বারো
অবশেষে যাত্রা সমাপ্ত হোল। নেহেমিয়ার ছোট দলটি জর্ডন নদী পার হয়ে ইহুদীদের স্বদেশের সীমানার মধ্যে এসে প্রবেশ করল। জর্ডনের জল ছল ছল শব্দে তাদের অভ্যর্থনা জানাল। নদীর বাতাস তাদের গায়ে মায়ের স্নেহহস্ত বুলিয়ে দিল।
সে এক রোমাঞ্চকর মুহূর্ত! নেহেমিয়া আর তাঁর ইহুদী সঙ্গীরা উপুড় হয়ে লুটিয়ে পড়ে তাদের পিতৃপুরুষের পবিত্র দেশের ভূমি চুম্বন করল। আর তার ধুলো গায়ে মাথায় মাখল। ওরা আনন্দ-বেদনায় কেঁদে ফেলল! ওদের চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে অশ্রু ঝরতে লাগল। আর ওরা ভাঙ্গা গলায় গেয়ে উঠল, ধন্য ধন্য যিহোবা, তুমি আমাদের মায়ের কোলে ফিরিয়ে এনেছ, তুমি আমাদের তোমার চরণের ছায়ায় আশ্রয় দিয়েছ।
শদরা আড় চোখে চেয়ে দেখল, মিকা ওদের সবার সঙ্গে মিশে গিয়েছে, সেও তাদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইছে, ধন্য ধন্য যিহোবা!
আর শদরা? শদরা তাদের কে? সেই মুহূর্তেই একটা কথা ধক করে আঘাত করল তার মনে—মিকা ইহুদী, আর শদরা ক্যালদীয়। কই, এ কথা তো কোন দিন তার মনে এমন করে জাগে নি! বাবিলে থাকতে ক্যালদীয় আর ইহুদীদের পরস্পর বিদ্বেষ তাদের দু’জনের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি করতে পারে নি। তারপর বাবিল থেকে যখন তারা যাত্রা করল—ঊর্ধ্বে সীমাহীন নীলাকাশ আর নিম্নে সীমাহীন পৃথিবী, তার মধ্যে জাত কুল ধর্মের চিন্তা কোথায় খসে পড়ে গেল। আর সর্ব-আবর্জনামুক্ত দু’টি মানব-মানবী চলার ছন্দে মেতে উঠল।
সেদিন শদরা বলেছিল, মিকা, আমরা নীলাকাশবিহারী দু’টি পাখী। আকাশের তো কোন শেষ নেই, আমরা উড়ে চলব চিরকাল, আমরা আমাদের পাখা কোন দিন গুটোব না। মিকা, আমর থামতে বড় ভয় করে।
মাঝে মাঝে এই মাদকতা মিকাকেও পেয়ে বসত। চলার আনন্দে মত্ত হয়ে সেও অসংলগ্ন প্রলাপ বকত—শদরা, আমাদের পেছনে কোন বাবিল নেই, সামনে কোন যাহুদা নেই, আমাদের দায় দায়িত্ব কিছুই নেই, আমরা শুধু চলব, শুধু চলব।
কি অনাবিল আনন্দের মুহূর্তগুলো! ঘোড়ার পিঠে দুলতে দুলতে শদরা বলত— মিকা, তোমার মুখখানি একবার ফেরাও। আমি কতক্ষণ তোমাকে দেখি না।
কিন্তু সংসারে সব জিনিসেরই শেষ আছে। ওদের চলাও থেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে কঠিন বাস্তবের স্বরূপ ফুটে উঠল। শদরা চমকে চেয়ে দেখল, এ কি! তার প্রাণটা আর্তনাদ করে উঠল—মিকা ইহুদী আর শদরা ক্যালদীয়! যেই মাত্র এই চিন্তা জাগল, সঙ্গে সঙ্গে পেছনে ফেলে আসা বাবিল তার চোখের সামনে যেন উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠল। রূপে আর ঐশ্বর্যে ঝলমল বাবিল! মনে পড়ল তার বাবা আর ছোট ভাইটির কথা। দেখতে দেখতে তার চোখে মুক্তার মত দু’টি অশ্রুবিন্দু দেখা দিল। সব দুঃখ ভুলিয়ে দিতে পারে একজন যার জন্য সে সব কিছু ছেড়ে এসেছে, যদি সে হাসিমুখে তার সামনে এসে দাঁড়ায়! কিন্তু তখন তার সময় কই? সে তখনও সবার সঙ্গে সুর মিলিয়ে গাইছে—ধন্য ধন্য যিহোবা।
শুল্ক-সংগ্রাহক ও সীমান্তের অন্যান্য রাজভৃত্য নেহেমিয়ার দলটাকে দেখে অবাক হয়ে গেল। পারসিক সৈন্যদের দেখে কিছুটা সন্ত্রস্তও বোধ করল। তারা জানতে চাইল, তাঁরা কারা এবং কি উদ্দেশ্যেই বা সেখানে এসেছেন। আর বলল, যদি তাঁরা রাজকার্য উপলক্ষে এসে থাকেন তবে অধ্যক্ষ হরোনীয় সনবল্লাটের সঙ্গে দেখা করলে তাঁদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে।
“আমরা তো তাঁর সঙ্গেই দেখা করতে চাই” নেহেমিয়া বললেন, “আমরা ইহুদী, আমরা পারস্যরাজ আর্তাসারেকসের পত্র নিয়ে সুসান রাজপ্রাসাদ থেকে এসেছি।”
পারস্যরাজের কথায় রাজভৃত্যেরা শশব্যস্ত হয়ে উঠল। তারা বলল, আমরা আপনাদের সঙ্গে লোক দিচ্ছি। সে-ই আপনাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। সন্ধ্যার আগেই আপনারা অধ্যক্ষ সনবল্লাটের বাসস্থলে গিয়ে পৌঁছতে পারবেন।
ওরা ভুল বলে নি। সন্ধ্যার আগেই তাঁরা যথাস্থানে পৌঁছে গেলেন। অধ্যক্ষ সনবল্লাটের দুদ্ধ-খাওয়া তাজা হৃষ্টপুষ্ট মাংসল দেহ। গা থেকে যেন লাবণ্য চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। মুখখানি মোটের উপর সুশ্রীই বলা চলত, যদি চোখ দুটো অমন ছোট ছোট না হত। একদলা মাংসের আড়াল থেকে দুটো চোখে যেন উঁকি-ঝুঁকি মারছে। দেখলেই কেমন সন্দে হয়। আর তার ডান দিকে বসেছিল একটি ছিপছিপে দেহ, লম্বামুখ আর ধূর্ত শেয়ালের মত চেহারা। নেহেমিয়া পরে জানতে পারলেন, এই লোকটি ঐ অঞ্চলের স্বনামখ্যাত আমোনীয় দাস টোবিয়া। লোকে বলত এই হচ্ছে অধ্যক্ষ সনবল্লাটের দক্ষিণ হস্ত, বলবুদ্ধি পরামর্শদাতা।
ভূমিকা শুনেই সনবল্লাটের মুখখানি গম্ভীর ও মেঘাচ্ছন্ন হয়ে উঠল। তারপর পারস্যরাজের পত্র দুখানি পাঠ করে তাঁর অপ্রসন্নতা আরও বেড়ে গেল। তাঁর অন্তরঙ্গ লোকেরা তাঁর চোখের দিকে তাকালে বুঝতে পারত যে, শুধু অপ্রসন্নই নন, তিনি যথেষ্ট পরিমাণে ক্রুদ্ধও হয়েছেন।
: বেশ, বেশ, সম্রাট দীর্ঘজীবী হোন। সম্রাট তাহলে-আপনাকেই জেরুজালেমের তীরশথের পদে নিয়োগ করেছেন? নেহেমিয়া সম্মতি-সূচক ভঙ্গীতে মাথা নেড়ে বললেন, সম্রাট দীর্ঘজীবী হোন। তিনি এই দুর্বলের হস্তেই এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছেন।
: আপনি ইতিপূর্বে সুসানে কোন পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন?
নেহেমিয়া একটু ইতস্তত করলেন। পরে ইতস্ততের ভাব কাটিয়ে উঠে স্পষ্ট কণ্ঠে উত্তর দিলেন, আমি রাজ-অন্তঃপুরের পানপাত্র-বাহক ছিলাম।
: বেশ, বেশ, উপযুক্ত লোককেই নগর-শাসনের দায়িত্বভার দেওয়া হয়েছে এখন বলুন, আপনি আমার কাছে কি আশা করেন?
পারিষদবর্গের মধ্যে একটু বিদ্রূপাত্মক গুঞ্জন শোনা গেল। আমোনীয় দাস টোবিয়া অমায়িক হাসি হাসল। আর হাসবার সঙ্গে সঙ্গেই তার সামনের দাঁত দু’টি বেরিয়ে পড়ল।
নেহেমিয়ার বুঝতে বাকী ছিল না যে, তিনি তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছেন। এই ইহুদী-বিদ্বেষী হরোনীয় তাঁর কাজের পথে সর্বতোভাবে বাধার সৃষ্টি করবে। কিন্তু নেহেমিয়া ভয় পাবেন কেন? যিহোবা এত দিনে তাঁর সন্তানদের দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন। পারস্যরাজ আজ তাঁদের সহায়। প্রবাসী ইহুদীরা সবাই ফিরে আসছে! সনবল্লাট তাঁর কি করবে?
সনবল্লাটের বিদ্রূপকে গায়ে না মেখে নেহেমিয়া উত্তর দিলেন,
হ্যাঁ, আমি আপনার কাছ থেকে অনেক কিছুই আশা করি। কিন্তু তার আগে আমি আপনাকে কয়েকটি সংবাদ দিচ্ছি। আপনাদের কাছে এখনও কোন খবর এসে পৌঁছেনি। প্রথম কথা, সম্রাটের আদেশে সমস্ত নির্বাসিত ইহুদীকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তারা সবাই তাদের স্বদেশে ফিরে আসতে পারবে। ইতিমধ্যেই আচার্য ইষ্রার নেতৃত্বে বাবিলের প্রবাসী ইহুদীদের প্রথম দল যাহুদার পথে যাত্রা করেছে।
সনবল্লাট আর টোবিয়া চমকে উঠলেন। তাঁরা তাঁদের উত্তেজনাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারলেন না। সনবল্লাটের ক্ষুদে চোখ দুটো জ্বল জ্বল করে উঠল
: আপনি বলছেন কি? নির্বাসিত ইহুদীরা মুক্ত? তারা যাহুদায় ফিরে আসছে? অসম্ভব। একথা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
নেহেমিয়া হাসলেন। এত দিনে আজ তাঁরা তাঁদের প্রতিপক্ষের মুখের উপরে হাসবার সুযোগ পেয়েছেন।
: অসম্ভব? হ্যাঁ, এত দিন অসম্ভব ছিল বই কি, কিন্তু যিহোবা যখন প্রসন্ন হন, তখন তিনি অসম্ভবকেও সম্ভব করে তোলেন। আপনারা একটু ধৈর্য ধরে শুনুন, আমার কাছে আরও নতুন নতুন খবর আছে, যা শুনলে আপনারা নিশ্চয়ই সুখী হবেন। জেরুজালেমে প্রভুর মন্দিরের সংস্কার ও উন্নতির জন্য সম্রাট তাঁর রাজকীয় ভাণ্ডার থেকে বহু-পরিমাণ স্বর্ণ, রৌপ্য ও মূল্যবান দ্রব্যাদি দান করেছেন। সেই সম্পদ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছেন। ইহুদীরা প্রভুর উদ্দেশে প্রদত্ত সেই ধন সম্পদ বহন করে জেরুজালেমে ফিরে আসছে। আমার কাছ থেকে আপনারা এই শুভ সমাচার গ্রহণ করুন। শত্রুপক্ষের সমস্ত দুরভিসন্ধিকে ব্যর্থ করে দিয়ে প্রভুর মন্দির আবার তার পূর্ব মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হবে। আবার গড়ে উঠবে জেরুজালেম নগরী, আবার তার প্রাচীর মাথা তুলে দাঁড়াবে।
: ইহুদীরা চিরকালই ভাবপ্রবণ জাতি। দীর্ঘদিন ধরে তারা এইসব আকাশকুসুমের স্বপ্ন দেখে এসেছে। কিন্তু আকাশকুসুম আকাশেই মিলিয়ে যায়। বৃথা চেষ্টা, ইহুদী জাতি আর কোনদিনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখুন। সনবল্লাট মন্তব্য করলেন।
এতক্ষণ মিকা কোন কথাই বলে নি। তার অবশ্য বলবার কথাও নয়। কিন্তু এবার সে আর ধৈর্য ধরে থাকতে পারল না। একটু উত্তেজিত সুরেই সে বলে উঠল,
: ইতিহাস চিরকাল একই পথে চলে না। এবার ইতিহাসের মোড় ঘুরেছে। যাদের দেখবার মত চোখ আছে, তারাই শুধু দেখতে পায়।
সনবল্লাট আর তার দলবল সবাই বিস্মিত হয়ে মিকার মুখের দিকে তাকাল। এ আবার কে? টোরিয়া তার হিংস্র দাঁত দু’টি বের করে মোলায়েম হাসি হেসে বলল, আপনি আবার কে মশাই—ক্ষুদে তীরশথ নাকি?
পারিষদের মধ্য থেকে এক রসিক ব্যক্তি বলে উঠল, আগে বলুন, রাজ-অন্তঃপুরে কিসের পাত্র বহন করতেন আপনি?
সনবল্লাটের দলবল সবাই হেসে উঠল। শদরা লক্ষ্য করল, মিকার মুখ ক্রোধে, উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছে। কিন্তু নেহেমিয়া তাকে সংযত করলেন। মিকা আর কোন কথা বলল না।
সনবল্লাট খুশীই হয়েছিলেন। কিন্তু বাইরে একটু রাগ দেখিয়ে ধমক দিয়ে তাদের থামিয়ে দিয়ে নেহেমিয়াকে বললেন,
: বেশ, বেশ, কিন্তু আপনি তো আর বালক নন। আর সুসানে বাস করে বহু অভিজ্ঞতাও লাভ করেছেন। বলুন, আপনি কি এ আশা রাখেন?
নেহেমিয়া হাসলেন। তাঁর হাসিকে ওরা ম্লান করতে পারে নি।
: আশা রাখব না কেন? যে-ক্ষেত্রে স্বয়ং সম্রাট মন্দিরের উদ্দেশে মুক্ত হস্তে সাহায্য পাঠিয়েছেন। তা ছাড়া তিনি আমাদের আরও আশ্বাস দিয়েছেন যে, আপনারা এখান থেকে সকল কর্মে আমাদের সাহায্য করবেন—
: আমরা? আমরা মন্দিরের ব্যাপারে আপনাদের সাহায্য করতে যাব কেন? যিহোবা আমাদের আরাধ্য নয়, যিহোবার সঙ্গে আমাদের দেবতার চিরদিনের বিরোধ।
: কেন সাহায্য করবেন, সে কথা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়, একমাত্র সম্রাটই তার উত্তর দিতে পারেন। সম্রাট আপনাদের প্রতি যে-নির্দেশ দিয়েছেন এবং যে- নির্দেশপত্র আর কদিন বাদে আপনাদের হস্তগত হবে, আমি তারই একটা নকল আপনাদের পড়ে শোনাচ্ছি—
“আমি সম্রাট আর্তাসারেকস আমার নদীপারের এলাকার সমস্ত কোষাধ্যক্ষদের এই মর্মে নির্দেশ দিচ্ছি যে, আচার্য ইষ্রা তাঁর উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য তোমাদের কাছে যা যা চাইবেন, অবিলম্বে তোমরা তাকে তা দেবে।
এক শত তালন্ত পর্যন্ত রৌপ্য, এক শত কোর পর্যন্ত গম, এক শত বাৎ পর্যন্ত দ্রাক্ষারস, এক শত বাৎ পর্যন্ত তেল এবং অনির্দিষ্ট-পরিমাণ লবণ দিতে কোনরূপ কুণ্ঠা করবে না।”
: দানের ফর্মটা কি এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেল? প্রশ্ন করল টোবিয়া।
: না, না, এখনও শেষ হয় নি। আর একটু ধৈর্য ধরে শুনুন—
“এই প্রসঙ্গে আরও বিজ্ঞাপিত করা হচ্ছে যে, জেরুজালেমের মন্দিরের যাজকদের, লেবীয়দের, গায়কদের, দ্বারপালদের, নথীনীয়দের এবং মন্দিরের কর্মে নিযুক্ত অন্যান্য লোকদের নিকট থেকে কোনরূপ রাজস্ব, কর বা শুল্ক আদায় করা বিধিসংগত বলে বিবেচিত হবে না।
সনবল্লাট বললেন, সম্রাট এ রকম উদ্ভট আদেশ দিতেই পারেন না। রাজরাজড়ারা খেয়ালী লোক, অনেক সময় খেয়ালের ঝোঁকে অনেক কথা বলেও থাকেন, কিন্তু আপনারা কি তাই বলে আশা করে বসে আছেন যে, সত্য সত্যই আপনাদের এ সমস্ত আবদার পূর্ণ করা হবে?
: আশা না-ই বা করব কেন? আপনারা যে সম্রাটের আদেশ অমান্য করে চলবেন, আপনাদের সম্পর্কে এমন অসংগত কথা আমরাই বা কেন মনে করতে যাব?
সনবল্লাট বুঝতে পেরেছেন পানপাত্র-বাহককে তিনি যত সহজ পাত্র বলে মনে করেছিলেন, আসলে তিনি তা নন। কথার মোড় ঘুরিয়ে দিতে তিনি বললেন,
: আচ্ছা, সে কথা থাক। নির্দেশ আগে আসুক তো, তারপর যা হয় দেখা যাবে। কিন্তু আমার সঙ্গে আপনার কি প্রয়োজন তাই বলুন।
: এই পত্র থেকেই আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে, সম্রাট আমাকে জেরুজালেমের তীরশথ নিযুক্ত করেছেন এবং নগর সংস্কার করবার ও প্রাচীর গেঁথে তোলবার অনুমতি দিয়েছেন। আমি-যে সম্রাটের অনুমতি নিয়েই এ কাজে হাত দিতে চলেছি, সে সম্পর্কে আপনাকে অবগত রাখা প্রয়োজন, তা না হলে আপনি হয়তো ভুল বুঝতেও পারেন।
: আমি আপনাকে অনুরোধ করছি, আপাতত এ কাজে হাত দেবেন না।
: কেন এ কথা বলছেন?
: কেন? তবে শুনুন। সনবল্লাট বর্তমান থাকতে জেরুজালেম নগরীর পুনর্গঠন করা বা প্রাচীর গেঁথে তোলা কোনটাই সম্ভব হবে না। এ নিয়ে সম্রাট ও তাঁর মন্ত্রীদের সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়া হবে। আর আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত যে, আমাদের সমস্ত বক্তব্য শোনবার পর সম্রাট এই অনুমতি অবশ্যই বাতিল করে দেবেন।
নেহেমিয়া স্থির কণ্ঠে বললেন, যদি এই অনুমতি বাতিল হয়ে যায়, আমার কাজও সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু যতক্ষণ তা না হচ্ছে, ততক্ষণ আপনি বলুন, আমি কার নির্দেশ মান্য করে চলব—সম্রাটের না অধ্যক্ষ সনবল্লাটের?
: যদি আপনার কাণ্ডজ্ঞান বা জীবনের মায়া থাকে, তাহলে আপাতত অধ্যক্ষ সনবল্লাটের নির্দেশই মান্য করে চলুন। আমি আপনাকে এই পরামর্শই দেব। আপনি বাইরের লোক, এখানকার হালচাল কিছুই জানেন না। আপনি এখানকার বাসিন্দা হলে বুঝতেন, সুসান অনেক দূর, যাহুদা ও জেরুজালেমে বসে অধ্যক্ষ সনবল্লাটের বিরুদ্ধাচরণ করা চলে না।
: কিন্তু যেহেতু আমি এখানকার বাসিন্দা নই, বাইরে থেকে নবাগত, কাজেই আমার কাছ থেকে এই জাতীয় কাণ্ডজ্ঞানের প্রত্যাশা করতে পারেন না।
: বেশ, বেশ, শুনে সুখী হলাম। মনে থাকবে। কিন্তু আপনারা কি এর পরে জেরুজালেমের দিকে যাত্রা করবেন? কিন্তু এখন তো রাত্রি হয়ে গেছে। আপনাদের থাকবার ব্যবস্থা করে দিই?
: না, না, তার কোন দরকার হবে না। আমরা আমাদের তাঁবুতেই থাকব।
ফিরে এলো ওরা নিজেদের তাঁবুতে। কেউ মনঃক্ষুণ্ন, কেউ বা উত্তেজিত। কিন্তু নেহেমিয়ার মুখের ভাব দেখে তাঁর মনের অবস্থাটা বোঝবার উপায় নেই।
শদরার সমস্ত শরীর যেন ক্লান্ত ও ভারী হয়ে এসেছে। পা দুটো আর চলতে চাইছে না। সমস্ত বাদবিবাদ তার মনে কোনই রেখাপাত করতে পারে নি। প্রভুর মন্দির, জেরুজালেমের পুনর্গঠন, প্রাচীর গেঁথে তোলা, তার জীবনের সঙ্গে এদের কি সম্পর্ক? সে চেয়েছিল শুধু মিকাকে। মিকা আর সে। কিন্তু মিকা-যে সহস্রসূত্রে জড়িয়ে পড়েছে। এত কিছু অবান্তর জিনিসের মধ্যে যাদের সঙ্গে শদরার আশা-আকাঙ্ক্ষার কোনই সম্পর্ক নেই। এর মধ্য থেকে মিকাকে ছিনিয়ে নিয়ে আসবে, শদরার বাহুতে এত শক্তি কি আছে? কোথায় মিকা? ওই যে, নেহেমিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে কত কি আলোচনায় ব্যস্ত। শদরার কথা কি আর এখন তার মনে আছে!
সেদিন অনেক রাত্রি পর্যন্ত ওদের পরামর্শসভা চলল। সামনে কত কাজ আর কত- যে বাধা, নেহেমিয়া বুঝিয়ে বলছিলেন সবাইকে। মিকা সাগ্রহে তাঁর কথা শুনছিল। মাঝে মাঝে জোরের সঙ্গে আপনার মতামত প্রকাশ করছিল। মিকার সুন্দর চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এত দিনে সে যেন তার জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছে। অসহ্য— অসহ্য লাগছিল শদরার। হরোনীয়, আমোনীয়, অফসখীয়, টর্পনীয়, অফসীয়, কনানীয়, এলমীয় প্রভৃতি জাতির সঙ্গে ইহুদীদের বংশপরম্পরাগত বাদবিসংবাদের ইতিবৃত্ত নিয়ে ফেনিয়ে ফেনিয়ে আলোচনা চলেছে। এ সমস্ত কথা যতই শুনছিল, শদরার ততই বেশী করে মনে পড়ছিল, মিকা ইহুদী আর শদরা ক্যালদীয়। দু’জনের মধ্যে-যে এত বড় একটা ব্যবধান, যাহুদার মাটিতে পা ফেলবার সঙ্গে সঙ্গেই সে কথা যেন প্রকট হয়ে উঠেছে। একটা চাপা কান্নায় তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল। শদরা চুপ করে সেখান থেকে উঠে এল।
নিরালায় বসে বসে ভাবছিল, বাবিল ছেড়ে চলে আসাটা কি ঠিক হয়েছে? বাবার কত স্নেহের আদরিণী মেয়ে, অকৃতজ্ঞ সন্তান। তাঁর সেই বুকভরা স্নেহের কি নিষ্ঠুর প্রতিদান তুমি দিয়েছ! ক্যালদীয় সমাজে তাঁর মাথা চিরদিনের জন্য তুমি হেঁট করে দিয়ে এসেছ। সেই অশুভরাত্রিতে চোরের মত যে-দুয়ার খুলে তুমি পথে বেরিয়ে এলে, সেই দুয়ার তোমার জন্য চিরদিনের মত রুদ্ধ হয়ে গেল, আর কোন দিন খুলবে না। তোমার বাবিলকে আর কোন দিন তুমি দেখতে পাবে না। সুখস্পর্শ কবারের জলে আর কোন দিন তুমি স্নান করবে না। তোমার জন্মভূমি আর কোন দিন এই কলঙ্কিনীকে বুকে টেনে নেবে না। শদরার ভেতর থেকে কে যেন কটুকণ্ঠে অভিশাপ দিয়ে উঠল— দুঃসাহসিনী, যাদের তুমি দুঃখ আর লজ্জা দিয়ে এলে, তাদের প্রাণের জ্বালায় তোমার সুখের ঘরে আগুন জ্বলে উঠবে।
ওদের আলোচনাসভা অবশেষে ভাঙ্গল।
: বারে, এখনও ঘুমোও নি তুমি? এখনও আমার জন্য জেগে বসে আছ?
শদরার কানে কথাটা বাজল। মিকার মুখে আজ একি নতুন কথা! কবেই বা শদরা তাকে ফেলে আগে ঘুমিয়েছে!
মিকা যথারীতি একটু আদর করল। শদরার মনে হোল এ যেন শুধুই নিয়মরক্ষা। আদরটা যেন শুধু তার চামড়াকেই ছুঁয়ে গেল, মনে গভীরে গিয়ে পৌঁছল না। কিন্তু সে কথা বোঝবার মত অবস্থা তখন মিকার ছিল না। তার মাথায় কত চিন্তাই যে ঘুরছে!
: শদরা, আর দেরী নয়, শিগগির করে ঘুমিয়ে পড়ো। কাল খুব সকালেই জেরুজালেমে যাত্রা করতে হবে। তারপর উঃ. কত কাজ!
বোধ হয় কাজের কথা চিন্তা করতে করতেই মিকা ঘুমিয়ে পড়ল। শদরা কতক্ষণ এপাশ ওপাশ করল। তারপর সেও ঘুমিয়ে পড়ল।
কিন্তু খুব বেশী সময় তারা ঘুমোতে পারে নি। হঠাৎ তারা একটা মিশ্রিত কোলাহলের শব্দে জেগে গিয়ে ধড়মড় করে লাফিয়ে উঠল। এক মুহূর্ত হকচকিয়ে থেকে তারপর তারা বুঝতে পারল, সর্বনাশ! তাদের তাঁবুতে আগুন লেগেছে। ধোঁয়া, ধোঁয়া, চারদিকে ধোঁয়া। মাঝে মাঝে হঠাৎ এক একটা আগুনের শিখা লাফিয়ে উঠছে। চারদিকে গোলমাল, চেঁচামেচি, ঠেলাঠেলি—সে এক বিপর্যয় কাণ্ড। ধোঁয়ায় চারদিক ছেয়ে গেছে, কিছুই দেখা যাচ্ছে না, দম আটকে আসছে। শদরা হতবুদ্ধির মত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
: শদরা, শদরা, করছ কি! এই-যে আমার হাত, হাত ধরে বেরিয়ে এসো।
কোথায় হাত! শদরা দেখতে পাচ্ছে না। “মিকা, মিকা!’ চিৎকার করে উঠল সে। ভেতর থেকে কয়েকজন লোক ছুটে আসছিল। তারা এসে মাঝখানে পড়ায় মিকা আর শদরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। শদরা ধাক্কা খেয়ে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু পড়বার আগেই কে যেন তাকে শিশুর মত দু’হাতে তুলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ল।
শদরার উদ্ধারকর্তা শদরাকে বাইরে নিয়ে এসে ঘাসের উপর শুইয়ে দিল। শদরা চোখ মেলে চেয়ে দেখল—নেহেমিয়া। শদরা এতক্ষণে বুঝতে পারল যে, তাকে মৃত্যুর মুখ থেকে তুলে নিয়ে এসেছে যে, সে মিকা নয়, যার বক্ষলগ্ন হয়ে, যাকে আঁকড়ে ধরে ছিল সে, সে মিকা নয়। সে নেহেমিয়া!
মিকা! মিকা!—চেঁচিয়ে উঠল শদরা।
মিকা কাছে এসে দাঁড়াল।
: কোন ভয় নেই শদরা, এই-যে আমি। তুমি চুপ করে থাকো। বলেই সে আর সকলের সঙ্গে জ্বলন্ত তাঁবুর ভেতর থেকে জিনিসপত্রগুলো টেনে টেনে বের করতে লাগল।
পরে হিসেব নিয়ে দেখা গেল, দলের মানুষগুলো সব ঠিকই আছে। তবে কয়েকজনের আগুনের ঝলসানি লেগেছে। জিনিসপত্র কিছু পোড়া গেছে। ঘোড়া আর গাধাগুলোর মধ্যে কয়েকটাকে পাওয়া যাচ্ছে না। ওরা আগুন দেখে দড়ি ছিঁড়ে পালিয়েছে।
লোকগুলো বাসাভাঙ্গা কাকের মত সবাই মিলে এক সঙ্গে কা কা করছে। সবাই বলে চলেছে। শ্রোতারই অভাব। এই আগুন লাগাবার পেছনে কারা আছে, এ বিষয়ে সবাই একমত। সেই মতটাকেই তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ভাষায় এবং নিজ নিজ ভঙ্গীতে প্রকাশ করে চলেছে। নেহেমিয়া তাদের শান্ত করবার চেষ্টা করে বললেন, এত সামান্য বিষয় নিয়ে তোমরা এত বেশী হৈ চৈ করছ কেন?
সামান্য বিষয়, বলে কি? সমস্ত তাঁবুটা পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এত জিনিসপত্র খোয়া গেল, এতগুলো লোকের জীবন বিপন্ন হয়েছিল, আর বলে কিনা সামান্য বিষয়! নেহেমিয়ার এ রকম অসংগত কথায় কেউ কান পাতল না, কেউ চুপ করল না। যার যতটুকু বক্তব্য ছিল পুরোপুরি বলে নিয়ে শেষে থামল। উত্তেজনা থামতে থামতে রাত্রি ভোর হয়ে গেল।
সংবাদ পেয়ে অধ্যক্ষ সনবল্লাট শশব্যস্ত হয়ে সদলবলে দেখতে এলেন। তিনি নেহেমিয়াকে ডেকে বললেন, আমি অত্যন্ত দুঃখিত। আমি তো কালই আপনাদের থাকবার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করে দেবার কথা বলেছিলাম। বলি নি? কিন্তু আপনারা তো আমার কথায় কানই পাতলেন না। আপনারা নতুন এসেছেন, আপনারা তো জানেন না, এই প্রদেশের যতগুলো জাতি আছে, সবাই ইহুদীদের উপর হাড়ে হাড়ে চটা। কে জানে, কি করে আপনারা একই সঙ্গে তাদের সবাইকে এমন করে ক্ষেপিয়ে তুলেছেন। তবু ভাল, এবার শুধু তাঁবু পোড়ানোর উপর দিয়েই গেছে। এর চেয়ে বড় বিপদও তো ঘটতে পারত। এজন্য তো বলি, যা-ই করুন অবস্থা বুঝে পা চালাবেন। হঠাৎ একটা কিছু করে বসে নিজেরাও বিপদে পড়বেন না, আমাদেরও অসোয়াস্তিতে ফেলবেন না।
নেহেমিয়া সনবন্নাটকে এই মূল্যবান উপদেশের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে মিকাকে ডেকে বললেন, মিকা, আমাদের হারানো পশুগুলো ফিরে পাওয়া গেছে?
: হ্যাঁ, সেগুলো ফিরে এসেছে।
: আমাদের জিনিসপত্রগুলো সব বাঁধাছাঁদা হয়ে গেছে তো?
: হ্যাঁ, সব ঠিক আছে।
: আমাদের খাবার?
: তৈরী হয়েছে।
: এবার তবে তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া শেষ করে যাত্রার উদ্যোগ করো। সনবল্লাট দরদের সুরে বললেন, আহা, এতবড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল! আজকের দিনটা না হয়, এখানেই থেকে যান।
নেহেমিয়া অমায়িক হাসি হেসে বললেন, না, না, দুর্ঘটনা আবার কি! একটা সামান্য তাঁবু পোড়া গেছে মাত্র। ও কিছু না। আমাদের এখনই যেতে হবে।
