২০
‘বিখ্যাত হতে চাওয়ার শর্টকাট আছে। কেউ কেউ বিখ্যাত হতে গিয়ে খানকি…’
কথাটা মুখে চলে এসেছিল। বলার আগে চুপ করে গেল অরিত্র। আরেকটু হলে বলে ফেলছিল।
এণাক্ষী রেগে গেল, ‘কী? কী বলতে চাইছ তুমি?’
অরিত্র বলল, ‘কিছু না। তুমি যদি ওই পার্টিতে যেতে চাও, তাহলে যাও। আমাকে বলছ কেন?’
এণাক্ষী বলল, ‘তোমাকে বলব না? ঠিক তো? তুমি চাও আমি যাব না। সরাসরি বলে দিলেই পারো!’
অরিত্র বলল, ‘আমার তো তোমার চালচলন কোনটাই ভালো লাগে না। কোনটা কোনটা বলতে হবে? আমি যদি বলি তুমি এই ছোটখাটো রোলের জন্য এসব জায়গায় যেও না, তুমি যাওয়া বন্ধ করবে?’
এণাক্ষী বলল, ‘তোমাকে তো বলেছি। এগুলো পি-আরের জন্য ভীষণই দরকারি। আমি কি কারো সঙ্গে শুতে যাচ্ছি?’
অরিত্র এণাক্ষীর দিকে তাকাল। এণাক্ষী ভীষণ রেগে গেছে। নাকের নীচে ঘাম জমেছে। সে বলল, ‘আমি তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে চাইছি না এখন। আমার মিটিং আছে। প্রিপারেশন দরকার। তুমি যেখানে যেতে চাও, যেতে পারো।’
এণাক্ষী বলল, ‘মানে? তুমি আমাকে বললে আমার চালচলন তোমার ভালো লাগে না। তারপর কী শুনতে চাইছ? আমি চুপ করে বসে থাকব? শান্তি চুক্তি করব?’
অরিত্র এণাক্ষীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখো, তুমি বলেছিলে অভিমন্যু তোমাকে দিয়ে ওর সিনেমায় একটা ছোট পার্ট করাতে চায়। ফাইন। আমি তখন অত ভাবিনি। রাজি হয়ে গেছিলাম। তারপর বললে তোমার পারফরম্যান্স দেখে ওরা একটা সিরিয়ালে নেবে। তাও মেনে নিলাম। ওদের সাকসেস পার্টিতে মাঝরাতে মাতাল হয়ে প্রোডিউসারকে জড়িয়ে ধরে ছবি তুলেছ, তাও বুঝলাম। কিন্তু আমি না, আর পারছি না। আমার সমস্যা হচ্ছে।’
এণাক্ষী চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওহ্, তোমার জ্বলছে, তাই তো? আনন্দ দেশাই আমাকে প্রমিসিং বলেছে বলে জ্বলছে?’
অরিত্র বলল, ‘ওরকম প্রমিসিং বলে হোটেলের ঘরে নিয়ে যাওয়ার পরে এরাই আর তোমার মধ্যে প্রমিসিং কিছু খুঁজে পাবে না। মাইরি বলছি। মিলিয়ে নিও।’
এণাক্ষী কানে আঙুল দিল, ‘ছি ছি ছি। ছিঃ। আমি তো তোমাকে অন্যরকম ভাবতাম। ভাবতাম তুমি উদার। শেষে তুমিও বাকিদের মতো? বউকে বেঁধে রাখতে চাও?’
অরিত্র বলল, ‘ভালোবাসি বলে বললাম। চোখের সামনে আমার বউকে কেউ লাইনে নামিয়ে দেবে, দেখতে পারব? আমি তো দেখতে পাচ্ছি দিন দিন তুমি কী হয়ে যাচ্ছ? বলব না?’
এণাক্ষী অরিত্রর দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, ‘এনাফ। এই কথাগুলোর পরে আমার আর এ বাড়িতে থাকার তো কোনও মানেই হয় না। আমি আজই চলে যাব। ইন ফ্যাক্ট, এখনই চলে যাব।’
অরিত্র কিছু বলল না। ট্যাবে চোখ রাখল।
এণাক্ষী চিৎকার করল, ‘কী হল? তোমার কিছু যায় আসে না?’
অরিত্র বলল, ‘তুমি তোমার পথ বেছে নিয়েছ। আশা করি ভবিষ্যতে ভালো থাকবে। যদি এভাবেই চালাতে চাও, আমার সঙ্গে থাকবে, আবার কাজ পাওয়ার জন্য এর ওর তার সঙ্গে আজেবাজে জায়গায় পার্টি করবে, তাহলে আমি আপত্তি করব। চোখের সামনে তোমার ইয়ে মারা যাবে, সেটা আমি দেখতে পারব না। তুমি যেতে চাইলে যেতে পারো।’
এণাক্ষী রাগী চোখে কিছুক্ষণ অরিত্রর দিকে তাকিয়ে ব্যাগ নিয়ে এলো। আলমারি খুলে তার শাড়ি, গয়না ব্যাগে তুলতে শুরু করল। ‘তুমি আজকে আমায় যা অপমান করলে, এটা আমার মনে থাকবে।’
অরিত্র বলল, ‘থাকবে না। তুমি যা শুরু করেছ, তাতে এসব ছোটখাটো ব্যাপার মনে থাকবে না। উদার হওয়া এক ব্যাপার। চোখের সামনে সব কিছু দেখে চুপ থাকা আরেক। আমি পারলাম না উদার হতে। কী করব?’
এণাক্ষীর চোখ থেকে জল পড়ছিল। সে ব্যাগে সব জিনিস ভরে ঠিক করে ব্যাগ গোছাতে পারছিল না। অরিত্র বলল, ‘তুমি এখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে চলে যাও। ঠিকানা দিও কার বাড়িতে উঠেছ। তার বাড়িতে ব্যাগ পাঠিয়ে দেব? ফাইন?’
এণাক্ষী মেঝেয় বসে পড়ল। বলল, ‘এরকম করে বলছ কেন?’
অরিত্র এণাক্ষীর দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু বলল না।
২১
ইদানীং বেশ গরম পড়েছে। ঘাম হয়। দিব্যেন্দুর অবশ্য সে কারণে ঘুমে কোনও অসুবিধা হয় না। ঘুমের ঘোরেই সে মাঝরাতে উঠে বাথরুমে যায়। এসে আবার শুয়ে পড়ে।
গরমটা বেশিই পড়েছিল। বেশি ঘাম হলে রুমাকে হাত পাখা দিয়ে হাওয়া করতে বলে। সিলিং ফ্যান চলবে, অন্যদিকে রুমা তাকে হাত পাখা দিয়ে সারারাত হাওয়া দিয়ে যাবে। রাতে রুমার আগেকার দিনের পাঙ্খাবরদারদের মতো কাজ থাকে।
ঘুমের ঘোরেই দিব্যেন্দু ডাকল, ‘হাওয়া দে।’
সাধারণত অন্যান্য দিন এটুকু বললেই হাওয়া দেওয়া শুরু হয়ে যায়। হাওয়া না পেয়ে দিব্যেন্দু বিরক্তিসহকারে হাত দিয়ে রুমাকে ঠেলতে গেল, ‘কীরে মাগী, হাওয়া দে…’
কিন্তু লাভ হল না। তার হাত হাওয়ায় ধাক্কা মারল।
দিব্যেন্দুর মাথায় রক্ত উঠে গেল, ‘কীরে, তোকে ডাকছি তুই সাড়া দিচ্ছিস না যে?’ বলে উঠে বসে দেখল তার পাশে রুমা নেই।
দিব্যেন্দু খাট থেকে নেমে বাথরুমে গেল। দরজা খুলে দেখল রুমা নেই। অবাক হল সে। তাহলে কি ঠাকুরঘরে? এত রাতে?
ঠাকুরঘরের দরজা ঠেলে দেখল, নাহ্। রুমা নেই।
সে চিৎকার শুরু করল, ‘রুমা! অ্যাই রুমা!’
রুমার বাবা-মার ঘুম ভেঙে গেল। ঘর থেকে বেরিয়ে এল তারা। রুমার মা ভীত গলায় বলল, ‘কী হল বাবা?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘রুমা কোথায়? আপনাদের ঘরে?’
রুমার মা বলল, ‘না তো! আমাদের ঘরে নেই তো!’
দিব্যেন্দু চোখ ছোট ছোট করে বলল, ‘সত্যি করে বলুন। যদি আপনাদের ঘরে খুঁজে পাই, তাহলে কিন্তু কপালে দুঃখ আছে।’
রুমার মা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ‘তুমিই দেখে এসো বাবা।’
দিব্যেন্দু কঠিন চোখে রুমার বাবা-মার দিকে তাকিয়ে ওদের ঘরে গেল। না রুমা নেই।
বসার ঘরেও নেই। এবার দিব্যেন্দু দৌড়ে বাইরের ঘরের দরজার কাছে গেল। দরজা খোলা…রাস্তায় টিউবের আলো জ্বলছে।
দিব্যেন্দু কোমরে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। রুমার মা-বাবা বাইরের ঘরে এলো। রুমার মা ভয়ার্ত গলায় বলল, ‘কী হল বাবা?’ দিব্যেন্দু নিজের দু’গালে চড় মারতে শুরু করল, ‘কী হল? কী হবে? আমি যা ভাবছিলাম তাই হয়েছে! মেয়ে পালিয়েছে! পালিয়েছে আপনাদের মেয়ে! আমি জানতাম, আমি ঠিক জানতাম, কারো না কারো সঙ্গে কিছু একটা চলছে। বলছি না…আমি ঠিক জানতাম। দেখেছেন? আমি যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই হয়েছে। আপনাদের মেয়ে পালিয়েছে। আমার সোনার কানের দুল, আট হাজার টাকা দাম, শালা ওটাও নিয়ে গেছে।’
রুমার মা কেঁদে উঠল। রুমার বাবা বলল, ‘তুমি কী জানো? মানে কারো সঙ্গে কিছু ছিল নাকি?’
দিব্যেন্দু দুজনের দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে বলল, ‘জানবো? আমি জেনে কী করব? ঘুমিয়ে পড়ুন। আবার কী? ঘুমিয়ে পড়ুন…না। ঘুমিয়ে কী করবেন? আপনার মেয়ের বিয়ে হয়েছিল এ বাড়িতে। সেই পালিয়েছে। এ বাড়িতে তো আপনাদের জায়গা হবে না। বেরিয়ে যান।’
রুমার মা কাঁদতে-কাঁদতেই হাঁ করে জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বেরিয়ে যাব?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘হ্যাঁ, ব্যাগ কোথায় আপনাদের? দাঁড়ান, এখনই ব্যাগ দিচ্ছি।’
দাপাতে দাপাতে দিব্যেন্দু ঘরের ভেতরে গেল। রুমার বাবা মা-র ব্যাগ টানতে টানতে বাড়ির বাইরে এনে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলল, ‘এই তো, এই যে ব্যাগ। যান, ফুটে যান। এখন ক’টা বাজে? রাত দুটো তো? রাতে রাস্তায় থাকুন, সকালে বেরিয়ে যাবেন।’
রুমার মা বলল, ‘বাবা, মাথাটা ঠান্ডা কর। তোমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। তুমি জল খাও।’
দিব্যেন্দু চেঁচিয়ে উঠল, ‘এই খানকি মাগী, আমি কী খাব তুই শিখিয়ে দিবি? তুই শেখাবি? তুই খানকি, তোর চোদ্দগুষ্টি খানকি, বেরো, ফোট এখান থেকে।’
দিব্যেন্দুর চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা বেরিয়ে এল।
রুমার বাবা খালি গায়ে লুঙ্গি পরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। দিব্যেন্দু ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল।
২২
‘তুমুল ঝগড়া পছন্দ কর না তুমি? করো, আমার সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করো। তুমি কী চাও সেটা বলো।’
এণাক্ষী বলল।
তার মাথা দপ দপ করছে। শরীর খারাপ লাগছে।
অরিত্র তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ফালতু ঝগড়া করে সময় নষ্ট করার থেকে ভালো আমরা কথাই আর বললাম না। তুমি যেটা করতে চাও, যেভাবে করতে চাও, সেটা করো।’
এণাক্ষী বলল, ‘আমি চলে গেলে তুমি বাধা দেবে না?’
অরিত্র মাথা নাড়ল, ‘না। একদিন না একদিন তুমি যেতেই। আমি জানতাম।’
এণাক্ষী রেগে গেল, ‘তুমি জানতে? তোমার জন্য আমার এত স্যাক্রিফাইস, এত সব কিছু, সব মিনিংলেস হয়ে গেল? তুমি নিজে তো জীবনে কিছু করতে পারলে না, আমি করছি, সুযোগ পাচ্ছি দেখে তুমি রেগে যাচ্ছ? হিংসে করছ? এত ইগো তোমার?’
অরিত্র বলল, ‘তুমি তাই মনে করলে তাই। তুমি যেটা ভাববে, ঠিক তাই। শুধু এটুকু বলে রাখি, তোমার সঙ্গে কথা বলার, তোমার সঙ্গে দিন-রাত ঝগড়া করার, আমার প্রবৃত্তি হচ্ছে না।’
এণাক্ষী বলল, ‘ও। আমাকে ঘেন্না করছ, তাই তো?’
অরিত্র হাসল, ‘এখন করছি না। কিন্তু যে পথে এগোচ্ছ, খুব শিগগিরি ঘেন্না করার মতো জায়গায় যেতে হবে।’
এণাক্ষী কপাল চেপে কিছুক্ষণ বসে রইল। ফ্যানটা চলছে একঘেয়ে সুরে। জানলা দিয়ে রাস্তার গাড়ির শব্দ আসছে।
সে এবার উঠে যতটা সম্ভব ঠান্ডা মাথায় তার ব্যাগ গুছিয়ে নিল। ক্যাব পাওয়া যাচ্ছে এখনও। বুক করে নিল। অরিত্র টিভি চালিয়েছে। তার দিকে তাকাচ্ছেও না। এণাক্ষী আলমারির চাবিগুলো টেবিলের ওপর রেখে ব্যাগ ঠেলতে ঠেলতে বেরোল।
বেরোনোর মুখে অরিত্র বলল, ‘প্রোটেকশন ইউজ করে নিও। যার তার সঙ্গে শুয়ে পড়াই যায়, তবে আজেবাজে অনেক রোগ হতে পারে। সেটা দেখে নিও।’
এণাক্ষী দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘তোমারটা তো ছোট। ওইটুকু জিনিস নিয়ে বড় বড় কথা বোলো না। মানায় না।’
অরিত্র বলল, ‘হ্যাঁ। এখন বড় পাবে। তার সন্ধানেই তো যাচ্ছ। মুখে পেছনে কানে নাকে, যেখানে যেখানে আছে, সবখানে গুঁজে বসে থেকো।’
এণাক্ষীর কান মাথা ঝাঁ-ঝাঁ করছিল। সে আর দাঁড়াল না। ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে লিফটে এল। দীপ্যমানকে ফোন করতে হবে। এক রাতের জন্য অন্তত একটা ঘর লাগবে। তার বাড়ি শিলিগুড়িতে। এত রাতে কী করে যাবে? আরেকটা কাজ করলেও হয়। সে তো ঘর থেকে বেরিয়েই এসেছে।
অরিত্র যে পার্টিতে যেতে বারণ করেছিল, সেখানে গেলেই হয়। সেটাই ভালো।
ক্যাব এসে গেছিল। সে পার্টির হোটেলটা ড্রপ লোকেশন দিল।
ক্যাবে উঠে বসে তার ব্যালকনিটা দেখল একবার। ওই তো, তার নিজের যত্ন করে লাগানো টবগুলো, দিব্যি দেখা যাচ্ছে। অরিত্র তো একবার ব্যালকনিতে আসতে পারত!
ঘরের বাইরে রাতের কলকাতা অন্যরকম। ঘরের নিশ্চিন্ত নিরাপত্তার বাইরে একটা শহর, যেখানে সবাই তার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকাচ্ছে। সবাই তাকে ছিঁড়ে খেতে চায়। অরিত্র তো ওই পার্টিগুলোতে ছিল। ওর থাকা আর না থাকায় অনেকখানি তফাত। এখন অরিত্র নেই। সে একা যাচ্ছে। কী করবে সে?
হোটেলের বাইরে তাকে নামিয়ে ক্যাব চলে গেল। এণাক্ষী ব্যাগটা নিয়েই হোটেলের ভেতর ঢুকল।
সুবীর বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। এণাক্ষীকে দেখে বলল, ‘একী ম্যাডাম? আপনি ব্যাগ নিয়ে? কোন জায়গা থেকে এলেন?’
এণাক্ষী হাসার চেষ্টা করল, ‘একটু বাইরে গেছিলাম। ব্যাগটা কোথায় রাখা যায়?’
সুবীর বলল, ‘আমাকে দিন। আমি রাখছি। আপনি এন্ট্রি নিয়ে নিন।’
এণাক্ষীর হাত থেকে ব্যাগ নিল সুবীর। এণাক্ষী পার্টিতে ঢুকল। ঢিমে মিউজিক চলছে। একদিকে কয়েকজন মাতাল গল্প করছে। সবার এতক্ষণে দল বানানো হয়েই গেছে। সে কোন দলে গিয়ে বসবে? কাউকেই চিনতে পারছে না সে। সুবীরও বা কোথায় গেল?
ঢোকার পর থেকেই এণাক্ষীর একটা অস্বস্তি শুরু হল। মনে হচ্ছিল একজোড়া চোখ যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। লোকটা তার দিকেই এগিয়ে এল, ‘ম্যাম, ব্যাগ নিয়ে হোটেলে এলেন দেখলাম। দাম্পত্য কলহ?’
এণাক্ষী লোকটার দিকে তাকাল। চিনতে পারল না। দামি স্যুট। দামি চশমা। খুবই হ্যান্ডসাম, যেন চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসী একজন লোক। সে বলল, ‘আপনি…’
‘যোগেন্দ্র শর্মা।’ লোকটা হাত এগোল।
এণাক্ষী লোকটার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করল।
যোগেন্দ্র বলল, ‘নতুন ইনভেস্টর। ডুবে যাওয়া ইন্ডাস্ট্রি বাঁচাতে এসেছি বলতে পারেন। আপনি বললেন না, ব্যাগ নিয়ে এসেছেন কেন? বসুন না।’
যোগেন্দ্র সোফায় বসাল তাকে যত্ন করে। ড্রিঙ্ক দিল।
এণাক্ষী দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘ওই, বুঝতেই পারছেন, মিডল ক্লাস ফ্যামিলি ক্রাইসিস। কী আর বলব।’ একবারে সে হাতের গ্লাসটা শেষ করে দিল।
যোগেন্দ্র জিভে চুকচুক শব্দ করে বলল, ‘এটাই তো প্রবলেম ম্যাডাম। বাঙালির মিডল এজ মেন্টালিটি। সব জায়গায় একই রকম।’
এণাক্ষী চারদিকে তাকাল, বলল, ‘আচ্ছা, আমি এখানে কাউকেই চিনতে পারছি না কেন?’
যোগেন্দ্র বলল, ‘আপনি বোধহয় ভুল রুমে ঢুকেছেন। এটা আরেকটা পার্টি।’ এণাক্ষী অবাক হয়ে যোগেন্দ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মানে? এ বাবা। তাহলে আমি…’
উঠতে গেল সে। মাথাটা ঘুরে গেল।
যোগেন্দ্র ধরে নিল তাকে।
এণাক্ষীর চারপাশটা কেমন ঝাপসা হয়ে গেল।
২৩
অরিত্রর সমস্যা হল, সে বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারে না। ভীষণ রাগ করবে, তুমুল চিৎকার করবে, ঝগড়া করবে, বিলো দ্য বেল্ট আঘাত করবে, তারপর এক সময় তার রাগ কমে আসবে। তখন লজ্জা লাগবে।
রাত এগারোটা নাগাদ তার মনে হল এণাক্ষীকে একা ছাড়া ঠিক হয়নি। মেয়েটা একা একা চলে গেল। খারাপ লাগছিল। ফোন করল। ফোন অফ বলছে। অরিত্র তৈরি হয়ে নিল। এণাক্ষী কোন হোটেলে আছে সে জানে। পার্কিং-এ এসে গাড়ি স্টার্ট দিল সে।
বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে মাথায়। এটুকু সে নিজেও জানে এণাক্ষী খারাপ কিছু করার মেয়ে না। কিন্তু কথা বলার সময় কখন যে সবরকম সভ্যতা ভদ্রতা ভুলে যায়, নিজেও জানে না। যখন বুঝতে পারে, তখন দেরি হয়ে যায়।
এণাক্ষী এত দিন তার সঙ্গে ছিল, এটাই অনেক। অন্য কেউ হলে তাও থাকতো না। সবাই তার মতো অসভ্য মানুষকে সহ্য করে না।
রাস্তা ফাঁকাই আছে। গাড়ি হোটেলের পার্কিং-এ রেখে অরিত্র রিসেপশনে ঢুকে দেখল সুবীর পায়চারি করছে। অরিত্র সুবীরের দিকে এগিয়ে গিয়ে অপ্রস্তুত গলায় বলল, ‘এণাক্ষীকে ডেকে দেবে? ফোনে পাচ্ছি না।’
সুবীর বিহ্বল কণ্ঠে বলল, ‘আরে, কী বলি তোমায়, এখানে আসার সময় একটা বড় ব্যাগ নিয়ে এসেছিল। আমাকে বলল রেখে দিতে। আমি ব্যাগ রেখে আসার পর থেকে ওকে খুঁজে পাচ্ছি না। আমিও ফোন করেছি, ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না।’
অরিত্র অবাক হল, ‘মানে? পাওয়া যাচ্ছে না মানে কী?’
সুবীর বলল, ‘চল। তুমি ভেতরে গিয়ে দেখো।’
অরিত্রকে নিয়ে সুবীর ব্যাঙ্কোয়েটে গেল। ঠিকই। কোথাও এণাক্ষী নেই।
অরিত্র কয়েক সেকেন্ড মাথা নিচু করে সুবীরকে বলল, ‘হোটেলে কোনও রুমে যায়নি তো?’
সুবীর বলল, ‘এসব কী বলছ তুমি? ও তোমার ওয়াইফ। ওর নামে এসব বলছ?’
অরিত্র লজ্জিত হয়ে বলল, ‘আমি বলছি না। আমি বোঝার চেষ্টা করছি ও অন্য কোথাও গেছে নাকি।’
সুবীর বলল, ‘আরে, তা বলে এরকম বোল না। এণাক্ষী খুবই ডিসেন্ট মেয়ে। তুমি তো ওর সঙ্গে অনেক পার্টিতে গেছ, কখনও মনে হয়েছে ও এরকম কিছু করতে পারে।’
অরিত্র সুবীরের হাত ধরে বলল, ‘প্লিজ কিছু মনে কোরো না। আমি কী করব বুঝতে না পেরে তোমাকে এভাবে বলে ফেলেছি। একটু দেখো না ও কোথায় গেছে।’
সুবীর বলল, ‘লনে দেখি, পুলে, গেমস কর্নারে, সবক’টা জায়গাতেই খুঁজি চল।’
তারা সবখানেই খুঁজল। এণাক্ষীকে কোথাও পাওয়া গেল না।
সুবীর চিন্তিত গলায় বলল, ‘আরেকটা ব্যাপার হতে পারে। পাশের হলে আরেকটা পার্টি ছিল। ওটায় ঢুকে যেতে পারে।’
অরিত্র বলল, ‘চল। তাই চল।’
দুজনে বেরিয়ে হোটেলের অন্য পার্টি রুমের এন্ট্রান্সে গেল। দুজন বাউন্সার দাঁড়িয়ে ছিল। সুবীর বলল, ‘এক্সকিউজ মি, আমাদের এক পরিচিত সম্ভবত আপনাদের পার্টিতে ভুল করে ঢুকে গেছে। একটু দেখবেন? বা আমরা কি ভেতরে ঢুকতে পারি?’
একজন বলল, ‘দেখছি।’
ভেতরে ঢুকে গেল সে। কিছুক্ষণ পর বাইরে বেরিয়ে এসে বলল, ‘না। এখানে আপনি যে নাম বলেছেন, সে নামে কেউ নেই।’
সুবীর বলল, ‘আমাদের একবার ঢুকতে দেওয়া যাবে?’
দুজনেই মাথা নাড়ল, ‘না। এটা হাই প্রোফাইল জোন। আন অথরাইজড কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হবে না।’
অরিত্র চিৎকার করে উঠল, ‘কী বলছেন আপনি? একজনকে খুঁজে পাচ্ছি না আর আপনি আন অথরাইজড মাড়াচ্ছেন?’
সুবীর অরিত্রর হাত ধরল, ‘প্লিজ প্লিজ। শোন অরিত্র। রাগারাগি কোরো না। আমার সঙ্গে এসো। আমি কথা বলছি। সিসিটিভি ফুটেজ আছে। সেখান থেকেই দেখে নেওয়া যাবে।’
অরিত্র বলল, ‘সেটা তুমি এতক্ষণ দেখোনি কেন?’
সুবীর বলল, ‘আরে, আমার এত গেস্টকে সামলাতে হচ্ছে। মাথাতেই আসেনি।’
অরিত্র বলল, ‘চলো। ব্যবস্থা করো। নইলে পুলিশকে ডাকতে হবে। একীরে বাবা, তোমাদের কোনও দায়িত্ব নেই? ফোনটা অবধি অফ।’
সুবীর দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘তোমার ওয়াইফ তো মাইনর না অরিত্র, তাই না? তাছাড়া সে ব্যাগ নিয়ে কেন এসেছিল, সেটাও তো জানি না। আমাকে সময় দাও। আমি ফুটেজ দেখার ব্যবস্থা করছি।’
অরিত্র রাগী চোখে সুবীরের দিকে তাকিয়ে রইল।
২৪
‘পালাতে পারলেন তাহলে?’
লোকটা গাড়ি চালাচ্ছে। রুমা পেছনের সিটে বসেছে।
লোকটার মুখ ঠিক করে দেখা যাচ্ছে না। কণ্ঠস্বরে উষ্ণতা।
রুমা বলল, ‘হ্যাঁ। পেরেছি। বাড়িতে খুব অশান্তি হবে।’
‘তা তো হবেই। তারপরে ভুলেও যাবে।’
রুমা মাথা নিচু করল। ঠিকই তো। তাকে মনে রাখবে কেন? সে কী ছিল? একটা চাকর ছাড়া?
‘আমি কোথায় যাচ্ছি?’ সে জিগ্যেস করল।
লোকটা বলল, ‘আপনি যেমন বললেন, আপনাকে যা জ্বালাতন করেছে, তাতে সাত-আট দিন একটা নিরাপদ আস্তানায় বিশ্রাম করুন। তারপর না হয় দেখা যাবে।’
রুমা বলল, ‘এমনি এমনি বিশ্রাম করব?’
লোকটা বলল, ‘হ্যাঁ। এমনি এমনি। কিচ্ছু করতে হবে না। খাবেন, আর ঘুমোবেন।’
‘তারপর? তারপর আমায় কী করতে হবে?’
লোকটা বলল, ‘তারপর দেখব আপনাকে দিয়ে কোনও কাজ করানো যায়। আসলে ব্যাপারটা কী বলুন তো, আমাদের কাজে মানুষের প্রয়োজন। এই যে ভারতবর্ষ, এই দেশটার সব থেকে বড় অ্যাডভান্টেজ কী জানেন? মানুষ। অথচ আমরা এই অ্যাডভান্টেজটাই নিতে পারছি না। উল্টে সেটা ডিসঅ্যাডভান্টেজ হয়ে গেল। কত ছোট দেশ, যার জনসংখ্যা আমাদের সিকিভাগেরও কম, আমাদের শাসন করে চলে গেল। আমরা গোলামি ছাড়া কিছু শিখলাম না। এটা কি ঠিক হল? আচ্ছা, আপনার কি ভয় লাগছে?’
লোকটার কথা বলার ক্ষমতা আকর্ষণীয়। রুমার একটুও ভয় লাগছে না। আনন্দ লাগছে। স্কুল ছুটি হবার পর ছোটবেলায় যেমন আনন্দ লাগত, তেমন আনন্দ লাগছে।
সেটাই বলল সে, ‘না, ভয় লাগছে না।’
লোকটা বলল, ‘দুর্ভাগ্যজনক। একটা অদ্ভুত ব্যাপার শুনুন। আমি যতজনকে এভাবে নিয়ে এসেছি আমাদের কাছে, তাদের নব্বই শতাংশ মহিলাই এই উত্তর দিয়েছেন। তাদের ভয় লাগছে না। মানুষ কতটা যন্ত্রণায় থাকলে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজনের সঙ্গে ঘর ছাড়ার পরেও ভয় পায় না।’
রুমা বলল, ‘আমাকে আপনি প্রত্যুষদার কাছে নিয়ে যেতে পারবেন?’
লোকটা বলল, ‘আমি খোঁজ নিয়েছি। টেলিকম কোম্পানিতে দেওয়া কাগজপত্র থেকেই খোঁজ নিয়েছি। আপনি যাকে খুঁজছেন, তার কোনও হদিশ এখনও পাওয়া যায়নি। পেলেই আপনাকে জানাব।
রুমা কিছু বলল না। লোকটা বলল, ‘আপনার সিটের পাশে কেক রাখা আছে। খেতে পারেন। ভালো লাগবে। এত ভালো কেক আমি অনেকদিন খাইনি।’
রুমা বলল, ‘কেক খাব না। আমাকে একটু জল খাওয়াতে পারবেন?’
লোকটা বলল, ‘হ্যাঁ, আমার সিটের পেছনের পকেটে একটা ছোট জলের বোতল আছে।’
রুমা বোতলটা নিয়ে অনেকটা জল খেয়ে নিল।
রাতের রাস্তায় কেমন মসৃণভাবে গাড়িটা চলছে। কত দাম হবে গাড়িটার কে জানে।
লোকটা গান চালিয়েছে। ভারি সুন্দর একটা ইংরেজি গান। গানটা বুঝছে না সে। অথচ শুনতে ভালো লাগছে। লোকটাও সুর দিচ্ছে মাঝে মাঝে।
দিব্যেন্দু গান শুনত না। কেমন অদ্ভুত টাইপের বেরসিক একটা লোক ছিল। গান ভালোবাসে না যারা তারা মানুষ খুন করতে পারে। সে গান গাইত। দিব্যেন্দু শুনে নাক কুঁচকে বলেছিল, ওসব পোষায় না। কী অদ্ভুত তাচ্ছিল্য। কোথাও কোনও অনুষ্ঠানে কেউ গান গাইলে দিব্যেন্দু কথা বলে যেত। এরকম অনেকে আছে। কেউ গান গাইলে কথা বলে। রুমার প্রথম প্রথম খারাপ লাগত। তারপর সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে অন্যান্য বিষয়গুলিও এমনভাবে যুক্ত হতে শুরু করল, যে আর অন্য কোনও অনুভূতিও আসত না। দেখা গেল সে গান শুনছে, দিব্যেন্দু কানে কানে বলে দিল, ‘কী রে খানকি মাগী, ভালো লাগছে, না? মনে মনে ভাবছিস লোকটার সঙ্গে শুলে কেমন হয়? তাই না?’
লজ্জায় লাল হয়ে যেত সে। চারদিকে ভয়ে ভয়ে তাকাত, কেউ কিছু শুনছে না তো? মাটিতে মিশে গেছে কতবার। বেঁচে থাকাটাকেই শাস্তি ভেবে গেছে।
গাড়িতে গানটা কী অদ্ভুত ঘুমপাড়ানি। কতদিন পর এত আরাম লাগছে!
কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল, নিজেই জানে না…
