পাপের সন্তান – ৬

ছয়

কিসের একটা শব্দ। মিকার ঘুম ভেঙ্গে গেল। কেমন-যে পাতলা ঘুম, সামান্য একটু খুটখাট শব্দ, তাতেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। সমস্ত ইহুদীপাড়া নিঃসাড় হয়ে ঘুমোচ্ছে। কোন সাড়া শব্দ নেই। শুধু কাদের একটা ছোট্ট বাচ্চার মাঝে মাঝে কেঁদে উঠছে।

ঘুম আর আসছে না চোখে। না আসুক, মিকার তাতে কোনই আফশোস নেই। কি অদ্ভুত সুন্দর একটা রাত্রি। খোলা জানালা দিয়ে দেখল মিকা, সমস্ত পৃথিবী যেন জ্যোৎস্নায় হাসছে। দিনের বেলা যা-কিছু অতি সাধারণ বলে মনে হয়েছিল, জ্যোৎস্নার যাদুমন্ত্রে তারাও অপূর্ব সুষমায় মণ্ডিত হয়ে উঠেছে। কি ভালই-যে লাগছে! আর সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়ল, এমন কত রূপের ঢেউ তোলা রাত্রি সে অবহেলার ভরে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে! অন্ধ মানুষ, সৌন্দর্য শ্রী তোমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে, তুমি তাকে দেখেও দেখতে পাও না।

জানালা দিয়ে এক ফালি জ্যোৎস্না ঘরের এক দিকে এসে পড়ছিল। বাদ বাকী সব অন্ধকার। ঘরের এক দিকে আলো, এক দিকে অন্ধকার। কিছু দেখা যায়, কিছু দেখা যায় না। মিকার নিজের জীবনের মতই। কে ছিল তার মা, কে ছিল তার বাবা, কোথায় ছিল তাদের ঘরবাড়ী, এ প্রশ্ন চিরদিনের মতই নিরুত্তর থেকে যাবে। সেই অজানা গভীর নীরন্ধ্র অন্ধকারে একটি সামান্য আলোক-রেখাও তো এসে পড়বে না? অব্যক্ত যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠে মন। এ দুঃখ কাউকে বলে বোঝানো যায় না।

অবাক হয়ে ভাবল মিকা, বিচিত্র মনের গতি। জ্যোৎস্নাপ্লাবিত পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে কি অপূর্ব আনন্দে ভরে উঠছিল তার মন। বাইরের আকাশের মত মনের আকাশেও যেন চাঁদ উঠেছিল। আর সেই জ্যোৎস্না পান করে তার দেহ মন রসাবেশে টলমল করে উঠেছিল। কিন্তু এক মুহূর্তেই এ কোন কালো মেঘের ছায়াপাত। বাইরে এখনও সুন্দরী পৃথিবী তেমনি করে জ্যোৎস্নার হাসি হাসছে। আর এদিকে মিকার মনে এ কি দুঃখের ছায়া জ্যোৎস্নাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। ঘরের এক দিকে আলো, এক দিকে অন্ধকার। এ রহস্যের সমাধান কেমন করে সে পাবে?

কেমন একটা অস্বস্তি বোধ করছিল সে। কিছুক্ষণ ধরেই মাঝে মাঝে ঘরের মধ্যে কার যেন একটা অস্ফুট পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কে যেন অতি সন্তর্পণে হেঁটে চলেছে। মাঝে মাঝে একটু খুটখুট শব্দ। ইঁদুর টিদুর হবে হয়তো। কিন্তু ও কি? মুমূর্ষু পশুর মত কে যেন একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। মনের ভুল বলে আপনাকে সে আশ্বস্ত করতে চাইল। কিন্তু কাকে বুঝ মানাবে সে! আবার একটা নিঃশ্বাসের শব্দ। আস্তে আস্তে শরীরটা তার কেমন যেন ভারী আর আড়ষ্ট হয়ে আসছে। দস্তুরমত ভয় পেয়ে গেছে সে। পেছন দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখবে, সে সাহসটুকুও নেই। কে জানে পেছন ফিরে তাকালে কি দেখবে! ঘরের একদিকে আলো, একদিকে অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের মধ্যে কত কি-যে থাকতে পারে, কে-ই বা জানে!

মিকার কেবলই মনের হতে লাগল, তবে কি তার জীবনের সেই অন্ধকার গুহা থেকে লুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীরা তার ডাক শুনে একে একে তার কাছে ফিরে আসছে? হয়তো পেছনের ওই অন্ধকারপুঞ্জ এখনই কথা বলে উঠবে—”মিকা, আমি তোর মা। তুই আমায় ডাকছিলি? কবরের মধ্যে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমার স্তন দুধের ভারে টনটন করে উঠল। থাকতে পারলাম না, আমি ছুটে চলে এলাম। আমি উড়ে চলে এলাম।” হয়তো তার পাশ থেকে আর একজন বলবে—”মিকা, আমি তোর বাবা। তুই আমাদের অমন করে ডাকছিলি কেন? তোর ডাকে আমরা-যে না এসে পারলাম না। অমন করে আমাদের আর ডাকিস্ না, আমরা-যে বড় কষ্ট পাই।”

মিকার মনে হোল অন্ধকারপুঞ্জ যেন একটু একটু করে কাছে এগিয়ে আসছে। এবার কি ওরা হাত বাড়াবে? মিকার সমস্ত শরীর সংকুচিত আর কাঠ হয়ে এল। না না না, মিকা ওদের দেখতে চায় না, ওদের কথা শুনতে চায় না, ওদের স্পর্শ পেতে চায় না।—তোমরা যাও চলে যাও, যেখান থেকে এসেছো, সেখানে ফিরে চলে যাও।

আবার একটা নিঃশ্বাস পড়ল। এবার স্পষ্ট, সন্দেহ নেই। মিকা প্রশ্ন করতে চাইল—কে? কিন্তু তার গলা দিয়ে স্বর ফুটল না। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল, তাই তো, পাগলাবাবা কোথায়? এতক্ষণ তার কথা ভুলেই গিয়েছিল। তার কথা মনে পড়তেই এক ছুটে সে পাগলাবাবার বিছানাটার উপরে গিয়ে পড়ল। কিন্তু অবাক কাণ্ড, বিছানায় কেউ নেই। কি হোল? কোথায় গেল সে? কিন্তু বেশী ভাববার সময় ছিল না। তার দেহের সমস্ত রক্ত হিমশীতল করে দিয়ে পেছনের অন্ধকারপুঞ্জ বিকৃত কণ্ঠে হাঃ হাঃ করে হেসে উঠল, আর সঙ্গে সঙ্গে একটা গুরুভার বোঝা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

সহজাত আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি মিকাকে সচেতন ও সাহসী করে তুলল। ওই অজ্ঞাত ও রহস্যময় আক্রমণকারী তার বুকের উপর চেপে বসেছে, তার সাঁড়াশীর মত লম্বা আঙ্গুলগুলো মিকার কণ্ঠনালীকে আঁকড়ে ধরেছে। মিকার দম বন্ধ হয়ে আসবার মত হোল। এ কি ভূত, না চোর ডাকাত, না অজানা কোন এক জন্তু—এ কে? অত কথা কি ভাববার সময় ছিল! জীবনের মায়ায় মরিয়া হয়ে উঠল মিকা। তার প্রবল ধাক্কায় বুকের উপরকার বোঝাটা ছিটকে পড়ে গেল। আর মিকা লাফিয়ে উঠে তাকে চেপে ধরল। আশ্চর্য একটু কাতরোক্তি করে সেই রহস্যময় ভূত বা মানুষ বা জন্তুটা একদম নির্জীব হয়ে পড়ে রইল, কোন রকম জোর করল না। মিকা চাদর দিয়ে চটপট তাকে বেঁধে ফেলল। আশ্চর্য, সে একটুও বাধা দিল না।

উত্তেজনায় মিকার হাত পা কাঁপছিল। ঘরের বাতিটা খুঁজে বের করে জ্বালাতে তার বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগে গেল। সে ভাবছিল, আলো জ্বলে ওঠবার সঙ্গে সঙ্গে কি এক দৃশ্য তার সম্মুখে উদ্ঘাটিত হয়ে যাবে। কে এ? ভূত কি কখনও মানুষের হাতে বাঁধা পড়ে? মানুষ? কে তাকে হত্যা করতে চায়? কেনই বা হত্যা করবে?

বাতিটা জ্বলে উঠতেই তার উজ্জ্বল আলোয় ফুটে উঠল একটি দীর্ঘ দেহ, হাত পা- বাঁধা, মাটির উপর চিৎ হয়ে পড়ে আছে। তার সুপরিচিত শুভ্রকেশ আর শুভ্রশ্মশ্রু তরঙ্গিত হয়ে নেমে এসেছে। একটা কাতরোক্তি করে দুই পা পিছিয়ে এল মিকা— “হায় যিহোবা, এ তুমি আমায় কি দেখালে?”

সকলের শ্রদ্ধার, ভালবাসার, আর পরম আদরের পাত্র—পাগলাবাবা।

: হায় যিহোবা, কত বিস্ময় তুমি আমার জন্য সঞ্চিত করে রেখেছো?

আর কোন কথা না বলে তাড়াতাড়ি পাগলাবাবার হাত আর পায়ের বাঁধন খুলে দিল মিকা। যত্নের সঙ্গে তাকে ধরে উঠিয়ে বসাল। পাগলাবাবা কোন কথা বলল না। যেমনভাবে বসেছিল, তেমনি বসে রইল। মিকাও কোন কথা বলতে পারছিল না।

কিছুই বুঝতে পারছে না মিকা। তবু তার চোখে অসহ্য জ্বালা করে উঠল। পাগলাবাবার মনের কথা কতটুকুই বা সে জানে! তবু তার মুখের দিকে চেয়ে তার মনটা হু হু করে কেঁদে উঠল। হায় প্রভু, তুমি মানুষকে এত দুঃখ দাও কেন? এই কি তোমার খেলা?

পাগলাবাবাই প্রথমে মুখ খুলল-

: তুমি কে?

: মিকা।

: মিকা কে?

: মনে নেই পাগলাবাবা, আমরা দু’জনে-যে এই ঘরে একই সঙ্গে রাত কাটালাম?

পাগলাবাবা মিকার দিকে কতক্ষণ কটমট করে তাকিয়ে থেকে শেষে বলল,

: তুমি কি ক্যালদীয়?

: না, আমি ইহুদী।

: ইহুদী? সত্যি বলছ তুমি ইহুদী? না তুমি দো-আঁশলা?

: না পাগলাবাবা, আমি খাঁটি ইহুদী।

: তোমার বাবা-মা?

: তাঁরা আমার শৈশবেই মারা গেছেন। তাঁদের কথা আমার মনে নেই।

: মনে নেই! তবে কি করে জানলে-যে তুমি খাঁটি ইহুদী?

: যারা জানতো তারা বলেছে।

: তারা বলেছে! তারা কি জানে? কতটুকুই বা জানে?

পাগলাবাবা তার পরিচিত ভঙ্গীতে হতাশভাবে মাথা নাড়াতে লাগল।

: পাগলাবাবা, অমন কথা বলছেন কেন?

: ইহুদী! ইহুদী বলতে কি আর কেউ আছে! যা দেখছো সব ভেজাল, সব ভেজাল। ইহুদীদের ঘরে যত মেয়ে আছে, ওরা সবাইকে নষ্ট করেছে। ইহুদী মেয়েরা ক্যালদীয়দের কাছ থেকে বীজ গ্রহণ করে যে-সব চারা গাছের সৃষ্টি করে চলেছে, তাদের তুমি বলবে খাঁটি ইহুদী? এ দেশে খাঁটি ইহুদী তুমি কোথায় পাবে? আমি কি জানি না? আমার চেয়ে কেই বা বেশী জানে? যে নিজের হাতে তার ব্যভিচারিণী মাকে হত্যা করেছে, এ কথা তার চেয়ে বেশী কে জানে?

: পাগলাবাবা, থামুন, থামুন, এসব কি বলছেন আপনি? এমন কথা বলবেন না।

: ঠিক বলেছি। ঠিকই বলেছি আমি।

পাগলাবাবার দু’চোখ থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে আগুন। এ আগুন কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলো, অবাক হয়ে ভাবছিলো মিকা। উত্তেজনা গ্রামের পর গ্রামে উঠতে লাগল। চোখ মুখের ভাব ক্রমেই বদলে যেতে লাগল। পাগলাবাবা কি সত্যই পাগল হয়ে গেল নাকি?

: ঠিকই বলেছি। আমি তাকে হত্যা করেছি। নিজের হাতে হত্যা করেছি। আর কত চাপা দিয়ে রাখব আমি! আর আমি চাপা দিয়ে রাখতে পারি না। সারা জীবন ধরে এই আগুন বুকে নিয়ে আমি জ্বলে পুড়ে মরছি। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি তাকে মেরেছি। বেশ করেছি, মেরেছি।

পাগলাবাবার চোখ মুখের ভাব দেখে মিকা ভয় পেয়ে গেল। কখন কি করে বসে, কে বলবে! সে তাকে শান্ত করতে চেষ্টা করতে লাগল।

: পাগলাবাবা, ভুল বলছেন আপনি। মাকে আপনি কি করে মারবেন? আপনি তো কালই বললেন, জেরুজালেমের ধ্বংসের পর আপনাদের দু’জনের-যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল, তারপর আর কখনও আপনাদের দেখা হয় নি।

পাগলাবাবা গর্জে উঠল : যে বলেছে সে মিথ্যে কথা বলেছে। যদি আমি বলে থাকি, তাহলে আমি ঘোর মিথ্যাবাদী। সত্যি কথা শোনো তবে! আমি সারা বাবিল তন্নতন্ন করে খুঁজে তাকে বের করেছিলাম বারো বছর পরে। তখন আমার বয়স উনিশ।

মাকে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। মা আমার আগেও সুন্দরী ছিল। কিন্তু কি আশ্চর্য, এই বয়সে আগেকার চেয়েও যেন সুন্দরী হয়ে উঠেছে। আগে মা অনেক রোগা ছিল, রীতিমত খাওয়া জুটত না। এখন কিন্তু বেশ মোটাসোটা হয়েছে। অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম তার মুখের দিকে। এই আমার মা? আমাকে অমন করে চেয়ে থাকতে দেখে মা মুখ টিপে কেমন করে যেন একটু হাসল। হাসিটা আমার চোখে ভাল লাগল না। আমার মা তো আগে কখনও এমন করে হাসত না।

মিকা কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল, পাগলাবাবা, কোথায় পেলেন আপনার মাকে? কোথায় থাকতেন তিনি?

: এক ক্যালদীয়ের বাড়ীতে দাসীর কাজ করত। কিন্তু দাসীর মত থাকত না, বেশ আদরেই ছিল। আমার সঙ্গে প্রায়ই দেখা হোত। মাঝে মাঝে দু-এক দিনের জন্য আমার ঘরেও এসে থাকত। কিন্তু এতে আমার সাধ মিটত না। আমার তো আর কেউ নেই, শুধু মা’ই আছে। এত দিনের চেষ্টায় কত খুঁজে খুঁজে তাকে পেয়েছি। কিন্তু তবু পেয়েও যেন তাকে ভাল করে পাচ্ছিলাম না।

মাকে বলতাম, মা, চলো, আমরা এ দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও পালিয়ে যাই— অনেক দূরে অন্য কোন এক দেশে।

মা বলত, দূর পাগল, তা কি হয় রে!

এক দিন আমার মনিব আমাকে ডেকে বললেন—হ্যাঁ, রে, ওই মেয়েমানুষটা বুঝি তোর মা রে? রঙ্গিলা মেয়ে তো। যেন পাকা আঙ্গুরটি, রসে একেবারে টসটস করছে। দেখলেই জিভে জল আসে।

আমার মনিবকে শুধু আমি নয় সবাই বাঘের মত ভয় করে। কিন্তু সেদিন ভয়টয় সব ভুলে গিয়ে এমন কটমট করে তার মুখের দিকে তাকালাম যে, লোকটা যেন একটু ঘাবড়ে গেল! আর কোন দিন আমার কাছে মা’র সম্পর্কে কোন কথা সে বলে নি।

কিন্তু যতই দিন যেতে লাগল, নানারকম কথা কানে আসতে লাগল। আমার এক বন্ধু একদিন চুপি চুপি আমাকে বলল,

: হ্যাঁ, ভাই রাগ করিস্ না। অন্যে হলে বলতাম না। তুই নেহাৎ বন্ধু বলেই বলছি, অমন মায়ের সঙ্গে তুই সম্বন্ধ রাখিস না।

: কেন, কি করেছে আমার মা?

: তবে শোন, তোর মা’র স্বভাব চরিত্র মোটেই ভাল নয়। এত বয়স হোল তবু— যে বাড়ীতে কাজ করে, আমরা তার সব খবরই রাখি। বাড়ীর কর্তার সঙ্গে তার কি-যে সম্বন্ধ তা আর কারু অজানা নেই। দু-দুবার দুটো বাচ্চা হয়েছে, একটু বড় হতে না হতেই বেমালুম কোথায় যে সরিয়ে দিয়েছে, কেউ টের পায় নি। লোকেরা বলে, সেগুলো নাকি দাসের হাটে বিক্রী হয়ে গিয়েছে। মা নয় তো রাক্ষুসী।

এই কথা নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে হাতাহাতি মারামারি হয়ে গেল। চিরদিনের জন্য বন্ধু- বিচ্ছেদ ঘটল। মনের খটকাটা কিন্তু বেড়েই চলল। সে যে কি কষ্টের দিনগুলো! আর চুপ করে থাকতে না পেরে লজ্জার মাথা খেয়ে এক দিন সরাসরি জিজ্ঞাসা করে বসলাম মাকে। মা আমার কথা শুনে যেন অত্যন্ত আহত হয়েছে, এইভাবে কতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। শেষে মুখে কাপড় দিয়ে ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল। সে কি কান্না! কাঁদতে কাঁদতে একেবারে অস্থির হয়ে পড়ল। আমি নিতান্ত অপ্রস্তুত হয়ে মায়ের পা ধরে ক্ষমা চাইলাম। বললাম—আরে, আমি কি এসব কথা বিশ্বাস করেছি না কি!

অনেক বলে-কয়ে সেদিনকার মত মায়ের কান্না থামালাম। মায়াবিনীর মায়াকান্না দেখে ভুলে গেলাম। তবু মাকে বললাম,

: মা, চলো, এই হতভাগা দেশে থেকে কাজ নেই, চলো, আমরা আর কোথাও যাই। পৃথিবীতে এমন কি কোন দেশ নেই যেখানে ক্যালদীয়দের হাত গিয়ে পৌঁছায় না?

মা ছল ছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

: ও, তুই বুঝি এখনও আমাকে বিশ্বাস করতে পারিস্ নি? হায় প্রভু, আমার নিজের পেটের ছেলে, সেও যদি আমায় এমন কথা বলে, তবে আর আমার বেঁচে থেকে লাভ কি!

এরপর আমি আর কোন কথা বলতে পারলাম না।

এইভাবেই দিন চলছিল। ইতিমধ্যে মনিবের খামারের কাজে নগরের বাইরে যেতে হোল। দু’দিন সেখানেই ছিলাম। তিন দিনের দিন ফিরলাম। ফিরতে ফিরতে বেশ রাত্রি হয়ে গিয়েছিল। ঝির ঝির করে পাতলা পাতলা বৃষ্টি পড়ছিল। বইরের দিকে ছোট্ট ঘরটায় আমি একাই থাকি। গুন গুন করে গান করতে করতে ঘরের সামনে এসে দাঁড়াতেই ভেতরে একটি চাপা হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। অবাক কাণ্ড, আমার ঘরে তো বাইরের লোক কেউ আসে না। আর এ সময়ে, এত রাত্তিরে! দরজা আটকানো ছিল, ধাক্কা দিতেই খুলে গেল। দরজাটা খোলার সঙ্গে সঙ্গে যে-দৃশ্য দেখলাম, তা কি কখনও ভাবতে পেরেছি!

পাগলাবাবা একটু চুপ করল। তার কপালের কুঞ্চন-রেখাগুলো আরও ঘন হয়ে উঠেছে। ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমেছে কপালের উপর

মিকা অধৈর্যের সুরে বলে উঠল, কি, কি দেখলেন পাগলাবাবা?

: দেখলাম, আমার ঘরে চেহারাটাই যেন বদলে গেছে। ঘর থেকে সুগন্ধ ভেসে আসছে। এ ঘর কি আমার ঘর? ঘরের কোণে একটি বাতি মিট মিট করে জ্বলছে। তারই ক্ষীণ আলোকে দেখলাম ঘর থেকে আমার ময়লা আর ছেঁড়া বিছানাটা অদৃশ্য হয়েছে, তার জায়গা দখল করেছে একটি দুধে ধোয়া পরিপাটী শয্যা। আর সেই শয্যার উপরে আমার মনিব একটি নগ্ন দেহ মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আছে।

আমি বিস্ময়ে চমকে উঠলাম। আমার ঘরের ভেতর এ কি দৃশ্য! ওরা এতই মগ্ন হয়ে ছিল যে, দরজা খোলার শব্দ ওদের কানেই যায় নি। হঠাৎ মনিবের চোখ আমার দিকে পড়ল। আমাকে দেখেই সে লাফিয়ে উঠে শিথিল বসন টানতে টানতে আমাকে ঠেলেই এক চুটে বাইরে বেরিয়ে গেল। আমি বাধা দিলাম না। কেনই বা দেব? আমি শুধু ভাবছিলাম, ওই মেয়েটা কে? ওর মুখটা দেখতে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ এরকম রসভঙ্গ হয়ে যাওয়ায় মেয়েটা মুখ ফেরাল, আর আমাকে দেখেই ভয়ার্ত একটা চিৎকার ওর মুখ থেকে বেরিয়ে এল। এবার পরিষ্কার দেখতে পেলাম—আমার মা।

মা!–বিশ্বয়ে চেঁচিয়ে উঠল মিকা।

: হ্যাঁ, আর কেউ নয়, আমার মা। যেই মা আমাকে গর্ভে ধারণ করেছিল, আমাকে জন্ম দিয়েছিল, আমাকে বুকে নিয়ে স্তন্য পান করিয়েছিল, এ আমার সেই মা। আমি সেই ভীষণ মুহূর্তে তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দেখলাম। উঃ, কি কুৎসিত! কি কুৎসিত! এই কি নারীদেহ–পুরুষের পরম কামনার ধন? ঘৃণায় আমার উদরের অস্ত্র যেন মুচড়ে উঠতে লাগল। সেদিন থেকে এ কি এক অভিশাপ আমার উপর নেমে এসেছে—আমি যে-কোন মেয়ের দিকে তাকাই, আমার দৃষ্টিপাতের সঙ্গে সঙ্গেই তার অঙ্গাবরণ যেন খসে পড়ে। আর তার নগ্নদেহের এক বীভৎস ছবি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এমন কোন দেশ কি আছে যেখানে কোন মেয়ে নেই—মা নেই, বোন নেই, স্ত্রী নেই, কন্যা নেই, তোমরা বলো আমাকে, আমি সেই দেশে গিয়ে আত্মগোপন করে থাকব।

: তারপর, পাগলাবাবা, তারপর?

: হুঁ, তারপর। আমার দৃষ্টির আঘাতে সংকুচিত ও সন্ত্রস্ত হয়ে সে উঠে বসল তার কাপড়টাকে সামলে নেবার জন্য। আর সেই মুহূর্তে বিকট একটা হাসি হেসে আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম তার উপর। আমার সেই হাসি আজও যেন আমি শুনতে পাই।

আমার এই আঙ্গুলগুলো দেখছো? এই আঙ্গুলগুলো দিয়ে আমি তার কণ্ঠনালী সবলে চেপে ধরেছিলাম। পায়রার গলার মত তার গলাটাকে আমি সেদিন মুচড়ে ছিঁড়ে আনতে চেয়েছিলাম। “ইরাদ”—শুধু এই একটি শব্দ অস্ফুটভাবে ওর মুখ থেকে বেরোতে পেরেছিল, আর কোন শব্দ সে করতে পারে নি। বাঁচবার জন্য সে প্রাণপণ চেষ্টা করল, নখের আঁচড়ে আমার সমস্ত মুখটাকে ক্ষত বিক্ষত করে দিল। সে কি প্রচণ্ড শক্তি। তার পায়ের আছড়ানিতে সেই বিলাস-শয্যা তছনছ হয়ে গেল। দু’বার সে আমাকে আছড়ে ফেলে দিল। আমার সর্বাঙ্গ দিয়ে দর দর করে ঘাম ঝরতে লাগল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হোল না। সে বাঁচতে পারল না। তার মৃত্যুর দূত তখন আমার উপর এসে ভর করেছে। একদিন যে আমাকে জন্ম দিয়েছিল, আমি তাকে মৃত্যু দিলাম। ক্রমে তার আক্ষেপ বিক্ষেপ, ছটফটানি সমস্ত থেমে গেল, সে স্থির হয়ে পড়ে রইল। আর আমার বজ্রমুষ্টি ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে খসে পড়ল।

: মরে গেল?

