অপারেশন ট্রেইটর – ৭০

৭০

কত দূর থেকে কে যেন ডাকছে তাকে। সে শুনতে পাচ্ছে না কিছু। এই যন্ত্রণাটা নতুন নয়। আগে হয়েছে। কিন্তু এ যন্ত্রণার তীব্রতা বেশি। সে কি বেঁচে আছে? মরার ভয় তো সেই কবেই চলে গেছিল, যখন দিব্যেন্দু তাকে দরজা বন্ধ করে বাথরুমে রেখে যেত। সে ভয় তার আর নেই।

এখন সে আর ভয় পাচ্ছে না। প্রাণপণে চোখ খুলতে চাইছে। দেখতে হবে চারদিকে। দেখাটা বড় দরকার। যারা তাকে এখানে পাঠিয়েছিল তারা কোথায়? তাদেরকেও দেখতে ইচ্ছে করছে। প্রতিটা মানুষকে দেখার দরকার এখন।

রুমা শুয়ে আছে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছে।

ডাক্তার খোন্দকার ভালো করে দেখে বললেন, ‘মারাত্মক অত্যাচার হয়েছে! বলে বোঝানো সম্ভব না কী হয়েছে। অবজারভেশন দরকার। আমরা নজর রাখছি।’

নির্মল বলল, ‘ওকে। জ্ঞান ফিরলে আমি কি একটা ফোন এক্সপেক্ট করতে পারি?’

খোন্দকার বললেন, ‘সারটেনলি।’

নির্মল আইসিউ-এর বাইরে গেল। দীপা ফোন করছে। বেশ কয়েকবার করেছে সে ধরতে পারেনি। তার শরীরেও সাকিনার রক্ত লেগে গেছে।

ফোনটা রিং হচ্ছে। নির্মল ধরল, ‘বলো।’

‘ঠিক আছ তুমি?’ দীপার গলায় স্পষ্ট উদ্বেগ।

নির্মল বলল, ‘হ্যাঁ। ঠিক আছি। পরে কথা বলছি।’

দীপা বলল, ‘ঠিক আছে। ফোন দিও।’

নির্মল বলল, ‘দেব।’

ফোন কেটে সে চুপ করে বসল। সাদিককে পাওয়া গেল না। সাদিক কোথায় এখন? পালিয়েছে? অমলকে আর রাণাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে হাসপাতালের একটা ছোট ঘরে। নির্মল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে সে ঘরে ঢুকল। অমল তাকে দেখেই বলে উঠল, ‘সাকিনা কেমন আছে নির্মলবাবু?’

নির্মল অমলের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আমার নাম জানলেন কী করে?’

অমল বলল, ‘আমি আপনাকে হেল্প করতে পারি। আনোয়ার আলিকে যে খুন করা হয়েছে আমার কাছে তার প্রমাণ আছে। সাদিকের সঙ্গে আমি কাজ করেছি। কিন্তু এই মুহূর্তে সাকিনার জীবনটা যে কত গুরুত্বপূর্ণ, তা হয়তো আমি আপনাকে বোঝাতে পারব না।’

নির্মলের ভ্রু কুঁচকাল, ‘কে আপনি? আন্ডারকভার? পরিচয় দিন।’

অমল বলল, ‘সাকিনার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দিন স্যার। ও একটু কিছু বলতে পারলেও আমাদের লাভ। বিশ্বাস করুন, ওতে বাংলাদেশেরও লাভ।’

নির্মল কড়া গলায় বলল, ‘আগে পরিচয় দিন। সাদিক কোথায়?’

অমল বলল, ‘সাদিককে পেয়ে যাবেন। সাদিকের ঘুঁটিগুলিও আমি আপনাকে দিয়ে দেব, কী করে ও এ দেশে পাকিস্তানি প্রভাব আনার চেষ্টা করছে এবং সেটা কাকে কাকে দিয়ে। আশা করি, আপনি জানেন বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তার চেনা লোকেরাই কিন্তু করেছিল। যদি এখন আবার সেরকমই একটা প্ল্যান ওরা করে থাকে? কিন্তু এগুলোও এখন গুরুত্বপূর্ণ না। সাকিনাকে আই এস আই তুলে নিয়ে গেছিল। ওরা সন্দেহ করেছিল সাদিকের এই বাধা রাখা মেয়েটার কোনও বড় পরিচয় আছে।’

নির্মল বলল, ‘কোনও পরিচয় আছে?’

অমল নির্মলের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, ‘সাদিকের সম্পর্কে সব জানতে পারবেন আপনি, সাদিকের সমস্ত মুখোশগুলো আপনার কাছে চলে আসবে। বাকি পরিচয় আপনার কি আদৌ জানার দরকার আছে?’

নির্মল শ্বাস ছাড়ল। সাদিকের বাধা মেয়েটা সব জানবে? মাথা কাজ করছে না তার। সে অনেক ক্যাজুয়াল্টি দেখেছে, কিন্তু এই মেয়েটাকে ওরা যেভাবে মেরেছে, তা অবিশ্বাস্য রকমের নিষ্ঠুর। চোখে দেখা যায় না। ছেলেটার বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কিত কথাটার তথ্যপ্রমাণ তো সে নিজেই পেয়েছে। সে জানত জাহির ম্যাডামের কাছের লোক। কিন্তু জাহির আসলে সোবাহানের সঙ্গেই হাত মিলিয়ে ছিল। জিগশ পাজলের অন্য একটা দিক প্রকাশ পাচ্ছে না? ভুল কিছু বলছে বলে মনে হচ্ছে না। বিশ্বাস করে দেখা ছাড়া তার হাতে অন্য কোনও অপশন আছে কি? কিছুক্ষণ আগে তাকেই ওরা সরিয়ে ফেলার প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। চক্র যে আছে, তা নিয়ে কোনও দ্বিধা নেই আর। সে সম্পর্কে এতক্ষণে নিঃসন্দেহ হওয়া গেছে।

তার ফোন বাজছে। ডাক্তার খোন্দকার সাহেব ফোন করছেন। নির্মল সঙ্গে সঙ্গে ধরল, ‘বলুন।’

ডাক্তার বললেন, ‘মেয়েটা কিছু একটা বলছে। আসবেন?’

নির্মল উঠে পড়ল, ‘আসছি।’

নির্মল ফোন রাখতেই অমল বলল, ‘জ্ঞান ফিরেছে।’

নির্মল অমল আর রাণার দিকে দ্বিধাগ্রস্থ মুখে তাকিয়ে বলল, ‘আসতে চাইলে আসুন?’

.

রুমা বিড় বিড় করে কিছু বলে যাচ্ছে। নির্মল ঘরে প্রবেশ করতেই ডাক্তার বললেন, ‘দেখুন তো কী বলছে।’

অমল দৌড়ে রুমার মুখের কাছে গিয়ে কান পাতল। রুমা বিড় বিড় করে যাচ্ছে, ‘কন্টেনার ফোর টু ওয়ান থ্রি, চিটাগং পোর্ট, লতিফ, লতিফ, ফোর টু ওয়ান থ্রি, মাদ্রাসা, লতিফ…।’

শব্দগুলো বলতে বলতেই রুমা চুপ করে গেল। অমল ডাক্তারের দিকে তাকাল, ‘কী হল?’

ডাক্তার খোন্দকার নার্সদের ডাকতে শুরু করলেন।

.

৭১

‘রাণাকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল অমলকে মারতে। শেখাওয়াত পুরোনো রাগের বদলা নিতে পাঠিয়েছিল। আরেকটা এজেন্ট কাছেই থাকবে যে রাণাকেও সরাতে চাইবে। কিপ দ্যাট ইন মাইন্ড।’

তুষার মেসেজ করেছেন। খান মেসেজটা মাথুরকে পড়ালেন। মাথুর ভ্রু কুঁচকে চুপ করে বসে থেকে বললেন, ‘গাড়িটা?’

খান বললেন, ‘ওয়েল, এখন বুঝতে পারছি। সাদিককে ক্লোরোফর্ম দাও তো জামাল…।’

মাথুর অবাক হলেন, ‘কী বুঝতে পারলে?’ মাথুর কিছু বুঝে ওঠার আগেই দরজা খুলে গাড়ি থেকে নামলেন। গাড়িটা দশ হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে। খান সরাসরি গাড়িটার দরজা খুলে বললেন, ‘কী চাই?’

ড্রাইভার সিটে ইমতিয়াজ বসে আছে। খানকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠে বলল, ‘আপনাদের জন্যই ফলো করছিলাম। আপনাদের নিরাপত্তার দিকটাও তো দেখতে হবে, তাই না?’

খান বললেন, ‘নামো। ভিড়ের মধ্যে বেশি নাটক আমার পছন্দ না। তুমি নামো।’

ইমতিয়াজ ঘাবড়ে গিয়ে নামল গাড়ি থেকে। খান বললেন, ‘এখানে কী চলছে? ফলো করছ কেন? যদি আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছ তাহলে কথা বলনি কেন? গাড়িতে চলো। ওখানে গিয়ে বসবে। তোমার নামে আমার কাছে অনেক রিপোর্ট আসত।’ ইমতিয়াজ গাড়িতে উঠতে গেল তড়িঘড়ি।

খান বজ্রকঠিন হাতে ইমতিয়াজের হাত ধরে বললেন, ‘চলো। ওই গাড়িতে চলো। কোনও চালাকি করবে না। তোমার রিভলভারটা আমি দেখেছি। চলো।’

রাস্তায় বেশ জ্যাম হয়ে গেছে। ভিড়ের মধ্যেই কোনমতে ইমতিয়াজকে ঠেলতে ঠেলতে গাড়িতে নিয়ে গেলেন খান। জামাল সাদিককে অজ্ঞান করে দিয়েছিল। সাদিকের শরীরটা বসেই আছে। খান ইমতিয়াজকে সাদিকের পাশে বসালেন। খান বললেন, ‘লুকিয়েছিলে কেন?’

ইমতিয়াজ বলল, ‘আমার কী করার ছিল বলুন স্যার? অমল আমাকে বলল না কোথায় যাচ্ছে। আমার কৌতূহল হচ্ছিল। ফলো করছিলাম তাই।’

খান রিভলভার বের করে হাতে নিলেন, ‘আর?’

