উনিশ
জেরুজালেমের বুকে প্লাবন নেমেছে। দেশদেশান্তর থেকে দলে দলে ইহুদীরা আসছে, সমুদ্রের ঢেউয়ের মত আর রাত্রির আকাশের তারকার মত তাদের যেন সীমাসংখ্যা নেই। প্রতিবেশী জাতিগুলো সশঙ্ক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখল সর্বপ্রথম আচার্য ইষ্রার ইহুদীবাহিনী নবনির্মিত প্রাচীরের দ্বার দিয়ে জেরুজালেম নগরীতে এসে প্রবেশ করল। তারপর দলের পর দল, আসছেই, আসছেই—নানা দিক থেকে বিক্ষিপ্ত ইহুদীরা শুভ সমাচার পেয়ে স্বদেশে ফিরে আসছে। ইহুদীদের এই কল্পনাতীত বলবৃদ্ধি দেখে শত্রুপক্ষের লোকদের চোখ টানিয়ে উঠল। হিংসায় মুখ কালো করে তারা মন্তব্য করল— য়িহুদিনীদের উর্বরতাশক্তির ধন্য দিতে হয়। ভেড়ীর মত ওরা শুধু বিইয়েই চলে। এইটাই বুঝি ওদের একমাত্র কাজ।
জেরুজালেম নগরী লোকসমাগমে টলমল করে উঠল। কিন্তু এত লোকের মধ্যে কারা-যে খাঁটি আর কারাই বা ভেজাল, তাও তো দেখে শুনে বাজিয়ে নিতে হবে। ইহুদী বললেই তো আর ইহুদী হয় না। নগরের প্রধানগণ, অধ্যক্ষগণ ও লেখকগণ বংশ পরিচয় লিপিবদ্ধ করার কাজে মনোনিবেশ করলেন। কাজ সহজ নয়। হাজার হাজার লোকের গোত্র আর পিতৃকুলের পরিচয় লিপিবদ্ধ করতে দম বেরিয়ে আসবার যোগাড়। কিন্তু এ তো নিতান্ত প্রাথমিক ও বাধ্যতামূলক কাজ। এ কাজ তো না করলেই নয়। ইহুদী জাতি পৃথিবীতে বিশুদ্ধতম জাতি। কোথাও যদি ভুলভ্রান্তিতে বা অবহেলার ফলে একটু ভেজাল ঢুলে পড়ে, তবে কি আর রক্ষা আছে! যিহোবা অনেক অপরাধ ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু এ অপরাধ কখনোই ক্ষমা করতে পারবেন না।
বহু লোকের বহু দিনের পরিশ্রমের ফলে হিসেবটা মোটামুটি এক রকম খাড়া করা হোল। কিন্তু বংশাবলীর চালুনীতে ছাঁকতে গিয়ে কিছু লোক হিসেবে বাইরে থেকে যাচ্ছে। এরা তেলমেলেহ, তেলহর্শা, করব, অদ্দন ও ইম্মের থেকে এসেছে। এরা আপন আপন গোত্র ও পিতৃকুলের প্রমাণ দিয়ে আপনাদের ইসরায়েল-সন্তান বলে প্রতিপন্ন করতে পারল না। এদের মধ্যে ছয় শত বিয়াল্লিশ জন আপনাদের দলায়ের সন্তান, টোবিয়ের সন্তান ও নকোদের সন্তান বলে পরিচয় দিয়েছিল। এ ছাড়া ঐ সমস্ত অঞ্চল থেকে আগত হবায়ের সন্তানগণ, হক্কোসের সন্তানগণ ও বর্সিল্লায়ের সন্তানগণ, যারা যাজক বলে পরিচিত ছিল, বংশাবলীর নিরিখে তাদের দাবীও টিকল না। এদের অশুচি বলে গণ্য করে যাজকত্ব থেকে ভ্রষ্ট করা হোল এবং পবিত্র বস্তু ভোজন করবার অধিকার থেকেও এদের বঞ্চিত করা হলো। এদের ভাগ্য অনির্দিষ্ট অবস্থায় ঝুলতে লাগল।
কিন্তু এই হাজার হাজার প্রবাসী ইহুদীদের মধ্যে কত বিচিত্র সমস্যাই না দেখা দিতে লাগল! এরা বিদেশে জন্মেছে, নানা দেশের নানা-রকম রীতিনীতি, আচারব্যবহার ও সংস্কার তাদের মধ্যে সংক্রামিত হয়ে এসেছে। এমন বহু লোকই আছে যাদের মধ্যে বংশ-পরিচয় ও ছিন্নত্বত্ব ছাড়া ইহুদীর আর কোন লক্ষণই খুঁজে পাওয়া যায় না। এই বিপরীতমুখী অসম প্রকৃতির মানুষগুলোকে এক দৃঢ়বন্ধনে বেঁধে রেখেছে তাদের সম- ঐতিহ্য ও ইহুদী চেতনা।
বৎসরের সপ্তম মাস—ইহুদীদের পবিত্র নিসান মাস অবশেষে এসে গেল। এই মাসটির জন্য উৎসুক হয়ে অপেক্ষা করছিল সকল ইহুদী, বিশেষ করে প্রবাস থেকে নবাগত ইহুদীরা, কেননা তাদের মধ্যে অনেকেই জীবনে এই প্রথম ইহুদীদের আপন ভূমিতে বসে এই পবিত্র মাস উদযাপন করবার সুযোগ পেয়েছে।
মোশির ব্যবস্থাকে অবলম্বন করে ইহুদী সমাজ দাঁড়িয়ে আছে, অথচ মোশির ব্যবস্থার সম্পর্কে বহিরাগতদের মধ্যে অনেকেই অনভিজ্ঞ। নিসান মাসের প্রথম দিনে তাই আজ মোশির ব্যবস্থা-পুস্তক পাঠ ও ব্যাখ্যা করে শোনানো হচ্ছে। নগরীর জলদ্বারের সম্মুখের ময়দানে সমস্ত লোক জড় হয়েছে। আচার্য ইষ্রা উচ্চ মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে পবিত্র ব্যবস্থার এক পুস্তক পাঠ করছেন। আর সাধারণ লোকে যাতে বুঝতে পারে সেজন্য যেশূয়, বানি, শেরেবিয়, যামীন, অক্কুব, শব্বহয়, হোদিয়, মাসের, কলীট, অসরীয়, শোষাবদ, হানন, তালায় প্রভৃতি লেবীয়েরা তাদের কাছে তা সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিচ্ছে।
ব্যবস্থা-পুস্তকের পাঠ ও ব্যাখ্যা শেষ হয়ে গেলে আচার্য ইষ্রা ও তীরশত নেহেমিয়া সবাইকে ডেকে বললেন—এবার তোমরা নিজ নিজ ঘরে ফিরে যাও। আজ আমাদের পবিত্র দিন। তোমরা কেউ যেন বিষণ্ন হয়ে থেকো না। হোমরা আনন্দ করো, উৎসব করো, পানাহার করো। আর যাদের ঘরে কোন সংগতি নেই, তোমরা তোমাদের খাদ্য ও পানীয় থেকে তাদের ভাগ পাঠিয়ে দাও।
তাঁদের কথানুযায়ী তারা আনন্দিত মনে নিজ নিজ ঘরে ফিরল। আর পাড়াপ্রতিবেশী সবাই মিলে ভোজ উৎসব সম্পন্ন করল।
এই নিসান মাসেই ইহুদীদের কুটির পর্ব। যিহোবা মোশির মুখ দিয়ে এই নির্দেশ ঘোষণা করেছিলেন যে, ইসরায়েল সন্তানগণ এই উৎসব উপলক্ষে কুটিরে বাস করবে। ব্যবস্থা-পুস্তকে যেমনভাবে লেখা আছে, সেইমত ইহুদীরা পর্বত থেকে জেতবৃক্ষের শাখা, ঝাউগাছের শাখা, গুলমেঁদির শাখা, খেজুর শাখা ও নানা-রকম ঝোপড়া গাছের শাখা বহন করে নিয়ে এল। আর তাই দিয়ে তারা আপন আপন গৃহের ছাদে, প্রাঙ্গণে, মন্দিরপ্রাঙ্গণে, জলদ্বারের ময়দানে ও ইফ্রয়িম দ্বারের ময়দানে আপনাদের থাকবার জন্য কুটির নির্মাণ করল। তারপর নিজ নিজ ঘর ছেড়ে সাত দিন পর্যন্ত তারা এই কুটিরে বাস করল। এইভাবেই তাদের কুটিরপর্ব সম্পন্ন হোল।
নিসান মাসের চব্বিশ দিনের দিন ইহুদীরা উপবাস করল এবং চট পরিধান করে ও মাথায় ধুলোমাটি মেখে সবাই একত্র হোল। এই দিন উপবাস পাপ-স্বীকার ও নিয়ম- স্থাপনের দিন। দিনের এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত তারা পবিত্র ব্যবস্থা-পুস্তক পাঠ করল। আর অপর এক-চতুর্থাংশ তারা যিহোবার কাছে পাপ-স্বীকার ও মার্জনা-ভিক্ষা করল। তারপর যেশূয়, বানি, কদমিয়েল, শবনিয়, বুন্নি শেরেবিয় ও কনানী এই কয়জন লেবীয় সকলের পক্ষ হয়ে উচ্চস্বরে বিলাপ করল। অবশেষে, যেশুয়, কদমিয়েল, বানি হশবনিয়, শেরেবিয়, হোদিয়, শবনিয়, পথাহীয় এই কজন প্রভুর মহিমা ও আপনাদের চিরাচরিত পাপ কাহিনী বর্ণনা করে চলল।
এই দিবস প্রতিপালনের সর্বশেষ অংশে ইহুদীগণ যিহোবার নামে শপথ করলঃ
আমরা যিহোবার দাস মোশি-কর্তৃক প্রদত্ত যিহোবার ব্যবস্থামত চলব, যিহোবার আদেশ, শাসন ও বিধি-সকল যন্ত্রপূর্বক পালন করব।
পরজাতীয় লোকদের সঙ্গে আপনাদের কন্যাদের বিবাহ দেব না ও আমাদের পুত্রগণের জন্য তাদের কন্যাদের গ্রহণ করব না।
পরজাতীয় লোকেরা বিশ্রামবারে বা অন্য কোন পবিত্র দিনে ভক্ষ দ্রব্য বা যে-কোন জিনিস বিক্রী করতে আনলে আমরা কেউ তা কিনব না।
প্রতি সপ্তম বৎসরে আমরা ইহুদী ভাইদের বাকী ঋণ সমস্তই ছেড়ে দেব।
আমরা প্রভুর মন্দিরের জন্য প্রতি বৎসর প্রতি কাকলের এক-তৃতীয়াংশ অৰ্পণ করবার দায়িত্ব গ্রহণ করলাম। আমাদের এই অর্থের সাহায্যে প্রভুর মন্দিরের দর্শনরুটির নিত্যভক্ষ নৈবেদ্যের, নিত্যহোমের, বিশ্রামবার, অমাবস্যা প্রভৃতি পর্ব সকলের পবিত্র বস্তুর এবং প্রভুর মন্দিরে সমস্ত কর্মের ব্যয়ভার গ্রহণ করা হবে।
ব্যবস্থার লিখন অনুসারে প্রভুর যজ্ঞবেদীর জন্য যে-কাষ্ঠের প্রয়োজন হবে, আমরা যাজক, লেবীয় ও অন্যান্য ইহুদীরা পালা করে নিরূপিত সময়ে তার যোগান দিতে দায়ী থাকব।
আমরা আমাদের ভূমিজাত দ্রব্যের অগ্রিমাংশ ও সমস্ত বৃক্ষজাত ফলের অগ্রিমাংশ প্রতি বৎসর যিহোবার মন্দিরে এনে জমা দেব। আমরা আমাদের প্রথমজাত পুত্র এবং গো-পাল ও মেষ-পালের প্রথম জাতকদের প্রভুর মন্দিরের পরিচর্যাকারী যাজকদের হাতে এনে সমর্পণ করব।
আমেন! আমেন! হাজার হাজার হস্ত ঊর্ধ্বে উত্তোলিত হোল, হাজার হাজার শির আনত হয়ে ভূমির উপর নেমে এলো, হাজার হাজার মুখ প্রভুর মন্দিরের ভূমি চুম্বন করল, আর তারপর হাজার হাজার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠল যিহোবার বন্দনা গান।
