তেরো
ভগ্ন, জীর্ণ, শ্রীহীন জেরুজালেম নগরী। যাকে ঘিরে প্রাচীর দাঁড়িয়ে নেই, বৃথা তাকে নগরী নাম দেওয়া। যেন কোন এক ধর্ষিতা রমণীর নগ্ন শবদেহ পড়ে আছে। পথে চলতি মানুষ আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলে, দেখ দেখ, সেই মৃত নগরীর স্মৃতিচিহ্ন। পরজাতীয়েরা ইহুদীদের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিত করে হাসে। অথচ এই নগরীতেই শত শত বছর ধরে কত মহা মহা রঙ্গনাট্য অভিনীত হয়ে গেছে।
রাজপথগুলো সব কোথায় গেল? আজ আর তাদের খুঁজে বের করবার উপায় নেই, তাদের চিহ্নটুকুও মিলিয়ে গেছে। গরীব ইহুদীরা এখানে ওখানে এলোমেলোভাবে বস্তি বেঁধে বাস করছে। মনে হয় কোন যাযাবর জাতি যেন চলতে চলতে দু’দিনের জন্য অস্থায়ীভাবে ডেরা বেঁধে বসেছে। ওদের চোখে আলো নেই, কোনমতে শরীরটাকে টেনে টেনে চলেছে। মিকার মনে হোল, এরা তো মানুষ নয়, বুঝি বা মানুষের প্রেতচ্ছায়া। এতদিনের স্বপ্ন দেখা জেরুজালেম নগরীতে প্রবেশ করবার মুখেই এ কি দৃশ্য তার চোখে পড়ল! শদরাই বা কি ভাবছে!….
নেহেমিয়ার দলকে আসতে দেখে ওরা দূর থেকে ভিড় করে দাঁড়াল, ভয়ে ভয়ে দেখতে লাগল। পারসিক সৈন্যদের উজ্জ্বল শিরস্ত্রাণ, স্বাস্থ্যপূর্ণ গোঁড়াগুলো, আর সুসান- প্রত্যাগত ইহুদীদের সম্ভ্রান্ত চেহারা দেখে ওরা চমকে গিয়েছে। কি জানি ওরা যদি মারে! ওরা যদি জোর করে তাদের ঘরের মেয়েদের টেনে নিয়ে যায়! যদি ওদের ঘরে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়! এমন তো তারা কতবার দেখেছে! ভাল চেহারা দেখলে ওদের ভয় হয়।
আহা, কঙ্কালসার ছোট ছেলেমেয়েগুলো। ওদের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ সুপরিস্ফুট। মিকার মন কেঁদে উঠল। এরাই তো তাদের আপনার লোক। এদের ডাকেই তো তারা এসেছে! মিকা নেহেমিয়াকে জিগ্যেস করল,
তীরশথ, আমরা কি এদের কাছে যাব না? এদের সঙ্গে কথা বলব না?
: না, আমরা প্রথমে মন্দিরে গিয়ে প্রভুর বন্দনা করব। তারপর সমস্ত নগর ঘুরে দেখব, আর নগরবাসীদের সঙ্গে পরিচিত হব।
নেহেমিয়ার দল এগিয়ে চলল। এ কেমন নগরী? মানুষের কাছ থেকে কোন বাধা না পেয়ে ঝোপ ঝাড় জঙ্গল ইচ্ছামত বেড়ে উঠেছে। স্থানে স্থানে পথ এতই দুর্গম যে, যাত্রীরা ভাবছিল, তারা পথ ভুল করে নি তো? না, তারা পথ ভুল করে নি। পথ-প্রদর্শক তাদের আশ্বস্ত করল। মন্দির পর্যন্ত এইভাবেই যেতে হবে!
সবার কাছেই অদ্ভুত ঠেকছিল। এই কি সেই জেরুজালেম? এই জেরুজালেমের ঐশ্বর্য, সমৃদ্ধি আর মাহাত্ম্যের কত কাহিনী শুনতে শুনতে তারা বড় হয়েছে। পবিত্র শাস্ত্রগ্রন্থে প্রভুর নগরীর বর্ণনা পড়তে পড়তে কত চোখের জল তারা ফেলেছে। এই কি সেই নগরী?…..ওদের পা ভারী হয়ে এসেছে, যেন আর চলতে পারে না। মিকা দেখল নেহেমিয়ার মুখও বিষণ্ণ আর গম্ভীর।
কুকুরের মত কি একটা জন্তু ঊর্ধ্ব কর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা সামনে আসতেই শোঁ করে জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে ঢুকল।
ওটা কি?—শদরা চমকে উঠে মিকার হাত ধরল।
: ও কিছু নয়। শেয়াল।
: শেয়াল? কামড়াবে না তো?
মিকা হেসে বলল, ও ইহুদী শেয়াল, ইহুদীদের কিছু বলবে না। কিন্তু একদল ইহুদীর মধ্যে একটি পরজাতীয়াকে দেখে ও হয়তো একটু উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল, সুযোগ পেলেই কামড়াতো।
মিকা কৌতুক করে বললেও, শদরা এ কথা শুনে হাসতে পারল না। তার মনে হোল কথাটার মধ্যে যেন ভবিষ্যতের একটা কঠিন সংকেত রয়েছে।
আর একটু এগোতেই একটা ঘন জঙ্গলের মধ্য থেকে হঠাৎ একটা গর্জন শুনে সমস্ত দলটা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু পরক্ষণেই তারা হেসে উঠল।
একমাত্র শদরাই হাসে নি। তার ভয়টা তখনও কাটে নি।
: ওটা কি মিকা? কি অমন করে ডেকে উঠল? বাবা, কি বিকট আওয়াজ!
মিকা হেসে বলল, ভয় পেয়েছ বুঝি? আরে না না, ভয় কিসের, ওটা একটা বুনো গাধা।
: বুনো গাধা? অমন করে চ্যাচাচ্ছে কেন?
: হয়তো বা–থাক, বলব না।
: না না, ‘থাক’ কেন, বলো, বলো, হয়তো বা—?
: হয়তো বা মত্ত হয়ে ওরা সঙ্গিনীকে অনুসন্ধান করে ফিরছে। আর সাড়া না পেয়ে ব্যাকুল হয়ে ডাকাডাকি করছে।
: ইস্, জেরুজালেমে পা দিতেই তোমার মুখ একেবারে খুলে গেছে যে। আচ্ছা, বুনো গাধার মনের কথা তুমি কি করে জানলে?
: কেন, পোষা গাধাটার মনের ভাব দেখে। এইমাত্র আমি মনে মনে ভাবছিলাম, এই একটি দিনে আমিও যেন আমার সঙ্গিনীকে হারিয়ে ফেলেছি। আর ভেতর থেকে মনটা আমার থেকে থেকে অমনি করেই যেন চেঁচিয়ে উঠছিল। তাই বুনো গাধাটার মনে কথাটা বুঝতে একটুও দেরী হয় নি।
শদরা চোখ তুলে মিকার চোখের উপর রাখল। মিকার চোখ দু’টি হেসে উঠল। ওই হাসিটুকু দেখলেই শদরা দুঃখকষ্ট ভয় ভাবনা সব কিছু ভুলে যায়।
এর জন্য তৃষ্ণায় আকুল হয়ে ছটফট করে মরছিল সে।
: মিকা, তুমি ঠিকই বলেছ, এই একটি দিনে তুমি আমার কাছ থেকে কতদূরে সরে গিয়েছিলে! উঃ, কত-যে কষ্ট তুমি আমায় দিয়েছ! আমি কত কি-যে ভেবেছি!
