অপারেশন ট্রেইটর – ৫০

৫০

সোবাহান তিনটের সময়েই এলেন।

জাহিরের চেম্বারের ওয়েটিং রুমে নির্মল টিভি দেখছিল। সোবাহান এলে নির্মলকে ডেকে নিলেন জাহির।

নির্মল চেম্বারে প্রবেশ করতেই সোবাহান তাকে দেখে বললেন, ‘সাদিকের ফাইল তোমার কাছে কিছু আছে?’

নির্মল বলল, ‘না। আমার কাছে কিছু নেই। অফিসেই ছিল যা থাকার।’

সোবাহান একটা মাত্র ফাইল নিয়ে এসেছিলেন। জাহিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘জনাব আমার কাছে এই একটা ফাইলই আছে। এই ফাইলে সাদিকের বিষয়ে তেমন সন্দেহজনক কিছু নেই। আসগর এককালে ক্রিমিনাল ছিল, পরে ভালো হয়ে যায়। সাদিক ওকে সৎ পথে নিয়ে আসে।’

নির্মল বলল, ‘ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট থেকে সাদিকের ফাইলগুলো আনার ব্যবস্থা করা হোক। সেখান থেকেই ওর যাবতীয় ট্রানজাকশানের সম্পর্কে জানা যাবে।’

জাহির বললেন, ‘সে সব ঠিক আছে। সোবাহান সাহেব, আপনি নির্মলকে ট্রেনিং ডিপার্টমেন্টে দিয়েছেন কেন?’

সোবাহান বললেন, ‘আমি দিইনি তো। আনোয়ার সাহেবের সময় থেকেই ওকে ওখানে দেওয়া হয়েছে। আমি মন্ত্রীসাহেবের হুকুম তামিল করেছি মাত্র। ওকে ওর ভালোর জন্যই ওখানে দেওয়া হয়েছিল জনাব। নিরাপত্তার ব্যাপার আছে। যদি সাদিক শেখ সত্যিই বড় প্লেয়ার হয়, তাহলে নির্মলকে টার্গেট করবে। সেটা তো হতে দেওয়া যায় না।’

জাহির বললেন, ‘ওকে যেখানে ছিল, সেখানে দিন। বাকিটা আমি দেখছি।’

সোবাহান বললেন, ‘জি জনাব। আমি যাব এখন?’

জাহির বললেন, ‘যান। বাই দ্য ওয়ে নির্মল, সাদিকের ট্যাক্সের ফাইলটা কে দিয়েছে তোমাকে?’

নির্মল বলল, ‘আমার এক বন্ধু। সোর্সটা বলা যাবে না স্যার।’

জাহির মাথা নাড়লেন, ‘তা ঠিক। তোমার ফ্যামিলি আছে তো?’

নির্মল বলল, ‘জি জনাব। স্ত্রী।’

জাহির বললেন, ‘তোমার ভয় লাগে না? বউ নিয়ে সংসার করছ, এই যে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ফাইল নাড়াচাড়া করছ, যদি ওদের কাছে খবর যায়, তোমার বউকে তুলে নিয়ে যায়, তাহলে কী হবে?’

নির্মল চমকে জাহিরের দিকে তাকাল। জাহির বললেন, ‘সোবাহানকে আমিই চার্জ দিয়েছিলাম।’

নির্মলের মাথা কাজ করছিল না। এই একটু আগেই তো জাহির অন্য কথা বলছিলেন! সোবাহান হাসছিলেন। জাহিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সংখ্যালঘুদের নিয়ে এই সমস্যা বুঝলেন জনাব। এরা সবসময় দেখাতে চায় এরা দেশকে ভালোবাসে। আসলে তো কাজ করে ইন্ডিয়ার জন্য। আবার কেমন সাহস দেখুন, আপনার কাছেও চলে এসেছে।’

নির্মলের শরীরটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল।

জাহির বললেন, ‘তোমরা ইন্ডিয়ায় চলে যাও না কেন নির্মল? সুন্দর দেশ। কলকাতা সাইডে একটা জমি কিনে নিলে। নেতাদের টাকা খাইয়ে ওখানকার আইডিও পেয়ে যাবে। কী দরকার এ দেশে পড়ে থাকার? তুমি ট্রেনিং ডিপার্টমেন্টে থাকতে চাও না, ঠিক আছে, এক কাজ করো, আমি তোমাকে মায়ানমার সীমান্তে ট্রান্সফার করছি। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের চার্জটা বরং তুমি নিয়ে নাও। ওদিকে থাকলে খানিকটা বুঝতে পারবে বাকি দেশগুলো কীভাবে সংখ্যালঘুদের ট্রিট করে। নিজেই ঠিক করো, কলকাতা পালাবে না মায়ানমার সীমান্তে যাবে।’

সোবাহান বললেন, ‘তাই দিন জনাব। ওর রক্ত গরম। এখন ব্যস্ত থাকুক। ঢাকা ওর জন্য না। ছোট ভাইয়ের মতো বোঝালাম, বাবা, আনোয়ার সাহেবকে দেখে শিক্ষা নাও। ওই লোকেরও তো অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল। সে থাকতেই পারে। ছেলের সে ইচ্ছাই নাই! তোমাকে রিম্যান্ডে নিলাম না, হ্যারাসও করলাম না, শুধু তোমাকে একটা ভদ্র জায়গা দিলাম, বললাম শান্ত হয়ে বসে চাকরিটা কন্টিনিউ করো, ট্রেনিং দাও, কিন্তু না! ছেলের হিরো সাজতে লাগবে। সব ইন্ডিয়ান সিনেমা দেখার ফল। এভাবেই আমাদের দেশটা ইন্ডিয়া ধীরে ধীরে কিনে নিচ্ছে। সবই বুঝতে পারি, কী করব, সহানুভূতির সঙ্গেই তো নির্মলের ব্যাপারটা বিবেচনা করেছি। অন্য কেউ হলে কি ওকে বাঁচিয়ে রাখত বলুন?’

জাহির বললেন, ‘আমিই রাখতাম না। আপনি পরম ক্ষমাশীল।’

বমি পাচ্ছিল নির্মলের। মনে হচ্ছে মাথার উপর যেন কেউ একমণ ভার চাপিয়ে দিয়েছে। দেওয়ালে বঙ্গবন্ধুর ছবিটা যেন তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

সোবাহান বললেন, ‘তাহলে নির্মলের ট্রান্সফার লেটারটা…?’

জাহির বললেন, ‘পেয়ে যাবে এখনই।’

দুজনেই হেসে উঠলেন…।

.

৫১

দাবা খেলছেন দুজনে। মাথুর জিতছেন।

খান চিন্তিত মুখে বললেন, ‘তুমি এত ভালো খেলা শিখলে কবে বল তো? আগে তো আমিই তোমাকে কতবার কিস্তিমাৎ করেছি। ইদানীং তুমি একবারে নতুন স্ট্র্যাটেজি নিয়েছ দেখছি। দাঁড়াতেই দিচ্ছ না। এত আক্রমণাত্মক খেলা শিখে গেছ, ভয় লাগছে তোমার সঙ্গে খেলতে।’

মাথুর বললেন, ‘কাশ্মীরে জওয়ানদের সঙ্গে খেলে খেলে হাত পাকিয়েছি। কর্নেল রায় যেমন। উনি যদি সেনায় না গিয়ে দাবা খেলতেন, তাহলেও অনেক দূরে যেতেন। দে আর অসাম।’

খান কোনমতে রানি বাঁচিয়ে বললেন, ‘সে তো ঠিক আছে, কিন্তু এখানে কাকে ডাকলে লাভ আছে বলে তোমার মনে হয়?’

মাথুর বললেন, ‘আমার তো একজনের কথাই মনে পড়ছে।’

খান বললেন, ‘কার কথা?’

মাথুর বললেন, ‘আরে সায়কের আগে যে করাচীতে ছিল। ওকে কী যেন একটা কারণে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়ে বলা হয়েছিল না যে তুমি জাস্ট এখানে থাকো। তোমাকে আর কোথাও যেতেও হবে না, তোমাকে আর কিছু করতেও হবে না। একপ্রকার শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।’

খান বললেন, ‘অমল? ভেবোও না। তুষার স্যার রেগে যাবেন।’

মাথুর বললেন, ‘হ্যাঁ, সে তো জানি, রেগে যাবেন, কিন্তু ঘটনাটা কী হয়েছিল করাচীতে? কী করেছিল অমল?’

খান বললেন, ‘জানি না। সেগুলো স্যার জানেন। তবে ঢাকার কোনও ব্যাপারে ওকে ইনভল্ভ করা হয় না, এটা তো অলিখিতভাবে সবাই জানে।’

খানের ফোন বেজে উঠল। তুষার ফোন করছেন। খান স্পিকারে দিলেন, ‘হ্যাঁ স্যার।’

তুষার বললেন, ‘তোমাকে অদ্ভুত একটা খবর দিই খান। শেখাওয়াত বহু আগেই অমলকে অপারেশনে নিয়ে নিয়েছিল। অমল ঢাকায় বেশ খানিকটা সময় ধরেই সক্রিয়!’

মাথুর শিস দিয়ে উঠলেন, ‘কী অদ্ভুত ব্যাপার স্যার, আমরা এতক্ষণ ওর ব্যাপারেই আলোচনা করছিলাম। আপনি আমাদের বলতেন ওকে অপারেশনে নেওয়া যাবে না, এদিকে শেখাওয়াত ওকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছে? এরকম কন্ট্রাডিক্টরি কেন ব্যাপারটা?’

তুষার বললেন, ‘জানি না। শেখাওয়াতের কথা একবারেই ট্রান্সপারেন্ট না। আমার মনে হচ্ছে ও অনেকখানি কথা পেটে রেখে তবেই কথা বলছে। ওকে আমি সবটা বিশ্বাসও করতে পারছি না। কিন্তু এই মুহূর্তে যদি অমল অ্যাক্টিভ থাকে, তাহলে আমি অমলকে ছাড়া আর কারো নাম ভাবতে পারব না। শেখাওয়াত একটা নাম্বার দিয়েছে। সেন্ড করছি। কন্ট্যাক্ট অমল।’

খান বললেন, ‘ওকে স্যার।’

তুষার বললেন, ‘শেখাওয়াত ঠিক কী কী করে রেখেছে, আমি এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। অমলের সঙ্গে আরেকটা ছেলে থাকার কথা। সে কন্ট্র্যাক্ট কিলার। শেখাওয়াত ওকে অমলের কাছে পাঠিয়েছে কাজ শেখার জন্য।’

খান ভ্রু কুঁচকে মাথুরের দিকে তাকালেন, ‘যা ইচ্ছে তাই করছে তো!’

তুষার বললেন, ‘করতে পারে। শেখাওয়াত সব সময় কিছু না কিছু প্রমাণ করার চেষ্টা করেই যায়। এবারেও তাই করেছে। যাই হোক, ওসব নিয়ে ভেবো না, ওকে কন্ট্যাক্ট করো। আই এস আইয়ের হাতে আমাদের যেই থাকুক, তাকে রেসকিউ করা আমাদের ফার্স্ট প্রায়োরিটি। বাকি পরে দেখা যাবে। ক্লিয়ার?’

খান এবং মাথুর দুজনেই বললেন, ‘ক্লিয়ার স্যার।’

তুষার বললেন, ‘ওকে, টেক কেয়ার। আপডেট দিয়ে যাবে।’

ফোন কেটে দিলেন তুষার। খান মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘শেখাওয়াত কী করতে চাইছে বল তো? ওর মধ্যে আমি দেখেছি হিরো সাজার একটা ব্যাপার ছিল বরাবরই। যেদিনই ঢাকা থেকে আমরা সরে গেলাম, সেদিন থেকে ও অমলকে অ্যাক্টিভেট করেছে। অথচ আমি জানতাম…’

মাথুর বললেন, ‘কী জানতে?’

খান বললেন, ‘থাক। পরে সব ঘটনা মনে করে তারপর না হয় বলব। হতে পারে আমি ভুল।’

তুষার নাম্বার পাঠিয়েছেন। খান দেরি করলেন না, নাম্বারটায় ফোন করলেন। একটা রিং হতেই ও-প্রান্তে ফোন রিসিভ হল, ‘হ্যালো।’

খান বললেন, ‘আকাশে মেঘের সঙ্গে অ্যালিয়েন দেখা যাচ্ছে।’

ও-প্রান্ত বলে উঠল, ‘অ্যালিয়েন আমেরিকা ছাড়া কিছু চেনে না।’

খান হেসে উঠলেন, ‘রিয়েলি ফানি। আপনি অমল?’

‘না। ইমতিয়াজ। আপনি?’

খান বললেন, ‘বাবা চাইছে ছেলে মা’র সঙ্গে কথা বলুক।’

একটু নীরবতা। তারপর অমলের গলা পাওয়া গেল, ‘বলুন।’

খান বললেন, ‘পাখি শহরের কাছে ঘুরছে না?’

‘না। পাখি তাড়া খেয়েছিল।’

‘ওকে। বুঝেছি। পাখির ঈদে জামা হবে, ট্রায়াল দেওয়ার দরকার। সব কাজ ফেলে আগে জামা কেনা দরকার।’

‘কিন্তু ঈগল সীতাকে নিয়ে গেছে।’

‘একসঙ্গে খোঁজা যাবে। আগে এখানে।’

‘ওকে।’

খান মাথুরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আসছে।’

মাথুর বললেন, ‘ওকেই জিগ্যেস করব করাচীতে কী হয়েছিল?’

খান হেসে ফেললেন, ‘একবারেই না। কাজের বাইরে কোনও কথা বলবে না।’

মাথুর কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘ওকে হুজুর। আপনার যেমন মর্জি।’

.

৫২

বৃষ্টি পড়ছে গাড়ির উইন্ডশিল্ডে। সাদা হয়ে যাচ্ছে চারদিক। নির্মল চুপ করে বসে আছে। চোখের কোণে জল আসছে, সে আর মোছার চেষ্টা করছে না।

এ দেশটা তার না? জন্মভূমি, তার সব স্মৃতি তো এই দেশেই। এই দেশের মানুষদের কোনদিন পর বলে ভেবেছিল সে? চাকরি করতে গিয়ে প্রতিকূলতা থাকলেও যতদিন আনোয়ার সাহেব ছিলেন, কোনদিন মনে হয়নি এদেশ তার না। আজকে এভাবে অপমানিত হতে হল?

জাহিরের চেম্বার থেকে বেরোনোর সময় শরীর খারাপ লাগছিল তার। আশাভঙ্গ একরকম, আর এ তো কেউ ডেকে এনে চড় মারার মতো ব্যাপার!

গাড়ি স্টার্ট দিতে পারছে না। পা কাঁপছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে।

বৃষ্টিটা ধরে এল হঠাৎ করেই। একটু বসে থেকে গাড়ির দরজা থেকে বেরোতেই দেখল আলমগির হোসেন দল নিয়ে চলে এসেছেন, ‘চলো।’

নির্মল বুঝল তাকে রিমান্ডে নিতে এসেছে। সে বলল, ‘স্ত্রীকে একটা ফোন করতে পারি? এতদিন একসঙ্গে কাজ করেছি, এটুকু করতে দেবেন তো?’

আলমগির থমথমে মুখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘করে নাও।’

নির্মল কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন বের করে দীপাকে ফোন করল।

দীপা ফোন ধরেই বলল, ‘কোথায় থাকো বলো তো? আমরা কক্সবাজারে এসেছি। কী মজা হচ্ছে! মামা বলছে যেখানেই থাকুক জামাইকে এখানে চলে আসতে বল। চলে এস না।’

নির্মল কয়েক সেকেন্ড ধরে থেকে বলল, ‘আমাকে রিমান্ডে নিচ্ছে দীপা।’

দীপা আর্তনাদ করে উঠল, ‘মানে? ইয়ার্কি মারছ তুমি?’

নির্মল বলল, ‘না। রিমান্ডে নিচ্ছে। সাবধানে থেক। আমি যদি আর কোনদিন না ফিরি…’

আলমগির নির্মলের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ফোন কেটে সুইচ অফ করে দিয়ে বললেন, ‘চলো।’

নির্মল গাড়ির চাবিটা আলমগীরের হাতে দিয়ে বলল, ‘আমার গাড়িটা বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করলে ভালো হয়।’

আলমগির নির্মলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে। আমি পাশে বসছি। তুমি বাড়িতে গাড়ি রেখে চলো।’ আলমগির বাকিদের বললেন, ‘নির্মলের গাড়িটা ফলো করে এস।’ বাকিরা জিপে উঠে পড়ল।

নির্মল গাড়িতে উঠে বসল। আলমগির তার পাশে। নির্মলের পা কাঁপছে, হাত কাঁপছে। আলমগির সেটা দেখে বললেন, ‘আমি চালাচ্ছি।’

নির্মল গাড়ি থেকে নামল। আলমগির ড্রাইভিং সিটে এসে বসলেন। নির্মল বসল। গাড়ি স্টার্ট করে আলমগির বললেন, ‘কী করেছ তুমি? এই তো সারাক্ষণ আনোয়ার সাহেবের সঙ্গে কাজ করছিলে। এখন রিম্যান্ডে নিচ্ছে কেন?’

নির্মল জানলার বাইরে তাকাল। শহরটাকে অচেনা লাগছে। এখন তাহলে সে বিদেশে আছে? এ দেশটা তো তার নয়!

আলমগির হর্ন দিলেন, ‘শুনতে পাচ্ছ কী বলছি? কী করেছ যে সোবাহান সাহেব আমাকে স্পেশাল ইন্সট্রাকশন দিলেন তোমাকে এখনই রিমান্ডে নিতে হবে? তাড়াতাড়ি বলো, দেরি কোরো না।’

নির্মল বলল, ‘আমাকে বলা হয়েছে আমি ইন্ডিয়ার এজেন্ট। আমি জানি না আমি কী করেছি ইন্ডিয়ার এজেন্ট হবার মতো।’

আলমগির বললেন, ‘ব্যস? আর কিছু করোনি?’

নির্মল বলল, ‘একজনকে এক্সপোজ করতে গেছিলাম। বুঝলাম তার হাত অনেক উপরে। আর কী বলি বলুন তো?’

আলমগির বললেন, ‘হুঁ। মানে তোমার জায়গায় যেকোনও দিন আমিও থাকতে পারি আর কী।’

নির্মল বলল, ‘তা কেন? আপনি তো আর সংখ্যালঘু নন। আপনাকে শুনতে হবে না আপনি ইন্ডিয়ার এজেন্ট।’

আলমগির চুপ করে গেলেন। নির্মলের বাড়িতে গাড়ি পার্ক করা হল। নির্মলকে জিপে তোলা হল। সেই একই বিল্ডিং। কত লোককে এখানে এনে জেরা করেছে সে। এবার তাকে জেরা করা হবে। বাজে একটা কারণ দেখিয়ে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে। নির্মল অনেকটা স্বাভাবিক হচ্ছিল। শেষটা জানলে টেনশন করার কোনও কারণ থাকে না।

করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আলমগির গলা নামিয়ে বললেন, ‘লোকটা কি সাদিক শেখ?’

নির্মল অবাক হল, ‘আপনি কী করে জানলেন?’

আলমগির বললেন, ‘সাদিক সোবাহানের দুলাভাই। তুমি কেন, অনেকেই জানে না সেটা। আমরা যারা পুরোনো লোক, তারা জানি।’

নির্মল হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

.

৫৩

‘আমরা সাদিকের বাড়ি নামব না। আগে নেমে যাব।’

গাড়ি সবে শহরে ঢুকেছে। ফোন রেখে অমল ইমতিয়াজের দিকে তাকাল। অমলের কথা শুনে ইমতিয়াজ অবাক হল।

‘কেন? কী হয়েছে?’

অমল বলল, ‘তুমি চলে যাও। আমাদের নামিয়ে দাও।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘ফোনটা কে করেছিল?’

অমল বলল, ‘তোমার জানা উচিত। তুমি জানো না?’

ইমতিয়াজ গম্ভীর হয়ে বলল, ‘উস্তাদ ফোন করেননি। উস্তাদ ছাড়া অন্য কারো কথা শোনা ঠিক হবে না।’

অমল বলল, ‘আমি কোডের গোলাম বস। আমার এখানে কিছু করার নেই।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘বেশ। তুমি যখন বলছ, তখন তাই হোক। কোথায় নামাব?’

অমল বলল, ‘এখানেই নামিয়ে দাও। এখান থেকে ফিরতে সুবিধে হবে তোমার।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘আমি যাব না?’

অমল বলল, ‘না। তুমি চলে যাও।’

রাণা অবাক হল। ফোনটা আসার পর থেকে অমল কেমন পাল্টে গেল।

ইমতিয়াজ গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল। অমল রাণার দিকে তাকাল, ‘অস্ত্রটা ফেরত দিয়ে দাও।’

রাণা কোনও কথা না বলে ইমতিয়াজের গাড়ির সিটে সন্তর্পণে রিভলভারটা রেখে দিল।

অমল গাড়ি থেকে নামল, ‘চলো।’

রাণা নামতে যেতেই ইমতিয়াজ বলল, ‘আজকেই করবে। মাথায় রেখো।’

রাণা কথা না বলে গাড়ি থেকে নেমে গেল। ইমতিয়াজ বেরিয়ে গেল। অমল একটা সি এন জি ধরে ঠিকানা বলল। সি এন জি চলতে শুরু করলে রাণা ফিসফিস করে বলল, ‘কী হচ্ছে বুঝতে পারছি না।’

অমল ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারায় রাণাকে চুপ করে যেতে বলল।

রাণা আর কোনও কথা বলল না। দোকানের সামনে এসে সি এন জি ছেড়ে দিল অমল।

ট্রায়াল রুমে ঢুকে নক করতেই দরজা খুলে গেল।

খান বললেন, ‘এস এস।’

দুজনে ঘরে ঢুকতে খান দরজা বন্ধ করে দিলেন।

মাথুর বললেন, ‘সেই ফেমাস অমল, হ্যাঁ? আপনার কথা অনেক শুনেছি। কত গল্প, কত মিস্ট্রি, ভাবাই যায় না।’

অমল হাসল, ‘ও রাণা। ওকে উস্তাদ পাঠিয়েছেন আমার সঙ্গে থেকে কাজ করতে।’

খান রাণার দিকে হাত বাড়ালেন, ‘তুমি জানো তুমি কত বড় কাজ করেছিলে? তারেক শেখকে কেমন অনায়াসে উড়িয়ে দিয়েছিলে! আনবিলিভেবল!’

রাণা বলল, ‘আমার কাজই ওটা। তারেক শেখ কী কাজ করে, আমি কিছুই জানতাম না।’

খান বললেন, ‘ঠিক। তোমাকে শেখাওয়াত এখানে পাঠিয়েছে কেন, আমরা সেটাই এখনো বুঝতে পারছি না। যাই হোক, এখন সবার আগে আমাদের লোককে উদ্ধার করতে হবে। তারপর বাকি কথা। আপনি বলুন অমল, আমরা কীভাবে ওকে উদ্ধার করতে পারব।’

অমল বলল, ‘জল খাই একটু? তারপর বলি?’

মাথুর ব্যস্ত হয়ে অমলের দিকে জলের বোতল এগিয়ে দিলেন। অমল অনেকটা জল খেয়ে বলল, ‘লাস্ট তিন বছরে আই এস আই এখানে অনেকটাই শক্তিবৃদ্ধি করেছে। অনেকগুলো জায়গায় ওদের ডেরা হয়েছে। তিন-চারজন রাজাকারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের কাজে লাগানো শুরু হয়েছে। তবে আমার মনে হয় গিয়াস ঢাকার বাইরে নয়, ঢাকার মধ্যেই কোথাও সাকিনাকে রেখেছে। তবে এখনো আছে নাকি জানা নেই। ওরা ওকে নিয়ে যেতে চাইবে যদি না কোনও ম্যাজিকে সাদিক সাকিনাকে আবার নিজের কাছে রেখে দেয় কিংবা…’

একটু চুপ করে থেকে অমল বলল, ‘মেরে ফেলে।’

মাথুর মাথায় হাত দিলেন। খান বললেন, ‘সে মারতেই পারে। কিন্তু ধরে নিয়ে গেলে…কতটা কী জানে আমাদের অ্যাসেট?’

অমল বলল, ‘ঢাকা অপারেশনের সবটাই।’ রাণা অবাক হয়ে অমলের দিকে তাকাল।

খান বললেন, ‘মাই গড। ইজ শি কেপেবল এনাফ?’

অমল বলল, ‘কোন মেয়ে এসে সাদিকের মতো নরকের কীটের সঙ্গে শোবে বলুন তো? আর কত কেপেবিলিটি প্রমাণ করতে হবে?’

খান লজ্জা পেলেন, ‘ছি ছি। আমি সেটা বলিনি। সব জানে বললেন বলেই বললাম। তার মানে শি ইজ দ্য মোস্ট ইমপরট্যান্ট অ্যাসেট নাও। ওর কাছে সব থেকে তাড়াতাড়ি পৌঁছনোর কী উপায়?’

অমল বলল, ‘সাদিক।’

খান বললেন, ‘সাদিক আপনাকে সাকিনার ডিটেলস দেবে কেন?’

অমল বলল, ‘জানি না। কিন্তু ও ছাড়া অত তাড়াতাড়ি কেউ গিয়াসের কাছে নিয়ে যেতে পারবে না। একটা ফোন দিন।’

খান তার ফোন এগিয়ে দিলেন। অমল নাম্বার ডায়াল করল। চট্টগ্রামের ভাষায় কিছুক্ষণ কথা বলে ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘কুড়ি জন মাদ্রাসা স্টুডেন্ট হারিয়ে গেছে। আমাকে সাদিক যেখানে যেখানে পাঠিয়েছিল, তার মধ্যে একটা জায়গার কোডে M ছিল। কাঠমান্ডুর কোড। M=মাদ্রাসা? আমি কাঠমান্ডু গেছি প্রায় এক মাস আগে। এক মাস আগে আজকের প্ল্যানটা করা ছিল তাহলে। আমাকে একটা কাগজ আর পেন দিন প্লিজ।’

খান একটা প্যাড আর পেন এগিয়ে দিল।

অমল দ্রুত গতিতে প্যাডে লিখল

T M S = Twenty Madrasa Students (?)

ভ্রু কুঁচকে সেদিকে কয়েকসেকেন্ড তাকিয়ে অমল বলল, ‘এত সোজা? এর জন্য কেউ কাঠমান্ডু যাবে কেন? অদ্ভুত!’

.

৫৪

‘আপনি শেষ কবে ইন্ডিয়া গেছেন নির্মল?’

একটা বাল্ব ঝুলছে। এই ঘরটা তার চেনা। কতবার প্রশ্নকর্তার জায়গায় বসেছে সে।

এখন উল্টো দিকে তাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। প্রশ্ন করছেন আরিফ রহমান। আরিফ সব সময়ে আসেন না। মাঝে মাঝে আসেন। হাই প্রোফাইল অপরাধীদের জন্য। সে তাহলে এদের কাছে হাইপ্রোফাইল অপরাধী। হয়ত আজ রাতেই তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে ফেলে দেওয়া হবে। গরম সীসার বুলেট ভেদ করে ফেলবে তার শরীর। এই দেশের মাটি, যাকে সে সবথেকে বেশি ভালোবেসেছিল, সে মাটি ভিজে যাবে তার রক্তে।

আরিফ রহমানের প্রশ্নের উত্তরে নির্মল তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নভেম্বরে। কলকাতায়, স্ত্রীর মামার ছেলের বিয়েতে।’

আরিফ তার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘সেখানে কার কার সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল?’

‘আমার শ্বশুরবাড়ির দিকের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে।’

‘আর?’

‘আর কেউ না।’

‘আপনি শিওর?’

নির্মল হেসে ফেলল। আরিফের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি আমার সঙ্গে কি র-এর লিংক খুঁজতে চাইছেন? এমনিই তো মেরে ফেলবেন বুঝতে পারছি। খামোখা নাটক প্যাঁচাচ্ছেন কেন?’

আরিফ রাগী গলায় বললেন, ‘আমি যা প্রশ্ন করছি তার উত্তর দিন।’

নির্মল বলল, ‘ওকে। করুন।’

আরিফ বললেন, ‘আপনার ফোনে মাঝে-মাঝেই ইন্ডিয়া থেকে ফোন আসে। তারা কারা?’

নির্মল বলল, ‘উনিশশো সাতচল্লিশ সালের আগে পাকিস্তান বলে কোনও দেশ ছিল না। শুধুই ইন্ডিয়া ছিল। দেশ ভাগ হল। এ-প্রান্তে থাকা অনেকেই ও-প্রান্তে চলে গেলেন। আত্মীয়তা সূত্রে অনেক মানুষই এখন এভাবেই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত আছে। যদি সত্যিই আপনি সোর্সগুলো দেখতে চান, এমব্যাসিতে খবর পাঠান, তারা ঠিকই বলে দেবে ফোনগুলো আমি আমার আত্মীয়-স্বজনকেই করেছিলাম।’

আরিফ বললেন, ‘আপনার কথাগুলো কোনটাই সোজা না। আপনি কি এভাবেই টেরিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন?’

নির্মল বলল, ‘গল্পের শেষটা দেখতে পারলে ছোটখাটো ভয়গুলো চলে যায়। আমি আমার গল্পের শেষটা জানি। একজন কোরাপ্টেড মানুষের সঙ্গে কতগুলো কোরাপ্টেড মানুষ যুক্ত হয়ে একটা দেশবিরোধী কাজ করছে। আমি মাঝে পড়ে গেছি। আমাকে সরাতে হবে। অকারণে আপনি নাটক করছেন আরিফ সাহেব। আপনার সময়ের দাম আছে। আপনি চলে যান। যা করার ওদের করে নিতে দিন। আমি সম্পূর্ণ সহযোগিতা করব, কথা দিচ্ছি।’

আরিফ নির্মলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একটু থেমে বললেন, ‘কোরাপ্টেড মানুষ মানে?’

নির্মল বলল, ‘একটা ইনভেস্টিগেশন করছিলাম। সেখানেই সাপের ল্যাজে পা পড়েছে। আপনি কিছু জানেন না এটা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?’

আরিফ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে বললেন, ‘ইন্ডিয়ার এজেন্টরা এভাবেই কথা বলতে শিখিয়ে দিয়েছে?’

নির্মল বলল, ‘ইন্ডিয়ার এজেন্ট? আমার পারফরম্যান্স দেখেছেন আপনি? আনোয়ার সাহেবকে চিনতেন না আপনি? আপনি জানেন না উনি ইন্ডিয়ার হয়ে কাজ করেছেন না বাংলাদেশের জন্য শেষ দিন অবধি কীভাবে ভেবে গেছেন?’

আরিফের ফোন বেজে উঠল। আরিফ ভ্রু কুঁচকে ফোনের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, ‘ওকে। এখনকার মতো এই অবধিই। রেস্ট করুন অফিসার।’

অদ্ভুতভাবে আর কোনও কথা না বলে আরিফ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

নির্মল টেবিলে চুপ করে বসে রইল। আলমগির কাচের জানলার ওপাশ থেকে তাকে দেখছিলেন।

নির্মল বলল, ‘কী হল? সাহেব চলে গেলেন কেন? অকারণ বসিয়ে রেখেছে কেন রাজাকারগুলো? যা করতে চায়, করতে বলে দিন না।’

আলমগির চেম্বারে প্রবেশ করে বললেন, ‘তুমি মাথা ঠান্ডা করো। তুমি কেন ধরে নিচ্ছ যে এখনই সব শেষ হয়ে গেছে?’

নির্মল বলল, ‘আমি তো বুঝতে পারছি। এটা না বোঝার কি কিছু আছে? আমি ইন্ডিয়ায় কার সঙ্গে দেখা করতে যাব? প্রশ্নগুলো কোনদিকে যাচ্ছে, তা বোঝার মতো বুদ্ধি কি আমার নেই?’

আলমগির নির্মলের কাঁধে হাত দিলেন, ‘আবারও বলছি। আরিফ সাহেব কেন বেরোলেন সেটা দেখা যাক।’

নির্মল দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে রইল।