ইমতিয়াজ ঘাবড়ে গেল, ‘আর কিছু না।’

খান সন্দিগ্ধ গলায় বললেন, ‘রাণাকে সরাতে পাঠিয়েছে তোমায়, তাই তো? রাণা অমলকে না সরালে তুমি দুজনকেই সরিয়ে দিতে আজ, হিসেবটা তো খুব সহজ, না বোঝার কোনও কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি না।’

ইমতিয়াজ ঘামছিল। খান ঘড়ি দেখলেন, ‘আজকে রাতের মধ্যে তুমি এ দেশ ছাড়বে। দিল্লিতে রিপোর্ট করবে কাল ভোরে। কী করে করবে আমি জানি না। নইলে তোমার এখানের সমস্ত কভার আমি ঢাকাকে দিয়ে দেব। গেট লস্ট!’

ইমতিয়াজ বলল, ‘প্লিজ স্যার, আমাকে আরেকটা সুযোগ দিন।’

জামাল উত্তেজিত গলায় বলল, ‘হোটেল থেকে ওদের বের করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। আমার লোক খবর দিল। কী করব?’

খান বললেন, ‘ব়্যাবের হাতে দুজন ধরা পড়েছে?’

জামাল বলল, ‘হ্যাঁ।’

খান শ্বাস ছেড়ে মাথুরের দিকে তাকালেন, ‘এবার?’

মাথুর বললেন, ‘হাসপাতাল চলো। আমাদের আর কী করার আছে?’

খান বললেন, ‘সাদিক?’

মাথুর বললেন, ‘ইমতিয়াজ দেখুক। না দেখলে ইমতিয়াজকে আমরা দেখব।’

ইমতিয়াজ হাতে চাঁদ পেল, ‘দেখব স্যার। চিন্তা করবেন না।’

খান জামালকে বললেন, ‘ওরা যেখানে গেছে সেই নার্সিং হোমে চলো।’

জামাল গাড়ি স্টার্ট করল। খান বললেন, ‘অমলকে সরানোর প্ল্যানটা তোমার উস্তাদের, তাই তো?’

ইমতিয়াজ মাথা নিচু করে বলল, ‘শুরুতে আমাকেই বলা হয়েছিল। আমি বলেছিলাম তাহলে আমার এখানের কভার এক্সপোজ হয়ে যাবে। ঝুঁকিও ছিল। উস্তাদ তখন রাণাকে পাঠানোর প্ল্যান করেন।’

খান বললেন, ‘কী বলা হয়েছিল?’

ইমতিয়াজ ইতস্তত করে বলল, ‘যে অমল সাদিকের এজেন্ট হয়ে গেছে।’

মাথুর শিস দিয়ে উঠলেন, ‘ঠিক কী চলছিল এখানে, স্পষ্ট বুঝতে পারছি। আপাতত তোমার উস্তাদকে তুমি ভুলে যাও। যা উস্তাদ আছে, তা আমরাই। নয়তো তোমার কপালে অশেষ দুঃখ আছে।’

ইমতিয়াজ সিঁটিয়ে গেল, ‘ওকে স্যার।’

হাসপাতালের থেকে বেশ খানিকটা দূরত্বে গাড়িটা থেমে গেল। খান বললেন, ‘এখন কী করা যায়?’

মাথুর বললেন, ‘অমল কোনও ভাবে যোগাযোগ করতে পারে নাকি দেখা যাক। অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও গতি নেই।’

খান গলা তুললেন, ‘জামাল, সাদিকের ক্লোরোফরমের ডোজ আর কতক্ষণ?’

জামাল বলল, ‘খুব বেশি হলে আধঘণ্টা।’

খান বললেন, ‘ওকে। চলবে। মিনিট পনেরো পরে আবার দিও। আপাতত এটাকে ওদেশে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।’

হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষার প্রহর গোণা শুরু হল…

.

৭২

‘একটা সাধারণ মেয়ে চিটাগং পোর্ট ওভাবে উচ্চারণ করবে না। মেয়েটা কে?’

ডাক্তার খোন্দকার তাদের আইসিইউ-এর বাইরে দাঁড়াতে বলেছেন। রুমার জ্ঞান না ফিরলেও এখন নাড়ি আছে।

নির্মল বেরিয়েই অমলকে জিগ্যেস করল।

অমল চারদিকে তাকিয়ে বলল, ‘কুড়িটা বাচ্চা। নয়, গিয়াস। এদের মধ্যে যে কেউ থাকতে পারে ওই কন্টেনারে। আপনি পারবেন? না আমাকে দেখতে হবে?’

নির্মল ভ্রু কুঁচকে অমলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি ইন্ডিয়ার লোক, তাই তো?’

অমল বলল, ‘বাচ্চাগুলো কিন্তু ইন্ডিয়ার না সাহেব।’

নির্মল শ্বাস ছাড়ল। বলল, ‘গোটা ডিপার্টমেন্ট কম্প্রোমাইজড হয়ে গেছে। আমাকে কখন আটকে দেবে আমি নিজেই জানি না। আমি কী করে কী করব জানি না।’

অমল বলল, ‘ফোন করতে পারি?’

নির্মল মাথা নাড়ল, ‘করুন।’

রাণা চুপ করে বসে আছে। অমলকে মারতে পাঠিয়েছিল তাকে উস্তাদ। অথচ এখানে তো অমলই আছে। আর কে আছে? এই মেয়েটার কাছে সাদিক তাকে পাঠিয়েছিল। মেয়েটা সাদিকের কাছ থেকে এত বড় সব খবর বের করেছে।

অমল ফোন করল। মিনিট পাঁচেক কথা বলে ফোন রেখে নির্মলকে বলল, ‘বললাম। দেখা যাক।’

নির্মল বলল, ‘কাকে বললেন?’

অমল বলল, ‘যেখানে বললে ওই কন্টেনারটা ধরা যাবে। সোবাহান আর জাহিরের ব্যাপারটাও বলেছি। ম্যাডামের জানা দরকার তার কাছের লোকেরা ঠিক কী করছে! তাই না?’

নির্মল অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘হু।’

অমল বলল, ‘সাদিকের মাস্টারমাইন্ডও জাহির সাহেবই। আমার সেটা বের করতে সময় লেগেছে। জানলে অনেক আগে স্টেপ নেওয়া যেত। অবশ্য এই কৃতিত্বটাও সাকিনারই।’

নির্মল চমকে অমলের দিকে তাকাল। অমল বলল, ‘সাকিনার জন্য প্রার্থনা করা ছাড়া উপায় নেই। মেয়েটা অসাধ্যসাধন করেছে। আমার মনে হয় না কন্টেনারে গিয়াস আছে। ওরা এখনও বাংলাদেশের মানুষদের ক্যাটল ক্লাসই মনে করে। নিজেরা কন্টেনারে কোনদিন যাবে না। কুড়িটা বাচ্চা আইসিস বা কোনও লস্কর ট্রেনিং ক্যাম্পে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে।’

নির্মলের ফোনে মেসেজ এল। আলমগিরের মেসেজ এসেছে। পি এমের দফতর থেকে আলমগিরকে ব়্যাবের প্রধান করার ফাইনাল অর্ডার এসে গেছে। তার মুখে হাসি ফুটল, ‘আপনার ফোনে কাজ হয়েছে মনে হচ্ছে।’

অমল বলল, ‘বিপদ বিন্দুমাত্র সরেনি সাহেব। এদেশে পাকিস্তান সিমপ্যাথাইজাররাই সংখ্যাগুরু। বিন্দুমাত্র লাভ হয়নি কোথাও। সোবাহানরাই এগিয়ে থাকবে। চ্যালেঞ্জটা বুঝতে পারছেন আশা করি।’

নির্মল বলল, ‘আমার মনে হয় আপনারা চলে গেলে ভালো হয়। এখানে থাকলে অন্য সমস্যা হবে। আশা করি বুঝতে পারছেন কী বলতে চাইছি?’

অমল বলল, ‘আমরা অন্য কোথাও অপেক্ষা করব। সাকিনাকে ছেড়ে আপাতত কোথাও যাবার কথা ভাবতে পারছি না।’

নির্মল হাত তুলে বাইরের পথ দেখাল, ‘প্লিজ গো। থাকবেন না। আমি আর কোনও বিতর্ক চাই না।’

অমল রাণার দিকে তাকাল, ‘চলো। আমাদের রিমান্ডে নিচ্ছে না চোদ্দোপুরুষের ভাগ্য ভালো।’

রাণা উঠল। দুজনে হাঁটতে শুরু করল। ফ্লোর থেকে বেরিয়ে সিঁড়িতে এসে অমল রাণাকে বলল, ‘তারপর? উস্তাদের কাজটা কখন করবে?’

রাণা চমকে উঠে অমলের দিকে তাকাল, ‘আপনি জানেন?’

অমল হাসল, ‘এস, রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াই। খান আর মাথুর স্যারের গাড়িটা কোথায় আছে দেখি। সাদিককে হালকা ভাবে নিলে হবে না। ব্যাটার লোক গোটা শহরে ছড়িয়ে আছে।’

রাণা বলল, ‘আপনি জানলেন কী করে?’

অমল রাণার কাঁধে হাত রাখল, ‘জানাটাই তো আমার কাজ। তা তুমি তোমার কাজটা করলে না কেন?’

রাণা বলল, ‘আমি কখনোই কনভিন্স হইনি যে কাজটা আমার করার দরকার আছে। সিম্পল।’

অমল হাসল, ‘তুমি বুদ্ধিমানও বটে। তবে উস্তাদ কাঁচা কাজ করার লোক না। নিশ্চয়ই আরও কাউকেও আমার পেছনে পাঠিয়েছে।’

রাণা বলল, ‘কিন্তু আপনাকে কেন টার্গেট করেছে?’

নীচের ফ্লোরে এসে গেছিল তারা। অমল বলল, ‘পুরোনো রাগ। পরে কোনদিন পুরো গল্পটা শুনবে।’

অমলের ফোনের মেসেজ টোন বেজে উঠল। মেসেজ দেখে অমল দাঁড়িয়ে পড়ল। পরক্ষণেই সে হেসে ফেলল।

রাণা বলল, ‘কী হল?’

অমল ফোনটা রাণার দিকে এগিয়ে দিল, খানের মেসেজ। লেখা ‘বি ওয়ার ফ্রম ইওর পার্টনার। হি ওয়ান্টস টু কিল ইউ।’

.

৭৩

রাত বারোটা।

অন্ধকার জায়গাটায় একটা ছোট গাড়ি এসে দাঁড়াল। গিয়াস গাড়ির ভেতর চুপ করে বসে আছে। তার ফোন বাজছে। সে ফোন তুলল, ‘বলো।’

‘জনাব, আপনি এসে গেছেন?’

গিয়াস বলল, ‘হ্যাঁ। তোমরা কোথায়?’

‘কাছেই। গাড়ির ভেতর বাচ্চাগুলো এত বেতমিজ যে কী বলব! চৌধুরী সাহেবকে অসুস্থ করে দিয়েছে।’

গিয়াস রাগী গলায় বলল, ‘বেত্তমিজি করুক না। কোনও অসুবিধে নেই। ঠিক জায়গায় ঠিক দাওয়াই পড়লেই সব ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তার কোনও ব্যাপার না।’

‘তাহলে কি চলে আসব? চৌধুরী সাহেবের কী হবে?’

‘যা অবস্থা আছে, সে অবস্থায় নিয়ে এস। আমি বুঝে নেব।’

‘জি জনাব।’

ফোন কেটে অন্য একটা নাম্বার ডায়াল করল গিয়াস। ও-প্রান্তে একবার ডায়াল হতেই ফোন ধরল, ‘বলো।’

‘জনাব, কন্সাইনমেন্ট এসে গেছে।’

ও-প্রান্তে উল্লাসের শব্দ শোনা গেল, ‘আহ্‌…এটা যে কত বড় কাজ হয়েছে, মৌলানা সাহেব তোমার সঙ্গে কথা বলবেন। ধরো।’

গিয়াস ফোন ধরে রইল।

ও-প্রান্ত থেকে মৌলানা সাহেবের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘আমার বাচ্চা, আমার সন্তান। তুমি পেরেছ শেষ অবধি।’

আবেগে গিয়াসের গলা বুজে আসছিল, ‘হুজুর, পেরেছি। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পরবর্তী লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাব।’

‘আমি জানতাম তুমি পারবে’, মৌলানার আবেগাপ্লুত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘তোমাকে আমরা এই জন্যই ট্রেনিং দিয়েছিলাম। আজকের কাজে তুমি আমাদের যেভাবে গর্বিত করেছ, তার কোনও তুলনা হয় না। আল্লাতালা তোমার মঙ্গল করবে। তুমি পাকিস্তান এসেই আমার সঙ্গে দেখা করবে। বাকি কথা সেখানে হবে।’

গিয়াস বলল, ‘জি জনাব।’

মৌলানা বলল, ‘শুনলাম তুমি ওখানে এক জেনানাকে আটকে রেখেছিলে?’

গিয়াস রাগী গলায় বলল, ‘জি জনাব। সাদিকের পোষ্য মেয়ে। ভেবেছিলাম মেয়েটা র-এর এজেন্ট। পরে দেখা গেল একবারে বুরবক। কিছুই জানে না।’

মৌলানা বলল, ‘সরিয়ে দিয়েছ?’

গিয়াস ক্রুর গলায় বলল, ‘না জনাব। সাদিকের জিনিস, ও বুঝে নিক। বাকি জীবন আর কোনও কাজে লাগাতে পারবে না।’

মৌলানা হো হো করে হেসে উঠে বলল, ‘বেশ করেছ। ওখানে আমরা সাদিককে কাজের জন্য রেখে দিয়েছি, আর ও এই সব করে বেড়াচ্ছে। যা করেছ, ঠিক করেছ। আমি তোমাকে সমর্থন করছি। কন্সাইনমেন্ট নেক্সট স্টপেজে পৌঁছালে আমাকে জানাবে।’

গিয়াস বলল, ‘জি জনাব।’

ফোন কেটে গেল। ট্রাক আসছে। গিয়াস টর্চ বের করে সিগনাল দেখাল।

তার গাড়ির সামনে এসে ট্রাক দাঁড়িয়ে পড়ল। ট্রাক ড্রাইভার ট্রাক থেকে নেমে বলল, ‘বাচ্চাগুলো বড় জ্বালাতন করেছে। চৌধুরী সাহেব মনে হয় অজ্ঞান হয়ে গেছেন।’

গিয়াস হাত নেড়ে বলল, ‘ও মরে যাক। ওকে নিয়ে আমার চিন্তা নেই। ওকে সুদ্ধ কন্টেনার লোড করে দাও।’

ড্রাইভার অস্বস্তির সঙ্গে বলল, ‘যদি সত্যি মরে যায়, তাহলে বাচ্চাগুলো ওই ডেড বডি নিয়েই থাকবে?’

গিয়াস বিরক্তমুখে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাতে তোমার কী? তোমাকে সেটা দেখতে বলেছি? সাদিককে ফোন করেছিলে?’

ড্রাইভার বলল, ‘সাদিককে ফোনে পাচ্ছি না। ওর বাড়িতে ব়্যাবের রেইড হয়েছে।’

গিয়াস মাথা নাড়ল, ‘শুনেছি। ওতে কোনও ক্ষতি নেই। তুমি শিপের দিকে এগিয়ে যাও…’

গিয়াসের কথা শেষ হবার আগেই তার মুখে একটা টর্চের আলো এসে পড়ল।

গিয়াস চিৎকার করে বলল, ‘কোন বেতমিজ? কে?’

ড্রাইভারও চিৎকার করল।

আরেকটা টর্চের আলো এসে পড়ল গিয়াসের মুখে। গিয়াস রিভলভার বের করতে গেল, গুলির শব্দে চারদিক কেঁপে উঠল। গিয়াস পা ধরে বসে পড়ল। ড্রাইভার সঙ্গে সঙ্গে দু’হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল। সভয়ে বলল, ‘কে?’

টর্চ নিভে গেল। একজন এগিয়ে এসে গিয়াসের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল, ‘ভালো আছেন জনাব? ইসলামাবাদে আপনি আমার কাছ থেকে সিগারেট কিনতেন। মনে আছে?’

গিয়াস হাঁ করে কণ্ঠস্বরের মালিকের দিকে তাকাল, কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘কে? কে তুই?’

লোকটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘আদর করে আপনার দেশের লোকেরা আমায় বাজ বলে। নাম শুনেছেন?’

গিয়াস আর কিছু বলে ওঠার আগেই রিভলভারের বাট তার মাথায় মেরে তাকে অজ্ঞান করে দিল…

৭৪

সকাল সাতটা। নরম সূর্যের আলো মুখের উপর পড়ছে সাদিকের।

চোখ খুলে সাদিক দেখল তার সামনের সিটে বসে খান আর মাথুর চা খাচ্ছেন।

খানের পাশ থেকে মাথুর চুক চুক করে শব্দ করে বললেন, ‘হুমকিগুলো ভালো ছিল কিন্তু। মানে যেভাবে ভয় দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল, আমি তো খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম। লাহোরে ছিলাম কয়েকদিন, তখন আমাদের ঘরের সামনে আইএসআই-এর এক অফিসার আসত। সেদিনের থেকেও তুমি বেশি ভয় দেখিয়ে দিয়েছিলে।’

খান শব্দ করে হেসে ফেললেন। দরজা খোলা। সাদিক তাড়াতাড়ি গাড়ির দরজা খুলে বাইরে নামল।

বাইরে চায়ের দোকানে লেখা ‘ভূতের কড়ক চা।’

সাদিক চোখ ছোট করে চারদিক দেখার চেষ্টা করল। খান গাড়ি থেকেই গলা ছাড়লেন, ‘চিনতে পারছিস? কোথায় আছিস বল তো?’

সাদিকের মাথায় ঘোর লেগে আছে। কোনওমতে বলল, ‘বরিশাল এলাম?’

খান হাসি হাসি মুখে সাদিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘না। আরও বল। দেখি মেলে কি না।’

সাদিক কোমরে হাত দিয়ে চারদিক দেখতে লাগল। রাস্তার উপর দিয়ে একটা বাস গেল। সাদিক চোখ ছোট করে বাসের নাম্বার পড়ে নিজের মনেই বলল, ‘এইডা আবার কোন জায়গায় চইলা আইলাম?’

চায়ের দোকানি ব্যস্ত ছিল। সাদিক তার কাছে গিয়েই জিগ্যেস করল, ‘কোন জায়গা এইটা?’

দোকানি বলল, ‘দত্তপুকুর।’

সাদিক অবাক হয়ে বলল, ‘সেইটা কোথায়?’

দোকানি রেগে গিয়ে বলল, ‘পাগল নাকি?’

সাদিকও রেগে গেল, ‘আমারে চেন তুমি? তুমি জানো আমি কে?’

দোকানের বাকি খদ্দেররা হাসতে লাগল, ‘কে তুমি? খয়ের খাঁ? পাগলা গারদের লোক ধরে নিয়ে যাচ্ছে নাকি?’

সাদিক জোর পায়ে হেঁটে গিয়ে গাড়ির জানলার কাছে গিয়ে খানকে বলল, ‘কোথায় এইটা? সত্যি কথা বলেন।’

খান বলল, ‘ইন্ডিয়া। আমরা সাফল্যের সঙ্গে এপারে এসে গেছি। এবার সাদিক সেখ, তোমার তো কোনও চিন্তাই নেই, আমরা দুজন শুধু না, তুষার রঙ্গনাথনও আছেন। আহা…তোমার জন্য আমার খুব ভালো লাগছে। ভালো ভালো লোকের সঙ্গে দেখা হবে। আরও ভালো ব্যাপার হল দিল্লিতে তুমি আরও দুজন পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা করতে পারবে। তোমার বন্ধু গিয়াস আর লতিফ চৌধুরী। লোকগুলো তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য কেমন হা-হুতাশ করছে তুমি জাস্ট ভাবতে পারবে না।’

মাথুর ফিক ফিক করে হাসতে শুরু করলেন। সাদিক মাথায় হাত দিয়ে বড় বড় চোখ করে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। কলকাতা বিমানবন্দর পর্যন্ত বাকি পথ সে আর কোনও কথাই বলতে পারল না…।

.

.

তিন দিন পরের কথা

.

নতুন দিল্লি।

বিশেষ কক্ষে জরুরি ইন্টারোগেশন শুরু হয়েছে অনিল শেখাওয়াতের।

অনিল ঘাম মুছছেন। তুষার বললেন, ‘রেকর্ডার অন করি শেখাওয়াত?’

অনিল ক্রুদ্ধ চোখে তুষারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হু।’

তুষার ঈশারা করলেন। ভিডিও রেকর্ডার অন করা হল।

‘ওকে শেখাওয়াত। প্রথমেই আমি জানতে চাই রুমা মেয়েটির সম্পর্কে।’ তুষার অনিলের চোখে চোখ রাখলেন।

অনিল শেখাওয়াত ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘প্রত্যেকটা দেশই অ্যাগ্রেসিভ প্রসেসে স্পাইং করে। আমি আমার মতো করে রুমাকে ঠিক পথে আনতে চেয়েছি। ওর হাজব্যান্ড ওকে কষ্ট দিত, মারতো, ও এমনিই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত। আমি ওর জীবনে একটা লক্ষ্য দিয়েছিলাম।’

তুষার পেপারওয়েট নিয়ে খেলতে শুরু করলেন, ‘অ্যাগ্রেসিভ স্পাইং? ওকে। তুমি আমাকে একটা কথা বলো, রুমার লাইফ প্যাথেটিক ছিল বলে তুমি ওকে ইউজ করনি, তাই তো?’

অনিল বললেন, ‘করিনি বলিনি। করেছি। সাদিকের ওই একটাই লুপ হোল ছিল। সেখানে ঢুকতে হলে আমাকে একটা মেয়েকে আনতেই হতো। এত বড় ঝুঁকি আর কেউ নিত না। আমার কিছু করার ছিল না। দেশ বাঁচানোর জন্য আমি এই স্টেপটা নিয়েছিলাম।’

তুষার বললেন, ‘আর রাণাকে রিক্রুট করা হয়েছিল কেন?’

অনিল বললেন, ‘আমি নতুন এজেন্টকে কাজ শেখাতে চেয়েছিলাম বলে রাণাকে পাঠিয়েছিলাম। আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে ফিল্ডে কাজই আসল কাজ। যে ফিল্ডে থাকবে, সে একটা ট্রেনিং রুমে থাকা ছেলের থেকে অনেক বেশি জানবে।’

তুষার বললেন, ‘তাহলে কোনও ট্রেনিং ছাড়া আমি যাকে খুশি এই কাজে এনগেজ করে দিতে পারি। তাই তো?’

অনিল বললেন, ‘ট্রেনিং কেন লাগবে? তারেককে মেরেছিল রাণা। ওর থেকে কোয়ালিফায়েড আর কে ছিল? আমাদের সবার পছন্দ ছিল ওকে।’

তুষার মাথা নাড়লেন, ‘বুঝলাম। এবার জাল নোটের ঘটনাটা শুনি।’

অনিল বললেন, ‘ইস্টার্ন সাইডে বাংলাদেশের কয়েকটা ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করার দরকার ছিল। ওরা জাল নোটের ব্যবসা করত। এভাবেই ওদের বিশ্বাস জিতেছিলাম।’

তুষার বললেন, ‘আর পূর্ণ বলে ছেলেটি? ও কোথায়?’

অনিল বললেন, ‘পূর্ণকে আমরা উদ্ধার করেছিলাম। আমার অফিসে চা দেয়। ওখানেই থাকে। ওকে কিছু করা হয়নি।’

তুষার হাসলেন, ‘উদ্ধার করেছিলে? না ওকেও মারার প্ল্যান ছিল?’

অনিল বললেন, ‘মারার কথা ভাবিনি কখনোই।’

তুষার বললেন, ‘বেশ। অমলকে মারতে চাইছিলে কেন? মিথ্যে বলে লাভ নেই, ইমতিয়াজের সাক্ষ্য আমি পেয়ে গেছি। যা বলবে, ভেবেচিন্তে বলো।’

অনিল কুঁকড়ে গেলেন। মাথা নিচু করলেন।

তুষার বললেন, ‘তুমি নিজে জানো তুমি কী করতে যাচ্ছিলে?’

শেখাওয়াত টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে জল নিয়ে পুরো গ্লাসটা খালি করে দিয়ে বললেন, ‘আমি স্বীকার করছি আমি ভুল করেছিলাম। ঠিক করিনি।’

তুষার বললেন, ‘গোটা অপারেশনটা পারফেক্ট সাজিয়েছিলে। আমি একেবারেই রুমাকে রাখার কাজটা সমর্থন করছি না, সেটা আমি এথিকস কমিটিকে ফরোয়ার্ড করব। কিন্তু তুমি আমাকে একটা কথা বলো তো অনিল, এটা কি পার্সোনাল স্কোর সেটল করার জায়গা ছিল?’

অনিল বললেন, ‘ছিল না। ঠিক সে কারণেই আমি রাণাকে বলেছিলাম অমলের থেকে কাজ শিখে নিতে। আমি জানতাম সেটা টাইম কনজিউমিং ব্যাপার। অবচেতনে আমিও চাইনি অমলের ক্ষতি হোক।’

তুষার চুপ করে গেলেন। শেখাওয়ার উশখুশ করতে শুরু করলেন। ঘরে শুধু ঘড়ির কাঁটার শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না।

মিনিট দুয়েক পর নীরবতা ভঙ্গ করে তুষার বললেন, ‘ভেরি ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট। অবচেতন। একজন কন্ট্র্যাক্ট কিলারকে পাঠিয়ে দিয়ে তোমার মনে হচ্ছে তোমার অবচেতন সেটাকে মানতে পারেনি। দুঃখের বিষয় শেখাওয়াত, আমাদের এখানে কার কী মনে হল, তা নিয়ে আমরা বিন্দুমাত্র চিন্তিত নই। যা হয়েছে সেটা নিয়ে চিন্তিত। গোপন খবর যাতে বাইরে না আসে, সে ভয়ে তুমি একজন গরিব চা-ওয়ালাকে পর্যন্ত খুন করেছিলে। তোমার সম্পর্কিত প্রতিটা রিপোর্ট আছে আমার কাছে। তোমার জন্য অমলের মতো এজেন্টকে অবধি আমাদের হারাতে হতো। তোমার কী মনে হয়? তোমার এখন কী করা উচিত?’

অনিল ঘামছিলেন। রুমাল বের করে ঘাম মুছে বললেন, ‘আ আ…আমি…আমি ক্ষমা চাইতে চাই।’

তুষার কড়া গলায় বললেন ‘চাইবে। তবে তা বলে ভেবো না তাতে তোমার সাতখুন মাফ হয়ে যাবে। আমি তোমার ইউনিট ভেঙে দিচ্ছি শেখাওয়াত। স্ট্রংলি রেকমেন্ড করছি যাতে রুমার মতো কোনও মেয়ের জীবন নষ্ট না করা হয়। শেম অন ইউ! রাষ্ট্রের নামে তুমি একজনের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা করেছ। শেম…। আন্তর্জাতিক মিডিয়া আমাদের ছিঁড়ে খাবে। আমি জানি না কী করে এত সব কিছু আমি ধামাচাপা দিতে পারব। সত্যিই জানি না। শেম…।’

অনিল মাথা নিচু করে বসে রইলেন…

.

.

কয়েক দিন পরের কথা

.

কলকাতা।

ফ্ল্যাটের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক। কলিং বেল টিপে দাঁড়িয়ে রইলেন। ক্লান্ত দৃষ্টি তার। চেহারায় হেরে যাবার ছাপ স্পষ্ট।

দরজা খুলে গেল। ভদ্রলোক বললেন, ‘আসতে পারি?’

মেয়েটি কয়েকসেকেন্ড ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আসুন।’

লোকটা ঘরের ভেতরে ঢুকল। মেয়েটি বলল, ‘বসুন।’

ভদ্রলোক সোফায় বসে বললেন, ‘আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি। আমি যেটা করেছি ঠিক করিনি। আপনাকে আমার ওভাবে ব্যবহার করা ঠিক হয়নি। অনেক পরে আমার উপলব্ধি হয়েছে। হ্যাঁ, আমাকে টিম থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে এই ক্ষমা চাওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। আপনি আমার মেয়ের মতো। আমাকে ক্ষমা করবেন কি?’

মেয়েটা চুপ করে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকল।

কিছুক্ষণ পর বলল, ‘একটা মেয়ে নরকে আছে দেখে তাকে আরও সহজেই আরেকটা নরকে ঠেলে ফেলে দেওয়া যায়, বলুন?’

লোকটা মাথা নিচু করে বলল, ‘কিন্তু তুমি পেরেছ রুমা, অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি। তুমি অসাধ্যসাধন করেছ, তুমি নিজে জানো না, তুমি কী করেছ।’

রুমা হাসল, ‘আমার জানার দরকার নেই। তার থেকেও বড় কথা, আমি করিনি, পরিস্থিতি করিয়ে নিয়েছে। আপনি, আর আপনার বিচার ভালো থাকুক। আপনি আসুন বরং। আর কোনদিন দেখা না হলেই খুশি হব মিস্টার শেখাওয়াত।’

লোকটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

রুমা দরজা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল…।

.

দুবাই এয়ারপোর্টের লাউঞ্জ। কিছুক্ষণ আগেই ঢাকা থেকে দুবাই এসে পৌঁছেছে তাদের বিমান। এক্সিকিউটিভ লাউঞ্জে তারা ছাড়া আর কেউ নেই এই মুহূর্তে।

অমল বলল, ‘দেশটা ছাড়তে খারাপ লাগল।’

রাণা গলা নামিয়ে বলল, ‘সেটা তো বুঝলাম। কিন্তু আপনি এখনও কোনও ব্রিফ দেননি আমায়। আমরা কী করব, কোথায় যাব, দুবাই গিয়ে কী করব?’

অমল হাসল, ‘অনেকদিন তুমি তোমার প্রিয় কাজ করনি। এবার করবে। আসগরেই কাউন্ট থামিয়ে দিলে চলবে? অপারেশন ব্লু উইং। দেখো তো, নামটা পছন্দ হচ্ছে নাকি?’

রাণা বিস্মিত হয়ে অমলের দিকে তাকাল।

দরজা খুলে গেল। অমল সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘স্যার এসে গেছেন।’

একজন বয়স্ক ভদ্রলোক ঘরের মধ্যে ঢুকে রাণার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন, ‘হাই রাণা, আমি তুষার, তুষার রঙ্গনাথান…।’

.

শেষ