: তুমি বিশ্বাস করো, আমি তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারব না। কোন দিন না।
: মিকা, মাঝে মাঝে বাইরের সংসারটা এমনভাবে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের মাঝখানে যে, আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। তখন আমার মনে হয় আমি বড় একা, আমার আর কেউ নেই। আর হয়তো তখন তোমার উপর অবিচার করি। মিকা, আমাকে ক্ষমা করো। আমি বড় বোকা।
শদরার মনে অদম্য ইচ্ছা জাগল একবার মিকার বুকে মুখ লুকিয়ে ইচ্ছা মত কেঁদে আপনাকে সে হালকা করে নেবে। কিন্তু এত মানুষের সামনে তা কি হয়?
অবশেষে তারা মন্দিরের কাছে এসে দাঁড়াল। পথ-প্রদর্শক হাত তুলে দেখাল, এই- যে প্রভুর মন্দির। না বললেও চলত, কাঁসী ঘণ্টা-করতালের মিলিত শব্দে একথা বুঝতে কারু আর বাকী ছিল না। মন্দিরের অঙ্গনের এক কোণে একজন নথীনীয় হাঁড়িকাঠে পশু বলি দিয়ে চলেছে। আর দু’জন তাকে সাহায্য করছে। পাশেই একদল ভেড়া রোমন্থন করতে করতে ধৈর্যের সঙ্গে আপনাদের পালা কখন আসবে, যেন তারাই জন্য প্রতীক্ষা করছে।
মন্দিরের চেহারা দেখে সবাই হতাশ হয়ে গেল। তাদের চোখে মুখে তারই চিহ্ন পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছিল। এই কি সেই প্রভুর মন্দির! প্রবাসী ইহুদীরা তাদের নির্বাসিত জীবনে এই মন্দির-সম্পর্কে কত কথাই শুনে এসেছে! ইসরায়েল সন্তানেরা ভাগ্যের নিষ্ঠুর খেলায় যে যেখানে নিক্ষিপ্ত হয়ে থাকুক না কেন, এই মন্দিরের সঙ্গে সকলের জীবনই অদৃশ্যসূত্রে আবদ্ধ। চিরকার শুনে এসেছে, যিহোবার মন্দিরের মত মন্দির কোন জাতির কোন দেবতার নেই। যিহোবার চেয়ে বড় দেবতা আর কে আছে! কিন্তু আজ বাবিলের বাল দেবতার অভ্রভেদী স্বর্ণমণ্ডিত মন্দিরের কথা স্মরণ করে তাদের মনটা বড় সংকুচিত হয়ে পড়ল।
নেহেমিয়া তাদের মুখের ভাব দেখে তাদের বুঝিয়ে বললেন,
: রাজা সলোমন যে-মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যে-মন্দিরের কথা তোমরা এত কাল শুনে এসেছ, এ মন্দির সে মন্দির নয়। বাবিলরাজ নেবুকাডনাজারের ক্যালদীয় সৈন্যবাহিনী সেই মন্দিরকে পুড়িয়ে ভস্মসাৎ করে দিয়েছিল। তারপর বহুকাল জেরুজালেমে প্রভুর মন্দির ছিল না। ক্যালদীয়রা জান তো এই মন্দিরের মধ্যেই আমাদের জাতির প্রাণ। সেজন্যই তারা প্রভুর মন্দিরকে ধ্বংস করে দিয়ে ইহুদী জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছে।
আবার। আবার সেই কথাই ফিরে ফিরে আসে। কথাটা শদরার মনের উপর বড় জোরে এসে ঘা মারল। শদরা, তুমি ক্যালদীয় আর এরা সবাই ইহুদী। মিকা তাদেরই একজন।
ওদের মধ্যে কেউ কেউ বলে উঠল, : হ্যাঁ, হ্যাঁ, এবার আমাদের মনে পড়েছে। বাবিলরাজের পতনের পর সম্রাট সাইরাসের অনুমতি পেয়ে নির্বাসিত ইহুদীরা স্বদেশে ফিরে এসে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেছিল।
নেহেমিয়া মাথা নেড়ে বললেন, তোমরা ঠিক বলেছ।
ইহুদীরা নতজানু হয়ে মন্দিরের ভিত্তি চুম্বন করল। তারপর সবাই একযোগে প্রভুর কাছে প্রার্থনা করে চলল। শুধু একজন দাঁড়িয়ে রইল। সে শদরা। মিকা হঠাৎ চমকে উঠে দেখল প্রার্থনারতদের মধ্যে শদরা নেই। কোথায় গেল শদরা? পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল, শদরা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যস্ত হয়ে মিকা তাকে চোখের ইঙ্গিতে ডাকল। কিন্তু শদরা দেখেও দেখল না, উদ্ধতভাবে ঘাড় বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সর্বনাশ! কেউ যদি দেখে ফেলে, কি মনে করবে!
মিকা উঠে গিয়ে তাকে হাত ধরে টানল। শদরা এ ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিল। বিষম বিপদ যে! মিকা তার কোন বাধা মানল না, জোর করে টেনে নিয়ে এস তাকে তার পাশে বসিয়ে দিল। শদরা মাটির উপর ভেঙ্গে পড়ল। রাগে, অভিমানে তার চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে জল পড়তে লাগল। বিশেষ বেমানান হোল না। কেননা প্রার্থনারতদের মধ্যে অনেকেই কাঁদছিল। কাঁদবারই তো কথা।
প্রার্থনা শেষ করে সবাই উঠে দাঁড়াল, প্রভুর বন্দনাগান গাইতে শুরু করল— ধন্য যিহোবা, ধন্য যিহোবা! কিন্তু মিকার গলা দিয়ে গান ফুটল না। গাইবার মত মেজাজ তার ছিল না। সকলের অলক্ষ্যে তার আর শদরার মধ্যে যে-ছোট্ট ঘটনাটি ঘটে গেল, তার গুরুত্ব-সম্বন্ধে তার মনে কোনই সন্দেহ ছিল না। তার পরিণতির জন্য সে সশঙ্কচিত্তে অপেক্ষা করছিল। একবার একটু আপোষ করার চেষ্টা করল। আর সবার চোখে আড়ালে তার হাতে সঙ্গে হাত মিলাল। শদরা তার হাত সরিয়ে নিল না। কিন্তু তার আড়ষ্ট হাতটা যেন মরে গেছে। মিকা তার মুখের দিকে চেয়ে একবার হাসল, কিন্তু ওর চোখে মুখে তার কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। মিকার ভয় হোল, এ যেন রাগ নয়, অভিমান নয়, তার চাইতেও বড় কি একটা জিনিস, যার নাম সে জানে না। মিকা দস্তুরমত ভীত হয়ে উঠল।
নেহেমিয়া এসেছেন, এই সংবাদটা মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। খবর পেয়ে জেরুজালেমের ইহুদীরা চারদিক থেকে জড়ো হতে আরম্ভ করেছে। দেখতে দেখতে মন্দিরপ্রাঙ্গণ জনারণ্যে পরিণত হয়ে গেল। নেহেমিয়ার নাম এখানে খুবই পরিচিত। সুসান রাজপ্রাসাদ থেকে একাধিকবার তিনি এখানকার ইহুদী নেতাদের সাথে বার্তা-বিনিময় করেছেন। তিনি যে পারস্যরাজের বিশেষ প্রিয়পাত্র সে কথাও এখানকার লোকেরা জানে। কিছু দিন থেকেই তারা বাবিল বা সুসান থেকে সংবাদের জন্য প্রতীক্ষায় বসে ছিল। নেহেমিয়া যখন এসেছেন, তখন নিশ্চয়ই ইহুদীদের জন্য সুসমাচার বহন করে নিয়ে এসেছেন। এই আশা নিয়ে দলে দলে লোক ছুটে আসছে। আসছে তো আসছেই।
মিকা দেখল, এই ইহুদীরা তো বস্তিবাসী সেই গরীব ইহুদীদের মত নয়। মন্দিরকে কেন্দ্র করে যে-পল্লীগুলো গড়ে উঠেছে, সেগুলো বেশ ফিটফাট, শ্রীসম্পন্ন ও সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো গুছানো। পারস্যরাজ সাইরাসের সময় যে-সমস্ত প্রবাসী ইহুদী ফিরে এসেছিল তারা আর তাদের বংশধরেরা এই সমস্ত পল্লীর বাসিন্দা। এদের উদ্যোগেই পুরানো মন্দিরের ধ্বংসস্তূপের উপরে এই নতুন মন্দির গড়ে উঠেছে।
