পাপের সন্তান – ২৫

পঁচিশ

: আশ্চর্য মিকা, তুমি কেমন মানুষ! নগরের সব লোক এই নিয়ে বলাবলি করছে, আর তুমি এ কথা জান না? এ তো তিন চার দিন আগেকার কথা।

নহিমা আস্তে আস্তে বলল, সত্যি তো, আমরাও তো শুনেছি এ কথা।

: আঃ, কি হয়েছে, বলেই ফেল না হানানি। তোমার কেবল ভূমিকা আর ভূমিকা। শদরা কি করেছে?

হানানি বলল : ধন্য মেয়ে শদরা! তোমাকেও একবার বলে নি! এমন মুখচাপা মেয়েও তো দেখি নি। তবে শোন, আমি যা শুনেছি। আমি তো ছিলাম না। সীদন থেকে সবে কাল ফিরেছি। একটি দিনের মধ্যে কত লোকের কাছেই-যে এ-কথা শুনলাম। শদরা জল আনতে গিয়েছিল কুয়োর ধারে। জলে জন্য অনেক মেয়েই সেখানে ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল। বিকাল বেলার ভিড়, বোঝই তো অবস্থাটা। সব মেয়ে জল নিয়ে চলে গেলে পর শদরা জল তুলল। তারপর জলের কলসীটা তুলে নিয়ে একটু মাত্র এগিয়েছে, এমন সময় ঘটনাটা ঘটল।

মিকা বলল, বাবিলে থাকতে রাস্তার ধারের কুয়ো থেকে নিজের হাতে জল তুলে বয়ে আনতে হবে, এ কথা তো শদরা ভাবতেও পারে নি কোন দিন।

: আহা, সেই দুঃখেই তুমি মরে গেলে। আসল কথাটা শোনই না। রাস্তার বাঁকটা ঘুরতে যাবে, এমন সময় ওর কলসীটা ভেঙ্গে গিয়ে ওর কাপড় চোপড় ভিজে একাকার হয়ে গেল। আর হো হো করে হেসে উঠল ওরা। শদরা তখন দেখতে পেয়েছে, এক দল ছোকরা ওকে ঘিরে ধরেছে।

: এ্যা, বল কি! তার পর?

: শোনই না। ওদেরই একজন লাঠির ঘায়ে ওর কলসীটা ভেঙ্গে দিয়েছে।

: তার পর? তার পর?

: শদরা এমনভাবে ঘেরাও হয়ে পড়েছিল যে, সে এগোতে পারছিল না। ছোঁড়াগুলো কুৎসিত ভাষায় তাকে গালাগালি দিচ্ছিল। দেখতে দেখতে ভিড় জমে গেল। শুধু অল্পবয়সী ছোকরারাই নয়, যুবক ও বয়স্ক লোককেরাও এসে যোগ দিল। আর এত দিন ধরে ক্যালদীয়দের বিরুদ্ধে যার মনে যত রাগ জমা ছিল, সবাই শদরার উপর ঢালতে লাগল।

: সর্বনাশ, আমি তখন কোথায় ছিলাম?

: আমি তখন কোথায় ছিলাম! আমাকে তুমি জিজ্ঞাসা করছ সে কথা? এমন অচৈতন্য আর অপদার্থ মানুষ, তুমি বিয়ে করতে গিয়েছিলে কেন? একটা অসহায় মেয়ে যার আপনার বলতে তুমি ছাড়া কেউ নেই, তাকে একা ঘরে ফেলে রেখে তুমি দিবারাত্রি বাইরে বাইরে ঊর্ধ্বদৃষ্টি হয়ে বিচরণ করো, তোমার খবর আমি জানি না? একা থাকতে, কারু কোন কথা বলবার ছিল না। কিন্তু তোমার আবার ঘর বাঁধবার শখ হোল কেন? মেয়েটাকে শিকড় ছিড়ে তুলে এনেছ, একবারও একটু খোঁজ করো না ও কেমন আছে, কি ভাবে ওর দিন কাটছে।

নহিমা একটু ধমক দিয়ে বলল, আঃ, তোমারও আর সময় নেই, এখন বকুনি দেওয়া শুরু হয়ে গেল। সুযোগ পেলে কেউ কাউকে ছাড়ে না। কেন, এ সমস্ত মূল্যবান উপদেশ আগে দেবার কথা মনে ছিল না? এখন ঘটনা যখন ঘটে গেছে, তখন, খুব গলা করে কথা বলতে এসেছ।

মিকা বলল, না, আমার বকুনি খাওয়াই উচিত। সত্যি, আমি ওকে বড় অবহেলা করে এসেছি। আচ্ছা, বল হানানি, তারপর? ওরা কি বলে গাল দিচ্ছিল ওকে?

: ওরা বলছিল—ক্যালদীয় রাক্ষুসী, এত দিন আমাদের সর্বস্ব খেয়েও সাধ মেটে নি। আবার এখনও আমাদের পেছন পেছন রক্ত খেতে এসেছিস। তোর এই সুন্দর মুখ দিয়ে মিকাকে ভুলিয়েছিস্, আমরা ভুলব না। ছোকরাগুলো ওর গায়ে ধুলোমাটি ছুঁড়ছিল, থুথু দিচ্ছিল, আর গায়ের কাপড় ধরে টানছিল। বয়স্কদের মধ্যে একজন বলে উঠল—এ বেটী বাবিলের গুপ্তচর, ওকে তীরশথের কাছে বেঁধে নিয়ে চল।

মিকা মাথা নীচু করে রইল। তার যেন কথা বলবার শক্তি ছিল না।

: কিন্তু মিকা, ব্যাপার সহজ নয়। আমার মনে হচ্ছে, এই ঘটনাটা হঠাৎ ঘটে নি। এর পেছনে একটা গভীর ষড়যন্ত্র আছে। সমস্ত ঘটনাটা মনে হয় আগে থেকে সুপরিকল্পিত। কেন বলছি জানো? কি অদ্ভুত যোগাযোগ! ঠিক সেই সময়ই স্ত্রী-নবী নোয়াদিয়াকে ঘটনাস্থলে দেখা গেল। তিনি তাঁর নবী-সুলভ জ্বালাময়ী ভাষায় জনতাকে উত্তেজিত করে তুলছিলেন—ডাইনী, ওরা ডাইনী, আমাদের ছেলেদের ওরা ভেড়া বানিয়ে রাখে। ওকে পুড়িয়ে মারো, পুড়িয়ে মারো। উত্তেজিত লোকগুলো চ্যাচাতে লাগল—পুড়িয়ে মারো, ডাইনীকে পুড়িয়ে মারো। ভিড় ক্রমশই বেড়ে চলছিল। নবী নোয়াদিয়া উচ্চ কণ্ঠে বারবার এই দাবী জানাতে লাগলেন, আর জনতাও সঙ্গে সঙ্গে তাকে সমর্থন করে ধ্বনি তুলল—পুড়িয়ে মারো, পুড়িয়ে মারো। কিন্তু এর মধ্যে কিছু কিছু লোক পালটা প্রস্তাব তুলল—চলো; আমরা একে তীরশথের কাছে ধরে নিয়ে যাই। তিনি যা বলেন তাই হবে।

তার প্রয়োজন হোল না। খবরটা ইতিমধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। সংবাদ পেয়ে তীরশথ নেহেমিয়া কয়েকজন অশ্বারোহী শান্তিরক্ষককে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে গেছেন। তীরশথ সেই জনতার দিকে তাকিয়ে ক্রুদ্ধ ভ্রূভঙ্গী করলেন, আর সবাইকে স্থান ত্যাগ করবার জন্য আদেশ দিলেন। অসন্তুষ্ট জনতা নবী নোয়াদিয়ার নির্দেশের জন্য তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। কিন্তু কই, নবী নোয়াদিয়া কোথায়। যেন কোন অলৌকিক শক্তির বলে মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছেন। জনতা বুঝল ব্যাপারটা বিশেষ সুবিধার নয়। তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

: আর শদরা কি করছিল?

: কি করবে শদরা। চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। শেষে তীরশথ নিজে তাকে বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে গেলেন।

তীরশথের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মিকার মন উচ্ছল হয়ে উঠল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কি এক অব্যক্ত ব্যথায় টনটন করে উঠল। তেমন সহজ আন্তরিকতার সঙ্গে আর হয়তো কোন দিনই তারা মিলতে পারবে না।

: তুমি এ সব কথা কার কাছ থেকে শুনলে হানানি?

: আমি কাল সীদন থেকে ফিরে এসে অনেকের মুখেই এ কথা শুনেছি। তাদের মধ্যে দু’ একজন প্রত্যক্ষদর্শীও ছিল। নহিমাও পাড়ার মেয়েদের কাছে এ কথা শুনেছে। একমাত্র তুমি ছাড়া জেরুজালেমের আর সব লোকই বোধ হয় এই সংবাদ পেয়ে গেছে। আর কি সাংঘাতিক মেয়ে শদরা—এমন কথাটা কি করে চেপে গেল!

: কিন্তু হানানি, আমি ভাবছি, কি তীব্র এই জাতিবিদ্বেষ! এ আমার সহ্য হয় না। একদিন ক্যালদীয়দের ইহুদী-বিদ্বের আর ইহুদী নির্যাতন দেখে আমি গোঁড়া ইহুদীতে পরিণত হয়েছিলাম। আর আজ ইহুদীদের পরজাতি-বিদ্বেষের প্রতিক্রিয়ায় আমি ইহুদী সমাজ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে কে জানে কোথায় ভেসে চলেছি! কোথায় গিয়ে আমি আশ্রয় নেব?

: তুমি কি এটা লক্ষ করেছ মিকা, ইহুদীরা সংখ্যায় ও শক্তিতে যতই বেড়ে চলেছে, তাদের পরজাতি-বিদ্বেয়ও ততই তীব্র হয়ে উঠছে? কিন্তু তবুও আমি বলব, এটা শুধু নিজের গতিতেই চলে নি, পেছন থেকে কে যেন উসকে দিচ্ছে। মহাসমাজের সমাবেশের পর থেকেই আমি লক্ষ করছি, কতগুলো লোক যেন বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

: তুমি কাদের কথা বলছ হানানি?

: নাম করে বলা বাহুল্য মাত্র। এক কথায় বুঝে নাও। যে-সকল যাজক ও নবী প্রাচীর তোলবার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশী বাধা দিয়েছিলেন, এঁরা প্রধানত তাঁরাই। আমি তো এতদিন জেরুজালেমে ছিলাম না, থাকলে ভেতরকার ব্যাপার কিছু কিছু নিশ্চয়ই জানতে পারতাম। তোমাকে দিয়ে এ সব কাজ হয় না, তুমি তো থেকেও নেই। ব্যাপারটা বড় সহজ নয়। জেরুজালেমে ফিরে আসবার পর প্রধান যাজক ইলিয়াশীব আর টোবিয়ার উপপত্নীর রহস্যজনক গতিবিধি আমার দৃষ্টিকে আকৃষ্ট করেছে।

: টোবিয়ার—উপপত্নী। সে আবার কে?

: নোয়াদিয়া।

: নোয়াদিয়া!

: হ্যাঁ, হ্যাঁ, এত বেশী চমকে উঠেছ কেন? ওয়াকিফহাল মহলের লোকেরা তো সেই রকমই বলে থাকে। কেন, কথাটা শুনে মর্মাহত হলে নাকি? আরও একটা কথা শুনে রাখো। আমি কাল রাত্রিবেলা টোবিয়াকে মহাযাজক ইলিয়াশীদের সঙ্গে মন্দিরে থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছি।

: টোবিয়াকে!

: হ্যাঁ গো, হ্যাঁ, টোবিয়াকে—ইহুদীদের পরম বন্ধু আমোনীর টোরিয়াকে। অন্ধকারে চোখে পড়বার কথা নয়। কিন্তু ওরা এমনভাবে আমার চোখের উপরে এসে পড়ে যে, আমি না দেখে পারি নি। আমার কি মনে হচ্ছে জানো, তীরশথ নেহেমিয়ার দৃষ্টির আড়ালে সনবল্লাট আর টোরিয়া তার পায়ের তলা দিয়ে নিঃশব্দে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে চলেছে। আজ তিনি আচার্য ইষ্রা, মহাযাজক ইলিয়াশীব প্রভৃতির উপর বিশ্বাস করে বসে আছেন। আর তাঁর চোখের আড়ালে এই সব লীলাখেলা চলছে।

: হানানি, এই দুঃসময়ের সংকেত পেয়েও আমরা কি চুপ করে বসে থাকব?

: কি করবে তুমি? তুমি যদি তীরশথকে এ সব কথা বলতে যাও, তিনি তা বিশ্বাস করবেন না। ভুলে যাও সে দিনের কথা, যে-দিন আমরা তাঁর একান্ত বিশ্বাসের পাত্র ছিলাম, যে-দিন তিনি আমাদের তাঁর ডান হাত আর বাঁ হাতের মতই মনে করতেন। আজ ইহুদী জাতির বিশুদ্ধি আন্দোলনে তিনি এমনই মুক্ত হয়ে উঠেছেন যে, আজ কোন কথাই তাঁর মুখে বাধবে না। হয়তো বা বলবেন আমরা জাতক্রোধ হয়ে ওই সমস্ত নেতৃস্থানীয়দের বিরুদ্ধে মিথ্যেমিথ্যি লাগাচ্ছি। তবে মিকা, একটা কথা শুনে রাখো, চুপ করে বসে থাকতে হবে না তোমাকে—আমাকে, ওরাই আমাদের অস্থির করে তুলবে। শদরার ঘটনাটা দেখলে তো। এটাকে একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে করো না। এ-যে একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনার অংশ মাত্র, এ বিষয়ে আমার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এই সমস্ত সূত্র ধরেই এর পর আরও আরও ঘটনা ঘটতে থাকবে, সেজন্য প্রস্তুত হও।

: প্রস্তুত তো হতে বলছ, কিন্তু প্রস্তুতির রকমটা কি, তা কিছু বলতে পারো?

: তা অবশ্য পারি না। জেরুজালেমের তরুণ সম্প্রদায় সম্প্রতি এই বিশুদ্ধি আন্দোলনে কি-রকম উৎসাহের সঙ্গে মেতে গিয়েছে, এটা লক্ষ করেছ তুমি? জেরুজালেমে কয়েক ঘর পরজাতীয় বাস করে। তাদের মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। আমার তো মনে হচ্ছে, শিগগিরই আদের পাততাড়ি গুটাতে হবে।

নহিমা হেসে বলল, ঝড়টা কি শুধু তাদের উপর দিয়েই যাবে মনে করো?

: শোনো কি বলে, এমন কথা আমি মনে করতে যাব কেন? ঝড়ের মূল লক্ষ্য সর্বনাশিনী পরজাতীয়ারা, যারা আমাদের বিশুদ্ধ সমাজকে দূষিত করে তুলছে। তাদের কেঁটিয়ে না নামিয়ে কি এই ঝড় শান্ত হবে!

মিকা বলল, তোমার দৃষ্টিশক্তি খুবই তীক্ষ্ণ এ কথা স্বীকার করি হানানি, কিন্তু একটা কথা আমি বুঝতে পারছি না। ইহুদীদের এই বিশুদ্ধি আন্দোলনে টোবিয়াদের কি স্বার্থ থাকতে পারে? আমি তো এতে ওদের ক্ষতি ছাড়া লাভ কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।

: আর আমি কিন্তু এদের লাভ ছাড়া ক্ষতি দেখতে পাচ্ছি না। পরম বন্ধু যারা তারা দুঃসময়ে বা সুসময়ে কোন সময়েই ছেড়ে যায় না। আমাদের দুঃসময়ে এরা আমাদের ঘাড় ভেঙ্গে রক্ত খেয়েছে। আর আজ সুসময়ে পছন্দসই জায়গা বেছে নিয়ে সেইখানে বসে মধু লুটবে। বুদ্ধির খেলা খেলে গৃহবিবাদ যদি ভাল ভাবে চালু রাখতে পারে, তাহলে মধুর ভাণ্ডারের চাবিটা শেষ পর্যন্ত ওদের হাতে চলে যাওয়াও বিচিত্র নয়। লাভের আরও দিক আছে। শুনতে চাও?

: নিশ্চয়ই, বলো তুমি।

: ইহুদীরা যে-পরিমাণের উগ্র ও পরজাতি-বিদ্বেষী হয়ে উঠবে, তার প্রতিক্রিয়ায় পরজাতীয়দেরও সেই পরিমাণেই ইহুদীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেয় দানা বেঁধে উঠবে। এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। ইহুদীরা সংখ্যায় যতই বেড়ে থাকুক না কেন, পরজাতীয়েরা যদি এক হয়ে তাদের বিরুদ্ধে আঘাত করে, সে ঘা কি এরা সইতে পারবে? ইহুদী জাতির অতীত ইতিহাসেও এই ঘটনা ঘটেছে। ভবিষ্যতে আবার যে-তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না, এমন নিশ্চয়তাই বা কে দিতে পারে! তুমি কি মনে কর সনবল্লাট আর টোবিয়ার মাথায় এই চিন্তা ঘুরছে না?

: ওরা কি এত দূর চিন্তা করে কাজ করছে?

: নিশ্চয়ই করছে। এ সম্বন্ধে কোন সন্দেহ রেখো না। এ চেষ্টা তো এদের এই প্রথম নয়। প্রাচীর তোলবার সময়ও ওরা চেষ্টার ত্রুটি করে নি। সে দিন ওরা আমাদের বিরুদ্ধে সমস্ত জাতিগুলোকে লেলিয়ে দিতে চেয়েছিল। তখন অবস্থা অনুকূল ছিল না, ওদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হোল। কিন্তু এমন গোঁড়া ও উগ্রপন্থী ইহুদীরা নিজেরাই উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরী করে চলেছে। টোবিয়ারাই বা এমন সুযোগে চুপ করে থাকবে কেন? তারাও তাদের বীজ বুনে চলেছে। এক দিন সেই সর্বনাশের ফসল ফলবে।

: আশ্চর্য হানানি, করে তুমি এমন করে দেখ? এ কথা-যে আমার কখনও মনেও পড়ে নি।

: আমার কথা এখনও শেষ হয় নি। তুমি জানো মিকা, সনবল্লাট আর টোবিয়ার দল সবচেয়ে বেশী ভয় করে তীরশথ নেহেমিয়াকে। তাঁর নির্ভীকতা, দৃঢ়চিত্ততা ও অদ্ভুত সংগঠনী শক্তি সেদিন ওদের চক্রান্তকে চূর্ণ করে দিয়েছিল। সে কথা ওরা ভোলে নি। ওদের মূল লক্ষ্য তীরশথ। টোবিয়াকে তুমি জানো না মিকা, ও বড় সহজ পাত্র নয়। সে আজ এক নতুন খেলায় মেতেছে। তীরশথকে সে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। এক দিন তীরশথকে কেন্দ্র করে জেরুজালেমের ইহুদীরা একমন একপ্রাণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু আচার্য ইষ্রা আজ সেই স্থান অধিকার করে নিয়েছেন।

: এ তুমি ঠিকই বলেছ। গরীব ইহুদীদের বস্তিতে গিয়ে দেখলাম, তীরশথ আজ তাদের কাছে নিষ্প্রভ হয়ে গেছেন। তখন তেমন করে ভেবে দেখি নি, কিন্তু তোমার এই কথাটা শুনে সে কথা মনে পড়ে গেল। কিন্তু এও কি টোবিয়ারই সৃষ্টি, এই কথাই কি বলতে চাও তুমি?

: না, তা বলছি না। কিন্তু টোবিয়া তাকে আপনার কাজে লাগাচ্ছে—কাজে লাগাবে। এই বিশুদ্ধি আন্দোলন যত বেশী উগ্র ও আক্রমণ-মুখর হয়ে উঠবে, টোবিয়াদের সুযোগ ততই বাড়বে। সে দিন তীরশথকে কেন্দ্র করে এক দল সুদৃঢ় ও নিষ্ঠাবান কর্মী জমায়েত হয়েছিল। তারা আজ কোথায়? কোথায় মিকা, আর কোথায় হানানি। এই বিশুদ্ধি আন্দোলনেই কি তীরশথ আর তাদের মধ্যে এক দুর্লঘ্য ব্যবধানের সৃষ্টি করে তোলে নি? আমরা আমাদের যত সামান্য বলেই মনে করি না কেন, ওরা কিন্তু আমাদের তুচ্ছ মনে করে না। ওরা কিন্তু আমাদের চোখে চোখে রেখেছে। শদরার ঘটনা তারই সূচনা। আরও ঘটনা ঘটবে। প্রথম আঘাত হয়তো আমাদের উপরেই আসবে।

এমন সময় হানানির ছেলেমেয়েরা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে ঘরে ঢুকল। ওদের চোখে মুখে উত্তেজনার ভাব প্রকট হয়ে উঠেছে।

: কি রে, কি হয়েছে? এমন হাঁপাচ্ছিস্ কেন? নহিমা জিজ্ঞাসা করল।

মেয়েটি আর বড় ছেলেটি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, মা, ও মা, ও বাড়ীর ছেলেমেয়েরা আমাদের ঢিল ছুঁড়ছে।

ছোট ছেলেটি ওদের ঠেলে সামনে এগিয়ে এসে বলল,

মা, মা, ঢিল ছুঁড়ছে।

: ঢিল ছুঁড়ছে। বেশ করেছে। কেন, বাড়ীতে জায়গা নেই? রাস্তায় যাও কেন মারামারি করতে? বেশ হয়েছে!

মেয়েটি ক্ষুণ্ণ হয়ে অভিমানের সুরে বলল, হুঁ, বেশ হয়েছে! মারামারি আবার কিসের? আমরা তিনজনে রাস্তার ধারে বসে খেলছিলাম। আমরা কিছু করি নি। এক দল ছেলে মেয়ে ও বাড়ী থেকে বেরিয়ে এসে “পাপের সন্তান”, “পাপের সন্তান” বলে আমাদের গাল দিতে লাগল আর ঢিল ছুঁড়তে লাগল। আমরা পালিয়ে এলাম। বাঝা, বাা, পাপের সন্তান কি? বলো না বাবা।

বড় ছেলেটি দিদির সুরে সুর মিলিয়ে বলল, বাবা, ও বাবা, পাপের সন্তান কি?

এ অবস্থায় ছোট ছেলেটিই বা কি করে চুপ করে থাকে। সেও বলল, ও বাবা, পাপের সন্‌চান কি?

হানানি, নহিমা ও মিকা পরস্পরের মুখের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।

নহিমা বলল, আমাদের পাড়াটা খুবই ভাল ছিল। এখানেও বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছে। এখানেও শান্তিতে থাকতে দেবে না।

ওরা তিন জন এখনও হানানিকে ঘিরে ধরে বলে চলেছে—বলো না বাবা, পাপের সন্তান কি? হানানি উচ্চস্বরে হেসে উঠল।

: দেখছো, আমার অবস্থাটা একবার? তার পর ওদের দিকে চেয়ে বলল—যাও, তোমরা মায়ের কাছে যাও। মা বলে দেবে’খন।

পিতৃ-আজ্ঞা পেয়ে তিনজন মহা উৎসাহে মাকে ঘিরে ধরে প্রশ্ন করতে লাগল। বড় ছেলেটি মায়ের গলা ধরে কথার সঙ্গে সঙ্গে তালে তালে নাচতে শুরু করে দিল— পাপের সন্তান কি? পাপের সন্তান কি?

ছোট ছেলেটি মা’র মুখখানা দু’হাতে খামচে ধরে বলতে লাগল— ও মা, পাপের সন্‌চান্ কি? পাপের সন্‌চানু কি? নহিমা অনুপায় হয়ে মিকার দিকে চেয়ে বলল, দেখেছেন কাণ্ডটা একবার! আপনিই বিচার করুন। আচ্ছা, এগুলোকে আমার কাছে পাঠানো হয়েছে কেন?

হানানি বলল, তুমি হচ্ছ গিয়ে পাপের মূল। পাপের সন্তান কাকে বলে তুমিই ভাল করে বুঝিয়ে দিতে পারবে। দাও না, বুঝিয়ে বল দাও ওদের।

নহিমা ওদের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য ওদের সঙ্গে তখনকার মত একটা আপোষ করল।

: এখন নয়, এখন নয়, দেখছো না, এখন কথা বলছি। পরে বুঝিয়ে দেব। যাও তোমরা এখন, ওই যে, ও পাশে খেলা করো গিয়ে। বাইরে যেও না।

ওরা এতেই মহাখুশী। মেয়েটি নির্দেশিত জায়গায় গিয়ে ভাইদের ডেকে বলল, দেখ, দেখ, এইটে যেন রাস্তা, আর ওইটে যেন ও বাড়ী। তোরা যেন ছেলেমেয়েগুলো, আর আমি যেন আমরা। এইবার আয় খেলি।

ওদের বিদায় দিয়ে হানানি, মিকা আর নহিমা এই সমস্ত কথা নিয়েই আলাপ করছিল। হানানির সদানন্দ মুখেও একটু ছায়ার রেখা পড়েছে। এমন সময় শিশু কণ্ঠের মিলিত চিৎকার ও দুমদাম শব্দে ওরা চমকে উঠল। কি ব্যাপার, ওরা নিজেরা নিজেরাই আবার মারামারি শুরু করে দিল না কি? তিনজনে এক সঙ্গে লাফিয়ে উঠল!

সামনে গিয়ে দেখলে, সে এক দৃশ্যই বটে! মারামারি নয়, বিশুদ্ধ খেলা। ছেলে দু’টি এক দিকে প্রচুর ঢিল কুড়িয়ে জড় করেছে। আর ওদের দিদি একটু দূরেই ওদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। ছেলে দু’টি দিদিকে লক্ষ্য করে সমানে ঢিল ছুঁড়ে চলেছে। বেশীর ভাগই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে দেয়ালের গায়ে গিয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে দুটো একটা দিদির গায়েও লাগছে। বেচারী দিদি আপনাকে বাঁচাবার জন্য ওইটুকু জায়গার মধ্যে ছুটোছুটি করছে। ছেলে দু’টি ঢিল মারছে, আর লাফাচ্ছে, আর চ্যাচাচ্ছে-পাপের সন্তান! পাপের সন্তান!

ওহ, খেলা খুব জমে উঠেছে। নতুন ধরনের খেলা ওদের খেলা দেখে এরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কারু মুখে কোন কথা ফুটল না। মা, বাবা আর কাককে দর্শক দেখে ওদের উৎসাহ আরও বেড়ে গেল। ছেলে দু’টি, তাদের গলায় যত জোর আছে। সমস্তটুকু ব্যয় করে সোল্লাসে চ্যাঁচাতে লাগল—পাপের সন্তান! পাপের সন্তান! পাপের সন্তান!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *