পাপের সন্তান – ৭

সাত

নবী যেরেমিয়ার বাণী কখনও মিথ্যা হতে পারে না। আবার আমরা ফিরে যাব যাহুদায়, আবার আমরা আমাদের প্রভুর নগর জেরুজালেমকে পুনর্গঠিত করে তুলব। ইহুদী জাতি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে তার স্বদেশে, যে দেশে এক দিন প্রভু নিজেই তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।

বাবিল নগরীর প্রান্ত দেশে একটি গুপ্ত কক্ষে ইহুদীদের এক গোপনসভা চলছিল। শুধু বাবিল নয়, আসীরিয়া, আক্কাদিয়া ও নিকটবর্তী অন্যান্য অঞ্চলের নির্বাসিত ইহুদীদের কয়েকজন নেতা গোপনে মিলিত হয়েছেন। নবী যেরেমিয়া ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন, ইহুদীদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত পূর্ণ হবার পর আবার তারা তাদের স্বদেশে ফিরে যাবে। পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনে যেখানে যত ইহুদী আছে, সবাই চঞ্চল হয়ে দিন গুনছে। প্রতিটি ইহুদীর চোখে যাহুদার স্বপ্ন।

: কিন্তু পারস্যরাজ কি আমাদের সমস্ত ইহুদী ভাইকে মুক্তি দিতে সম্মত হবেন? যদিই বা মুক্তি দেন, আমরা যদি জেরুজালেমের ভগ্ন প্রাচীর গেঁথে তুলতে চাই, পারস্যরাজ কি তাতে বাধা দেবেন না? তখন আমরা কি করব? ইহুদীদের আজ কি শক্তি আছে?

সেরাইয়ার পুত্র আচার্য ইষ্রা উপস্থিত নেতাদের সম্মুখে তাঁর বক্তব্য বলছিলেন। প্রশ্নকারীর দিকে মুখ ফিরিয়ে তিনি বললেন,

: পারস্যরাজ কোনদিনই আমাদের বিরুদ্ধে ছিলেন না। কিন্তু যাহুদার বিদেশী শাসনকর্তাগণ, আমাদের প্রতিপক্ষ জাতিগুলো এবং বিশেষভাবে বাবিলের ক্যালদীয়ারা আগাগোড়াই এই ব্যাপারে বাধা দিয়ে এসেছে। তাদের এই বাধার জন্যই পারস্যরাজ আমাদের পক্ষে কিছুই করতে পারেন নি। কিন্তু, বন্ধুগণ, আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন, এই নির্বাসন ও দাসত্ব আমরা কোনদিনই মাথা পেতে মেনে নেই নি। আমাদের মুক্তিসংগ্রাম আজ নয়, নির্বাসনের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়েছে। এই বাবিল নগরীতে রাজা নেবুকাডনাজারের আমলে বহু ইহুদী ভাইকে এজন্য ষড়যন্ত্রের অভিযোগে প্রাণ দিতে হয়েছে। তারপর বাবিল যেদিন পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেদিন থেকে আমরা পারস্যরাজের নিকট আমাদের আবেদন জানিয়ে আসছি। সে এক দীর্ঘ ইতিহাস।

আক্কাদিয়ার একজন প্রতিনিধি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,

: আমরা দূরবর্তী অঞ্চলের লোক, কোন খবরই আমরা জানি না। রাব্বী, আপনি এখানে প্রাচীনতম ও বিজ্ঞতম লোক। কোন কিছুই আপনার অজানিত নেই। সেই ইতিহাস আপনি আমাদের কাছে খুলে বলুন।

: হ্যাঁ, সেই কথাই আমি বলব, আপনারা ধৈর্য ধরে শুনুন। আমরা বাবিলের ইহুদীরা পারস্যরাজ সাইরাসের কাছে আবেদন করেছিলাম। যিহোবা তাঁর আত্মার কল্যাণ করুন, তিনি আমাদের এই আবেদনে কর্ণপাত করলেন। তিনি আপনার রাজ্যে সর্বত্র ঘোষণা দ্বারা ও লিখিত বিজ্ঞাপন দ্বারা এই আদেশ প্রচার করলেন, “পারস্যরাজ সাইরাস এই কথা কহেন, স্বর্গের ঈশ্বর পৃথিবীর সমস্ত রাজ্য আমাকে দান করিয়াছেন। তিনি যাহুদা দেশস্থ জেরুজালেমে তাঁহার জন্য এক গৃহ নির্মাণ করিবার ভার আমাকে দিয়াছেন। আমি আমার সমস্ত নির্বাসিত ইহুদী প্রজাকে অনুমতি দিতেছি, তাহারা নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী স্বদেশে ফিরিয়া যাইতে এবং জেরুজালেমে ইহুদীদের প্রভুর মন্দির নির্মাণ করিতে পারে।”

সেদিন বাবিলের ইহুদীদের কি মহোৎসব! যাহুদা আর বিন্নামিনের প্রধানগণ, যাজকগণ ও লেবীয়গণ জেরুজালেম যাত্রার জন্য উদ্যোগী হলেন। চারদিকের ইহুদীরা স্বর্ণ, রৌপ্য, পশু, নানারূপ দ্রব্য, যার যেমন শক্তি তাই দিয়ে তাদের সাহায্য করল। নেবুকাডনাজার জেরুজালেমের প্রভুর মন্দির থেকে যে-সকল মহামূল্য পাত্র লুণ্ঠন করে এনেছিলেন, পারস্যরাজ সাইরাস তা তাদের ফিরিয়ে দেবার জন্য আদেশ দিলেন। কোষাধ্যক্ষ মিত্রদাত সেই সমস্ত পাত্র ও অন্যান্য দ্রব্য গণনা করে যাহুদার অধ্যক্ষ শেশবসরের হাতে সমর্পণ করলেন।

: সেই সব পাত্র কি প্রভুর মন্দিরে পৌঁছেছে?

: পৌঁছেছে বই কি! আমাদের কাছে তার লিখিত হিসেবও আছে—ত্রিশখানি সোনার থালা, এক সহস্র রূপার থালা, ত্রিশটি সোনার পানপাত্র, চারশত দশটি রূপার দ্বিতীয় প্রকার পানপত্র এবং এক সহস্র অন্যান্য পাত্র। এ ছাড়া ঊনত্রিশখানি ছুরিও ছিল। নির্বাসিত ইহুদীদের বাবিল থেকে জেরুজালেমে নিয়ে যাওয়ার সময় শেশবসর এই সমস্ত জিনিস তাঁর সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন।

: রাব্বী, বাবিল ত্যাগ করার অনুমতি পাবার পরেও এত ইহুদী-যে এখানে থেকে গেল, তারই বা কারণ কি? তারা কি বাবিলকে এতই ভালবেসেছিল?

: সেই কথাই তো বলছি। শত শত ইহুদী বাবিল ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ক্যালদীয়দের মাথার টনক নড়ল। এই ক্ষেত চষবার, কাঠ কাটবার, বোঝা বইবার আর জল টানবার সচল যন্ত্রগুলো সবই যদি চলে যায়, তবে তাদের চলবে কি করে! তখন স্থানীয় শাসনকর্তা ও অধ্যক্ষদের যোগসাজশে ইহুদীদের বাবিল-ত্যাগ করা নিষিদ্ধ করা হোল। আমাদের মুখ জোর করে বন্ধ করে রাখা হোল, যাতে আমরা পারস্যরাজ্যের কানে আমাদের কথা তুলে ধরতে না পারি। আর রাজা সাইরাসের মৃত্যুর পর এ কথা একেবারেই চাপা পড়ে গেল।

: যাহুদা ও বিন্নামিনের প্রধানগণ, যাজকগণ, লেবীয়গণ ও অন্যান্য যে-সমস্ত ইহুদী ভাই জেরুজালেমে গিয়ে পৌঁছলেন, তাঁদের ইতিহাস শোনবার জন্য আমরা উৎসুক আছি।

: নির্বাসন থেকে স্বদেশে প্রত্যাগত সমস্ত ইহুদী পবিত্র সপ্তম মাসে জেরুজালেমে গিয়ে একত্রে জমায়েত হোল। তাদের মধ্য থেকে যোষাদকের পুত্র যেওয়া আর তার যাজক ভাইগণ এবং মিয়েলটিয়ের পুত্র যেরুব্বাবেল ও তার ভাইগণ প্রভুর নিকট উৎসর্গের জন্য যজ্ঞবেদী নির্মাণ করে তুলল, যাতে তারা মুসা-কর্তৃক নির্ধারিত নিয়ম- অনুযায়ী দগ্ধ বলি প্রদান করতে পারে।

তারা তাঁবুর ভোজ সম্পন্ন করল, আর প্রতিদিনের নির্ধারিত দগ্ধ বলি প্রদান করে চলল, তারপর প্রভুর পবিত্র নতুন চাঁদের ভোজপর্বে ও অন্যান্য নির্দিষ্ট ভোজপবে অবিশ্রান্ত দগ্ধ বলির অনুষ্ঠান হতে লাগল। আর সবাই স্বেচ্ছায় আপন আপন বলি উৎসর্গ করল।

কিন্তু মন্দিরের ভিত্তি তখনও গড়ে উঠে নি। এই উদ্দেশ্যে রাজমিস্ত্রী ও মিস্ত্রীদের ডাক পড়ল। আর সিডন ও টায়ারের শ্রমিকদের জন্য উপযুক্ত পরিমাণ মাংস, দ্রাক্ষারস ও জেতফলের তেল পাঠিয়ে দেওয়া হোল, যাতে তারা লেবানন থেকে কাঠ কেটে সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে এনে জোপ্‌পা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে যায়। এই কাঠের জন্য পারস্যরাজ সাইরাসের মঞ্জুরী পত্র তারা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল।

জেরুজালেমে এসে পৌঁছবার দ্বিতীয় বৎসরের দ্বিতীয় মাসে তারা প্রভুর মন্দির গড়ে তোলবার কাজে হাত লাগাল। বিশ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে যত সক্ষম লেবীয় সম্প্রদায়ের লোক ছিল, তাদের সবাইকেই এই কাজে নিয়োগ করা হোল।

কারিগরেরা প্রভুর মন্দিরের ভিত্তি গড়বার সঙ্গে সঙ্গে রাজা দায়ুদ-কর্তৃক নির্ধারিত বিধি-অনুসারে প্রভুর বন্দনাগান শুরু হোল। উপযুক্ত পোশাকে সুসজ্জিত যাজকগণ শিঙ্গাধ্বনি করে উঠল, আর লেবীয় সম্প্রদায়ভুক্ত আসফের সন্তানগণ করতাল বাজিয়ে চলল।

গায়করা মিলিতকণ্ঠে প্রভুর প্রশংসাগান গাইতে লাগল। তারা গাইল —‘ধন্য প্রভু, ধন্য তোমার করুণা! হে আমাদের প্রভু, তুমি চিরদিন মঙ্গলময়, তোমার করুণাধারা চিরপ্রবাহিত।” তারপর তারা মহাশব্দে প্রভুর নামে জয়ধ্বনি করল। কিন্তু উপস্থিত জনতার মধ্যে যে-সমস্ত যাজক প্রধান ও লেবীয়গণ প্রভুর সেই প্রথম মন্দির দেখবার সুযোগ পেয়েছিল, তারা উচ্ছ্বসিত আবেগে উচ্চকণ্ঠে কেঁদে উঠল। অন্যান্য সবাই আনন্দধ্বনি করল। কিন্তু সেই ক্রন্দন আর আনন্দরোল এমনভাবে মিশে গেল যে, তাদের আর আলাদা করে বোঝবার উপায় ছিল না। সেই মহানির্ঘোষ শুনে নিকটবর্তী ও দূরবর্তী প্রতিবেশী পরজাতীয় লোকেরা চমকে উঠল।

: এইভাবেই বুঝি তারা মন্দির গড়ে তুলল?

: না, এত সহজ নয়। বহু বাধা তাদের পেতে হয়েছে। যাহুদার শাসনকর্তাগণ আর চারদিকের বিদ্বেষপরায়ণ জাতিগুলো এমনভাবে পেছনে লাগল, আর নানাভাবে তাদের উপর উৎপাত শুরু করল যে, মন্দিরগঠনের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। এই ভাবে বছরের পর বছর গড়িয়ে যেতে লাগল। আমাদের প্রতিপক্ষের লোকেরা নানাভাবে তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে গেল, আর তারা ইহুদীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ জানিয়ে পারস্যের রাজাদের মন বিষাক্ত করে তোলবার চেষ্টা কতে লাগল। কিন্তু তাদের সমস্ত দুরভিসন্ধি ও ষড়যন্ত্র শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হোল। প্রভুর বিধান উল্লঙ্ঘন করতে পারে, এমন শক্তি কার আছে? একদিন তাঁর অভিশাপে মন্দির আর নগরী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। আবার তাঁরই ইচ্ছায় মন্দির গড়ে উঠল। তখন নবী হগয় ও ইদ্দোর পুত্র সখরিয় এই দু’জন নবী যাহুদা ও জেরুজালেমের ইহুদীদের কাছে প্রভুর বাণী প্রচার করতে লাগলেন, আর প্রভুর বাণী উৎসাহিত হয়ে শন্টীয়েলের পুত্র সরুব্বাবিল ও যোষাদকের পুত্র যেশুয়ের নেতৃত্বে ইহুদীরা মন্দির গড়ে তুলল।

আসীরিয়ার প্রতিনিধি বললেন,

আমরা শুনেছি, আমাদের ইহুদী ভাইরা জেরুজালেম নগরীর পুনর্গঠন করবার জন্য এবং প্রাচীর গেঁথে তোলবার জন্য চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পারস্যরাজের আদেশে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাব্বী, এ কথা কি সত্য?

: আপনারা ঠিকই শুনেছেন। ইহুদীদের জনসংখ্যা ও সক্রিয়তার পরিচয় পেয়ে প্রতিপক্ষ শঙ্কিত হয়ে উঠল। বিশ্রম, মিত্রদাত, টাবেল ও তাদের অন্যান্য সঙ্গী যাহুদা ও জেরুজালেমের ইহুদীদের বিরুদ্ধে পারস্যরাজ আর্তাসারেকসের নিকট এক অভিযোগপত্র লিখল। সে পত্রের অনুলিপি এই,

“রহুম মন্ত্রী ও শিমশয় লেখক এবং তাহাদের সঙ্গী অন্য সকলে অর্থাৎ দীবীয়, অফসখীয়, টর্পলীয়, অফসীয়, অর্কবীয়, বাবিলীয়, শৃসণখীয়, দেহবীয় ও এলমীয় লোকেরা এবং মহামহিম সম্রাট অম্লপ্পর কর্তৃক আনীত ও সামরিয়া নগরে এবং ফোরাৎ নদীর তীরস্থ অন্য সকল দেশে স্থাপিত অন্য সকল জাতি ইত্যাদি মহারাজ্যের নিকট এই নিবেদন জানাইতেছি, ইহুদীরা আপনার নিকট হইতে অনুমতি প্রাপ্ত হইয়া জেরুজালেমে আসিয়াছে। তাহারা সেই দুষ্ট বিদ্রোহী নগরকে পুনর্নির্মাণ করিতেছে এবং প্রাচীর গাঁথিয়া তুলিতেছে। অতএব মহারাজের অপমান দেখা আমাদের উচিত নয়, এইজন্য লোক পাঠাইয়া মহারাজের নিকট নিবেদন এই যে, যদি এই নগর নির্মিত ও প্রাচীর স্থাপিত হয়, তবে ঐ লোকেরা কর, রাজস্ব ও মাশুল আর দিবে না। ইহাতে পরিণামে রাজ-সরকারের ক্ষতি হইবে। আমরা রাজ-সরকারের লবণ খাইয়া থাকি। অতএব মহারাজকে জ্ঞাত করিলাম। আপনার পিতৃ-পুরুষদের ইতিহাস পুস্তক দেখিয়া জানিতে পারিবেন এই নগর বিদ্রোহী নগর এবং রাজাদের ও প্রদেশ সকলের পক্ষে অনিষ্টকর। আর এই নগরে পূর্বকাল হইতে উপপ্লব হইয়া আসিতেছিল, সেইজন্যই এই নগর বিনষ্ট হয়। আমরা মহারাজকে জ্ঞাত করিতেছি, যদি এই নগর নির্মিত ও প্রাচীর স্থাপিত হয়, তবে এতদ্বারা নদীর ওপারে আপনার কিছু অধিকার থাকিবে না।”

: রাজা এই চিঠি পেয়ে কি করলেন?

: তিনি তাদের এই চিঠির উত্তর দিয়ে পাঠালেন,

“তোমরা আমাদের কাছে যে-পত্র পাঠাইয়াছ, তাহা আমার সম্মুখে স্পষ্টভাবে পঠিত হইয়াছে। আমার আদেশে অনুসন্ধান করিয়া জানা গেল, পূর্বকাল হইতেই এই নগর রাজদ্রোহ করিয়া আসিয়াছে এবং এখানে বিদ্রোহ ও উপপ্লব হইত। আর জেরুজালেমে পরাক্রমী রাজগণও ছিলেন। তাঁহারা নদীতীরস্থ সকলের উপর রাজত্ব করিতেন এবং তাঁহাদিগকে কর, রাজস্ব মাশুল দেওয়া হইত। সেই লোকদিগকে নিবৃত্ত থাকিতে এবং যতদিন আমা হইতে কোন আজ্ঞা প্রচারিত না হয় ততদিন ঐ নগর নির্মাণ না করিতে আজ্ঞা দাও। সাবধান, এই কার্যে তোমরা শিথিল হইও না। রাজ-সরকারের ক্ষতিজনক অপচয় কেন হইবে?”

রাজার চিঠির মর্ম জানতে পেরে প্রতিনিধিদের মুখ কালো হয়ে গেল।

“তবে আর আমাদের ভরসা কি? স্বয়ং পারস্যরাজ যখন আমাদের বিরুদ্ধে, তখন যাহুদায় ফিরে যাওয়া, নগরীর পুনর্গঠন করা, প্রাচীর গেঁথে তোলা সবই কি আকাশ-কুসুমের স্বপ্ন দেখা নয়? রাজার আদেশের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি, এমন কি শক্তি আমাদের আছে?” একজন প্রতিনিধি মন্তব্য করলেন।

“তবে কি আমরা চুপ করেই থাকব? আপনি কি তাই করতে বলেন?” প্রশ্ন করলেন আর একজন প্রতিনিধি। “আপনারা কি ভুলে যাচ্ছেন, আমাদের যাহুদা আর জেরুজালেমের ভাইয়েরা জীবনপণ সংগ্রাম করে প্রভুর মন্দির গড়ে তুলেছে? সমস্ত দায়িত্ব আর বিপদের ঝুঁকি তাদের উপর ছেড়ে দিয়ে আমরা কি যে যার জায়গায় লেজ গুটিয়ে বসে থাকব?”

চারদিকে একটা গুঞ্জনধ্বনি উঠল। গুঞ্জন আর শুধু গুঞ্জন রইল না, শেষে এই নিয়ে একটা প্রখর তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে গেল। আচার্য ইষ্রা তাদের সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,

: আপনারা বৃথাই কথা কাটাকাটি করছেন। আমার কথা তো এখনও শেষ হয় নি। সবটা শুনে নিন আগে।

তখন সবাই একসঙ্গে কোলাহল করে উঠল,

: হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন, বলুন! আপনারা থামুন তো, ওঁকে বলতে দিন।

সবাই শান্ত হলে পর আচার্য ইষ্রা বললেন,

দেখুন, রাজা আমাদের বিরুদ্ধে, তাই বলে তিনি প্রভুর বিধানকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেন না। রাজা যতই বড় হোন না কেন, তিনি কি আমাদের প্রভুর চেয়েও বড়? ফারাউন আপনাকে যিহোবার চেয়েও শক্তিশালী বলে অহঙ্কার করেছিল। কিন্তু কি হোল তার পরিণতি? প্রভু যদি ইচ্ছা করেন, সমুদ্রের জলরাশি দু’ভাগ হয়ে পথ করে দেয়; প্রভু যদি ইচ্ছা করেন, কঠিন পাষাণ বিদারিত হয়ে প্রস্রবণ ধারা বেরিয়ে আসে; প্রভু যদি ইচ্ছা করেন, আকাশ থেকে মান্না আর মাংস বৃষ্টি হয়।

সবাই সমন্বয়ে এ কথার অনুমোদন করল; ঠিক, ঠিক।

: আপনারা চিন্তা করবেন না। প্রভু এতদিনে আমাদের উপর সদয় হয়েছেন। নবী যেরেমিয়ার বাণী সফল হতে চলেছে। রাজা আর্তাসারেকসের নিষেধাজ্ঞা শুনে অনেকেই হয়তো ভয় পেয়েছিল। কিন্তু আমরা ভয় পাই নি বা হাল ছেড়ে দিই নি। আমরা দিনের পর দিন এই নিয়ে চেষ্টা করে আসছিলাম। সম্ভবত এতদিনে তার ফল ফলতে শুরু করেছে। স্বয়ং প্রভু তাঁর মতি পরিবর্তন করে দিচ্ছেন।

প্রতিনিধিরা উৎসাহে কাছে এসে ঘেঁষল।

: বলুন, রাব্বী, বলুন, রাজা কি তবে—

আচার্য ইষ্রা হেসে বললেন,

: না, অনুমতি দেন নি। তবে আমরা এটুকু আশ্বাস পেয়েছি যে, রাজপ্রাসাদের প্রাচীন দলিলপত্র ঘেঁটে যদি রাজা কোরসের অনুমতি পত্রখানার সন্ধান পাওয়া যায়, তবে তিনি তাঁর মর্যাদা রক্ষা করবেন।

: রাজা নিজে কি এ কথা আপনাকে জানিয়েছেন?

: না, আমাদের বন্ধু নেহেমিয়া সুসান রাজপ্রাসাদের কর্মচারী। তিনি রাজার অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং অনুগ্রহের পাত্র। তাঁর কাছ থেকে আমরা এই সংবাদ পেয়েছি।

ধন্য যিহোবা!—মহা আনন্দে সবাই ধ্বনি দিয়ে উঠল।

একজন হুঁশিয়ারী দিয়ে বলল,

: চুপ চুপ, আপনারা ভুলে যাচ্ছেন, আমরা শত্রুপুরীর মধ্যে বাস করছি। ক্যালদীয়রা কিছু যেন একটা আঁচ করেছে। ওরা সব সময় আমাদের চোখে চোখে রাখছে।

আচার্য ইষ্রা বললেন,

: হ্যাঁ, ধন্য যিহোবা। একমাত্র যিহোবাই আমাদের ত্রাণকর্তা। মিসরের ফারাউনের হাত থেকে যিনি একদিন আমাদের পূর্বপুরুষদের ত্রাণ করেছিলেন, সেই তিনিই আমাদের ত্রাণ করবেন। হয়তো কিছুদিনের মধ্যে রাজা কোরসের সেই অনুমতিপত্রের সন্ধান পাওয়া যাবে, তারপর শুরু হবে আমাদের যাত্রা। আপনারা যে যার অঞ্চলে ফিরে যান। ফিরে গিয়ে যাত্রার জন্য সবাইকে প্রস্তুত করুন। একটি ইহুদীও যেন বাকী না থাকে। যিহোবার উদ্দেশ্যে যার যতটুকু শক্তি বলি সংগ্রহ করুন। আমরা যেন যিহোবার অকৃতজ্ঞ সন্তান বলে পরিগণিত না হই।

: রাব্বী, সত্য সত্যই প্রভু যদি আমাদের দয়া করেন, তবে এই দীর্ঘ ও বিপৎসংকুল পথে কে আমাদের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে?

: আপনাদের প্রধানগণ আপনাদের পরিচালনা করবেন, সেইজন্য এখন থেকেই আপনাদের আচার ব্যবহার দ্বারা আপনাদিগকে শোধণ করে তুলুন। আমরা জানি এই বিদেশে, এই মিথ্যা ধর্ম ও কুৎসিত আচারের মধ্যে দীর্ঘকাল বাস করে আমরা আমাদের সনাতন ধর্ম ও আচারের বিশুদ্ধতা হারিয়ে ফেলে মরতে বসেছি। ইহুদী জাতি যদি সত্যসত্যই বাঁচতে চায়, তবে তাকে আবার তার সেই শুদ্ধ আচারে ফিরে যেতে হবে।

: কিন্তু আমাদের প্রধানগণ অধিকাংশই বৃদ্ধ। তাঁরা কি এই ক্লেশকর পথের পরিচালনার ভার নিতে সক্ষম হবেন?

: না, তা কখনোই তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে তাঁরা অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ। তাঁরাই আপনাদের মধ্যে থেকে যোগ্য পরিচালক নির্বাচন করে দেবেন। এই সমস্ত পরিচালকদের যোগ্যতা অনুসারে দশের উপর একজন, পঞ্চাশের উপর একজন, শতের উপর একজন এবং সহস্রের উপর একজন এইভাবে নিযুক্ত করা হবে। যাত্রার শুরু থেকে জেরুজালেমে পৌঁছা পর্যন্ত নিজ নিজ দলের পরিচালনার ব্যাপারে এঁরাই সম্পূর্ণভাবে দায়ী থাকবেন।

এমন সময় একজন লোক হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরের মধ্যে এসে ঢুকল,  

: আপনারা এখনই এখান থেকে সরে পড় ন।

: কেন? কেন?—সবাই উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে উঠল।

: ওদের গুপ্তচরেরা সংবাদ পেয়েছে যে, ইহুদীদের নেতারা ক্যালদীয়দের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবার জন্যে এই অঞ্চলের কোথাও মিলিত হয়েছে। ওরা এ পাড়ার ইহুদীদের বাড়ীতে বাড়ীতে ঢুকে হামলা শুরু করে দিয়েছে। এক্ষুণি এদিকে এসে পড়বে। এই বলেই লোকটি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে বেরিয়ে গেল।

: কে এ, আমাদের লোক তো?

: হ্যাঁ। গৃহকর্তা সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।

: বিশ্বস্ত?

: হ্যাঁ, আমিই ওকে চারদিকে নজর রাখবার জন্য নিযুক্ত করেছিলাম।

নেতাদের মধ্যে দুই তিনজন মিলে একটু কানাকানি পরামর্শ করলেন। তারপর সুশৃঙ্খলভাবে একের পর এক ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

দেখতে দেখতে ঘরটার চেহারা বদলে গেল। কয়েকটা ফসল-ভরতি বস্তা এবং আরও নানা-রকম জিনিসপত্রে ঘরটা বোঝাই হয়ে গেল। দেখে বোঝবার উপায় ছিল না যে, একটুখানি আগেই এখানে এক গুরুত্বপূর্ণ গোপন সভা হচ্ছিল।

আর একটি বৃদ্ধা ঘরের এক কোণে বসে মসিনার সুতো কাটতে লাগল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *