পাপের সন্তান – ৯

নয়

ওরা চলেছে। দলে দলে চলেছে। বাবিলের নির্বাসিত ইসরায়েল সন্তানেরা। বাবিল ছেড়ে স্বদেশের দিকে ফিরে চলেছে। যে-স্বদেশে হয়তো তারা জন্মায় নি, যে-স্বদেশকে হয়তো চোখেও দেখে নি কোন দিন, আহা, তবু তো স্বদেশ। তাদের পিতৃপুরুষের স্বদেশ। যে-দেশ একদিন যিহোবা তাদেরই জন্য নির্বাচিত করেছিলেন। এ-যে সেই দেশ, মিসর থেকে বেরিয়ে আসবার পর থেকে চল্লিশ বছর পর্যন্ত অস্থির ও যাযাবর জীবন যাপন করে অবশেষে ইসরায়েলের সন্তানগণ যেখানে স্থিতিলাভ করল, আর প্রবুর আশীর্বাদে বংশের পর বংশ ধরে তাদের সন্তান-সন্ততি বনের পশু, নদীর মাছ আর আকাশের তারার মতো বেড়েই চলল।

কিন্তু তারা প্রভুর কাছে জঘন্য পাপ করেছিল। তাই প্রথম পিতা আদমের মত তাদের সেই পবিত্রভূমি থেকে বিতাড়িত হতে হোল। প্রভু নির্মম বিচারক। সেই পাপের ফলে দীর্ঘদিন ধরে তাদের কত না দুর্ভোগ আর লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছে। তারপর আজ এতদিন বাদে অগ্নিদগ্ধ স্বর্ণের মত বিশুদ্ধ হয়ে আবার তারা তাদের পবিত্র ভূমির দিকে ফিরে চলেছে। কি আনন্দ, কি আনন্দ! প্রতিটি ইহুদীর চোখে মুখে আজ আনন্দের প্রস্রবণ উছলে উঠছে।

প্রথম দল চলেছে এক হাজারেরও উপরে। আচার্য ইষ্রা তাদের দলপতি। বাবিল থেকে যে-নদীটি অহবার দিকে চলে গিয়েছে, তারই ধারে এসে ইষ্রা শিবির স্থাপন করলেন। যাহুদা কাছে নয়, দীর্ঘদীনের পথ। পথ দুর্গম, বিপৎ সংকুল। ইহুদীদের শত্রুপক্ষের লোক আর লুণ্ঠনজীবী সুপ্ত দস্যুর দল চারদিকে ছড়িয়ে আছে। এরই মধ্য দিয়ে পথ করে চলতে হবে। অথচ প্রভুর উদ্দেশে নিবেদিত ভারে ভারে স্বর্ণ-রৌপ্য ও বহুমূল্য সম্পদ তাদের সঙ্গে রয়েছে। একথা কি কারু কাছে অজানা আছে।

দলপতি ইষা বিশেষ চিন্তিত হয়ে সেই কথাই ভাবছিলেন। রাজা তাদের সম্পর্কে যে-রকম দয়া ও বিবেচনা দেখিয়েছেন, তাতে আর একটু অনুগ্রহও তাঁর কাছ থেকে পাওয়া যেতে পারত। ইষ্রা যদি একবার মুখ ফুটে বলতেন, তাহলে রাজা হয়তো একদল সশস্ত্র সৈন্য দিয়ে তাদের সাহায্য করতে কুণ্ঠিত হতেন না।

ইষ্রা ভাবছিলেন, সত্যই এটা মস্ত ভুল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখন আর এ ভুল শোধরাবার উপায় নেই। যাত্রা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে প্রভুর নামে নিবেদিত সম্পদ প্রাণ দিয়েও রক্ষা করে চলতে হবে।

ডাক পড়লো প্রধান যাজকদের। শেরেবিয়ে, হশবিয় ও তাদের দশ ভাই, এই বারজন প্রধান যাজক তাঁর ডাকে এগিয়ে এলেন। ওজন করে দেখা গেল, সেখানে ছয়শত পঞ্চাশ তালন্ত পরিমাণ রৌপ্য, এক শত তালন্ত পরিমাণ রৌপ্য, এক শত তালন্ত পরিমাণ রৌপ্যপাত্র, এক শত তালন্ত স্বর্ণ, এক সহস্র অর্দকোণ মূল্যের কুড়িটি স্বর্ণপাত্র এবং স্বর্ণের ন্যায় বহুমূল্য উত্তম পরিষ্কৃত দু’টি তাম্রের পাত্র আছে।

আচার্য্য ইষ্রা তাদের সম্বোধন করে বললেন,

: যাজকগণ, আপনারা অবহিত হয়ে শুনুন। পারস্যরাজ তাঁর মন্ত্রীগণ ও অধ্যক্ষগণ এবং বাবিলের ইহুদীগণ স্বেচ্ছায় প্রভুর নিকট নিবেদনের উদ্দেশ্য যে-অর্থ দান করেছেন, তা আপনাদের হাতে ন্যস্ত করা হচ্ছে। প্রভুর মন্দিরে নিযুক্ত যাজক, লেবীয় এবং ইহুদী- প্রধানদের নিকট এই সম্পদ যথাযথভাবে বুঝিয়ে দিয়ে তবেই আপনারা এই গুরুদায়িত্ব থেকে মুক্তি পাবেন। আর আমাদের যাত্রাপথের শেষ পর্যন্ত এই সহস্রাধিক ইহুদী-ভাই আপনাদের পাহারা দিয়ে চলবে।

প্রধান যাজকগণ অবনত মস্তকে এই পবিত্র দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। যাত্রা শুরু হয়ে গেল।

আর সেই দিন সন্ধ্যার পর কবার নদীর তীরে বাইশী গাছের গায়ে পাশাপাশি গা ঘেঁষে বসে দু’টি প্রাণী বলাবলি করছিল।

: ওরা চলে গেল শদরা। আমার এতদিনের স্বপ্ন দেখা অবশেষে সত্যি-সত্যই সফল হতে চলেছে। আমরা সবাই যাব, সবাই মিলে সেই দুর্ভাগ্য দেশকে আবার নতুন করে গড়ে তুলব! সেই দুগ্ধ আর মধুর দেশ আবার তার ফিরে পাওয়া সন্তানদের কলহাস্যে মুখরিত হয়ে উঠবে। আবার আমাদের মরা নদীতে বান জাগবে, গড়ে উঠবে আমাদের নতুন সমাজ আর নতুন জীবন। ওরা আজ চলে গেছে। কাল যাব আমরা— এই গরীব ইহুদী পাড়ার বাসিন্দারা। জানো শদরা, এবার আমরা ইহুদীরা ভাই ভাই মিলে যাব, সবাই সমান হব, ছোট বড় আর থাকবে না। আঃ, কি মধুর স্বপ্ন!—এ কি, তুমি কাঁদছ শদরা? শদরা—শদরা—

: কি করব বল, আমার চোখে যদি জল এসে যায়, আমি কি করে তাকে আটকে রাখব? আমি কাঁদব না? তুমি আমার আপন, কিন্তু যাহুদা আমার কে? আমি আমার বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, কতদিনের কত সুখ-দুঃখের স্মৃতিতে ঘেরা আমার এই জন্মভূমি, এই কবার, আকাশ সব কিছু ছেড়ে চলে যাব, তবু আমি কাঁদব না? মেয়েরা স্বামীর ঘরে যায়, আর পেছন ফিরে চেয়ে চোখের জল ফেলে, এ তো চিরদিনেই নিয়ম। কিন্তু তাদের তো কেউ জন্মের মত সবকিছু থেকে তো এমন করে ছিনিয়ে নিয়ে যায় না, যেমন আমাকে যেতে হচ্ছে। তবু আমি কাঁদবো না?

মিকার সমস্ত উৎসাহ যেন ঠাণ্ডা হয়ে জল হয়ে গেল। নিজের আনন্দে অধীর হয়ে উঠেছে সে, শদরার কথাটা তো একবারও ভেবে দেখছে না। শদরা তো ঠিকই বলেছে,—যাহুদা তার কে? শুধু মিকার জন্যই তো সে সব কিছু বিসর্জন দিয়ে চলেছে। মিকার মনে হোল শদরা যেন তার দুর্বল বাহু দিয়ে বাবিলকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছে। আর মিকা তার চুল ধরে হিচড়ে টেনে নিয়ে চলেছে যাহুদার পথে। কি নির্মম! এই কি তাদের ভালবাসার পরিণতি? কি বলবে মিকা? কি করবে মিকা?

: শদরা, এখনও ভেবে দেখো, না হয়—

: না হয়—নাই বা গেলাম তোমার সঙ্গে, না!

: শদরা, আমি এখন বুঝতে পারছি, এভাবে তোমাকে বাবিল থেকে নিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে চরম নিষ্ঠুরতা হবে।

: বুঝতে পারছ? তবে অমন নিষ্ঠুর হোয়ো না। মিকা, আমার কথা রাখবে? নাই বা গেলে যাহুদায়, থেকে যাও এখানেই। এ তো তোমারও জন্মভূমি। আমার কান্না দেখে তোমার যদি দুঃখ হয়ে থাকে, তবে আর কাঁদিও না। ওরা চলে যাক দেশে, সেখানে সবাই স্বাধীনভাবে সুখে আর শান্তিতে জীবন যাপন করুক। ওদের সুখে এখানে বসে সুখী হব। তুমি না হয় যাবে মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসবে। আমি তোমার পথ চেয়ে বসে থাকব, বসে বসে দিন গুনব। আবার তুমি ফিরে আসবে বুকে, যেমন করে পাখী ফিরে আসে নীড়ে।

: শদরা!

: যাক, আর বলতে হবে না। বুঝতে পেরেছি তোমাকে যেতেই হবে। তোমাকে আটকে রাখতে পারি, সে সামর্থ্য আমার নেই। কিন্তু তোমাকে ছেড়ে আমি-যে থাকতে পারবো না। তাই আমাকেও যেতেই হবে। কি করব, এই আমার নিয়তি— নিষ্ঠুর নিয়তি।

: শদরা, আমি বড় স্বার্থপর

: ও কথা বলো না। তুমি স্বার্থপর নও। তা হলে কি আমি তোমাকে এমন করে ভালবাসতে পারতাম!

: শদরা, এমন হোল কেন?

শদরা মিকাকে কাছে টেনে এনে আকাশের দিকে ইশারা করে দেখাল আর কানে কানে ফিসফিস করে বলল,

: দেখ মিকা, ওই-যে নক্ষত্রটা আমার দিকে চেয়ে বিদ্রূপ করে হাসছে, ওই তো সব করছে, ওই তো সব কিছুর মূলে।

: কি-যে ছাই বল তুমি, কোথায় বিদ্রূপের হাসি হাসছে! ও তো সুন্দর জ্বলজ্বল করছে, কি সুন্দর দেখতে!

: ও আমার ভাগ্য-নক্ষত্র। ও শুধু আমিই দেখতে পাই। আর কেউ দেখতে পায় না। আমি ওকে বড় ভয় করি।

: কে. তোমাকে এসব বাজে কথা বলেছে? আমি এসব বিশ্বাস করি না।

আমি বিশ্বাস করি। আমার বড় ভয় মিকা। আমার জন্য তুমিও হয়তো অনেক দুঃখ পাবে। আমাদের দু’জনের ভাগ্য একই সঙ্গে জড়িয়ে গেল কি না। তোমাকে না ভালবাসাই আমার উচিত ছিল, না মিকা? কিন্তু এড়িয়ে যাব, সাধ্যি কি আমার! এও-যে ঐ নক্ষত্রেরই কাজ। তা না হলে অতটুকুন মেয়ে, কিই বা বোঝে সে, সেই বা কেন অমন প্রশ্ন করতে গেল? তুমিই বা অমন মিষ্টি করে বলতে যাবে কেন—হ্যাঁরে, খুব ভালবাসি। আর শৈশবের সেই একটি কথা কেনই বা আমার রক্তের সঙ্গে এমন করে মিশে রইল? আমি যৌবনে পা দিলাম, কিন্তু কই, তোমার সম্পর্কে এতটুকু সংকোচ জাগল না আমার মনে। মনে হোল তুমি আমার চিরদিনের আপনার। তোমার মুখের দিকে চেয়ে আমার লাজ-লজ্জা, মানসম্ভ্রম কিছুমাত্র রইল না। আমি নির্লজ্জভাবে আমার মনের আবরণ উন্মুক্ত করে দিয়ে তোমার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে বললাম—আমাকে গ্রহণ করো, গ্রহণ করে আমাকে ধন্য করো। এমন কথা কোন মেয়ে বলতে পারে? মিকা, তুমি জেনো, নিশ্চিত করে জেনো, এও ঐ নক্ষত্রেরই কাজ।

: শদরা, কি আশ্চর্য, এইখানেই।

: হ্যাঁ, সেদিন ওইখানেই তুমি বসেছিলে। আর উপরে ওই অশুভ নক্ষত্রটা ঠিক অমনি করেই তাকিয়েছিল। কিন্তু তখন তো আমি জানতাম না। আর জানলেই বা কি করতাম! ওর উপর কি আর কারু কোন হাত আছে! ও যা করবার করে চলেছে, করে চলবেই।….মিকা, মিকা, আর একটু কাছে এসো।

: আরও কাছে?

: হ্যাঁ, আরও কাছে। আমার কেমন ভয় করছে।

: ওরে ভীরু, কিসের ভয় তোমার?

: আমি কাল রাত্রিতে কি ভয়ানক একটা স্বপ্ন দেখেছি জানো?

: কি স্বপ্ন, শদরা?

: যেন তুমি আর আমি বসে আছি, এখন যেমন আছি, ঠিক সেইভাবে। এমন সময় বিকট-মূর্তি কি একটা আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। ওর কপালের উপর একটা আগুনের মতো চোখ জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। উঃ, কি নিষ্ঠুর সেই চোখের চাহনি! আমি ভয় পেয়ে তোমাকে জড়িয়ে ধরতে গেলাম। কিন্তু কোথায়, তুমি-যে নেই! আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলাম, আর সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঃ, ঘরে একটু বাতাস নেই, দম নিতে পারছি না। ঘরের বন্ধ জানালাটা তাড়াতাড়ি খুলে দিলাম। ও কি, আকাশের সেই তারাটা আমার দিকেই চেয়ে আছে যে! ওই ভয়েই তো রাত্রিবেলা জানালাটা বন্ধ করে রাখি। ও কি আমায় ছাড়বে না! যেখানে যাব, আমার সঙ্গে সঙ্গে ফিরবে! স্বপ্নে দেখা সেই চোখটার মতই নিষ্ঠুর ওর চাহনি। আমি তাড়াতাড়ি জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে চোখ বুজে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম। উঃ, তারপর কি কাঁপুনি! মিকা অবাক হয়ে দেখল, শদরা থরথর করে কাঁপছে।

: মিকা, আমায় জড়িয়ে ধরো। আমার ভীষণ শীত করছে। তোমার দেহের উষ্ণতা দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে তোলো।

মিকা পরম স্নেহে তাকে ছোট্ট শিশুটির মতই জড়িয়ে ধরল। বহুদিন আগেকার কথা তার মনে পড়ে গেল, শদরা যখন ছোট ছিল, যখন তার শিশু দেহে বিদ্যুৎ-তরঙ্গ খেলতে আরম্ভ করে নি।

শদরা আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠল। চোখ মেলে চেয়ে হাসল।

: মিকা, তুমি কি যাদু জান? আমার মনে হচ্ছিল কি জান? আমি যেন এতক্ষণ আমার সেই সুন্দর শৈশবে ফিরে গিয়েছিলাম। মিকা, কি আশ্চর্য, আমার সমস্ত ভয় কেটে গেছে। মনে হচ্ছে, তুমি যদি আমার পাশে থাক, তবে আমার আর কোনদিনও ভয় আসবে না। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না। বুঝেছি, এই আমার ভবিতব্য। আমার এক দিকে তুমি, আর অন্য দিকে সব। আমি তোমাকেই বেছে নিলাম। আমার আর কোন দ্বিধা নেই, দ্বন্দ্ব নেই, সংশয় নেই। আমার সব ভয় কেটে গেছে। এখন তুমি বলো, আমি কি করব?

: কাল চুপি চুপি পালিয়ে আসবে এই সময়ে, এইখানে। খুব সাবধানে, কেউ যেন টের না পায়, তা হলে সমস্ত পণ্ড হয়ে যাবে।

: কিছু লিখে রেখেও আসব না?

: না, এখন নয়। যখন সুদিন আসবে তখন জানাব।

: কিছু সোনা-রূপো নিয়ে আসবো?

: মন্দ কি? এনো, যদি আনতে পার। কিন্তু চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়বে না তো?

: আমাকে ধরে কার সাধ্য! বিধির নির্বন্ধে তোমার কাছে বোকা বনে গেছি। আসলে বুদ্ধি কিন্তু আমার কম নয়।

: তা আমি এক শো বার স্বীকার করি। আমাকে নিয়ে তুমি স্বচ্ছন্দে বেচা-কেনা করতে পার। কিন্তু একটা কথা শদরা, সব তো পার, কিন্তু হাঁটতে পার তো? অনেক হাঁটতে হবে কিন্তু।

: ইস্, আমি হাঁটতে পারি না? আমি কি পারি না? আমি সব পারি। দেখো, আমি তোমাকে অবাক করে দেব।

ভূমিদাস ইহুদীদের পাড়ায় যাত্রার তোড়জোড় চলছে। কি নেবে আর কি রেখে যাবে এই নিয়েই সমস্যা। কিছুই ফেলে যেতে মন চায় না। যদি সবসুদ্ধ নিয়ে যাওয়া যেত। ঘরে ঘরে এই নিয়ে বচসা চলছে। অবুঝ মেয়েগুলোকে বুঝিয়ে ওঠা সহজ কর্ম নয়। স্বামীরা মিষ্টি করে বুঝিয়ে, কড়া করে ধমক দিয়ে কোন কিছুতেই মানাতে পারছে না। সম্পত্তি তো কত! কিন্তু কত হাড়-ভাঙ্গা পরিশ্রমে আর কত করে আপনাদের বঞ্চিত করে এইটুকু বিত্ত তারা সঞ্চয় করে তুলেছে! এও যদি ফেলে যেতে হয়, তবে তাদের আর রইল কি?

মেয়েরা সদ্যোমৃত সন্তানের মত তৈজসপত্রগুলোকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। আর তাদের স্বামীরা মুখ বাঁকা করে তেরছা চোখে তাদের দিকে চেয়ে আছে। মানুষের মনটাকে যদি দেখতে পাওয়া যেত, তা হলে দেখা যেত, তাদের ভেতর থেকেও গোপন কান্না ঠেলে ঠেলে উঠছে। কিন্তু তারা যে পুরুষ। তারা তো মেয়েদের মত অমন করে খোলাখুলি কাঁদতে পারে না। এই মাটিটুকু, এই ঘরখানি, এই জিনিসপত্রগুলো, তার বউ, তার ছেলেমেয়ে, সবকিছু জড়িয়ে নিয়ে গড়ে উঠেছে তার ব্যক্তিত্ব। এরই মধ্যে কোনও কিছু যদি খোয়া যায়, তাহলে ভাঙ্গা চাঁদের মতো তাদের ব্যক্তিত্বও-যে কানা হয়ে যাবে।

মুরুব্বী শ্রেণীর লোকেরা মহাব্যস্ত হয়ে সারা পাড়ায় টহল দিয়ে ফিরছে আর হাঁকডাক করছে : তোমরা কি সব পাগল হলে নাকি? যাহুদা কি এখানে? সে-যে বহু দূরের পথ। তোমরা এত সমস্ত জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা করছ কেন? তোমাদের মাল বইবার জন্য রাজা কি উট বা ঘোড়া কি গাধা পাঠিয়ে দিচ্ছে? আহাম্মকের দল, তোমরা ভেবেছ কি! দুহাতে যেটুকু স্বচ্ছন্দে বয়ে নিতে পারবে সেইটুকুই নাও। যতটা পার খাবার জিনিস নিয়ে নাও সাথে করে। আর কাপড়-জামা, টাকা-পয়সা। এসব ছাড়া আর কিছু না। হ্যাঁ গো মেয়েরা, বাচ্চাগুলোকে নিয়ে চলতে হবে, খেয়াল আছে সেদিকে? ওরা তো এখন খুব লাফাচ্ছে, কিন্তু দুপা হেঁটেই যখন হেদিয়ে পড়বে, তখন সারা পথ কোলে করে নিয়ে যেতে হবে। আর যে পথ, কে জানে বাপু, এই পথ ভাঙ্গতে গিয়ে কত লোক মুখ থুবড়ে পড়ে মরে যাবে! আমরা তো আরবী নই, আমরা হলাম গিয়ে ইহুদী, আমরা কি এই পথে অত হাঁটতে পারি!

একটি ন’দশ বছরের মেয়ে একটা ডালিম গাছকে জড়িয়ে ধরে কি কান্নাই না কাঁদছে! আহা, ওর নিজের হাতে পোঁতা গাছটা। এইবার প্রথম ফুল হয়েছে। ফলও ধরেছে কয়েকটা। আঃ, কি সুন্দর ফল ক’টি, দিন দিন পুষ্ট হয়ে উঠছে। ওর মনে মনে সংকল্প, কাউকে ছিঁড়তে দেবে না এ ফল। যত দিন থাকবে, গাছেই থাকবে। রোজ সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই ছুটে আসে ফলগুলোকে দেখতে, ফলগুলোকে চুমো খায়, আর তার গাল ঘষে।

হঠাৎ সবাই মিলে কেন-যে এমন ক্ষেপে উঠেছে! শুধু যাহুদা আর জেরুজালেম, তার কোন কথা নেই। কেন তারা যাবে সেখানে, এমন সুন্দর বাড়ীঘর গাছপালা সবকিছু ছেড়ে? এমন সুন্দর ছুটোছুটি করবার মত একটা উঠান, কোথায় গেলে তারা পাবে! আর ঐ ডালিম গাছটা? না, না, ওকে ছেড়ে সে কোথায় যাবে? কিন্তু যাত্রার আয়োজন ক্রমশই এমন সক্রিয় ও সশব্দ হয়ে উঠল যে, তার ছোট্ট বুদ্ধিতে এটুকু সে বুঝল যে, তার বাধা কেউ মানবে না। মন চাক আর না চাক, যেতেই হবে। তখন সে অনেক ইতস্তত করে বাবার কাছে মনোগত অভিপ্রায়টি খুলেই বলে ফেলল—

: বাবা, আমার ডালিম গাছটিকে তুলে আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে যাব।

ব্যস্তসমস্ত বাবা কথা শুনেই ধমক দিলেন। যারা কাছে ছিল, তারা হেসে উঠল। অভিমানিনী মেয়ে তাই এই অন্ধকারে সবার চোখের আড়ালে ডালিম গাছটাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে বসেছে। যাত্রার উৎসবের মাঝখানে সেদিকে কারু দৃষ্টি দেবার ফুরসৎ নেই।

তরুণেরা উৎসবে মত্ত। মশাল জ্বালিয়ে অন্ধকার রাত্রিকে আলোকিত করে তারা প্রভুর বন্দনাগান গেয়ে চলেছে। এইভাবে তারা সারাটা পাড়া প্রদক্ষিণ করবে। তারা গাইছিল,

“ধন্য যিহোবা, তুমি ধন্য। প্রভু, তোমার ক্রোধ অপরিসীম, তোমার শাস্তি কঠিন ও মর্মভেদী। আমাদের পাপময় দেহে তুমি অগ্নিশলাকা-স্বরূপ। কিন্তু প্রভু, তোমার ক্ষমা তুলনা নেই। আজ তুমি শ্যামল মেঘপুঞ্জের মত সারা আকাশ ভরে এসেছ, তোমার করুণার ঘনবর্ষণে সমস্ত দাহ প্রশমিত হবে, আর আমাদের ভয় নেই।

জেরুজালেম, জেরুজালেম, তুমি কত দূর? আমার প্রভুর মন্দিরে ধূপের ধোঁয়ার সৌরভ পাচ্ছি, দক্ষিণের বাতাসে প্রভুর মন্দিরের গীতধ্বনি ভেসে আসছে। জেরুজালেম, জেরুজালেম, তুমি কত দূর?”

“মশালের আলোয় চারদিক আলোকিত হয়ে উঠেছে। গানের শব্দ শুনে প্রতি ঘর থেকে পুরুষ, মেয়ে আর শিশুরা সব বেরিয়ে এল। এত লোকের সমাগম দেখে গায়করাও উৎসাহিত হয়ে তাদের কণ্ঠস্বর আরও উঁচুতে তুলল। সে গানে বিহ্বল হয়ে উঠল শ্রোতাদের মন। তাদের মুখে মুখে গানের শেষকলিটা ঝংকৃত হয়ে উঠতে লাগল— জেরুজালেম, জেরুজালেম তুমি কত দূর?”

গানের দল এগিয়ে চলেছে। কিন্তু হঠাৎ তারা থমকে দাঁড়াল। গান থেমে গেল। মশালের আলোয় স্পষ্ট দেখা গেল পথের ধারে বুড়ো ডুমুর গাছটার তলায় একটি ধোয়ামোছা পরিচ্ছন্ন কবরের উপর একটি মেয়ে লুটিয়ে পড়ে কাঁদছে। গায়কদের মধ্যে কয়েকজন এক সঙ্গে বলে উঠল—এবেদের মা!

এবেদ-ছ-সাত বছরের একটি ছেলে। বাপ-মায়ের একমাত্র ছেলে। সমস্ত ইহুদী পাড়ায় এমন সুন্দর ছেলে আর একটিও ছিল না।

হঠাৎ কি হল, কেউ কিছু বুঝল না, বাপ-মায়ের কোলের ধন সোনার ফুলটি অকালে ঝরে পড়ে গেল।

এবেদের মা রোজ একবার করে এখানে আসে। হতভাগিনী কবরের উপর বুক দিয়ে পড়ে থাকে। এবেদের সঙ্গে কথা কয়। কিন্তু কাল ওরা চলে যাবে যাহুদায়। কার কাছে রেখে যাবে এবেদকে? আহা, এতটুকুন কচি ছেলে, মাকে ছেড়ে সে কি আর এমন করে একা থাকতে পারে! ওরা সবাই স্বদেশে ফিরে যাবে। পিতৃপুরুষের মাটির পবিত্র ধুলো গায়ে মাখবে, প্রভুর মন্দিরে পুজো দেবে। কিন্তু এবেদ, এবেদ তখন কোথায়?

একটু থেমে গানের দল এগিয়ে চলল। আবার তারা সমস্বরে গাইতে লাগল প্রভুর বন্দনাগান। কিন্তু সবাই অনুভব করল, গান যেন আর জমছে না।

নগরের ব্যবসায়ীরা যে-অঞ্চলে থাকে, সেখানকার একটি বাড়ীতে পঞ্চাশ বৎসর- বয়স্ক ইহুদী কুসীদজীবী হাক্কাতান তার অষ্টাদশবর্ষীয়া জীবনসঙ্গিনীকে বোঝাচ্ছিল

: তুমি কি পাগল হয়েছ, আমি এখন বাবিল ছেড়ে যাহুদায় যেতে পারি! আমার লগ্নীতে খাটান দুই শো তালন্ত রৌপ্য এখনও এখানকার বাসিন্দাদের হাতে আটকা পড়ে আছে। বিদেশে মাল চালান দেবার কারবারে আমার মূলধন খাটছে, ব্যবসা দিন দিন ফেঁপে উঠছে। এখন এখান থেকে চলে যাওয়া মানে সর্বস্বান্ত হওয়া। পাগল ছাড়া এমন কাজ কেউ করে?

: ওগো, আমাদের তো অনেক আছে। না হয় কিছু লোকসান হলই বা। ওরা-যে সবাই চলে গেল। আমার বাপ-মা ভাইবোন আত্মীয়-স্বজন সবাই—কে এখানে থাকবে? শুধু তুমি আর আমি কেন এই বিদেশে বিধর্মী পরজাতীয়দের মধ্যে পড়ে থাকবো?

: সবাই চলে যাচ্ছে? বেশ তো, ভালই হয়েছে। ঝামেলা যত কমে ততই ভালো। এখন শুধু তুমি আর আমি দু’টিতে মিলে নির্ঝঞ্ঝাট কপোত কপোতীর মতোই বাস করব। ভাবোন্মত্ত কপোত এই বলে কপোতীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়বার উপক্রম করল। কপোতী একটু সন্ত্রস্ত হয়ে সরে বসল। অপমান ও বিরক্তিতে হাক্কাতানের মুখভঙ্গী বিকৃত হয়ে এল।

: তুমি কি আমার বউ, না আর কারু বউ। একটু ছুঁতে গেলে বউ অমনি ফোঁস করে। কেন, আমাকে এমন করে এড়ানো কেন? আমি তোমাকে কি না এনে দিয়েছি! যখন যা চাও, কথাটা মাটিতে পড়তে পারে না, তখনই তা দিই। আর তার বদলে কিনা এই! গা-ভর্তি গয়না দিয়েছি, বাবিলের বড় বড় ঘরের গিন্নীদের পর্যন্ত দেখে চোখ টাটায়। তবু তোমার মন পাই না আমি!

: আমি তোমার বউ, তোমার বউ, এক শো বার তোমার বউ। আমার অদৃষ্টের এই লেখন কেউ খণ্ডাতে পারবে না। গরীব বাপ-মায়ের কাছে থেকে টাকা দিয়ে কিনেছ—একথা কেমন করে অস্বীকার করব আমি? তার দাম কি আদায় করে নাও না? কাল সারা রাত তুমি আমায় জ্বালাতন করেছ, আমি মুখ বুজে সহ্য করেছি, কোন কথা কই। আর আজ কিনা দিনের বেলাতেই? আমাকে কি একটুও বিশ্রাম দেবে না? কে চেয়েছে তোমার গয়না? কোন্ সুখে আমি গয়না চাইব? নাও, সব গয়না তুমি নিয়ে যাও। তোমার ব্যবসায় খাটিও, লাভ উঠে আসবে।

: আহা, এই তো তোমার দোষ। একটুতেই রেগে যাও। কি বলেছি আমি? আমি তোমার গয়না নিতে যাব কেন? কেন শুধু শুধু অমন রাগ করছ? লক্ষ্মী মেয়েটি। কি চাও তুমি, তাই বলো না। তুমি যা চাও, তাই দেব।

: যা চাই তাই দেবে? দেবে তো?

: হ্যাঁ, তাই দেব।

: ঠিক?

: ঠিক।

: যিহোবার নামে শপথ করে বলো।

: যিহোবার নামে শপথ করে বলছি।

: ওগো, আমাকে যাহুদায় নিয়ে যাও।

: পাগল না কি! আবার সেই কথা। যাহুদায় যাওয়া তো হতেই পারে না।

: হতেই পারে না? এইমাত্র না যিহোবার নামে শপথ করে বললে? তোমার কি ভয় নেই প্ৰাণে?

: ভয় আবার কিসের? তুমি-যে এমন অসম্ভব কথা বলবে, আমি জানতাম নাকি! না না, ও হবে না, ওসব পাগলামি রাখো—

: আমি-যে কত আশা করে বসে আছি, জেরুজালেমে গিয়ে প্রভুর মন্দিরে পূজা দেব। আমার এই কামনাটুকুও তুমি পূর্ণ করতে দেবে না?

: যিহোবা বুঝি শুধু জেরুজালেমেই থাকেন? তিনি সর্বত্র আছেন। তুমি যেখান থেকে ডাকো, সেখানেই তাঁর সাড়া পাবে।

: তুমি কি সত্যি আমাকে যেতে দেবে না?

: আঃ, তুমি এত অবুঝ কেন? দেখছ না, এদেশে পথে পথে সোনা ছড়িয়ে রয়েছে, শুধু কুড়িয়ে নিতে পারলেই হয়। আর শুধু পাঁচটি বছর ধৈর্য ধরে থাক, দেখো, আমি তোমাকে সোনা দিয়ে মুড়ে রাখব।

: হুঁ, পাঁচ বছরে তুমি আমায় সোনায় মুড়ে কবর দিও। আমি কি তোমার কাছে সোনা চেয়েছি কোনদিন! কি হবে এত দিয়ে। মোটে তো আমরা দু’টি প্রাণী।

: আজ না হয় দু’জন আছি। চিরকাল কি তাই থাকব? আমাদের ছেলেপুলে হবে না? কপোতী এবার যেন বাঘিনী হয়ে উঠল। তার চোখে এক ঝলকে বিদ্যুৎ খেলা করে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে সে তার কথার মধ্যে তীব্র বিষ ঢেলে দিল।

: আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তুমি এ কথা বলছ, তোমার লজ্জা করে না? তোমার কি সেই যোগ্যতা আছে?

সাপের মাথায় যেন ধুলো পড়ল। হাক্কাতানের মাথা নত হয়ে গেল। এমন করে- যে তাকে আঘাত করবে, তা সে ভাবতেও পারে নি। অক্ষম ক্রোধে তার সর্বাঙ্গ জ্বালা করতে লাগল। কতক্ষণ এই ভাবে কেটে গেল।

: তুমি যদি আমাকে যেতে না-ই দাও, আমি বলছি, আমি এক দিন তোমার ঘর সংসার ছেড়ে পালিয়ে যাব। সেদিন কিন্তু তুমি আমাকে দোষ দিতে পারবে না। আজ রাজার আদেশে সমস্ত ইহুদী মুক্তি পেয়েছে, শুধু তোমার হাত থেকেই কি আমি মুক্তি

: পাব না?

এবার হাক্কাতান মাথা তুলল। তার মুখে বীভৎস হাসি।

: সে চেষ্টা তুমি করে দেখ। তুমি কি মনে কর, সে ভয় আমি করি না? সত্য কথা বলছি, শোনো, তোমাকে আমি বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করি না। তাই তো বাড়ী ছেড়ে বেরিয়ে যাবার আগে রোজ তোমাকে তালাবদ্ধ করে রেখে যাই।

: এ্যা, তুমি আমাকে রোজ তালাবদ্ধ করে রেখে যাও?

: হ্যাঁ, রোজ।

: কত দিন তুমি আমাকে এইভাবে আটকে রাখতে পারবে?

: কত দিন? যত দিন তোমার ওই উছলে-ওঠা যৌবনে ভাটি না ধরে। তোমার যৌবনের ঐ গর্ব আর গরিমা আমি ভাঙ্গব।

হাক্কাতান বাইরে বেরিয়ে গেল। তার স্ত্রী পেছন পেছন গিয়ে দেখল যে, সে সত্য কথাই বলেছে। দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। বাড়ী থেকে বাইরে বেরোবার আর কোন পথ নেই। এখান থেকে চেঁচিয়ে মরলেও কেউ শুনতে পারে না। সত্যসত্যই সে বন্দিনী।

জানালা দিয়ে ঝুঁকে পড়ে রাজপথের দিকে তাকাল সে। কি জানি, যদি সে এসে থাকে! পথ দিয়ে কত লোক আসছে, যাচ্ছে, তাদের মধ্যে যদি একজন হয়! যদি সত্যিই এসে পড়ে, তবে কি করবে সে? দরজা তো তালাবদ্ধ। কিন্তু কি ভুল, সে তো আর আসতে পারে না। সে-যে এতদিনে যাহুদার পথে।….কি নিষ্ঠুর এই পুরুষ জাতি! এরা সবাই নিষ্ঠুর—সবাই। কেউ কেউ হাক্কাতানের মত কৃপণ আর বর্বর, পারে তো গায়ের মাংস চিবিয়ে খায়। আবার কেউ কেউ আছে যারা যাদু জানে, যারা বাঁশীর সুরে কথা বলে, যাদের হাতের একটু ছোঁয়ায় তুমি বিশ্ব সংসার ভুলে গিয়ে পাতার মত থর থর করে কাঁপতে থাকো। তারা বলে, “তুমি জেগে বসে থেকো, আমি এসে সংকেত দেব, আর তুমি তখন নেমে এসো। তারপর আমি তোমাকে বাবিল আর হাক্কাতানের হাত থেকে মুক্ত করে নিয়ে যাব যাহুদায়। সেখানে মিলব আমরা চির আনন্দের দেশে।” তুমি ভয়ের দোলায় দুলতে দুলতে দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করো, প্রহরের পর প্রহর কেটে যায়, শেষে রাত্রির অন্ধকার কেটে গিয়ে দিনের আলো দেখা দেয়, পথে লোক

চলাচল শুরু হয়ে যায়, তবু তারা আসে না। তারা তাদের খেয়ালে তাদের পথে চলে যায়। আর তোমাদের জন্য শুধু রেখে যায় বুক-ভরা কান্না।

বন্দিনী নিরুদ্দেশ-দৃষ্টিতে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। কোথায় তার মুক্তি, কোথায় তার যাহুদা? জেরুজালেম কত দূর?

আর সেদিন রাত্রিতে কবার নদীর কূলে নলখাগড়ার ঝোপটার আড়ালে যে-ভাঙ্গা কুঁড়েটা আছে সেখানে একটি মেয়ে তার বুড়ো বাবাকে ডেকে বলছিল, বাবা, আমাদের ইহুদীরা সব যাহুদায় ফিরে গেল বুঝি?

অন্ধকারে একটি দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল : হ্যাঁ, মা।

ঘরে তেল নেই, বাতি জ্বলে না, তাই ঘর অন্ধকার। অন্ধকার সকল লজ্জা ঢেকে রাখে। মেয়েটার বয়স হয়েছে। ছেঁড়া ন্যাকড়াটা দিয়ে আপনাকে আর ঢেকে রাখতে পারে না। সারাদিন তাই আপনাকে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু নিতান্ত পেটের দায়ে যখন তাকে বেরোতে হয় বা নদীর ঘাটে যখন সে জল আনতে যায়, বখাটে ছোঁড়াগুলো তাকে দেখে দাঁত বের করে হাসে আর কুৎসিত ইঙ্গিত করে। ওরা সময় বুঝেই আসে। মেয়েটা শরমে মরে যায়।

বুড়ো বাপ আর তার কুমারী মেয়েটি দু’জনে এই ভাঙ্গা কুঁড়েটায় থাকে। সব মরে গিয়ে ওরা এই দু’টিতে এসে ঠেকেছে। যদি ঘরে কেউ এখন একটা বাতি জ্বালাত, তাহলে সেই বাতির আলোতে দেখতে পেত কুমারী মেয়েটির অঙ্গে অঙ্গে ভাবী মাতৃত্বের চিহ্ন সুস্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে। অনাহারে শীর্ণ হলেও ওর মুখে অপূর্ব কমনীয়তা দেখা দিয়েছে। চাঁদের কলঙ্কের মত ওর চোখের নীচে কালো ছায়া পড়েছে। কিশোরীর অপরিণত স্তন দু’টি অনাগত এক শিশুর চাহিদায় স্ফীত ও পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাতি জ্বালালে আরও দেখা যেত ওর দু’টি চোখ থেকে অশ্রুর ধারা গড়িয়ে পড়ছে। অন্ধকার স্নেহময়ী মাতার মত ওর সর্বাঙ্গ আবৃত করে দিয়ে এই পুরুষ কঠিন সংসারের নিষ্ঠুর কৌতূহলী দৃষ্টি থেকে ওকে রক্ষা করছে।

: বাবা, তোমার সাধ ছিল, জেরুজালেমে যাবে, প্রভুর মন্দিরে গিয়ে পুজো দেবে, কিন্তু এই হতভাগিনীর জন্যই তো তুমি যেতে পারলে না। বাবা, আমি তোমার কলঙ্ক। আমার জন্য সমাজে তোমার মাথা নীচু হয়েছে। আমাদের ইহুদী ভাইরা তোমায় ঘৃণা করে, সমাজে তোমাকে বসতে দেয় না। আমার জন্য কত লাঞ্ছনা তুমি পাও।

আহা, এইটুকু কচি মেয়ে, জীবনের কি এক দারুণ অভিজ্ঞতায় ওকে প্রবীণতা এনে দিয়েছে।

: মা, অমন করে বলিস্ না, আমার বুক ফেটে যায়।

: বাবা, কতদিন আমি ভেবেছি গলায় দড়ি দেব। নয়তো কবারের জলে ডুবে মরব, নয়তো আগুনে পুড়ে মরব। কিন্তু যখনই মরতে যাই, অমনি তোমার কথা মনে পড়ে যায়। আমি যদি না থাকি কে তোমাকে দেখবে? আমি ছাড়া তোমার তো আর কেউ নেই।

বুড়ো হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল।

: বাবা, কেঁদো না, কেঁদো না, তুমি আমার কাছে এসো।

: ওরে আমার ছোট্ট মা-টা!

বুড়ো তাকে জড়িয়ে ধরল।

: বাবা, একটা কথা আমায় বুঝিয়ে বলো। আমরা সবাই যিহোবার সন্তান, না বাবা!

: হ্যাঁ, মা।

তিনি তো সবাইকেই ভালবাসেন?

: হ্যাঁ, মা।

: তাই যদি হয়, বাবিলের সমস্ত ইহুদীকে তিনি যাহুদায় তাঁর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন, আর আমাদের এই দু’জনকে তিনি এমন দুঃখ আর লজ্জার মধ্যে ফেলে রেখে গেলেন কেন? বাবা, তিনিও কি আমাদের ঘৃণা করেন? আমরা পাপ করেছি? না না, তুমি তো কোনদিন কোন পাপ করতে পার না। আর আমি, যে যাই বলুক না কেন, তুমি তো জান বাবা, আমি নির্দোষ। বল বাবা, যিহোবার এই অবিচার কেন?

: ওরে মা, তোর এই কথার কি উত্তর দেব আমি। যিহোবার কাছে আমিও তো দিবারাত্রি এই একই কথা জিজ্ঞাসা করছি। যিহোবা, সমস্ত পৃথিবী জুড়ে কত অসহায় মানুষ দিবারাত্রি তোমার কাছে এই প্রশ্নই করছে। তুমি কি এর কোন উত্তর দেবে না? তুমি কি এর উত্তর দিতে পার না? তুমি কি মানুষের মতই অবিচারী, না কি তুমি মানুষের মতই অক্ষম?

রাত্রি বেড়ে চলল। বুড়ো আর তার মেয়ে পাশাপাশি ঘুমিয়ে পড়ল। কবারের স্নিগ্ধ আর্দ্র বাতাস অনেক আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে সেই ভাঙ্গা কুঁড়ের মধ্যে এসে ঢুকল। ওদের দু’জনের গায়ে দরদ-ভরা ঠাণ্ডা হাত বুলিয়ে দিল। কবার সব জানে। কবার সব দেখেছে। কবার কোন কথা ভোলে না। অনুদ্ভিন্ন কুঁড়িটির মত যেই কিশোরী মেয়েটি রোজ তার ঘাটে জল ভরতে আসত, আজও আসে, তার অশ্রুসজল করুণ ইতিহাস কবারের মর্মরধ্বনির মধ্যে মিশে রয়েছে।

যাত্রার উদ্যোগ আয়োজনে মিকা বড় ব্যস্ত। নিজের বলতে তার কিছুই নেই। সে সকলের একজন। এই গরীব ইহুদী পাড়ায় দুঃখী ভূমিদাসেরা তাকে তাদের আপনার মানুষ বলে গ্রহণ করেছে। কে জানে কখন, কেমন করে সে তাদের আপন জন হয়ে দাঁড়াল! মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবে মিকা। সেই কথাগুলো এখনও তার মনে পড়ে “তুমি ইহুদী হয়েও ইহুদীর ভাষা জান না! ও বুঝেছি, তুমি ক্যালদীয়দের পোষা কুকুর সেজে বসে আছ। তুমি গোল্লায় যাও, তুমি গোল্লায় যাও।”

সে তো বেশী দিনের কথা নয়। অথচ মনে হয় কত যুগ আগেকার কথা। অদৃষ্ট- দোষে ইহুদী জাতির সঙ্গে তার যে-ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছিল, তার কিছুমাত্র আর অবশিষ্ট নেই। আজ সে ইহুদীদের সাথে হিব্রু ভাষায় কথা বলে। পুরানো জীবনের যত কিছু চিহ্ন সবই সে তার গা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। সব কিছু ছেড়ে এসেছে—সব? না—শদরা আছে যে। শদরা থাকবার জন্যই এসেছে, ও আর যাবার নয়।

মিকা বড় ব্যস্ত। কত লোককে-যে তার কত কিছু বোঝাতে হচ্ছে! কত লোক-যে পরামর্শ ও উপদেশের জন্য তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে! কজন দাঁড়িয়ে বলাবলি করছিল

: আহা, এবারকার ফসলটা বেশ ভালই হবে গো। শিগগির তো এমন দেখি নি। দিব্যি থনথন করছে গাছগুলো, দেখলে চোখ জুড়োয়। আর ইয়া মোটা-মোটা সব থোড় বেরিয়েছে। কি ফসলটাই না ফলবে! এ বছরটা থাকলে ছেলেপিলেগুলো পেট ভরে খেয়ে মোটাতাজা হতে পারতো। এখন সব কিছু এই হতভাগাদের ভোগে লাগবে।

: ঠিকই বলেছ দাদা। ক্ষেতভরা ফসল এমনিভাবে ফেলে থুয়ে এত দিনের জায়গাটাকে ছেড়ে চলে যেতে মন কি চায়? হাজার হলেও এইখানেই জন্মেছি তো।

আচ্ছা, সতেরটা বছর তো এমনি কেটেই গেল বিদেশে। ফসলটা ওঠা পর্যন্ত আর দুটো মাস কি সইত না? এখন নতুন জায়গায় গিয়ে কে জানে কিই বা আছে অদৃষ্টে! আর বলেই বা লাভ কি, সবাই যাবার জন্য যেন একেবারে ক্ষেপে উঠেছে, আমাদের দু’একজনের কথাটা কি আর বিকোবে?

মিকা বলল : কাকা, অত ভাবছ কেন? যিহোবার নিজের দেশ, সেখানে কি আর কোন অভাব আছে! সে দেশের মাটিতে সোনার ফসল ফলে। আমাদের সব দুঃখ দূর হয়ে যাবে।

কে একজন হেসে বলল : মিকা, তুমি বুঝি এইমাত্র সে দেশ থেকে এলে?

মিকা হেসে উত্তর দিল : না দেখলে বুঝি জানা যেতে পারে না! আচ্ছা, তোমরাই বলো, প্রভুর দেশে অভাব অনটন আর দুঃখকষ্ট থাকবে কেন? তোমরা কি শোনো নি যাত্রাপর্বে প্রভু ইসরায়েল-সন্তানদের জন্য আপন মহিমাবলে আকাশ থেকে মানা আর মাংস বর্ষণ করেছিলেন? মিকা ইতিমধ্যে শাস্ত্রকথা কিছু কিছু আয়ত্ত করে নিয়েছে।

কোন ইহুদী-সন্তান একথার প্রতিবাদ করতে পারবে! ওরা চুপ করে রইল।

মিকা বলে চলল, নিজের কথায় নিজেই মুগ্ধ হয়ে বলে চলল,

: দুঃখ-দারিদ্র্য, ভেদবিভেদ, অশান্তি, হাঙ্গামা আসবে কেন; যদি আমরা প্রভুর নির্দেশ মান্য করে চলি? সেখানে প্রভুর ব্যবস্থা ঢলে, এখানকার মত মানুষের হাতেগড়া ব্যবস্থা নয় তো! প্রভুর কাছে সব সন্তান সমান। তিনি কি মানুষকে বড়-ছোট, ধনী- নির্ধন করে সৃষ্টি করেছিলেন? এখানে ক্যালদীয়রা আমাদের ছোট বানিয়ে রেখেছে, তাই তো আমাদের এত লাঞ্ছনা।

ইতিমধ্যে এই চিত্তাকর্ষক আলোচনার গন্ধ পেয়ে আরও অনেকে তাদের ঘিরে ধরেছে। মিকা বেশ উৎসাহিত বোধ করল। নিজের মনের কামনা ও কল্পনাকেই সে প্রভুর ব্যবস্থা বলে ব্যাখ্যা করে চলল।

সবাই খুশী হয়ে মিকার কথা শুনছিল। আর তার কথা শুনে পরম তৃপ্তি বোধ করছিল। এইজন্যই তো তারা মিকাকে এত ভালবাসে। কিন্তু হঠাৎ ছন্দপতন ঘটল। কুসুমেও কীট থাকে। মাঝখান থেকে কে একটা লোক একটা বেখাপ্পা কথা বলে উঠল—

: আরে ভাই, রেখে দাও ওসব কথা। বড় ছোট ধনী গরীব চিরদিনই ছিল আর চিরদিনই থাকবে। বেশী দূরে গিয়ে দরকারটা কি, এখানেই দেখ না, আমরা গরীব ইহুদীরা সারা দিনমান খেটেও ভর পেটে খেতে পারি না। আর ওদিকে হাক্কাতানের মত সুদখোর ইহুদীরা টাকার কাঁড়ির উপর শুয়ে আছে।

মিকা বলল : সে তো বটে। এ রাজ্যে তো আর প্রভুর ব্যবস্থা চলে না। আমরাও ক্যালদীয়দের দেখে দেখে তাদের মতই হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তাই বলে যাহুদা আর জেরুজালেমে এইরকম চলবে নাকি? তাহলে প্রভুর রাজ্যে আর মানুষের রাজ্যে তফাৎটা কি?

সবাই এক বাক্যে মিকার কথায় সায় দিল। শুধু তো মিকা নয়, সমস্ত নির্বাসিত ইহুদীরাই যাহুদা আর জেরুজালেমকে নিয়ে এমন কত মনোরম স্বপ্নই না দেখে এসেছে। এই স্বপ্ন দেখেই প্রাত্যহিক জীবনের দুঃখ-কষ্টগুলোকে তারা দু’হাতে ঠেলে দিয়েছে। একদিন সুদিন আসবে, একদিন যিহোবা অবশ্যই প্রসন্ন হবেন। আর যাহুদা সেদিন স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে। কত দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত সেই উজ্জ্বল লগ্ন অবশেষে এসে গেছে। এ সময় তারা সন্দেহ আর সংশয়ের কথা শুনতে চায় না।

তাই তো তাদের সেই আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক মিকাকে তারা ঘিরে ধরল। বিশেষত তরুণ সম্প্রদায়। তাদের বিশ্বাসে উজ্জ্বল চোখের দিকে চেয়ে মিকা নিজেও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

আজ এক যুগসন্ধি। বাবিলের কালরাত্রি কেটে গিয়ে যাহুদার বুকে নতুন সূর্যের উদয় হবে। এমন রাত্রি কি কেউ ঘুমিয়ে কাটাতে পারে! প্রাচীন ব্যক্তিরা বারবার উপদেশ দিয়ে দিয়ে ফিরছেন— “তোমরা ঘুমিয়ে নাও—একটু ঘুমিয়ে নাও।” কিন্তু তাঁদের নিজেদের চোখেও ঘুম নেই। এমন রাতে কে ঘুমোতে পারে?

কিন্তু সেই ছোট্ট মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়েছে। কে জানে, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হয়তো সে তার বড় সাধের ডালিম গাছটির স্বপ্নই দেখছে। ছোট্ট এবেদের কবরের উপরে এবেদের মা এখনও লুণ্ঠিত পাখীটির মতই ডানা ঝাপটে পড়ে আছে কি?

হাক্কাতানের অষ্টাদশবর্ষীয়া বধূটি বিনিদ্রনয়নে এখনও কি শূন্য প্রেক্ষণে চেয়ে আছে? কি জানি, যদি বা সে তার কথা মনে করে এখনও যাহুদার পথ থেকে ফিরে আসে, আর যদি সে সংকেত করে সাড়া না পেয়ে ফিরে চলে যায়!

কবারের তীরে সেই ভাঙ্গা কুঁড়েটায় গভীর রাত্রিতে কি একটা স্বপ্ন দেখে হয়তো মেয়েটি ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসেছে। তার পেটের মধ্যে কি যেন একটু নড়ল। পাশ ফিরে গুলো কি? বিষম ভয়ে সে ঘর্মাক্ত হয়ে উঠলো। কি হবে তার পরিণতি? কিন্তু কি আশ্চর্য, সেই ভয়ের পাশাপাশি আর একটি অপূর্ব মাধুর্যের স্রোত বয়ে চলেছে… মধুর ব্যথায় তার পরিপূর্ণ বুক দু’টি টনটন করে উঠল।

শদরার চোখেও আজ ঘুম আছে কি? হয়তো সে বিনিদ্র শয্যার একবার এপাশ একবার ওপাশ হয়ে ছটফট করছে। তার বড় আদরের ছোট ভাইটিকে সে কেমন করে ছেড়ে চলে যাবে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *