ষোল
সেই দিন বিকালবেলায় নেহেমিয়া যাহুদার ইহুদীপ্রধানদের জন্য কতগুলো চিঠি লিখছিলেন। এমন সময় হানানি এসে সংবাদ দিল,
: আমোনীয় দাস টোবিয়া আর আরবীয় গেশেম এর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
: কোথায়? এই জেরুজালেমে?
: তা ছাড়া আর কোথায়? দিব্যি দলবল নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে, ‘ভাই’ ‘ভাই’ বলে ইহুদীদের সঙ্গে খুব খাতির জমিয়ে বসেছে। না, লোকটা অসম্ভব ধড়িবাজ! ওঃ, আর এক কথা, আমাদের শল্লুমকে দেখলাম তাদের সঙ্গে।
: শলুম? টোবিয়ার সঙ্গে?
: তাই তো দেখলাম। আমার দিকে চোখ পড়তেই ওর মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তারপর যখন দেখল যে ধরা পড়েই গেছে, তখন আর লুকোচুরি করবার চেষ্টা করল না। আগেকার থতমত ভাবটা সামলে নিয়ে টোবিয়াকে ডেকে আমার দিকে ইশারা করে দেখাল। টোবিয়া তখন আমার দিকে মুখ করে দাঁড়াল। দেখলাম চোখের দৃষ্টিটা বড় খারাপ।
নেহেমিয়া একটু চিন্তিতভাবে বললেন, তাহলে আমাদের সমস্ত আলোচনাই তো ওদের কানে গেছে।
: তা তো গেছেই। তীরশথ, ওরা কি সব সময়ই আমাদের থেকে এক কদম এগিয়ে চলবে?
: এখন পর্যন্ত তাই তো দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু কালকের পুরো দিনটা আমাদের হাতে। কে জানে হয়তো বা এক দিনেই স্রোতের মোড় ঘুরে যেতে পারে। তুমি কি একটু ঘাবড়ে গেছো হানানি?
: তীরশথ, আমি একটু আলাদা জাতের লোক। সাধারণ সময়ে যে-কোন কাজেই হাত দিই না কেন, কোনটাতেই আমি তেমন সুবিধা করতে পারি না। একদম ঢিলেঢালা আর এলোমেলো হয়ে যাই। কিন্তু সময় যতই কঠিন হয়ে আসে, কেমন করে জানি না আমিও সঙ্গে সঙ্গে শক্ত হয়ে উঠতে থাকি। আমার জন্য কিছু ভাববেন না।
নেহেমিয়া হেসে বললেন, ভাল, ভাল, এইরকম লোকই তো এখন চাই। কিন্তু আমি একটা কথা ভাবছি হানানি, মূল চক্রীরা যে তাদের নেপথ্য ভূমিকা ছেড়ে দিয়ে প্রকাশ্যে ও সশরীরে এসে উপস্থিত হয়েছে, এটা কি ওদের সবলতা না দুর্বলতার লক্ষণ?
: আপনি কি মনে করছেন?
: আমি মনে করি দুর্বলতা। জেরুজালেমে ওদের ঘাঁটিটা খুব শক্ত ও নির্ভরযোগ্য নয় বলেই ওদের নিজেদের আসতে হয়। ওদের এখানকার বন্ধুদের উপর নির্ভর করে ওরা বসে থাকতে পারছে না।
আবার এও তো হতে পারে, ওদের আত্মবিশ্বাস এতই বেশী যে, ওদের লুকোচুরি করবার দরকার করে না। আমাদের বাড়ীর উপর চড়াও হয়ে ওরা ওদের প্রতাপ দেখিয়ে যায়।
নেহেমিয়া খুশী হয়ে হেসে উঠলেন
: বাঃ, দিব্যি বলেছ তো!
: কিন্তু যা-ই বলি না কেন, আপনার ধারণাটাই ঠিক হোক, মনেপ্রাণে এই কামনাই করি।
: আচ্ছা, হানানি, তুমি তো এখানকার স্থানীয় অধিবাসী, তা ছাড়া খুবই জনপ্রিয় লোক। এ বিষয়ে এখানকার লোকদের মনের গতিটা কোন দিকে ঝুঁকেছে, বলতে পারো? প্রথম দিন এসে আমরা যে-উৎসাহ দেখেছিলাম, তাতে কিছুটা-যে ভাটি ধরেছে, তুমি না বললেও একথা আমি বুঝতে পারি। কিন্তু বর্তমান অবস্থাটা কোন পর্যায়ে আছে, তুমি আমাকে তার একটা চিত্র দিতে পারো?
: আমার মনে হচ্ছে আমাদের দিক থেকে অবস্থাটা খুব খারাপ নয়। একটা মজার কথা কি জানো, ঘরে ঘরে এ নিয়ে মতভেদ ঘটছে। জোয়ানেরা এগিয়ে আসতে চাইছে, আর বুড়োরা বলছে, এত সাহস ভাল নয়। তবে বুড়োরা তেমন সুবিধা করে উঠতে পারছে না, কিন্তু এ বিষয় কোন সন্দেহ নেই যে, টোবিয়া তার মোক্ষম অস্ত্রটি ছাড়বার জন্যই এসেছে। এ আপনি ধরে রাখতে পারেন, আজ রাত্রির মধ্যেই একথা প্রচারিত হয়ে যাবে যে, সম্রাট তার অনুমতি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তারপর বোঝা যাবে কোথাকার জল কোথায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ কালকের মধ্যে হাওয়ার গতি কোনদিকে সেটা অনেকটা ভাল করে টের পাওয়া যাবে।
সেই দিন অপরাহ্ণে ইহুদীপ্রধানদের সঙ্গে দেখা করলেন নেহেমিয়া, মূল প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কারু কিছু বলবার ছিল না। সে তো আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া আছে। অধিক আলোচনা বাহুল্য মাত্র। কিন্তু তাই বলে পরশু থেকেই?
এ-যে অসম্ভব কথা। কতদিক চিন্তা করবার আছে, কত কিছু আয়োজন করতে হবে, তবে তো কাজে হাত দেওয়া। এ তো ছেলেখেলা নয়। এতবড় বৃহৎ একটা ব্যাপার, যে-কোন দিনে তো আর শুরু করা যায় না। পঞ্জিকা দেখে দিনক্ষণ বাছাই করতে হবে বইকি। একটা সাধারণ গৃহ নির্মাণ করতে গেলে পর্যন্ত শুভদিন দেখে নিতে হয়। আর এ তো নগরী নির্মাণ। নেহেমিয়া ক্ষেপেছেন নাকি! বিদেশে পরজাতীয়দের মধ্যে প্রতিপালিত হয়েছেন বলে কি ইহুদীদের পিতৃপুরুষের এই রীতিনীতিগুলোও তাঁর জানা নেই! এ বছরের খুচরো যে-ক’টা মাস আছে, চলে যাক না, ওদিকে নির্বাসিত ইহুদী ভাইয়েরাও ফিরে আসছে! তখন নতুন বছরের প্রথম মাসের নতুন চাঁদের দিনে নগর গঠনের কাজে হাত দেওয়া যাবে। এত ব্যস্ত হবারই বা কি আছে? এত বছর যদি এইভাবেই কেটে গিয়ে থাকে, আর দুটো চারটা মাস কি সইবে না?
নেহেমিয়া কিছুতেই তাঁদের বুঝিয়ে উঠতে পারলেন না। প্রধানদের মধ্যে দু’তিন জন খুবই তীব্রভাবে আপত্তি করছিলেন। তাঁদের স্বরূপ নেহেমিয়ার অজানা ছিল না। বাদবাকী যাঁরা, তাঁরা সাদামনে মাথা নেড়ে তাঁদের আপত্তিতেই সায় দিচ্ছিলেন। তাঁদের মূল বক্তব্য এই যে, এমন অ-দিনে অ-ক্ষণে এমন একটা কাজে হাত দেওয়া যায় না।
নেহেমিয়া বোঝাতে চেষ্টা করলেন, পরজাতীয়েরা তাদের কাজে বাধা দেবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। যত দেরী হবে তাদের শক্তি ততই বেড়ে যাবে। কাজেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, অন্ততপক্ষে প্রাচীর গেঁথে তোলবার কাজটা শেষ করে ফেলাই দরকার। ওঁরা তাঁর এই যুক্তি হেসেই উড়িয়ে দিলেন। সম্রাট যদি পক্ষে থাকেন, ওদের সাধ্য কি কিছু করতে পারে। দেখুক না একবার চেষ্টা করে!
নেহেমিয়াকে হার মানতে হোল। তিনি তাঁদের একজনকেও বুঝিয়ে উঠতে পারলেন না। অথচ বাধাটা যে এদিক দিয়ে আসতে পারে, উৎসাহের মুখে এ আশঙ্কা তাঁর মনে একবারও জাগে নি। কিন্তু ইহুদীদের কাছে এই প্রশ্ন-যে মোটেই ছোট নয়, ইহুদীদের রীতিনীতি ও লোকাচার সম্পর্কে যথোচিত অভিজ্ঞতা থাকলে এ কথাটা তাঁর অবশ্যই মনে পড়ত।
নেহেমিয়া বড় রকমের একটা ধাক্কা খেলেন। এজন্য যে তিনি একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। এ বাধা তিনি ডিঙ্গিয়ে যাবেন কি করে? শেষ পর্যন্ত দৌড়ের প্রতিযোগিতায় ওরাই কি কদমের পর কদম এগিয়ে যাবে? না, তিনি শেষ পর্যন্ত হাল ছাড়বেন না। কাল ইহুদীদের সাধারণ সভায় এর একটা চূড়ান্ত ফয়সালা হবে। পাছে মন ভেঙ্গে যায় সে জন্য আপনাদের সহকর্মীদের কাছে তিনি এ সম্পর্কে কোন কথাই বললেন না।
সন্ধ্যার পর থেকেই জেরুজালেমের আবহাওয়া বদলে যেতে লাগল। খবরটা ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসের মুখে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত। সম্রাট নাকি তাঁর অনুমতি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, নগরীর পুনর্গঠন করা চলবে না। কে যে কোথা থেকে এই সংবাদটা নিয়ে এসেছে, সে কথা কেউ বলতে পারে না। খবরটা মুখ থেকে মুখে ঘুরে ঘুরে ফিরছে। সকলের মুখে এই একই কথা। উত্তেজনা পর্দায় পর্দায় উঠছে।
নেহেমিয়ার ঘরের কাছে লোকের ভিড়। ভিড় ক্রমশই বেড়ে চলেছে। সবাই জানতে এসেছে ব্যাপারটা সত্যি কি না। নেহেমিয়া তাদের বুঝিয়ে বলছেন, তোমরা আমার কথা শোন, এ খবর সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমাদের শত্রুপক্ষের লোকেরা আমাদের মনের জোর ভেঙ্গে দেবার জন্য এই মিথ্যে খবর রটিয়ে বেড়াচ্ছে।
লোকে যেন ঠিক বিশ্বাস করতে চায় না। ওরা বলছে, বিনা বাতাসে কি আর পাতা নড়ে? কিছু সত্য এর পেছনে আছেই। তা না হলে এত লোকে একই কথা বলবে কেন? ভিড় ক্রমেই বাড়তে লাগল। বিচিত্র কণ্ঠের বহু প্রশ্ন। সবাই মিলে একসঙ্গে কথা কইছে। আবার তার মাঝখানেই পরস্পর কথা-কাটাকাটি চলছে।
হঠাৎ ভিড়ের মধ্য থেকে কার একটা তীক্ষ্ণ কণ্ঠ শোনা গেল—এই নেহেমিয়াই যত নষ্টের গোড়া। প্রথম থেকেই আমাদের ফাঁকি দিয়ে এসেছে। ধরো ওকে, টেনে বার করো ঘর থেকে।
টোবিয়া অনুচরটি নেহাৎ কাঁচা। বোধ হয় এই-জাতীয় কাজে নতুন নেমেছে। কড়াইতে তেল গরম না হতেই বেগুন ছেড়ে দিয়েছে। যারা ভিড় করেছিল, তারা চিন্তিত ও উত্তেজিত হোলেও নেহেমিয়ার সম্পর্কে কোন বিক্ষোভ নিয়ে আসে নি। হঠাৎ এই ধরনের বেখাপ্পা কথা শুনে তারা অবাক হয়ে গেল।
হানানি এই সুযোগটাকে ছাড়ল না। লাফ দিয়ে ওঠে চিৎকার করে বলল :
: ওই, ওই, ওই সেই শত্রু-পক্ষের লোক। ওরাই এ সমস্ত মিথ্যা কথা রটিয়ে বেড়াচ্ছে। ধরো, ধরো তোমরা ওকে।
ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি ধস্তাধস্তি বেধে গেল। ওর মুখটা ভাল করে দেখা গেল না। কয়েকজন মিলে ওকে ঘিরে ধরেছে। সঙ্গে সঙ্গে সেই অস্পষ্ট আলোতেই দেখা গেল একটা কি যেন ওর হাতে ঝিলিক মেরে উঠেছে।
ছোরা, ছোরা!
যারা তাকে ঘিরে ধরেছিল, ঘাবড়ে গিয়ে সরে দাঁড়াল। আর সেই লোকটা সেই সুযোগে ভোঁ করে ছুট দিল। জনতা এবার দুর্দান্ত রকম সাহসী হয়ে উঠল, ‘ধর, ধর’ বলতে বলতে সবাই তার পেছন পেছন ধাওয়া করল। নেহেমিয়া আর তাঁর সাথীরা একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী এসে সংবাদ দিল, নবী হিলকিয়া মন্দিরের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে বাণী দিচ্ছেন।
: বটে, আজকের দিনে বাণী! কেমন কেমন যেন মনে হচ্ছে! কি বলছেন নবী হিলকিয়া! প্রশ্ন করলেন নেহেমিয়া।
: তিনি প্রথমে সম্রাটকে ধন্যবাদ জানালেন ইহুদীদের প্রতি তাঁর এই অনুগ্রহের জন্য। ধন্য সম্রাট আর্তাসারেকস স্বয়ং যিহোবা যাঁর প্রতি প্রসন্ন হয়েছেন। সম্রাট যিহোবার পরম ভক্ত। যিহোবার আদেশেই তিনি নির্বাসিত ইহুদীদের স্বদেশে ফেরবার অনুমতি দিয়েছেন। প্রভুর মন্দিরের পুজোর জন্য তিনি মুক্তহস্তে স্বর্ণ ও রৌপ্য দান করেছেন। রাজা আর্তাসারেকস দীর্ঘজীবী হোন, আর তাঁর রাজ্ঞীরা বহু সন্তানের জননী হোন। ইহুদীদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে সম্রাট প্রথমে তাদের জেরুজালেমের পুনর্গঠনের অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু স্বয়ং যিহোবা তাঁকে প্রত্যাদেশ দিয়েছেন, না, এখনও সময় হয় নি, এই মহাপাতকী নগরীর প্রায়শ্চিত্তকাল পূর্ণ হতে এখনও বাকী আছে। আজ যারা প্রভুর ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই নগরীর সংস্কার কার্যে হাত দেবে, বা প্রাচীর গেঁথে তুলতে চাইবে, তাদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হবে, আর প্রভুর অভিসম্পাত তাদের উপর নেমে আসবে।
সঙ্গে সঙ্গেই আর একটা সংবাদ পাওয়া গেল। স্ত্রী-নবী নোয়া-দিয়ার বাড়ীর সামনে অনেক লোকের ভিড়।
: কি বলছেন নবী নোয়াদিয়া?
সংবাদদাতা সে সম্পর্কে কোন কথা বলতে পারল না। তিনি কী যেন বলছিলেন, কিন্তু এত লোকের গোলমালে কোন কথাই সে বুঝতে পারে নি।
কি বলছিলেন, সেটা আমরা এখানে বসেই অনুমান করতে পারছি, হানানি হেসে বলল, টোবিয়া আসরটা জমিয়েছে ভাল। নাঃ, লোকটার বাহাদুরী আছে, এ কথা অস্বীকার করা যায় না।
নেহেমিয়া বললেন, ইহুদীদের দুর্বলতার আসল জায়গাটা ওরা বেশ ভালমতই ধরতে পেরেছে। এই-জাতীয় নবীরা চিরদিনই সুযোগ-সন্ধানী। যে যার উদ্দেশ্য-সিদ্ধির জন্য সব সময়েই এদের কাজে লাগিয়ে এসেছে। টোবিয়া কি এদের সব কটিকেই হাত করে নিয়েছে নাকি?
হানানি মন্তব্য করল, কেনই বা নেবে না? আর এই বেচারা নবীরাই বা করবে কি? অপর পক্ষ, মানে আমাদের পক্ষ থেকে লাভজনক কোন প্রস্তাবও তো এদের কাছে যায় নি। তারা যে-দিকে মধুর গন্ধ পেয়েছে, সে দিকেই ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে টোবিয়া আর এক কদম এগিয়ে গেল, আর এ কদমটা বেশ বড় রকমের কদম।
নেহেমিয়া হাসলেন, আপাতত তাই মনে হচ্ছে বটে।
মিকা নিঃশব্দে বসে তাঁদের কথা শুনছিল। আর চুপ করে থাকতে পারল না।
: আপনারা এসব কি বলছেন? প্রভুর নবীরা এত নীচে নেমে আসতে পারেন কখনো? টাকা দিয়ে তাঁদের কিনে নেবে, এও কি বিশ্বাসের কথা?
হানানি বলল, তুমি থামো তো মিকা। তুমি তো জানো না, আমাদের এই সমস্ত নবীরা কি অসীম শক্তিসম্পন্ন। এঁরা-যে কত নীচে নেমে যেতে পারেন, তোমার আমার মত সাধারণ মানুষ তা কল্পনাও করতে পারে না। আর মিকা, তুমি তো সবেমাত্র এসেছো, আর কিছু দিন থাকো, আমাদের ইহুদী সমাজটাকে ভাল করেই চিনতে পারবে। বাবিলে বসে যে-সব স্বপ্ন দেখেছো তুমি, তার অনেক কিছুই ভেঙ্গে যাবে।
ইতিমধ্যেই সেই ভাঙ্গনের কাজ কি কিছু কিছু শুরু হয়ে যায় নি? এই ক’দিনের মধ্যে বেশ কিছু কিছু ফাটল দেখা দিয়েছে। কিন্তু মিকা কিছুতেই তা স্বীকার করবে না। নিজের মনটাকে কেবলই ভুল বুঝিয়ে রাখতে চায়। চিরদিনের স্বপ্ন-দেখা মানুষ মিকা স্বপ্নই যদি ভেঙ্গে যায়, তবে কিসের উপর সে দাঁড়িয়ে থাকবে!
নেহেমিয়া তাঁর সহকর্মীদের ডেকে বললেন, যাও, এবার তোমরা যে যার কাজে বেরিয়ে পড়ো। কিন্তু খুব হুঁশিয়ার, প্রতি পদে সতর্ক হয়ে চলবে। একটা অশুভ শক্তি জেরুজালেমের পথে পথে কুটিল গতিতে সঞ্চরণ করে ফিরছে, এখানে বসেও আমরা তার আভাস পাচ্ছি।
পরদিন মন্দিরপ্রাঙ্গণে ইহুদীদের সভা বসল। ছোটবড় সবাই এসেছে। সভা গম গম করছে।
যাহুদা থেকে সামান্য কিছু ইহুদী মাত্র এসেছে। যে পত্র-বাহকদের পাঠানো হয়েছিল তারা সেখানকার ইহুদীপ্রধানদের কাছ থেকে উত্তর নিয়ে এসেছে। তাঁরা জানিয়েছেন, কাজের লোক পাঠাবার সামর্থ্য তাঁদের নেই। তাঁদের ভারবাহকেরা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে, প্রাচীর গাঁথার কাজ তাদের পক্ষে অসাধ্য।
যাহুদা থেকে যে-কয়জন ইহুদী এসেছিল, তাদের মুখে জানা গেল বিদেশী রাজভৃত্য ও পরজাতীয়দের কড়া শাসানির ফলে সেখানকার ইহুদীরা ইচ্ছা থাকলেও আসতে সাহস পায় নি। হরোনীয় সনবল্লাট ও আমোনীয় দাস টোবিয়ার অনুচরেরা সারা প্রদেশের ইহুদীদের মধ্যে এই বলে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে যে, প্রাচীর গাঁথবার জন্য যে-ইহুদীরা জেরুজালেমে যাবে, তাদের আর রক্ষা থাকবে না, তাদের ভিটে মাটি উৎসন্ন করে দেওয়া হবে।
হরোনীয় সনবল্লাট সবার কাছে বড়াই করে ফিরছেন—জেরুজালেমের অপদার্থ ইহুদীরা ভেবেছে কি? জেরুজালেমকে গড়ে তুলে আবার তারা শক্তিশালী হয়ে দাঁড়াবে? সে আশা বৃথা। ইহুদীদের সেই দিন আর ফিরবে না। ওদের সূর্য চিরদিনের জন্য অস্ত গেছে। বৃথাই ওরা প্রাচীর গেঁথে তোলবার স্বপ্ন দেখছে। আমরা কি চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখব
আমোনীয় টোবিয়া বিদ্রূপ করে বলছে, ওরা যে-গাঁথুনি দিয়ে প্রাচীর তুলবে, তার উপর শেয়ালটাও যদি উঠে দাঁড়ায়, তবে তার ভারেই ওদের প্রাচীর ধসে পড়বে। আমাদের আর কিছুই করবার দরকার হবে না। কিন্তু ওদের স্পর্ধা দেখে আমরা অবাক হচ্ছি। বার বার এত মার খেয়েও কি ওদের শিক্ষা হয় নি? সুসান রাজ-প্রাসাদের পানপাত্র-বাহক জেরুজালেমের তীরশথের পদ পেয়ে আপনাকে কি মনে করেছে? আমাদের কথা অগ্রাহ্য করে প্রাচীর গেঁথে তোলবার চেষ্টা করেই দেখুক না একবার। এটা সুসানের রাজপ্রাসাদ নয়, এটা আমাদের এলাকা।
যাহুদার ইহুদীরা এই সমস্ত সংবাদ দিয়ে তারপর বলল,
আমরা বলছি, আপনারা এই কাজ থেকে আপাতত নিবৃত্ত থাকুন। আপনারা অবস্থাটা ঠিকমত বুঝতে পারছেন না। ওদিকে শমরীয়দের সৈন্যদল তৈরী হয়েই আছে, একটু ইঙ্গিত পেলেই হয়। আরবীয়, আমোনীয়, অসদোদীয় ও অন্যান্য জাতি ঘন ঘন সভা করছে। ওরা বলছে, “আমরা এমন শিক্ষা দেব, যাতে ইহুদীরা ভবিষ্যতে আর কখনো টু শব্দটি না করতে পারে।” ওরা বলছে, “যেইমাত্র ওরা এই কাজে হাত দেবে, ওরা জানবে না, বুঝবেও না কোনদিক থেকে আমরা ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছি। আমরা কাউকে রেহাই দেব না, একটা একটা করে সব কটাকে বধ করব। ওদের প্রাচীরের ভিত ওদের নিজেদের রক্তে লাল হয়ে যাবে।” এই সমস্ত প্রচার করে বেড়াচ্ছে ওরা। এ শুধু প্রচার নয়, এ ওরা করবেই। ওদের অসাধ্য কিছুই নেই। তীরশথ, আপনি প্রবাসী ইহুদী, এখানকার অবস্থা তো আপনি জানেন না। এখানকার ইহুদীরা বহু দুঃখ ক্লেশ ভোগ করেছে ও করছে, তাদের উপর আর নতুন করে বিপদ ডেকে আনবেন না।
কিন্তু তীরশথ নেহেমিয়া বিচলিত হলেন না। যতই বাধা পাচ্ছেন, তাঁর সংকল্প যেন ততই দৃঢ় হয়ে উঠছে। তাঁর মনে পড়ছে হানানির সেই কথা—”সময় যতই কঠিন হয়ে আসছে, কেমন করে জানি না, আমিও সঙ্গে সঙ্গে শক্ত হয়ে উঠতে থাকি।” বাঃ, কি চমৎকার ছেলে এই হানানি! ওর এই কথাটা নেহেমিয়া কোনদিন ভুলতে পারবেন না।
সভায় লোক বেশ জমেছে। একটা জিনিস তাঁর চোখে পড়ল। সেই প্রথম দিন যারা সবার পেছনে সংকুচিত হয়ে বসে ছিল, আজ তারা আর পেছনে নয়, সেই অকুলীন আর অভাজনের দল আজ সবার সামনে এসে বসেছে। আজ কারু ডাক শুনে নয়, আজ নিজেরাই এসে নিজেদের স্থান অধিকার করে নিয়েছে। কি উৎসাহে উজ্জ্বল ওদের চোখ! ওই শ্রমক্লান্ত ক্ষুধাক্লিষ্ট, বিশীর্ণ মুখে এমন চোখ ওরা কোথা থেকে পেয়েছে? নেহেমিয়া ভাবছিলেন, বুঝি যিহোবা তাঁর নগরী গড়ে তোলবার জন্য এই ছদ্মবেশী ফেরেশতাদের পাঠিয়ে দিয়েছেন। মিকা কোথায়? ওই-যে ওদের মাঝখানে তার অপূর্ব সুন্দর মুখখানি মনের আনন্দে ফুলের মতই ফুটে উঠেছে। কি খাসা ছেলে মিকা! এই কদিনে ওর পরিচয় ভাল করেই তিনি পেয়েছেন। কর্তব্যের ডাকে ও হাসিমুখে প্রাণ দিতে পারে, ওর চোখ মুখ সেই কথাই যেন বলছে।
“যিহোবার আপন মহিমায় মিথ্যার জাল ছিন্ন হয়ে যাবে। যারা প্রচার করে বেড়াচ্ছে সম্রাট তাঁর অনুমতি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, তারা শয়তানের অনুচর, তারা মিথ্যার সন্তান। কিন্তু তাদের এই মিথ্যা চাপা রইবে না। আমরা কি জানি না তারা কারা? শুধু আজ নয়, ইহুদীদের এই সমস্ত জাতশত্রু চিরদিন আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এসেছে। কিন্তু ইহুদী সমাজ আজও মরে নি, ইহুদী সমাজ মরবে না। তাদের হীন ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করে দিয়ে বহু দুঃখ দুর্ভাগ্যের অবসানে ইহুদী সমাজ আবার তার পূর্ব মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। এ বিধান যিহোবার বিধান। এ বিধান ভঙ্গ করতে পারে, এমন শক্তি সংসারে কারু নেই।”
নেহেমিয়া লক্ষ করছিলেন, অধিকাংশ লোকই নিবিষ্টভাবে তাঁর কথা শুনছিল। কিন্তু এখানে ওখানে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু লোক কানাকানি করছে। নেহেমিয়া বলে চললেন, “যারা সম্রাটের সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার করে বেড়াচ্ছে, তারা রাজদ্রোহী— ঠিক এই সময় কয়েকটা জায়গা থেকে একই সঙ্গে কয়েকটা কণ্ঠ শোনা গেল— “আমরা নেহেমিয়ার কথা বিশ্বাস করি না। নেহেমিয়া আমাদের ফাঁকি দিয়ে চলেছে। “নগরকে প্রাচীর দিয়ে ঘিরে নিয়ে নেহেমিয়া নিজেই রাজা হয়ে বসতে চাইছে। নেহেমিয়া রাজদ্রোহী।”
এভাবে হঠাৎ আক্রান্ত হয়ে থেমে গেলেন নেহেমিয়া। এই মুহূর্তে এ জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না।
হানানি ক্ষিপ্রতার সঙ্গে লাফিয়ে উঠল : তোমাদের যার যা বলার আছে দাঁড়িয়ে বলো। হানানির এই আহ্বানে কেউ মাথা তুলল না। শ্রোতাদের এক অংশ উত্তেজিত হয়ে গর্জন করে উঠল—দাঁড়িয়ে বলো, দাঁড়িয়ে বলো।
কেউ দাঁড়াল না। ওরা মুখ দেখাতে রাজী ছিল না। টোবিয়ার অনুচরেরা আবারও কাঁচা কাজ করল। জনতার মনের গতি ওরা পরিমাপ করতে পারে নি। কাজেই ফলটা বিপরীত হয়ে গেল।
নেহেমিয়া আর কোন বাধা ছাড়াই তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন। উপসংহারে তিনি তাঁর প্রস্তাব উপস্থিত করলেন—আমরা কাল থেকেই প্রাচীর গাঁথার কাজ শুরু করে দেব। দরিদ্র বস্তিবাসীরা সোল্লাসে এই প্রস্তাবে সমর্থন জানাল। আরও অনেক লোক তাদের সঙ্গে যোগ দিল। কিন্তু একটা অংশ ভাল মন্দ কোন কিছু না বলে চুপ করে রইল। নেহেমিয়া লক্ষ করে দেখলেন, তাদের সংখ্যা খুব কম নয়। শত্রুপক্ষ ইহুদীদের মধ্যে বেশ কিছুটা ভেদ সৃষ্টি করতে পেরেছে।
প্রধানদের পক্ষ থেকে কিছু কিছু আপত্তি উঠল। কেউ বললেন, “শুভদিন দেখে শুভকর্মে হাত দেওয়া উচিত। এই বছরের মধ্যে আর ভাল দিনই নেই।” কেউ বললেন, “সম্রাটের কাছে লোক পাঠিয়ে তাঁর অনুমতি সম্পর্কে সত্যাসত্য নির্ধারণ করেই নেওয়া উচিত। কি দরকার অত ঝুঁকি নেওয়ার?” কেউ বললেন, “প্রবাসী ইহুদীরা তো
শিগগিরই ফিরে আসছেন, তাঁরা এলে অর্থে সামর্থ্যে সব দিক দিয়েই আমাদের শক্তি- বৃদ্ধি হবে। কাজেই সে-পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ভাল।” কিন্তু অধিকাংশের উৎসাহের ধাক্কায় আপত্তিগুলো টিকল না। নেহেমিয়ার প্রস্তাবই বহাল রইল।
ঠিক এমন সময় একটা ঘটনা ঘটল। সভার উপরে বাইরে থেকে প্রচুর ঢিল পড়তে লাগল। কিছু কিছু লোক জখমও হোল। প্রতিপক্ষের এই ইতরামিতে সভার লোকেরা ক্রুব্ধ হয়ে উঠল।
নেহেমিয়া হানানিকে ডেকে বললেন, হানানি, এবারও কিন্তু ওরা এক কদম পিছিয়ে গেল। ওদের নির্বুদ্ধিতাই এজন্য দায়ী।
হানানি বলল : টোবিয়ার সাগরেদরা একদম কাঁচা। টোবিয়া নিজে উপস্থিত থাকলে কিন্তু এ-রকম হতে পারত না। কিন্তু তার সমস্ত অস্ত্র এখনও নিঃশেষ হয় নি জানবেন। সে মহা ধুরন্ধর লোক।
: হ্যাঁ, তার জন্য তো প্রস্তুত থাকতেই হবে।
