অপারেশন ট্রেইটর – ৫

গরম লাগছে। লতিফ চৌধুরী পান খাচ্ছে। কষ গড়িয়ে পানের রস পড়ছে। তার দাড়ি মেহেন্দি করা। কোত্থেকে একটা বলিউডি গান বাজছে।

লতিফ চৌধুরী চিৎকার করল, ‘এইসব হারাম গান বন্ধ কর। বন্ধ কর। কতবার বলছি এসব গান চালানো এইখানে নিষেধ।’

লতিফের ছেলে সফিক এসে বাবার কাছে বসল। ‘আব্বা।’

লতিফ বলল, ‘কও। তোমার আর কাম কী? সারাদিন ঘরে শুইয়া থাকো।’

সফিক বলল, ‘আব্বা, সাদিক ভাই আসবে বলছে। ফোন দিছিল।’

লতিফ বলল, ‘কখন আইবে?’

সফিক বলল, ‘সকাল দশটায়।’

লতিফ ঘড়ির দিকে দেখল, রাগী গলায় বলল, ‘এখন দশটা বাজতে পাঁচ মিনিট আছে। তোমারে কখন ফোন দিছিল?’

সফিক বলল, ‘কাল রাইতে।’

লতিফ রাগী চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাইর হও। বাইর হও।’

সফিক লজ্জিত মুখে বলল, ‘টেকা লাগবে আব্বা।’

লতিফ বলল, ‘কী কামে লাগবে?’

সফিক বলল, ‘আম্মা কইসে।’

লতিফ পকেট থেকে টাকা বের করে ছুঁড়ে মারল।

বাইরে গাড়ির হর্ন শোনা গেল। লতিফ উঠে দাঁড়াল, ‘তুই যা। আমি দেখতাসি। যা যা।’

সফিক দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সাদিক ঘরে ঢুকে লতিফকে কদমবুসি করে সালাম করল।

লতিফ খুশি হয়ে প্রত্যুত্তরে সালাম জানিয়ে বলল, ‘কী দরকার ছিল তোমার আসার? আমারে বললেই পারতা! আমি চইলা যাইতাম।’

সাদিক বলল, ‘আসার দরকার ছিল। সরকার থেকে আবার একটা কমিটি বানাইছে রাজাকারদের তালিকা তৈরির জন্য। অন্য কেউ থাকলে সমস্যা ছিল না। শেখের বেটি আছে না? শেখের বেটির নিজস্ব রাগ আছে রাজাকারদের বিরুদ্ধে।’

লতিফের মুখ শুকিয়ে গেল, ‘আবার? আগেরবার ফাঁকি দেওয়া গেছিল। এবার কী হবে? আমার বয়স হইসে। এই বয়সে টানাটানি করবে নাকি?’

সাদিক বলল, ‘করবে না। আমার এক দোস্তোরে বলা আছে। ও সব দেখবে। ও আবার আপনার খুব বড় ভক্ত। দেখা করতে আইসে।’

লতিফ বলল, ‘কই?’

সাদিক ডাকল, ‘রুমান। আস।’

ঘরে অমল প্রবেশ করল। লতিফের পা ছুঁয়ে কদমবুসি করল।

সাদিক বলল, ‘খুব ভালো ছেলে, বুঝলেন? তালিকা তৈরির কাজ ওরেই দেওয়া হইসে। রুমান। আমার পরিচিত।’

রুমান বলল, ‘আপনার কথা অনেক শুনছি। কত গ্রামে আপনি তখন পাকিস্তানি সেনা লইয়া গেছেন।’

লতিফের মুখে আলাদা আভা চলে এল, ‘তা আর কী কই? আমি ছিলাম বইলা গ্রামের পর গ্রাম মালাউন পালাইসিল। তাও পারে নাই। কম করসি?’

সাদিক বলল, ‘আমাদের লক্ষ্য একই আছে। আমরা আবার পাকিস্তান দেখতে চাই আমাদের দেশে। আমরা চাই তার লক্ষ্যে চাচা আপনি আমাদের নেতৃত্ব দেন। আমাদের শিক্ষা দ্যান। পথ দেখান। পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’

সাদিক আবেগে কেঁদে ফেলল লতিফের হাত ধরে।

লতিফ বলল, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ। কোনও খবর আইসে?’

সাদিক অমলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাইরে যাও।’

অমল সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সাদিক বসে বলল, ‘খবর আছে। বড় মিয়াঁভাই আসবেন।’

লতিফের মুখ খুশিতে ভরে উঠল, ‘মাশাল্লাহ। কবে আসবেন?’

সাদিক বলল, ‘জানাবো। সব জানাবো। আমরা এবার আমাদের লক্ষ্যে সফল হবই। অনেক মালাউন আছে এখন সরকারের কান ভারী করছে। ইন্ডিয়া চেষ্টা কইরা যাইতাসে। আমরা এখনই আমাদের কাজ না করতে পারলে সমস্যা বাড়বে জনাব।’

লতিফ বলল, ‘জানি তো। আমি সেই কবে দিয়া বলতাসি। মিয়াঁ ভাই আইলে কিন্তু আমারে ডাকবা। আমি কথা কমু। কতদিন উর্দু কই না। আহা, কী সুমিষ্ট ভাষা। প্রাণের ভাষা।’

সাদিক বলল, ‘সেদিন নিকটে চইলা আইসে। বেশিদিন আমাগো অপেক্ষা করতে হবে না। সব ব্যবস্থা হইয়া যাইব। আপনি কিন্তু রুমানের লগে কন্ট্যাক্ট রাখবেন। মাঝে মাঝে ফোন দিবেন। এখন সময় ভালা না। কত লোকের লগে ঝামেলা লাগে। ও ভুইলা গেলেও আপনি ভুলবেন না। আমি যাই চাচা।’

লতিফ ঘাবড়ে গিয়ে সাদিকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আবার ভুলবে ক্যান?’

সাদিক বলল, ‘কথার কথা চাচা। আপনি কন্ট্যাক্ট রাইখেন।’

লতিফ ব্যাজার গলায় বলল, ‘ঠিক আছে। রাখব।’

.

সাদিকের গাড়িটা জাহাজের মতো বড়। আসগর দরজা খুলে দিয়ে তাকে বসাল। নিজে রাণার উল্টোদিকে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করল।

রাণার অস্বস্তি লাগতে শুরু করল। আসগর একটাও কথা বলছে না। চুপ করে বসে আছে।

রাণা জানলার বাইরের ঢাকা শহরটাকে দেখতে লাগল। সাদিক যেন একপ্রকার জোর করে তাকে পাঠিয়ে দিল। এখন এই বিকেলবেলাতেই পাঠিয়ে দিল? অদ্ভুত!

সোনাগাছিতে রাণার একটা বাঁধা মেয়েছেলে আছে। তারা। যাওয়ার আগে ফোন করে যায়। তারা আর কাউকে ঘরে ডাকে না। একবার তারাকে নিয়ে দীঘা গেছিল রাণা। তারা খুব খুশি হয়েছিল। সন্ধেবেলাতেও সমুদ্রে স্নান করার জন্য বায়না ধরেছিল।

অদ্ভুত দিন কাটে তারার সঙ্গে। এখানে, ঢাকায় এসে আবার সেরকম একটা মেয়ের সঙ্গে তার দেখা হবে? জীবনটা ভারি অদ্ভুত। কখন কোন চমকের সামনে নিয়ে এসে দাঁড় করায়, কেউ জানে না।

একটা গলির সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আসগর দরজা খুলে বলল, ‘চলেন।’

রাণা গাড়ি থেকে নামল।

আসগর হাঁটতে শুরু করল। রাণা তার পেছন পেছন হাঁটতে লাগল।

একটা ছোট গলিতে ঢুকল আসগর। চারদিকে এত ভিড়, অথচ এই গলিটায় একটা লোকও নেই। খানিকটা হাঁটার পর বুঝল এটা আসলে একটা কানা গলি। গলিটা একটা জায়গায় গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। আর যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানেই একটা দরজা।

আসগর এগিয়ে গিয়ে দরজায় দুবার নক করল। দরজা খুলে গেল। আসগর রাণার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘যান।’

রাণা চারদিকে দেখল। কেউ কোথাও নেই। কেউ তাকে দেখছে না। সে ভিতরে প্রবেশ করল। আসগর বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সে। সামনে আরেকটা দরজা। রাণা এগিয়ে দিয়ে দরজায় নক করল।

একটা কমবয়সি মেয়ে দরজা খুলে বলল, ‘আসেন।’

রাণা বলল, ‘আপনি?’

মেয়েটা খিলখিল করে হেসে বলল, ‘আমাকে আপনি বলার দরকার নাই।’

রাণা অপ্রস্তুত হল। সে বলল, ‘জল খাওয়াবেন?’

মেয়েটা আবার হেসে বলল, ‘পানি বলেন। জল বলেন ক্যান?’

রাণা ঘাড় নাড়ল, ‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ। আমাকে পানি দিন।’

মেয়েটা বলল, ‘আসেন, ভিতরে আসেন।’

একটা ছোট ঘরের ভিতর ঢুকল। মেয়েটা রিমোট দিয়ে এসি চালিয়ে দিল। বলল, ‘ভাইজানের গরম লাগে বুঝি?’

রাণা বলল, ‘তোমার নাম কী?’

মেয়েটা বলল, ‘আমি জরিনা। সাকিনা আমার আপা। আপনের কেমন মাইয়া পছন্দ? বুড়ি না ছুড়ি?’

রাণা গলা খাকড়াল। কী বলবে বুঝতে পারছে না সে। দরজা খুলে আরেকজন মেয়ে ঢুকল। জরিনার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, ‘তুই যা। দরজা বন্ধ করে দিয়ে যা।’

জরিনা থতমত খেয়ে, ‘জি আপা’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

মেয়েটা রাণার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে থেকে বলল, ‘এসব করতে আপনাকে এখানে পাঠানো হয়েছে?’

রাণা চমকে মেয়েটার দিকে তাকাল, ‘কে আপনি?’

‘সাকিনা। কেন, রুমান কিংবা অমল কি কিছুই বলেনি আমার সম্পর্কে?’

রাণা মাথা নাড়ল, ‘না। বলেনি কিছু। তাছাড়া সাদিক আমাকে হঠাৎ করে এখানে পাঠিয়েছে। তার আগে আমাকে কোনও কথা বলার সুযোগও পায়নি।’

সাকিনা সিগারেট বের করল। রাণাকে বলল, ‘ফুঁকবেন?’

রাণা মাথা নাড়াল, ‘না।’

একটা ফোন বাজতে শুরু করল। সাকিনা ফোনটা ধরেই অবিকল জরিনার মতো খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, ‘বল জান, মেহেমান এসে গেছে তো, মেহেমানকে আমি দেখছি। তোমায় কিচ্ছু ভাবতে হবে না। ভাবার কিছু নাই। উম্মা।’

ফোনে বড় একটা চুমু খেয়ে ফোন কেটে দিল সাকিনা। রাণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘প্রথম যখন এলাম, বলতো তুমি শুধু আমার, আর কাউকে তোমাকে দেব না। সময় পাল্টে গেল। এখন আমাকে শেয়ার করা যায়। শুয়োর! শুনুন, আপনাকে বলছি’, কড়া গলায় বলল সাকিনা, ‘আপনাকে এখানে ঘুরতে পাঠানো হয়নি।’

রাণার মাথা গরম হল, ‘তাহলে কী করতে পাঠানো হয়েছে? আমার কী করার ছিল যদি আমাকে এখানে পাঠিয়ে দেয়?’

সাকিনা বলল, ‘সেটাই তো খেলা। উস্তাদ আমাকে বলে দিয়েছে আপনাকে অমলের সঙ্গে থাকতে হবে। একা থাকতে দেবেন না ওকে। কিছুতেই যেন আপনাকে ঝেড়ে ফেলতে না পারে। আপনাকে এখানে পাঠিয়ে ও সাদিকের সঙ্গে কোথায় গেছে জানেন?’

রাণা বলল, ‘আমি আজকে এসেছি। আমি কি ম্যাজিক জানি নাকি? সময় লাগবে তো!’

সাকিনা চিন্তিত মুখে রাণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হায়! আমাদের হাতে এই জিনিসটিই মোটে নেই!’

রাণা বলল, ‘অমল কী করেছে?’

সাকিনা কাঁধ ঝাঁকাল, ‘আমি কিচ্ছু জানি না। উস্তাদ আপনাকে এটা বলতে বলেছে, বলে দিলাম।’

রাণা আরও দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়ল…।

.

আধঘণ্টা পর রাণা ঘর থেকে বেরোল। জরিনা যেমন শুরুতে এসেছিল, তেমনই এসে খিলখিল করে হেসে বলল, ‘ভাইজান, সব ঠিক আসে তো?’

রাণা উত্তর দিল না। ঘরের বাইরে বেরোতে জরিনা দরজা বন্ধ করে দিল। আসগর বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে।

রাণা বেরোতে আসগর হাঁটতে শুরু করল। রাণা আসগরের পিছন পিছন হাঁটতে লাগল। ভিড় গলির মুখে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আসগর দরজা খুলে দিল।

রাণা গাড়িতে উঠে অবাক হয়ে গেল। গাড়িতে সাদিক বসে আছে। সে অবাক হলেও মুখে বিস্মিতভাব দেখাল না।

সাদিক হাসল, ‘কেমন ভাই? সাকিনা খুশি করতে পেরেছে তো?’

আসগর গাড়িতে উঠল না। গাড়ি চলতে শুরু করল।

রাণা মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ। সাকিনা খুব ভালো।’

সাদিক বলল, ‘একদম জোশ, তাই না?’

রাণা বলল, ‘হ্যাঁ, একদম জোশ।’

সাদিক অদ্ভুতভাবে হাসল, ‘আপনি রুমানভাইয়ের দোস্তো মানে আমারও দোস্তো। ইন্ডিয়ায় কী করসিলেন আপনি? পালায়ে আসতে হইল কেন?’

সাদিক বেশ অদ্ভুতভাবে কথা বলে। কখনও পুরো বাঙাল ভাষায় কথা বলে, কখনও শান্তিপুরি বাংলায়। রাণা বলল, ‘ঝামেলা হয়ে গেল। মেয়েঘটিত।’

সাদিক বলল, ‘ভাইয়া মনে হয় কথা বলতে ভালোবাসেন না। কম কথা বলেন, তাই না?’

রাণা বলল, ‘রুমান কোথায়?’

সাদিক বলল, ‘আমার বাসাতেই আছে। আমি ভাবলাম আপনার সাথে একবার দেখা করে আসি। মানে মেহমান তো আপনি। আমরা আবার মেহমানদের জন্য জানও দিতে পারি। কোক খান ভাই। অনেক পরিশ্রম হয়েছে।’

গাড়ির ভেতর থেকে একটা কোকের বোতল রাণার দিকে এগিয়ে দিল সাদিক। রাণা ইতস্তত করে বোতলে এক চুমুক দিল।

সাদিক বলল, ‘এই যে ঢাকা শহর দেখছেন না ভাই, আমি এই শহরে যখন এসেছিলাম আমার পকেটে কত টেকা ছিল জানেন? পঞ্চাশ টেকা। কী করি নাই? ভিক্ষা করসি, ট্রেনে পকেটমারি, দোকানে কাজ…কী করি নাই? সব করসি। সময় পাল্টায় ভাই। কিন্তু সময় কী দিতে পারে না জানেন? বলেন তো?’

রাণা সাদিকের দিকে তাকিয়ে রইল। উত্তর দিল না। কী বলবে বুঝতে পারছিল না।

সাদিক নিজেই বলে চলল, ‘সময় একজন বন্ধু দিতে পারে না ভাই। বন্ধু খুব কঠিন জিনিস। রুমানভাইয়ের সঙ্গে খুব বেশি দিন হয় নাই আলাপ হয়েছে, কিন্তু রুমানভাইরে আমি আমার দোস্তো বইলা ভাবি। রুমানভাইয়ের প্রবলেম, আমার প্রবলেম। নইলে আমার খাস জায়গায় শুরুতেই আমি আপনারে লইয়া আসি? আপনিই বলেন?’

গাড়ি ফাঁকা রাস্তায় উঠেছে। সাদিক চেঁচিয়ে ড্রাইভারকে বলল, ‘ভালো গান চালা। ও রুস্তম। ভালো গান চালা।’

রাণা সতর্ক হল। সাদিক কি অন্য কিছু প্ল্যান করছে? অহেতুক আজেবাজে কথা বলে যাচ্ছে। অমলের কথা শুনে তো মনে হয়নি তার সঙ্গে সাদিকের এত বন্ধুত্ব হয়ে গেছে?

সাদিক গানের তালে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল, ‘কাজের কথায় আসি গৌতম ভাই। ফাউ প্যাঁচাল পাইড়া যাইতাসি। কুনো মানে হয় না। আপনারে প্রথম দেইখাই আমার ভালো লাইগা গেছে। তাই বলছি। আমি একটা ছোট সিন্ডিকেট খুলসি। কিছু জিনিসপত্র, এদেশ থেকে আমরা বিভিন্ন দেশে পাঠামু, আবার ও সব দেশ থিকাও নিয়া আসতে হইব। তার মধ্যে ইন্ডিয়াও আছে ভাই। কিন্তু আপনি ওদেশে এখন যাইতে পারবেন না, আমি বুঝি। তাই আপনারে ইন্ডিয়ায় পাঠাবো না।’

রাণা বলল, ‘স্মাগলিং-এর কাজ?’

সাদিক বলল, ‘ওরকমভাবে বলবেন না ভাই। স্মাগলিং আবার কী কন? এখনকার দিনে সব পথই এক। যে পথে টেকা আসে, সেই পথই ঠিক। খারাপ ভালো ভাইবেন না ভাই। আমার আপনাকে পছন্দ হইসে। রুমান ভাইয়ের মতো আপনিও আমার সাথে কামে আসেন ভাই।’

রাণা সাদিকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী কাজ করতে হবে?’

সাদিক বলল, ‘ঘুরতে হইব। আজ সিঙ্গাপুর, কাল ব্যাংকক, পরশু দুবাই। ঘুরবেন মনের সুখে, এদিক সেদিক যাবেন। একটা কাগজ দিলে, সেটা নিয়া চইলা আইলেন। এই তো কাম। এর বেশি কিছুই করতে লাগব না।’

রাণা বলল, ‘তার জন্য ধরা পড়লে কী হবে?’

সাদিক খুব খুশি হল যেন। দুলে দুলে হাসল। হাসতেই হাসতেই বলল, ‘আপনারে তো আমি সোনা দিমু না। হিরাও দিমু না। এক খান কাগজ। কাগজের জন্য আপনারে কেউ ধরবে না। নিশ্চিন্ত থাকেন।’

রাণা অবাক হল, ‘শুধু কাগজের জন্য ট্রাভেল করতে হবে? আর কিছু না?’

সাদিক বলল, ‘না। আর কিছু না ভাইজান। শুধু কাগজ। রুমানভাই আপনেরে কি খাওয়াইসে? লাচ্ছি খাবেন?’

রাণা মাথা নাড়ল, ‘নাহ্‌। ওসব খাব না এখন। আপনি কোক খাওয়ালেন তো। তাতেই হবে।’

সাদিক বলল, ‘আপনি আমার এখানে জয়েন করেন ভাই। এই দেশে লোকের কমতি নাই। কিন্তু একটা মাইনসের মধ্যে দুইটা জিনিস এক লগে পাওয়া যায় না। বিশ্বস্ত মানুষ আছে। কিন্তু তার মধ্যে লুকস নাই ভাই। লুকস বোঝেন তো? এই আসগররে যদি আমি ব্যাংকক পাঠাই, ওরে তো পুলিশে ধইরা আগে পিটাইবে তার পর বাকি কথা শুনবে। তাই না?’

রাণা তীক্ষ্ণচোখে সাদিকের দিকে তাকিয়ে রইল। সাদিকরা কী জিনিস দেওয়া নেওয়া করে?

তাকে প্রথম দেখাতেই এত পছন্দ হয়ে গেল যে তাকে নিতে চলে এল? শুরুর দিকে হলে রাণা ভাবত, তার তখন মাথা পরিষ্কার ছিল। মানুষ মেরে মেরে এখন আর বেশি ভাবতে ইচ্ছে করে না। শুধু মনে হয়, ঘরে ফিরে কখন ঘুমোবে। এপাশ ওপাশ করে শোবে। টিভি দেখবে। এই মানসিকতা থেকেই লিস্টার হোটেলের ভুলটা হয়ে গেছে। বোঝে সে। হয়তো আরও অনেক ভুল হতো। ঢাকায় যদি কাজ করতে গিয়ে মরেও যায়, কোনও খেদ থাকবে না। বেঁচে থেকে খুব বেশি লাভ নেই। মরে গেলে যাবে। অত বুদ্ধি খাটাতে যাবে না।

.

সাদিকের প্রাসাদে গাড়ি এসে দাঁড়াল। সাদিক বলল, ‘আসেন ভাই। রাতে না খাওয়াইয়া আপনাকে ছারুম না।’

রাণা দেখল আসগর দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে চলে এসেছে? অদ্ভুত ব্যাপার তো!

অমল ড্রইংরুমে ক্রিকেট ম্যাচ দেখছিল। তাকে ঢুকতে দেখে হাসল, ‘কী, সব ঠিক আছে তো?’

রাণা মাথা নাড়ল। সাদিক বসল। সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘দোস্তোরে কইলাম রুমানভাই। আমি ইন্ডিয়ায় যাওয়ার জন্য জোর করুম না। আমার জন্য মাঝে মাঝে ব্যাংকক, দুবাই, কলম্বো যাইতে হইব। আপনি তো যান, ভাইরে বোঝাইয়া কন না।’

রাণা বিরক্ত মুখে অমলের দিকে তাকাল। অমল বলল, ‘যাবে যাবে। গৌতমের দায়িত্ব আমি নিচ্ছি। আপনি অত ভাবছেন কেন? এর পরে দোস্তো আমার কলকাতা ফিরতেই চাইবে না, দেখবেন।’

সাদিক বলল, ‘তাই তো চাই। আমার কাছে থাকলে চিন্তার কিছু নাই ভাই।’

অমল উঠে দাঁড়াল। টিভির পাশে সাদিকের সঙ্গে তারেকের ছবি। অমল বলল, ‘অনেকবার বলেছি, আবারো বলছি, আপনাদের দেখলে যমজ লাগে ভাই।’

সাদিক বলল, ‘বড় ভাইজান থাকলে কি এখন এত হেডেক নিতে হইতো রে ভাই? সব একাই সামলাইয়া রাখত।’

রাণার মনে পড়ে গেল। তারেক প্রচুর মদ খেয়ে ছিল সেদিন। কলিং বেল টিপতে চিৎকার করতে করতে দরজা খুলল। রাণা দেরি করেনি। পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুণে গুণে চারটে গুলি করে বেরিয়ে চলে এসেছিল। সাইলেন্সার থাকায় কেউ শব্দ পায়নি। লাশটা লুটিয়ে পড়েছিল মেঝেতে। লিস্টার ছোট হোটেল। স্টাফরা তখন ডিনার করছিল। কাজটা করে চুপচাপ হোটেল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে বসেছিল সে।

তারেকের সঙ্গে সাদিকের চেহারার অনেক মিল আছে। সাদিক ধরাগলায় বলল, ‘আমার যাওয়ার কথা ছিল জানেন মিয়াঁ? ভাইজান বলল তোর যাওয়ার দরকার নেই। তুই ভুবনেশ্বর চিনবি না। আমি আর জোর করি নাই। আমারও ভয় ছিল। ভাইজান হয়তো বুঝতে পারসিলো। তাই আমারে না পাঠায়ে নিজে গেছিল।’

অমল আড়চোখে রাণার দিকে তাকাল। সাদিক সিগারেট ফেলে সোফায় এসে বসল। অমলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভাইরে বলেন মিয়াঁ। আমার বিশ্বস্ত লোক দরকার। টেকার বিষয়ে চিন্তা করতে বারণ করেন।’

অমল বলল, ‘করবে তো! গৌতম করবে। কী রে গৌতম, সাদিকভাই এত আদর করে বলছে, তুই করবি না?’

রাণা মাথা নেড়ে বলল, ‘করব।’

সাদিক খুব খুশি হল। ছুটে এসে রাণার হাত ধরে বলল, ‘শুক্রিয়া ভাই। আপনারে অনেক শুক্রিয়া। ইলিশ খাবেন ভাই?’

রাণা মাথা নাড়ল, ‘আপনি যা খাওয়াবেন সাদিকভাই।’

সাদিক রাণাকে জড়িয়ে ধরল।

.

সাদিকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠেই রাণা বলল, ‘এটা কী হল? আপনি কি এখন এই কাজই করছেন? স্মাগলার হয়ে গেছেন?’

অমল অ্যাকসিলারেটরে চাপ দিয়ে বলল, ‘ও ইনফরমেশন আদান প্রদান করে। কোনরকম অনলাইন সিস্টেমে সাদিক বিশ্বাস করে না। ওই কাজ না করলে আমি কী করে জানতাম ওরা ইন্ডিয়াতে কী প্ল্যান করছে?’

রাণা বলল, ‘ব্যাকগ্রাউন্ড চেক ছাড়া ও আমাকে নিচ্ছে কেন?’

অমল বলল, ‘আমার জন্য নিয়েছে। আমার ট্র্যাক রেকর্ড বেশ ভালো। এগারোটার উপর দেশ ঘুরে এলাম সাদিকের কল্যাণে। ও আমার মুখের কথা বিশ্বাস করেছে। পরে চেক করবে হয়তো। তবে তার আগে আমাদের কাজ হয়ে যাবে।’

রাণা বলল, ‘আমার সব অদ্ভুত লাগছে। আমি অনেক কিছুই বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে মাঝখান থেকে কোনও সিনেমা দেখতে শুরু করেছি।’

অমল বলল, ‘কেন? তোমার তো এতক্ষণে অনেকটাই সড়গড় হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। এরকম বললে কী করে হবে? আমাদের কাজ খুবই সিম্পল। সাদিক একটা চুনোপুটি। ও যার যার কথা শুনে কাজ করে, আমাদের সেগুলো খুঁজে বেড়াতে হবে। আর তাদের পেয়ে গেলে…’

রাণা বলল, ‘কী করতে হবে? মেরে দেব?’

অমল শিস দিয়ে উঠল, ‘মারতে পারলে আর কিছু চাই না।’

.

বৃষ্টি নেমেছে। গাড়ির জানলার বাইরে তাকিয়ে রাণা বলল, ‘আপনি যে দেশগুলোতে গিয়ে সাদিককে হেল্প করছেন, এটা উস্তাদ জানে?’

অমল বলল, ‘উস্তাদ সব জানে। না জানিয়ে আমি এ কাজ করব কেন?’

রাণা কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে গেল।

অমল বলল, ‘কী হল? কী বলতে যাচ্ছিলে?’

রাণা বলল, ‘কিছু না।’

অমল বলল, ‘এ দেখি মেয়েদের মতো করো। মেয়েরাও এরকম করে। কথা বলতে গিয়ে বলে কিছু না।’

রাণা বলল, ‘আমার একটা রিভলভার লাগবে। কিছু বুলেট।’

অমল বলল, ‘পেয়ে যাবে। সময়মতো সব পেয়ে যাবে। সাদিকের বাড়িতে ওসব নিয়ে গেলে ধরা পড়ে যাবার চান্স আছে। ওই চান্স নেওয়া যাবে না।’

রাণা বলল, ‘সাদিকের এদিক সেদিক পাঠানোর স্বভাবটা ভালো লাগছে না। ও যদি রিস্কি কোথাও পাঠিয়ে দেয়?’

অমল বলল, ‘পাঠাতেই পারে। এভ্রিথিং ইজ পসিবল। সে কাজে অস্তর লাগলে ও-ই তোমাকে দিয়ে দেবে। আমরা যে কাজে নেমেছি, সে কাজে নামার আগে ভাবতে হয়। নামার পরে ভেবে লাভ নেই। তুমি ঠান্ডা মাথার খুনি, তুমি খুন করার পরে কি ভেবেছ কাজটা ঠিক হয়নি? সেটা ভাবলে কি বেঁচে থাকতে পারতে?’

রাণা চুপ করে গিয়ে জানলার বাইরে তাকাল। প্রথম খুন করার আগে কি সে কোনওদিন ভাবতে পেরেছিল এ জন্মে সে একজন মানুষকে মারতে পারবে? নিজের মতোই হাত চোখ কান ওয়ালা একটা লোক, তার হাতে মরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, রক্তে ভেসে যাচ্ছে, দৃশ্যগুলো কতদিন তাকে ঘুমোতে দেয়নি। জাগিয়ে রেখে দিয়েছে রাতের পর রাত। ধীরে ধীরে ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণে এসেছে। যেটা ইচ্ছে, সেটা করতে পেরেছে। একটার পর একটা পাপবোধ তাকে বিদ্ধ করে গেছে।

শক্ত না থাকলে সবার আগে নিজেকে মরতে হবে। সেটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যাবে না। আদিম মানুষ একে অপরকে মেরেই বেঁচে থাকত। তাকেও বেঁচে থাকতে হবে। তাকে গুরুত্ব পেতে হবে। প্রতিটা মানুষ তাকে গুরুত্ব দেবে। মরতে যেমন ভয় পাবে না সে, একইভাবে যতদিন বেঁচে থাকবে, কারো উপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকবে না। কাউকে ভয় পেয়ে বেঁচে থাকবে না।

অমলের গাড়ি ফ্ল্যাটের পার্কিং-এ দাঁড়াল। অমল গাড়ি লক করে বলল, ‘পেছনে একটা টয়োটা গাড়ি ফলো করছিল লক্ষ করেছ?’ রাণা দেখল সাদা রঙের গাড়িটা বেরিয়ে চলে গেল। সে বলল, ‘সাদিক পাঠিয়েছিল?’

অমল বলল, ‘সাদিক তোমার ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করে দেখবে। মুখে দোস্তো দোস্তো করবে, কিন্তু ঠিকই সব যাচাই করবে। চিন্তা নেই। তোমার কভার ঠিকঠাক সাজানো আছে। চলো।’

অমলের ফ্ল্যাটে ঢুকল দুজনে। অমল দরজা বন্ধ করে আলো জ্বালাল। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জল বের করে গ্লাসে ঢেলে গ্লাস নিয়ে সোফায় বসল, ‘কঠিন খেলা চলছে। কে জিতবে কেউ জানে না।’

রাণা বলল, ‘হারলে কী হবে?’

অমল তার দিকে তাকাল, ‘কী হতে পারে বলে তোমার মনে হয়?’

রাণা বলল, ‘বাইরের দেশগুলোতে যখন পাঠায়, সে কাগজ থেকে ব্লাস্টের লোকেশন সম্পর্কে কিছু লেখে না?’

অমল ঘাড় নাড়ল, ‘লেখে। কোডে লেখে। যেমন এই মুহূর্তে কোচিতে ওদের একটা স্লিপার সেল জেগেছে। আসামেও। এই দুই সেলের জেগে ওঠার কোড ওই কাগজ থেকেই গেছে। কাগজগুলো রিমোটের কাজ করে। ব্যাংককের কোনও এক দেহপসারিণী একটা মিসড কল মেরে একটা স্লিপার সেলের ঘুম ভাঙিয়ে দিতে পারে। ইন্টারেস্টিং না?’

রাণা বলল, ‘হুঁ। উস্তাদকে ফোন করেন কখন?’

অমল বলল, ‘দরকার পড়ে না। রোজ রোজ ফোন করবই বা কেন? তাছাড়া যখন তুমি বাইরের কোনও দেশে থাকবে, তখন তোমার মালিক তুমি নিজেই। অন্য কারো নির্দেশের অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। তোমার মাথায় একজন বন্দুক ধরে আছে, আর তুমি তখন দিল্লিতে ফোন করে জিগ্যেস করবে এখন তোমাকে কী করতে হবে? নাহ্‌, এসব ওভাবে চলে না। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শেখো। নিজের রুটির ব্যবস্থাও নিজে করবে। বুঝলে?’

রাণা বলল, ‘হুঁ।’

.