পাপের সন্তান – ১৫

পনেরো

খবর যেন বাতাসের আগে ছড়িয়ে পড়ে। চারদিকে থেকে ইহুদীরা দলে দলে আসছে। যাহুদা, রামা, বিন্নামিন, ইফরায়েম, শমরিয়া আরও পার্শ্ববর্তী নানা অঞ্চলে যে-সমস্ত ইহুদী বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিল, তারা পুজোর বলি বহন করে নিয়ে এসে উৎসর্গ করে প্রভুর মন্দিরে। আর নেহেমিয়াকে ঘিরে ভিত করে দাঁড়ায়। তারা যে-সব কথা শুনেছে, তা কি সত্যি? সত্যিই কি তবে নির্বাসিত ইহুদীরা আবার তাদের স্বদেশে ফিরে আসছে? প্রভুর নগরী কি আবার তার গর্বোন্নত শির তুলে দাঁড়াবে?

নেহেমিয়া তাদের আশ্বাস দেন। কিন্তু লোকগুলো পুরোপুরি ভরসা পায় না। কত বার এই-রকম কত জনরব তারা শুনেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিদেশী রাজভৃত্য আর প্রতিবেশী পরাজাতীয়দের ষড়যন্ত্রে সব কিছুই ব্যর্থ হয়ে গেছে। ওরা পারস্যরাজাকে চারদিক দিয়ে এমনভাবে ঘিরে থাকে যে, হতভাগ্য ইহুদীদের কান্না সেখানে গিয়ে পৌঁছতে পারে না।

তাদের কাছ থেকে খবর পাওয়া গেল, হরোনীয় সনবল্লাট আর আমোনীয় দাস টোবিয়ার দল চুপ করে বসে নেই। তারা ইহুদীদের মধ্যে বলে বেড়াচ্ছে— নেহেমিয়ার কথায় বুঝি খুব নেচে উঠেছ তোমরা? একটা সামান্য পানপাত্র-বাহক, তার কথার মূল্য কি? সম্রাট তাকে তীরশথ নিযুক্ত করেছেন? রাজরাজড়ারা খেয়ালের ঝোঁকে এমন অনেক কিছু করেন। কিন্তু দু’দিন বাদেই, দেখ না ওর অবস্থা কি দাঁড়ায়! ও তো সামান্য একটা পিঁপড়ে মাত্র, পাখা গজিয়ে পাখী হয়ে উড়তে চাইছে। ওর আয়ু আর ক’দিনের!

জেরুজালেমের ইহুদীরাও ওদের এই সমস্ত কথা শুনে কিছুটা যেন মুষড়ে পড়েছে। নেহেমিয়া সেটা অনুভব করতে পারলেন। বিশেষ করে উপরতলার লোকেরা কেমন যেন টলমল করে উঠছে। খোলাখুলি মুখে কিছু বলে না। কিন্তু ভাবভঙ্গীটা যেন কেমন কেমন। নেহেমিয়ার কাছে খবর আসছে, সনবল্লাটের চরেরা জেরুজালেমের ইহুদীদের মধ্যে নিঃশব্দ পদসঞ্চার করে ফিরছে, আর হতাশার বীজ ছড়িয়ে চলছে। আর একদিন সংবাদ পাওয়া গেল, টোবিয়া সশরীরে এসেছিল, এই জেরুজালেমের বুকে দুদিন কাটিয়ে গিয়েছে। সে নাকি কয়েকজন ইহুদীপ্রধান যাজক ও নবীকে ডাকিয়ে গোপনে কি সব আলোচনা করে গেছে। কিন্তু তীরশথ নেহেমিয়াকে তারা সংবাদ দেয় নি। আর যারা সেই গোপন সভায় উপস্থিত ছিল তারাও নেহেমিয়ার কাছে ভাল মন্দ কোন কথা বলল না।

