৪০
জিভ পুড়ে গেছে। গরম চা খাবার অভ্যাস না থাকলে এটা স্বাভাবিক ঘটনা।
লুকা বিচ্ছিরি মুখ করে বসে আছে। রোজ মদ খায়। আজ সকালে উঠে ইচ্ছে হল চা খাবে। গরম চা জিভে পড়তেই পুড়ে গেল।
এত বিরক্ত লাগছে। লুকার ঠাকুরদা দাবি করেছিল জব চার্নকের আসার আগে তারাই কলকাতার মালিক ছিল। জমিদার ছিল নাকি! মামলা ঠুকে দিয়েছিল। সে মামলা গ্রাহ্য হয়নি। ‘আদালতের সময় নষ্ট করবেন না’ বলে খুব রেগে গিয়েছিলেন জাজ।
লুকার ঠাকুরদা ভদ্রলোক এমনিতেই খ্যাপা ছিলেন। এই ঘটনার পর পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলেন। শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে কিছুদিন ট্রাফিক কন্ট্রোলের চেষ্টা করেছিলেন। মাঝে মাঝে নেতাজির সঙ্গেও কথা বলতেন, ‘আমাদের চেষ্টা করতেই হবে, ইম্ফল কতদূর? আসছি আমি নেতাজি, তোমার সঙ্গে ঘোড়ায় আমিও চড়ব।’
শেষমেশ স্ট্যাচুর ঘোড়ায় চড়তে পারেননি। পুলিশ তাড়া দিয়েছিল।
লুকা ঠাকুরদাকে ভারি ভালোবাসত। কিন্তু বাবাকে যদি বলত, ‘আমি ঠাকুরদার মতো হব’, তাহলে বাবা গম্ভীর হয়ে বলত, ‘চুপ কর, বলদ।’
লুকা বলত, ‘বলদ কী বাবা?’
বাবা বলত, ‘যারা কিছু বোঝে না, তাদের বলদ বলে।’
লুকার ভোকাবুলারিতে শব্দটা যুক্ত হল। স্কুলে কী করে যেন সে শিক্ষককে বোঝাতে পারছিল না নখ কেন কেটে আসেনি, প্রার্থনার সময়ে বলেই দিল, ‘আপনি একটা বলদ।’
তখন এখনকার নিয়ম ছিল না। স্কুলে শিক্ষকদের হাতে গবাদি পশু মারার মতো লাঠি মজুত থাকত। একটা গোটা লাঠি তার পিঠে পড়েছিল।
লুকা তখন থেকেই ঠিক করে নিয়েছিল,
১) সে আর পড়াশুনা করবে না,
২) যে শিক্ষকের জন্য পড়াশুনা ছাড়ল, তাকে দেখে নেবে।
লুকা চুরি শিখল, ছিনতাই শিখল, ছিনতাই দলের নেতা হল। বহুদিন তক্কে তক্কে ছিল, একদিন সুযোগ এল। সেই পিটি টিচারকে রাস্তায় ধরল। গম্ভীর মুখে বলল, ‘আপনি জানেন আমি সেদিন কেন নখ কাটিনি?’
সেই টিচার লুকাকে চিনতে পারেননি। অবাক গলায় বললেন, ‘কে আপনি?’
লুকা বলল, ‘একটা পেয়ারার ডাল ভেঙেছিলেন। স্যাটাভ্যাঙা কেলিয়েছিলেন, মনে আছে? লোকেশ সাঁতরা। ভুলে গেলেন নাকি নামটা?’
ভদ্রলোক ফ্যাকাসে চোখে লুকার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘মনে পড়েছে। তা বাবা তুমি কী করবে?’
লুকা বলল, ‘আমি গত কয়েকদিন ধরে আপনাকে দেখছি। বেশ কয়েকদিন।’
ভদ্রলোক আরও ঘাবড়ে গেলেন, ‘কেন? আমি কী করেছি?’
লুকা বলল, ‘কিছুই করেননি। তখন ছোট ছিলাম। ভাবতাম বড় হয়ে আপনাকে পেলে একই রকম ক্যালাবো। তারপর বুঝলাম টিচারদের মারতে নেই। তাই ঠিক করেছি আপনাকে ক্যালাবো না। আপনি যান। যেখানে যাচ্ছিলেন, যান।’
ভদ্রলোক কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে লুকা তাকে ছেড়ে দিয়েছে। তিনি ঘাবড়ে পালাতে গিয়ে দুবার হোঁচট খেলেন। লুকা হাত নেড়ে আবার ডাকল, ‘শুনুন স্যার।’
ভদ্রলোক আবার ভিতু মুখে এলেন।
লুকা দাঁত বের করল, ‘ভাগ্যিস কেলিয়েছিলেন। পড়ালেখা করলে আপনাদের মতো ডরপোক তৈরি হতাম যাদের এটুকু ধক নেই বলার যে মেরেছিলাম, বেশ করেছিলাম। এখন আমি মোস্ট ওয়ান্টেড। তেরোটা মার্ডার কেসের আসামি। ভাবতে পারেন! যাকগে, যান। আপনি আমার টিচার। তাই ছেড়ে দিলাম। ফুটুন।’
ভদ্রলোক দাঁড়ালেন না। পড়িমরি করে পালিয়ে গেলেন। লুকা ফিক ফিক করে হাসতে লাগল। আজকেও লুকা হাসছিল। দিব্যেন্দুকে দেখে। ভেঙে পড়া, চোখের তলায় কালি পড়া একজন ছাপোষা কেরানি। হাতুড়ি মেরে দিয়েছে নাকি।
লুকা বলল, ‘কীরে? কী করেছিস তুই?’
দিব্যেন্দু সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
লুকা ধমক দিল, ‘এক চড় মারব খানকির ছেলে। উত্তর দিচ্ছিস না কেন?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘কী করেছি মানে, ওই হাতুড়ি মেরে দিয়েছি।’
লুকা বলল, ‘কেন মেরেছিস?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘বউয়ের কথা মনে পড়ছিল।’
লুকা বলল, ‘বউয়ের কথা মনে পড়ছিল বলে হাতুড়ি মেরে দিবি? বউকেও মারতিস?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘হ্যাঁ। বউ তাই পালিয়েছে।’
লুকা ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘আজব চিড়িয়া তো। গুন্ডামি করবি?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘পারি না স্যার। আমি ক্লার্ক।’
লুকা দলের বাকিদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল, ‘কচুরি নিয়ে আয়। এটাকে খাওয়া। ক্লার্ক গিরি বের করছি মাদারচো…র।’
দিব্যেন্দু নড়ল না। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে বলল, ‘যা করবেন করে ফেলুন। আমার আবার পায়খানা পেয়েছে। এখানেই করে দেব নইলে। আমার পেট ভালো না। প্যান্টে হলে আমার সাইজের প্যান্ট পাবেন?’
লুকা হো হো করে হেসে উঠল, ‘এ কে বে? শান্তিগোপাল?’
৪১
বাড়ি এসেও অরিত্র ঘুমোতে পারছে না। অস্বস্তি হচ্ছে। আজে বাজে কথা মনে আসছে।
এণাক্ষীর ফোনে বেশ কয়েকবার ফোন করে দেখল। আগেও করেছে। একই কথা বলে যাচ্ছে।
নীলকে ফোন করল। নীল ফোন ধরে বলল, ‘আপনাকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম।’
অরিত্র আশান্বিত হল, ‘খবর পাওয়া গেছে?’
নীল বলল, ‘হোটেলের সামনের রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজটা পাওয়া গেছে। আপনার স্ত্রী যে হোটেলে ঢুকেছেন ব্যাগ নিয়ে সেটা দেখা যাচ্ছে।’
অরিত্র বলল, ‘আর বেরোনোটা?’
নীল বলল, ‘বেরনোটা দেখা যায়নি। কারো সঙ্গে বেরিয়েছে, সেটাও দেখা যায়নি। এর একটা মানে হতে পারে, আপনার স্ত্রী হোটেলেই আছেন।’
অরিত্র বলল, ‘তাহলে?’
নীল বলল, ‘আপনি কি শিওর যে আপনার স্ত্রীর অন্য কারো সঙ্গে কোনও অ্যাফেয়ার ছিল না?’
অরিত্র রেগে গেল, ‘মানে?’
নীল বলল, ‘দেখুন, আপনি রেগে যাবেন না, কিন্তু ইনভেস্টিগেশনের জন্য আমাদের সব কথাই জানা দরকার। হতে পারে আপনি জানেন না। হতে পারে আপনার অগোচরেই আপনার স্ত্রী কারো সঙ্গে কোনও সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এবার তিনি নিজের কন্সেন্টে যদি অন্য কারো ঘরে থাকেন, তবে আমি কেন, আমার বাপেরও অসাধ্য আপনার স্ত্রীকে খুঁজে বের করা।’
অরিত্র থমকে গেল, ‘আমি…আমি জানি না। আমি বিশ্বাস করি না এণাক্ষী এরকম কোনও সম্পর্কে জড়িয়েছে।’
নীল বলল, ‘আমরা কেউই বিশ্বাস করি না। প্রত্যেকেই আমরা আমাদের পার্টনারকে প্রচুর বিশ্বাস করি। সম্পর্কে ওটাই তো সব থেকে বড় কথা। কিন্তু এর পরেও কিছু জায়গা থাকে। আপনি বুঝতে পারছেন আমি কী বলছি?’
অরিত্র গম্ভীর হল, ‘হ্যাঁ। আমি বুঝতে পারছি, আপনি কী বলছেন। যদি এরকম প্রমাণ থাকে, তাহলে সেটাও আপনি আমাকে বলে দিতে পারেন। আমি কিছু মনে করব না। সত্যিটাকে তো মেনে নিতেই হবে। জোর করে কিছু আটকে রাখা যায় না।’
নীল বলল, ‘আমরা সবরকম সম্ভাবনাই যাচাই করে দেখছি। আমার কাছে প্রমাণ কিছু নেই। তাও আপনাকে বলে রাখলাম।’
অরিত্র বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ অফিসার।’
নীল বলল, ‘টেক কেয়ার।’
অরিত্র চুপ করে কিছুক্ষণ বসে রইল। এণাক্ষীকে সন্দেহ করার মতো সত্যিই কি কিছু ঘটেনি? তা তো না। এণাক্ষী তার কথা শোনেনি, নিজের মতো চলেছে। তার সামনেই প্রোডিউসারের গলা জড়িয়ে ধরে ছবি তুলেছে। যে মেয়েটা বরের সামনে এরকম করতে পারে, বরের সঙ্গে ঝগড়া করার পর তার প্রতিশোধ নিতে তো আরও অনেক কিছুই করতে পারে। রিভেঞ্জ সেক্স শব্দটা নিয়ে তো এককালে তারাই কত মজা করেছে।
মাথাটা দপ দপ করছিল। মাথায় অদ্ভুত সব ছবি আসতে শুরু করেছে। এণাক্ষী তাকে ছেড়ে অন্য কারো সঙ্গে চলে গেছে, তার সঙ্গে শুয়েছে, একটা অচেনা অজানা হাত তার শরীর জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বমি পেয়ে গেল তার। বাথরুমে গিয়ে হড়-হড় করে বমি করে দিল।
নীল একটা ইঙ্গিত দিয়েছে। এণাক্ষী তার মানে হোটেলের মধ্যেই আছে। বেরোতে গেলে তো লোকের সামনে দিয়েই বেরোতে হবে।
অরিত্র দেরি করল না। তৈরি হয়ে আবার গাড়ি নিয়ে বেরোল। এখন সকাল হয়েছে। রাস্তাঘাটে যথেষ্ট ভিড়। জ্যাম আছে। চিংড়িহাটা ক্রস করার সময় সে ঠান্ডা মাথাতেই বেরোচ্ছিল, হঠাৎ করে একটা সুমো তাকে পেছন থেকে মেরে দিল।
অরিত্র গাড়ি থেকে নামল। সুমোর ড্রাইভারের কাছে গিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে?’
ড্রাইভার বলল, ‘সামনে গিয়ে বাঁ দিকে দাঁড় করান। সেটল করে নিচ্ছি।’
অরিত্রর মাথায় রক্ত উঠে গেল, ‘সেটল করবি, কী সেটল করবি? তোর বাবার চাকর নাকি?’
দরজা খুলে ড্রাইভারের কলার ধরল সে। মুহূর্তের মধ্যে ভিড় জমে গেল। ড্রাইভারও ছাড়ল না। হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল। জামা ছিঁড়ল, মুখ থেকে রক্ত বেরোতে শুরু করল।
অরিত্র থামল না। মারপিট চালিয়ে গেল। তার সব দুশ্চিন্তা, রাগ ড্রাইভারের উপর ঝাড়তে শুরু করল…
৪২
সিসিটিভি লাগানোর আগেই টাকাগুলো জায়গা মতো রেখে দিয়েছিল পূর্ণ। ক্যামেরা লাগানো শুরু হয়েছে আবার। তার টানা হচ্ছে।
পূর্ণ মন খারাপ করে বসে ছিল। পোড়া কপাল তার। টাকাগুলো পেলে কিছুটা ভালো থাকা যেতো। মানুষের জীবনে টাকার থেকে দরকারি আর কিছু নেই। সম্পর্ক টিকে থাকে এর জন্যই। ভালোবাসা অবধি জানলা দিয়ে পালায় যদি টাকা না থাকে। সে কী পেল? টাকাগুলোই নাকি নকল। নকল মানুষে ভর্তি পৃথিবীতে টাকা আসল লাগে নাকি!
ফোন বাজছে। বাপিদা। পূর্ণ ধরল, ‘বলো।’
বাপিদা বলল, ‘ক্যামেরা লেগে গেছে?’
পূর্ণ বলল, ‘লাগাচ্ছে। অত হড়বড় করলে হয় নাকি? আমি তো আছি, দেখছি। চিন্তা কোরো না।’
বাপিদা বলল, ‘হয়ে গেলে আমাকে ফোন করবে। এখান থেকে কী করে দেখতে হবে আমি জেনে নেব। আজ থেকে কিন্তু তোমাকে আমি এখান থেকেই দেখতে পাবো।’
পূর্ণ বলল, ‘দেখো। কী আছে তাতে? তোমার বাড়ি কি আমি খেয়ে ফেলব?’
বাপিদা হাসল, ‘তা না। তোমার কাজও হালকা হয়ে যাবে। ক্যামেরা লেগে গেলে তোমাকে কি আর সারাক্ষণ থাকতে হবে?’
পূর্ণ প্রমাদ গুনল। মানে, কী বলতে চাইছে?
সে বলল, ‘চাকরি ছাড়িয়ে দেবে?’
বাপিদা বলল, ‘সারাক্ষণ তো আর লাগবে না। ক্যামেরা থেকেই আমি সব দেখে নেবো। তুমি অন্য কাজ করতে পারবে।’
পূর্ণ বলল, ‘আমার অন্য কাজ নেই। কোথাও কোনও কাজ করি না বলেই এখানে থাকতে এসেছি।’
বাপিদা বলল, ‘ঠিক আছে। আমি দেখছি কী করা যায়।’
পূর্ণ বলল, ‘না, তুমি ঠিক করে বল। আমাকে কি কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেবে?’
বাপিদা বলল, ‘আহা, তা বলেছি নাকি? আমি শুধু বলতে চাইছি, ক্যামেরা লেগে গেলে তোমার উপর থেকে চাপটা কমে যাবে। এদিক সেদিক যেতে আর কোনও বাধা রইল না।’
মাথা দপদপ করছিল। ওই ছোট ছোট ক্যামেরাগুলো এত সহজে তার চাকরি খেয়ে ফেলল? পৃথিবীটার চারদিকেই এভাবে চাকরি খাবার মেশিন লেগে যাচ্ছে। মানুষের কোনও দাম থাকছে না। মেশিনই সব কাজ করে দেবে।
মুখে বলল, ‘ঠিক আছে। আমি দেখে রাখছি। হয়ে গেলে ফোন করব।’
ক্যামেরা লাগাতে দেড় ঘণ্টা লাগল। কোনও ব্যাপারই না। ইন্টারনেট কানেকশন করিয়ে রাউটার লাগিয়ে বাপিদাকে ফোন করে সব বুঝিয়ে দেওয়া হল।
ছেলেগুলো চলে যাওয়ার পর পূর্ণর অস্বস্তি হওয়া শুরু করল। ভারি মুশকিল হল তো। সে উঠবে, বসবে, ঘরের মধ্যে হাঁটাচলা করবে, সবই বাপিদা দূর থেকে বসে দেখতে পাবে? কেউ যদি সব সময় তার উপর চোখ রেখে চলে, তাহলে তো সমস্যা। তখন ভয় পাচ্ছিল চাকরি চলে যাবার, এখন মনে হচ্ছে চাকরি গেলেই ভালো হতো।
সন্ধে হল। পূর্ণ বসার ঘরের মেঝেতে চুপ করে শুয়ে ছিল। মেজাজ ঠিক লাগছিল না, এমন সময় তার ফোন বেজে উঠল। আবার বাপিদা। ফোন ধরে বিরক্ত গলায় বলল, ‘বলো।’
বাপিদা বলল, ‘ঠাকুরঘরের আলমারিটা অন্য দিকে ঘোরানো দেখলাম? কী হয়েছে?’
পূর্ণ বলল, ‘আমি ঘরটা পরিষ্কার করে দিলাম। ঠাকুরের জায়গা, সেখানে নোংরা হয়ে থাকলে কি ভালো দেখায়?’
বাপিদা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে কড়া গলায় বলল, ‘তোমাকে আমি ওই ঘরে যেতে বারণ করেছিলাম। তুমি ভুলে গেছ মনে হয়।’
পূর্ণ বলল, ‘ভুলব কেন? ঠাকুর দেবতার ব্যাপার, অপরিষ্কার নোংরা ঘরে তাদের রেখে দেওয়া কি ঠিক? তুমিই বল?’
বাপিদা বলল, ‘ঠিক আছে। আর ঢোকার দরকার নেই। আলমারি খুলেছিলে নাকি আবার?’
পূর্ণ বলল, ‘না বাপু। তুমি বলেছো তার পরে আবার কে খুলবে?’
বাপিদা স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘একদম খোলার দরকার নেই। তুমি ওই একটা ঘরেই থাকো। ঠাকুরঘরে ঝাড়পোঁছ করার কিছু নেই। আমি দেখে নেব এখান থেকে।’
ফোন কেটে গেল। পূর্ণ ক্যামেরার দিকে তাকাল। কী যে অদ্ভুত জিনিস তৈরি হয়ে গেছে। মানুষও অন্তর্যামী হয়ে গেল যন্ত্রের সাহায্যে!
৪৩
সে কি শহরে, না শহরের বাইরে? ঠিক কোন জায়গায় আছে সে? একসঙ্গে কতগুলো আবছা ছবি মাথার মধ্যে কেউ যেন বসিয়ে দিচ্ছে। আবার পরপর কতগুলো ছবি সোয়াইপ করার মতো ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে চলে যাচ্ছে। কিছুতেই রুমার ঘোর কাটছে না। জানলার বাইরে দেখার চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কখন যে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, সে নিজেই জানে না।
রাস্তা দিয়ে গাড়িটা চলছে বেশ জোরে।
বেশ খানিকক্ষণ পরে একপ্রকার জোর করেই চোখ খুলল সে। তার পাশে লোকটা বসে আছে। রুমা বলল, ‘কোথায় যাচ্ছি?’
লোকটা বলল, ‘হোমে। তুমি হোমে থাকতে চেয়েছিলে। তোমাকে পুনর্বাসন দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। আশা করি, বাকি জীবনটা তুমি সেখানেই থাকবে।’
রুমা বলল, ‘আমার সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে কেন? আমাকে কি কোনও ওষুধ দিয়েছেন?’
লোকটা বলল, ‘একটু গোপনীয়তার ব্যাপার তো থাকেই। চিন্তা কোরো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমি ঠিক হয়ে যাবে।’
রুমা চুপ করে গেল। শরীর ঠিক লাগছে না।
একটা সময় গাড়ি থামল। লোকটা বলল, ‘এসে গেছি।’
গাড়ি থেকে নামল রুমা।
চারতলা একটা বিল্ডিংয়ের সামনে এসে লোকটা বলল, ‘এস।’
রুমার মাথা গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে ঘুরে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর সামলে নিয়ে লোকটার পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল।
বিল্ডিংয়ের দেয়ালে বিভিন্ন প্রকল্পের বিজ্ঞাপন দেওয়া। রুমাকে অফিস ঘরে নিয়ে বসানো হল। লোকটা একটা কাগজ দিয়ে বলল, ‘ফর্মটা ফিল আপ কর।’
ফর্মটা দেখতে গিয়ে হঠাৎ করে অফিস ঘরের জানলার বাইরে চোখ পড়ল রুমার। এক যুবক হাঁটছে। হাঁটার ভঙ্গিটা ভীষণ চেনা তার। অফিস থেকে ফিরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এভাবেই পায়চারি করত বারান্দায়। কিছুক্ষণ পরেই তার হাতে উঠে আসত কখনও পর্দা টাঙানোর রড, কখনও বা প্রাইমারি স্কুলের কাঠের স্কেল, কখনও তবলার হাতুড়ি। এখানে দিব্যেন্দু কী করছে?
সে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
লোকটা বলল, ‘কী হয়েছে?’
রুমা সভয়ে বলল, ‘আমাকে গাড়িতে নিয়ে চলুন।’
লোকটা বলল, ‘কেন? কী হয়েছে?’
রুমা বলল, ‘প্লিজ, চলুন।’
লোকটা বলল, ‘বেশ, চলো।’
আবার দৌড়তে দৌড়তে গাড়িতে এসে বসল রুমা। তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছিল। লোকটা জলের বোতল এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে? এবার বলা যাবে?’
রুমা বলল, ‘এখানে আমার হাজব্যান্ড আছে। ও কী করছে এখানে?’
লোকটা বলল, ‘এখানে? তুমি শিওর?’
রুমা বলল, ‘হ্যাঁ, আমি শিওর। আমি ওকে দেখতে পেয়েছি। এটা তো লেডিস হোম। ও এখানে কী করছে?’
লোকটা বলল, ‘হবে কিছু একটা। আমি তো এই হোমটাই চিনি। তোমাকে এখানেই পুনর্বাসন দেওয়া যেত। একটু অপেক্ষা করবে?’
রুমা লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি আমাকে যে কাজ বলেছিলেন, সেখানেও তো আমার হাজব্যান্ডের সামনে পড়ে যাবার সুযোগ থাকবে? থাকবে না?’
লোকটা বলল, ‘না থাকার চান্সটাই বেশি। তুমি হাই সোসাইটিতে যাবে যেখানে তোমার হাজব্যান্ড কোনওভাবেই পৌঁছতে পারবে না। যদি বা কোনওভাবে পৌঁছে যায়ও, তাহলেও তুমি তখন এতটাই শক্তিশালী হবে, তোমার হাজব্যান্ড কোনওরকম অসভ্যতা করার আগে তুমি প্রতিরোধ করতে পারবে।’
রুমা জোরে জোরে শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘আপনি ইচ্ছে করে আমার হাজব্যান্ডকে এখানে নিয়ে এসেছেন যাতে আমি আপনাদের কাজটা করি, তাই তো? আপনারা তো ওকে খুব ভালো করেই চিনে গেছেন। কোনভাবে ওকে এখানে নিয়ে এসেছেন।’
লোকটা খুশি হল, ‘ভেরি গুড রুমা। এর মানে হল তোমার বুদ্ধি আছে। এটুকু বুদ্ধি কিন্তু খুব কম কিছু না। পরিস্থিতির চাপ মানুষের বুদ্ধির বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়ে আবার অন্য এক পরিস্থিতিই সে বুদ্ধি বের করে আনতে পারে। তোমার বুদ্ধি আছে। এই কাজে তুমি সফল হবে। আমি নিশ্চিত।’
রুমা লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল শুধু। আর কোনও কথা বলল না…।
৪৪
মাথা ধরে আছে। কিছুই ভালো লাগছে না। সারাক্ষণ মনে হচ্ছে একটা গোটা মানবজনম কেমন বৃথা হয়ে গেল তার। একটা লোক ক্যামেরা দিয়ে সারাদিন তাকে দেখবে? এটা কেমন ব্যাপার? সে খাবে দাবে ঘুরবে, সব দেখবে? রাগ হচ্ছিল। তালা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে নুরুলের দোকানে বসল পূর্ণ। দোকান ফাঁকাই ছিল। নুরুল বলল, ‘কীরে পুন্ন, কী হল?’
পূর্ণ বলল, ‘ভাল্লাগছে না। ক্যামেরা লাগিয়ে দিয়েছে। আমাকে তাড়িয়েও দেবে বোধহয়।’
নুরুল বলল, ‘কী আর করবি! এখন ক্যামেরার সময়। কিছু তো করার নেই। আচ্ছা, বাপিদা ওই টাকাগুলো দিয়ে কী করে বলত?’
পূর্ণ বলল, ‘জানি না। বিদেশে থাকে, জাল নোট কি বিদেশে চলে?’
নুরুল চিন্তিত মুখে বলল, ‘সেই তো। ভালো ছেলে, কোত্থেকে এসব পেল কে জানে।’
পূর্ণর ফোন বেজে উঠল। বিরক্ত গলায় পূর্ণ বলল, ‘দেখলি তো? বেরোতে পারলাম না, ফোন করতে শুরু করে দিয়েছে।’
নুরুল বলল, ‘ধর ধর। কী আর করবি?’
পূর্ণ ফোন কেটে দিল, ‘থাক। ধরব না। আমি আর কাজ করব না। অন্য কোথাও কিছু পাওয়া যায় নাকি দেখি।’
নুরুল বলল, ‘খুব রেগে গেছিস দেখছি।’
পূর্ণ বলল, ‘হ্যাঁ। রাগ তো হবেই। এত কষ্ট করে কাজ করলাম, কেমন ভাগিয়ে দেওয়ার ছক কষছে দেখতে পারছিস না?’
ফোনটা আবার বাজতে শুরু করেছে। পূর্ণ বলল, ‘ধুস, জ্বালিয়ে খেলো তো!’ ধরল, ‘হ্যালো।’
বাপিদা বলল, ‘কী হল? আবার বেরিয়েছ নাকি?’
পূর্ণ বলল, ‘হ্যাঁ। নুরুলের দোকানে এসেছি চা খেতে। তুমিই তো বললে ক্যামেরা লেগে গেলে আর চিন্তা নেই, তাই বেরিয়েছি।’
বাপিদা বলল, ‘ক্যামেরা লেগে গেল মানে যখন খুশি বেরিয়ে যাবে? তোমাকে কী বলা হয়েছিল? যখন খুশি বেরোনো যাবে না, সেটা বলেছিলাম তো?’
পূর্ণ রেগে গেল, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ। দাসখত দিয়ে রেখেছি নাকি?’
বাপিদা বলল, ‘দাসখতই দিয়েছ। কাজের শুরুতেই আমি বলেছিলাম কাজটা এরকম হবে। সব জেনেবুঝে এরকম করছ তুমি। মাইনে নেবে না? নাকি সেটাও চাও না?’
পূর্ণ বলল, ‘ছাড়ো ছাড়ো। টাকার গরম দেখিও না। নকল নোট নিয়ে চলো, ভেবে বসে আছ কেউ কিছুই জানে না।’
নুরুল অবাক হয়ে পূর্ণর দিকে তাকিয়ে ঠোটে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘কী বলছিস কী? চুপ কর!’
ও প্রান্ত একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘এসব কথা কি বাজারে বলে বেড়াচ্ছ?’
পূর্ণ বোকা মানুষ। সে বুঝেছে কথাটা বলে ভুল হয়ে গেছে। সেটাকে ম্যানেজ করতে গিয়ে বলল, ‘কোন সব কথা? এখানে কথার কী আছে? আমি আর নুরুল জানি। আর কেউ জানে না।’
বাপিদা বলল, ‘ঠিক আছে। এসব নোট খেলনা হিসেবে রাখা হয়েছিল, তুমি আবার আলমারি খুলে সেটা নিয়ে এদিক-সেদিক বলে বেড়াচ্ছ?’
পূর্ণ বলল, ‘এদিক সেদিক বলিনি। আমরা দুজনেই জানি।’
ফোনটা কেটে গেল।
নুরুল ফ্যাকাসে মুখে বলল, ‘এটা তুই কী করলি? এ কথা কেউ বলে? এবার জেনে গেল তুই আলমারি খুলেছিলিস’!
পূর্ণ উঠে দাঁড়াল, ‘আমি যাই বরং। কী বলিস?’
নুরল বলল, ‘যা। কী যে করিস। এ চাকরিটা বোধ হয় তোর গেল।’
পূর্ণ বলল, ‘হ্যাঁ। ব্যাগটা নিয়ে আসি।’
পূর্ণ হাঁটতে শুরু করল। মন খারাপ হয়ে গেছে। এটাই তার সমস্যা। রাগের মাথায় কী বলে, নিজেই জানে না। আরেকবার কি বাপিদাকে ফোন করবে? নাকি করবে না?
হাঁটতে হাঁটতে বাজার পেরিয়েছে সবে, এমন সময় একটা পটকা ফাটার আওয়াজ কানে এল। পূর্ণ বিড়বিড় করতে লাগল, ‘লোকের এত আনন্দ যে কোত্থেকে আসে, কে জানে!’
ব্যাগটা নিতে হবে, মাথার মধ্যে ঢুকে ছিল, রাস্তায় জোর পায়ে হাঁটতে শুরু করেছে, এমন সময় দেখল পিন্টু জোরে সাইকেল চালিয়ে আসছে। পূর্ণ অবাক হয়ে বলল, ‘কীরে, এত তাড়া কীসের?’
পিন্টু চিৎকার করে বলল, ‘ভরা বাজারে নুরুলদাকে কারা জানি গুলি করে পালিয়েছে।’
