পাপের সন্তান – ১৭

সতেরো

ভদ্র ইহুদীদের মধ্যে দুটো ভাগ হয়ে গিয়েছে। এক দল নেহেমিয়ার পক্ষে, আর এক দল বিপক্ষে। যারা বিপক্ষে তারা সবাই-যে টোবিয়ার লোক তা নয়। অধিকাংশই সাধারণ ভাল মানুষ।

অনেকে আফসোস করে বলছিল—এত বড় একটা কাজ, এ তো শুধু তোমার আর আমার কাজ নয়, সমস্ত ইহুদী জাতির কাজ, সেখানেও আমরা একমত হয়ে কাজ শুরু করতে পারলাম না। এই-জন্যই আমাদের ইহুদী জাতির আজ এই দুর্দশা। আমাদের নিজেদের মধ্যে এই দলাদলি দেখে পরজাতীয়েরা হাসছে যে।

কেউ কেউ নেহেমিয়ার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে বলছিল—নেহেমিয়ার বড় বেশী বাড়াবাড়ি। এত কাল ধরে আমরা এইভাবে আছি, আর দুটো দিন কি অপেক্ষা করতে পারতাম না? এ তো আর সহজ কাজ নয়। এজন্য আগে থেকে কত আয়োজন উদ্যোগ করতে হয়, তবে না কাজে হাত দেওয়া! আলাপ নেই, আলোচনা নেই, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা নেই, এ যেন একটা গোঁ-এর উপর চলছে।

একজন প্রাচীন বয়সের প্রধান বলছিলেন—আগেকার দিনে প্রধানদের ব্যবস্থামতই সব কাজ চলত। আমাদের বয়স তো আর কম হয় নি, এই নিয়মই আমরা চিরকাল দেখে এসেছি। আর আজ নেহেমিয়া তীরশথ হয়ে যেন সব কিছুর উপর হর্তাকর্তা হয়ে বসেছে। তার জন্ম কর্ম সবই বিদেশে। চিরকাল বাইরে থেকেছে। ইহুদী সমাজের নিয়ম- কানুন,

রীতিনীতি সে কি করে জানবে! তা নইলে এমন অ-দিনে অ-ক্ষণে এমন শুভকর্মে কেউ হাত দেয়! কেউ কোন দিন শুনেছে এমন কথা! আমাদের বুড়োদের কথাগুলো কানেও নিল না একবার। ও-পাড়ার ছোটলোকগুলোকে হাত করে নিয়ে সে যেন ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। ইহুদী সমাজের উচ্ছিষ্ট এই অশুচি আর অপবিত্র জন্তুগুলো, ভয়েও যারা কোন দিন কথা বলত না, নেহেমিয়ার আসকারা পেয়ে পেয়ে দশের সভায় সামনের পঙ্ক্তিতে এসে বসে, আমাদের মুখের উপর বড় গলায় কথা কয়।

কেউ কেউ বলছিল—হরোনীয় সনবল্লাট, আমোনীয় টোবিয়া আর আরবীয় গেশেম চুপ করে বসে আছে, এমন কথা মনেও করো না কেউ। তারা তাদের দলবল নিয়ে দিবারাত্রি শলাপরামর্শ চালাচ্ছে, এ সব খবর আমাদের কাছে আসে। শেষ কালে সত্যসত্যই যদি ওরা হামলা করে বসে, তখন কি করে তোরা তাদের ঠেকিয়ে রাখবি? তোরা তো মারা পড়বিই, সঙ্গে সঙ্গে সবসুদ্ধ মারবার বন্দোবস্ত করছিস্ যে। তার চেয়ে আমাদের নির্বাসিত ইহুদী ভাইয়েরা ফিরে আসুক, সময় তো আর ফুরিয়ে যাচ্ছে না। ওরা এলে আমাদেরও জোর বাড়বে, আর ওরাও একটু সমঝে চলবে। কিন্তু বোঝাই কাকে? আমাদের নিজেদের ঘরের চ্যাংড়াগুলো পর্যন্ত নেচে উঠেছে। আর বলছে কি শুনেছ? বলছে, মরতে তো এক দিন হবেই, সেজন্য এত ভয় কিসের? আরে বাবা, তোরা আর কত মরবি? মরতে কি আর ইহুদীরা বড় কম মরেছে? বলি এত মরা মরেও ফলটা হয়েছে কী?

কেউ বলছিল—আরে বাবা, সম্রাট যদি আমাদের পক্ষে থেকেই থাকেন তাহলে এমন তাড়াহুড়া করবার দরকারটা কি? বেশ তো, তাঁর সঙ্গে তোমার এত খাতির প্রণয় যখন রয়েছে, তখন সমস্ত খবর জানিয়ে তাঁর কাছে লোক পাঠাও। লোক যেতে আর আসতে তো আর দশ বিশ বছর কেটে যাবে না। আর সম্রাটের কাছে ধমক খেলে, সনবল্লাট আর টোবিয়া এখন যত ফোঁসফোঁস করুক না কেন, তখন দিব্যি ফণা গুটিয়ে যে যার গর্তে গিয়ে ঢুকে পড়বে। আর ব্যস, তোমরাও তখন নিশ্চিন্তে নির্ঝঞ্ঝাটে তোমাদের কাজ করে চলো। সাধ করে আর হাংগামা ডেকে আনা কেন? কিন্তু বোঝাও দেখি এ কথা তীরশথকে একবার। কোন কথা শুনবে না, আরও উল্টে ঝুড়ি ঝুড়ি কথা বলে তোমার মুখ বন্ধ করে দেবে। প্রবীণ লোকদের কথা কানেই নেয় না মোটে। কতগুলো ছেলে ছোকরা জুটেছে পেছনে, ওরাই তাকে আরও ক্ষেপিয়ে তুলেছে। কী-যে হবে এর পরিণাম, একমাত্র যিহোবাই জানেন।

সকলের কথার মধ্যেই কিছু না কিছু যুক্তি আছে। ঘরে আর বাইরে দু’পক্ষের মধ্যে যুক্তি নিয়ে ঠোকাঠুকি চলতে লাগল। প্রথমে আলোচনা, তারপর কথা কাটাকাটি, তারপর ঝগড়া, অবশেষে হাতাহাতি পর্যন্ত। নানা জায়গা থেকে নানা রকম খবর আসতে লাগল। নেহেমিয়া ডেকে বললেন, হানানি, তোমরা কি লক্ষ করছ, সাধারণ লোকের চোখের আড়ালে একটা গোপন হস্ত নিঃশব্দে কাজ করে চলেছে? খুব হুঁশিয়ার থেকো, আজ রাত্রিতে কিছু কিছু অঘটন ঘটতে পারে।

সন্ধ্যার পর খবর পাওয়া গেল মন্দিরের সামনে দুটো দলের মধ্যে সংঘর্ষ হয়ে গিয়েছে। শুধু হাতে হাতে নয়, লাঠি সোঁটা, ছোরাছুরির ব্যবহারও হয়েছে। কয়েকজন জখম হয়েছে। কি ভাবে, কি থেকে যে এই সংঘর্ষ বাধল, সে বিবরণ কেউ ভাল করে দিতে পারল না। সন্ধ্যার সময় মন্দিরে লোকের ভিড় থাকে। গোলমাল শুনে অনেকেই ছুটে এসেছিল, কেউ গোলমাল থামাবার জন্য, কেউ বা মজা দেখবার জন্য। কিন্তু কে জানে কেমন করে তারাও সেই চক্রের মধ্যে ঘেরাও হয়ে পড়ল। তখন নিছক নিয়ম রক্ষার জন্য সেই ঘেরাও থেকে বেরিয়ে আসবার জন্য তারাও সেই ধস্তাধস্তিতে অংশ গ্রহণ করতে বাধ্য হোল। কিন্তু হাংগামাটা বেশীক্ষণ রইল না। যেমন হঠাৎ করে শুরু হয়েছিল, তেমনি হঠাৎ থেমে গেল। কে একজন বলছিল, সে নাকি একটা বাঁশীর শব্দ শুনতে পেয়েছিল। সেই বাঁশীর সংকেত শোনবার সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকজন নাকি মারামারির জায়গা ছেড়ে ছুটে পালিয়ে গেল। বাঁশীর শব্দের কথা আর কারু মুখে শোনা যায় নি। এটাকে কেউ বড় আমল দিল না।

হানানি বাইরে থেকে এসে বলল, তীরশথ, ঠিকই বলেছিলেন আপনি। একটা গোপন হস্ত সত্যসত্যই নিঃশব্দে কাজ করে চলেছে। নিঃশব্দে, কিন্তু অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ঘটনাগুলো যেন ঝড়ের বেগে ছুটে চলেছে।

নেহেমিয়া বললেন, ঠিক বলেছ, অত্যন্ত দ্রুত। ঘটনার গতি অনুসরণ করা খুবই কঠিন হয়ে উঠেছে। কে এগিয়ে যাচ্ছে, কেই বা পিছিয়ে পড়ছে বুঝতে পারছি না।

: একটু আগেই দুটো লোক আমার পিছু নিয়েছিল। আমার হাতে এক দম কিছুই নেই। শেষে অনেকক্ষণ ঘুরিয়ে ব্যাটাদের বোকা বানিয়ে চলে এসেছিল। ওরা একটা বাড়ীর সামনে আমার অপেক্ষায় এখনও হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। দেখুন তীরশথ, একটা জিনিস বিশেষভাবে লক্ষ করবার মত। পথে অনেক অপরিচিত মুখ দেখলাম, ইহুদীর পোশাক পরা থাকলেও আমার সন্দেহ হয় এরা পরজাতীয়। খুবই সন্দেহজনক এদের চলাচল আর গতিবিধি। ওরা যেন আলোর কাছাকাছি আসতে চায় না, আর মুখের দিকে তাকালেই মুখ ফিরিয়ে নেয়।

: হানানি, ভয় করতে বলি না, কিন্তু সতর্ক হয়ে অবশ্যই চলতে হবে। তোমার হাতে আত্মরক্ষার জন্য কিছুই থাকে না কেন?

: এটা-যে কত বড় ভুল হয়েছে, এখন ভালভাবেই তা বুঝতে পারছি।

একটু বাদেই খবর পাওয়া গেল যে, নেহেমিয়ার তিনজন কর্মী গুপ্ত আক্রমণকারীর হাতে জখম হয়েছে। একজনের অবস্থা গুরুতর। হানানি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করল, মিকা কোথায়?

: মিকা? মিকা তো ওদের সেই বস্তিতে।

: তবে ভয় নেই। সবচেয়ে সুরক্ষিত দুর্গেই সে আছে। কিন্তু সে হয়তো এখানকার অবস্থা কিছুই জানে না। ফেরবার পথে বিপদে পড়তে পারে। ওর উপরে ওদের খুবই রোখ আছে। আর-যে আনমনা ছেলে। নাঃ, এখনই লোক পাঠিয়ে ওকে হুঁশিয়ার করে দেওয়া দরকার।

ঠিকই বলেছ। এখনই লোক পাঠাও।

ওরা বলছিস, মিকা ভাই, তুমি তো ভদ্রলোকের ছেলে, তুমি আমাদের সঙ্গে এমন করে মিশ কেন? তোমার মানসম্মান নেই? আমাদের এখানকার ভদ্রলোক ইহুদীরা কেউ তো আমাদের সঙ্গে এমন করে মিশে না।

: আমি কি ভদ্রলোক? আমার গায়ে কি সে কথা লেখা আছে?

: আছে বই কি, নিশ্চয় আছে। তোমার কেমন সুন্দর রং, মাখনের মত নরম তোমার গায়ের চামড়া। আমরা বলদের মত সারা দিনভর খাটতে পারি, তুমি কি তা পারো? তোমার কাপড়চোপড় কত পরিচ্ছন্ন, ফিটফাট, আর আমরা নোংরা। তুমি লেখাপড়া জানো, তুমি কত সুন্দর করে কথা বলো। আমাদের মত রুক্ষ আর বর্বর তো তুমি নও।

এ কথার কি উত্তর দেবে মিকা? এর সব কথাই তো সত্য। কিন্তু এই সত্যটা কিছুতেই যেন সে বরদাস্ত করতে পারে না।

ওরা বলে, আমাদের কথা শুনে তুমি কি রাগ করো মিকা ভাই? আমরা তো শুধু তোমার সঙ্গেই এমন করে বলি। অন্য কেউ হোলে কি বলতাম!

মিকা কথাটার ধারাটাকে ঘুরিয়ে দিল,

: কিন্তু কাল থেকে তো আমরা সবাই হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করব, সেখানে তো আর আমরা-তোমরা ভাব থাকলে চলবে না। এ নগর আমাদের সকলের। এ কাজও আমাদের সকলের।

ওরা বলল, তা আমরা বুঝি। এইজন্যই তো আমাদের এই গরীব পাড়ায় আমরা সবাই একমত হয়েছি, তীরশথের মতেই আমরা মত দিয়েছি। আজকের সভায় দেখেছো তো আমরা সবাই একজোট বেঁধেছিলাম, আর ওই ভদ্রলোকদের এক শ জনের এক শ মত।

কথার মাঝখানে ওদের একজন বলে উঠল, মুনেছ মিকা ভাই, ভদ্রলোকদের মধ্যে খুবই ঠেলাঠেলি চলেছে। সন্ধ্যার সময় মন্দিরের কাছে এক বিষম মারামারি হয়ে গেল দু দলের মধ্যে। এক দল তীরশথের পক্ষে, আর এক দল বিপক্ষে

: মারামারি? আজ সন্ধ্যায়? বলছ কি?

: বাঃ, তুমি কিছুই জান না?

: কি করে জানব আমি? আমি তো সন্ধ্যার আগে থেকে এখানেই আছি।

: কিন্তু কি বিদঘুটে ব্যাপার দেখ দেখি। এই কথা নিয়ে নিজেরা নিজেরা মারামারি! পরজাতীয়েরা তো দেখে হাসবে।

: তোমরা তো জানো না, এ সব পরজাতীয়দের উসকানি।

: ওরা তো উসকানি দেবেই। কিন্তু সেই উসকানিতেই পড়তে যাও কেন তোমরা? তোমাদের তো কত বিদ্যা বুদ্ধি। আমরা মুখ্যু লোকেরা যে-কথা বুঝি, সে কথা তোমরা কেন বোঝো না?

এমন সময় মিকার ডাক পড়ল বাইরে। তার খোঁজে দু’জন লোক এসেছে। মিকা তাদের সঙ্গে আলাপ শেষ করে আবার ভেতরে এসে ঢুকল।

কি হয়েছে? কে এসেছিল মিকা ভাই? কয়েকজন সমস্বরে প্রশ্ন করল।

: তীরশথ একটা খবর পাঠিয়েছেন।

: কি খবর?

: বাইরে নানারকম গোলমাল চলছে, ফেরবার সময় যাতে সাবধান হয়ে ফিরি, সেই কথা বলে পাঠিয়েছেন। আচ্ছা, সে কথা থাক। এখন বলো দেখি ভাইয়েরা, তোমরা সব ঠিক আছ তো? কাল থেকে শুরু, থামা চলবে না, যত দিন প্রাচীর গাঁথা শেষ না হয়।

: আমরা? আমরা সব ঠিক আছি। আমাদের জন্য চিন্তা করতে হবে না। কাল সকালবেলা দেখবে পিঁপড়ের জাঙ্গালের মত দল বেঁধে আমরা কাজ করে চলেছি। আঃ, প্রাচীর যখন খাড়া হয়ে উঠবে, তখন কি সুন্দরই না দেখাবে। নগর তো এটা নয়, তখনই হবে সত্যিকারের নগর।

মিকা একটু হেসে বলল, তোমরা তো সব ঠিক আছ, কিন্তু আমি ভাবছি, আমি কাজ করব কোন দলের সঙ্গে!

: তার মানে? আমাদের সঙ্গে কাজ করবে না?

: বা রে, আমি তোমাদের সঙ্গে কি করে কাজ করব? আমি-যে ভদ্রলোক, আমাকে তোমরা তোমাদের দলে নেবেই বা কেন? আর আমিও ভেবে দেখলাম আমি যখন ভদ্রলোক, তখন আমার ভদ্রলোকদের সঙ্গে কাজ করাটাই ঠিক।

: তুমি ভদ্রলোক না ছাই। তুমি তোমার জাত খুইয়ে বসে আছ।

: বা, তোমরাই তো বলেছ, আমি ভদ্রলোক, আমার চামড়া নরম, আমি কাজ করতে পারি না—

: তুমি ভদ্রলোক না ছোটলোক, আমরা জানি না, তবে তুমি-যে আমাদের লোক সে কথা জানতে আমাদের বাকী নেই, আমাদের ছেড়ে তুমি যাবে কোথায়?

কি সামান্য একটা কথা! কিন্তু এই কথা শুনেই মিকার চোখ দু’টি জলে ভরে এল। মিকার তৃপ্তি মিটছিল না। সে বুঝি আরও একটু শুনতে চায়।

: আমাকে সঙ্গে রেখে তোমাদের লাভ?

তুমি যদি সামনে থাক, আমাদের কাজের উৎসাহ দশগুণ বেড়ে যাবে।

: কিন্তু আমি তো কাজ করতে জানি না।

: না-ই বা জানলে, কিন্তু তোমার কথার মধ্যে কি যেন আছে, তোমার কথা শুনলে আমরা উৎসাহ পাই। হয়তো বা তোমার মধ্য দিয়েই যিহোবা আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। দেখ মিকা ভাই, এই-যে আমরা, এখানকার মানুষগুলো, তোমরা আসবার আগে যারা ছিলাম, এখনও তারাই আছি। কিন্তু সেই ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া মানুষগুলো তোমাদের কথা শুনে আজ সাহসে দুর্দান্ত হয়ে উঠেছে। আজ তারা কাউকে ভয় করে না। মিকা ভাই, তোমাদের চোখের আলোয় আমরা প্রভুর আশীর্বাদ দেখতে পেয়েছি।

আবেগে মিকার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল। কোন কথা সে বলতে পারল না।

ক’টি মেয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কি ব্যাপার? একজন জিজ্ঞাসা করল,

: কি গো, কি চাও তোমরা?

তাদের মধ্যে একটি মেয়ে সোজা মিকার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

: সবাই কাজ করবে, আর আমরা মেয়েরা বুঝি কাজ করব না? সবাইকে বলছেন, কই, আমাদের তো কিছু বলছেন না?

বিপদেই পড়ে গেছে মিকা। কি বলবে এর উত্তরে? এ প্রশ্ন তো কখনও মাথায় আসে নি। কিন্তু মেয়েগুলো নাছোড়বান্দা, উত্তর আদায় না করে ছাড়বে না।

: আপনাদের বাবা, মা, বাড়ীর সবাই, তাঁরা কি বলছেন?

: তারা বলেছে, আমরা কি জানি, মিকা ভাইকে শুধোও গিয়ে। সেই তো আমাদের নেতা, সে যা বলে, তাই হবে।

এখন কি বলবে মিকা? ফাঁপর হয়ে উঠল সে। যারা তাকে ঘিরে বসেছিল, অনুপায় হয়ে তাদের মুখের দিকে তাকাল।

উঁহু, তারা কেউ কিছু জানে না। কেউ একটি কথাও বলল না। সবাই চুপ করে বসে মজা দেখতে লাগল। মিকার মনে হোল, তার এই দুরবস্থা দেখে একটা মেয়ে যেন হাসি চাপছে। মেয়েটার চোখে মুখে দুষ্টামি।

: আপনারা কি কাজ করতে পারবেন?

একটা মেয়ে টিপ্পনী কেটে বলল, আমরা ভদ্রলোকের মেয়ে নই। আমরা গরীব ঘরের মেয়ে, খেটে খাই, কোন্ কাজ আমরা করতে না পারি? সব কাজই আমরা জানি।

: বেশ তো, আপনারাও কাজে হাত লাগান। আপনাদের কাজ আপনারা করবেন, এর চেয়ে আনন্দের কথা আর কি আছে?

মেয়েরা খুশী হয়ে বলল, চল্ লো চল্, মিকা ভাইর হুকুম হয়ে গেছে যখন, তখন আর ভাবনা কি?

আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়ল মিকা, মনে হোল, জীবনটা কী মধুর! সেই মুহূর্তের জন্য সে ভুলেই গিয়েছিল, আজ মন্দিরের কাছে দু’দলে দাঙ্গাহাঙ্গামা হয়ে গিয়েছে, তাতের তিনজন কর্মী গুপ্ত ঘাতকের ছুরিতে আহত। আরও কত দুর্ঘটনার আশঙ্কা মাথার উপর ঝুলছে। আর একদিকে এক নির্জন ঘরে ছিন্নমূল লতিকার মত একটি মেয়ে লুটিয়ে পড়ে আছে, তার নাম শদরা। জীবনটা কি সত্যিই মধুর?

অশান্তিতে ঘুম আসছিল না চোখে। নেহেমিয়া শুয়ে এ পাশ ও পাশ করছিলেন। যিহোবা তাঁকে এ কি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন! তিনি জানতেন, জেরুজালেমের অনেকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিনি এ কাজে হাত দিতে চলেছেন। এমনকি প্রধানদের মধ্যে একজনও তাঁর সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তিনি এ দেশে নতুন, অনভিজ্ঞ, হয়তো বা তাঁর এই সাহস দুঃসাহস। কিন্তু কার অমোঘ নির্দেশ যেন অনুক্ষণ তাঁকে পরিচালিত করে চলেছে। যেটুকু এগিয়েছেন, ফেরবার পথ আর নেই। সামনেই এগিয়ে যেতে হবে। নেহেমিয়ার মনে পড়ল ওদের বুড়ী মায়ের সেই স্বপ্নের কথা। সে কথা স্মরণ করলে বুকটা আশায় ভরে ওঠে।

কিন্তু দুশ্চিন্তা তবু যায় না। কাঁটার মত বারে বারেই খচ্ খচ্ করে বিধতে থাকে। যে-আত্মবিরোধ ও হানাহানির মধ্য দিয়ে এই শুভ কর্মের সূচনা হয়েছে, তার শেষ পরিণতি কি দাঁড়াবে কে জানে! এই দুঃসাহসের জন্য এক দিন কি তাঁকে অনুশোচনা করতে হবে? ভবিষ্যদ্বংশীয়েরা এক দিন কি এই হঠকারিতার জন্য তাঁকে দোষী করবে? চিন্তায় চিন্তায় মাথাটা গরম হয়ে ওঠে, ঘুম আসে না চোখে।

রাত্রি কত হয়েছে, কে জানে! দ্বিতীয় প্রহরের ঘোষণাকারী যামঘোষের দল কখন ডেকে গেছে। দিবসের কর্মক্লান্ত মানুষগুলো গা ছেড়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু নেহেমিয়ার চোখে ঘুম নেই। আর কি ঘুম আসবে আজ? হঠাৎ মনে পড়ল নেহেমিয়ার, কে জানে, জেরুজালেমের বুকে তাঁরই মত আরও কত লোক এমনি বিনিদ্র রজনী যাপন করছে।

কিন্তু ও কি, কার পায়ের শব্দ? তার দরজার কাছে এসে থেমে গেল না? এ কি তাঁর উষ্ণ মস্তিষ্কের বিকৃত কল্পনা? না না, কল্পনা নয়, তাকে উদ্দেশ করেই ডাকছে যে, অস্ফুটকণ্ঠে ডাকছে—তীরশথ! তীরশথ! এ কে? রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল নেহেমিয়ার দেহ। যিহোবার রাজ্যে যে-সমস্ত অপার্থিব প্রাণী আকাশে বাতাসে ঘুরে বেড়ান, এ কি তাঁদের কেউ? এঁদের আগমনের অপেক্ষাতেই কি তাঁর চোখে ঘুম আসছিল না?

ওই-যে আবার ডাকছে—তীরশথ! তীরশথ! দরজা খুলুন!

মনে হোল যেন বড়ই বিপন্ন সেই কণ্ঠস্বর। শয্যা থেকে লাফিয়ে উঠলেন নেহেমিয়া। হঠাৎ দরজা খুলে দেওয়াটা নিরাপদ হবে কিনা, এ চিন্তা তাঁর মনেই এল না। দরজা খুলে প্রশ্ন করলেন—কে, তুমি কে?

দু’জন লোক এসে ঘরে ঢুকল। অন্ধকারে স্পষ্ট বোঝা না গেলেও পোশাক দেখে মনে হল তারা ইহুদী।

: তীরশথ, আপনি আমাদের চিনবেন না। একটা জঘন্য পাপ-কার্য করবার উদ্দেশ্যে আমাদের পাঠানো হয়েছে। এমন কাজ, যে-কাজ কোন ইহুদী করতে পারে না।

নেহেমিয়ার বিস্ময়ের অবধি রইল না।

: জঘন্য পাপকার্য! কি কাজ?

: আমাদের উপর আদেশ দেওয়া হয়েছে আপনার ঘরে আগুন দিয়ে আপনাকে পুড়িয়ে মেরে ফেলবার জন্য।

: আমাকে? পুড়িয়ে মেরে ফেলতে? কার আদেশ?

: দয়া করে ও-প্রশ্ন করবেন না। আমরা এ প্রশ্নের উত্তর দিতে অক্ষম।

: কিন্তু সে কাজ করলে না কেন?

: তীরশথ, যত দুরদৃষ্ট হই না কেন, আমরা ইহুদী। এমন কাজ করতে কি আমাদের মন সায় দেয়? আমরা প্রথমে স্বীকার হই নি, পরে ওরা বলল, এ কাজ না করলে ওরা আমাদের হত্যা করবে। তখন প্রাণের দায়ে মৌখিকভাবে স্বীকার করে নিয়েছি।

: এখন তোমরা কি করবে? কি করতে চাও?

: তীরশথ, আমরা জানি আপনি যিহোবার মানুষ। স্বীকার করলেও এ কাজ করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আপনি এই মুহূর্তে এই ঘর ছেড়ে চলে যান, আর আমরাও ঘরে আগুন দিয়ে আমাদের কাজ সমাধা করি। দয়া করে আমাদের কথাটা যেন প্রকাশ করবেন না। এ পথ দিয়ে নয়, এ পথে আমাদের দলের অন্য লোকেরা পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে। আপনি পেছনের ওই সরু পথটা দিয়ে বেরিয়ে যান। ওই পথের খবরটা ওরা জানে না।

বেশী চিন্তা করার বা কথা বলার সময় ছিল না। তাড়াতাড়ি নিতান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যা কিছু হাতের কাছে পেলেন, তাই নিয়ে নিহেমিয়া ঘর ছেড়ে মিকার বাড়ীতে গিয়ে দরজায় ঘা মেরে ডাকলেন—মিকা, মিকা!

ভেতর থেকে মেয়েলী কণ্ঠের সাড়া পাওয়া গেল

: কে? মিকা? উঃ, কি ভাবনা-যে হচ্ছিল! এত রাত্তির কেন?

শদরা এসে দরজা খুলে দিতেই নেহেমিয়া ঘরে ঢুকে বললেন—

: না, আমি মিকা নই, দানিয়েল। আমি নেহেমিয়া।

নেহেমিয়া। দু পা পিছিয়ে গেল শদরা। মৃদু বাতির আলোকেও দেখা গেল তার মুখে কী-যে এক আতঙ্কের ছবি। সেই ছবি পাঠ করে নিতে নেহেমিয়ার একটুও দেরী হোল না। দানিয়েল তাঁকে দেখে ভয় পেয়েছে। একটু ক্ষীণ হাসি দেখা দিল নেহেমিয়ার মুখে। সে হাসি বড়ই করুণ, কান্নার মতই করুণ।

ইতিমধ্যে শদরা আপনাকে সামলে নিয়েছে। আতঙ্কের বদলে এখন তার চোখে ক্রোধের আগুন ফুটে উঠেছে। নেহেমিয়ার মনে পড়ল দানিয়েলের চোখের এই ক্রোধাগ্নিই একদিন তাঁকে দগ্ধ করে দিয়েছিল।

: তীরশথ, এই গভীর রাত্রিতে, মিকা বাড়ী নেই, নির্জন ঘরে একলা আমি, এ সময় আপনি কেন? কি অভিসন্ধি আপনার?

উঃ, কি তীব্র আর নগ্ন তার এই আক্রমণ! বেদনাহত কণ্ঠে নেহেমিয়া বললেন,

: তুমি আমায় ভুল বুঝেছ দানিয়েল—

তাঁর সেই কাতর কণ্ঠ শদরাকে নিবৃত্ত করতে পারল না। সে বলে চলল,

: বৃথা আপনার এই চেষ্টা। আপনি আমার চোখে ধুলো দিতে পারবেন না। অনেক দিন আগেই আমি আপনাকে চিনেছি। আপনি নিজেই চিনবার সুযোগ দিয়েছেন। আপনি সর্বজনমান্য বয়োবৃদ্ধ প্রবীণ, দিবারাত্রি আপনি যিহোবার নাম জপ করে থাকেন, আর এ কি হীন প্রবৃত্তি আপনার? কাজের ছুতোয় মিকাকে কোথাও দূরে সরিয়ে দিয়ে, সেই সুযোগ নিয়ে চোরের মত আমার ঘরে এসে ঢুকেছেন!

ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে গিয়েছিল নেহেমিয়ার। তিনি গর্জন করে উঠলেন,

থামো দানিয়েল, তোমার ওই বিষাক্ত জিহ্বাকে সংযত করো। কাকে কি বলছ, তুমি জান না! এত স্পর্ধা তোমার!

প্রচণ্ড এই ধমক খেয়ে শদরা অবাক হয়ে থেমে গেল। এ-রকম সে কখনোই আশা করে নি। এ তো অপরাধীর কণ্ঠ নয়। নেহেমিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল ক্রোধে যেন জ্বলছে। শদরা স্তম্ভিত হয়ে গেল। নেহেমিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে তার যেন কেমন ভয় ভয় করছিল।

দু’জনে নিঃশব্দে দু’জনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। দু’জনেই দু’জনের মনকে পাঠ করবার চেষ্টা করছিল। আস্তে আস্তে নেহেমিয়ার মুখে উত্তেজনার রেখাগুলো একটি একটি করে নিশ্চিহ্ন করে যেতে লাগল। আর কি আশ্চর্য, শদরা দেখল, সেই রোষরক্ত চোখে যেন স্নেহমমতার একটি নরম পর্দা নেমে আসছে।

ধীর গম্ভীর কণ্ঠে নেহেমিয়া বলে চললেন। না, শদরা তাঁর এমন কণ্ঠস্বর আর কোনদিন শোনে নি।

: শোন দানিয়েল, এ জীবন বড় বিচিত্র, বড় জটিল। তুমি তাকে তোমার মুঠোর মধ্যে ধরে রাখতে পারো না, এ তোমাকে ছাপিয়ে ওঠে, তোমাকে ছাড়িয়ে চলে যায়। তাই বলি, এত সহজে এত কঠিন করে কাউকে বিচার করো না। আমিও এক দিন এমনি কঠোরভাবে পরের বিচার করেছি, আর লোকের কত বাহবা কুড়িয়েছি। আজ বুঝি তারই প্রতিদানে যিহোবা আমাকে এমনি কঠিন শিক্ষা দিলেন। শোন দানিয়েল, তিনি আমাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন।

নেহেমিয়ার আর্ত কণ্ঠস্বরে আহত হয়ে ঘরের বাতাস কাঁপতে লাগল। শদরা বুঝতে পারছিল না নেহেমিয়া কি কথা বলবেন। তবু তার সমস্ত অন্তর কেন-যে এমন গভীরভাবে আলোড়িত হয়ে উঠল!

: তীরশথ, বলুন, বলুন, আমি কি তবে ভুল করেছি?

: না, ভুল তুমি করো নি। তোমার চোখ তোমাকে ফাঁকি দেয় নি। আমি কোন কথা অস্বীকার করব না, আমি কোন কথা চাপা দেব না। আমি তোমার কাছে আমার সমস্ত কথা প্রকাশ করে দিয়ে এই দুর্বহ বোঝা থেকে মুক্তি পাব। তুমি শুনবে দানিয়েল? হ্যাঁ, তোমার শোনা উচিত।

: তীরশথ, যাঁর সম্বন্ধে আমি এত দিন মনে মনে এত বিরাগ পোষণ করে এসেছি, কে বলবে, তাঁর কথা শোনবার জন্য আমার মন আজ এমন ব্যাকুল হয়ে উঠল কেন?

: দানিয়েল, তোমরা তো জানো না, আমি কত ভাগ্যহীন। বাপ-মাকে চোখেও দেখি নি, ভাই বোন কেউ ছিল কি না, তাও জানি না। ত্রিসংসারে আমার কেউ নেই। পথের বুকে মানুষ আমি, ভাগ্যের তাড়নায় পথে-বিপথে বিতাড়িত। ঘরের স্নেহ ভালবাসা, মায়া মমতা, তার আস্বাদটুকু কোনদিন পাই নি। জীবন আমার শুকিয়ে গিয়েছিল। যৌবন স্বাভাবিকভাবেই পুরুষ নারীর সঙ্গ কামনা করে। আমি কি সাধারণ মানুষ থেকে স্বতন্ত্র কিছু? আমি তখন সুসান রাজপ্রাসাদের অন্তঃপুরের একজন পরিচারক। রাজপ্রাসাদের বিলাসিনীদের জীবনযাত্রা দেখে আমি নারী-জাতি সম্পর্কে কেমন যেন বীতশ্রদ্ধ হয়ে গেলাম। আপনাতে আপনি ডুবে রইলাম। সবাই বলল, ধন্য, ধন্য, জিতেন্দ্রিয় সাধুপুরুষ! এই প্রশংসা আমার কানে ভালই লাগল।

কিন্তু কামনা কি এত সহজেই মরে! সে-যে দেহের অণুতে অণুতে মিশে থাকে, আবার উপযুক্ত সুযোগ পেলেই অতর্কিতে শত শিখা বিস্তারিত করে আত্মপ্রকাশ করে। মূঢ় আমি, আমি কি তা জানতাম! আমি মনে করেছিলাম, আমার এই বাসনাময় দেহকে ছাড়িয়ে আমি অনেক উপরে উঠে গেছি। কিন্তু যহোবা আমাকে নির্মমভাবে কঠিন মাটির উপর আছড়ে ফেলে দিলেন।

দানিয়েল, তোমার মত আমার একটি মেয়েও তো থাকতে পারত। কিন্তু কে জানে কার চক্রে তবু তো তোমাকে দেখেই আমার চোখে মোহের ঘোর লাগল! সে দিন তুমি ভোরবেলায় নদী থেকে স্নান করে উঠছিলে, আর ঠিক সেই সময়, চোরের মত নয়, ঘটনাচক্রে আমি তোমার সামনে গিয়ে পড়লাম। দানিয়েল, অমন করে সংকোচে মাথা নত করো না। মনে কর, আমরা নই, অন্য কোন দু’টি লোকের কাহিনী শুনছ। তোমার দিকে চেয়ে আমি চমকিত হয়ে উঠলাম। এমন তো আমি কোনদিন দেখি নি। সঙ্গে সঙ্গে কত দিনের কত অপূর্ণ ক্ষুধা, এত দিন কোথায় লুকিয়েছিল কে জানে, অকস্মাৎ সবাই মিলে আমাকে ঘিরে ধরল! সংকোচ করো না দানিয়েল, মাথা তোল, আজ আমি তো আর সেই আমি নই।

তুমি ভুল করো নি। তুমি আমায় বুঝতে পেরেছিলে। কিন্তু দানিয়েল, কি দারুণ আত্মগ্লানিতে আমার হৃদয় দগ্ধ হয়ে যাচ্ছিল, সে তো তুমি দেখ নি। তুমি আমাকে ধিক্কার দিয়েছ, ঘৃণা করেছ, কিন্তু আমি কি আপনাকে শতগুণ বেশী ধিক্কার দিই নি? শতগুণ বেশী ঘৃণা করি নি? আমি আর কি করতে পারতাম? আমি রাত্রির পর রাত্রি প্রভুর কাছে কেঁদেছি, চোখের জলে আমার বুক ভেসে গেছে। কেঁদেছি আর বলেছি— প্রভু, তুমি আমায় বাঁচাও। তুমি ছাড়া আর তো আমার কেউ নেই। অবশেষে প্ৰভু আমার কাঁদন শুনলেন। আমি ক্রমে ক্রমে আপনাতে আপনি ফিরে এলাম। আজ আমাকে তোমার কোন ভয় নেই দানিয়েল।

শদরা অবাক হয়ে শুনছিল তাঁর কথা। যেন মুগ্ধ হয়েই শুনছিল। জীবনের স্তরে স্তরে কত বিস্ময়ই না সঞ্চিত হয়ে আছে, অবাক হয়ে সেই কথাই ভাবছিল শদরা। আছে বই কি শদরা, অনেক আছে, রহস্যে ভরা মানুষ কত বিস্ময়ই না তার মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে! যখন নেহেমিয়া তাকে আশ্বস্তি জানিয়ে বলছিলেন যে, আজ তাঁর কাছ থেকে শদরার কোনই ভয় নেই, ঠিক সেই মুহূর্তেই শদরার অন্তরের কোন এক গোপন মর্মকোষ থেকে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল—নেহেমিয়া কি আমার কথা একেবারেই ভুলে গেছে? একবারও তাঁর মনে পড়ে না? এটাও কি কম বিস্ময়কর শদরা?

হঠাৎ বহু লোকের শব্দে দু’জনেই চমকে উঠল। সেই ভাবমুগ্ধ পরিবেশটা এক মুহূর্তেই ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল।

কি? ও কি? চকিত হয়ে প্রশ্ন করল শদরা।

: দক্ষিণের জানালাটা দিয়ে দেখো।

শদরা ঝুঁকে পড়ে দেখল, আকাশ লাল হয়ে উঠেছে।

: উঃ, কাছেই কোথায় যেন আগুন লেগেছে। তীরশথ, দেখুন তো এসে, কোথায় আগুন লাগল।

: আমার আর দেখতে হবে না। আমারই ঘরে আগুন লেগেছে।

: আপনার ঘরে? এ আপনি বলছেন কি?

: ঠিকই বলছি। আমাকে পুড়িয়ে মারবার জন্য ওরা আমার ঘরে আগুন দিয়েছে। আমি একটু আগেই টের পেয়ে ওখান থেকে সরে পড়ে তোমার ঘরে এসে আশ্রয় নিয়েছি

: আপনাকে পুড়িয়ে মারতে? তারা কারা?

: পরজাতীয়েরা। আমাকে মেরে ফেলে ওরা নগরের প্রাচীর তোলার কাজ বন্ধ করতে চেয়েছিল।

: ছি ছি ছি। আর বেশ মানুষ তো আপনি। এতক্ষণ বাদে এ কথা বলতে হয়!

নেহেমিয়া এবার হেসে উঠলেন, বলব কি! সুযোগ দিয়েছ তুমি? যে-রকম তেড়ে উঠেছিলে, আমি তো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম। শদরাও হাসল

: উঃ, কি না ভয়! এক ধমক দিয়ে আমার মুখ তো বন্ধ করে দিলেন।

: ভাল করি নি?

: হ্যাঁ, সত্যিই ভাল করেছেন। সেজন্য আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

হঠাৎ নেমেহিয়ার একটা কথা মনে পড়ে গেল,

: কিন্তু দানিয়েল, রাত্রি শেষ হয়ে এল, মিকা ফিরল না যে?

: আমিও তো সেই কথাই জিগ্যেস করব ভাবছিলাম।

: তাই তো!

মিকা যখন ওদের বস্তি থেকে বেরিয়ে পড়ল তখন রাত্রি অনেক হয়েছে। ওরা বলেছিল—সময়টা ভালো না, একা যেও না, চলো তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি। কিন্তু মিকা কিছুতেই রাজী হোল না। সে একাই বেরিয়ে পড়ল।

বাইরে এসে কোমরে হাত দিয়ে দেখল, ছুরিটা ঠিকমতই আছে। বাবিল থেকে এই ছুরিটাই সে নিয়ে এসেছিল। ভাবল, এতদিনে এখন কি তবে এটার সদ্ব্যবহার করবার সময় এসে গেছে? কিন্তু প্রয়োজনের সময় কাজে লাগবে তো? শান্ত শিষ্ট, নির্বিবাদী মিকা, ছুরিছোরা তো কোন দিন চালায় নি। একটা লোকের গায়ে এই ধারালো ছোরাটা বসিয়ে দিতে পারবে সে? মন কেমন করবে না? আহা, তাজা রক্তগুলো যখন গলগল করে বেরিয়ে আসবে। ভাবলেও-যে কেমন করে ওঠে গাটা।

বন্ধুরা বারবার সাবধান করে দিয়েছে, চোখ কান সজাগ রেখে পথ চলবে। কিছু দূর পর্যন্ত সেই উপদেশ মেনে চলবার চেষ্টা করেছিল। ডানে, বায়ে, সামনে, পিছে সব দিকেই তাকিয়ে দেখল সে। নাঃ, কোথাও কিছু নেই। কিন্তু একটা বাদেই যে মিকা সেই মিকাই হয়ে পড়ল। যত রাজ্যের চিন্তা, আর সময় পায় না, পথ চলবার সময়ই তার মাথায় এসে ভিড় করে। পথে চলতে চলতে কত সমস্যার সমাধান করতে হয় তাকে। সম্প্রতি যে-সমস্যাটা তাকে উদ্ব্যস্ত করে তুলেছিল তা হোল এই যে, ভদ্রলোক আর শ্রমজীবী ছোট-লোকদের মধ্যে মূলগত পার্থক্য কি কি এবং পার্থক্যগুলোকে ভেঙ্গে সমান করে এই দুটো ভাগকে এক করে দেওয়া যায় কিনা এবং কি করেই বা দেওয়া যায়।

গভীর চিন্তার ফলে সমাধানের দুটো একটা সূত্র বেরিয়ে আসছিল। এমন সময় হঠাৎ সেই সূত্র ছিন্ন হয়ে গেল। মিকা স্পষ্ট শুনতে পেল, কে যেন তার পেছন থেকে একটা শিস্ দিল। শিকারীরা তাদের শিকারী কুকুরদের সংকেত করে যেমন শিস্ দেয়, ঠিক সেই রকম। শব্দটা শুনেই সে চমকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গেই সাপের মত কী একটা তার মাথার উপর লাফিয়ে পড়ল। আত্মরক্ষার জন্য সামনের দিকে ছুটতে চাইল সে। কিন্তু ছুটবার শক্তি আর নেই। তার গলায় ফাঁস আটকে গেছে। একটা বিষম হ্যাঁচকা টানে তার দম বন্ধ হয়ে এল। উঃ, কি কষ্ট-যে হচ্ছে! ছটফট করতে লাগল মিকা। একবার মনে পড়ল শদরার কথা। সেই অবস্থাতেই শুনতে পেল কারা যেন খিলখিলিয়ে হাসছে। উঃ, কি যন্ত্রণা!

মিকা যখন চোখ মেলে চাইল, তখন অবাক হয়ে দেখল, এ কোথায় আছে সে, আর কোন দিন তো সে এ জায়গায় আসে নি। স্বপ্ন দেখছে না তো? ঘরটা তাদের ঘর নয়। যে-বিছানায় সে শুয়ে আছে, সেটাও তাদের নয়। ঘরের মধ্যে একটা বাতি জ্বলছে। এ বাতিটাও সে কোনদিন দেখে নি। তার মাথার কাছেই শদরার মতই কে যেন মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ভাল করে দেখা যাচ্ছে না।

সে ডাকল : শদরা!

মাথার কাছে যে দাঁড়িয়ে ছিল, সে ডাক শুনে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। নাঃ, শদরা নয় তো। এ তবে কে? একে তো কোনদিন দেখে নি। মিকা এ কোথায় এসেছে? একবার নিজের সম্বন্ধে সন্দেহ জাগল, সে মিকা তো?

: কি রে, চোখ মেলেছিস্, খিদে পেয়েছে? খাবি কিছু!

ও বাবা, এ আবার কে? মিকা দস্তুরমত ঘাবড়ে গেল। মেয়েটি কে? মেয়েটি তো নয় স্ত্রীলোকটি। ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছরের মধ্যে বয়স হবে। মুখের ছবি মোটামুটি মন্দ নয়, কিন্তু চোখের দিকে তাকালে কেমন যেন অস্বাভাবিক বলে মনে হয়।

মিকার মুখের দিকে চেয়ে কেমন করে হাসছে। মিকার বিষম অস্বস্তি লাগতে লাগল।

: আপনি কে?

বাঃ, আমি কে? আমি আমিই। আমি আবার কে?

: আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন কেন?

: বা, রে আমি এনেছি বুঝি? ওই-যে হতভাগারা নীচে বসে হল্লা করছে, ওরাই তো নিয়ে এল তোকে। গলায় এমন করে ফাঁস আটকে দিয়েছিল, আমি ভাবলাম মরেই গেছিস্ বুঝি।

এবার মিকার সব কথাই মনে পড়ল। সর্বনাশ, শত্রুপুরীতে বন্দী সে।

: ওরা তো তখনই তোকে মেরে ফেলতে চায়। আমি বললাম, না, ওকে মারতে পারবি না। ওরা কিছুতেই শুনতে চায় না। শেষে কত করে বললাম, আজ রাত্রির মত ওকে আমার হাতে ছেড়ে দে। ওরা বলল, কি করবি তুই ওকে নিয়ে? আমি বললাম, কি করব আর, আমি ওকে নিয়ে খেলা করব। ওরা হেসে বলল, আচ্ছা, নে, নে, আজ রাত্রিটা তুই ওকে নিয়ে খেলা কর। রাত্রি শেষ হবার আগেই কিন্তু ওকে ছেড়ে দিতে হবে। তখন আমরা ওকে নিয়ে সরে পড়ব। ও-ই তো সর্বনাশের গোড়া, ছোটলোকগুলোকে এই ব্যাটাই তো ক্ষেপিয়ে তুলেছে।

: আমাকে কাল মেরে ফেলবে বুঝি?

: তাই তো ওরা বলছে। আর ওরা যে-কথা বলে, তার তো বড় নড়চড় হয় না। তা সে যাক গে, কালকের কথা কাল, এখন তুই খেয়ে নে দেখি, এই-যে আমি তোর জন্য খাবার এনেছি।

এ সমস্ত খবর শোনবার পর মিকার আর খাওয়ার রুচি ছিল না। আজ আর একটু সময় মাত্র তার হাতে। তারপর নির্ঘাত মৃত্যু। ওদিকে প্রাচীর গাঁথার কাজ শুরু হয়ে যাবে। সে-ই শুধু থাকবে না। তার বন্ধুরা কেউ কোন কথা জানতে পারবে না। তারা তাকে বৃথাই খুঁজে মরবে। তাকে না পেয়ে শদরা লুটিয়ে পড়ে কাঁদবে। এই নির্বান্ধব বিদেশ ভূমিতে পরজাতীয়দের মধ্যে কি করবে সে?

কিন্তু সে তো কাল। সম্প্রতি এই স্ত্রীলোকটি-সম্পর্কে সে বেশ শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এই উন্মাদিনী কি করে না করে ঠিক আছে কিছু! কোন কথার প্রতিবাদ করতে বা আপত্তি জানাতেও ভয় হয়। একটু যদি গোলমাল হয় নীচের তলার লোকগুলো উপরে চলে আসবে।

: এই-যে তোর খাবার এনেছি।

নিতান্ত বাধ্য ছেলের মত মিকা বলল, দিন।

: দেব কি রে? হ্যাঁ কর, আমি খাইয়ে দিচ্ছি, পাগল, তুই কি নিজে খেতে পারিস্ না কি? কোনরূপ উচ্চবাচ্য না করে মিকা লক্ষ্মী ছেলের মত হাঁ করল। আর সে একটু একটু করে ওর মুখে দিতে লাগল। খাওয়া শেষ হয়ে গেলে পর সে মিকার মুখ মুছে দিল। তারপর উপুড় হয়ে ঝুঁকে পড়ে মিকার মুখে চুমো খেল। কি করবে মিকা, ভয়ে কাঠের মত আড়ষ্ট হয়ে রইল। কিন্তু তাতে ওর তৃপ্তি হয় নি মিকার মাথাটা সে নিজের কোলের উপর তুলে নিয়েছে। আবার সে চুমো খেল।

স্ত্রীলোকটি বিড় বিড় করে বকছিল। ওরে, এবার তোকে চিনতে পেরেছি। বাছা রে, এতদিন তুই কোথায় ছিলি? আহা, কতদিন বাদে তোকে নিজের হাতে খাওয়ালাম। কতদিন বাদে তোকে কোলে নিয়ে চুমু খেলাম।

এই কি তবে মায়ের মুখের চুমো! তা না হলে কি এমন হয়? মিকা জানে না মা কি রকম, কত দিন কতরকম করে তাকে কল্পনা করে দেখেছে। কই, এত কান্না কেঁদেও স্বপ্নের মধ্যেও কোন দিন সে মায়ের স্পর্শ পায় নি। মিকা বুঝল, এ এক পুত্রহারা অভাগিনী। বিকৃত-মস্তিষ্ক হয়ে তাকেই তার হারানো ছেলে বলে মনে করেছে। পাগলিনী, আহা, তবু তো মা। সব মা একই মা। মিকার আর ভয় রইল না। মমতায় ভরে উঠল বুক।

: ও মা, তুই চিনতে পেরেছিস্ আমাকে? ও আমার সোনা, এখনও ভুলে যাস্ নি। আমায় ছেড়ে এতদিন কোথায় ছিলি? আহা, কত কষ্টই না পেয়েছিস্। আয় বাবা আমার বুকে।

এই বলে সে মিকাকে তার বুকে টেনি নিল। আর গুনগুন করে গান গেয়ে গেয়ে ঘুম পাড়াতে লাগল। মিকা ভাবছিল কাল আমার শেষ। তাই বুঝি মা এসে দেখা দিল।

: ঘুমোস্ না যে দুষ্টু ছেলে! আমি তোর জন্য জেগে আছি যে। তুই ঘুমিয়ে পড়লে আমি তোর ঘুমন্ত মুখখানি দেখব। ওরে কতদিন যে দেখি না। ঘুমো, ওরে দুষ্টু ছেলে ঘুমো।

অসংকোচে বুকের কাপড় সরিয়ে একটি নরম মাংসল স্তন মিকার মুখে তুলে দিল।

: নে, আর বায়না করতে হবে না। নে, খা, খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়। আহা কেমন করছে দেখ না, লজ্জা হয়েছে বুঝি? বড় হয়ে গিয়েছিস, মস্ত বড় হয়েছিস্? মায়ের চেয়েও বড়?

ওরে শোন, শোন, সেদিন এমনি করেই আমি তোকে মাই দিচ্ছিলাম। এমন সময়ে সে ঘরে এসে ঢুকল। কে? ওরে তোর বাবা। মদ খেয়ে মাতাল হয়ে এসেছিল। এমন মাঝে মাঝেই আসতো। ভয়ে আমার বুক কেঁপে উঠল। কোন কথা না বলে সে আমার হাত ধরে টানাটানি করতে লাগল। তুই কেঁদে উঠলি। আমি বললাম, ওগো, তোমার দু’টি পায়ে পড়ি। বাছাকে মাই দিচ্ছি, এখুনি ঘুমিয়ে পড়বে। তারপরেই আমি তোমার কাছে যাব। তখন আমাকে নিয়ে তুমি যা খুশী তাই করো। সে চেঁচিয়ে উঠল— আয় শিগির। ওটকে ছুঁড়ে ফেলে দে, যত সব জঞ্জাল। আমার আর দেরী সয় না, আমার শরীর গরম হয়ে উঠেছে। আমি কাকুতি করে বললাম— ওগো, একটু দাঁড়াও, ও তো এক্ষুণি ঘুমাবে। “তুই পারবি না, আমিই ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি।” বলেই উঠে— ওরে বাবারে, আমি কেমন করে সে কথা বলব। কেমন একটা শব্দ করেই তোর মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তুই মরে গেলি। একবার ছটফট করে কাঠ হয়ে পড়ে রইলি।

মা মিকাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল,

: বাবা, তুই তো মরে গিয়েছিলি, তুই আবার কেমন করে ফিরে এলি? আমাকে ছেড়ে থাকতে পারলি না বুঝি? ওরে আমার মণি, ওরে আমার বুকজুড়ানো ধন, আজ তুই নেই, অথচ আমি আছি।

হঠাৎ ঝটপট করে উঠে বসল মা। দুহাতে টেনে তুলল মিকাকে।

: ওরে, কেন তুই এলি? কেন এখানে মরতে এলি? তোকে-যে আবার মেরে ফেলবে। পালা, পালা, আমার এখানে আর আসিস না। কক্ষনো আসিস না। আবার যে তোকে মেরে ফেলবে।

মায়ের ভাবভঙ্গী দেখে মিকা ভয় পেয়ে গেল। তার চোখে পুরো উন্মাদের দৃষ্টি।

: কি, বসে আছিস্-যে বড়? আবারও আমাকে কাঁদাবি?

: কোথায় যাব, দ্বার বন্ধ যে। আর ওরা সব নীচে বসে আছে।

: থাকগে ওরা, কিছু করতে পারবে না। আয় তুই, আয় আমার সঙ্গে। আমি তোকে বের করে দিয়ে আসি। ওরা কিচ্ছু টের পাবে না।

মা অতি সন্তর্পণে পা টিপে এগিয়ে চলল। ফিসফিস করে বলল— আয়, আয় আমার পেছন পেছন। মিকার মনেও একটু আশা জাগল। কিন্তু সমস্তই উন্মাদের প্রলাপ নয় তো? যা হয় হোক, একবার দেখতেই হবে!

মিকা চেয়ে দেখল বাড়ীটা দ্বিতল, মাটি থেকে অনেকটা উঁচু। লাফিয়ে পড়বার সুযোগও নেই। আঁকাবাঁকা পথে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মা শেষে একটা খোলা জানালার কাছে দাঁড়াল। জানালাটার দুটো শিক নেই। একজন সাধারণ মানুষ কোনমতে গলে যেতে পারে।

: নে, এই দড়িটা, বাঁধ এইখানে। বেঁধেছিস্? বেশ বাবা, বেশ। এইবার দড়িটা ধরে নেমে যা। কিচ্ছু ভয় নেই। ওরা যখন আমাকে আটকে রাখে আমি তখন এমনি করেই পালিয়ে যাই। এ কথা আবার বলিস্ না যেন কাউকে।

মুক্তির সম্ভাবনা মিকাকে চঞ্চল, অস্থির করে তুলল। মা’র কাছ থেকে বিদায় নেবার কথা তার আর মনে রইল না। দ্রুত দড়ি বেয়ে নেমে পড়ল সে। একটু বাদেই মাটিতে। মাটি! সত্য সত্যই মাটি যে! ‘আঃ’—মিকা মুক্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। উপর দিকে চেয়ে দেখল একবার। দড়িটা সঙ্গে সঙ্গে টেনে নিয়ে গিয়েছে। নাঃ, কিছুই দেখা যায় না। জানালাটা বুঝি বন্ধ করে দিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *