পাপের সন্তান – ৫

পাঁচ

পাগলাবাবা এসেছে রে—পাগলাবাবা! ইহুদীদের পাড়ায় সোর পড়ে গেছে। ছেলে বুড়ো সবার মুখেই এই কথা—পাগলাবাবা এসেছে। মেয়েরাও কুয়োর ধারে জল তুলতে তুলতে এই কথাই বলাবলি করছে—পাগলাবাবা এসেছে গো!

চুল দাড়ি সব পেকে গেছে, একটিও কাঁচা নেই। কিন্তু শরীরের বাঁধনটা মজবুত আছে। সোজা হয়ে হাঁটা, একটুও নুয়ে পড়ে না। সুগঠিত স্তম্ভের মত দু’টি পা। এই দুটিকেই বাহন করে সে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়। এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না। আজ এখানে কাল ওখানে, সর্বত্রই সে আছে, অথচ কেথাও নেই। দেশ-বিদেশে ইহুদীদের সমাজে যেখানে যায়, সেখানেই সে আদর পায়, কিন্তু কেউ তাকে ধরে রাখতে পারে না।

লোকে বলে, শোকে দুঃখে লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এইভাবেই তারা তাকে দেখে আসছে। কোনদিন সে যে সুস্থ স্বাভাবিক লোক ছিল, একথার সাক্ষ্য দেবার মত লোকও আজ আর কেউ নেই।

ইহুদীদের সৃষ্টিতত্ত্ব, তাদের উপাখ্যান আর কাহিনী, যাহুদা আর জেরুজালেমের বৃত্তান্ত, মিসর, আসিরিয়া ও বাবিলের আক্রমণ, জেরুজালেমের পতন আর ইহুদীদের মর্মান্তিক পরিণতি—এ সমস্ত যদি কথকের বর্ণনার মধ্য দিয়ে ছবির মত করে দেখতে চাও, তবে চলে যাও পাগলাবাবার কাছে। সোজাসুজি কোন প্রশ্ন কোরো না, কথায় কথায় কথা তুলে দাও। তারপর পাগলাবাবা যখন অপূর্ব ভঙ্গীতে সেই সমস্ত কাহিনী বলে চলবে, তখন সু-কৌশলে জায়গা বুঝে একটু একটু করে ইন্ধন যোগাও। ব্যস্, পাগলাবাবা গল্প শুনিয়ে রাতকে রাত পার করে দেবে।

লোকে অবাক হয়ে বলে, লোকটা এত কথা কি করে মনে রাখে! তাই বাবিলের ইহুদীরা তাকে একবার পেলে আর ছাড়তে চায় না। তারা বলে, পাগলাবাবা, বয়স তো আর কম হোল না, এবার একটু শান্তি মতন থাকো। তোমায় আমরা ঘর বেঁধে দিচ্ছি, সুস্থ হয়ে বাস করো। পা দুটোকে এবার একটু বিশ্রাম দাও। এমন করে ওদের আর কত খাটিয়ে মারবে! খাওয়া পরার ভাবনা কি? সেজন্যে তো আমরাই আছি। তুমি শুধু আমাদের শাস্ত্রের কথা শোনাবে। এই বিদেশীদের দেশে, এই দুঃখ কষ্টের মাঝে তুমি যখন আমাদের মধ্যে থাকো, আমরা যেন যাহুদা আর জেরুজালেমকে আমাদের চোখের সামনে দেখতে পাই।

পাগলাবাবা তাদের কথার সায় দিয়ে বলে—হ্যাঁ, এবার আর কোথাও যাব না ভাই, এইখানেই থেকে যাব। আর যে ক’টা দিন আছি, তোমাদের সঙ্গেই আছি।

দুটো চারটে দিন ভালভাবেই কাটে। গল্পে গল্পে পাড়াটাকে মাতিয়ে তোলে। শুধু ছেলে-ছোকরারা নয়, ছোট বড় সবাই আসে। আসর জমে যায়। ঝাঁক বেঁধে বউ- ঝিরাও আসে। তারা বলে–বা রে, আমরা বুঝি শুনব না পাগলাবাবার গল্প! ক’টা দিন যেন পাড়াসুদ্ধ মহোৎসব চলে।

তারপর কেমন করে কি-যে হয়ে যায়, তার রহস্য বুঝে ওঠা কঠিন। ব্যাপারটা অনেকেই লক্ষ্য করেছে। সদানন্দ হাসিখুশী লোকটা কেমন করে রাতারাতি বদলে যায়। মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মত মুখ তার থমথম করতে থাকে। কেউ যদি জিজ্ঞাসা

গো পাগলাবাবা, কি হয়েছে? ‘না না না, কিছু না, কিছুই হয় নি তো’! পাগলাবাবা কি যেন চাপা দিতে চেষ্টা করে, তার চোখে চোরের মত চাউনি। মাঝে মাঝে আসর ভরতি লোকের মধ্যে কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যায়। তার চোখ মুখ বিবর্ণ ও ভয়ার্ত হয়ে ওঠে, বিস্ফারিত দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে কি যেন সে দেখে। কখনও কখনও বা দেখা যায়, ঘরের কোণে বসে থরথর করে কাঁপছে।

লোকে বলে, এই বার পাগলাবাবাকে ভূতে পেয়েছে, আর তাকে ধরে রাখা যাবে না। অনেক দিনের অভিজ্ঞতা থেকেই তারা একথা বলে। শেষ পর্যন্ত সত্যসত্যই তাই ঘটে। একদিন কি দুইদিন এই ভাবে চলে, তারপর পাগলাবাবাকে আর দেখা যায় না, কোথায় যেন হাওয়া হয়ে যায়। পাগলাবাবার আর সবই ভাল, এইটুকুই শুধু পাগলামি।

এ নিয়ে কত না গবেষণা চলে! কেউ বলে, খুব বড় রকমের একটা দুঃখ পেয়ে বেচারীর মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। কেউ বলে, আরে না, না, এর পেছনে বড় রকমের একটা রহস্য রয়ে গিয়েছে। আবার কেউ বলে, পাগলাবাবা নাকি তার মাকে নিজের হাতে খুন করেছিল, তার পর থেকেই তার এই অবস্থা। কোথাও গিয়ে সে শান্তি পায় না। কিন্তু এর পর আলোচনাটাকে আর বেশী দূর এগোতে দেওয়া হয় না। সবাই যেন একমত হয়ে কথাটাকে চাপা দিয়ে দেয়। পাগলাবাবার গায়ে আঁচড়টুকু লাগতে পারে, এমন কথা কারু সহ্য হয় না। মেয়েরা তেড়ে উঠে বলে, পাগলাবাবার মত মানুষ কখনোই খুন করতে পারে না। এমন কথা যারা বলে, তাদের মুখ খসে পড়ুক।

সেই পাগলাবাবা এতদিন বাদে কোথা থেকে ঘুরতে ঘুরতে আবার এসে হাজির হয়েছে।

সন্ধ্যার পর ইহুদী পাড়ার সবাই এসে জমেছে। পাগলাবাবা শাস্ত্রের কথা বলছে। যাহুদা আর জেরুজালেমের কাহিনী। সেই দুগ্ধ আর মধুর দেশ! শিশুকাল থেকে তারা শুনে আসছে সেই দুগ্ধ আর মধুর দেশের কাহিনী। এই দেশের কথাই তো যিহোবা তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে বলেছিলেন। বলেছিলেন, দেখো, আমি তোমাদের বসবাসের জন্যে এক দেশ নির্দিষ্ট করে রেখেছি। আমি নিজে পথ দেখিয়ে তোমাদের সেই দেশে নিয়ে যাব, সেই সোনার দেশে তোমাদের প্রতিষ্ঠিত করব।

প্রভু বলেছিলেন, “তোমরা সংখ্যায় কম হলেও প্রসাদে তোমরা দুর্ধর্ষ হয়ে উঠবে। তোমরা তো শুধু উপলক্ষ। আমি অদৃশ্যভাবে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করব। তোমরা আমার বন্দনা ও প্রশংসাগান করে যে-পথ দিয়ে অগ্রসর হবে, তোমাদের প্রতিপক্ষ যতই প্রবল হোক না কেন, তারা হাওয়ার মুখে ফসলের তুষের মতই উড়ে যাবে। এইভাবে হিট্টীয় গিরগানীয়, আমেরীয়, ক্যানানীয়, পেরিজ্জীয়, হিবীয় ও যেবুসীয়, এই প্রবল পরাক্রমশালী সাতটি জাতি তাদের নিজ ভূমি থেকে উৎপাটিত হয়ে প্রাণ বাঁচাবার জন্য যে যেদিকে পারে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটবে।

“আর আমি সেই পলাতকদের ধরে ধরে তোমাদের সম্মুখে নিক্ষেপ করব। তোমরা তাদের উপর নির্দয়ভাবে আঘাত হানবে। চূড়ান্তভাবে তাদের ধ্বংস করবে। তারা যা-ই বলুক না কেন, তাদের কোন কথায় কান দেবে না। তাদের সঙ্গে কোন রকম শান্তি- চুক্তি করবে না, তাদের কারু উপর দয়া প্রদর্শন করবে না।

“তোমরা তাদের দেখে ভয় পেয়ো না। তোমাদের প্রভু তো তোমাদের সঙ্গেই আছেন। তোমাদের প্রভু মহাশক্তিশালী, তোমাদের প্রভু কালান্তক। তাঁর উদ্যত দক্ষিণ হস্তের প্রচণ্ড আঘাতে এই সমস্ত জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আমি তাদের রাজাদের ধরে ধরে তোমাদের হাতে সমর্পণ করব, আর তোমরা তাদের নাম পৃথিবীর বুক থেকে চিরদিনের জন্য মুছে দেবে। তোমাদের সামনে কোন লোক সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না, তোমাদের পায়ের তলায় তাদের শির লুণ্ঠিত হবে।

“তোমরা তাদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখবে না। তাদের ছেলেদের কাছে তোমাদের মেয়েদের বিয়ে দেবে না। তোমাদের ছেলেদের জন্য তাদের মেয়েদের ঘরে নিয়ে আসবে না। না না, ওদের বিশ্বাস করো না। এই বিধর্মীদের মেয়েরা তোমাদের ছেলেদের মন ভুলিয়ে নিয়ে যাবে। তোমাদের ছেলেরা তাদের ফুসলানিতে পড়ে আমার কথা ভুলে গিয়ে ওই সমস্ত পরজাতীয় মিথ্যা দেবতার পুজো করতে শুরু করবে। আর জেনো,

তোমাদের প্রভু তা নিঃশব্দে সহ্য করবেন না। তাঁর ক্রোধাগ্নি তোমাদের শুদ্ধ ভস্মে পরিণত করবে।

“সেইজন্য প্রথমেই তোমরা ওদের দেবতাদের বেদী ভেঙ্গে মাটির সমান করে দাও, মূর্তিগুলোকে চূর্ণ করে ফেলো, তাদের পবিত্র কুঞ্জগুলো ভেঙ্গেচুরে উচ্ছন্ন করে দাও।

“কেননা, তোমরা এক পবিত্র জাতি। তোমাদের প্রভু পৃথিবীর বুকে যে-সমস্ত জাতি আছে, সকলের মধ্যে তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ও তাঁর আপনতম বলে নির্বাচিত করেছিলেন।

“তোমরা কোন চিন্তা কোরো না। যত দিন পর্যন্ত আমার প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে এবং আমার অনুশাসনগুলো মান্য করে চলবে, তত দিন আমিও তোমাদের সহায় থাকব। আমি তোমাদের ভালবাসব—আমার আশীর্বাদ তোমাদের উপর নিয়ত বর্ষিত হবে। আর তোমাদের সন্তান-সন্ততিগণ আকাশের নক্ষত্র-রাজির মত বৃদ্ধি পাবে। গর্ভের ভ্রূণ, গাছের ফল, ক্ষেতের ফসল, দ্রাক্ষার রস, জেতফলের তেল আর গোষ্ঠের পশু আমার আশীর্বাদে দিন দিন বেড়ে চলবে। তোমাদের মেয়েরা কেউ বন্ধ্যা থাকবে না। আর তোমাদের মাদী পশুগুলোও হবে বহুপ্রসবিনী। M

পাগলাবাবা বলল, এই সেই সোনার দেশ, এই সেই যাহুদা, যার জন্য আমাদের প্রভু আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন’। সেই প্রতিশ্রুতি তিনি রক্ষা করেছিলেন, কেননা মানুষদের মত প্রভু কখনও চুক্তি ভঙ্গ করেন না।

শ্রোতারা যিহোবার নামে জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল। কয়েকজন গায়ক প্রভুর বন্দনাগান শুরু করল। আর সঙ্গে বেজে উঠল দফ আর মৃদঙ্গ আর বীণা।

মিকা এক পাশে চুপ করে বসে শুনছিল। সে আজ কেমন যেন বিমনা হয়ে পড়েছে। যিহোবা কি এমনি প্রচণ্ড, এমনি হিংস্র—বাবিল ও পারসিকদের রাজা আর প্রভুদের মতই? দয়া নেই, মায়া নেই, বিচার নেই—শুধু শক্তি, শুধু বর্বর শক্তির খেলা! একদিন যাহুদা ইহুদীদের দেশ ছিল না, সেখানে শান্তিতে বসবাস করছিল কতকগুলো জাতি। তারা ইহুদীদের কোনই ক্ষতি করে নি। কিন্তু তবু তাদের বাঁচবার অধিকার শেষ হয়ে গেল। তাদের নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হোল। কোথায় গেল তারা সব? ইহুদীদের আক্রমণের ফলে দলে দলে প্রাণ দিয়েছে। আর বাদ বাকী সবাই স্বদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে দেশে দেশে আশ্রয় খুঁজে বেড়িয়েছে, নয়তো পশুর মত ক্রীতদাসের জীবন বহন করে চলেছে। আর ইহুদীরা? কালের চক্র আবর্তিত হয়েছে। তারাও আজ সেই একই দুর্ভাগ্যের নিগড়ে বন্দী। হায় রে অদৃষ্টের পরিহাস!

মানুষ কি সব সময় চিন্তা করে? সব সময় নয়। মাঝে মাঝে ভেতর থেকে চিন্তা যেন উঠে আসে। তুমি চাও বা না চাও, তারা তোমার সমস্ত মস্তিষ্ক দখল করে বসবে। মিকা এই চিন্তাকে তার মাথায় ঠাঁই দিতে চায় না। চিন্তা যদি একবার এই পথ দিয়ে চলতে শুরু করে, তবে তো আর সে থই পাবে না। তাই সে তাকে জোর করে চাপা দিতে চেষ্টা করে।

কিন্তু যাহুদা? অপূর্ব এই নামের মায়া। শুধু আজ নয়, এই যাহুদার নাম বালক মিকার মনে কত রোমাঞ্চ ও আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। সে কথা কি মিকা ভুলে গেছে? সে যেন রূপকথার এক দেশ। মন ছুটে যেতে চায় সেই দেশে। গত রাত্রিতে সে স্বপ্ন দেখেছে যাহুদাকে। কিন্তু এই যাহুদা তো সেই কল্পনা আর রোমাঞ্চ দিয়ে গড়া যাহুদা নয়। স্বপ্নে দেখল, সে যাহুদায় চলে গেছে। কিন্তু কি আশ্চর্য, সেখানেও কবারের মতই একটি নদী, অবিকল কবার। এমনকি কবারের তীরে যে বাইশী গাছটি আছে একটু জোরে বাতাস হলেই যা উপুড় হয়ে নুয়ে পড়ে হাত বাড়িয়ে কবারের জল ছুঁয়ে যায়, সেই গাছটিও ঠিক তেমনি দাঁড়িয়ে আছে, আশ্চর্য!

কিন্তু এ কে, সামনে কে দাঁড়িয়ে? অবগুণ্ঠনবতী একটি রমণী। কে, কে তুমি? – কোন উত্তর নেই। কে তুমি? তুমি কি যাহুদা? মুখ খোলো, আমি তোমায় দেখব। অবগুণ্ঠনবতী বড় মিষ্টি সুরে খিল-খিলিয়ে হেসে উঠল। তারপর চাঁদের উপর থেকে মেঘের যবনিকার মত অবগুণ্ঠন একটু একটু করে সরে গেল। শদরা! শদরা!—বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল মিকা। শদরা, তুমি কি করে যাহুদায় এলে? শদরা কোন কথা বলল না, কোন কথা বলছে না। শুধু গ্রীবার ভঙ্গীতে একটি অপূর্ব ছবি ফুটিয়ে তুলে মিকার দিকে মুখ টিপে টিপে হাসছে। ও কিসের আমন্ত্রণ? চুম্বকের মত টানছে। না, মিকা এ আহ্বান প্রতিরোধ করতে পারবে না। মিকা কাছে গিয়ে দাঁড়াল, দু’হাত বাড়িয়ে শদরাকে তার বুকে টেনে নিল। শদরা কোন বাধা দিল না, যেন মোমের মত গলে গেল। মিকার বুকের সঙ্গে মিশে গেল, যেন তার রক্তের সঙ্গে মিশে গেল।

হঠাৎ মিকা সম্বিত ফিরে পেয়ে চেয়ে দেখল, প্রভুর বন্দনা গান কখন থেমে গেছে। চমকে উঠল মিকা। এই একঘর লোকের মাঝখানে গত রাত্রির স্বপ্ন নিয়ে এ কি জাগ্ৰত স্বপ্ন সে দেখে চলেছে! কিন্তু শদরাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখবার এই কি সময়? যিহোবার বন্দনা-গানের মাঝখানে শদরা কোন্ পথ দিয়ে এসে ঢুকে পড়ে। হঠাৎ মনে পড়ল, যিহোবার সেই সতর্ক বাণী, যেন বজ্রকণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে

: তাদের ছেলেদের কাছে তোমাদের মেয়েদের বিয়ে দিবে না, তোমাদের ছেলেদের জন্য তাদের ঘর থেকে মেয়েদের নিয়ে আসবে না। না, না, ওদের বিশ্বাস কোরো না। এই বিধর্মীদের মেয়েরা তোমাদের ছেলেদের মন ভুলিয়ে নিয়ে যাবে।

পাগলাবাবা চুপ করে গেছে। মাথা নীচু করে বসে আছে। বোধ হয় আর কিছু বলবার ইচ্ছা নেই।

কিন্তু শ্রোতারা এইখানেই ক্ষান্ত হতে রাজী নয়। তারা আরও শুনতে চায়। একজন প্রশ্ন করল, পাগলাবাবা, আপনি তখন কত বড় ছিলেন?

: আমি? আমি তখন খুবই ছোট। ঐ ছোট ছেলেটির মত।

: আপনি তো তখন জেরুজালেমেই ছিলেন?

: ছিলাম বই কি।

: পাগলাবাবা, যেদিন আমাদের জেরুজালেমে ওরা প্রবেশ করল, সেই দিনটির কথা মনে পড়ে আপনার?

: বা রে, মনে পড়ে না তো কি! সেই দিনটার কথা ভুলতে পারি কখনও? চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে যে!

চোখে চোখে ইঙ্গিত খেলা করে গেল। সবাই গল্প শোনবার জন্য একটু ঘেঁষে বসল। এ গল্প এই প্রথম নয়, আরও তারা শুনেছে,, তবু বার বার শুনেও তৃপ্তি নেই। আবার তারা শুনবে, শোনার পর সবাই মিলে প্রাণভরে কাঁদবে। তবে তারা শান্ত হবে।

পাগলাবাবা স্থির দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। যারা জানে তারা বুঝতে পারছে যে, এই মুহূর্তে পাগলাবাবা আর এখানে নেই, পঞ্চাশ বছর আগেকার জেরুজালেমে ফিরে গেছে।

একটু বাদেই পাগলাবাবা মুখ খুলল।

: আমি তখন ছোট, খুবই ছোট। বাবা, মা আর আমি, এই নিয়েই আমাদের ছোট্ট সংসার। ক’দিন থেকে ক্ষিদেয় বড় কষ্ট পাচ্ছি। নগরে নাকি খাবার নেই। মা’র কাছে খেতে চাইলে মা শুধু কাঁদে, আর মুখ ফিরিয়ে থাকে।

সেদিন রাত্তিরে বাবা এসে ঘরে ঢুকল, হাতে কিছু খাবার, দেখে আমার মন আনন্দে নেচে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে এতক্ষণ চাপা দেওয়া ক্ষিদেটা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। কিন্তু বাবার মুখ অমন হয়ে গেছে কেন? হাত পা থরথর করে কাঁপছে। মা অবাক হয়ে ভয়ার্ত চোখে তার দিকে তাকাল।

: কি হয়েছে, অমন করছ কেন গো?

: নহিমা, ওরা ঢুকে পড়েছে, নগরে ঢুকে পড়েছে। আর রক্ষা নেই।

: কি তুমি বলছ? কারা ঢুকে পড়েছে?

: আর কারা? ক্যালদীয়রা।

: ক্যালদীয়রা? আমাদের নগরের প্রাচীর?

: প্রাচীন এখনও দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু রাজা এইমাত্র প্রাচীরের গোপন দরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু এটাও ওদের দৃষ্টি এড়ায় নি। এক দল রাজার পিছু নিয়েছে। আর এক দল সঙ্গে সঙ্গে খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে পড়েছে।

: বল কি! রাজা পালিয়েছেন?

: হ্যাঁ, রাজা পালিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে গিয়েছে অধ্যক্ষগণ, মন্দিরের যাজকেরা আর অস্ত্রধারী সৈন্যগণ। এখন বাকী শুধু আমরা—নিরস্ত্র, অসহায় নগরবাসীরা।

: আমাদের বোধ হয় কিছু বলবে না, না গো?

: নহিমা, তুমি-যে শিশুর মত কথা বলছ। আমরা কেউ প্রাণে বাঁচব না। তুমি ক্যালদীয়দের কথা শোনো নি? ওরা কাউকে রেহাই দেবে না। মরবার জন্য প্রস্তুত হও নহিমা। আর মাত্র ক’টি মুহূর্ত, ওরা এসে পড়ল বলে।

: ওগো চলো, আমরা পালাই।

: পাগল! কোথায় পালাবে, বাইরে বেরোলেই ওদের হাতে পড়তে হবে।

“ইরাদ, আমার ইরাদ কোথায়’?—মা চেঁচিয়ে উঠল। একমুঠো খাবার খেয়ে আমার মুখ বন্ধ হয়ে গিয়েছে, আর খেতে পারছি না, কোথায় গেল এত ক্ষিদে? আমার ভয় করছে। আমার কেমন যেন শীত শীত করছে। কি-যে হয়েছে, কিছুই বুঝতে পারছি না। তবু আমার পা দুটো ঠক ঠক করে কাঁপছে। ক্যালদীয়রা ঢুকে পড়েছে, তাতে কি হয়েছে? রাজা পালিয়েছেন। কেন পালিয়েছেন? বাবা আর মা অমন করছে কেন? বাবার গায়ে এত জোর। তবু বাবা এত ভয় পাচ্ছে কেন?

: ইরাদ, আমার ইরাদ কোথায়?

: ‘এই-যে মা আমি।’ মাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলাম। মা আমাকে বুকে নিয়ে চুমো খেতে লাগল। তারপর মা আমাকে বাবার কাছে এগিয়ে দিল। বাবাও ঠিক মায়ের মত আমাকে ধরে বারবার চুমো খেতে লাগল। আঃ, ওরা এমন করছে কেন? এত চুমো আমার ভাল লাগছে না। আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছে।

: শ্ শ্ শ্……,ওই-যে শোন নহিমা, ওই শোন!

: কি, কি?

: ওই-যে ওরা আসছে।

এবার আমিও শুনতে পেলাম। বিকট চিৎকার, বহুকণ্ঠের মিলিত চিৎকার ক্রমেই কাছে আরও কাছে এগিয়ে আসছে।

চেয়ে দেখি বাবা মা পাগলের মত দু’জন দু’জনকে চুমো খাচ্ছে। এমন তো আমি কোনদিন দেখি নি। মা কাঁদছে, দু’চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। মা’র কান্না দেখে আমার ভেতর থেকে কান্না ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। আমি কেঁদে উঠলাম।

আমার কান্না শুনে মা’র কান্না থেমে গেল। পাখীর মত ডানা মেলে মা আমাকে ঘিরে ধরল। আমি মা’র বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম। উঃ, কি শব্দ, এমন শব্দ আমি আগে আর কোনদিন শুনি নি। এ সব কি? কে আমাকে বুঝিয়ে বলবে? এ কি ঝড়? একদিন খুব ঝড় এসেছিল, আমাদের ঘরটা ভেঙ্গে পড়ে গিয়েছিল। সেদিনও খুব ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু এ যেন তার চেয়েও ভয়ংকর কিছু। ক্যালদীয়রা কি-রকম? জানোয়ারের মত? মানুষ খেয়ে ফেলে? এ কেমন জানোয়ার? কত বড় জানোয়ার? বাবাকে জিজ্ঞেস করে দেখব? না, বাবা এখন আমার কথায় সাড়া দেবে না। ও কি, কারা যেন কাঁদছে, কারা যেন চিৎকার করছে। খট খট আর ঝন ঝন শব্দ, এসবই বা কি? আলো, আলো, চারদিক আলো হয়ে গেছে। গাছের পাতাগুলোকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ওই-যে ওরা আমাদের বাড়ীর ভেতর ঢুকে পড়ছে। আঃ, এমন করে চ্যাচাচ্ছে কেন?

মা লাফ দিয়ে উঠে দরজা বন্ধ করতে গেল। বাবা মাকে টেনে নিয়ে এল।

: অমন কাজও কোরো না। দরজা বন্ধ করলে ওরা ওদের মশালের আগুনে ঘর জ্বালিয়ে দেবে। তা হলে সবাইকে জ্বলে পুড়ে মরতে হবে। দেখছ না, ওই বাড়ীগুলো জ্বলছে।

এবার ওরা আমাদের ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। জানোয়ার নয় তো, একদল মানুষ, আমাদের মতই মানুষ। কি সুন্দর ওদের পোশাক, মশালের আলো পড়ে ঝিকমিক করছে। আঃ, ওরা তো মানুষ, তবে আমরা এত ভয় করছি কেন?

সামনের লোক ক’টা মা’র দিকে চেয়ে হাসাহাসি করছিল। আমার আর ভয় রইল না, ওরা আমাদের কি করবে? এমন সময় সবচেয়ে সামনের লোকটা কোন কথা না বলেই হঠাৎ একটা ঝকমকে তলোয়ার বাবার মাথার উপর মারল। মশালের উজ্জ্বল আলোয় আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম, লোকটা হাসছে, দাঁত বের করে হাসছে। আমি তাকে এখনও দেখতে পাচ্ছি। হাসছে, দাঁত বের করে হাসছে।

পাগলবাবা সামনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

শ্রোতারা আরও একটু কাছে ঘেঁষে বসল। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে পাগলবাবা আবার বলতে লাগল,

কোন শব্দ না করেই বাবা কাত হয়ে পড়ে গেল। উঃ, কি রক্ত। ঘরের মধ্যে রক্তের ধারা বয়ে চলল। মা চিৎকার করে উঠল, কিন্তু একবারই। আর চিৎকার করার সুযোগ পেল না মা। একজন এসে হ্যাঁচকা টান মেরে মাকে মাটিতে ফেলে দিল। ওরা খুশীতে চিৎকার করে উঠল। ওরা সবাই হাসছিল। সবাই মাকে ঘিরে ধরল, মা’র উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল।

শ্রোতাদের মধ্যে একটি মেয়ে কেঁদে উঠল, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে তার কান্না অন্যের মধ্যেও সংক্রামিত হয়ে পড়ল। একজন, দু’জন, শেষে সব ক’টি মেয়ে। সবার চোখেই জল। ওরা কাঁদবার জন্যই এসেছে। ওরা কাঁদবার জন্যই এই গল্প শোনে। এইভাবে কত কান্নাই না ওরা কেঁদে আসছে। তবু তো ওদের অশ্রু নিবৃত্তি মানে না।

পাগলাবাবা ওদের দিকে চেয়ে বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়তে লাগল। পাগলাবাবা সবাইকে কাঁদায়, নিজে কিন্তু কাঁদে না। শুধু অসহায়ভাবে কেমন করে মাথা নাড়ে, দেখলে কান্না পায়।

মিকার মনে পড়ে গেল কবার নদীর তীরে সেই ধর্ষিতা কিশোরীটির কথা। আহা কি নির্দোষ, কি নরম আর কচি সেই মুখখানি জেরুজালেমের পতনের পর থেকে আজ পর্যন্ত সেই একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি চলছে। এইভাবেই চলবে? অস্থির, চঞ্চল, অধৈর্য হয়ে উঠল মিকা। যিহোবার সৃষ্টির মাঝখানে ক্যালদীয়রা কি এক দুরন্ত অভিশাপের মত দাঁড়িয়ে আছে?

পাগলাবাবা বলে চলেছে, আমার যেন কেমন হয়ে গেল। ভয় বলতে কিছুই যেন ছিল না। “মা, আমার মা” বলতে বলতে আমি মা’র কাছে যাবার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়লাম, ওদের একজন আমাকে তুলে ধরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। ঘরের দেওয়ালের গায়ে গিয়ে ছিটকে পড়লাম। তীব্র একটা বেদনা, পরক্ষণেই চোখের সম্মুখ থেকে সব কিছু মিলিয়ে গেল।

যখন জ্ঞান হোল, চেয়ে দেখি শুধু আমি আর মা, ঘরে আর কেউ নেই। আমার মাথা মায়ের বুকে। মা আস্তে আস্তে আমার কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। একটু একটু করে আমার সমস্ত কথা মনে পড়তে লাগল।

: মা, তোমাকে ওরা মেরেছে?

: হ্যাঁ বাবা।

: মা, তোমার খুব লেগেছে?

: না বাবা—বলেই মা কাঁদতে লাগল, ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল।

: মা, বাবা?

মা চোখে কাপড় দিয়ে ইশারা করে দরজার দিকে দেখিয়ে দিল। মুখ ফিরিয়ে চেয়ে দেখলাম, রক্ত সব জমাট বেঁধে গেছে, আর সেই কাদা-কাদা রক্তের মধ্যে বাবা পড়ে আছে। বাবার মুখ দেখতে পাচ্ছি না। আমি দেখতে চাই না, আমার ভয় করছে।

: মা, ওমা, বাবা মরে গেছে, না?

: হ্যাঁ বাবা।

: আমরা তবে কোথায় যাব?

: প্রভু যেখানে নেবেন।

সে রাত্রি কাটল। তার পরদিনও গেল। কিছুই আমাদের খাওয়া হয় নি। মায়ের বুকে মাথা রেখে আচ্ছন্নের মত পড়ে রইলাম। তার পরদিন-তিনজন ক্যালদীয় এসে ঘরে ঢুকল। ওরা কি বলছিল আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না। ওরা ইশারা করে মাকে উঠতে বলল। মা উঠল না। আমরা দু’জনে দু’জনকে আঁকড়ে ধরে রইলাম। কিন্তু আমাদের গায়ে আর কত জোর, আমরা পারলাম না। ওদের দু’জন মাকে ধরে জোর করে টেনে নিয়ে চলে গেল। আর একজন আমাকে ধরে টান মারল। আমি ‘মা মা’ বলে চিৎকার করে উঠলাম। মায়ের কান্না দূর থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম—ইরাদ, ওরে ইরাদ! সেই কান্না, সে কি ভুলতে পারি কখনও। তার পর কোথায় গেল মা, আর কোথায় গেলাম আমি।

শ্রোতাদের মধ্যে একজন প্রশ্ন করল,

তারপর মায়ের সঙ্গে আর কোন দিন দেখা হয় নি?

পুরানো যারা তারা সবাই জানত, এ প্রশ্ন করতে নেই। কিন্তু প্রশ্নকর্তা সে কথা জানত না। প্রশ্ন শুনেই একটু যেন চমকে উঠল পাগলাবাবা। প্রশ্নকর্তার দিকে একটু তাকিয়ে থেকে স্খলিত কণ্ঠে বলল—না।

এই ‘না’ কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গেই পাগলাবাবা একটা আর্তনাদ করে উঠল। সবাই অবাক হয়ে দেখল, বিস্ফারিত দৃষ্টিতে কি যেন বিভীষিকা সে দেখছে। তার সর্ব শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। মিকা তার দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল—এ আবার কি ব্যাপার, দিব্যি গল্প বলতে বলতে কি হোল পাগলাবাবার! কিন্তু আসরের পুরানো লোক যারা তারা কেউ বিস্মিত হোল না। এ রকম তারা অনেক বারই দেখেছে। এইখানেই তো পাগলাবাবার পাগলামি।

সেদিনকার আসর সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙ্গে দিয়ে সবাইকে বিদায় দেওয়া হোল। কিছুক্ষণ বাদে পাগলাবাবা আস্তে আস্তে সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠল। সেই রাত্রির মত মিকার ঘরেই পাগলাবাবার থাকবার ব্যবস্থা করা হোল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *