এক
: যাহুদা তো তোমার জন্মভূমি নয়, তুমি তাকে চোখেও দেখনি কোনদিন। তবু তার কথা বলতে বলতে তোমার চোখ অমন ছলছল করে ওঠে কেন, কেন তোমার কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ হয়ে আসে, আমাকে বলতে পারো মিকা? মিকা চুপ করে রইল, কোন উত্তর দিল না।
: কই, তুমি আমার কথার উত্তর দিলে না?
: তুমি তা বুঝবে না শদরা, বুঝবে না। তুমি করুণাময়ী, তুমি কোমল-প্রাণ, তবু তুমি এ ব্যথা বুঝবে না। এ যার বোঝার সেই শুধু বোঝে। শদরা অধৈর্য হয়ে উঠল।
: না, এ চলবে না। আমাকে বুঝতেই হবে, কেন তুমি আপনাকে এমন করে তিলে তিলে হত্যা করে চলেছ? কোথায় গেল সেই আনন্দ-উজ্জ্বল মুখখানি, প্রাণখোলা উচ্ছল হাসি? মিকা, মিকা, এমন করে আমাকে তোমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিও না। আমরা দু’জন চিরদিনের সুখ-দুঃখের সাথী, এই অনুচ্চারিত সত্যে আমরা কি পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ নই?
: শদরা, যাহুদার মাটি আমায় টানে। যাহুদার মানুষ—এই দুঃখী মানুষগুলো আমায় টানে। আমার শিকড় ছিঁড়ে উপড়ে আসে। আমার রক্তমাংস, আমার অস্থিমজ্জা সেই যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে। আমি কেমন করে তোমাকে বোঝাব!
: এখনও যাহুদা? সেই দূর অতীতের এক কালো ছায়া কেমন করে তোমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল? মিকা, বাবিলকে কি তুমি আর ভালবাসো না? বাবিল কি তোমার কেউ নয়? এই বাবিলের বুকেই তুমি একদিন চোখ মেলে এই পৃথিবীকে প্রথম দেখেছিলে, সে কথা কি তুমি আজ ভুলে গিয়েছ? সেদিন থেকে এই বাবিল মায়ের মত স্তন্যপান করিয়ে তোমাকে কি বড় করে তোলে নি? এতদিন কোথায় ছিল যাহুদা? কই, একদিনের জন্যেও তো তুমি তোমার পিতৃপিতামহের জন্মভূমি যাহুদাকে স্মরণ করে একবিন্দু অশ্রুবর্ষণ করো নি!
: তুমি সত্য বলেছ শদরা—বড় কঠিন সত্য। আমি যাহুদার কুসন্তান, আমি এতদিন তাকে ভুলেই ছিলাম।
: না, অমন কথা বোলো না মিকা। তুমি যাহুদার সন্তান নও, যাহুদা বা জেরুজালেম তোমাকে জন্ম দেয় নি, তোমাকে পালন করে নি। যাহুদা তোমার কাছে ইতিহাসের একটা ছেঁড়া পাতা। মিকা, অমন করে মাথা নেড়ো না। আমার মুখের দিকে তাকাও। একবার বলো, তুমি কি ভুলে গেছ সেই ছোট ছেলেটিকে যে আমাদের এই কবার নদীর তীরে বালুকা নিয়ে খেলা করত, ঘর গড়ত আর ঘর ভাঙ্গত, আর তার সাথী সেই-যে ছোট্ট একটি মেয়ে ছায়ার মত তার পেছন পেছন ফিরত?
: তাদের কথা কি ভুলে যেতে পারি, শদরা?
বাতাসে এক গোছা চুল মিকার চোখের উপর এসে পড়ল, শদরা সস্নেহে সেই উচ্ছৃঙ্খল চুলগুলোকে সরিয়ে দিয়ে মিকার মুখের দিকে কতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল,
: এত সুন্দর, এত সুন্দর তুমি! এত সুন্দর মানুষ কি করে হয়! তোমার দিকে যখন আমি তাকাই, আমি যেন সমস্ত পৃথিবীকে ভুলে যাই।
: আর তুমি?
: কি, কি বলতে চাও, বলো, সুন্দর? না, আজ আর নই। মিকা, দোহাই তোমার, মিথ্যে করে বানিয়ে বোলো না, শদরাকে তুমি ফাঁকি দিতে পারবে না। হ্যাঁ, একদিন ছিল যেদিন আমি তোমার কাছে সুন্দর ছিলাম। কিন্তু সেদিন কোথায় গেল? আজ তুমি আমার পাশ কাটিয়ে চলে যাও, আমার দিকে ফিরেও দেখ না। মিকা, বলো, তোমার কি হয়েছে? কেন তুমি এত দূরে সরে গেলে?
: তোমার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছি, শদরা, এ কথা কি তুমি বিশ্বাস করো?
: এ কথা যদি পুরোপুরি বিশ্বাস করতাম, পাগল হয়ে যেতাম। এ কথা বিশ্বাস করতে-যে আমার বুকের শিরা ছিঁড়ে যেতে চায়। কিন্তু মিকা, তুমি তো কোনদিন এমন ছিলে না, তুমি এমন হয়ে গেলে কেন? শুধু কি আমি, বাবা, যিনি তোমাকে আপন সন্তানের মতই বড় করে তুলেছেন, তাঁর কথাও কি তুমি ভুলে যেতে পার?
: না, তা পারি না। কিন্তু এ কথাও যে আমি ভুলতে পারি না যে, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কথা এই যে, আমি একজন ইহুদী। তোমার বাবার সামান্য একজন ক্রীতদাস, প্রভুর অনুগ্রহে প্রতিপালিত।
শদরা হাত দিয়ে মিকার মুখ চাপা দিল।
: মিকা, মিকা, ওকথা বোলো না, তুমি ইহুদী নও।
: ইহুদী নই? কি তবে আমি? আমি কি ক্যালদীয়?
: ক্যালদীয়? না, তুমি ক্যালদীয়ও নও। তুমি ক্যালদীয় নও, তুমি ইহুদীও নও, তুমি ওসব কিছুই নও। তুমি আমার মিকা, তুমি শদরার মিকা, এইটাই কি তোমার যথেষ্ট পরিচয় নয়?
: তোমার আর আমার কাছে এই পরিচয় যথেষ্ট হতে পারে, কিন্তু সমাজের কাছে নয়। মানুষ আছে, কিন্তু তার জাতি নেই, এ তো আর হতে পারে না।
: কেন পারে না? এতদিন তো এই প্রশ্ন ছিল না, তাতে কিইবা ক্ষতি হয়েছিল? আর আজই বা এই প্রশ্ন এমন প্রখর হয়ে দেখা দিল কেন? মিকা, তোমার কি হয়েছে খুলে বলো।
: শদরা, কোন মোহে আমি এতদিন ভুলে ছিলাম জানি না, কিন্তু একটা প্রচণ্ড আঘাত আমার এই মোহ ভেঙ্গে দিয়েছে। আমি বুঝতে পেরেছি আমি বাবিলের কেউ নই, বাবিলের সামান্য তৃণ খণ্ডটুকুর উপরেও আমার কোন অধিকার নেই, দাবী নেই—ক্ষমতাও নেই। আমার ভাগ্য হতভাগ্য ইহুদী জাতির সঙ্গে জড়িত, আমার ভবিষ্যৎ তাদেরই মাঝখানে।
: থামো, থামো, মিকা। উঃ কি নিষ্ঠুর তুমি!
: থামো, বাবিলকন্যা, আমি নিষ্ঠুর, বড় নিষ্ঠুর, আমি-যে অভিশপ্ত জাতির অভিশপ্ত আত্মা, তুমি আমার কাছে এসো না, আমার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস তোমায় দগ্ধ করবে।
: তুমি আমায় দূরে সরিয়ে দিতে চাও, কিন্তু পারবে না। তুমি নিজের একটা বিকৃত মূর্তি রচনা করে আমাকে ভয় দেখাতে চাও? শদরা তাকে ভয় করবে না। শদরা- যে তোমাকে তোমার চেয়েও বেশী চেনে। কিন্তু তুমি বলো তোমার কি হয়েছে, কে তোমাকে এমন করে দুঃখ দিচ্ছে।
: অস্বাভাবিক কিছুই হয় নি, বাবিলের বুকে যে-সব ঘটনা নিয়ত ঘটে থাকে, এ তারই একটি। আমিই শুধু জানতাম না, আমিই শুধু এতকাল অন্ধ হয়ে ছিলাম।
: বলো, শুনি।
: কয়েক মাস আগে সন্ধ্যাবেলা কবার নদীর তীরে একাই বসে ছিলাম, যেমন আমি প্রায়ই বসে থাকি। কি যেন একটা চিন্তায় মগ্ন হয়ে ছিলাম। হঠাৎ একটা আর্ত চিৎকার। চমকে উঠলাম, চেয়ে দেখি, কিছু দূরেই কয়েকটা লোক জটলা পাকিয়ে কি করছে আর তার ভেতর থেকে একটি মেয়ে আর্তকণ্ঠে চিৎকার করছে। দৌড়ে তাদের কাছে গিয়ে পড়লাম। কয়েকটা বদমাইস, ক্যালদীয় ছোকরা মেয়েটার হাত ধরে টানাটানি করছে। পাশেই একটি বুড়ো ইহুদীকে হাত পা বেঁধে ফেলে রেখেছে। আমাকে দেখে মেয়েটি ডুকরে কেঁদে উঠল—বাঁচাও, আমার বাবাকে বাঁচাও। পনেরো কি ষোল বছরের একটি ইহুদী মেয়ে। আহা কি কচি মুখখানি! এখনও যেন আমার চোখের সামনে ভাসছে।
: তারপর, তারপর তুমি কি করলে?
উদ্বেগে আর আশঙ্কায় শদরার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।
: আমি কোন কিছু বলবার বা করবার আগেই আমাকে দেখতে পেয়ে ওদের দু- তিনজন আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আত্মরক্ষা করবার সুযোগটুকুও পেলাম না। হঠাৎ এভাবে অতর্কিতে আক্রান্ত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলাম। মাথায় একটা আঘাত পেয়ে চোখে অন্ধকার দেখলাম।
: সর্বনাশ! কই, একথা তো তুমি একদিনও আমাকে বলো নি।
: শুনতে পেলাম ওরা বলাবলি করছে। একজন বলছে—কি বলিস্, দেই ব্যাটাকে সাবাড় করে। আর একজন বলল—না রে, না, কাজ নেই, দেখছিস না ক্যালদীয়, এ তো আর ইহুদী ভেড়া নয়। শেষ কালে এই নিয়ে হয়তো বিষম হাঙ্গামায় পড়তে হবে! তার চেয়ে বুড়োটার মত ওকেও হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখ। ওরা আমার হাত-পা বাঁধল। ইতিমধ্যে মেয়েটির মুখও বেঁধে ফেলেছে। আর চিৎকার বন্ধ হয়ে গেছে। তারপর সেই পশুগুলো সেই মেয়েটিকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল— “এই বুড়ো, ভয় নেই, মেয়ে তোর খোয়া যাবে না, আমাদের কাজ হাসিল হয়ে গেলে তোর মাল তোর ঘরেই ফেরত পাবি। আর এ নিয়ে যদি কোন গোলমাল করতে যাস, তবে তোকে বস্তাবন্দী করে কবারের জলে ডুবিয়ে মারব।” ওরা চলে গেল। আর অক্ষম, অনুপায় আমি নিজের মনের আগুনে নিজেই জ্বলে পুড়ে মরতে লাগলাম।
: আহারে, বাপের কাছ থেকে মেয়েকে এভাবে ছিনিয়ে নিয়ে গেল! তারপর, মিকা, তারপর?
: এর আর তারপর কি? কতক্ষণ চেষ্টা করে আমার হাত পায়ের বাঁধনটা খুলে ফেললাম। শেষে সেই বুড়ো ইহুদীকেও মুক্ত করলাম। বৃদ্ধ উঠে বসে কতক্ষণ হতবুদ্ধির মত আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, শেষে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল কাঁদতে কাঁদতে বলল—–‘আমারই মেয়ে। ঐ-যে সামনেই আমাদের বাড়ী। মেয়েটা রোজই নদীর ঘাটে জল নিতে আসে। আজ বলল, “বাবা, আমি আর একলা যাব না, তুমি আমার সঙ্গে চলো, পথে ওরা বড় জ্বালাতন করে, আমার ভয় করে।” বুড়ো আবার কেঁদে উঠে বলল, “আমার-যে এই একটিই মেয়ে। সংসারে আর-যে আমার কেউ নেই। আমি কি করে আবার ঘরে ফিরে যাব?”
কি বলে তাকে সান্ত্বনা দেব? এমন কি কথা আছে? চুপ করে রইলাম। বুড়ো আরও একটু কাছে এগিয়ে এল। আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, বাবা, যিহোবা তোমার মঙ্গল করুন। ক্যালদীয়দের মধ্যেও তাহলে ভাল লোক আছে! তোমার নাম কি বাবা?
: মিকা।
: মিকা! মিকা! তবে তো তুমি ক্যালদীয় নও। তবে তুমি-তুমি—
: আমি ইহুদী।
: ইহুদী! তবে তুমি ঘৃণ্য বিধর্মীদের পোশাক পরেছ কেন? কেন তবে তুমি আমাদের মাতৃভাষার কথা না বলে অরামীয় ভাষায় কথা বলছ?
লজ্জায় আমার মাথা নত হয়ে এল। হায়রে, এই লজ্জা এতদিন কোথায় ছিল। রুদ্ধ কণ্ঠে বললাম—আমি-যে হিব্রু ভাষা ভাষা জানি না।
: জানো না? তুমি ইহুদী হয়ে ইহুদীর ভাষা জানো না? ও বুঝেছি, বুঝেছি, তুমি ক্যালদীয়দের পোষা কুকুর সেজে বসে আছ। যারা আমার বুকের ধনকে এভাবে ছিনিয়ে নিয়ে গেল, তুমি আজ তাদেরই একজন হয়েছ। গোল্লায় যাও তুমি, গোল্লায় যাও!
বৃদ্ধ ঘৃণায় থুথু ফেলল। আবার থুথু ফেলল। শেষে আর কোন কথা না বলে উঠে বাড়ীর দিকে চলল। আমার দিকে আর একবার ফিরেও তাকালো না। উঃ, এত ঘৃণার বোঝা আমি বইব কি করে! মনে হোল শুধু এই বৃদ্ধ একাই নয়, সমস্ত ইহুদী জাতি যেন ঘৃণাভরে আমার মুখের উপর থুথু ফেলছে। ধিক্, কেনই বা আমি এই পৃথিবীতে জন্মেছিলাম! সেদিন থেকে, শদরা, আমি আর সেই আমি নেই।
: মিকা, আমায় ক্ষমা করো। আমি তো এত সব কথা জানতাম না! কিন্তু শেষে কি হোল সেই মেয়েটির, তুমি জানো?
: না, জানি না। কি হবে আর জেনে? পরে জেনেছি, এই তো—এখানকার রীতি। ইহুদী ভেড়াদের মাংস দিয়ে ক্যালদীয়দের ভোজের উৎসব চলে আসছে। এতদিন কোন মোহের স্বর্গে ছিলাম জানি না, চোখের সমুখে যা কিছু ঘটছে চোখ মেলে দেখি নি। আজ চোখ খুলে গেছে। যত দেখছি তত শিউরে উঠছি।
শদরা, তোমরা প্রভু। আর আমরা তোমাদের ভারবাহী দাস, ভূমিদাস। ইহুদীর দল তাদের রক্ত জল করে ফসল ফলায়, কাঠ কাটে, বোঝা বয়, তাদের সেই মেহনতের উপরে তোমাদের বিলাস সৌধ গড়ে উঠে। শদরা, তোমরা চাবুক মারো, আর আমরা আর্তনাদ করে মরি, তোমাদের সঙ্গে এই তো আমাদের সম্বন্ধ। আমাদের ঘরের সুন্দরী মেয়েদের ক্যালদীয় প্রভুরা উচ্ছিষ্ট করে ছুঁড়ে ফেলে দেয়, আমরা কথাটি বলতে পারি না। কার কাছে নালিশ জানাব? আমাদের কথায় কেউ কান পাতে না, বরং তাতে বিপদ আরও বেড়ে ওঠে। আমরা শুধু আকাশের দিকে চেয়ে যিহোবার কাছে নালিশ জানাই আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
: এসব কি বলছ তুমি! দেশ কি অরাজক, দেশে কি বিচার নেই?
: দেশ অরাজক নয়, বিচার-ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু সে বিচার তো ইহুদীদের জন্য নয়। আমার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ক্যালদীয় বন্ধুকে এসব কথা বলেছিলাম, তারা কিন্তু শুনে মোটেই আশ্চর্য হোল না, এতটুকু বেদনা বা গ্লানির রেখা ফুটে উঠল না তাদের মুখে। তারা কি বলল, জানো? বলল—ইহুদীদের কথা বোলো না। ওরা কি মানুষ? ওরা তো বিধাতার অপসৃষ্টি। আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু আমাকে চুপি চুপি হুঁশিয়ার করে দিল— এসব কথা নিয়ে বেশী মাতামাতি কোরো না। ইহুদীর সন্তান হয়েও ভাগ্যের জোরে তুমি ক্যালদীয় সমাজে স্থান পেয়ে গেছ। বুদ্ধির ভুলে এই সুযোগ হারিও না। শদরা, সেদিন থেকে বাবিলের বুকে আমি বন্ধুহীন। সেইদিন থেকে ক্যালদীয়দের অন্নজল আমার মুখে বিষ, ক্যালদীয়দের পোশাক আমার দেহে অগ্নিজ্বালার সঞ্চার করে, ক্যালদীয়দের ভাষা আমার জিহ্বাকে তিক্ত করে তোলে। শদরা স্তব্ধ হয়ে কতক্ষণ মিকার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। শেষে বলল,
: তুমি ক্যালদীয়দের সমস্ত অন্তর দিয়ে ঘৃণা করো, না মিকা?
: তুমি কি আশা করো, এর পরেও আমি তাদের ভালবাসতে পারি?
: সমস্ত ক্যালদীয়কেই তুমি ঘৃণা করো?
: হ্যাঁ, করি, নিশ্চয় করি। কিন্তু শোন শদরা, আমি নিজেকে যত ঘৃণা করি এমন ঘৃণা বোধ হয় কাউকে করি না। গোলামের জাত হয়ে ছদ্মবেশ নিয়ে নিজের সমাজ ছেড়ে প্রভুর সমাজে চোরের মত স্থান করে নিয়েছি, এ আমার প্রতি মুহূর্তের মৃত্যু- যন্ত্রণা। আজও আমি ক্যালদীয়দের অনুগ্রহে পরিপুষ্ট, আজও ক্যালদীয়দের পোশাক পরছি, ক্যালদীয়দের ভাষায় কথা বলছি, এ লাঞ্ছনা আমার আর সহ্য হয় না। শদরা, আমাকে ছেড়ে দাও, আমাকে আমার নিজের সমাজে ফিরে যেতে দাও, আমাকে আমার দুঃখী ভাইদের সঙ্গে নির্যাতন ও লাঞ্ছনাকে সমান ভাবে ভাগ করে নিতে দাও।
: আর শদরা, শদরা কোথায় যাবে? শদরার আশৈশব সঙ্গী, শদরার যৌবনের প্রিয়তম সাথী, তুমি বলো, শদরার স্থান কোথায়? একদিন কি তুমি তাকে তোমার নিকটতম বলে স্বীকার করে নাও নি? মিকা, মিকা, ঘৃণা আর বিদ্বেষের আগুন কি তোমার এই ভালবাসাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে? মিকা, চুপ করে থেকো না। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার কথার উত্তর দাও।
: উঃ, কি তীব্র এই সংঘাত! শদরা যদি তোমাকে অস্বীকার করতে পারতাম, তাহলে আমি সহজ আনন্দে পথে নেমে যেতাম। কিন্তু তুমি যে তোমার ওই দু’টি মায়াময় চোখ নিয়ে আমার এই পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছ। আঃ, আমি যদি তোমাকে প্রাণ ভরে ঘৃণা করতে পারতাম! কিন্তু পারি না যে, অথচ তোমার আর আমার মাঝখানে এক দুস্তর রক্তসমুদ্রের ব্যবধান।
: মিকা, তুমি যা-ই বলো না কেন, আমার কোন সংশয় নেই। আমার সাহস আছে, আমি ভয় করি না। কোন বাধা আমাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। দেখো, আমি এই রক্তসমুদ্র সাঁতরে পার হয়ে তোমার কাছে গিয়ে পৌঁছব।
