বাইশ
মহাসমাজের সমাবেশ থেকে ওরা ফিরে আসছিল। মিকা বলল, হানানি, চলো, আজ তোমাদের বাড়ী যাব।
: চলো, এত দিনে তোমার যখন যাবার সময় হোল। কিন্তু দিনটা খুব ভাল দেখেই বেছে নিয়েছ মিকা। চলো, দু’জনে মিলে নহিমার কাছে এই শুভ সংবাদটা বহন করে নিয়ে যাই। তোমার অভ্যর্থনাটা বেশ ভালোই হবে।
মিকা আঁতকে উঠল : না, না, থাক, তবে আর গিয়ে কাজ নেই।
: ভীরু, চোখ বুজে থেকে দুঃখকে এড়িয়ে চলতে চাও? তা পারবে না। কিন্তু এ তো শুধু তোমার আমার কথা নয়, তুমি কি বুঝতে পারছ না, কত ঘরে ঘরে আজ কান্নার রোল উঠেছে। মানুষ হয়ে এমনি করেই কি মানুষের বুকে ছুরি বসিয়ে দিতে হয়!
হানানি চলতে চলতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। বেদনার্ত চাপা কণ্ঠে বলে উঠল,
: মিকা চেয়ে দেখ, তোমার ওই সামনে চেয়ে দেখ।
মিকা হানানির এই অস্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে চমকে উঠে চেয়ে দেখল, দশ-বারোটি মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে আসছে। ওরা ওদের আলু-থালু চুলগুলো টেনে টেনে ছিড়ছে, আর গলা ছেড়ে কাঁদছে। ওদের পেছন পেছন একদল ছোট ছেলেমেয়েও কাঁদতে কাঁদতে আসছে।
এরা কে? আহা, এমন করে কাঁদছে কেন? জিজ্ঞাসা করল মিকা।
ওদের পাশেই ক’জন লোক বলাবলি করছিল,
: ও বাবা, এই মেয়েগুলো আবার কে রে? লজ্জা শরমের মাথা খেয়েছে না কি?
: আর বোলো না। এই ডাইনীগুলোই তো রূপযৌবনের চটক দেখিয়ে আমাদের ছেলেগুলোকে নষ্ট করেছে। আমাদের পবিত্র জাতির বুকে কলঙ্কের বীজ বুনে দিয়েছে। ওরাই তো প্রভুর কাছে আমাদের অপরাধী করে তুলেছে। পরজাতীয়েরা কি এক ভাবে আমাদের সঙ্গে শত্রুতা করে! আমাদের সমাজকে দূষিত করে তোলবার জন্য ওরা ওদের ঘরের মেয়েগুলোকে পর্যন্ত আমাদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে।
: এবার আর ও সমস্ত তুকতাক করা চলবে না। প্রভুর নির্দেশে স্বয়ং আচার্য ইয়া এবার এসেছে। দু’দিনে সব ডাইনীগুলোকে ঝেটিয়ে বিদায় করবেন। দেখছো না, এই তো সবেমাত্র তার কাজ শুরু হয়েছে।
: মারব না কি একটা ঢিল?
: থাক, থাক, আর ঢিল মেরে কি হবে! যে-মন্ত্র ছেড়েছেন আচার্য, তাতেই ওরা মুখ থুবড়ে পড়েছে।
সবাই হেসে উঠল।
হানানি প্রশ্ন করল, এবার তো বুঝতে পেরেছ মিকা, ওরা কারা?
মিকা নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।
হানানি বলল, ওদের ভাগ্য নির্ধারিত হতে চলেছে, এই সংবাদ শুনে ওরা সমাবেশের কাছাকাছি কোথাও গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সভায় রায় শুনতে পেয়ে এখন ওরা কাঁদতে কাঁদতে নিজেদের ঘরে ফিরে চলেছে। কিন্তু কোথায় নিজেদের ঘর! ঘর-যে এদের ভেঙ্গে পড়ল। ভেবে দেখ মিকা, যে-সংসার ওরা ওদের বুকের রক্ত দিয়ে, স্নেহ দিয়ে, মমতা, দিয়ে, ত্যাগ দিয়ে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিল, সেই সংসারে ওদের আর ঠাঁই হবে না। এক দিন ওরা নিজেদের জাতি, ধর্ম ও সমাজের মায়া ছেড়ে দিয়ে পরম বিশ্বাসের সঙ্গে লতার মত যাদের আঁকড়ে ধরেছিল, আজ তারা ওদের টেনে ছিঁড়ে পতের উপর ছুঁড়ে ফেলে দেবে। আর ধর্মের কসাইরা ওদের মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে উল্লসিত হয়ে উঠবে। ধর্মের নামে এ কি অমানুষিকতা, এ কি নৃশংসতা!
মিকা, ওদের দিকে চেয়ে আমাদের স্বজাতীয় ভাইয়েরা কি বলছিল, তুমি শুনেছ তো?
: শুনেছি।
: আমি লজ্জায় মরে যাই মিকা, যখন আমি স্মরণ করি যে, আমি একজন ইহুদী। যত দিন বেঁচে থাকব, কোন দিন তো এই সত্যকে মুছে ফেলতে পারব না।
: আচ্ছা হানানি, এখানে কেউ নেই, শুধু তুমি আর আমি। তুমি সত্য করে আমাকে বলো, তুমি কি ইহুদী জাতিকে ঘৃণা করো?
: ঘৃণা? না, না, এ বুঝি ঘৃণা নয় + যদি ঘৃণা করতে পারতাম, আমি বুঝি মুক্তি পেতাম। ঘৃণা নয়, এ একটা তীব্র বেদনা। মায়ের জবায়ুর সাথে আমার নাভির যোগসূত্র রয়েছে, এ যেন কিছুতেই কাটাবার মত নয়। আজ যখন এই সমস্ত ছিন্নমূল পরজাতীয়া মেয়ে আর তাদের সন্তানদের দিকে তাকাই, তখন মনে হয় আমিও তো সেই ঘাতকদেরই এক জন, কারণ আমিও তো ইহুদী। এ কথা আমি কেমন করে ভুলে থাকব! অত্যাচার আর নির্যাতন আমি তো আর কম দেখি নি মিকা। সারা জীবনভর দেখে এসেছি। কিন্তু সে-দিন আমি ছিলাম অত্যাচারিতদের মধ্যে, আর আজ আমি অত্যাচারীদের একজন। এ দুঃখ তো আমাকে কোনদিন ভোগ করতে হয় নি।
মিকা অবাক হয়ে গেল। এ কথা তারও মনে আকাশে অস্পষ্ট হয়ে ছিল। হানানি কেমন করে তাকে উজ্জ্বল তারার মতই ফুটিয়ে তুলেছে। তার কথার মধ্য দিয়ে আপনার মনের ছবিটা সে স্পষ্ট ভাবে দেখতে পেল।
মিকার মনে পড়ল মাসখানেক আগে এমনি সময় তারা দু’জন এই পথ দিয়েই ফিরছিল। সেদিন নিসান মাসের চতুর্বিংশ দিবসে নিয়ম-স্থাপন পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
: তোমার মনে আছে হানানি, নিয়ম স্থাপন পর্ব অনুষ্ঠানের শেষে এই পথ দিয়ে যেতে যেতে তুমি একটা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলে, আর কি আশ্চর্য, এক মাস যেতে না যেতেই তা এমন করে সত্যে পরিণত হয়ে গেলে।
: হ্যাঁ, আমার বহু দুর্ভাগ্য, আমার সেই ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা হয় নি। আজ আমার কি মনে পড়ছে শুনবে মিকা? আজ মনে পড়ছে, একদিন সহায়সম্বলহীন, পথাশ্রয়ী আমি আশ্রয় খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। স্বজাতীয় ভাইয়েরা সেদিন আমার দিকে ফিরেও তাকায় নি। সেদিন ইহুদী এই পরজাতীয়া মেয়ে নহিমা আর তার পরম স্নেহশীল পিতা আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল, আমায় বুকে টেনে নিয়েছিল। তাদের সেই অনুগ্রহ আর ভালবাসার ফলেই আজ আমি সুখী গৃহস্থে পরিণত হয়েছি। আমার নহিমা আর ফুলের মত শিগুলো আমাকে ঘিরে আছে। ইহুদী হানানি, আজ সেই তোমারই চোখের সামনে ইহুদীদের এই নিষ্ঠুর বলিদানের উৎসব চলবে, আর তোমাকে নীরব হয়ে তাই দেখতে হবে! তোমার করবার কিছুই নেই।
এক জায়গায় একটা ভিড় দেখে ওরা চলতে চলতে থমকে দাঁড়াল। এখানে আবার কি? ভারী এক মজার ব্যাপার। লোকগুলো মহা খুশী হয়ে তামাসা দেখছে। বিনা খরচায় এমন তামাসা পেলে কেউ বা ছাড়ে! ওরা কাছে গিয়ে দেখল একটা সরূমোর গাছের গা ঘেঁষে বসে একটা পাগলী একটু নুয়ে বসে এটা বড় কাঠের পুতুলকে মাই খাওয়াচ্ছে। তামাসাই বটে!
মিকা ওর কাছে গিয়ে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়াল। এতগুলো লোক তার দিকে তাকিয়ে হাসাহাসি করছে, পাগলীর তাতে কোনই হুঁশ নেই! নিঃসংকোচে বুকের কাপড় সরিয়ে পরিপুষ্ট স্তনটিকে একহাতে ধরে কাঠের পুতুলটার মুখের মধ্যে গুঁজে দিচ্ছে, আর বলছে, নে, নে, খা, বাবা খা। খেয়ে ঘুমিয়ে পড় সোনা আমার। তোর বাবা আসলে আর রক্ষা রাখবে না। খা বাবা, খা।
লোকগুলো মহা আনন্দে দেখছে। একজন সুরসিক লোক আড় চোখে তাকিয়ে একটা রসালো মন্তব্য করল। হোক না পাগলী, তবু মেয়েমানুষ তো।
মিকা চিনতে পেরেছে। এ-যে তার সেই রাত্রির সেই পাগলী। কত দিন তার কথা সে ভেবেছে! সে দিন সেই বিচিত্র অভিজ্ঞতাময় এক রাত্রিতে আধ আলোয় আধ ছায়ার মধ্যে যতটুকু সে দেখেছিল, তাতে হয়তো চিনতে পারত না, কিন্তু কথা শুনে আর কোন সন্দেহ রইল না। প্রকাশ্য দিবালোকে এতগুলো লোকের নির্লজ্জ চোখের কৌতূহলী দৃষ্টির সামনে এ অবস্থায় তাকে দেখে মিকার মনটা কেমন করে উঠল। তার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে গলার স্বর নীচু করে মিকা ডেকে বলল, কি করছ মা, ঘরে যাও।
পাগলী চমকে উঠে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকাল। কাঠের পুতুলটাকে শক্ত করে বুকের উপর চেপে ধরে মিকার মুখের দিকে চেয়ে কান্নার সুরে বলতে লাগল, ওগো, একটু বসো, একটু অপেক্ষা করো। আমি-যে বাছাকে মাই দিচ্ছি। ও ঘুমিয়ে পড়বে, এক্ষুণি ঘুমিয়ে পড়বে। আমি এই এলাম বলে। তারপর তুমি আমাকে নিয়ে তোমার যা খুশী তাই করো।
মিতা লজ্জা পেয়ে ফিরে এল। পাগলী তাকে চিনতে পারে নি, আর কোন দিন চিনতে পারবে না। ওর স্মৃতি-যে কোন কিছুকেই আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে না, শুধু একটি মাত্র ছবি ওর স্মৃতির পটে চিরতরে মুদ্রিত হয়ে আছে। বুঝি শেষ দিন পর্যন্ত সে তার পেছন পেছন ধাওয়া করে চলবে।
তামাসাটা এবার আরও বেশী জমে উঠল। পাগলীকে ছেড়ে সমস্তগুলো চোখ এবর মিকার মুখের উপর গিয়ে পড়ল। সেই রসিক লোকটি অর্থ পূর্ণ চোখের ভঙ্গী করে বলল, কি ভাই, বেশী সুবিধা হোল না বুঝি?
লোকগুলো হো হো করে হেসে উঠল। মিকা সংকোচে এতটুকু হয়ে গেল। হানানি তার হাত ধরে একটা হ্যাঁচকা টানে এগিয়ে চলল। পেছন থেকে ওদের হাসির শব্দ শোনা গেল।
: কি ব্যাপার মিকা? চেন নাকি এই পাগলীকে? ও কে? ওকে কি বলছিলে তুমি?
মিকা হাঁটতে হাঁটতে সেই রাত্রির ঘটনাটাকে সংক্ষেপে বর্ণনা করল। সমস্ত কাহিনীটা শুনে হানানি কতক্ষণ চুপ করে রইল। শেষে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, এই তো ইহুদী মেয়েদের জীবন। এই তো আমাদের সমাজের ছবি।
একটু চুপ করে থেকে হানানি আবার বলল, নাঃ, নিজের কথা তো অনেক বললাম। এবার তোমার কথা একটু শুনতে চাই, মিকা। বলো, তুমি কি নির্ভেজাল ইহুদী? আমার কিন্তু তা মনে হয় না। তাহলে আমি হয়তো তোমাকে এত বেশী ভালবাসতে পারতাম না। একমাত্র নহিমা ছাড়া তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী আর কেউ নেই।
মধুর হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল মিকা : আমি বড়ই ভাগ্যবান। আমার কথা শুনতে চাও? কিন্তু আমি-যে বড় এলোমেলো। কিছুতেই নিজেকে গুছিয়ে তুলতে পারি না, না কাজে, না কথায়। আমি যদি আমার কথা বলি, শুনলে লোকে হাসবে। তুমি হাসবে না তো?
: আহা, হাসলামই না হয় একটু। লোকেরা হাসিতে ভয় কেন মিকা?
: আচ্ছা, হাসো। আমাকে নিয়ে আমি অনেক ভেবে দেখেছি। ভেবে ভেবে আর থই পাই না। সম্প্রতি একটা সূত্র যেন হাতে এসেছে। শুধু তোমাকেই বলছি, আর কাউকে বোলো না যেন। আমার মনে হচ্ছে কি জান, আমার ইহুদী ভাবটা বোধ হয় অনেকটাই কৃত্রিম। তার সত্যিকারের শিকড় নেই।
: সে কি! বলছ কি তুমি?
: অমন করে চমকে উঠো না। তোমাকে তো বলেছি, আমি শিশুকাল থেকে ক্যালদীয়দের ঘরে প্রতিপালিত, ক্যালদীয় শিক্ষা-দীক্ষায় মানুষ হয়ে উঠেছিলাম। আমি জানতাম যে, আমি ইহুদীর সন্তান, কিন্তু ইহুদীদের সম্পর্কে আমার মনে বিশেষ কোন আকর্ষণ ছিল না, এমন কি তাদের ভাষাও আমি জানতাম না। আমার জীবনের তেইশটি বছর এইভাবেই কেটে গেলে।
: আশ্চর্য তো।
: ছোটবেলা থেকেই কোন দিন কারু উপর কোন রকম অত্যাচার বা উৎপীড়ন দেখতে পারি না। আমার ক্যালদীয় বন্ধুরা বলত আমার স্বভাব বড় নরম। একবার আমার এক বন্ধু খেলার ছলে একটা কুকুরের বাচ্চাকে মেরেই ফেলল। সেই দিন থেকে তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব চিরদিনের মত শেষ হয়ে গেল। এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে অত্যাচার আমাকে দেখতেই হবে, চোখ বুজে থাকলেও নিষ্কৃতি নেই। পশুই বল, আর মানুষই বল, তাদের উপর অত্যাচার তো আর কম দেখি নি। প্রতিকার হয়তো কিছুই করতে পারি নি, কিন্তু অনেক সময় তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছি।
: কিন্তু তবু তোমার অত্যাচারিত ইহুদীদের কথা মনে পড়ল না? তুমি-যে ইহুদীর সন্তান, এ কথা তুমি কি করে ভুলে রইলে?
: আমি পরে এ কথা অনেক ভেবেছি। কিন্তু ভেবে কোন কূল কিনারা পাই নি। এমনভাবে ক্যালদীয় সমাজের মধ্যে মিশে গিয়েছিলাম যে, ও কথাটা আমার মনেই জাগত না। এমনকি বাবিলনিবাসী ইহুদীরা কোথায় থাকে, কিভাবে থাকে, এ সব প্রশ্ন ও আমার মনে আসত না। আমার পরনে ক্যালদীয় পোশাক, মুখে ক্যালদীয় বুলি। মনটাও ক্যালদীয় রংয়ে রাঙানো। তা ছাড়া শদরা আমাকে অনেক কথাই ভুলিয়ে দিয়েছিল।
: সেই কথাই বলো।
: না, সেটা বড় কথা নয়। শদরা অবশ্য আগাগোড়াই আমার কাছাকাছি ছিল। কিন্তু আমার জীবনে এসে প্রবেশ করল আমার বাবিল ছাড়ার মাত্র দু’ বছর আগে।
: বেশ, তারপর?
: শদরার প্রেমে যখন হাবুডুবু খাচ্ছি, ঠিক সেই সময় আমার চোখের সামনে পর পর এমন কয়েকটা ঘটনা ঘটল, যার মধ্য দিয়ে আমি ইহুদীদের প্রতি ক্যালদীয়দের নির্যাতনের প্রত্যক্ষ পরিচয় পেলাম। ঘটানাগুলো আমাকে অস্থির করে তুলল। যতই দেখতে লাগলাম, ততই আমার চোখ ফুটতে লাগল। অসহ্য আত্মধিক্কারে পূর্ণ হয়ে উঠল মন–কি করে এত দিন অন্ধ হয়ে ছিলাম। ইহুদী সম্প্রদায়ের লোক হয়েও এই দুর্দিনে তাদের পক্ষে না দাঁড়িয়ে আমি কিনা অত্যাচারী ক্যালদীয় সমাজের একজন হয়ে ভোগবিলাসে ডুবে আছি।
এক দিন এক বৃদ্ধ ইহুদী আমাকে তীব্র ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন—ইহুদীর সন্তান হয়ে ক্যালদীয়দের পোষা কুকুর সেজে বসে আছ, লজ্জা করে না তোমার? এই তীক্ষ্ণ কশাঘাতে আমার আত্মসম্বিৎ ফিরে এল। আমি হিব্রু ভাষা শিখলাম। ইহুদীদের শাস্ত্রগ্রন্থ পড়লাম। ক্যালদীদের পোশাক বর্জন করে ইহুদীদের পোশাক গ্রহণ করলাম সেদিন কি তীব্র ক্যালদীয়-বিদ্বেষ আমার মনে জমে উঠেছিল, সে কথা মনে করলে এখনও অবাক হয়ে যাই, কেমন একটু লজ্জাও বোধ করি যেন। একবার ভাবলাম, যা কিছু ক্যালদীয়, সবই নির্মমভাবে বর্জন করব, এমন কি ক্যালদীয় শদরাকে পর্যন্ত। গোঁড়া ইহুদীদের মত আমি এও ভাবতে শুরু করেছিলাম যে, ইহুদী হয়ে শদরাকে ভালবেসে আমি জঘন্য পাপের কাজ করেছি। কিন্তু ভাগ্য-চক্রে শদরকে বর্জন করা আমার পক্ষে সম্ভব হোল না।
: মিকা, সেজন্য কি তুমি অনুতপ্ত?
: না, শদরা আমাকে রক্ষা করেছে। শদরা আমার মুক্তি। শদরা আমার জীবনে আনন্দ। কিন্তু শদরার কথা এখন থাক। আমার কথাই চলুক। ধর্ম-কর্ম নিয়ে আমি কোন সময়ই বেশী মাথা ঘামাতাম না। কিন্তু এখন প্রচণ্ড যিহোবা-ভক্ত হয়ে পড়লাম। যিহোবা, যাহুদা আর ইহুদী জাতি আমার ধ্যান, জ্ঞান আর জপমন্ত্র হয়ে দাঁড়াল। তুমি জান, আমি স্বপ্ন দেখতে ভালবাসি। আমি স্বপ্ন দিয়ে গড়ে তুললাম এক যাহুদা আর ইহুদী জাতি। আমি আমার মনের সোনালী কল্পনা দিয়ে এমন এক ছবি এঁকে তুললাম, সত্যের সঙ্গে যার কোন সম্পর্কই ছিল না।
: মিকা, ইহুদীর কোন পরিচয়ই কি সে দিন তুমি পাও নি? আজ যাঁরা জেরুজালেমের বুকে ধর্মের ঝাণ্ডা উঁচু করে তুলে ধরেছেন, তাঁদের অধিকাংশ তো বাবিলেই ছিলেন। তুমি তাঁদের দেখ নি?
: না, ক্যালদীয়দের সোনার খাঁচার মায়া কাটিয়ে আমি আমার ঘর বাঁধলাম ভূমিদাস ঘরীর ইহুদীদের পাড়ায়, আমি তাদের ভাল-বাসলাম, তাদের ভালবাসা পেলাম। আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি এত দিনে সত্যিকারের ইহুদী হয়েছি। ওরা বড় দুঃখী, ক্যালদীয় প্রভুদের শোষণ আর অত্যাচার ওদের জীবনকে অসহ্য করে তুলেছিল। আমি ওদের সঙ্গে সেই দুঃখের ভাগ নিলাম। শোন হানানি, সে দিন আমি বুঝতে পারি নি, আজ মনে হচ্ছে, শোষণ আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মন্ত্রই সে দিন আমাকে উদ্দীপিত করে তুলেছিল, ইহুদীর মন্ত্র নয়। শদরা বার বার আমাকে বলেছে, মিকা আমি বলছি তুমি ইহুদী নও। আমি রাগ করে পালটা প্রশ্ন করেছি, তবে কি আমি ক্যালদীয়? ও বলেছে, না, তুমি ক্যালদীয়ও নও।
: তবে? তবে আমি কি?
তার উত্তরে ও বলেছিল, তুমি শুধু মিকা। আমরা ইহুদী নই, ক্যালদীয়ও নই— তুমি আর আমি এক জাতি
এ কথা বল্ল শদরা : হ্যাঁ, বলেছিল। এত দিনে যেন সেই কথার মর্ম কিছু কিছু বুঝতে পারছি। অদ্ভুত হানানি, অদ্ভুত, ওই নারী প্রেম যা দিককূলপ্লাবী বন্যার মত সমস্ত গণ্ডী ভেঙ্গে একাকার করে দিতে পারে। তোমার নহিমা তোমার ভেতরকার ইহুদী আর মানুষের ব্যবধানটাকে এমনি করেই ভেঙ্গে ভেঙ্গে আনছে।
হানানি উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, আশ্চর্য কথা তুমি বলছ মিকা। আমি তো এ কথা এমন করে ভেবে কখনও দেখি নি। নহিমার কথা তুমি কি করে জানলে?
মিকা হেসে বলল, আমরা শদরার মধ্য দিয়েই আমি তোমার নহিমাকে দেখছি। তারপর শোন হানানি, আমি আমার কল্পনার তুলিতে ছবি এঁকে চললাম—চললাম। যখন বাবিল ছাড়বার সময় হোল, মনে পড়ছে, গরীব ইহুদী ভাইদের ডেকে বলেছিলাম—চলো, চলো, আমরা যিহোবার রাজ্যে যাই, যেখানে বড় নেই, ছোট নেই, উচু নেই, নীচু নেই, ধনী নেই, নির্ধন নেই— এমনি কত কথাই না বলেছিলাম। যারা জীবনে কোনদিন সুখের মুখ দেখে নি, আমার কথা শুনে তাদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু জেরুজালেমে এসে তারা কি দেখল? আর আমিই বা কি দেখলাম? আমার নিজের রচিত স্বপ্নে আমি ডুবে ছিলাম। কিন্তু জেরুজালেমে প্রবেশ করবার প্রথম দিনেই গরীব ইহুদীদের পাড়ায় গিয়ে যখন ঢুকলাম, আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। দেখলাম গরীব ইহুদীদের প্রতি ভদ্র ইহুদীদের মনে কি অপরিসীম ঘৃণা। এরা তাদের কাছে অশুচি। তখন ভাবলাম, ক্যালদীয়রা তাহলে আর কি এমন বেশী অপরাধ করেছিল! আমার যেন আর সোজা হয়ে দাঁড়াবার ক্ষমতা রইল না, আমি হতাশা ও অবসাদে ভেঙ্গে পড়লাম।
হানানি আশ্চর্য হয়ে বলল, আমি এ সব কথা তোমার মত এমন করে ভেবে দেখি নি মিকা। কিন্তু কই, তোমাকে তো কোন দিন হতাশা বা অবসন্ন হয়ে পড়তে দেখি নি?
: সে দিন কে আমাকে বাঁচিয়ে তুললেন জান?—তীরশথ নেহেমিয়া। আমি তাঁর আহ্বানে প্রাচীর গেঁথে তোলবার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। কিন্তু সে কাজ সহজ ছিল ন! বিরাট বাধা এগিয়ে এল। আর সেই বাধার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমার সমস্ত অবসাদ কেটে গেল। সে দিন দেখেছিলাম তীরশথ নেহেমিয়ার নির্ভীক দৃঢ়চিত্ততা। আর তাঁকেই অবলম্বন করে চিরদিনের স্বপ্নদেখা ভাবালু মিকা কাজের মধ্যে আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করল। সে-জন্য তীরশথের কাছে চিরদিনের জন্য কৃতজ্ঞ থাকব। আঃ, সেই দিনগুলো কি আনন্দেই না কেটে গেছে! কাজের মধ্যে-যে এত আনন্দ তা কি আগে জানতাম! আমার জীবনে এত আনন্দ আমি আর কখনও পাই নি।
: কিন্তু তোমার মনের মধ্যে ইহুদীর টানটা টনটনে ছিল বলেই এই কাজের মধ্যে তুমি প্রেরণা পেয়েছিলে, এ কথা কি তুমি অস্বীকার করতে পারো?
: তাই কি? হয়তো হবে। কিন্তু আমি তো তোমাকে বলেছি, ভাঙ্গা মনকে জোড়া দেবার জন্য সমস্ত উদ্যম নিয়ে এই কাজের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে চলেছি, সেই চিন্তাই আমাকে অনুপ্রাণিত করে তুলেছিল। এ কি ইহুদীর টান না আর কিছু, এই প্রশ্নের মীমাংসা আজও আমার হয় নি। আমি তো আগেই বলেছি হানানি, আমি বড় বেশী এলোমেলো, কিছুতেই আপনাকে গুছিয়ে তুলতে পারি না।
: থাক, আর গুছিয়ে তুলে কাজ নেই, আর সময়ও নেই। দেখ না, আমরা আমাদের বাড়ীর দুয়ারে এসে গেছি।
দরজায় ঘা মারতেই ভেতরে একটা ছুটোছুটির শব্দ শোনা গেল। কে আগে দরজা খুলে দেবে তাই নিয়ে প্রতিযোগিতা। দরজা খুলতেই ফুলের মত তিনটি কচি মুখ এক সঙ্গে ওদের সামনে ভেসে উঠল। মেয়েটি বড়, ছেলে দু’টি ছোট।
মিকার মনে হোল ওর দুই চোখ যেন জুড়িয়ে গেল। বাবিল ছাড়বার পর থেকে শিশুদের কচি মুখ এমন এর আর যেন সে কখনও দেখে নি। মেয়েটি মুখের দিকে চেয়ে মনে হোল, ওকে যেন সে চেনে। হ্যাঁ, কোন দূর এক অতীতে ঠিক এমনি একটি মেয়ের হাত ধরেই সে কবার নদীর তীরে ঘুরে বেড়াত। তাকে আদর করত, তার সঙ্গে খেলা করত, তাকে গল্প শোনাত। মেয়েটির সুমিষ্ট কলকাকলি কবারের কলধ্বনির সঙ্গে মিশে যেত। মিকা মনে মনে হাসল, সেই মেয়ে আজ কত বড় হয়ে উঠেছে। সে আজ তাকে শাসন করে, মায়ের মত স্নেহে প্রতিপালন করে তার উন্মুখ মুহূর্তগুলোকে কি অপরূপ মাধুর্যে ভরে দেয়।
মেয়েটি আবদারের সুরে বলল, বাবা, তুমি রোজ রোজ বাড়ী ফিরতে এত দেরী করো কেন?
ছেলে দু’টি দিদির প্রতিধ্বনির মতই বলে উঠল, বাবা, এত দেরী করো কেন?
: আর করব না, করব না।
হানানি এক সঙ্গে তিনজনকে জড়িয়ে ধরল। সবচেয়ে ছোট ছেলেটার মনে সাধ তাকে মিটল না। সে বাবাকে জড়িয়ে ধরে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে আঁকুপাঁকু করতে লাগল। তার মনে কথা বুঝতে পেরে হানানি তাকে কোলে তুলে নিল।
এবার মিকার দিকে ওদের চোখ পড়ল। একটু ভয়ে ভয়ে আড় চোখে তাকিয়ে মেয়েটি আস্তে আস্তে বলল, তোমার সঙ্গে এ কে বাবা?
: তোমাদের চাচা।
মেয়েটি বিস্মিত চোখে বলল, চাচা? আমদের কোন চাচা তো ছিল না! আমাদের কোন চাচা তো আসে না! আমাদের বাড়ী কেউ আসে না কেন বাবা? চাচা, তুমি এত দিন কোথায় ছিলে? এত দিন আস নি কেন?
মিকা হেসে বলল, এবার থেকে আসব।
বড় ছেলেটি মিকার কাছে এসে প্রশ্ন করল, তুমি চাচা?
: হ্যাঁ, আমি চাচা। মিকা তাকে কোলে তুলে নিল।
হানানির কোলে ছোট ছেলেটি দাদার এই অসংগত ব্যবহার দেখে অস্থির হয়ে উঠল। আর থাকতে পারল না, ছটফট করে নেমে পড়ল। তারপর এতটুকু ইতস্তত না করে মিকাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে উপর দিকে চেয়ে নিঃশব্দ ভাষায় আবেদন জানাল—আমাকে কোলে নাও।
মিকা তাকে আর এক কোলে তুলে নিল। ইতিমধ্যে ডান কোল থেকে বড় ছেলেটি জিজ্ঞাসা করল, চাচা, তুমি এত দিন আস নি কেন?
বাঁ কোলের ছোট ছেলেটির তা সহ্য হোল না। সে মিকার মুখটা জোর করে তার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে তার মুখোমুখি চেয়ে বলল, চাচা, তুমি আস নি কেন?
: অপরাধ করেছি। এবার থেকে ঠিক আসব।
: অপরাধ স্বীকার করলেন তো? মনে থাকে যেন।
মিষ্টি হাসির শব্দে চমকে উঠে মিকা চেয়ে দেখল—নিহমা। কে বলেছে নহিমা? বলে দেবার দরকার নেই, মিকা এমনিতেই চিনে নিতে পেরেছে।
মিকা হেসে বলল : অপরাধ স্বীকার না করে উপায় আছে? দেখুন না, কেমন করে আঁকতে ধরেছে?
: আঁকতে ধরেছে? বেশ করেছে। যারা ধরা দিতে চায় না, তাদের এমনি করেই ধরতে হয়।
এ বিদ্যা ওরা ওদের মা’র কাছ থেকেই পেয়েছে—মন্তব্য করল হানানি।
তাই বুঝি? অমন ধরাধরি করবার মত মহামূল্য বস্তু তুমি নাও। নেহাৎ দয়া করেই তোমার ঘরে এসেছিলাম। নইলে তুমি তো ভেসেই যেতে।
: ও, আমার দয়াময়ী। এখন-যে তুমি নিজেই আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছ।
ছোটরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। বড়রা বড় অবিবেচক। এরা যখন তখন তাদের অবহেলা করে এক পাশে ঠেলে রেখে নিজেরা নিজেরা কথা বলে। আর এমন সব কথা বলে যে, সে কথার মাথামুণ্ড কিছুই বোঝা যায় না।
বড় ছেলেটি মা’র দৃষ্টি আকর্ষণ করবার জন্য চিৎকার করে উঠল,
: মা, ও মা, দেখ দেখ, চাচা যেন খেজুর গাছ, আর আমরা দু’জন খেজুরের দুটো কাঁদি ঝুলছি।
ছোট ছেলেটি কোন কিছুতেই পিছিয়ে থাকতে রাজী নয়। সে সঙ্গে সঙ্গে দাদার কথার পুনরাবৃত্তি করল
: মা, ও মা, আমরা খেজুরের কাঁদি ঝুলছি।
পরক্ষণেই জ্ঞানপিপাসায় অস্থির হয়ে উঠে সে জিজ্ঞাসা করল
: কাঁদি কি মা, কাঁদি? এই শব্দটা আজই সে প্রথম শুনল। এটাকে আয়ত্ত করতে না পারা পর্যন্ত তারা শাস্তি নেই।
তার প্রশ্ন শুনে সবাই হেসে উঠল। মেয়েটি আর বড় ছেলেটি সে হাসিতে যোগ দিল! অন্তত এইটুকু সময়ের জন্য ওরা বড়দের সমপর্যায়ে উঠে গেছে। ওরা আত্মমর্যাদায় স্ফীত হয়ে উঠল, আর স্নেহ ও করুণামাখা দৃষ্টিতে ছোট ভাইটির দিকে তাকিয়ে ভাবল, আহা, কি ছেলেমানুষ, কিচ্ছু জানে না।
নহিমা এবার এগিয়ে এসে ছেলেটিকে টেনে নামাতে নামাতে বলল, এই-যে বড় কাঁদিটাকে কেটে দিলাম, খসে পড়ল মাটিতে। তারপর ছোট ছেলেকে টেনে নামাতে নামাতে বলল, এই-যে ছোট কাঁদিটাকে কেটে দিলাম, খসে পড়ল—উহুঃ, খসে আর পড়ল কই। মাটিতে নামিয়ে দেবার আগেই সে মায়ের কণ্ঠ লগ্ন হয়ে ঝুলে পড়ল। এই কৌশলটি তার ভালো করেই আয়ত্ত করা আছে। তখন অসম্ভব তাকে ছাড়ানো।
: উঃ, তোকে নিয়ে আমি-যে আর পারি না।
মায়ের কোলে সে তখন আপনাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে। কিন্তু তার সেই প্রশ্নটা সে এখনও ভুলে যায় নি। মায়ের কপালের উপর নুয়ে পড়া একগোছা চুল ধরে টেনে মায়ের মুখটা তার মুখের কাছে নিয়ে এসে সে তার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করল :
: কাঁদি কি মা, কাঁদি?
: এই যেমন তুই আমার কাঁদি, এই বলে আদর করে মা ওকে চুমো খেল। মায়ের চুমো খেয়ে ছেলের সোহাগ যেন গরগর করে উঠল। মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিফিস্ করে বলল— মা, একটু দুদু? আর ঠিক তেমনি ফিফিস্ করে মা উত্তর দিল, ছিঃ, এখন খেতে আছে বুঝি? চাচা দেখে কি করবে?
: চাচা চলে গেলে বুঝি?
: হ্যাঁ।
: কি তোমরা এত ফিসফিস করে বলছ? কপট ক্রোধে বলে উঠল হানানি।
: ও আমাদের নিজেদের কথা। তোমাদের শুনতে নেই।
মেয়েটি হাততালি দিয়ে বলে উঠল : আমি বুঝেছি, বুঝেছি, বলি? বলি? বলব?
—আঃ, তুই থাম। বলে ধমক দিয়ে নহিমা মেয়েকে নিরস্ত করল।
হানানি এবার তার কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব গম্ভীর করে নিয়ে বলল,
এইভাবেই চলবে নাকি? কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি, ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে, সে দিকে কারু লক্ষ আছে। মিকাকে এত করে ধরে নিয়ে এলাম, না দিচ্ছ বসতে, না খেতে। তোমার কোন হুঁশ যদি থাকে। কেবল ছেলে নিয়ে সোহাগ করা হচ্ছে। আর আমরা এ দিকে টাটিয়ে মরছি। আঃ, এই পরজাতীয়া মেয়ে নিয়ে কি বিপদেই-যে পড়েছি। সাধে কি ওরা বলে।
মিকা লক্ষ করল, এমন সপ্রতিভ মেয়ে নহিমা, সেও যেন এই অভিযোগে একটু লজ্জিয়ে পড়ল। এটা মেয়েদের জাতের ধর্ম—শিশু আর বৃহৎ শিশু পুরুষদের ক্ষুধা তৃষ্ণা মেটানো ওদের জীবনের চরম লক্ষ্য।
কিন্তু নহিমার মেয়ের মনে কেমন একট খটকা লেগেছে। একটু উস্ করতে করতে দু’একবার একটু ইতস্তত করে সে জিজ্ঞাসা করেই বসল, মা, পরজাতীয়া কি?
: থাম হতভাগী, সব কথাই ওর জানা চাই!
ধমক খেয়ে মেয়ের ঠোঁট ফুলে উঠল। কি এমন অন্যায় কথা বলেছে সে! তোমরা যে-খানে বলতে পারো, আমি কি তা জিজ্ঞাসাও করতে পারব না? ওর ছলছল চোখ দু’টি এই কথাই বলছিল।
: এই দেখ, দিলে তো মেয়েটিকে কাঁদিয়ে! আয় মা, তুই আমার কাছে আয়! হানানি আদর করে মেয়েকে তার কোলের কাছে টেনে নিল। এইটুকু আদর পেয়ে মেয়ের মুখে হাসি ফুঠে উঠল। এই তো শিশুর জগৎ। শরতের আকাশে মেঘ ও রৌদ্রের লুকোচুরি খেলা।
কিন্তু ছোট ছেলেটির সইল না। সে চটপট মায়ের কোল থেকে নেমে গিয়ে দিদিকে টেনে সরিয়ে দিল, তারপর বাবার কোল ঘেঁষে ঘনিষ্ঠতম হয়ে দাঁড়াল। সবাই হেসে উঠল।
দু’জন পুরুষ আর তিনটি শিশু খাচ্ছে, আর একটি নারী তাই বসে বসে দেখছে। এই দেখার মধ্যেই তার কত তৃপ্তি! মনে হয় বুঝি মা বসুমতী তার সন্তানদের খাওয়াচ্ছেন।
হানানি ডেকে বলল, গুলো মেয়ে, একটু জল দেবে? নহিমা জল দিল। নহিমার হয়েছে কি? হাসি যেন তার চোখে মুখে উছলে উঠতে চাইছে। সে দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে রাখল। কিন্তু মিকা অমন করে তার দিকে চেয়ে হাসছে কেন? নহিমা সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে হানানির মুখের দিকে তাকাল। কিন্তু হানানি তখন অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে ধীরস্থিরভাবে খেয়ে চলেছে। তাকে দেখে কিছু বোঝবার উপায় নেই। নহিমা এবার মিকাকে নিয়ে পড়ল।
: আপনি অমন করে হাসছেন যে?
: হাসি পেল, হাসলাম! কেন, আপনার সংসারে হাসতেও কি নিষেধ আছে না কি?
: না, তা নেই। কিন্তু কাউকে অকারণে হাসতে দেখতে আমার ভয় হয়। হানানির আরও একটু জলের প্রয়োজন ছিল। সে আবার ডাকল, ওগো মেয়ে, আমাকে আরও একটু জল দেবে?
আহা, কি করুণ আবেদন!
মিকা এবার প্রাণ খুলে হো হো করে হেসে উঠল। নহিমার মনে আর সন্দেহ রইল না। অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছে এই রকম ভাব দেখিয়ে সে হানানিকে উদ্দেশ করে বলল, ভারী বিশ্রী তুমি। কিছু তোমার পেটে থাকে না।
নিরীহ হানানি বিক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল, কী-যে তুমি বলছ, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু জল চেয়েছি বই তো নয়, সেজন্য তুমি অত রাগারাগি করছ কেন?
বাবার কথা শুনে মেয়ের মনে দুঃখ হোল।
বলল, মা, বাবা এত করে জল চাইছে, একটু জল দাও না কেন?
এবার হানানি আর মিকা দু’নেরই হেসে উঠল। হাসি জিনিসটা বড় সংক্রামক। নহিমা আর সামনে রাখতে পারল না, ওর চাপা হাসি এবার ভেঙ্গে পড়ছে। হাসতে হাসতে মেয়েকে শাসন করে বলল, তুই থামছি, সব কথায় ওর কথা বলা চাই!
খাওয়া দাওয়া শেষ হয়ে গেলে পর হানানিকে বলল,
: বাঃ, তুমি বেশ মানুষ তো! মহাসমাজের সমাবেশ থেকে ফিরে এলে, কিন্তু কই, সেখানকার কোন কথাই তো বললে না। আজ বুঝি কিছু ঠিক হয় নি?
: ঠিক হয় নি আবার? সব ঠিক হয়ে গিয়েছে। খেয়ে দেয়ে একটু শক্তি সংগ্রহ করে নিলাম। এবার তবে সিদ্ধান্তের কথা বলছি, শ্রবণ করো।
হানানির গলার সুর হঠাৎ বদলে গেল। নবীদের মতই গম্ভীর আর উদাত্ত কণ্ঠে সে বলে চলল,
পরজাতীয়া কন্যা, তবে শ্রবণ করো, আমি যিহোবার নির্বাচিত সন্তান বিশুদ্ধ ইহুদী, তুমি মিথ্যা দেবার পূজক কদাচারী কনানীয়া। তোমাকে গ্রহণ করে আমি আমার ইহুদী বংশকে কলঙ্কিত করেছি। তোমাকে উপগত হয়ে আমি আমার পবিত্র ইহুদী রক্তকে দূষিত করে তুলেছি। তাই সমাজ নির্দেশ দিয়েছেন, আর আমি তোমাকে সেই নির্দেশ জানাচ্ছি—শোন, কলঙ্কিনী কনানীয়া নহিমা, তুমি এই মুহূর্তে আমার এই গৃহ থেকে বহিষ্কৃত হও, আর তোমার এই পাপজাত সন্তানদের তোমার সঙ্গে করে নিয়ে যাও। বিশুদ্ধ ইহুদীদের ঘরে তোমাদের স্থান হতে পারে না। কোথায় যাবে আমাকে জিজ্ঞাসা করো না। তোমরা যেখানে খুশী সেখানে যাও। পরজাতীয়দের জন্য আমাদের কোনই দায়িত্ব নেই। যাও, তোমরা এক্ষুণি চলে যাও। আমি তোমাদের কারু মুখ দর্শন করতে চাই না।
মিকা অবাক হয়ে গেল। এ আবার কি? এ সব কি বলছে হানানি? পাগল হয়ে গেল নাকি? ছেলেমেয়েরা বাবার কণ্ঠস্বর শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। ওদের চোখে মুখে ভয়ের রেখা ফুটে উঠেছে। ছেলে দু’টি এ সব কথার মানে কিছুই বুঝতে পারে নি। কিন্তু মেয়েটি যেটুকু বুঝতে পেরেছে, তাতেই অস্থির হয়ে উঠে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল।
: বাবা গো, তুমি এ সব কি বলছ? তোমাকে ছেড়ে আমরা কোথাও যেতে পারব না। ওমা, মা, বলো না, বলো না বাবাকে।
কোন কথা বুঝতে না পেরেও, দিদিকে এমনভাবে কাঁদতে দেখে ভাই দু’টিও বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল—বাবা গো, বাবা গো!
মিকা এ রকম একটা অভাবিত পরিস্থিতির মধ্যে কি বলবে আর কি করবে খুঁজে পাচ্ছিল না। হানানির কাণ্ড দেখে নহিমা প্রথমে একটু থ’ খেয়ে গিয়েছিল। শেষে আচ্ছা করে কড়া এক ধমক দিয়ে বলল
: হয়েছে, হয়েছে, তুমি থামো তো! তামাসা করবার আর সময় পেলে না। ছেলেমেয়েগুলো কেঁদে-যে একবারে খুন হয়ে যাচ্ছে!
কড়া ধমক খেয়ে হানানি এবার তা বক্তৃতা বন্ধ করল।
: বা রে, তামাসা আবার কোথায় দেখলে! জিজ্ঞাসা করো না হয় মিকাকে। সমাজের অধিপতি আচার্য ইষ্রা তো এই নির্দেশই দিয়েছেন।
: দিয়েছেন তো দিয়েছেন, বেশ করেছেন। কিন্তু তাই বলে তুমি এমনতর ছেলেমানুষী করবে নাকি?
: আহা, কি করলাম আবার আমি! আমি তো তোমার সঙ্গে কথা বলছিলাম। মেয়েটা-যে এমন করে কান খাড়া হয়ে বসে আছে, আমি তা কি করে বুঝব!
: না, তুমি গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা করবে, আর ওরা সবাই কান বন্ধ করে বসে থাকবে!
মেয়েটা তখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। হানানি তাকে কাছে টেনে নিয়ে এসে আদর করে বলল
: কি রে মা, অমন করে কাঁদছিস কেন? কি হয়েছে?
আদর পেয়ে মেয়েটা যেন কেঁদে একেবারে গলে পড়ল।
: তুমি অমন করে ও সব কথা বলছিলে কেন? আর ও-রকম বোলো না।
: আচ্ছা, আচ্ছা, যা, আর বলব না। কি রে, ওরা দুটো আবার কোথায় গেল? ওরা? ওরা তখন অবস্থা স্বাভাবিক দেখে নিশ্চিন্ত মনে একটা বিড়ালছানাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। হানানি ওদের সন্ধানে গেল।
মিকা নহিমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আচ্ছা পাগল তো হানানি। এমন পাগল নিয়ে আপনি সংসার করেন কি করে?
নহিমা হেসে বলল, নিজের চোখেই দেখলেন তো সব। এই ভাবেই আমার দিন যায়। এই তিনটির থেকে ওই একটির জন্যই আমার চিন্তা বেশী।
: আমি কিন্তু আপনাকে দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি। কোন উদ্বেগ নেই তো আপনার! অথচ হানানি সমাজের নির্দেশ-সম্পর্কে যা বলল, তার একটি কথাও কিন্তু মিথ্যা নয়।
: তাই বলে আমার উদ্বেগ হবে কেন? আমি কি হানানিকে চিনি না?
একটু থেমে কি একটু চিন্তা করে আবার সে বলল, কিন্তু একথাও ঠিক নয়। উদ্বেগ আমার-যে নেই তা নয়। হানানিকে যাতে কোন দুঃখ বা আঘাত পেতে না হয়, সেজন্য আমি আমার ধর্ম, আমার আচার, আমার ভাষা সব কিছু ছেড়ে দিয়ে সর্বরকমে ইহুদী হয়ে গিয়েছি। কিন্তু এত করেও বুঝি শেষ রক্ষা করতে পারলাম না। আমার ভয় হচ্ছে, আমার জন্য ওকে অনেক দুঃখ পেতে হবে। ও যা মানুষ, ও তো কারু কাছে মাথা নোয়াবে না, সেইখানেই আমার যত উদ্বেগ, আমার যত গর্ব।
