চব্বিশ
মিকা বড় একা পড়ে গেল। হানানি ব্যবসায়ী লোক। সীদনের বণিকদের সঙ্গে তার কাজ কারবার চলে। কিছু দিনের জন্য সে সীদনে চলে গেছে। জেরুজালেমে আসার পর থেকে হানানি যেন তার পক্ষে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সে না থাকলে সব কিছু বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগে।
বাবিলের যেই ভূমিদাসদের পাড়ায় সে যাতায়াত করত, তারা সব ইতস্তত ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে। বেশীর ভাগ যাহুদায় গ্রামাঞ্চলে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। জেরুজালেমে যে দু’এক ঘর আছে, তাদের সঙ্গে কালেভদ্রে দেখা হয়।
অনেক দিন ধরে সেই গরীবদের বস্তিতে যাওয়া হয় না। ‘যাই’ ‘যাই’ করে যাওয়া হচ্ছিল না। যতই দেরী হচ্ছে মনের অপরাধী ভাবটা ততই বেড়ে চলেছে। আবার তারই ফলে যাওয়াটাও কঠিন হয়ে উঠছে। আজ সে দৃঢ় সংকল্প করে বসল— আজ সে যাবেই।
কিন্তু যাওয়ার পর মনে হোল, না গেলেই বুঝি ভাল ছিল। গিয়ে শুনল বুড়ী মা মরে গেছে। বুড়ী মা চলে গেল! রাত্রিশেষে বিছানা থেকে উঠে বসে যিহোবার কাছে প্রার্থনা করছিল—আর উঠল না। ঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে যেমন বসেছিল তেমনি বসে রইল। রাত ভোর হয়ে গেল, সকালের আলো এসে ছড়িয়ে পড়ল, কাক পাখীরা ডাকাডাকি শুরু করে দিল, কিন্তু কই, বুড়ী মা তো আর উঠল না। বেলা যখন আরও একটু উপরে উঠল, তখন তার খোঁজ পড়ল। ওরা খোঁজ নিতে গিয়ে দেখল, বুড়ী মা মরে গেছে। সবাই একবাক্যে বলল, বুড়ী মা ভাগ্যবতী, যিহোবা বুড়ী মাকে নিজের কাছে ডেকে নিয়েছেন। বুড়ী মা না থাকার অর্থ যে কী, মিকা এবার তা বুঝল। সবই আছে, শুধু একটি প্রাণী নেই, তাতেই মনে হচ্ছে, পাড়াটা যেন একেবারে ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। বুড়ী মা যে মিকাকে বড় ভালবাসত।
সন্ধ্যার পরই মিকা গিয়েছিল। গিয়ে দেখল। বিরাট সমারোহে প্রভুর নামগান চলছে। কাঁসী বাজছে, করতাল বাজছে, দফ বাজছে, পাড়াটা মেতে উঠেছে। মূল গায়েন গাইছে, আর বহু লোক ধুয়ো ধরে চলছে। কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে গান শুনছে। মেয়েদের ভিড় খুবই বেশী।
“মিকা ভাই, বোসো, বোসো, দু’একজন আদর করে ডেকে বসাল। মিকা বসল, কিন্তু বেশী ক্ষণ ভাল লাগল না। নামগান শুনতে তো সে এখানে আসে নি। তার জন্য তো মন্দিরই আছে। কতক্ষণ উসখুস করে শেষে একটা জরুরী কাজের ছুতো দেখিয়ে সে উঠে পড়ল।
প্রভুর নামগান? ভালই তো। বাবিলে থাকতে, তারপর বাবিল থেকে আসবার পর থেকে সেও তো এমন কত গান গেয়েছে। কিন্তু আজ তার এমন লাগছে কেন? এই জোয়ান জোয়ান ছেলেগুলো যারা তাদের বাহুর পরিপুষ্ট পেশীর জোরে গুরুভার পাথর বয়ে এনে প্রাচীর গেঁথে তুলেছিল, প্রতিপক্ষের সমস্ত চক্রান্ত ও বাধা অতিক্রম করে অসাধ্য সাধন করেছিল, তারা আজ দুলে দুলে মাথা নাড়িয়ে প্রভুর নামগান গাইছে। আর সেই দুঃসাহসিক মেয়েগুলো যারা এগিয়ে এসে দর্প করে বলেছিল, “আমরা করতে পারি না, এমন কি কাজ আছে?” তারা আজ প্রভুর নামগান শুনে আকুল হয়ে কাঁদছে। সমস্ত জিনিসটা কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকছিল মিকার চোখে। এ পাড়ায় এত দিন এসেছে সে, কিন্তু এমন দৃশ্য কখনও দেখে নি তো! মিকার মনে হোল সারা দিনের অভাব অনটন, কর্মক্লান্তি ও দুঃখজ্বালার পর এই ভাবমদিরায় মাতাল হয়ে ওরা যেন এক সর্ব- চিন্তাহরা পরম শান্তির পথের সন্ধান পেয়ে গেছে।
আচার্য ইষ্রার কৃতিত্ব আছে সন্দেহ নেই। তিনি আসার পর থেকেই সারা জেরুজালেম জুড়ে যেন ধর্মের প্লাবন বয়ে গেছে, মন্দিরে অষ্টপ্রহর কাঁসী ঘন্টার বিরতি নেই। মন্দিরের প্রাঙ্গণে ভিড় আর কমে না। যাহুদা, বিন্নামিন, ইফ্রায়েম, শমরিয়া, ডান—আরও কত দূর দূর অঞ্চল থেকে দলে দলে ইহুদীরা আসছে প্রভুর মন্দিরে বলি ও নৈবেদ্য উৎসর্গ করতে, মন্দিরের সন্ধ্যারতি দেখতে আর প্রভুর বন্দনা গান শুনতে। মন্দিরের সম্মুখে পুরানো দোকানপাটগুলো আবার আগেকার মতই জাঁকিয়ে বসেছে!
পরজাতীয়েরাও তাদের মালপত্র নিয়ে বিকিকিনি করতে আসে। বাইরে থেকে যে- সব ইহুদী আসে তারা এ সব দেখে শুনে ধন্য ধন্য করে। বলে, এত দিনে প্রভুর নগরী সত্য সত্যই পুনর্জীবন লাভ করেছে। আচার্য ইষ্রার গুণগান করতে করতে তারা আপন আপন স্থানে ফিরে যায়।
শুধু মন্দিরেই নয়, সন্ধ্যার পর যে-পাড়ায় যাও, সেখানেই প্রভুর বন্দনাগান, সেখানেই কাঁসী করতালের শব্দ। সবাই বলছে— প্রভুর অপার করুণা। তিনি নিজ মহিমায় তাঁর সন্তানদের কাছে ফিরে এসেছেন। ভালোই তো। প্রভুর চরণে এই প্রার্থনাই তো তারা যুগ যুগ ধরে করে এসেছে। তবু কে বলবে কেন, মিকার কেমন যেন সব কিছুই ফাঁকা ফাঁকা লাগে, আর থেকে থেকেই মনে পড়ে প্রাচীর গেঁথে তোলবার কর্মমুখর সেই উজ্জ্বল দিনগুলোকে, যখন তারা ছোট আর বড়, মেয়ে আর পুরুষ, শদরা আর মিকা হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে চলেছিল। সে দিন ভয় ছিল, বিঘ্ন ছিল, কিন্তু সব কিছু অতিক্রম করে এগিয়ে চলবার উন্মাদনা তাদের উত্তপ্ত করে তুলেছিল। আঃ, কি সেই আনন্দময় দিনগুলো! তেমন দিন আর কি কখনও ফিরে আসবে না?
নামগানের আসর থেকে বেরিয়ে এসে মিকা একটি যুবককে পাকড়াও করল।
: প্রাচীর গাঁথবার সময় তোমরা তীরশথের কাছে তোমাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা জানিয়েছিলে। তিনিও আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, তিনি সমস্ত ব্যাপারে সুমীমাংসা করে দেবেন। আর যারা তোমাদের সর্বস্ব গ্রাস করে বসেছে, তারা সমাজের সভায় শপথ করে বলেছিল যে, তারা তোমাদের কাছে থেকে ছলে, বলে, কৌশলে যা কিছু নিয়ে নিয়েছে, সব ফিরিয়ে দেবে। তোমরা তোমাদের সেই সব সম্পত্তি ফিরে পেয়েছ? আর তোমাদের যে-সব ছেলেমেয়েদের ওরা দাসদাসী করে রেখেছিল, ওরা তাদের ফিরিয়ে দিয়েছে?
সে মাথা চুলকিয়ে উত্তর দিল—কই, তার পর এ সমস্ত নিয়ে আর তেমন কোন কথাবার্তা হয় নি তো। আমরা এখন যথেষ্ট কাজকর্ম পাচ্ছি। হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আচার্য ইয়ার কাছে কথাটা একবার তোলা হয়েছিল বটে। তিনিই এখন সমস্ত বিচারব্যবস্থার মালিক কিনা। তা তিনি আমাদের কয়েকজনকে ডেকে বুঝিয়ে দিলেন— দেখ, আমরা এখন সমাজকে রক্ষা করার বিরাট কাজে হাত দিয়েছি। এখন প্রয়োজন একতারা। এখন এ সমস্ত কথা তুলে গৃহবিবাদ ডেকে এনো না। তাহলে আমাদের সমস্ত কাজ পণ্ড হয়ে যাবে।
মিকা কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল। এ বলে কি!
: তোমাদের সেই ছেলেমেয়েগুলো? তাদের কি হবে?
: ছেলেমেয়েগুলো! হ্যাঁ, আচার্য বললেন—দেখ, এইসব ছেলে-মেয়েরা তো আর শুধু তোমাদেরই ছেলেমেয়ে নয়, এরা সমস্ত জাতির সম্পদ। এরা যেখানে আছে সুখেই আছে। তোমরা গরীব মানুষ, তোমরা কি আর ওদের এর চেয়েও ভালভাবে রাখতে পারবে? যিহোবার আশীর্বাদে তোমাদেরও তো ছেলেপিলের অভাব নেই। ওদের বড় করে তোলো। ওরাই তো তোমাদের পক্ষে যথেষ্টের চেয়েও বেশী। আচার্যের এই কথার উপর আমরা আর কিউ বা বলতে পারি! তা ছাড়া আচার্য তো আর মিথ্যে বলেন নি। গরীবের ঘরে বেশী ছেলেপিলে হওয়া পাপ।
: এটা কি তোমার নিজের কথা?
ছেলেটি একটু সংকুচিত হয়ে বলল, না, না, আমি ছেলেমানুষ, আমি এ সব কথার কি বুঝি! আর বলতেই বা যাব কেন এ সব কথা! আমাদের মাথার উপরে যাঁরা আছেন, তাঁরাই এ কথা বলেন।
মিকার দেহ আর মন যেন জ্বলতে লাগল। কিন্তু জ্বলুনীই সার। যাদের ছেলেমেয়ে তারাই যদি এমন কথা বলে, তবে সে আর কি করতে পারে! দারিদ্র্য মানুষকে এমন অমানুষ করে ফেলে! অসহ্য মনের জ্বালায় বস্তির ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ল মিকা। সরু পথটা কিছু দূর পর্যন্ত বস্তির গা ঘেঁষে চলে গেছে। একটু এগিয়েছে, এমন সময় বস্তির একটা বাড়ীর ভিতর থেকে একটি সুবেশ ইহুদী যুবক ভোঁ করে বেরিয়ে গেল। অস্পষ্ট আলোয় তার মুখটা চেনা গেল না। কিন্তু সে সুগন্ধে ভয়ে দিয়ে গেল বাতাসটা। এমন বেশভূষা আর এমন সুগন্ধ এ পাড়ার যুবকদের কাছে থেকে আশা করা যায় না। নিঃসন্দেহে ও পাড়ার অর্থাৎ ভদ্রপাড়ার ছেলে। কেমন একটা খটকা লাগল তার মনে এ আবার কি! কেমন যেন চোরের মত চলাচলটা।
কিন্তু তার আশ্চর্য হবার আরও বাকী ছিল। বস্তিটা ছাড়িয়ে সবেমাত্র কিছুটা এগিয়ে এমন সময় আর একটা ঘটনা ঘটল। রাস্তার ধারেই ঘাসে ছাওয়া একটা জমি। সেই জমিটাকে কোনাকুনি কেটে সে এগিয়ে চলেছে। সেই সুগন্ধী ছেলেটার কথাই সে মনে মনে ভাবছিল। অন্যমনস্কভাবে চলতে চলতে হঠাৎ হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল সে, কোন মতে আপনাকে সামলে নিল। এখানে খোলা আকাশের তলায় তারার আলোকে অন্ধকারটা পাতলা হয়ে এসেছে। স্পষ্ট দেখতে পেল, তার পায়ের কাছে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে জড়াজড়ি করে পড়ে আছে। ত্রস্ত হয়ে দু পা পিছিয়ে গেল সে। মেয়েটা আঁতকে উঠে ভয়ার্ত কণ্ঠে একটা অস্ফুট শব্দ করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই ছেলেটা কেটে পড়ল। কিন্তু সে তার চোখকে ফাঁকি দিতে পারে নি। ও পাড়ার একটা বখাটে ছেলে। মিকা ওকে চেনে। কিন্তু মেয়েটা? সে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়েছে। সেই আবছায়ার মধ্যেও ওর গায়ের লাল জামাটা দেখতে পেয়ে শিউরে উঠল মিকা— তবে কি, তবে কি সেই? হ্যাঁ, এবার আর সন্দেহ নেই—হ্যাঁ, সেই দুষ্টু চোখ মিষ্টি হাসি মেয়েটাই বটে। মেয়েটাও তাকে চিনতে পেরেছে। সঙ্গে সঙ্গে দু’হাতে মুখ ঢেকে ছুটতে ছুটতে সে বস্তির অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
বুকের মধ্যে যেন একটা তীব্র বেদনা বোধ করল মিকা। শদরা একদিন তাকে বলেছিল—মিকা, মেয়েটা তোমাকে ভালবাসে। সেই থেকে কত দিন ওর কথা ভেবে মন মধুর রসে ভরে গিয়েছে। যা হয় না, হতে পারে না, এমন কত উদ্ভট কথা ওই মেয়েটিকে কেন্দ্র করে তার মনে উদয় হয়েছে! কিন্তু শেষ কালে এই কি ছিল ওর মনে! মিকা, কি এমন অপরাধ করেছে মেয়েটা? ও যদি ওর মনের গোপন কামনা তোমার কাছে তুলে ধরত, তুমি কি ওকে গ্রহণ করতে? ও কি চিরকাল তৃষিত চোখে তোমার মুখের দিকে চেয়ে বসে রইবে? মিকা অবুঝ নয়, কথাটা সে অস্বীকার করতে পারে না। তখন সে আপনার মনকে বুঝ দেবার চেষ্টা করে—আমি কি তাই বলছি? কিন্তু তাই বলে এই বখাটে ছেলেটাকে কেন? আর কেন? ক্ষুধায় যখন মানুষ পাগল হয়ে ওঠে, তখন কি আর খাদ্যাখাদ্যের বিচার থাকে!
সবই যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। মনে মনে স্বপ্নপুরী সে রচনা করে তুলেছিল, তা যেন টুকরো টুকরো হয়ে খসে পড়ছে। আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কত জায়গাতেই না সে গিয়েছে! কিন্তু যেখানেই গিয়েছে, সেখান থেকেই নিয়ে এসেছে অবসাদ আর হতাশা। ইহুদী সমাজের জন্য যেন তার কিছুই করবার নেই। তার কাছ থেকে কেউ কিছু প্রত্যাশাও করে না। এ সংসারের তার সব প্রয়োজনীয়তা কি ফুরিয়ে গেল? তবে আর বেঁচে থাকবারই বা সার্থকতা কি? হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মত একটা কথা তার মনে পড়ে গেল—না, সব কিছুই তো যায় নি, শদরা আছে যে। শদরা আছে, এত বড় কথাটা এতক্ষণ কি করে সে ভুলে ছিল! এই কথাটা মনে পড়তেই সে বাড়ীর দিকে দ্রুত পা চালিয়ে দিল।
শদরা জানালার দিকে মুখ করে বসেছিল। মিকা পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে দু’হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
: ইস্, সারা দিন পরে মনে পড়ল, আর এখন আদরের ঘটা দেখ! সেই কখন থেকে আমি একা বসে আছি! তুমি কেমন মানুষ?
: আমিও বড় একা বোধ করছিলাম শদরা। মিকা শদরার পাশে বসে পড়ল।
: বেশ কথা, ভালোই তো, আমিও একা তুমিও একা। তবে আর অমন বাইরে বাইরে না ঘুরে এখানেই চলে এলে পারতে। তা- হলে আমরা আর কেউ একা থাকতাম না, দু’জন হয়ে উঠতাম।
কিছুর মধ্যে কিছু না, মিকা হঠাৎ বলে উঠল, শদরা, তুমি আবার আমাকে ফেলে চলে যাবে না তো? আমার কিন্তু আর কেউ নেই।
একটা বিদ্রূপ বাক্য শদরার ঠোঁকের আগায় এসে গিয়েছিল, কিন্তু মিকার অস্বাভাবিক কণ্ঠস্বর শুনে শদরা কথাটাকে সামলে নিয়ে মিকার মুখের দিকে তাকাল।
: এ কি কথা মিকা? তোমার কি হয়েছে? এমন কথা বলছ কেন?
: না, শদরা, আমাকে ফেলে চলে যেও না।
মিকার কাতর কণ্ঠ শুনে শদরার মনটা কেমন করে উঠল! ভাবল, আহা, আমার এই পাখীটাকে কে এমন আঘাত দিয়েছে?
: বা রে, কোথায় যাব আমি? আমার কি কোথাও যাবার জায়গা আছে? যে-দিন বাবিল থেকে পা বাড়িয়েছি সে দিনই তো ফেরবার পথে কাঁটা দিয়ে এসেছি। কিন্তু মিকা, হঠাৎ তোমার মুখে এ কথা কেন? আমার কেমন যেন ভয় করছে।
: শদরা আমার আজ কেবলই মনে পড়ছে কবার নদী, আর তাঁর জলের ধারে নুয়ে পড়া বাইশী গাছটার কথা।
: সত্যি মনে পড়েছে তোমার? কিন্তু তোমার তো আজই কেবল মনে পড়ল, আর আমার-যে রোজই মনে পড়ে মিকা, সেই বাইশী গাছটির গা ঘেঁষে বসে আছে দু’টি ছেলেমেয়ে—ছেলেটি ইহুদী আর মেয়েটি ক্যালদীয়। বিধাতার কি অপরূপ লীলা! এ অঘটন কেমন করে ঘটালেন!
: না, শদরা, না, তুমি ভুল বলছ। ছেলেটিও ইহুদী নয়, মেয়েটিও ক্যালদীয় নয়, এদের দু’জনের একই জাত।
শদরা বিস্মিত চোখে মিকার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি বলছ কি মিকা? তোমার মুখে এ কি কথা! এ-যে বিশ্বাস হতে চায় না।
: বিশ্বাস না হবারই কথা। কিন্তু বাবিলে থাকতে তুমিই তো এক দিন বলেছিলে মিকা, তুমি যতই বল না কেন, আমি বলছি তুমি ইহুদী নও। আমি সে দিন তোমার কথা বিশ্বাস করি নি। আমি নিজের গায়ে পুরু করে ইহুদীর রঙ মাখালাম। সবার কাছে সেই কথা ফলাও করে প্রচার করতে লাগলাম। আর তার মধ্য দিয়ে আমি নিজেও মনে প্রাণে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠলাম যে, আমি একজন সত্যিকারের ইহুদী। কিন্তু আজ দিনে দিনেই আমার সেই বাইরের কৃত্রিম রং খসে পড়ছে, আর আমি আপনার স্বরূপ দেখতে পেয়ে চমকে উঠছি।
: মিকা, আমার মনে হয় তুমি আজ ঝোঁকের মুখে এ সব কথা বলছ। ঝোঁকটা কেটে গেলেই তুমি আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবে। তোমার এই ঝোঁকটাকে আমার বড় ভয় করে মিকা। ওটা কোন দিন-যে কোন্ বাতাসে ভর করে চলে আসবে ভেবে পাই না।
মিকা হেসে বলল, তাই মনে করো বুঝি তুমি? কিন্তু তুমি তো জান না শদরা, অবস্থা-যে অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। মহাসমাজের সমাবেশে সে দিন যে-নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তার পর আমার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
: কেন, মহাসমাজ কি নির্দেশ দিয়েছে?
: মহাসমাজ নির্দেশ দিয়েছে, যে-সব ইহুদী সন্তান পরজাতীয়া কন্যাদের গ্রহণ করেছে, তাদের নিজ নিজ স্ত্রীদের ও তাঁদের গর্ভজাত সন্তানদের অবিলম্বে ত্যাগ করতে হবে।
: ত্যাগ? তাই না কি? কই, আমাকে তো কিছুই বলো নি তুমি? মিকা, আমায় তুমি ত্যাগ করতে পার?
: সে দিন স্পষ্টভাবে বুঝতে পারলাম, যত বড় গলায় প্রচার করি না কেন, আমি এখনও সত্যিকারের ইহুদী হয়ে উঠতে পারি নি। দেখ না, সেদিনকার সেই সমাবেশে আমার মত দু’ একজন লোক ছাড়া আর সবাই এই নির্দেশ নিঃশব্দে মেনে নিল। তারাই- যে খাঁটি ইহুদী আর আমরা-যে মেকী, এই পরীক্ষাতেই তা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে।
: এখন কি করবে তুমি? দেখ দেখি আবার কোন্ এক দুর্যোগ দেখা দিল। মিকা, সেই রাক্ষুসে নক্ষত্রটা এখনও আমার পেছন ছাড়ে নি। ওর মনে আরও কত কি আছে কে জানে! মিকা, আমি তোমার জীবনে এ কি দুর্ভাগ্য নিয়ে এলাম!
: ও কথা বোলো না। তুমি আমার জীবনের আনন্দ।
: সত্যি বলছ মিকা? আচ্ছা, যারা এই নির্দেশ মান্য করবে না, তাদের কি হবে?
: তদন্ত ও দণ্ডের উপযুক্ত ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হচ্ছে। সম্ভবত সমাজ থেকে তাদের বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হবে।
: ও, সেইজন্যই বুঝি আজ ওরা এসেছিল?
: ওরা—ওরা আবার কারা?
আজ বিকেলবেলা চার-পাঁচ জন লোক ঘরে ঘরে জিজ্ঞাসাবাদ করে নাম ধাম বংশপরিচয় ইত্যাদি টুকে নিচ্ছিল। তাদের সঙ্গে একজন প্রধানও ছিলেন। পোশাক দেখে মনে হোল মন্দিরের লোকেরাও ছিল। মিকা, তুমি রাগ করো না। তুমি এক দিন আমায় নিষেধ করেছিলে, কিন্তু আমি পারলাম না, কিছুতেই গোপন করতে পারলাম না। আমার যা যথার্থ পরিচয়, আমি তাই বলে দিয়েছি। ওকথা গোপন করতে আমার বড় হীনতা বোধ হয়, আমার আত্মমর্যাদায় বাধে। মিকা, তুমি কিন্তু এজন্য আমার উপর রাগ করো না।
: শদরা, তুমি ঠিকই করেছ। সে দিন নিষেধ করে আমি অন্যায় করেছিলাম। না, আমরা কোন কিছু গোপন করব না। এ কি, এ-কি শদরা, তোমার চোখে জল কেন?
: মিকা, আমার জন্য তুমি সমাজ থেকে বহিষ্কৃত হবে, এ আমি কেমন করে সইব? তোমাকে তোমার সমাজ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আমিই কি সুখী হতে পারব? আমি তো জানি সমাজ থেকে ছিন্ন হওয়ার কি-যে ব্যথা! এখনও ভেবে দেখ মিকা।
: কি ভেবে দেখব?
: ভেবে দেখ, আর সবাইকে বাদ দিয়ে শুধু আমাকে নিয়ে তুমি সন্তুষ্ট থাকতে পারবে তো? না হয়—
: এ কি কথা বলছ শদরা? তুমি গেলে আমার কে থাকবে! শদরা, তুমি যদি আমার অবস্থায় থাকতে, তুমি কি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারতে?
: অমন কথা বোলো না মিকা।
: তবে তুমিও অমন কথা বোলো না।
: না, আর বলব না। তবে এসো, কাছে এসো মিকা। আজ তুমি সকলের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একান্তভাবে আমার কাছে এসেছ। প্রার্থনা করি, আমি যেন তার মর্যাদা রক্ষা করতে পারি।