মিকার মনে পড়ছিল সেই বস্তিবাসী গরীব লোকগুলোর কথা। আহা, ওরা বুঝি খবর পায় নি। সুখী আর সুন্দর চেহারার ইহুদীরা সবাই এসেছে, কিন্তু ওরা কোথায়? ইহুদীরা একই যিহোবার সন্তান, তাদের মধ্যেও কি তবে ছোট বড়, উঁচু নীচু ভেদাভেদ রয়েছে? এখানকার বাড়ীঘরগুলো কি সুন্দর! আর ওখানে? এখানকার ছোট ছেলেমেয়েগুলো কি হাসিখুশী, আনন্দে উজ্জ্বল! আর ওখানে? এখানকার ইহুদীরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ভদ্র। আর ওখানে? এ কেমন করে হয়? ঠিক এই জিনিসই তো সে দেখেছে বাবিলে— ক্যালদীর আর ইহুদীদের মধ্যে।
সন্দেহ মেটাবার জন্য মিকা নেহেমিয়ার কাছে প্রশ্নটা তুলল। নেহেমিয়া এর উত্তরে কোন কথা বললেন না। শুধু সস্নেহ দৃষ্টিতে মিকার মুখের দিকে চেয়ে একটু হাসলেন। মিকা এই ক’দিনের ঘনিষ্ঠ মেলামেশার ফলে নেহেমিয়ার স্বভাবটা কিছু কিছু বুঝতে পেরেছিল। মুখের ভাব দেখে সে বুঝল, এখন তিনি এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজী নন। কেন? প্রশ্নটা মিকার মাথায় অনবরত পাক খেতে লাগল। আর সে ভাবতে লাগল, নেহেমিয়ার ঐ হাসিরই বা অর্থ কি?
প্রধান যাজক এলিয়াশিব আর জেরুজালেমের অন্যান্য ইহুদী নেতারা এগিয়ে এসে অভ্যর্থনা জানালেন নেহেমিয়াকে।
তাঁরা বললেন, আমরা অধীর ও উদ্গ্রীব হয়ে আছ। বলুন, আপনি আমাদের জন্য কি সমাচার বহন করে এনেছেন?
: ডাকুন সবাইকে। আমি আমাদের সমস্ত ভ্রাতৃমণ্ডলীর সামনে আমার বক্তব্য বলব।
তাঁরা বললেন, সবাই এসেছে। কেউ বাকী নেই। দেখছেন না কত লোক এসে জড়ো হয়েছে?
নেহেমিয়া মাথা নেড়ে বললেন, না, সবাই আসে নি। আমাদের বস্তিবাসী গরীব ইহুদী ভাইয়েরা সব কোথায়? কই, তাদের তো দেখছি না। তাঁরা আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলেন, ওদের দিয়ে কি হবে? ওরা মূর্খ, ওরা এ সব বুঝবে কি? ওদের বলে কি লাভ হবে? ওরা তো জানে শুধু খেতে আর বংশবৃদ্ধি করতে।
মিকা স্তম্ভিত হয়ে গেল। এ সব বলছে কি এরা? ইহুদী যদি তার ইহুদী ভাই- সম্পর্কে এমন কথা বলতে পারে, তবে ক্যালদীয়রাই বা কি দোষ করেছিল? ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে মিকা নেহেমিয়ার মুখের দিকে তাকাল। কিন্তু নেহেমিয়ার মুখে কোনই ভাব পরিবর্তন লক্ষ করা গেল না।
তিনি শান্ত অথচ দৃঢ়কণ্ঠে বললেন,
না, আমি এমন কোন কথা বলব না, যা এরা বুঝতে পারবে না। আমার বক্তব্য আমি আমার সমস্ত ইহুদী ভাইদের কাছেই খুলে বলতে চাই। আমি কাউকে বাইর রাখতে চাই না। আপনাদের কাছে দেবার জন্য অনেক শুভ সংবাদ এনেছি, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বহু গুরুভার দায়িত্বও আমাদের গ্রহণ করতে হবে। এই দায়িত্ব প্রতিপালন করতে হলে প্রতিটি ইহুদীর সহযোগিতা চাই। ছোট বড় কাউকে বাদ দিলে চলবে না। আপনারা ওদের ডাকুন।
নেহেমিয়ার কথার সুরে আর তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে জেরুজালেমের ইহুদী নেতারা বুঝতে পারলেন, এ তাঁর অনুরোধ নয়, এ আদেশ এবং এ আদেশ অমান্য করা চলে না।
সংবাদ পাঠানো হোল। কিছুক্ষণ বাদেই পিঁপড়ের জাঙ্গালের মতো দলে দলে লোক আসতে লাগল। তারাও ইহুদী, কিন্তু ঠিক এই ইহুদীদের মত নয়। ওদের পরনের কাপড়চোপড় নোংরা, ওদের চাল চলতি ভালো নয়, তাই ওরা ভদ্রসমাজের আসরে জায়গা পায় না। আজ হঠাৎ এমন অসময়ে ওদের ডাক পড়ল কেন? ওদের চোখে মুখে তাই দুশ্চিন্তার রেখা ফুটে উঠেছে। মনে মনে ভয় আর সন্দেহ, কি জানি, ওদের মাথার উপর আবার কোন নতুন কর চাপাবার ষড়যন্ত্র চলেছে না তো?
: তোমরা সবাই বসে পড়ো, বসে পড়ো, বসে পড়ো!
উপরওয়ালাদের এই হুকুম শুনে ভীরু মেষশাবকগুলো যে যেখানে দাঁড়িয়েছিল গুটি গুটি বসে পড়ল। নেহেমিয়া এক দিক থেকে আর এক দিক পর্যন্ত চোখের দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে খুশী হয়ে বললেন—হ্যাঁ, এইবার দেখুন তো, সমাজ এবার কেমন জমেছে! এদের বাদ দিলে আপনাদের জমায়েত কি অসম্পূর্ণ থাকত না?
ইহুদী নেতারা নেহেমিয়ার এই কথায় কেমন যে একটু সংকোচ বোধ করে মাথা নত করলেন। আশ্চর্য, নেহেমিয়া কোন্ দেশ থেকে এই অদ্ভুত এক লজ্জা নিয়ে এলেন! ছোট লোকদের ছোট মনে করার মধ্যে-যে কোন লজ্জা থাকতে পারে, এমন কথা কে-ই বা ভাবতে পেরেছিল।
নেহেমিয়া অভিজ্ঞ, করিৎকর্মা ও বহুদর্শী লোক। শৈশব থেকে শরীর খাটিয়ে শরীর পোষণ করে এসেছেন, শ্রমের মূল্য তাঁর অজানা ছিল না। নগরীর পুনর্গঠনের কাজে সবচেয়ে সহায়ক হবে কারা, সে কথা ভাল করেই তিনি জানেন। যখন তিনি তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, তখন তাঁর দৃষ্টি বিশেষভাবে নিবন্ধ রইল পেছন দিকের ঐ নোংরা শ্রীহীন লোকগুলোর দিকে। আর তারাও যেন অনুভব করতে পারছিল যে, বিশেষভাবে তাদের উদ্দেশ্য করেই কথাগুলো বলা হচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে সেই অবহেলিত মানুষগুলো নেহেমিয়াকে তাদের আপনার মানুষ বলে মনে করে নিল।
নেহেমিয়া বলছিলেন ইহুদীদের নির্বাসিত জীবনের করুণ কাহিনী। দীর্ঘ দিনের সেই নির্যাতনের ইতিহাস। ক্যালদীয়দের সেই নৃশংস অত্যাচারের কথা শুনতে শুনতে নির্বাক জনতা বিক্ষুব্ধ ও চঞ্চল হয়ে উঠছিল। নেহেমিয়া আবেগময় বক্তা নন, কিন্তু তাঁর প্রতিটি কথা যেন শ্রোতার অন্তরে গিয়ে বিদ্ধ হয়ে থাকে। অবাক হয়ে ভাবছিল মিকা, এত শক্তি নেহেমিয়া কোথা থেকে সঞ্চয় করলেন!
অবশেষে নেহেমিয়া যখন ঘোষণা করলেন যে, সম্রাটের অনুগ্রহে সমস্ত নির্বাসিত ইহুদীদের মুক্তির আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং আচার্য ইষ্রার নেতৃত্বে সহস্রাধিক ইহুদীর প্রথম দল বাবিল থেকে জেরুজালেমের দিকে যাত্রা করেছে, তখন এই অপ্রত্যাশিত সংবাদে ভদ্র ও অভদ্র ইহুদী সন্তানগণ সমস্বরে আনন্দধ্বনি করে উঠল।
নেহেমিয়া একটু থামলেন। সেই আনন্দ-কোলাহলে তাঁর কণ্ঠ চাপা পড়ে গিয়েছিল। তারপর তিনি জানালেন, তার যে শুধু নিজেরাই আসছেন তা নয়, মন্দিরের উন্নতিকল্পে অজস্র স্বর্ণ, রৌপ্য ও অন্যান্য বহুমূল্য দ্রব্য তাঁরা নিয়ে আসছেন সঙ্গে করে। ইহুদীদের স্বর্ণযুগে রাজা সুলেমান যে-ভাবে বিশ্বের বিস্ময় সেই প্রথম মন্দির গঠন করেছিলেন, এবারও তারই পুনরাবৃত্তি ঘটবে। উত্তেজনায় আনন্দে শ্রোতাদের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।
তিনি আরও বললেন, আমরা এই নগরীর ভগ্নাবশেষকে পুনর্গঠিত করে তুলে তাকে পূর্ব গৌরবে প্রতিষ্ঠিত করবো। আবার আমরা গেঁথে তুলব সেই প্রাচীর, ক্যালদীয় দস্যুরা যাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল।
পেছন থেকে দাঁড়িয়ে একজন যুবক কি যেন বলতে যাচ্ছিল। সামনের দিকের লোকেরা তাকে বসে পড়ো, বসে পড়ো, বলে বসিয়ে দিল।
না, না, ওকে বলতে দিন।—নেহেমিয়া ডেকে বললেন!
সাহস পেয়ে যুবকটি আবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল, এই নগরীকে কি করে গড়ে তুলব আমরা? ওরা-যে বাধা দেবে।
: ওরা কারা?
: বিদেশী রাজভৃত্যেরা। নগরের অধিকাংশ জায়গা, ঝোপঝাপে, জঙ্গলে ভর্তি হয়ে গেছে, সাপখোপ আর নানারকম বুনো জানোয়ার এসে সেখানে বাস করে। রাস্তাঘাটের চিহ্নমাত্র নেই, চলাচলের বিষম অসুবিধা। আমরা নিজেরা যদি জঙ্গল কেটে সাফ করতে যাই বা রাস্তাঘাট বানাতে যাই, এই বিদেশী ও পরজাতীয় রাজভৃত্যেরা হুমকি দেয়, বলে— তোরা এ সব করতে পারবি না। সম্রাটের হুকুম নেই। ইহুদীদের নগর যেমন আছে, তেমনি পড়ে থাকবে। আরও কত রকমের জোর জুলুম-যে চলে, তা বলে শেষ করা যায় না।
: না, না, ভয় নেই। এখন আর ও সব কথা চলবে না। আমরা আমাদের নগর গড়ে তুলব। কেউ যদি বাধা দিতে আসে, সে বাধা আমরা মানব না।
: মানব না?—শঙ্কিত প্রশ্ন ওঠে সামনের সারি থেকে।
: না, মানব না। কারণ সম্রাটের অনুমতিপত্র আমাদের হাতে রয়েছে। যারা এর বিরুদ্ধে বাধা দেয়, তারা রাজদ্রোহী।
মানব না, মানব না,–পেছনের সারি থেকে ধ্বনি উঠতে থাকে। নদীর তরঙ্গের মত উত্তেজনা সামনের দিকে ছুটে আসে। এবার পেছনের লোক আর সামনের লোক কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে ঘোষণা করে চলে, মানব না, মানব না।
শুধু কয়েকটি লোক শুকনো মুখে আর শঙ্কিত চোখে এই মত্ত জনতার দিকে তাকায়। নেহেমিয়ার দৃষ্টি এড়ায় নি। এদের মনের কথা তিনি-যে একেবারে না বোঝেন তা নয়।—সুসান অনেক দূর, আর সনবল্লাট আর টোরিয়া-যে একেবারে বুকের উপর দাঁড়িয়ে।
নেহেমিয়া বললেন, এবার আমার শেষ কথা আপনারা শুনুন। রাজা আমাকে জেরুজালেমের তীরশথের পদে নিযুক্ত করেছেন। কিন্তু এই গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করার ব্যাপারে আমি এখনও ইতস্তত করছি। এই সমস্যার সমাধানের জন্য আমি আপনাদের সাহায্য ভিক্ষা করি। আপনারা যদি আমাকে উপযুক্ত মনে করেন, একমাত্র তাহলেই আমি এই প্রস্তাব মাথা পেতে নেব।
আবার তুমুল হর্ষধ্বনি উঠল। আর এই মিলিত আনন্দ-কোলাহলের মধ্য দিয়েই হর্ষোৎফুল্ল জনতা তার সম্মতি জ্ঞাপন করল। পেছন দিকের লোকেরা এগিয়ে এল সামনের দিকে, নেহেমিয়াকে আরও ভাল করে দেখবার জন্য। তাদের নোংরা পোশাকের সঙ্গে সামনের লোকদের পরিচ্ছন্ন পোশাকের ঘেঁষাঘেঁষি মাখামাখি হয়ে গেল। তাদের শক্ত সবল পায়ের নীচে কত নরম নরম পা চাপা পড়ল। কিন্তু সেজন্য আজ কেউ কিছু মনে করল না। অন্তত এই সময়টুকুর জন্য ইহুদীর জাতীয়তাবোধ ও ভ্রাতৃত্ববোধ উঁচু নীচু ভেদাভেদকে ছাপিয়ে উঠতে পেরেছে।
মিকা স্বভাবতই আবেগপ্রবণ। জনতার এই ভাবাবেগ ও উচ্ছ্বাস তাকে অভিভূত করে ফেলেছিল। তবু তার মধ্যেও হঠাৎ মনে পড়ে গেল শদরার কথা। মিলন ও ঐক্যের এই অপূর্ব সমাবেশ তাকেও কি একটু উদ্দীপিত করে তোলে নি? কিন্তু কোথায় শদরা? তার পাশে নেই তো! উদ্বিগ্ন হয়ে চারদিকে তাকাতেই দেখতে পেল, একটু দূরে, লোকের সংস্রব এড়িয়ে একটা গাছের নীচে বসে আছে শদরা। এই আনন্দ-কোলাহলের এক ধারে সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কি এক গভীর চিন্তায় সে মগ্ন! এ কি? এ কেন? সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল মন্দিরের সামনে প্রার্থনার সময়কার সেই ঘটনাটি। কি আশ্চর্য, এখনও কি তারই জের চলেছে? সে কিছুই বুঝতে পারছিল না। শুধু একটা অজানা ভয়ে কেঁপে উঠল তার বুক। এ কেমন হোল? এই পরিপূর্ণ আনন্দের লগ্নে শদরা কেন তার কাছ থেকে এত দূরে সরে যাচ্ছে?
কাছে গিয়ে মিকা তার মাথার উপর হাত রাখল। শদরা চমকে উঠে তার দিকে চাইল। কিন্তু কি ক্লান্ত সেই চাহনি!
