পাপের সন্তান – ২১

একুশ

আচার্য ইষ্রা সাধারণ লোক নন। তিনি ইহুদীদের ধর্মজগতের মধ্যমণি। তাঁর নাম ইহুদীদের মুখে মুখে। স্বয়ং মোশির ভ্রাতা প্রধান যাজন হারোন, যিনি সর্ব বিষয়ে মোশির সহায়ক ছিলেন, আচার্য ইষ্রা তাঁরই বংশে জন্মলাভ করেছেন। পবিত্র বংশাবলী পুস্তকে লিখিত আছে—হারোনের সন্তান ইলিয়াসর, ইলিয়াসরের সন্তান পীনহস, পীনহসের সন্তান অবীশুয়, অবীমূয়ের সন্তান বুক্কি, বুক্কির সন্তান উষি; উষির সন্তান সরহিয়, সরহিয়ের সন্তান মরায়োৎ, মরায়োতের সন্তান অসরিয়, অসরিয়ের সন্তান অমরিয়, অমরিয়ের সন্তান অহীটুব, অহীটুবের সন্তান সাদেক, সাদেকের সন্তান শল্লম, শলুমের সন্তান হিলকিয়, হিলকিয়ের সন্তান অসরিয়া, অসরিয়ের সন্তান সরায়, আর সেই সরায়ের সন্তান আচার্য ইষ্রা। হারোন থেকে সপ্তদশ পুরুষ। ইহুদীদের ধর্ম, বিধিবিধান ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে শেষ কথা বলবার তাঁরই একচ্ছত্র অধিকার।

পাপ স্বীকার ও নিয়ম স্থাপন পর্বের সাফল্যমণ্ডিত অনুষ্ঠানের পর আচার্য ইষ্রা এক নতুন প্রেরণায় উদ্দীপিত হয়ে উঠেছিলেন। আবার তিনি সেই সনাতন ও বিশুদ্ধ ধর্মকে সঞ্জীবিত করে তুলবেন। যিহোবার নির্বাচিত সন্তানগণ আবার তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও বিশুদ্ধির উপর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। সেই মহিমময় অতীতকে আবার তিনি ফিরিয়ে আনবেন। আচার্য ইষ্রা এই নতুন সংকল্প নিয়ে কাজে নামলেন।

কিন্তু এক দিন—দুই দিন—তিন দিন, তারপরই আচার্য ইষ্রার মুখ নিষ্প্রভ আর কালো হয়ে এল। অধ্যক্ষেরা দিনের পর দিন তাঁর কাছে যে-সমস্ত খবর পৌঁছে দিতে লাগলেন, তা-যে তিনি কখনও ভাবতেও পারেন নি। তাঁদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারলেন, যাজক লেবীয় ও অন্যান্য ইহুদীরা এই অঞ্চলের পরজাতীয়দের সংস্পর্শে এসে আপনাদের কলুষিত করে ফেলেছে। তারা কনানীয়, হিট্টিয়, পরিষীয়, যিবুষীয়, আমোনীয়, মোয়াবীয়, সিস্ত্রীয় ও ইমারীয় লোকদের ঘৃণ্য আচার ব্যবহার ও রীতিনীতি পালন করে চলেছে। আর তারা আপনাদের জন্য ও আপনাদের পুত্রদের জন্য তাদের কণ্যা গ্রহণ করেছে। এইভাবে ইহুদীদের পবিত্র রক্ত মিথ্যা দেবতার পূজক, কদাচারী ও অশুচি পরজাতীয়দের দূষিত রক্তের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে গেছে।

এই সমস্ত কথা শুনে আচার্য ইষ্রা আপনার বস্ত্র ও পরিচ্ছদ ফালি ফালি করে ছিড়লেন। আপনার চুল আর দাড়ি মুঠোয় মুঠোয় টেনে তুললেন। তিনি সারা দিন কারু সঙ্গে কোন কথা বললেন না। আহার করলেন না, সরাদিন স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। তাঁর এই ভাব দেখে কেউ কোন কথা বলতে সাহস করল না। সবাই ভয়ে কাঁপতে লাগল।

তারপর সন্ধ্যারতির বাজনা যখন বেজে উঠল, আচার্য তাঁর আসন ছেড়ে উঠলেন। তারপর প্রভুর পবিত্র সিন্দুকের সম্মুখে গিয়ে লুটিয়ে পড়ে প্রার্থনা করলেন,

হে প্রভু, আমি তোমার দিকে মুখ তুলে তাকাতে লজ্জিত ও অনুতপ্ত। আমরা বহু পাপ করেছিলাম, সে পাপ মার্জনা করবার মত নয়। কিন্তু তুমি তোমার সন্তানদের প্রতি স্নেহপরবশ হয়ে, তোমার অসীম ক্ষমায় তাদের সেই পাপ মার্জনা করেছ। তুমি তোমার অনির্বচনীয় মহিমার প্রভাবে পারস্যরাজ্যের প্রাণে দয়ার উদ্রেক করেছ, তাই তিনি তোমার ইচ্ছায় চালিতে হয়ে মন্দির প্রতিষ্ঠা ও জেরুজালেম নগরী পুনর্গঠনের অনুমতি দিয়েছেন। তোমার কৃপার কৃপায় আমরা আবার সবই ফিরে পেয়েছি। কিন্তু হায়, তোমার সেই অপার করুণার প্রতিদানে আমরা কি করলাম!

প্রভু, যে-দিন তুমি আমাদের পূর্বপুরুষদের মিসরের ফারাউনের হাত থেকে মুক্ত করে এই পুণ্যভূমিতে বসতি করবার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলে, সেদিন তুমি তাদের আদেশ দিয়েছিলে—তোমরা যে-দেশ অধিকার করতে চলেছ, সে দেশ সেখানকার অধিবাসীদের অশুচিতার ফলে অশুচি হয়ে আছে, তাদের ঘৃণ্য আচার ব্যবহার ও ক্রিয়াকর্মের ফলে সে দেশের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত মালিন্যে পরিপূর্ণ। অতএব তোমরা তাদের পুত্রদের সঙ্গে তোমাদের কন্যাদের বিবাহ দিও না এবং তোমাদের পুত্রদের জন্য তাদের কন্যাদের গ্রহণ করো না। হায়, হায়, আমরা তোমার অবাধ্য সন্তান, আমরা তোমার সেই আদেশ লঙ্ঘন করেছি। এই অশুচি ও কদাচারী পরজাতীয়দের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়ে আমরা আমাদের পবিত্র রক্তকে দূষিত করে চলেছি!

হে প্রভু, আমি ভয়ে কাঁপছি। আর কত তুমি সত্য করবে? এর পরেও কি তোমার প্রচণ্ড ক্রোধাগ্নি এই পাপলিপ্ত ইহুদী জাতিকে ভস্মীভূত করে দেবে না?

এই বলে আচার্য ইষ্রা উচ্চস্বরে ক্রন্দন করে উঠলেন। আচার্য ইষ্রার এই প্রণিপাত, প্রার্থনা, পাপ-স্বীকার ও রোদনের সময় এক বৃহৎ ইহুদী জনতা তাঁর কথা শোনবার জন্য ভিত করে দাঁড়িয়েছিল। আচার্যের প্রার্থনা শুনে তারা ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল। আর আচার্যের রোদনের ধ্বনি শুনতে পেয়ে তারাও সমস্বরে কাঁদতে লাগল।

তখন সেই ভিড়ের মধ্য থেকে এক জন শুক্লকেশ প্রাচীন লোক আচার্য ইষ্রার কাছে এগিয়ে এলেন। তিনি এলম-সন্তান যিহীয়েলের পুত্র শখনিয়। শখনিয় আচার্যকে উদ্দেশ করে বললেন, রাব্বি, আমরা প্রভুর নিকট যে-সত্যে আবদ্ধ ছিলাম সেই সত্য থেকে ভ্রষ্ট হয়েছি, আমরা পরজাতীয়া কন্যাদের গ্রহণ করেছি। কিন্তু তাই বলে আমাদের হতাশ হলে চলবে কেন?

ইহুদী জাতি বহু অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে চলে এসেছে। আজও তার সামনে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। এই পরীক্ষায় পিছিয়ে গেলে তো চলবে না। আপনি আদেশ করুন, আমরা যিহোবার সঙ্গে এই নিয়ম করি যে, আমরা আমাদের এই সমস্ত পরজাতীয়া স্ত্রী ও তাদের গর্ভজাত সন্তানদের ত্যাগ করব।

ত্যাগ? আচার্য ইষ্রা চমকে উঠলেন।

শখনিয় দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, ত্যাগ। নির্মমভাবে ত্যাগ করতে হবে। শরীরের কোন অংশে যদি পচন ধরে তাকে কেটে ফেলতে হয়, নইলে সমস্ত শরীর পচে যায়।

আচার্য ইষ্রার মনে হোল, তিনি যেন যিহীযেলের পুত্র শখনিয়ের কণ্ঠে যিহোবার প্রত্যাদেশ শুনতে পেলেন। না, দ্বিধা নয়, সংশয় নয়, মায়া নয়, মোহ নয়, কোনরকম দুর্বলতা নয়, কঠিন প্রায়শ্চিত্তের আগুনে এই জাতিকে আত্মশুদ্ধি তিনি ধূলিশয্যা থেকে দৃঢ় হয়ে উঠে বসলেন। তখনই মন্দিরে উপস্থিত যাজক, লেবীয় ও ইহুদী প্রধানদের একত্রে সমবেত করে তিনি তাদের উদ্দেশ করে বললেন,

বলো—আমরা যিহোবার নামে শপথ করে বলছি, আমরা যারা পরজাতীয়া স্ত্রী গ্রহণ করেছি, তারা অবিলম্বে তাদের স্ত্রীদের এবং তাদের গর্ভজাত সন্তানদের পরিত্যাগ করব।

এ সময় কেউ তো এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। কয়েকটি মুহূর্তে নিঃশব্দে কেটে গেল। মাথার উপরে যিহোবার রক্তপিপাসু খড়গ উদ্যত হয়ে আছে। আর তার নীচে ভীরু মেষশাবকগুলো প্রাণভয়ে থর থর করে কাঁপছে। ওদের কণ্ঠ দিয়ে স্বর ফুটল না।

আবার আচার্যের বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত হোলঃ বলো, আমরা যিহোবার নামে শপথ করছি—।

কোন এক অদৃশ্য নিষ্ঠুর শক্তির বজ্রপেষণে দয়া মায়া স্নেহ ভালবাসা প্রেম, বাৎসল্য, চূর্ণ, নিষ্পিষ্ট হয়ে গেল। মন্ত্রমুগ্ধ লোকগুলো সম্মোহিতের মত তাঁর কথার পুনরাবৃত্তি করে চলল

: আমরা যিহোবার নামে শপথ করছি—

অধ্যক্ষ ও প্রধানদের নির্দেশমত জেরুজালেম ও যাহুদার সর্বত্র প্রচারিত হয়ে গেল— সিবন মাসের বিংশ দিবসে জেরুজালেমে ইহুদীদের মহাসমাজের অধিবেশন হবে। ঘোষণাকারীরা নগরে আর গ্রামাঞ্চলে ঘোষণা করল, যারা এই সমাবেশে উপস্থিত না থাকবে, তাদের সর্বস্ত বাজেয়াক্ত করা হবে এবং তাদের সমাজচ্যুত করে দেওয়া হবে।

অবশেষে সিবন মাসের বিংশ দিবস মন্দিরের সম্মুখের ময়দানে ইহুদীদের মহাসমাজ বসল। দিনটা দুর্দিন, থেকে থেকে বৃষ্টি গড়ছিল, আর হু হু করে ঠাণ্ডা বাতাস বইছিল। লোকগুলো শীতে ঠকঠকিয়ে কাঁপছে। কিন্তু সবাই স্থির হয়ে বসে আছে। একটা সুকঠোর বিধান গুরুভার পাথরের মত শূন্যের উপর ঝুলছে, সেটা যখন সত্যসত্যই প্রচণ্ডভাবে নেমে আসবে তখন তার বিষম চাপে কত হাহাকার উঠবে, কত রক্ত অশ্রু হয়ে বেরিয়ে আসবে, বহুলোকের চোখে মুখে তারই আভাস যেন ফুটে উঠেছিল। সভার উদ্দেশ্য প্রকাশ্যে ঘোষিত না হোলেও এখন তা আর কারু কাছেই অজানা ছিল না। কথাটা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে।

মঞ্চের কাছেই মিকা আর হানানি বসে ছিল। মিকা বলছিল, আশ্চর্য তোমার দূরদৃষ্টি হানানি। তোমার সেদিনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী-যে এত শীঘ্রই সত্য হয়ে উঠবে, এ কথা কিন্তু আমি ভাবতেই পারি নি।

: আমাদের এই ইহুদী জাতটাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনে ফেলেছি মিকা। সুদক্ষ বৈদ্যের মতই আমি ওর হাতের নাড়ী দেখেই ওর সব কথা বলে দিতে পারি। একবার দেখ, চেয়ে দেখ এদে দিকে। কত লোকের চোখে কান্নার ছায়া, দেখতে পাচ্ছ মিকা? কিন্তু যখন এই নৃশংস ধর্মের কসাইরা ওদের হাতে পবিত্র ছুরি বাগিয়ে এদের ডাক দেবে, তখন এতটুকু আপত্তি এরা করবে না, নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে গলা বাড়িয়ে দেবে। এ তুমি দেখে নিও।

: হানানি, তুমি তো জান না, তোমার আর আমার একই অবস্থা। এত দিন তোমাকে আমি এ কথাটা বলি নি, সেজন্য আমাকে ক্ষমা করো। হানানি হেসে বলল, ক্ষমা? আচ্ছা, তা করব। কিন্তু মিকা, এ কথা তো আমি আগেই জানি।

: জানো তুমি! না, না, তুমি কি করে জানবে?

: ওর নাম আর কথা বলবার ধরন দেখে আমি প্রথমেই সন্দেহ করেছিলাম। পরে এক দিন নিজেই ওকে জিজ্ঞাসা করলাম।

: কাকে, শদরাকে? তুমি ওকে চিনলে কি করে?

: না, শদরাকে অবশ্য চিনতাম না, কিন্তু প্রাচীর গাঁথবার সময় কর্মরতা মিকার বউকে তো দেখেছি। আমি এক দিন কাজের সময় একলা পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি ক্যালদীয়?

: বটে! কি বলল?

: একটু চমকে উঠে একটু সময় আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল। শেষে বলল, হ্যাঁ। আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম, আপনি ভয় পাবেন না, কাউকে বলব না আমি। আমি মিকার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

আমার কথা শুনে সে ভ্রূ কুঞ্চিত করে বলল, আপনি যাকে খুশী বলতে পারেন, আমি কাউকে ভয় করি না।

ও বাবা, বিষম তেজী মেয়ে। বড়ো ভালো লেগেছিল তাকে।

মিকা স্নেহের ভঙ্গীতে হেসে বলল, ওর ওই রকমই। দিনের মধ্যে কত বার-যে ওর কাছে বকুনি খেতে হয়! কিন্তু বেচারা এখনও কিছুই জানে না। জানে না যে, কী বিপদের খড়গ আমাদের মাথার উপর ঝুলছে!

: খড়গ না ছাই! তোমার আমার কি? আমাদের ওরা কি করতে পারে? আমি শুধু ভাবছি এই নিরীহ, নির্বোধ আর নিঃশব্দ প্রাণীগুলোর কথা। ধর্মের নামে ডাক দিলেই ওরা ভয়ে জুবুথুবু হয়ে পড়ে। আর তার চাইতেও আমি বেশী ভাবছি সেই দুর্ভাগিনী পরজাতীয়া মেয়েগুলোর কথা যারা বুকভরা ভালোবাসা আর বিশ্বাস নিয়ে ওদের সঙ্গে ঘর বাঁধতে এসেছিল, আর ওদের সন্তানদের গর্ভে ধারণ করেছিল। ওরা কি ওদের এই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে?

হঠাৎ একটা গোলমাল শুনে ওদের কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গেল। একটু দূরেই একটা লোককে ঘেরাও করে খুব হৈ চৈ চলছে। লোকটি দীর্ঘকৃতি, ভিড়ের মধ্যে থেকেও তার মাথাটা দেখা যাচ্ছে। মাথার চুল সবই পাকা, বৃদ্ধ লোক—সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। ব্যাপার কি? এই বুড়ো লোকটার পেছনে সবাই এমন করে লেগেছে কেন? হানানি আর মিকা দু’জনেই উৎসুক হয়ে উঠে দাঁড়াল। বুড়ো হলেও গলার জোর আছে, তার কথা ওরা বেশ স্পষ্টভাবেই শুনতে পাচ্ছিল।

: বাবিল থেকে যারা এসেছে, তারা আবার ইহুদী, তাদের আবার রক্তের বিশুদ্ধতা! রেখে দাও, রেখে দাও, ওসব আমার কাছে বোলো না। ওদের সবার মধ্যেই ভেজাল। ওরা সাবই দো-আঁশলা। আর ওদের মায়েরা, বউয়েরা আর মেয়েরা বেশ্যাবৃত্তি করেছে ক্যালদীয়দের কাছে। আমাকে বেশী ঘাঁটিও না। আমার কোন্ খবর না জানা আছে!

কথাগুলো উত্তেজনা সৃষ্টি করবার মতই। সবাই ক্ষেপে উঠেছে, আর চারদিক থেকে গলাধাক্কা খেয়ে লোকটা বারে বারেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। দু’ একজন শান্তিপ্রিয়, ভালোমানুষ ওদের নিবৃত্ত করবার জন্য অনুরোধ জানিয়ে বলছেন, আহা পাগল, ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও। কিন্তু ভালোমানুষদের কণ্ঠস্বর উপরে ওঠে না, ফলে কোন কাজও হয় না তাতে।

মিকার মনে হোল বৃদ্ধের পাকা চুলগুলো, তার কণ্ঠস্বর, এমনকি কথাগুলো পর্যন্ত তার অত্যন্ত পরিচিত। কিন্তু কোথায়—কোথায় দেখেছে সে তাকে? হঠাৎ তার স্মৃতির পটে একটা মুখ ভেসে উঠল। হানানি অবাক হয়ে দেখল কথা নেই, বার্তা নেই, মিকা হঠাৎ “পাগলা-বাবা” “পাগলাবাবা” বলতে বলতে ভিড়ের দিকে ছুটে চলেছে। কিন্তু পাগলাবাবাকে খুঁজে পাওয়া গেল না। শান্তিরক্ষকেরা নাকি তাকে সমাবেশের এলাকা থেকে বাইরে বের করে দিয়েছে।

মিকা যখন তার জায়গায় আবার ফিরে এল, তখন আচার্য ইষ্রা মঞ্চের উপর উঠে দাঁড়িয়েছেন।

হানানি কৌতূহলের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল, পাগলাবাবা আবার কে মিকা?

: এখন নয়, পরে হবে। ঐ শোন, আচার্য ইষ্রা শুরু করে দিয়েছেন। আচার্য ইষ্রা প্রথমে যিহোবার বন্দনা দিয়ে শুরু করলেন। তারপর তিনি ইহুদী জাতির মহান ঐতিহ্য, তার ওঠা-পড়া, ভাঙ্গাগড়ার বিচিত্র কাহিনী, বর্তমান অধঃপতিত অবস্থা ও তাদের করণীয়-সম্পর্কে আবেগময়ী ভাষায় যে-ভাষণ দিলেন, ধর্মপ্রাণ ইহুদীরা অভিভূত হয়ে তা শুনল। কিন্তু আচার্য ইষ্রার মূল বক্তব্য কি, এ কথা সবারই জানা ছিল। উপসংহারে সেই কথাই তিনি বললেন। তিনি জানিয়ে দিলেন যে, ইহুদী হয়েও যারা যিহোবার বিধান অমান্য করে পরজাতীয় কন্যাদের গ্রহণ করেছে, তাদের অবিলম্বে সেই সমস্ত স্ত্রীদের ও তাদের গর্ভজাত সন্তানদের পরিত্যাগ করতে হবে। তারপর যথোচিত প্রায়শ্চিত্তের পরে তারা সমাজে প্রবেশ করবার অনুমতি পাবে।

মহাসমাজের সমাবেশে নানা রকম প্রশ্ন ও বাদ প্রতিবাদ ওঠে থাকে। কিন্তু বিষয়টা যেখানে মূল নীতি-সংক্রান্ত এবং স্বয়ং ইষ্রা যেখানে বক্তা, সেখানে শ্রোতারা নিঃশব্দ থাকাটাই শ্রেয় বলে বিবেচনা করল। অধিকাংশ শ্রোতা সাগ্রহে এই ব্যবস্থার সমর্থন জানাল। আর যাদের বুকের ভেতরে আগুন জ্বলছিল, তারা কোন কথাই বলল না। আগুনের ধোঁয়াটুকুও চোখে পড়ল না।

এমন সময় সকলের মনে বিস্ময় ও কৌতূহলের সঞ্চার করে হানানি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, মহাসমাজের কাছে আমার কিছু জিজ্ঞাস্য আছে।

মঞ্চের সামনে যাঁরা ছিলেন সেই অধ্যক্ষগণ, প্রধানগণ ও নেতৃস্থানীয়গণ সচকিত হয়ে উঠলেন। তীরশথ নেহেমিয়া উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তার পরম স্নেহের পাত্র হানানি ও মিকার দিকে তাকালেন। লোকের মুখে মুখে হানানির নামটা ফিরতে লাগল। কেউ কেউ বলল, হানানি, সেই কনানীয় মেয়েটার স্বামী।

মহাসমাজের অনুমতি নিয়ে হানানি প্রশ্ন করল : আমি একটি পরজাতীয় কন্যাকে বিবাহ করেছি, আর তার গর্ভে আমার তিনটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। সংসারের আমি ছাড়া তাদের আর কেউ নেই। আর ইহুদীদের মধ্যে শুধু আমিই নই, সমাজের উচ্চস্তর থেকে নিম্নস্তর পর্যন্ত আমার মত অবস্থার লোক অনেক রয়েছে। এ কথা কারু কাছেই অবিদিত নয়। আমি আমার নিজের পক্ষ থেকে এবং তাদের সকলের পক্ষ থেকে আপনাদের কাছে জিজ্ঞাসা করতে চাই, আমরা যদি আমাদের স্বামীদের ও আমাদের সন্তানদের পরিত্যাগ করি তবে তাদের কি দশা হবে?

আচার্য ইষ্রা উত্তর দিলেন, পরজাতীয় মেয়েদের সম্বন্ধে আমাদের কোন দায়িত্ব নেই। তাদের অদৃষ্টে যা আছে, তাই ঘটবে। আর তাদের এই গর্ভজাত সন্তানেরা পাপের সন্তান। এরা যত শীঘ্র লোপ পাবে যিহোবার রাজ্য ততই নিষ্কলঙ্ক হয়ে উঠবে।

ইহুদীর আবরণের নীচেও মানুষ বাস করে। ইষ্রার সেই অমানুষিক উক্তি শুনে সেই মানুষ কেঁদে উঠল। কিন্তু ইহুদীর পুরু চামড়া ভেদ করে তার সেই কান্না বেরিয়ে আসতে পারল না। হানানি সকলের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখল। কিন্তু কেউ কোন কথা বলল না।

হানানি আবার বলল, আমরা যাদে বিবাহ করে স্ত্রী বলে গ্রহণ করেছিলাম, আমরা তাদের নিরাপত্তা, জীবিকা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আর আমাদের এই সন্তানদের আমরাই এই সংসারে এনেছি। তারাও আমাদের উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে আছে। আমরা জিজ্ঞাসা এই যে, আমরা যদি আজ বিনা দোষে তাদের পরিত্যাগ করি, আমরা কি তবে সত্যভঙ্গের দায়ে দায়ী হব না?

আচার্য ইষ্রা একটু ইতস্তত করলেন। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বড়ই কঠিন। কিন্তু উত্তর-যে তাঁকে দিতেই হবে। হাজার হাজার মানুষ উত্তরের অপেক্ষায় তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আচার্য ইষ্রা উত্তর দিলেন

: তোমাদের এই প্রতিশ্রুতি মিথ্যা ও অধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা পাপ, ভঙ্গ করাই কর্তব্য।

ইহুদীর বুকের ভেতর যে-মানুষ ছিল, সে তীব্র কণ্ঠে এর প্রতিবাদ করে উঠল। কিন্তু সেই প্রতিবাদ শোনা গেল না। হানানি আর এক বার সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে শেষে একটু ম্লান হাসি হাসল।

হানানির প্রশ্ন এখনও শেষ হয় নি।

: আমি জানতে চাই, যিহোবার এই বিধান কি উচ্চনীচ-নির্বিশেষে সকল ইহুদীর পক্ষেই প্রযোজ্য?

আচার্য উত্তর দিলেন, অবশ্যই, অবশ্যই।

: আপনি কি মনে করেন, রাজা শলোমন ধর্মপ্রাণ ইহুদী ছিলেন?

আচার্য ইষ্রা এই প্রশ্নের তাৎপর্য ধরতে পারলেন না। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই। রাজা শলোমন প্রভুর মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি প্রভুর প্রিয়পাত্র ছিলেন।

: রাজাবলীতে লিখিত আছে, রাজা শলোমন মিসরের ফারাউনের কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। তার ছাড়া তিনি আরও অনেক মোয়াবীয়, আমোনীয়, ইদোজীয়, সিদোনীয় ও হিট্টিয় রমণীকে প্রেম করতেন। এ সব কাজ কি বিধিসম্মত?

: না।

: তবে তখনকার দিনের সমাজকর্তাগণ তাঁকে সমাজ থেকে বহিষ্কারের আদেশ দেন নি কেন? আর স্বয়ং প্রভুই বা তাঁকে নিজের প্রিয়পাত্র বলে মনে করতেন কেন?

আচার্য অবাক হয়ে গেলেন। যিহোবার বিধান-ভঙ্গকারী এই হতভাগ্য কোথায় নিজের দুঃখে লজ্জায় ও অনুতাপে মরে যাবে, না আরও উলটে গলা বাড়িয়ে তর্ক করতে এসেছে। আবার এমন বাঁকা বাঁকা তার প্রশ্ন, যার সদুত্তর দেওয়া কঠিন। কিন্তু উত্তর-যে তাঁকে দিতেই হবে। আচার্য উপায়ান্তর না দেখে সহজ সূত্রের প্রয়োগ করলেন।

: তখনকার দিনের সমাজকর্তাগণ কি ভেবে কি করেছিলেন, তা বোঝা আমাদের পক্ষে সম্ভবপর নয়। আর প্রভু লীলার রহস্য একমাত্র প্রভুই জানেন।

কিন্তু হানানি তখনই তাঁকে অব্যাহতি দিল না।

: আমার জিজ্ঞাস্য, রাজা দায়ুদ কি ধর্মপ্রাণ ইহুদী ছিলেন?

: নিশ্চয়ই। এখনও তাঁর রচিত ধর্মসংগীত আমরা গান করে থাকি।

: শামুয়েলের দ্বিতীয় পুস্তকে লিখিত আছে, রাজা দায়ুদ তাঁর বিশ্বস্ত ভৃত্য উরীয়ের অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী বৎশেবাকে রাজপুরীতে আনিয়ে তার সঙ্গে শয়ন করেন এবং তার পরে তাঁর ভৃত্য উরীয়কে গুপ্তভাবে হত্যা করিয়ে পরজাতীয়া বৎশেবাকে বিবাহ করেন। সেই বৎশেবার গর্ভেই রাজা শলোমনের জন্ম হয়। আমার জিজ্ঞাস্য, রাজা দায়ুদের এই কাজ যদি পাপের কাজ হয়ে থাকে, সমাজকর্তারা কি সেজন্য তাঁকে সমাজ থেকে বহিষ্কার করেছিলেন?

: না, তাঁরা তা করেন নি।

: আমার জিজ্ঞাস্য, রাজা শলোমন কি পাপের সন্তান?

আচার্য ইষ্রা এই প্রশ্নের উত্তর দিলেন না।

: আপনি আমার এই প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। আচ্ছা, আপনার যদি অসুবিধা হয় ও কথাটা না হয় থাক, কিন্তু আমার একটা কথা জিজ্ঞাস্য থেকে গেল, এর উত্তর আপনাদের দিতেই হবে। আমার প্রশ্ন এই, যিহোবার এই বিধান কি রাজরাজড়াদের উপর খাটে না? এটা কি শুধু আমাদের মত দুর্বল লোকদের জন্যই? রাজরাজড়াদের সাথে এঁকে উঠতে না পেরে শেষে আপনারা কি আমাদের পেছনেই লাগেন?

নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ হানানির এই ঔদ্ধত্য এতক্ষণ ধৈর্য ধরে সহ্য করছিলেন। কিন্তু সর্বজনমান্য আচার্য ইষ্রার উপর এই বিদ্রূপোক্তি শুনে তাঁরা উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। আচার্যকে পেছনে রেখে একজন সামনে এগিয়ে এলেন। এই জেরার মুকে পড়ে আচার্য ইষ্রা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি অব্যাহতি পেলেন।

: আমাদের সময় নেই। আপনার প্রশ্ন সব শেষ হয়েছে তো? আপনি তবে এবার বসু। হানানি বলল, হ্যাঁ, প্রশ্ন করা হয়েছে। কিন্তু একটা প্রশ্নেরও সন্তোষজনক উত্তর পাই নি।

আবার ঝাঁকে ঝাঁকে বৃষ্টি নেমে এর। লোকজন সব অধৈর্য হয়ে উঠেছিল। এ সমস্ত শাস্ত্রীয় তর্ক তাদের আর ভাল লাগছিল না। তারা চিৎকার করে বলে উঠল, আপনারা তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করুন। এই বৃষ্টিতে আমরা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।

আচার্য ইষ্রা সকলকে সম্বোধন করে শেষ নির্দেশ দিলেন : তোমরা সত্য লঙ্ঘন করে পরজাতীয় কন্যাদের গ্রহণ করেছ, আর তারই ফলে ইহুদী সমাজকে দূষিত করে তুলেছ। তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষের প্রভুর নিকট পাপ- স্বীকার করো, মার্জনা ভিক্ষা করো, তাঁর তুষ্টি সাধন করো এবং পরজাতীয় স্ত্রীদের ও তাদের গর্ভজাত সন্তানদের সংস্পর্শ থেকে আপনাদের পৃথক কর বৃষ্টিতে ভেজা কাকের মত লোকগুলো শীতে কাঁপতে কাঁপতে উচ্চস্বরে উত্তর দিল—হ্যাঁ, আপনি যেমন বললেন, আমরা তেমনি করব। আপনারা প্রধানগণ, অধ্যক্ষগণ ও বিচারপতিগণ এই সিদ্ধান্তকে কার্যকর করার জন্য যে-নির্দেশ দেবেন, আমরা তা মান্য করে চলব। কিন্তু এখন আপনারা আমাদের ছেড়ে দিন। আকাশের অবস্থা খুবই খারাপ। আমাদের বাড়ী ফিরে যেতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *