ছাব্বিশ
: তুমি এই জানালাটাকে এমন করে বন্ধ করে রাখ কেন শদরা?
: কেন রাখি, তা কি তুমি জানো না? জানালাটা খুললেই সেই হতভাগা নক্ষত্রটার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় যে। আমি যেখানেই যাই, ও আমার সঙ্গে সঙ্গে যাবে। ও আমাকে কিছুতেই ছাড়বে না!
: তুমি একটা পাগল। পাগল তুমি শদরা। এমনিতে এত সাহস, আর ওই নক্ষত্রটার দিকে তাকালে কী-যে তোমার হয়।
: সত্যি, আমি বুঝি না কেন-যে এত ভয় করে। হয়তো আমার বোকামি। যে-দিন থেকে জ্যোতিষীর মুখে শুনেছি যে, ওই নক্ষত্র আমার অশুভ ডেকে আনবে, সে দিন থেকে ওর দিকে তাকালে আমার বুকটা কেঁপে ওঠে। জান, কাল হঠাৎ ওর সঙ্গে একেবারে চোখাচোখি হয়ে গেল। ও মা, কি বিচ্ছিরি করে হাসল! মনে হোল, আমার দিকে চেয়ে যেন বলছে— “ওরে, বড় সুখের আশায় বাবিল ছেড়ে এখানে এসেছিস্ কিন্তু আমার হাত এড়াবি কি করে?” তখন বুকের মধ্যে কি-যে কাঁপুনি ধরল, আর থামেই না। তুমি ছিলে না কাছে, কে আমার ভয় ভাঙ্গাবে? শেষে তুমি যখন এলে, আমি তোমার বুকে আশ্রয় নিলাম। তবে আমার ভয় ভাঙ্গল।
: তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করব শদরা। যখন তোমার কাছে থাকি ভুলে যাই, শেষে দূরে চলে গেলে মনে পড়ে।
: কি এমন কথা গো!
: ও মাসে সেই কুয়োর ধারে জল আনতে গিয়ে যেই ব্যাপারটা ঘটেছিল—
: ও, তুমি আবার সেই পুরানো কথা নিয়ে এলে! তুমি এখনও সেই কথা মনের মধ্যে পুষে রেখেছ? এইজন্যই তো আমি তোমার কাছে কথাটা চেপে গিয়েছিলাম। না মিকা, ওসব কথা মনে করে তুমি দুঃখ পেও না।
: আরে না, না, দুঃখের কথা হচ্ছে না। আমি জানতে চাইছি, সে দিন তীরশথ যখন তোমাকে বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে গেলেন সে সময় তিনি তোমাকে কি বললেন?
: আমাকে? কই, কিছুই বললেন না।
: সে কি! কিছুই বললেন না?
: তেমন বিশেষ কিছু বলেন নি। ভিড়টা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবার পর শান্তিরক্ষকদের বিদায় দিয়ে তিনি আমাকে বললেন, “চলো, তোমাকে তোমাদের বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসি। আমি আগে আগে চলছিলাম, আর তিনি পেছন পেছন আসছিলেন। রাস্তার লোকজন আর আমাদের পাড়ার সবাই তাঁকে আমার সঙ্গে এ ভাবে আসতে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। বোধ হয় সেইজন্যই সে দিন থেকে আজ পর্যন্ত আমার উপর আর কোন উপদ্রব হয় নি। যখন বাড়ীতে এসে পৌঁছলাম, তিনি সোজাসুজি একবার আমার মুখের দিকে তাকালেন। কেমন করে যেন তাকালেন। আমি বললাম, তীরশথ, আমাদের এই গরীবের ঘরে দয়া করে একটু বসুন।
তিনি বললেন, না, আমাকে এখন যেতে হবে। বলেই তখনই চলে গেলেন। কি- যে হয়েছে, কিছুই বুঝলাম না। এ রকম তো আর তাঁকে কোন দিন দেখি নি। আচ্ছা, এ সব নিয়ে তোমার কাছে কোন কিছু বলেছেন তিনি?
: বলবেন কি করে! তার পরে তাঁর সঙ্গে আমার-যে আর দেখাই হয় নি
: সে কি! দেখা হয় নি? বলছ কি তুমি? কেন?
: তোমাকে কি বলি নি, তাঁর সঙ্গে আমাদের—মানে, হানানি আর আমার মতবিরোধ ঘটে গেছে?
: হ্যাঁ, সে কথা একবার বলেছিলে। কিন্তু মানুষের মানুষে এমন মতবিরোধ তো কতই ঘটে। তাই বলে সমস্ত সম্বন্ধ কি শেষ হয়ে যায়! আমাদের তিনি এত স্নেহ করতেন— না না, তুমি ভুল করছ মিকা, এ হতে পারে না। আমি-যে এ কথা ভাবতেই পারছি না। তোমরা তাঁকে ভুল বুঝেছ।
: কি করে ভুল বুঝব? এখানে তো ভুল বোঝার কোনই অবকাশ ছিল না। আর এ মতবিরোধ তো সাধারণ মতবিরোধ নয়। এ ব্যাপারে মাঝামাঝি আপোষের কোন পথ নেই। হয় এ দিক, নয় ও দিক।
: তাহলে—তাহলে তিনি নিজেই কি নিজেকে ভুল বোঝাচ্ছেন, নিজেই কি নিজেকে আঘাত করছেন? তিনি যদি সত্যসত্যই আমাদের উপর বিরূপ হবেন, তাহলে সে দিন আমাকে রক্ষা করবার জন্য অমন করে ছুটেই বা এলেন কেন?
মিকা একটু চিন্তা করে বলল, কে জানে, হয়তো বা তোমার আমার কথা মনে করে নয়, তীরশথের কর্তব্য মনে করেই তিনি তোমাকে ওদের হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য এসেছিলেন।
শদরা সংশয়-ভরা কণ্ঠে প্রশ্ন করল, তাই কি? আমি তবে তাঁর চোখে অমন দৃষ্টি দেখলাম কেন? আমি কি তবে ভুল দেখেছি?
: কি আশ্চর্য শদরা, এরই মধ্যে কেমন করে এত ভালবেসেছিলাম তাঁকে! আমি- যে তাঁর মধ্যে আমার পিতা, ভাই আর বন্ধুকে একাধারে পেয়ে গিয়েছিলাম। যেমন পথে চলতে চলতে হঠাৎ কুড়িয়ে পেয়েছিলাম, আবার হঠাৎ কেমন করে তাঁকে হারিয়ে ফেললাম।
: আর আমি, আমিই সেজন্য দায়ী! দুঃখ করো না মিকা, আমি তোমার সমস্ত পূর্ণ করে দেব।
মিকা বলল, আজ কি জানি কেন, আমার কেবলই থেকে থেকে বাবিলের সেই ফেলে আশা দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে। সেই দিনগুলো—যখন ক্যালদীয়ও ছিল না, ইহুদীও ছিল না, ছিল শুধু শদরা আর মিকা, আর—
: আর কল্লোলিনী কবার নদী, তাই না মিকা?
: ঠিক বলেছ। আমার মনে পড়ছে সেই দিনটির কথা যে-দিন আমার বাঁশীটা খুঁজে আনবার জন্য ফিরে গিয়েছিলাম ঘরে। আর তখন তোমাকে হঠাৎ সূর্যাস্তের রাঙা আলোয়—
: বাঁশীটা খুঁজে পেলে না, পেলে আমাকে। হ্যাঁ, সেদিন আমি আপনাকে নিজেই তুলে দিলাম তোমার হাতে। তবু লাজুক মিকা লজ্জায় মুখ নত করে রইল। আমি নির্লজ্জ, নিজের হাতে তোমার লজ্জার বাধন কেটে দিলাম। মনে পড়ে মিকা
: মনে পড়বে না? আরও মনে পড়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে কবারের তীরে বাইশী গাছটার আড়ালে হাতে হাত রেখে সমস্ত কথা হারিয়ে ফেলে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা। আমার কৈশোরের সেই ছোট্ট সঙ্গিনীটি কোথা থেকে এত ঐশ্বর্য নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল! তোমাকে গ্রহণ করব, এমন কি যোগ্যতা আমার আছে! তুমি নিজে থেকে কাছে এলে, কিন্তু আমার ভয় হোল, আমার স্পর্শে পাছে তুমি মলিন হয়ে যাও।
: আর আমি তোমার অবহেলা দেখে মনে মনে মরে যেতে লাগলাম। তার পর, তার পর কি মিকা?
: তার পর? তার পর এল ক্যালদীয় আর ইহুদী। তারা পরস্পর হানাহানি করতে লাগল। সেই সংঘাতে আমরা দু’জন ছিটকে পড়লাম।
: না মিকা, না, তুমি ভুল বলছ। তুমি ছিটকে পড়তে চাইলে, কিন্তু আমি তোমাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রইলাম। বলো মিকা, এ কথা কি সত্যি নয়?
: হ্যাঁ, সত্যি। কিন্তু কি সন্দেহ-সংশয়-সমস্যা-কণ্টকিত সেই দিনগুলো! তবু তার মধ্য দিয়ে চলতে চলতে কি এক অঘটন ঘটে গেল। ইহুদী ক্যালদীয়ার দরজায় এসে ঘা মারল। ক্যালদীয়া তার দরজা খুলে দিল। আর ইহুদী তাকে দু’হাতে বাড়িয়ে গ্রহণ করল। এ যেন এক রূপকথার কাহিনী! তেমনি বিচিত্র আর তেমনি রহস্যময়।
: হ্যাঁ, তুমি সে দিন স্বেচ্ছায় আর সাগ্রহে আমাকে বুকে টেনে নিলে। তোমার ওই ইহুদীর বহিরাবরণটা আর বাধা দিয়ে রাখতে পারল না।
: আর আমি তোমার স্নিগ্ধনীর সরোবরের বুকে অবগাহন করলাম।
: তার পর, মিকা, তার পর?
: তার পর আজ আমার আপন বলতে যা ছিল সব কিছু হারিয়ে রিক্ত হয়ে আবার তোমার কাছে ফিরে এসেছি। এবার তুমিই আবার আমাকে পূর্ণ করে তুলবে। আজ আমাদের মাঝে যা কিছু ব্যবধান ছিল, সব কেটে গেছে। আমি তোমার কত কাছে চলে এসেছি শদরা।
: হ্যাঁ, এত তাছে বুঝি আর কোন দিন আস নি।
: আমি অস্থির হয়ে ছুটে এসেছি।
: হ্যাঁ, আমি তোমার বুকের অশান্ত স্পন্দন অনুভব করছি। কি চাও, মিকা, বলো তুমি কি চাও?
: এক দিন কত কিছুই তো চেয়েছিলাম! যাদের চেয়েছিলাম, তাদের সবাই আমায় ঠেলে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আজ আর কিছুই চাই না, শুধু তোমাকে চাই, আর একটু শান্তি চাই। আমি বড় ক্লান্ত, একটু স্নিগ্ধ-সঞ্জীবিত হয়ে উঠতে চাই। আমার ভয় হয়, কাল প্রখর দিবালোকে আবার কোন্ কথা বলব কে জানে! হয়তো অশান্ত আর অস্থির মন নিয়ে দিগ্বিদিকে ছুটে বেড়াব। কিন্তু আজকের এই মুহূর্তে আমি আর কিছুই চাই না, চাই শুধু একখানি কুটির, সেখানে তুমি আর আমি, আর—
: আর? বলতে বলতে থেমে গেলে-যে মিকা? বলো, আর—
: আর? আর ফুলের মত একটি শিশু!
: মিকা, মুখ তোলো, আমার মুখের দিকে তাকাও। বল, সত্যি তুমি তাই চাও? তুমি চাও ফুলের মত একটি শিশু?
: চাই, শদরা, চাই—যার মধ্যে তুমি আর আমি এক দেহে বেঁচে থাকব।
: প্রিয় আমার, তবে তাই আমি তোমাকে দেব। আমি-যে আমার অতি নিভৃতে তাকে একটু একটু করে গড়ে তুলছি। আমি তোমাকে কোন কথা বলি নি। এই কথাটা তোমার কাছে বলবার জন্য সুন্দরতম মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
: শদরা—শদরা—বলছ কি! এ কি সত্য?
: হ্যাঁ মিকা, এ সত্য। সে আমার গর্ভে এসেছে। মিকা, এই-যে আমি উন্মুক্ত করে দিলাম আপনাকে। সংকোচ করো না, তুমি আর আমি কি আলাদা? এই-যে আমার এইখানে কান পেতে শোনো। শুনতে পাচ্ছ প্রাণের স্পন্দন!
এ কে? চেন না? এ-যে তুমি। এ-যে আমার ছোট্ট মিকা। আমার দেহ ছিঁড়ে ছিঁড়ে আমি তাকে রক্ত দিচ্ছি, মাংস দিচ্ছি, অস্থি দিচ্ছি—আমি তাকে তিল তিল করে গড়ে তুলছি। কি আশ্চর্য, আজ আমার বাইরেও তুমি, ভেতরেও তুমি—আমি তোমার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছি।
: শদরা!
: এই অসহ্য আনন্দ আমি আর চেপে রাখতে পারছি না। আনন্দের লাবণ্যে আমার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্লাবিত হয়ে চলেছে। মিকা, চেয়ে দেখো, আমার এই ছোট্ট মিকার ক্ষুধা মেটাবার জন্য আমার এই স্তনযুগল পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যখন সে পূর্ণাঙ্গ হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসবে, আমার দেহের রক্তকে দুধে পরিণত করে আমি তার মুখে তুলে দেব। আমার দেহের নির্যাস পান করিয়ে আমি তাকে একটু একটু করে বড় করে তুলব। কি আনন্দ! মিকা, বল, এবার তুমি তৃপ্ত হয়েছ তো?
দুয়ারে কে যেন ভীষণ জোরে করাঘাত করল। সেই শব্দে সমস্ত ঘরটা যেন কেঁপে উঠল। উঃ, এমন করে ঘা মারে কেন? ঘরটা কি ভেঙ্গে ফেলবে না কি?
স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল। শদরা সচকিত হয়ে আপনার বেশ-বাস সংযত করল। এমন করে কে ডাকছে! এমন অসময়ে কেউ তো আসে না!
শদরা বলল, মিকা, আমার কেমন যেন ভয় করছে। এত রাত্রিতে এ কে? আবার—আবার সেই করাঘাতের শব্দ।
দাঁড়াও, খুলছি—মিকা দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
: মিকা, দরজাটা খুলে দেবে! কে জানে কোন দুর্যোগ আসছে।
মিকা দরজা খুলে দিল। বাইরের অন্ধকারের পুঞ্জ ভেদ করে একটি দীর্ঘাকৃতি মূর্তি ঘরের মধ্যে এসে প্রবেশ করল। তাকে দেখে ওরা দু’জনেই চমকে উঠল।
তীরশথ! মিকা আর শদরা একই সঙ্গে বিস্ময়োক্তি করে উঠল। কিন্তু এই কি নেহেমিয়ার মুখ মনে হোল যেন তিনি কবরশয্যা ছেড়ে উঠে এসেছেন।
বসুন, বসুন তীরশথ। শদরা একটা উচ্চাসন এগিয়ে দিল।
: না, বসব না এখন।
কিন্তু এই কি নেহেমিয়ার কণ্ঠস্বর?
নেহেমিয়া ডাকলেন—শদরা!
শদরা লক্ষ করল, নেহেমিয়া এই প্রথমবারের মত তাকে ‘শদরা’ বলে ডাকলেন। সে তো তাঁর কাছে সব সময়ই দানিয়েল। এইটুকুতেই কেমন এক অজানা উদ্বেগে ওর বুকটা কেঁপে উঠল।
: শদরা, তোমার পিতা নারগেল শারেজের আচার্য ইষ্রার কাছে এই চিঠিখানা পাঠিয়েছেন। মুখ চিঠি আচার্য ইষ্রার হাতেই আছে। আমি তার একটা নকল নিয়ে এসেছি। নাও, তোমরা দু’জনে পড়ে দেখ।
‘বাবা!’ শদরার মুখ থেকে একটা কাতরোক্তি বেরিয়ে পড়ল।
ওরা দু’জনে ব্যগ্র হয়ে বাতির কাছে ঝুঁকে পড়ে চিঠিটা পড়তে লাগল। কিছুটা পড়তেই শদরা একটা অস্ফুট আর্তনাদ করে বাণবিদ্ধ পাখীর মত মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। মিকা পড়ে চলল। সে পড়ছিল, আর তার হাতের চিঠিটা কাঁপছিল, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সে পড়ে গেল। চিঠিতে লেখা ছিল :
আচাৰ্য ইষ্রা,
আমার কন্যা শদরা মিকার সঙ্গে বাবিল ছেড়ে চলে গিয়েছে। নিঃসন্দেহে তারা এখন জেরুজালেমে। ওদের দু’জনকে বলবেন, মিকা আমার পুত্র—য়িহুদিনীর গর্ভজাত পুত্র। কাজেই তার সঙ্গে কোন মতেই শদরার বিবাহ হতে পারে না। আর যদি ইতিমধ্যে বিবাহ হয়ে গিয়েও থাকে, তবে তা বিধিসংগত বলে গ্রাহ্য নয়। শদরাকে বলবেন, আপন ভ্রাতার সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে সে যেন আমাকে ও আমার পিতৃপুরুষের নরকস্থ না করে। যদি সে এখনও আমার কাছে ফিরে আসে, আমি তার সমস্ত অপরাধ মার্জনা করে তাকে আমার ঘরে তুলে নেব। আর সে যদি আমার এই নির্দেশ মান্য না করে, তবে তাকে বলবেন, তার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমার অভিশাপ তাকে তিলে তিলে দগ্ধ করে চলবে।
নারগেল শারেজের নীচেই নেহেমিয়ার নিজের হাতে লেখা অল্প কয়টি কথা— ব্যভিচারের অপরাধে প্রাণদণ্ডই একমাত্র দত্ত। যদি প্রাণে বাঁচতে চাও, অবিলম্বে এ দেশ ত্যাগ করে চলে যাও।
মিকার হাত থেকে চিঠিকা খসে পড়ে গেল। সে মাথা তুলে নেহেমিয়ার দিকে তাকাল। কিন্তু কোথায় নেহেমিয়া? এমন অলক্ষ্যে কেমন করে মিলিয়ে গেলেন? তবে কি—তবে কি সবই একটা দুঃস্বপ্ন মাত্র? তার পায়ের তলা থেকে মাটি ধসে পড়ছে, সামনে অন্ধকারের অতল গহ্বর। তবু তার মধ্যেও একটু ক্ষীণ আশা ঝিকিমিকি করে উঠল–হয়তো সবই একটা দুঃস্বপ্ন। কিন্তু না, না, ওই তো সেই বিষ-মাখা চিঠিটা ঘরের মেজের উপর বাতাসে লুটোপুটি খাচ্ছে। ওই-যে দরজাটা হাঁ করে আছে, যে-পথ দিয়ে নেহেমিয়া এসেছিলেন। আর ওই ওখানে কে অমন করে ছিন্ন লতার মত লুটিয়ে পড়ে আছে? কে ও, শদরা না? হ্যাঁ, শদরাই তো। তবে তো এ স্বপ্ন নয়। মিকা কেমন আচ্ছন্নের মত যেমন বসে ছিল তেমনি বসে রইল। সমস্ত চিন্তা যেন গুলিয়ে আসছে। জাল জাল জাল চার দিকেই জাল। এই জাল থেকে বেরিয়ে যাবার কোন পথ নেই, শিকারীরা চার দিক দিয়ে ঘেরাও করে ফেলেছে।
রাত্রি বেড়ে চলল। গুরুভার প্রহরগুলো ওদের বুকের উপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চলেছ। উঃ, দম বন্ধ হয়ে আসছে যে! সমস্ত পৃথিবী দিনের কর্মক্লান্তি শেষে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। শুধু ওদের দু’জনের চোখে ঘুম নেই। মাঝে মাঝে প্রহর-ঘোষণাকারী পশু আর পাখীরা ডেকে ডেকে উঠছে। ঘুম নেই চোখে, অসহ্য জ্বালা। তবু ভালো, তবু এই রাত্রি যেন তাদের কাছে চিররাত্রি হয়ে থাকে। এ রাত্রি যেন আর প্রভাত না হয়। আগামী দিনের আলোকোজ্জ্বল প্রভাতে সকলের কৌতূহলী দৃষ্টির সামনে কেমন করে ওরা মুখ তুলে দাঁড়াবে? আর ভাবতে পারে না মিকা। কিন্তু ভাবনা-যে বাধা মানে না। অবাধ্য ভাবনাগুলো মাছির মত ঘুরে ঘুরে উড়ে এসে বসে। কোন্ জায়গা থেকে ভাবতে শুরু করবে সে, সমস্তই-যে জট পাকিয়ে যাচ্ছে। এ ভাবনা কোন্ পথ দিয়ে চলবে? এর অন্ত কোথায়?
রাত্রিশেষের ঠাণ্ডা হাওয়া ঘরের মধ্যে এসে ঢুকল। মিকা চমকে উঠল—কে যেন তার মাথার উপর হাত রেখেছে। কে? এ কি তার সেই কলঙ্কিনী য়িহুদিনী মা? চোখ মেলে চেয়ে দেখল—শদরা। কিন্তু যে শদরাকে চিনত, এ তো সেই শদরা নয়। আহা, এক রাত্রির মধ্যে অমন ফুটন্ত ফুলটি কেমন করে শুকিয়ে গেল! যেন এখনই ঝরে পড়বে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনটা কেঁদে উঠল। ডাকল—শদরা!
শদরা কোন উত্তর দিল না, উপুড় হয়ে ভেঙ্গে পড়ল। আর ফুলে ফুলে কি কান্নাই- যে কাঁদতে লাগল! সারা রাতভর একটু কান্নাও কাঁদতে পারে নি। শুকিয়ে কাঠ হয়ে ছিল। এবার নামল বর্ষণ।