নেহেমিয়ার বুঝতে বাকী রইল না, প্রথম দিনের উৎসাহের প্রাবল্য দেখে তাঁর কাজ তিনি যতটা সহজ বলে মনে করেছিলেন, আসলে তা তত সহজ নয়। সুসান বহু দূর, সনবল্লাট আর টোবিয়া বুকের উপর দাঁড়িয়ে আছে। নানা দিক থেকে যে-সমস্ত সংবাদ আসছে, তাতে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, জেরুজালেমের ইহুদী সমাজকে যে-দুর্ভেদ্য দুর্গ বলে তিনি মনে করেছিলেন, তার মধ্যে বহু ফাটল রয়েছে। আর শত্রুর চরেরা অবাধে তার মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করছে। কিন্তু নেহেমিয়ার আরও অনেক কিছু জানবার বাকী ছিল। একটু একটু করে আসল ছবিটা তাঁর চোখের সামনে ফুটে উঠতে লাগল।

এ বিষয়ে আর সন্দেহ রইল না যে, নগরী গড়ে তোলবার কাজে হাত দেওয়া মাত্রই চারদিক থেকে ভীষণ প্রতিরোধ দেখা দেবে। নেহেমিয়া বললেন, সেজন্য ভাবলে চলবে না। মৌচাক থেকে মধু আহরণ করতে হলে মধুমক্ষিকাদের আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়েই নিতে হবে। বাধা যত আসুক, আমরা ভয় পেয়ে পিছোব না!

তাঁর অত্যন্ত বিশ্বস্ত জনাকয়েক সহকর্মীকে নিয়ে তিনি পরামর্শ করতে বসেছিলেন। এই পরামর্শ সভায় মিকাও স্থান পেয়েছিল। স্থানীয়দের মধ্যে হানানি এবং আরও পাঁচ- সাতজন লোক ছিল।

আলোচনার মধ্য দিয়ে একটা কথা জানা গেল, প্রতিবেশী বিভিন্ন জাতিগুলোর নিজেদের মধ্যে ঝগড়াবিবাদ যতই থাকুক না কেন, ইহুদীদের সম্পর্কে সবাই সমান জাতক্রোধ। জেরুজালেম ও যাহুদা আবার তাদের পূর্ব মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হোক, এটা কারু কাছেই কাম্য নয়। ইহুদীদের এই চেষ্টা ব্যর্থ করবার জন্য তারা নিজেদের বংশপরম্পরাগত পারস্পরিক ভেদ বিভেদ সাময়িকভাবে চাপা দিয়ে রাখতে প্রস্তুত আছে।

প্রশ্নটা নেহেমিয়াকে ভাবিয়ে তুলেছে। এ তো শুধু সনবল্লাট আর টোবিয়ার প্রচারকার্য নয়, এতগুলো জাতি সবাই একজোট হয়ে এই দুর্ভাগা ইহুদীদের বিরুদ্ধে বেঁকে দাঁড়ায় কেন? আর এ তো শুধু আজই নয়, ইতিহাসও এই একই কথা বলে। আর তাঁর নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও তাই। যাহুদায় এসে প্রবেশ করবার পর থেকেই এ জিনিসটা তাঁর নজরে এসেছে।

এখানকার ইহুদীদের জিজ্ঞেস করলে বলে, পরজাতীয়দের মন হিংসায় ভরা, ওরা য়িহুদিদের দেখতে পারে না। এই উত্তরটা কিন্তু সন্তোষজনক বলে মনে হয় না। তবে কি একমাত্র ইহুদীরা ছাড়া আর যত জাতি আছে, তারা সবাই বিদ্বেষপরায়ণ, সবাই হিংসুক? নেহেমিয়ার জীবনের অধিকাংশ ভাগ ইহুদী সমাজের বাইরে কেটেছে। বহু পরাজাতীয়ের সঙ্গে তাঁকে চলাফেরা করতে হয়েছে, ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে হয়েছে, ইহুদী সমাজের বাইরের লোকদের সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা তাঁর আছে। সেইজন্য এই প্রশ্নের এই উত্তর তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারে নি।

আর এইটাই যদি সত্য হয়, তবে এই বিক্ষুব্ধ সমুদ্র তরঙ্গে অবিচ্ছিন্ন আক্রমণের মুখে যাহুদার ক্ষুদ্র দ্বীপখণ্ড কদিনই বা টিকে থাকতে পারবে!

কিন্তু সমস্যা শুধু এইটাই নয়, আরও আছে। ইহুদী সমাজে নিজেদের মধ্যেও চূড়ান্ত দুর্বলতা। হানানি বলল,

: যাহুদা আর জেরুজালেমের অনেক ইহুদীর উপর টোবিয়ার যথেষ্ট প্রভাব আছে। এই প্রদেশের অনেক ইহুদী তার প্রতি আনুগত্যসম্পন্ন। তার কারণ, সে ইহুদীপ্রধান আরার পুত্র ইহুদী-প্রধান শেকানিয়ার জামাতা। তা ছাড়া তার ছেলে যোহান ইহুদীপ্রধান বেরেকিয়ার পুত্র মেশুল্লমের মেয়েকে বিয়ে করেছে। আমি সংবাদ পেয়েছি, যাহুদার ইহুদীপ্রধানদের সঙ্গে টোবিয়ার ঘন ঘন পরামর্শ চলেছে।

নেহেমিয়া ভ্রূ কুঞ্চিত করে বললেন, আপনারা কি মনে করেন, এই বৈবাহিক সম্পর্কের ফলেই এই সমস্ত ইহুদী নেতা টোবিয়ার প্রতি এমন অনুরক্ত? আর তার জন্যই এই সমস্ত ইহুদী নেতা ইহুদীদের স্বার্থের বিরুদ্ধে টোবিয়ার সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়েছে?

অপর একজন বললেন : বন্ধু হানানি যে-কথা বলেছেন, তা মিথ্যে নয়। কিন্তু আমাদের বিবেচনায় এই রহস্যের মূল রয়েছে আরও গভীরে। এ কথা আজ আর গোপন নেই যে, আমাদের উপরতলার ইহুদী নেতাদের মধ্যে অনেকেই আপন আপন স্বার্থ হাসিল করবার ব্যাপারে সনবল্লাট আর টোবিয়ার মত বিশিষ্ট রাজভৃত্যদের সঙ্গে বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট। উভয় পক্ষই একে অপরের পক্ষে প্রয়োজনীয় এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করবার জন্য একজনের সাথে আর একজনের হাত মেলাতে কোন অসুবিধা হয় না।

মিকা যেন কিছু বলবার জন্য উসখুস করছিল। নেহেমিয়া বুঝলেন।

: তুমি কিছু বলতে চাও মিকা? বলো, বলো, কি বলবে বলো।

: আমি ওদের পল্লীতে গিয়েছিলাম।

নেহেমিয়া হেসে বললেন : হ্যাঁ, আমি তা জানি। জেরুজালেমে আসবার পর থেকে তুমি ও-পাড়ায় খুবই যাতায়াত করছ। কি ব্যাপার, বলো দেখি?

: ওদের পাড়া? ওদের পাড়া মানে?— শলুম প্রশ্ন করল।

মিকা উত্তর দিল : গরীব ইহুদীদের পাড়ায়। ওই বস্তিগুলোতে।

শলুম যেন আঁতকে উঠল : বলেন কি? ওই নোংরা বস্তির মধ্যে? ভ্রাতা মিকা, আপনার তরুণ বয়স, ও-দিকে বেশী ঘোরাঘুরি করবেন না। পাড়াটার কিন্তু বেশ বদনাম আছে!

কিসের বদনাম? তীক্ষ্ণ কণ্ঠে প্রশ্ন করল মিকা।

শলুম রসালো হাসি হেসে বলল : সব কথা সব জায়গায় বলা যায় না। আচ্ছা থাক, সে কথা বাদই দিলাম। কিন্তু ব্যাটাদের আচার ব্যবহার ধর্ম কর্ম বলতে আছে কিছু? ওদের দেহও অপবিত্র, মনও অপবিত্র। ওদের গায়ের বাতাস লাগলে স্নান করে শুদ্ধ হতে হয়। নেহেমিয়া দেখলে, মিকার, মুখের ভাব উত্তেজিত। এই দৃশ্যের উপর যবনিকাপাত করে দিয়ে তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বললেন,

: এ সব কথা এখন কেন? ভ্রাতা শলুম, আমাদের বর্তমান আলোচনার সঙ্গে এ সব কথার কি সম্বন্ধ আছে? মিকা, তুমি কি বলছিলে, তাই বলো।

শলুম অপ্রসন্ন মুখে বসে রইল।

মিকা বলল, ওরা যে-সব কথা বলল, আমি শুনে অবাক হয়ে গেলাম। যে-ক’জন ইহুদী প্রধান টোবিয়ার গোপন বৈঠকে যোগ দিয়েছে বলে আমরা খবর পেয়েছি, তাদের কীর্তি কাহিনী সম্বন্ধে অনেক কথাই ওরা আমাকে বলেছে। সব কথা জিজ্ঞাসা করতে আমার প্রবৃত্তি হয় নি। ইহুদী-যে ইহুদীর উপর এ রকম অত্যাচার করতে পারে, এ কথা কেমন করেই বা বিশ্বাস করব?

নেহেমিয়া বললেন : মিকা, তোমার বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা এখন রাখো। ওরা কি বলেছে, তাই বলো।

: ওরা বলল, এরা নাকি সনবল্লাট আর টোবিয়ার কথায় ওঠে বসে। নানাভাবে ওরা এদের হাত করে রেখেছে। এই সমস্ত ইহুদী সুদখোর নাকি সুদের দায়ে এদের জমিজমা ভিটেমাটি দখল করে ওদের ক্রীতদাস, ভূমিদাস আর নিঃসম্বল পথে ভিখারী করে ছেড়েছে। আচ্ছা, এ সব কি বিশ্বাস করবার মত কথা? ইহুদী হয়ে ইহুদীকে—

: আঃ মিকা, ও কথা রাখ। এখন বলো, নগরী গড়ে তোলবার ব্যাপারে ওদের উৎসাহ কি-রকম দেখলে? মনে রেখো, আজকের দিনে এরাই আমাদের বড় ভরসা। ওরা-যে শ্রমজীবী। ওরাই শুধু গড়ে তুলতে পারে। আর কেউ তা পারে না।

: তীরশথ, সে এক ভারী মজার কথা। ওদের এক বুড়ী মা আছে। তাকে ওরা ভারী ভক্তি শ্রদ্ধা করে। আমরা যেদিন এলাম, তার আগেকার রাত্রিতে সে নাকি স্বপ্ন দেখেছিল, যিহোবার আদেশে জেরুজালেমে এক ফেরেশতা নাকি আসছে। সে এলে পরে এই নগরী আবার গড়ে উঠবে, ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে নগরীর প্রাচীর আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে। সে এলে পরেই নাকি জেরুজালেমের গরীব ইহুদীদের দুঃখের দিন ঘুচবে। আর ওরা সবাই বলাবলি করছে, তীরশথই নাকি সেই ফেরেশতা, যিহোবাই তাঁকে পাঠিয়েছেন। আমায় পেয়ে সবাই উল্লসিত হয়ে উঠল, আমাকে ঘিরে ধরে বলল—বলো, কবে আমরা আমাদের প্রাচীর গড়ে তুলব, নগরীর পথ ঘাট বানাব?

নেহেমিয়া কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ভাবাবেশে তাঁর চোখ দু’টি নিমীলিত হয়ে গেল। তারপর যখন চোখ মেললেন, মিকার মনে হোল, সে চোখ যেন কোন অপার্থিব আলোয় দীপ্ত হয়ে উঠেছে। নেহেমিয়া বললেন, বুড়ী মা সত্য কথাই বলেছেন। যিহোবার আদেশ ছাড়া গাছের একটি পাতাও গজাতে পারে না। আজ যিহোবার আদেশ হয়েছে, তাই তো আমরা এসেছি। যিহোবা আজ ইহুদীদের উপর প্রসন্ন। জেরুজালেম নগরী গড়ে উঠবেই। কেউ তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। ভ্রাতৃগণ, আপনারা আমার নাম করে জেরুজালেমের ইহুদী সমাজে প্রচার করতে থাকুন, আগামী অর মাসের প্রথম পুণ্যাহ থেকে আমরা আমাদের প্রাচীর গেঁথে তোলবার কাজ শুরু করে দেব।

একজন একটু ইতস্তত করে বললেন, কিন্তু তীরশথ, আমার মনে হয়, বাবিল থেকে আমাদের নির্বাসিত ইহুদী ভাইয়েরা ফিরে এলে পর এ কাজে হাত দিলে ভাল হোত। আমাদের শক্তি তখন অনেক বেড়ে যাবে।

নেহেমিয়া মাথা নেড়ে বললেন, না, আমরা তো দুর্বল নই। শক্তি এখনও আমাদের প্রচুর। অবস্থা আমাদের অনুকূলে। দু চারজন মোড়ল গোছের লোক যদি ওদের পক্ষে যোগ দেয়, তবে এক দল ইহুদীকে তারা খসিয়ে নিতে পারবে সন্দেহ নেই। হয়তো তারা আমাদের কাজে সহযোগিতা করবে না। হয়তো তারা গোপনে প্রতিপক্ষকে সাহায্য করবে। কিন্তু তারা প্রকাশ্যে আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি না। সেইজন্যই সনবল্লাট আর টোবিয়ার দল মুখে যতই দত্ত আর তর্জন গর্জন করুক না কেন, নিজেরা সোজাসুজি এসে আক্রমণ করবে না।

একজন একটু সন্দেহের সুরে প্রশ্ন তুলল : আপনি কি মনে করেন ওরা চুপ করে সব দেখবে, কোন কথা বলবে না? তাই যদি হবে, তবে এত গোপন শলাপরামর্শ, এত আয়োজন আর এমন ব্যাপকভাবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে কেন?

নেহেমিয়া উত্তর দিলেন, না, ওরা চুপ করে বসে থাকবে, এমন কথা আমি চলছি না। ওরা এখন শক্তি সংগ্রহ করছে। ওরা আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার করে অন্যান্য জাতিকে ক্ষেপিয়ে তুলতে চাইছে। ওদের যদি আমরা সময় দিই, আর সেই সময়ের মধ্যে ওরা যদি ওদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে নিতে পারে, তবে চতুর্দিকের মিলিত প্রতিরোধের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমাদের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে। আর ওরাও সুযোগ পেয়ে সম্রাটকে দেখাবে যে, আমাদের দাবী পূর্ণ করার অর্থ অন্যান্য অধীন জাতিকে বিদ্রোহের মুখে ঠেলে দেওয়া। এইভাবেই ওরা সম্রাটের উপর চাপ সৃষ্টি করবে। কিন্তু আমরা ওদের একটুও সময় দেব না। এ হচ্ছে কি জানো, দৌড়ের প্রতিযোগিতা, কে আগে গিয়ে পৌঁছতে পারে। আমরা যদি দ্রুত গতিতে আমাদের প্রাচীর তোলবার কাজ একবার সুসম্পন্ন করে ফেলতে পারি, তার পর থেকে ভেঙ্গে ফেলবার আদেশ দেওয়া সহজ-সাধ্য হবে না। আমাদের মন্দির তোলবার ব্যাপারে কি ওরা কম বাধা দিয়েছিলো? সমস্ত বাধা অগ্রাহ্য করে মন্দির যখন একবার গড়ে উঠল, তখন আর তার উপর আঘাত করা ওদের পক্ষে সম্ভব হয় নি 1

মিকা বলল, কিন্তু সম্রাট যখন স্বেচ্ছায় অনুমতি দিয়েছেন, তখন তিনি আবার তা প্রত্যাহার করে নিতে পারেন, এ ভয় আমরা কেন করছি? সম্রাট যদি সহায় থাকেন, পরজাতীয়েরা আমাদের কিই বা করতে পারে? তারাও কি আমাদের মতই পারস্যরাজের আজ্ঞাবহ নয়?

: তুমি একটা কথা ভুলে যাচ্ছ মিকা, সুসান বহু দূরে, আর পরজাতীয়েরা আমাদের ঘেরাও করে রেখেছে। তবে আমাদের বিরুদ্ধে ওরা এখনও জোট বাঁধে নি, সেইখানেই আমাদের সুযোগ। কিন্তু চতুর্দিকের নদীগুলো যদি একবার মিলিত হয়ে সমুদ্রে পরিণত হয়ে যায়, তবে কি করে তুমি তাকে ঠেকাবে? আরও একটা কথা মনে রেখো, সম্রাটের মতি অপরিবর্তনীয় নয়। এ শুধু আমার কল্পনা নয়, এই জেরুজালেমের ভাগ্য নিয়ে ইতিপূর্বে এরকম ঘটনা ঘটেছে। আমাদের প্রতিপক্ষ চুপ করে বসে নেই। তারা আমাদের বিরুদ্ধে সম্রাট ও মন্ত্রীদের মন বিষিয়ে তোলবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। আর মন্ত্রীদের মন যদি তারা কোন মতে ভাঙ্গিয়ে নিতে পারে, তাহলে সম্রাট কি ঠিক থাকতে পারবেন? মন্ত্রীদের বাদ দিয়ে সম্রাট চলতে পারেন না। কাজেই যত তাড়াতাড়ি পারা যায় আমাদের কাজ শেষ করে ফেলা চাই। এই দৌড়ের প্রতিযোগিতার পাল্লায় সনবল্লাট আর টোবিয়ার দল যেন আমাদের হারিয়ে দিতে না পারে।

ঠিক এই সময় পত্রবাহক মারফৎ একখানা পত্র এসে পৌঁছল। পত্রটি নেহেমিয়ার উদ্দেশে লিখিত। পত্র-পাঠ শেষ করে নেহেমিয়া একটু চিন্তিতভাবে ভ্রূ কুঞ্চিত করলেন। সবাই কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাল।

: টোবিয়ার পত্র। তোমরা সবাই শোন।

“তীরশথ নেহেমিয়া,

অধ্যক্ষ নবল্লাটের আদেশক্রমে আমি আপনাকে জানাচ্ছি যে, আপনি অত্যন্ত বিপজ্জনক পথে পা বাড়িয়েছেন। জেরুজালেমের পুনর্গঠনের ব্যাপারে আমরা প্রথমেই আপনাকে সতর্ক করেছিলাম। কিন্তু আমাদের কাছে নানা সূত্রে খবর আসছে যে, আপনি সেই বন্ধু-সুলভ উপদেশে কর্ণপাত না করে নগরীর পুনর্গঠনের জন্য ইহুদী সম্প্রদায়কে উসকানি দিয়ে চলেছেন। জেরুজালেম আবার প্রাচীর-পরিবৃত নগরী হয়ে প্রাচীন দিনের মতই প্রতিবেশীদের শান্তির বিঘ্নকারী হয়ে দাঁড়াক, এতদঞ্চলের কোন জাতির পক্ষেই তা কাম্য হতে পারে না। সমস্ত দিক বিবেচনা করে যাহুদার ধর্মপ্রাণ ইহুদীরাও এর সমর্থক নয়। আমরা তাদের মুখেই শুনেছি যে, আপনাদের পাপের ফলেই জেরুজালেম নগরী বিধ্বস্ত হয়েছিল। এ নাকি আপনাদের দেবতা যিহোবার ই বিধান। তবে আপনিই বা তাঁর এই বিধানের বিরুদ্ধে মাথা তুলতে চাইছেন কেন?

আপনি আগুন নিয়ে খেলা করতে যাবেন না। আমরা আপনাকে এ কথা জানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন বোধ করছি যে, আপনি যদি আপনার এই অশুভ পরিকল্পনা বন্ধ না করেন, তবে ব্যক্তিগতভাবে আপনার পক্ষে ও সম্প্রদায়গতভাবে ইহুদীদের পক্ষে তার পরিণাম শুভ হবে না। সর্বশেষে এই প্রসঙ্গে আপনাকে আরও একটা কথা জানিয়ে দিচ্ছি, আমরা যা আশা করেছিলাম, তাই ঘটেছে। আমরা বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারলাম সম্রাট সমস্ত দিক বিবেচনা করে তাঁর পূর্বতন অনুমতি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। শীঘ্রই সরকারী সূত্রে আপনার কাছে এই মর্মে রাজকীয় আদেশ এসে পৌঁছবে। অতএব আমরা আশা করতে পারি, আপনি এর পর আপনার এই শঠতামূলক কাজ থেকে নিবৃত্ত হবেন। অন্যথা আপনাকে রাজদ্রোহের দায়ে অভিযুক্ত হতে হবে।”

কতক্ষণ কেউ কোন কথা বলল না। অবশেষে একজন নিঃশব্দতা ভেঙ্গে বলল,

: তীরশথ, এইমাত্র আপনি বলছিলেন যে, সম্রাট হয়তো চাপে পড়ে অনুমতি প্রত্যাহার করে নিতেও পারেন। কিন্তু সেই কথা-যে এমন সঙ্গে সঙ্গেই সত্য বলে প্রমাণিত হবে, কেই বা একথা ভাবতে পেরেছিলো!

মিকা মাথা তুলে বলল, না, এ কথা আমার বিশ্বাস হয় না। অনুমতি প্রত্যাহারের কথাটা সম্পূর্ণভাবে টোবিয়ার নিজস্ব রচনা।

: কেন, তোমার এ কথা মনে হোল কেন? নেহেমিয়া জিজ্ঞাসা করলেন।

: সুসান থেকে যাহুদা বহু দূরে। সেখান থেকে কোন ঘোড়-সওয়ার এত শীঘ্র এখানে এসে পৌঁছতে পারে না। কাজেই সম্রাট যদি শেষ পর্যন্ত তাঁর মতি পরিবর্তনও করে থাকেন, তবুও সে খবর এত শীঘ্র এখানে আসতে পারে না।

ঠিক বলেছ মিকা, নেহেমিয়া মিকার পিঠা চাপড়ে দিয়ে বললেন, আরও একটা কথা আছে, ওরা যদি সত্য সত্যই এ রকম কোন সংবাদ পেয়ে থাকত, তাহলে অনুমতি প্রত্যাহারের কথাটা পত্রের সর্বনিম্নে থাকত না, পত্রের সর্বোচ্চই স্থান পেত, তা ছাড়া চিঠির সুরই থাকতো আলাদা।

একটু স্বস্তি যেন ফিরে এল সবার মনে। একটা ‘কিন্তু’ তবুও থেকে থেকে খোঁচা মারতে লাগল, কি জানি যদিই বা–

নেহেমিয়া বললেন, অবস্থা গুরুতর। আমরা যা মনে করেছি, প্রতিপক্ষ তার চেয়ে অনেক বেশী উদ্যোগ নিয়েছে। যত মিথ্যেই হোক না কেন, এ সংবাদটা যদি একবার লোকের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে, তবে তার ফল হবে মারাত্মক! একদিকে ইহুদীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে, অন্যদিকে পরজাতীয়দের উৎসাহও বহুগুণ বেড়ে যাবে। ওরা এই চিঠি লিখবার আগে থেকেই যাহুদার ইহুদীদের মধ্যে এই প্রচার-কার্য শুরু করে দিয়েছে। এমনিতেই ওদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ছে। তার উপর এই প্রচার যদি ওরা ভালোমত চালাতে পারে, তাহলে যাহুদা থেকে কোন সাহায্য পাওয়া আমাদের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে। কারণ তাদের সঙ্গে আমাদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই।

হানানি তাঁর কথার সমর্থন করে বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন তীরশথ। যাহুদার ইহুদীদের এমনিতেই টোবিয়ার নামে আতঙ্ক, তার উপর সম্রাটের নিষেধাজ্ঞার কথা যদি তাদের কানে যায়, তাহলে তারা নড়তেও চাইবে না। কিন্তু এখন আমরা কি করব তীরশথ?

: আমাদের গতিবেগ আরও বাড়িয়ে দিতে হবে। আমার ভয় হচ্ছে দৌড়ের প্রতিযোগিতায় আমরা ওদের চেয়ে এক কদম পিছিয়ে পড়েছি। এখন চাই দ্রুততা। এই মুহূর্তে যে ঢিলেমি দেখাবে, সেই মরবে। একটু আগেই যে-কথা মনে করেছিলাম, সে কথা বাতিল করে দিতে হোল। আর মাসের প্রথম পুণ্যাহে নয়, কাল বাদে পরশু থেকে আমরা প্রাচীর গাঁথার কাজ শুরু করব।

পরশু! আপনি বলেন কি! সে কি সম্ভব? – দু-তিন জন এক সঙ্গে বলে উঠল।

: হ্যাঁ, সম্ভব, পরশুই সম্ভব। কেন নয়? আমরা প্রমাণ করব, পরশুই সম্ভব। আমি আজ জেরুজালেমের ইহুদীপ্রধানদের সঙ্গে মিলব, কাল মন্দিরপ্রাঙ্গণে ছোট বড় সমস্ত ইহুদী ভাইয়েরা একত্র হয়ে আমাদের কাজ বুঝে নেব, আর পরশু সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কাজ শুরু হয়ে যাবে। হ্যাঁ, এক কদম পিছিয়ে থেকে নয়, আমাদের দশ কদম এগিয়ে চলতে হবে।

মিকা অবাক হয়ে শুনছিল নেহেমিয়ার কথা। লোকটা কি যাদু জানে? প্রতিটি কথার মধ্যে কি করে এমন জোর ঢেলে দেয় যা সহকর্মীদের মনকে বিশ্বাস ও উৎসাহে পূর্ণ করে তোলে। একটু আগেই যে-হতাশা ও অবসাদের ভাব দেখা গিয়েছিল, মুহূর্তের মধ্যে তা মিলিয়ে গেল, যেন মেঘ কেটে গিয়ে স্বচ্ছ হয়ে উঠল আকাশ।

নেহেমিয়া বলছিলেন, এই সংগ্রামে যিহোবা আমাদের সেনাপতি। আমরা কাকে ভয় করব? না, আর ভয় নেই। মিকা ভাবল, ওদের বুড়ী মা যে-স্বপ্ন দেখেছিল, বুঝি তা মিথ্যে নয়, বুঝি নেহেমিয়ার মধ্য দিয়েই তাঁর ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন যিহোবা।

: লোক ঠিক করো হানানি, পাঁচজন বিশ্বস্ত ও দ্রুতগামী লোক। ঘোড়সওয়ার যদি যোগাড় করতে পার সবচেয়ে ভালো হয়। কাল সকালে যাহুদার ইহুদীপ্রধানদের কাছে আমার পত্র বহন করে নিয়ে যাবে। আর মিকা, শোন, তোমার কাজ আছে—অনেক কাজ। জাতির সেবা করতে এসেছিলে, সেই সুযোগ আজ এসেছে। নেমে পড়ো কাজে, না নেমে নয়, ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। তৈরী আছো তো?

: আমি সব সময়ই তৈরী, আমি তো কাজই চাই তীরশথ। আমাকে বসিয়ে রাখবেন না। আমি কি করব বলুন।

: না, কাউকে বসে থাকতে হবে না। আর তুমি তো আমার বলবার অপেক্ষা রাখো নি। যে-জায়গা তুমি আপনা থেকে বেছে নিয়েছ, সেইখানেই তোমার কাজ। গরীব ইহুদীদের বস্তিতে যাও, তাদের কাজের মধ্যে টেনে নিয়ে এসো। বাইরের সাহায্যের কথা ভুলে যাও। জেরুজালেমের ইহুদীরা নিজেরাই জেরুজালেমকে গড়ে তুলবে। আর মনে রেখো, আমাদের এই কাজে এই গরীব শ্রমজীবীরাই আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। তাদের বোলো, বুড়ী মার স্বপ্ন সফল হবেই হবে। আর সেই স্বপ্ন আমরাই সফল করে তুলব।

মিকা আজ সুখী। আবেগে তার মন পূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতির কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করার জন্য সে আজ অধীর। নেহেমিয়া বলেছেন, হয়তো এই সংগ্রামে বহু প্রাণ বলি দিতে হতে পারে। মিকা ভয় করে না, মিকা সেজন্য প্রস্তুত আছে। তার এতদিনের স্বপ্ন দেখা এইবার কি তবে সফল হতে চলেছে?

কিন্তু শদরা? শদরা এখন কি করছে? কি ভাবছে? একলা বসে কাঁদছে? আহা! কিন্তু মিকার এখন কত কাজ! এত কথা ভাববার সময় কি তার আছে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *