‘ভাবা যায় না, এসব এলাকায় এককালে একটাও বাইরের লোক আসত না। আর এখন নাকি কে বাইকে করে এসে খুন করে দিয়ে গেল! কী অবস্থা বুঝতে পারছেন? আর সে কী টিপ! কুত্তামারা টিপ যাকে বলে। কপালের মাঝ বরাবর গুলি করে দিয়ে গেছে। ভালো মানুষ ছিল। কারো সাতে পাঁচে থাকত না। সেই লোকের এই হাল করে দিয়ে গেছে। ভাবা যাচ্ছে না।’
পূর্ণ বলল, ‘কী আর করা। সবার নিজের নিজের কপাল।’
বাড়ির সামনে নেমে পড়ল পূর্ণ। তালা খুলে ঘরের ভেতর গিয়ে তালা বন্ধ করে ঢুকে পড়ল।
বুক ঢিব ঢিব করছে। ফোন বাজল আবার। সে ফোন ধরতেই বাপিদা বলল, ‘তোমাকে বোকা ভাবতাম। তুমি তো তেমন বোকা না। আলমারি খোলার জন্য যথেষ্ট বুদ্ধি দরকার। সেটা যখন পেরেছ, তাহলে আমার অন্য কাজগুলোও করতে পারবে। এক কাজ করো। আমার বেডরুমে দেখো একটা ব্যাগ আছে। টাকাগুলো ওই ব্যাগে ভরে নাও। একটা ঠিকানা পাঠাচ্ছি। দিনের আলো থাকতে বেরিয়ে গিয়ে ব্যাগটা ওই ঠিকানায় দিয়ে এস। পারবে?’
পূর্ণর ঘাম হচ্ছিল। সে কোনমতে বলল, ‘আমার বুক ধড়ফড় করছে বাপিদা। নুরুলকে তুমি মেরে দিলে? নুরুল আমার বন্ধু ছিল।’
বাপিদা বলল, ‘মানুষ মরল বাঁচল, তাতে কিছু যায় আসে না। এই যে তুমি না খেতে পেয়ে ঘুরে বেড়াতে, তোমার বন্ধু কি তোমায় খাইয়ে দিত? নিজেই ভেবে দেখো। এই পৃথিবীতে কেউ কারো না। একেক জন, একেক রকম। তুমি তোমার মতো। নুরুল নুরুলের মতো। আমার কথা শুনে কাজ করো, তোমাকে না খেয়ে থাকতে হবে না। তোমাকে বোকা ভাবাটা আমার ঠিক হয়নি। আগে জানতে পারলে নুরুলের প্রাণটা বাঁচত এই যা। ব্যাগে টাকাগুলো ভরে নাও। উলুবেড়িয়া গেছ কোনওদিন?’
পূর্ণ বলল, ‘না।’
বাপিদা বলল, ‘হাওড়া গিয়ে ওখান থেকে মেচেদার দিকের লোকাল ট্রেন ধরবে। উলুবেড়িয়া নেমে রিকশা নিয়ে আমার পাঠানো ঠিকানা বলবে, নিয়ে যাবে। কাজ করো। খাবারের চিন্তা করতে হবে না।’
পূর্ণর বমি পাচ্ছিল। সে ফোন কেটে দিল।
৪৮
হোটেলের রুমে ফিরে এসেছে সে। টিভি দেখছে স্থির হয়ে বসে। আবেগ শূন্য হয়ে গেছে সে। কী হবে ভেবে?
যত ভাববে, তত সমস্যা বাড়বে।
দিব্যেন্দু যখন প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে মারত, প্রথম প্রথম অনেক ভেবেছে। পরে দেখেছে, আসলে ওসব ভেবেটেবে কিছু হয় না। যা হবার, তা হয়েই যায়।
হোমে দিব্যেন্দুকে দেখার পর হৃদস্পন্দন থমকে গেছিল তার। মনে হচ্ছিল যেকোনও সময় হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে। কী ভয়ংকর একটা মুহূর্ত। আবার সে লোকটার মুখোমুখি! পৃথিবীতে কি দিব্যেন্দুর থেকেও ভয়ংকর কেউ হতে পারে? না বোধহয়।
দিব্যেন্দু অফিস থেকে ফিরে জুতো খুলতে খুলতে বলত, ‘আফগানিস্তানের গল্প শুনলাম। ওখানে বউরা যদি বরের কথা না শোনে, মাথায় পাথর ঠুকেই মেরে দেয়। বুঝতে পারছ, কী ভয়ংকর ব্যাপার? তার তুলনায় আমি কী? কিচ্ছু না। আমি তো আসলে ভালোবাসি তোমায়। এই যে মারি, মারার পরে কি আমার কষ্ট হয় না? কিন্তু কী করব? বউকে সিধে রাখতে হলে মারতে হয়।’
রুমা চুপ করে বসে থাকত। কী আর বলবে? বাড়ির লোক যদি সাপোর্ট না দেয়, তাহলে সব রকম পরিস্থিতি সহ্য করতে হয়। একবার কী মনে হল, মাঝরাতে হঠাৎ করে ঠেলে তুলে দিয়ে বলল, ‘একটা কাজ করো। বাড়ির বাইরের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাক। দেখা যাক কী হয়।’
রুমা কোনও প্রতিবাদ করেনি। চুপচাপ গিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।
দিব্যেন্দু জানলা থেকে চুপ করে বসে তাকে দেখছিল। রুমা কাঁদেনি। পাড়ার কুকুরগুলো এসে একবার তাকে ঘিরে ডেকে চলে গেল। রুমা ভয় পায়নি। ভয়গুলো এভাবেই জয় করতে হতো।
কিছুক্ষণ পর দিব্যেন্দু তাকে ডাকল। সে আবার ঘরের ভেতর এল। দরজা বন্ধ করতে করতে শুনল দিব্যেন্দু বলছে, ‘রাস্তায় দাঁড়ান অভ্যাস আছে তার মানে। দাঁড়িয়েছিলি নাকি কোনদিন?’
রুমা সে কথারও প্রতিবাদ করেনি।
প্রতিবাদ করার ইতিহাস মনে আছে তার। ব্লেড দিয়ে এমন ভাবে হাত চিরে দেবে, অসহ্য যন্ত্রণা হয়। একবার কাটা জায়গায় নুন দিয়ে দিয়েছিল। ব্যথায় সে চিৎকার করছে, দিব্যেন্দু এসে মুখে হাত দিয়ে বলেছে, ‘গলা নামিয়ে চিৎকার কর শুয়োরের বাচ্চা, পাশের বাড়ির লোক জেগে যাবে।’
কলিং বেল বাজল। রুমার হুঁশ ফিরল।
সে দরজা খুলল।
লোকটা বলল, ‘আসব?’
রুমা কিছু না বলে দরজা থেকে সরে দাঁড়াল।
লোকটা ঘরের ভেতর ঢুকে বলল, ‘তুমি আমার উপর রাগ করে আছ। রাগ করে থেকো না। রাগ কোনও কিছুর সলিউশন হতে পারে না। আজ না হোক, কাল তোমার হাজব্যান্ড ওই হোমের ঠিকানা ঠিকই পেয়ে যেত। তারপর কী হতো ভেবে দেখেছ?’
রুমা পাথুরে মুখে বলল, ‘ভাবতে চাই না। আমাকে কী করতে হবে, সেটা বলুন।’
লোকটা বলল, ‘তোমার ট্রেনিংটা হোক। তারপর তুমি ঠিক করে নিও।’
রুমা বলল, ‘আপনি বলেছিলেন হানি ট্র্যাপ করাবেন। শেষ অবধি ওটাই করতে হবে তো?’
লোকটার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। বলল, ‘ব্রাভো। তোমার মেমোরি তো খুব শার্প। এই কাজে মেমোরি শার্প হওয়া মাস্ট। একটা কোনও কথা শুনলে, কোনও কোড, কোনও ফোন নাম্বার, মনে রাখতে হবে। তুমি টুয়েলভ অবধি পড়েছ, তারপর পড়া হয়নি। বাড়ির লোক জোর করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল। ছেলেটার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করার প্রয়োজন বোধ করেনি।’
রুমা বলল, ‘চেক করলে কি জানা যেত ছেলেটা ওভাবে মারে?’
লোকটা বলল, ‘তুমি শক্তিশালী হলে মারতে পারত না। ধর তোমাকে মারতে এল, তুমি এমন একটা প্যাঁচ দিলে, উল্টে পড়ে গেল। কোনওদিন প্রতিরোধ করনি। করলে এত খারাপ অবস্থা হতো না।’
রুমা বলল, ‘করার কথা মনে হয়নি। বাড়িতে পাঠিয়ে দিলে রাখত না।’
লোকটা বলল, ‘ঠিক রাখত। এই ধরনের সাইকোপ্যাথরা শক্তের ভক্ত। নরমের যম। তুমি কি কাল থেকে ট্রেনিং শুরু করতে প্রস্তুত?’
রুমা বলল, ‘আপনি যা বলবেন।’
লোকটা বলল, ‘তুমি এখনও ভাবছ তোমাকে জোর করা হচ্ছে, তাই না?’
রুমা ম্লান হাসল, ‘সবাই একটা কথাই বলে। আমার ভালোর জন্যই নাকি করা হচ্ছে। বাবা-মা বলল ভালোর জন্য বিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ও বলল ভালোর জন্য মারা হচ্ছে। কোনটা খারাপ, সেটাই ভাবছি।’
লোকটা বলল, ‘বেঁচে থাকতে চাও তো এত কিছুর পরেও? সেটার থেকে ভালো আর কী হতে পারে?’
রুমা উত্তর দিল না।
.
৪৯
রাত গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে।
গলির সামনে ভিড় বাড়ছে একটু একটু করে। যেন কোনও উৎসব চলছে। কত রকম মানুষ আসে, একেক জনের একেক রকম চাহিদা। প্রথম প্রথম সবাই ভয়ে ভয়ে থাকে। এক দিন, দু-দিন করতে করতে যখন অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন তাদের শরীরে আত্মবিশ্বাস ঝকঝক করতে থাকে।
সুখেনের দুটো কাস্টমার হয়েছে। পকেটে দুশো টাকা এসেছে। সে চায়ের দোকানে গিয়ে বসল।
আরেকটু রাত হলে আরও মজা হয়। সুখেন আসলে রাতের প্রতীক্ষাই করে দিনভর। রাত হলে সে বেঁচে থাকার রসদ পায়।
লুকা সাঁতরার গাড়ি গলির সামনে আসতেই সুখেন উঠে পড়ল। লুকা দিব্যেন্দুকে তুলেছিল। কী কেস জানতে হবে।
লুকা গাড়ি থেকে নামতেই একটু দূরত্ব রেখে সে চিৎকার করল, ‘দাদা, প্যাকেজটা কী করলেন?’
লুকা সিগারেট টানছিল। সুখেনকে দেখামাত্র হাতছানি দিয়ে ডাকল। সুখেন কান ধরল, ‘মারবে দাদা।’
লুকা বলল, ‘চাইলে অনেক আগেই উড়িয়ে দিতে পারতাম। এদিকে আয়।’
সুখেন ধীর পায়ে লাজুক মুখে লুকার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
লুকা সুখেনের কান ধরে জোরে মুলে দিল, ‘তোর নাকি পাখনা গজিয়েছে?’
সুখেনের লাগছিল। তাও চিঁচিঁ করে বলল, ‘দাদা, তোমরাই তো রাখবে, তোমরাই তো মারবে। আমি ভাবলাম লোকটাকে যদি হাপিশ করে দাও। এমনি তো দোষ কিছু করেনি। হাতুড়িটা নাকি ওর মুদ্রাদোষ।’
এক রাস্তা লোকের সামনে লুকা তাকে লাথি মারল। পরপর কয়েকটা চড় মেরে বলল, ‘আমার কথা না শুনে নিজের বুদ্ধি খাটাতে গেলে এরপরে ধাপার মাঠে তোর লাশ পাওয়া যাবে। আমার কথার নড়চড় হয় না।’
কান মাথা ঝিঁঝি করছে। যে কাজ সে করে, তাতে অপমান বলে কোনও শব্দ হয় না। তাও সুখেনের খারাপ লাগছিল। সে বলল, ‘ভুল হয়ে গেছে দাদা। আর হবে না।’
লুকা বলল, ‘ভুল বলে কিছু হয় না। তুই পুরোনো শুয়োর বলে তোকে হালকার উপরে ছাড়লাম আজ। আমার ছেলেদের তুই বলেছিলি রাতেই ওকে ট্যাক্সিতে তুলে দিয়েছিস। কিন্তু তুই তা করিসনি। নিজের কাছে রেখেছিলি। তুই কী ভেবেছিলি, এসব করবি আর কিছু হবে না?’
সুখেন বলল, ‘দাদা, মালটাকে আমি একটু দেখতে চেয়েছিলাম। মানে এরকম তো দেখিনি, তুমি কি দেখেছ? বেশ্যাপাড়ায় এসে পায়ে হাতুড়ি মারে, দেখব না?’
লুকা জ্বলন্ত চোখে সুখেনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সাতদিন এলাকায় ঢুকবি না। তোকে সাতদিনের জন্য এখান থেকে বের করা হল। ফের যদি তোকে এলাকায় দেখেছি, তাহলে তুই খবর হয়ে যাবি।’
সুখেন কাঁদার নাটক করল, ‘এরকম করে বললে কী করে হবে দাদা? আমি কী খাব? না খেতে পেয়ে মরবো তো। তোমার দয়ার শরীর। ছেড়ে দাও।’
লুকা মাথা নাড়ল, ‘তোর অনেক বাড় বেড়েছে সুখেন। আমি অনেক দিন ধরেই দেখছি। তুই যদি ভেবে থাকিস কেউ কিছু বোঝে না, তাহলে তুই মূর্খের স্বর্গে বাস করছিস। আমি যা বলেছি, তাই হবে। সাতদিন তোকে যেন না দেখি। যদি দেখতে পাই, তোর খবর আছে।’
সুখেন কান ধরল। আরেকটা গাড়ি এসে গলির মুখে দাঁড়াল।
লুকা ইশারা করল। সুখেন দেখল গাড়ি থেকে একটা বউ নামল। দেখে বোঝা যাচ্ছে, মেয়েটা হকচকিয়ে গেছে। ভয় পাচ্ছে। একবারে ভদ্রবাড়ির মেয়ে দেখলেই বোঝা যায়।
লুকা মেয়েটাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সুখেন ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল। বোঝা যাচ্ছে মেয়েটাকে নিয়ে লুকার কোনও প্ল্যান আছে। গলির ভেতরে ঢুকে জোর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে শমিতার ঘর থেকে নিরাপদ দূরত্বে একটা ঘরের ছাদে উঠে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে বসে রইল।
ঠিক যা ভেবেছিল তাই।
মেয়েটাকে নিয়ে শমিতার ঘরে ঢুকল লুকা।
সুখেন ভ্রু কুঁচকে চিন্তা করতে লাগল, কী করে শমিতার ঘরের ভেতর ঢোকা যায়।