: হ্যাঁ, মরে গেল। সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শান্ত, স্থির, যেন ঘুমিয়ে রয়েছে, কিন্তু ঠোঁটটা এক দিকে একটু বেঁকে আছে। আর চোখ দুটো! হায় যিহোবা, বিস্ফারিত হয়ে চোখ দুটো যেন ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এই চোখ—এই চোখ দুটো অনুক্ষণ আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, কোথাও আমাকে শান্তিতে থাকতে দেয় না। দিনের আলোকে, রাত্রির অন্ধকারে, আমি যেখানে যাই, সব সময় আমাকে অনুসরণ করে চলে। সেই তাড়নায় আমি দেশ থেকে দেশে ঘুরে ঘুরে বেড়াই। কিন্তু কোথাও আমার নিষ্কৃতি নেই।

: পাগলাবাবা, অমন করে মা’র উপর লাফিয়ে পড়েছিলেন কেন?

: আমি কি করব! ও তো মা নয়, ও-যে রাক্ষুসী, মরে গিয়েও ও আমাকে শান্তি দেবে না। এমন প্রায়ই হয়, রাত্রি যখন গভীর হয়ে আসে, হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি দেখতে পাই ঘরের কোণে ছোট একটি বাতি মিটি মিটি জ্বলছে। আর তার আলোয় দেখি দুগ্ধধবল শয্যার উপরে এক নগ্ন নারীমূর্তি আমার দিকে চেয়ে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপের হাসি হাসছে। আমার তখন কি-যে হয়ে যায়! আমি ভয়ভীতি ভুলে গিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ি। সেই ভয়ংকর রাত্রির সেই ভয়ংকর মুহূর্তটা এমনি করে আমার জীবনে বারবার ফিরে আসে।

হঠাৎ গলার স্বরটা নামিয়ে পাগলাবাবা ফিসফিস করে বলল, তোমরা তো কেউ জানো না, আমি দু-দুবার বিয়ে করেছিলাম। দুটো বউই এইভাবে মারা গেছে।

মিকা শিউরে উঠল। এ কি সত্য, না উন্মাদের উষ্ণ মস্তিষ্কের কল্পনা? হঠাৎ ভোরের পাখীগুলো এক সঙ্গে কলকল করে ডেকে উঠল। ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ছে। সকালবেলায় ফুরফুরে হাওয়া জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকল। পাগলাবাবা থেমে গেল। মিকা অবাক হয়ে দেখল পাগলাবাবার আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গিয়ে এক মুহূর্তে সে যেন স্বাভাবিক মানুষ হয়ে উঠেছে। সে এইমাত্র যেন ঘুম থেকে জাগল।

পাগলাবাবা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মিকাকে পর্যবেক্ষণ করে শেষে যেন একটু আশ্চর্য হয়ে বলল, তুমি কে?

: আমি মিকা।

: মিকা কে?

: আমরা কাল রাত্রিতে দু’জনে এক সঙ্গে ছিলাম যে! আপনি আবার ভুলে গেলেন পাগলাবাবা?

: ও, তাই নাকি, বেশ। তুমি কি ক্যালদীয়?

: না, আমি ইহুদী।

: আচ্ছা বেশ—কি তোমার নাম?

: মিকা।

: হ্যাঁ, মিকা, শোন, আমি কি তোমাকে এইমাত্র কোন কথা বলেছি?

: কি কথা?

: যে-কোন কথা, এই ধরো যেমন আমার মা-সম্পর্কে?

মিকা সঙ্গে সঙ্গেই এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। একটু ভেবে শেষে বলল, না পাগলাবাবা, আমি তো এইমাত্র আপনাকে ঘুম থেকে জাগালাম।

পাগলাবাবা কেমন একটু সন্দেহের দৃষ্টিতে মিকার মুখের দিকে তাকাল। কথাটা যেন সে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না।

: যাই পাগলাবাবা, আমার আবার কেটু কাজ আছে।

মিকার ভয় হচ্ছিল, কে জানে, কোন্ কথা থেকে কোন্ কথা উঠে পড়বে। সে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে কেটে পড়ল।

সেদিন দুপুরের মধ্যেই বাবিলের ইহুদীরা জানতে পারল, পাগলা-বাবা আবার কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *