পাপের সন্তান – ১৮

আঠারো

সমস্ত জেরুজালেম যেন এসে ভেঙ্গে পড়েছে নেহেমিয়ার ঘরের কাছে। নেহেমিয়ার ঘর? সে তো পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। ভস্মাবশেষ ধুইয়ে ধুইয়ে উঠছে এখনও। পাশাপাশি আরও দু’এক-খানা ঘর পোড়া গেছে।

সমস্ত লোক উত্তেজিত—আমাদের তীরশথকে পুড়িয়ে মেরেছে ওরা! দেশে কি বিচার নেই? যিহোবা, তুমি দেখছ না? মাথার চুল ছিঁড়ে খুঁজে তারা বিলাপ করছে। ছোট-বড় ইতর-ভদ্র কেউ বাদ নেই, সবাই এসে হা-হুতাশ করছে। নেহেমিয়ার কর্মীরা পাতিপাতি করে দেখল, কিন্তু নেহেমিয়ার দেহের সামান্য ভস্মাবশেষটুকুও খুঁজে পাওয়া গেল না। এমন করে কি করেই বা নিশ্চিহ্ন হয়ে মিলিয়ে গেল! তবে কি

আর ঠিক সেই সময় নেহেমিয়া আর মিকা হাসিমুখে সেখানে এসে দাঁড়ালেন। এ-যে প্রত্যাশার অতীত। তাদের দেখে সেই বিপুল জনতা সমস্বরে আনন্দধ্বনি করে উঠল। প্রভুর মানুষ নেহেমিয়া, তাঁকে মেরে ফেলতে পারে এমন শক্তি কার আছে? “তাঁর কথাই কথা” “তাঁর কথাই আমরা মেনে চলব”, সবাই এসে তাঁকে ঘিরে ধরল। কেউ কেউ নাচতে লাগল। কেউ গান গাইতে লাগল। সমস্ত মানুষের মাঝেই জয়ের উল্লাস আর মাতন লেগেছে।

এক রাত্রির মধ্যে কত কিছু-যে পরিবর্তন হয়ে গেল। নেহেমিয়া অবাক হয়ে দেখলেন, কাল পর্যন্ত যারা প্রতিপক্ষের ভয়ে জড়সড় হয়ে ছিল, এই একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে তাদের ভয় কেমন করে কেটে গিয়েছে। কোথায় গেল এত মতবিরোধ। ইহুদীপ্রধানেরা একজনের পর একজন এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। নেহেমিয়া বলে উঠলেন—ধন্য, ধন্য তুমি প্রভু, তুমি যখন প্রসন্ন হও, এমনি করেই বুঝি সব বাধা কেটে যায়। যখন তোমার করুণা হয়, নির্মেঘ আকাশ থেকেও বৃষ্টি ঝরে পড়ে।

সবাইকে উদ্দেশ করে তিনি ডেকে বললেন,

তোমরা চেয়ে দেখো, ওদের সমস্ত ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। ওরা আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চেষ্টা করেছিল, আমরা তা কাটিয়ে উঠেছি। ওরা গুপ্তহত্যা করে আমাদের ভয় দেখাতে চেষ্টা করেছিল, স্বয়ং প্রভুর আমাদের রক্ষা করেছেন। এসো, আমরা সেই প্রভু কথাই স্মরণ করি, যিনি মহান, যিনি ভয়ংকর। আর এসো আমরা তাঁরই করুণার স্নেহচ্ছায়ায় দাঁড়িয়ে আমাদের ভাইদের, স্ত্রীদের, সন্তানসন্ততির, আমাদের পশু, আমাদের আবাস গৃহ ও ক্ষেত্রসমূহের রক্ষার জন্য জীবনপণ সংগ্রাম করে চলি। প্রভু আমাদের সঙ্গে আছেন। সমস্ত পৃথিবী যদি আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবু তো আমরা ভয় পাব না।

কাজ শুরু হয়ে গেছে। হাজার হাজার লোকের জয়ধ্বনির মধ্যে ওরা প্রাচীরের ভিত্তি স্থাপন করল। সেই জয়ধ্বনির শব্দ দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ল। পরজাতীয়দের কানে তা যেন কাঁটার মতই গিয়ে বিধল।

সমস্ত নগর বেষ্টনী সীমাকে ভাগ ভাগ করে এক এক দলের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দলগুলো যে যার আপন আপন ভাগের কাজ করে চলেছে।

জোর গুজব শোনা যাচ্ছে, শত্রুপক্ষও খুবই তোড়জোড় করছে। তারা নাকি হঠাৎ এসে ঝাপিয়ে পড়ে সব কিছু মিসমার করে দিয়ে যাবে। নেহেমিয়া বললেন,

: এ সমস্ত শুনে তোমরা ভয় পেও না। ওরা জানে যে, সম্রাটের অনুমতি আমাদের হাতে আছে। এটা জানবার পর ওরা খুব বেশী দূর এগোতে সাহস করবে, এ কথা আমার মনে হয় না। তবে ভয় দেখিয়েই ওরা আমাদের কাজ ভণ্ডুল করে দিতে চায়। যদি একবার বোঝে আমরা ভয় পেয়েছি, তাহলে ঠিকই তাড়া করবে। আর আমরা যদি শক্ত হয়ে দাঁড়াই, ওরাও থমকে দাঁড়িয়ে পড়বে। কিন্তু যা-ই ঘটুক না কেন, আমাদের সমস্ত অবস্থার জন্যই তৈরী হয়ে থাকতে হবে। আমাদের প্রস্তুতির যেন কোন ত্রুটি না থাকে।

যারা কাজ করছিল, তারা নেহেমিয়ার নির্দেশে পালা করে আপনাদের দুটো দলে ভাগ করে নিল। একদল কাজ করে চলেছে, আর একদল ঢাল, বর্শা আর তীরধনুক নিয়ে তাদের পাহারা দিচ্ছে। তা ছাড়া যারা পাথর বয়ে আনছিল, আর যারা পাথরের পর পাথর গেঁথে তুলছিল তারাও নিরস্ত্র ছিল না। প্রত্যেকের কোমরে বাঁধা তলোয়ার, যাতে প্রয়োজন হলে সৈন্যদলের মতই আক্রমণকারী শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।

যে-সকল প্রধান ও অধ্যক্ষ ঘুরে ঘুরে তাদের কাজ তদারক করছিলেন, নেহেমিয়া তাদের ডেকে বললেন,

: আপনারা সতর্ক থাকুন, সবাইকে সতর্ক করে দিন, আকস্মিক আক্রমণের মুখে আমরা যেন হতভম্ব হয়ে না পড়ি। আমাদের কাজ অতি বৃহৎ, কাজের ক্ষেত্রও বিস্তারিত। তার ফলে আমরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি। এইজন্য প্রত্যেক দলের দলপতির হাতে একটা করে শিঙ্গা দেওয়া হয়েছে। বিপদের আশঙ্কা যেখানেই দেখা দেবে, সেইখানেই সংকেত-স্বরূপ শিঙ্গা বেজে উঠবে। তখন সেই সংকেত শুনে আর সবাই যেন তাদের সাহায্যের জন্য ছুটে যায়। এই কথা ঘোষণা করে দিন আর সবাইকে জানিয়ে দিন যে, শত্রুর আক্রমণ থেকে শুধু প্রাণ নয়, প্রাণের চাইতেও মূল্যবান মনে করে এই প্রাচীন রক্ষা করে চলতে হবে। এ শুধু পাথরের গাঁথুনি নয়, এ হচ্ছে ইহুদী জাতির গাঁথুনি।

এই সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা ছিল, সে কথা প্রমাণিত হতে বেশী সময় লাগল না। দিনের একপ্রহর যেতেই একই সঙ্গে প্রাচীরের দুদিকে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর-বর্ষণ শুরু হোল। শিঙ্গা বেজে উঠল। তীরন্দাজ প্রহরীর দল দুভাগে ভাগ হয়ে প্রতি-আক্রমণ করল। হামলাকারীরা সম্মুখযুদ্ধে এগিয়ে আসবার জন্য ইচ্ছুক ছিল না। তারা শুধু একটু খোঁচা মেরে ইহুদীদের মনোবল পরখ করে দেখছিল। প্রথম প্রথম দু’ একবার এই রকম খোঁচাখুঁচি চলল। কিন্তু শেষে ওরা প্রত্যুত্তরে এমনই কড়া জবাব পেল যে, একদম চুপ করে গেল।

এইভাবে দিনের পর দিন জেরুজালেমের ইহুদীরা পাথরের উপর পাথর গেঁথে তুলতে লাগল। সকালবেলা সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু হয়। আর যখন সন্ধ্যার আকাশে তারা ফুটে ওঠে, তখন ওরা ওদের হাতের কাজ বন্ধ করে। আর সারারাত্রি আলো জ্বালিয়ে ওরা পাহারা দেয়, এইভাবে তীরশথ নেহেমিয়া থেকে শুরু করে কর্মরত প্রতিটি ইহুদী একমাত্র স্নান করবার সময় ছাড়া পোশাক বদলাবার সময় পায় না। নেহেমিয়ার সাদা ঘোড়াটি সারাদিন নগর বেষ্টনী প্রদক্ষিণ করে ফিরছে। তার আর তার অশান্ত আরোহীর তিলমাত্র বিশ্রামের সময় নেই।

সবাইকে অবাক করে দিল গরীব বস্তির লোকেরা। ওদের মেয়েরাও দলে দলে কাজে নেমে গেছে। ওদের পুরুষ আর মেয়েরা হাতে হাতে কাজ করে চলেছে। ওরা যেন রোজকার মতই ওদের ঘরসংসারীর কাজ করে চলেছে। কঠিন শ্রমে লাল হয়ে উঠেছে মেয়েদের মুখ, ঘাম ঝরছে, তবু ওরা হাসছে, খুশীতে উছলে উঠছে। যেন এরা এক নতুন খেলা পেয়েছে। ওদের সেই আনন্দের দোলা লেগে পুরুষদের বুকও দুলে উঠেছে, ওদের মুখের দিকে তাকালে সে কথা বুঝতে দেরী হয় না। ওদের কাছে কাজ আর খেলার বিভেদটা ঘুচে গেছে।

ভদ্র ইহুদীরা বারে বারেই তির্যক দৃষ্টিতে ওদের দিকে চেয়ে দেখছে আর ভাবছে— এ কি ভালো? পুরুষ আর মেয়ে মাঠে ময়দানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কাজ করবে, এটা কি শাস্ত্রসম্মত কথা! কিন্তু এই মুখ্যু লোকগুলো শাস্ত্রের কিই বা জানে। তাদের কাছে সদাচার আর সুনীতির আশা করাই বৃথা। ভদ্রদের মন ভ্রূভঙ্গি করে এই কথা বলছে কিন্তু ভেতরের মনটা ঝুরে ঝুরে মরছে—আমাদের মেয়েরা যদি আমাদের সঙ্গিনী হয়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে এমনিভাবে কাজ করত, তাহলে আমাদের কাজ কি আনন্দেই না ভরে উঠত।

নেহেমিয়ার সাদা ঘোড়াটা এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। মেয়েরা ডেকে বলে— তীরশথ, আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করুন। নেহেমিয়া হাসিমুখে মাথা নোয়ান। এ দৃশ্য তাঁকেও মুগ্ধ করেছে।

শদরা বলল, মিকা, আমি আর এমন করে পারি না। আমাকে কি মেরে ফেলবে তোমরা? আমাকে না হয় তোমাদের কিছু কাজই দাও।

: কি কাজ করবে তুমি?

: কেন, তোমাদের প্রাচীর গাঁথবার কাজ, যা তোমরা করছ। না কি আমি তোমাদের শত্রুপক্ষের মেয়ে বলে আমাকে এ কাজ দেবে না?

: আঃ শদরা, বড্ড ঝগড়াটে মেয়ে তুমি, ঝগড়া না করে কি থাকতেই পার না?

: তোমার সঙ্গে ঝগড়া করে সুখ আছে? তুমি-যে একটুতেই হেরে যাও। ও আমার ভাল লাগে না।

: এ ভেবে আর কি করবে এখন? আগে মনে ছিল না? এখন যা পেয়েছো, তাই নিয়ে তুষ্ট থাকো। কিন্তু শদরা, তুমি যে-কাজ করবে, ভদ্রঘরের মেয়েরা কেউ তো সে কাজ করছে না? তুমি একা কি করে করবে?

: কোন মেয়েরাই কাজ করছে না?

: হ্যাঁ, করছে বই কি! গরীব পাড়ার মেয়েরা অনেকেই কাজ করছে।

: তা আমি ওদের সঙ্গে মিলে মিশে কাজ করতে পারি না?

: তা-তা-হ্যাঁ পার, খুব পাব। করবে, শদরা করবে? আমি কিন্তু খুব খুশী হব।

: তবেই তো আবার ভাবনায় ফেললে। কেন গো, তুমি এত খুশী হবে কেন? সে কথা বলে নাও আগে।

: বা রে, আমি যে গরীব পাড়ার ওদের সঙ্গে কাজ করি। সারা দিন কাজ করব, আর তোমাকে কাছে কাছেই পাব। খুশী হব না?

: ও মা, তাই নাকি? তবে আর দেরী করো না মিকা। চলো, চলো, এক্ষুণি আমাকে নিয়ে চলো।

: হ্যাঁঃ, কী-যে বলে! এক্ষুণি নিয়ে চলো তাকে! এখনও কত রাত রয়েছে! দেখছো না, মোরগগুলোও এখনও ডেকে ওঠে নি। ভোর হোক তো আগে।

হরোনীয় সনবল্লাট, আমোনীয় দাস টোবিয়া, আর আরবীয় গেশেম, এই তিন জনের মধ্যে কথা হচ্ছিল।

সনবল্লাট বলছিলেন, তোমার কূটবুদ্ধিও এবার হার মানল টোবিয়া। প্রথমটা কিন্তু দিব্যি পাকিয়ে তুলেছিলে। আমি তোমার হাতের খেলার খুবই তারিফ করছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব কিছু এমন ওলটপালট হয়ে গেল কেন?

হতাশভাবে মাথা নেড়ে টোবিয়া উত্তর দিল, এই ইহুদীগুলোর মত অকর্মণ্য জীব আমি কোথাও দেখি নি। যে-ক’টা কাজের ভার দিয়েছিলাম ওদের হাতে, একটা যদি ঠিকমত হাসিল করতে পারে। সেদিন রাত্রিতে নেহেমিয়াকে যদি ওরা খতম করতে পারত, তাহলে জেরুজালেমের সমস্ত ইহুদী একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে যেত। কাউকে আর মাথা তুলতে হোত না।

আরবীয় গেশেম টোবিয়ার দিকে চেয়ে বলল, আপনি যাদের অকর্মণ্য জীব বলছেন, দেখুন গিয়ে সেই ইহুদীরা কীভাবে তাদের প্রাচীর গেঁথে তুলছে। পৃথিবীতে আর কোন জাত, আর কোন নগরে এভাবে প্রাচীর তুলেছে এ কথা আমি আর শুনি নি। ওদের ঘরের মেয়েরা পর্যন্ত দলে দলে পুরুষদের পাশাপাশি কাজ করে চলেছে। দেখে অবাক হয়ে যেতে হয়। যে-ভাবে কাজ এগিয়ে চলেছে তাতে আর বেশী দিন ওদের লাগবে না। আজ মাত্র দশ দিন। এ ভাবে যদি কাজ চলে তবে এক মাসের মধ্যেই ওদের কাজ শেষ হয়ে যাবে। তাই বাধা যদি দিতে হয়, এখনই, নইলে আর নয়।

সনবল্লাট জিজ্ঞাসা করলেন, ওদের কি কোন রকম বাধাই দেওয়া হচ্ছে না?

গেশেম বলল, বাধা-যে একেবারেই দেওয়া হয় নি তা নয়। কিন্তু সেই আঁচড়টুকুও ওদের গায়ে লাগে নি। ওদের ব্যবস্থার কোন দিকে কোন ত্রুটি নেই। এক দল কাজ করছে, আর এক দল অস্ত্র হাতে নিয়ে পাহারা দিচ্ছে। আমাদের একদল ভীমরুলের চাকে খোঁচা মারতে গিয়েছিল, উলটে বিষম ঘায়েল হয়ে নিজেরাই ফিরে এসেছে।

টোবিয়া চিন্তাক্লিষ্ট সুরে বলল, এখন অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে এভাবে খোঁচাখুঁচি করে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। বাধা যদি দিতেই হয় দস্তুরমত যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে হবে।

না, না, সে অসম্ভব, সনবল্লাট প্রতিবাদ করে বললেন, তার অর্থ হবে পারস্যরাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। তা কি আমরা করতে পারি?

টোবিয়া বলল, তবে এখনও একটা পথ আছে। নেহেমিয়াকে যদি ওদের মধ্য থেকে কোনমতে সরিয়ে ফেলতে পারা যায়। প্রথমে লোকটাকে আমরা যা মনে করেছিলাম, তার চেয়ে সে অনেক বেশী ধুরন্ধর। আগে যদি বুঝতে পারতাম, তাহলে সে কি আর জেরুজালেম পর্যন্ত এসে পৌঁছতে পারত! চিনতে বড় বেশী দেরী হয়ে গেল।

সনবল্লাট বললেন, হুঁ, এখন তার মাশুল দিতে হচ্ছে। কিন্তু তোমার প্রস্তাবটা কি টোবিয়া?

: আমি ভাবছি, আলাপ আলোচনার নাম করে ওকে একবার ডাকিয়ে নিয়ে আসা যাক। লোকটা দুঃসাহসী, আসতেও পারে, তারপর একবার হাতে পেলে –

সনবল্লাট একটু চিন্তিতভাবে বললেন, হুঁ, লোকটা দুঃসাহসী সন্দেহ নেই, কিন্তু বিচক্ষণও বটে। আরও একটা কথা স্মরণ রাখা দরকার, এই লোকটা পারস্যরাজের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র! আমি এ সম্পর্কে সঠিক সংবাদ পেয়েছি।

: কিন্তু এটাও স্মরণ রাখা দরকার, এই প্রাচীর যদি ওরা একবার খাড়া করে তুলতে পারে, তাহলে শুধু জেরুজালেম নয়, সমস্ত যাহুদা আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে। কেউ তাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। সেজন্য কিছুটা ঝুঁকি নিতেই হবে। আমাদের অস্তিত্বই-যে আজ বিপন্ন হতে বসেছে।

: তীরশথ, অভিবাদন গ্রহণ করুন।

নেহেমিয়া ঘোড়ার রাশটা চেপে ধরলেন। অবাক হয়ে তাকালেন। কই, কে ডাকছে তাকে?

: তীরশথ, আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন।

মেয়েটি কে? পরনে ছেঁড়াখোঁড়া ময়লা পোশাক। গরীব পাড়ার মেয়ে। মাথায় ঝুড়ি বয়ে নিয়ে প্রাচীরের দিকে চলেছে। তাঁকে দেখে অভিবাদন করবে, এর মধ্যে আশ্চর্যের কিছুই নেই, কিন্তু গলাটা-যে বড় বেশী চেনা-চেনা। মেয়েটির দুই চোখে কৌতুক নেচে উঠল। বোঝার ভারে তার তনুলতা একটু হেলে পড়েছে। সুন্দর লাগছিল দেখতে। নেহেমিয়ার বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে সে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। নাঃ, এবার আর কোন সন্দেহ নেই।

: দানিয়েল! তুমি এখানে, এ বেশে!

: বাঃ, দেখছেন না, প্রাচীরের কাজ করছি যে।

: অসম্ভব মেয়ে তুমি। এর ভেতরে ঢুকে পড়লে কীভাবে? আর তোমার এই পোশাক মিকাই তোমাকে উপহার দিয়েছে না কি?

মেয়েটা বিষম ঠোঁটকাটা। বলল, মিকা ছাড়া কে দেবে আর? আপনি কোন দিন দিয়েছেন কিছু? আর এ পোশাক না পরলে এরাই বা আমাকে দলে জায়গা দেবে কেন? ভদ্রমেয়েদের এমন খোলামেলা মাঠে ময়দানে এ সব কাজ করা নিষেধ যে।

: দানিয়েল, কেমন লাগছে কাজ করতে?

: খুব ভালো লাগছে। কিন্তু আপনি কি দানিয়েল ডাকটা ছাড়বে না?

: কেমন যেন অভ্যাস হয়ে গেছে। ছাড়তে ইচ্ছা করে না। আর তোমার ওই ক্যালডীয় নামটা আমার কানে বড় লাগে।

বটে, ক্যালদীয় নামেও দোষ! এত বিদ্বেষ! শদরা ভেতরে ভেতরে গর্জাতে লাগল।

: আচ্ছা দানিয়েল, ওরা কি জানে যে, তুমি ক্যালদীয়, আর মিকা তোমার কে হয়?

: জানে না আবার, খুব জানে। কিন্তু আপনার কোন ভয় নেই। তীরশথ আমার কেউ হন কি না, সে খবর ওরা কেউ জানে না।

নেহেমিয়া স্তব্ধ হয়ে গেলেন। প্রবল ইচ্ছা হচ্ছিল, হাতের চাবুকটা দিয়ে দানিয়েলের মুখের উপর একটা কঠিন আঘাতচিহ্ন এঁকে দেন। কিন্তু না, কিছুই তিনি করলেন না। কোন কথা না বলে হঠাৎ ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেলেন।

সঙ্গে সঙ্গে শদরার হুঁশ হোল, মুহূর্তের উত্তেজনায় কত বড় অন্যায় সে করে বসেছে। ওরে শদরা, ওরে শদরা, এ তুই কি করলি! কিন্তু অসতর্ক মুহূর্তে যে-কথা একবার বেরিয়ে পড়ে তাকে কি আর ফিরিয়ে আনা যায়?

পাথর গাঁথতে গাঁথতে ওরা দু’জন আলাপ করছিল।

একজন বলছে, প্রাচীর তো গড়ে উঠছে, উঁচুর পর উঁচু হয়ে উঠছে। ধরো, আর কিছু কাল বাদে প্রাচীর তোলার কাজ শেষ হয়ে গেল—তারপর?

তার উত্তরে অপরজন বলছে, তারপর নগর সংস্কার, নতুন নতুন বাড়ীঘর আর রাস্তাঘাট তৈরী করে তোলা।

: তারপর?

: তারপর এই সুরক্ষিত নগরীতে ইহুদী জাতি আবার তার পূর্ব মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হবে।

: তা যেন হোল। কিন্তু আমাদের? আমাদের কি হবে?

: আহা, কেমন কথা বলছিস, আমরা কি ইহুদী জাতির বাইরে?

: না, বাইরে নাই, ভেতরেই আছি। কিন্তু তাতেই কি আমাদের পেট ভরবে? আমরা মহাজনের কাছে ঋণের বাবদ বাঁধা দেওয়া জমিগুলো ফেরত পাব? আমাদের যে-ছেলেমেয়েগুলোকে ওরা ক্রীতদাস- আর ক্রীতদাসী-রূপে আবদ্ধ করে রেখেছে তাদের কি ওরা মুক্তি দেবে?

: দুর, তা কি আর দেয় কেউ?

: আমরা তো আমাদের জায়গাজমি হারিয়ে ফতুর হয়ে বসেছি, আমাদের পেটের ভাত আর পরনের কাপড়ের ব্যবস্থা করবে কেউ?

: তুই আচ্ছা পাগল! গরীবের কথা কেউ কখনও চিন্তা করে?

: তবে আবার কিসের মর্যাদা? এই মর্যাদা ধুয়ে কি আমরা জল খাব?

: তোর চিরদিনের কেমন ট্যারা ট্যারা কথা। এমন দিনে ও সব কথা তুলতে আছে!

: কি করব আমি, আজকের দিনেই এ সব কথা আমার বেশী করে মনে পড়ছে। মুখ চাপা দিয়ে রাখলেই পেট তো আর মানবে না।

: দাঁড়া, যে তোর কথার উত্তর দিতে পারবে সে-যে এই দিকেই আসছে। মিকা ভাই, ও মিকা ভাই, শুনে যাও একটা কথা

মিকা, ওই মেয়েটাকে লক্ষ করে দেখেছ তুমি? ওই-যে গো, জলের ভাঁড়টা বয়ে নিয়ে আসছে। আহা, একটু ভাল করে তাকিয়েই দেখ না। আমি বলছি, আমি কিচ্ছু মনে করব না। ওই-যে মেয়েটা, ওই-যে লাল পোশাক পরে এসেছে। এতগুলো মেয়ের মধ্যে ওর সাজটাই চোখে পড়ে। চুল বাঁধবার ভঙ্গীটা দেখ না! কাজ করতে এসেছে, না রূপ দেখাতে এসেছে। আঃ, চেয়েই দেখ না একটু, এতে ওর গায়ে ফোস্কা পড়ে যাবে না। একটু চেয়ে দেখলে ও খুশীই হবে। আমি মেয়েমানুষ, আমি মেয়েমানুষের মন বুঝি না?

: ওই-যে মেয়েটা—দুষ্টু দুষ্টু চোখ আর মিষ্টি মিষ্টি হাসি?

: ও বাবা, সে তো আমি লক্ষ করে দেখি নি। কিন্তু তাও তোমার চোখ এড়াতে পারে নি? তবে তোমাকে আমি যত হাবা মনে করি, আসলে তুমি তা নও? মিকা, এবার-যে আমার সত্য সত্যই ভয় করছে। আর তোমাকে একটা কথা বলছি মিকা, তুমি শুনে রাখো। মেয়েটা কিন্তু তোমাকে ভালবাসে, ভীষণ ভালবাসে। ওর ঐ লাল পোশাকটা, ওর ওই নাগিনীর মত চুল বাঁধা, আর ঐ মিষ্টি মিষ্টি হাসি—সব, সব কিছু তোমার জন্য।

: এ আবার তুমি কি শুরু করলে শদরা? ছিঃ, এ সব ঠিক নয়। একটা মেয়েকে নিয়ে মিথ্যেমিথ্যি এ সব কথা বলা, ঠাট্টা হলেও ঠিক নয়।

: মিথ্যেমিথ্যি? আমি কি তোমার মত কানা? আর ও-সব ঢং তো আমাকেও এক সময় কম করতে হয় নি, আমার চোখকে ও কি করে ফাঁকি দেবে? কিন্তু তোমাকে একটা কথা বলছি মিকা, বিশ্বাস করো তুমি, আমার সম্পত্তির উপর চোখ দিয়েছে বলে আমার কিন্তু ওর উপর রাগ বা হিংসা হয় নি, বরং—

: বরং কি?

: বরং একটু মায়াই লাগছে। কেন, জানো মিকা? ও যে-সমাজের মেয়ে ও তো তোমাকে আশা করতে পারে না। তাছাড়া তুমি-যে অপরের সম্পত্তি তাও তো ও জানে। দিব্যি বড়সড় বুদ্ধিমতী মেয়ে, ও কি তা বোঝে না? কিন্তু কি করবে, মন-যে মানে না। আর তোমাকে যে একবার ভালবাসল, তার-যে কী দুর্গতি। দেখছ না আমার অবস্থাটা?

: শদরা, বুঝি, বুঝি আমি তোমার অবস্থা। কচি লতাটিকে আমি মাটি থেকে উপড়ে তুলে নিয়ে এসেছি, কিন্তু সে এই মাটিতে শিকড় মেলতে পারছে না। শদরা কাল রাত্রিতে তুমি কাঁদছিলে। তুমি ভেবেছিলে আমি ঘুমিয়ে আছি। না, জেগেই ছিলাম। কিন্তু কোন কথা বলতে পারলাম না। কি বলব?

শদরা মিকার হাতে চাপ দিয়ে দরদভরা কণ্ঠে বলল, দেখ, ওগো মেয়েটার দিকে চেয়ে দেখ একবার।

মিকা তাকিয়ে দেখল, সে হাতের কাজ ফেলে রেখে স্থির দৃষ্টিতে ওদের দু’জনের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে সেই দুষ্টুমি নেই, মুখেও আর মিষ্টি হাসি নেই। এমন রিক্ত, অবসন্ন যে, ওর মুখ দেখে মনে হয় যেন ওর সব কিছু হারিয়ে গেছে। চোখে চোখ পড়তেই সে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজের কাজে মন দিল।

শদরা একটু ম্লান হাসি হাসল : আমি কি ভাবছি জান মিকা, ওই মেয়েটা আর তুমি যদি এইভাবে পাশাপাশি গল্প করতে, আর আমাকে ওর জায়গায় দাঁড়িয়ে অমন করে তাই দেখতে হোত—তবে? এ সংসারটা যেন কেমন মিকা! এই পৃথিবী সুধায় ভরা, কিন্তু প্রতিটি সুধাপাত্রে কে অমন করে গরল মিশিয়ে রেখেছে? মিকা, মিকা, মিকা! ডাকো, ওকে ডাকো!

চমকে উঠল মিকা : কাকে? কাকে ডাকতে বলছ? মেয়েটিকে? ছিঃ!

: আরে না না, মেয়েটাকে কেন, ওই-যে লোকটা সাদা ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে, ওকে ডাকো।

: এ তো তীরশথ।

: হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাঁকেই তো ডাকতে বলছি।

: কেন? তাঁকে ডাকবো কেন?

: আঃ, কেন নয়। ডাকো আগে। কেন, তারপরে হবে।

মিকা তার গলার স্বর উঁচু করে ডাকল। ডাক শুনতে পেয়ে ঘোড়সওয়ার থেমে গেল। নেহেমিয়া ওদের চিনতে পেরেছেন। মিকা এবার তাকে হাতের ইঙ্গিতে করে কাছে আসতে বলল। শদরা লক্ষ করল তিনি একবার যেন একটু ইতস্তত করলেন, পরে ঘোড়াটা আস্তে আস্তে এগিয়ে আসতে লাগল।

: তীরশথ, অভিবাদন গ্রহণ করুন।

নেহেমিয়া একটু মাথা নুইয়ে তাদের দু’জনের অভিবাদন গ্রহণ করলেন।

: মিকা, তুমি আমায় ডাকছিলে?

মিকা নয়, আমি শদরা বলল। নেহেমিয়ার চোখে বিস্ময়ের কুঞ্চন দেখা দিল। শদরা মিকাকে ঠেলে সরিয়ে দিল

: তুমি যাও না। তুমি আবার এখানে দাঁড়িয়ে রইলে কেন?

কোথায় যাব আমি? অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন মিকা

: কোথায় যাবে, আমি তার জানি কি? যেখানে খুশী সেখানে যাও। কেন এত লোক কাজ করছে, কাজ নেই তোমার হাতে? তোমার যত কাজ কি সব আমার কাছে? আঃ, এই ইহুদীগুলোকে নিয়ে হয়েছে এক জ্বালা। সোজা কথাটা বললে বোঝে না। মাথায় কিছু যদি থাকে। আচ্ছা, জলের মত তরল করেই বলছি। আমার তীরশথের সঙ্গে একটু দরকারী কথা আছে। তুমি কেটে পড়ো

কি আর করবে মিকা, কেটেই পড়ল।

কিছুটা সময় নিঃশব্দে কেটে গেল।

‘তীরশথ, আমাকে ক্ষমা করুন’ শদরার গলাটা একটু কেঁপে উঠল। তীক্ষ্ণভাষিণী শদরার কণ্ঠ থেকে-যে এমন কোমলতা ঝরে পড়তে পারে, নেহেমিয়া তা ভাবতেও পারেন নি। মুখের দিকে চেয়ে দেখলেন—না, সেখানে বিদ্রূপ বা অশিষ্টতার চিহ্নমাত্র নেই।

: কেন, কি করেছ তুমি? কিসের জন্য তোমাকে ক্ষমা করতে হবে?

: সে কথা আপনি ভোলেন নি, ভুলতে পারেন না। কাল ওই ওখানে দাঁড়িয়ে আমি আপনাকে অত্যন্ত অশিষ্ট একটা কথা বলেছিলাম। আপনি আমার শ্রদ্ধেয়, আপনাকে ও-কথা বলা আমার খুবই অন্যায় হয়েছিল। ও-কথা বলবার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম, না, হঠাৎ কেমন করে মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, সেই অনুতাপে আমি জ্বলে মরছি। আপনি এর আগেও আমাকে আর একবার ক্ষমা করেছেন। আমি অল্পবুদ্ধি। এবারও আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।

সুবক্তা নেহেমিয়া কথা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ঘোড়াটা উস করতে লাগল, কিন্তু আরোহী স্থির হয়ে বসে রইল। এইভাবে নিঃশব্দে সময়-স্রোত বয়ে চলল, কেউ কোন কথা বলল না। হঠাৎ মাথার উপর দিয়ে একটা ঈগল তীক্ষ্ণকণ্ঠে ডাক দিয়ে উড়ে চলে গেল।

ওরা দু’জনেই চমকে উঠল। মনে হোল সে যেন হুঁশিয়ারী দিয়ে বলে গেল, তোমরা কি ভুলে গেছ যে, এ ভাবে এতক্ষণ মুখোমুখি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকাটা লোক- চক্ষে শোভন নয়?

নিঃশব্দতা ভেঙ্গে নেহেমিয়া বললেন, কে কাকে ক্ষমা করবে দানিয়েল, আমি নিজেই যে তার জবাব খুঁজে পাচ্ছি না। কাল তোমার মুখে ও-কথা শুনে প্রথমে সত্যসত্যই খুব উত্তেজিত হয়েছিলাম। কিন্তু পরে শান্ত মুহূর্তে স্থির হয়ে বসে অনেক কিছু ভাবলাম। সে ভাবনা আমার এখনও শেষ হয় নি। মনে হোল, সেখানে হয়তো বা মনের কোণে কোণে এখনও অনেক কালি লেগে আছে, ধুয়ে মুছে সাফ করতে পারি নি। আর তাই বুঝি যিহোবা তোমার মধ্য দিয়ে আমার পাপের জন্য ভর্ৎসনা-বাণী পাঠালেন। তখন আর তোমার উপর আমার বিরূপ ভাব রইল না। আমি তোমাকে ধন্যবাদ জানালাম!

শদরা নেহেমিয়ার চোখে চোখ মিলিয়ে স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,

: পাপ! শাস্ত্রজ্ঞেরা এই পাপের চুল-চেরা হিসেব করতে গিয়ে থই পাচ্ছেন না, আমি অল্পবুদ্ধি সাধারণ মেয়ে, আমি আর কী বলব! বিচারের ভার প্রভুর হাতেই থাক, আমাকে আর তার সঙ্গে জড়াবেন না। কিন্তু আপনি আমার কথা শুনুন, একদিন আমাকে উদ্দেশ করে আপনার মহৎ হৃদয় থেকে যে-স্নেহধারা উৎসারিত হয়ে উঠেছিল, আজ যদি তার কিছুমাত্রও অবশিষ্ট থেকে থাকে, তাহলে যে যা-ই বলুক না কেন, আমি আপনাকে ধন্য বলে মনে করব।

নেহেমিয়া মুগ্ধ হয়ে দেখলেন, দানিয়েলের মুখখানি কী অপূর্ব সুষমায় মণ্ডিত হয়ে উঠেছে। তাকে এত সুন্দর বলে আর কোনদিনই তাঁর মনে হয় নি। তার মাধুর্যে ভরা স্নিগ্ধ দৃষ্টি যেন তাঁর অন্তরের সমস্ত গ্লানি মুছে দিয়ে তাঁকে নির্মল করে তুলল।

: তোমাকে আমি কোন দিন ভুলতে পারব না, দানিয়েল।

: না, ভুলবেন না। মনে রাখবেন। আমি তাকে আমার পরম সৌভাগ্য বলেই মনে করব।

নেহেমিয়ার ঘোড়া মুখ ফিরিয়ে এগিয়ে চলল। কিন্তু এবার আর ছুটল না, ধীরে চলতে লাগল।

নেহেমিয়া এই ব্যাপারটার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। এত সমস্ত খবর তিনি রাখতেন না। তা ছাড়া জানবার সময়ই বা কোথায়। জেরুজালেমে পা দেবার পর থেকেই যে হৈ-হুল্লোড় চলছে!

তাঁর প্রিয় সাদা ঘোড়াটায় চেপে গরীব পাড়ার পাশ দিয়ে যাচ্ছেন, এমন সময় বস্তি থেকে দলে দলে লোক এসে তাঁকে ঘিরে ধরল। তাদের মধ্যে পুরুষ আর মেয়ে দুই-ই ছিল। নেহেমিয়া ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন। লোকগুলোকে তাঁর বড়ই ভাল লেগেছিল। প্রাচীর গড়ে তোলবার ব্যাপারে এরাই-যে তাঁর বল ভরসা। কি অক্লান্তভাবেই না এরা পরিশ্রম করে চলেছে! ঘুরে ঘুরে সবই তো দেখছেন তিনি। এ তো আর শৌখিন লোকের শখের কাজ নয়। শ্রমজীবীর কড়া হাতের টানেই তো সংসারটা চলছে।

: কি গো, তোমরা তোমাদের কাজে যাবে না?

একজন সামনে এগিয়ে এসে বলল, আমরা তো চলছিলাম কাজেই, এমন সময় আপনি এসে পড়লেন। এসেছেন ভালই হয়েছে, আমাদের কতগুলো দুঃখের কথা আছে, আপনার কাছে নিবেদন করতে চাই। আপনাকে না বললে কাকেই বা বলব!

নেহেমিয়া মনে মনে একটু আশ্চর্য হলেন। ভূমিকা শুনে ও লোক-সমাগম দেখে মনে হোল, এরা যেন আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে ছিল। একটু হেসে বললেন, বলবে বই কি, বল বল।

: তীরশথ, আমরা ইতর লোক, বিদ্যাবুদ্ধিহীন। কিন্তু তাই বলে কি আমরা ইহুদী নই?

: তোমরা যদি ইহুদী না-ই হবে, তবে ইহুদী কারা? আজ তোমরা যা করছ সে কথা স্মরণ করে ভবিষ্যৎ ইহুদীরা একদিন গর্ব ও গৌরব বোধ করবে।

: সে তো অনেক পরের কথা তীরশথ। আপনি আমাদের এখনকার কথাটা একবার চিন্তা করে দেখুন। আমাদের এই ভাঙ্গাচোরা ঘরগুলোর দিকে একবার তাকান, আর একবার তাকিয়ে দেখুন আমাদের এই কঙ্কালসার বাচ্চাগুলোর দিকে। এদের দিকে তাকালে গর্ব আর গৌরবের কথাটা কি ঠাট্টার মতই মনে হয় না?

নেহেমিয়া থমকে গেলেন কথা শুনে। লোকটি বিদ্যায় হীন যদিও বা হয়, বুদ্ধিহীন তো মোটেই নয়। দিব্যি গুছিয়ে কথাগুলো বলেছে।

: তীরশথ, আমাদের এই দুরবস্থা কেন, বলতে পারেন?

এর একটা বাঁধা জবাব আছে, সচরাচর সবাই তাই দিয়ে থাকে। অভ্যাসমত নেহেমিয়াও সেই উত্তরই দিলেন

: এ সবই আমাদের পাপের ফল ভাই, সবই যিহোবার ইচ্ছা। তার উপরে তো আর কারু কোন হাত নেই।

: আপনিও-যে ওদের মত কথাই বললেন। ওরাও ঠিক এই কথাই বলে।

: ওরা কারা? তাদের কথা বলছ?

: বলছি আমাদের সেই সব ধনী ইহুদী ভাইদের কথা, যারা এত দিন ধরে আমাদের হাড় মাংস চিবিয়ে খেয়েছে, আজও খাচ্ছে।

: এরা কি করেছে তোমাদের?

: অকালের সময় আমরা ওদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলাম, সেই ঋণ সুদসুদ্ধ পর্বতপ্রমাণ হয়ে উঠেছে। আর তারই দায়ে আমাদের ভিটেমাটি জমি ওদের হাতে বাঁধা পড়েছে। আর আমাদের ছেলেমেয়েগুলো ওদের বাড়ীতে দাসদাসী হয়ে গরু ভেড়ার মতই আটকে আছে?

বল কি, তোমাদের ছেলেমেয়েরা ইহুদীদের বাড়ীতে দাসদাসী হয়ে আছে!

: হায় যিহোবা, আপনি কি তাও জানেন না। এই ঋণ শোধ করা আমাদের পক্ষে কোন দিনই সম্ভব হবে না। আমাদের ছেলেমেয়েদেরও আমরা আর ফেরত পাব না। পরজাতীয়দের আমরা কত কথা বলি, কিন্তু আমাদের এইসব ধনী ইহুদী ভাইয়েরা কি তাদের চেয়ে কোন অংশে কম?

: তোমরা এ সমস্ত কথা সমাজকে জানিয়েছ কোন দিন?

: কাকে জানাব? যাদের জানাতে পারি তারা হয় নিজেরাই এই কাজে লিপ্ত, নয়তো এর পেছনে তাদেরও সমর্থন আছে। তীরশথ, আমাদের এই সমস্ত সুখী ভ্রাতাদের রক্তমাংস থেকে আমাদের রক্ত-মাংস কি আলাদা? আর তাই তাই যদি হয় তবে আমাদের ‘ইহুদী’ বলে পরিচয় দেওয়ার অর্থই বা কি?

নেহেমিয়া তাদের আশ্বস্ত করে বললেন, তোমাদের কথা তো সবই শুনলাম। ভাই সব, তোমরা এখন কাজে যাও। নিশ্চিন্ত মনে কাজ করো। আজ রাত্রিতে আমি সমাজে জমায়েত বসিয়ে সেইখানে এই সমস্তে প্রশ্ন তুলব।

তাঁর কথায় সবাই খুশী হয়ে গেল। কে একজন ডেকে বলল, তীরশথ, এই-যে বুড়ী মা আপনাকে দেখতে এসেছে।

বুড়ী মা, কই বুড়ী মা? নেহেমিয়া সচকিত হয়ে উঠলেন।

এক অথর্ব বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে লাঠি ধরে কাঁপছে। একটি যুবক তাকে ধরে আস্তে আস্তে নিয়ে আসছে। নেহেমিয়া শশব্যস্ত হয়ে তার কাছে এগিয়ে গেলেন।

কয়েকজন একসাথে বলে উঠল, বুড়ী মা, বুড়ী মা, তীরশথ এসেছেন।

: কে, কে এসেছেন?

: তীরশথ এসেছেন।

: তীরশথ এসেছেন? তীরশথ, আপনি আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন। আমি অন্ধ, দেখতে পাই না, তবু আপনাকে দেখতে এসেছি। আপনি আমার গায়ে হাত রাখুন। নেহেমিয়া পরম আদবের সাথে তার একখানি হাত নিজের হাতে তুলে নিলেন।

: বুড়ী মা, কে বলে তুমি অন্ধ? তুমি অন্ধ নও। আমরা তো শুধু বাইরের চর্মচক্ষে দেখি, আর স্বয়ং যিহোবা তোমার অন্তর্লোকে বসে নিজে তোমাকে দেখান।

: না বাবা, অমন কথা বোলো না। আমি-যে পাপী, বড় পাপী। অমন কথা শুনলে আমার ভয় হয়।

নেহেমিয়া বললেন, বুড়ী মা, তুমি যা বলেছিলেন, সবই তো ঠিক হয়েছে। তুমি বলেছিলেন, আমরা আসব, আমরা এলাম। তুমি বলেছিলে, জেরুজালেমের প্রাচীর উঠবে, সেই প্রাচীর তো উঠছে। তবু তুমি অন্ধ?

: হ্যাঁ বাবা, তবু আমি অন্ধ। আমি-যে আরও কিছু বলেছিলাম, কই সে কথা তো বললে না? বলেছিলাম—গরীব ইহুদীদের দুঃখ দুর্গতি দূর হবে। কিন্তু কই বাবা, তা তো হয় নি।

নেহেমিয়া হেসে উঠলেন : বুড়ী মা, আচ্ছা মেয়ে তুমি। না, না, বুড়ী মা তুমি কিছুই ভুল বলো নি। গরীব ইহুদীদের দুঃখ দুর্দশা এবার সত্য সত্যই দূর হবে। আমি তোমাকে কথা দিলাম।

সবাই আনন্দধ্বনি করে উঠল।

বুড়ী মা দুহাত দিয়ে নেহেমিয়ার হাতটা জড়িয়ে ধরে বলল; আহা, কী কথা শোনালে! এবার আমি বড় শান্তিতে মরতে পারব। বাবা, তুমি যিহোবার দূত। আমি আর তোমাকে কি বলে আশীর্বাদ করব!

বুড়ী মার কোটরগত নিষ্প্রভ চক্ষু থেকে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু তার বলিরেখা-অঙ্কিত গালের উপর দিয়ে বেয়ে পড়তে লাগল।

: তীরশথ, অভিবাদন গ্রহণ করুন।

: কে মিকা? তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে? এখান থেকেই বেরিয়ে এলে যে! ও, এবার বুঝলাম। তুমি পেছনে বসে তোমার বাহিনী পরিচালিত করছিলে। এত কৌশলী হয়ে উঠেছে তুমি এই ক’দিনেই!

পেছন থেকে একটি কোমল কণ্ঠ ঝংকার দিয়ে উঠল,

: না, তীরশথ, আপনার মিকার নিজের মাথায় এ বুদ্ধি খেলত না। মিকার সকল বিষয়ে বুদ্ধিদাত্রী যিনি, এই বুদ্ধিও তাঁর মাথা থেকেই বেরিয়েছে। মিকা, বলো, ঠিক কিনা। মিছে কথা বোলো না।

: ও বাবা, তুমিও আছো? তাই তো বলি। এমন বুদ্ধিদাত্রী পেয়েছে, মিকার অদৃষ্ট ভালো বলতেই হবে। কিন্তু শাসনের পালাটা যা দেখলাম সেদিন, ঘাবড়াবারই কথা। উঃ, দানিয়েল, বড় কড়া শাসন তোমার।

বাইরের লোকে যাতে শুনতে না পায় এমনি আস্তে করে শদরা বলল।

: শাসন না করলে ঠিক থাকে কখনও! তীরশথ, আমাদের উপরে আপনি শাসনকর্তা। বিস্তীর্ণ আপনার শাসন ক্ষেত্র। কিন্তু তার নীচেও আমাদের ছোট ছোট সীমাবদ্ধ শাসনক্ষেত্র আছে, সেটা আপনার এলাকার বাইরে। আপনি কি সেখানেও হস্তক্ষেপ করতে চান?

: না, কক্ষনো না। তুমি প্রবল প্রতাপে শাসন করো।

এবার নেহেমিয়ার স্বর অনেক নীচে নেমে গেল। শদরা ছাড়া আর কেউ সে কথা শুনল না। নেহেমিয়া যেন গুঞ্জন করে উঠলেন

: দুঃখের কথা কি বলব দানিয়েল, হয়তো বা চিরকাল আমাকে এই ভাবে শাসন করেই যেতে হবে। কিন্তু আমাকে শাসন করবার কেউ নেই।

বুড়ী মাকে ঘিরে বসে সবাই খবরটা শোনাচ্ছিল। আনন্দে উজ্জ্বল ওদের মুখগুলো।

: তারপর কি বললেন তীরশথ?

তীরশথের মুখ দিয়ে যেন আগুন ছুটতে লাগল বুড়ী মা। বললেন তোমরা ভাই হয়ে ভাইরের কাছে সুদ খাও, তোমাদের ঘেন্না হয় না? তোমরা ইহুদী? তোমরা মানুষ নামে যোগ্য নও, ইহুদী তো পরের কথা। ওদের মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গিয়েছিল। কারু চোখের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারে না।

কেউ কাউকে কথা বলতে দিতে চায় না। প্রথম রক্তার বক্তব্য শেষ না হতেই আর একজন মাঝখানে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

: বলব কি বুড়ী মা, তীরশথের চোখ যেন জ্বলছিল। আমি কাছে ছিলাম, নিজের চোখে স্পষ্ট দেখলাম। বললেন—লজ্জার কথা! আমাদের চিরশত্রু ক্যালদীয়রা ইহুদীদের দেশবিদেশের নিয়ে বিক্রী করে দিয়েছিল। আমরা চেষ্টা করে মরছি তাদের মুক্ত করে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য। আর তোমরা ঋণের দায়ে ইহুদী ছেলেমেয়েদের দাসদাসী করে রেখেছে, আর পণ্যের মত তাদের বিক্রী করছ, তোমরা ইহুদী বলে পরিচয় দাও? সমাজের বহু লোক তখন চিৎকার করে উঠল—ধিক্! ধিক্!

বুড়ী মা জিগ্যেস করল

: কি বলল? কি বলল তারা?

: বলল, ধিক! ধিক! ওই সুদখোর মহাজনগুলোকে সবাই মিলে গাল দিল আর কি। কেউ কেউ ওদের উদ্দেশ করে থুথুও ফেলল।

দ্বিতীয় বক্তার বক্তব্য আর এগোতে পারল না। ইতিমধ্যে আর একজন এসে ঢুকে পড়েছে। সে দ্বিতীয় বক্তাকে ঠেলে সরিয়ে তার গলাটাকে বাড়িয়ে দিয়ে আরও একটু চড়া গলায় বলে চলল,

: তারপর তীরশথ আমাদের কথা বললেন। বললেন—যাদের তোমরা সর্বস্বান্ত করে চলেছ, সেই গরীব ইহুদী ভাইয়েরা ইহুদী জাতির গৌরব। তারা যদি কাজে হাত না লাগাত তাহলে কি আর এই প্রাচীর উঠত? আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরেরা চিরদিন এদের কথা স্মরণ করবে। ইতিহাসে তাদের কথা লেখা থাকবে।

: বললেন—বললেন তীরশথ এই কথা? তুই নিজের কানে এই কথা শুনেছিলি? বুড়ী মা উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করল।

প্রথম বক্তা এবার একেবারে বুড়ী মার গা ঘেঁষে বসেছে। বুড়ী মার এই প্রশ্নটা মাটিতে পড়বার আগেই সে তাকে লুফে নিল।

: আমি—আমি—আমি একেবারে স্বকর্ণে শুনেছি। একদম কাছে বসেছিলাম কিনা। তীরশথ বললেন, না, এত দিন যা-ই হয়ে থাক, এখন আর এ সব চলবে না। তোমরা তো অনেক ভোগ করেছ, এবার সবাইকে ঋণমুক্ত করে দাও। তোমরা ঋণের দরুন এদের যে- সমস্ত শস্যক্ষেত্র, দ্রাক্ষাক্ষেত্র, জেতক্ষেত্র ও আবাসসমূহ ভোগ করছ সব কিছু ফিরিয়ে দিতে হবে এবং রৌপ্যের, শস্যের, দ্রাক্ষারসের ও তেলের উপর যে-সুদ আদায় করে চলেছ, সেই আদায় বন্ধ করে দিতে হবে। আর ঋণের দায়ে যে-সমস্ত ছেলেমেয়েকে দাসদাসী বানিয়ে রেখেছ, তাদেরকে মুক্তি দিতে হবে। তোমরা কি দেখছ না পরজাতীয়েরা তোমাদের এই সমস্ত জঘন্য কার্যকলাপ দেখে হাসছে? তোমাদের কি ভয় নেই? তোমরা কি তোমাদের পাপের ফলে আবার যিহোবার অভিশাপ ডেকে আনতে চাও? সবাই তীরশথের এই কথাকে সমর্থন করল। একটা লোকও এর বিরুদ্ধে কোন কথা বলল না।

কেন, ওরা? ওরা কিছু বলল না? বুড়ী মা জানতে চাইল।

: হ্যাঁ। ওরা আবার কথা বলবে। ওদের কি আর তখন কথা বলবার সাহস আছে! সবাই যখন ওদের মুখের দিকে তাকাল, ওরা তখন নেহাৎ ভালমানুষের মত বলল, সমাজ যে-আদেশ করবেন, আমরা তা অবশ্যই মেনে চলব। আমরা কথা দিচ্ছি, আমরা ওদের বাকী ঋণের দায় থেকে মুক্তি দেব, আর ওদের কাছ থেকে যা আমরা নিয়েছি, সব কিছু ফিরিয়ে দেব।

: আর তীরশথ তখন কি বললেন?

: তিনি যাজকদের ডাকিয়ে এনে তাদের সামনে দিব্য করালেন। তারপর তাঁর নিজের কোলের কাপড় ঝেড়ে বললেন, যে-কেউ এই প্রতিজ্ঞা পালন না করবে, যিহোবা তার গৃহ ও পরিশ্রমের ফল থেকে যেন এইভাবেই তাকে ঝেড়ে ফেলেন, এইভাবেই সে ঝাড়াও শূন্য হোক।

এই কথা শোনা মাত্রই বুড়ী মা তার কোলের কাপড় ঝাড়ল। তার দেখাদেখি সকলেই তাদের নিজ নিজ কোলের কাপড় ঝাড়ল।

: তারপর আর সবাই কি করল?

: সবাই বলল—আমেন!

: বুড়ী মা দৃষ্টিহীন চোখ দু’টি ঊর্ধ্বে উত্তোলিত করে বলল—আমেন!

উপস্থিত সকলেই তার প্রতিধ্বনির মতই বলল—আমেন!

প্রাচীরের অধিকাংশ কাজ সারা হয়ে গিয়েছে। যেটুকু বাকী আছে শেষ করতে আর বেশী দিন লাগবে না। এখন আর কারু মনে সংশয় নেই। এবার তারা আবার তাদের সেই প্রভুর নগরীকে ফিরে পাবে।

প্রাচীরের পুরদ্বারগুলো এখনও সবই বাকী। লেবাননের বনরক্ষক আসফের কাছে নির্দেশ দিয়ে পারস্যরাজ নেহেমিয়ার হাতে যে-পত্র দিয়েছিলেন, সেই পত্র নিয়ে কয়েকজন চলে গেছে লেবাননে কাঠ আনবার জন্য। তাদের ফিরে আসার সময় হয়ে এলো। তারা কাঠ নিয়ে এলেই দ্বারগুলো তৈরী করা হবে। সে আর কত দিনের কাজ। তারপরেই জেরুজালেম সুরক্ষিত নগরীর রূপ নেবে। জেরুজালেমবাসী ইহুদীরা সেই দিনের কথা মনে করে কত সুখস্বপ্নই না দেখছে।

এ সব দেখে শুনে শত্রুপক্ষের লোকদের মন ভেঙ্গে গেছে। তবু এখনও তারা হাল ছাড়ে নি। তারা অস্থির হয়ে ইহুদী সমাজের রন্ধ্রগুলো খুঁজে খুঁজে ফিরছে। হরোনীয় সনবল্লাট আর আরবীয় গেশেমের কাছ থেকে নেহেমিয়ার কাছে বার্তাবাহক বার্তা নিয়ে এলো—কতগুলো গুরুতর বিষয় নিয়ে আপনার সঙ্গে আমাদের আলাপের প্রয়োজন আছে। আপনি আসুন, ওনোর প্রান্তরে অবস্থিত যে-কোন একটি গ্রামে আমরা আলোচনার জন্য একত্রে বসতে চাই।

নেহেমিয়া এর উত্তরে তাদের জানালেন—আপনারা জানেন, আমি এখন বিরাট এক কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছি। আমার এখান থেকে মুহূর্ত মাত্র নড়বার সুযোগ নেই। আমি যদি এখন এই কাজের জায়গা ছেড়ে আপনাদের ওখানে যাই তাহলে সমস্ত কাজ বন্ধ হয়ে থাকবে। কাজেই আমার পক্ষে যাওয়া এখন কোন মতেই সম্ভব নয়।

নেহেমিয়ার বুঝতে বাকী ছিল না, এই আহ্বানের পেছনে একটা বদ মতলব রয়েছে। হয়তো বা তাঁকে ফাঁদে ফেলতে চায়। না, এত কাঁচা ছেলে নেহেমিয়া নয়। তাঁর কাছ থেকে এই স্পষ্ট জবাব পাওয়ার পরেও অপর পক্ষ কিন্তু নিবৃত্ত হোল না। এর পরেও তারা পর পর চারবার এই সংবাদ পাঠাল আর নেহেমিয়াও একইভাবে উত্তর দিয়ে চললেন।

অতঃপর পঞ্চম বার সববল্লাটের একটি বিশিষ্ট ভৃত্য তার একখানা চিঠি নিয়ে এলো। সেই চিঠিতে লেখা ছিল :

“প্রতিবেশী জাতিগুলোর মধ্যে ব্যাপকভাবে এই জনরব ছড়িয়ে পড়ছে এবং গেশেমও এই কথা বলছেন যে, আপনি আর জেরুজালেমের ইহুদীরা সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করবার জন্য সংকল্প করছেন। আর সেই উদ্দেশ্যেই আপনি প্রাচীর তুলে জেরুজালেমকে সুরক্ষিত নগরীতে পরিণত করবার চেষ্টায় আছেন। সকলের মুখে এই এক কথা শোনা যাচ্ছে, আপনি নাকি ইহুদীদের রাজা হয়ে বসতে চাইছেন।

“আমি আরও শুনতে পাচ্ছি আপনার নিযুক্ত নবী জেরুজালেমের পথে পথে বাণী ঘোষণা করে চলেছে যে, যিহোবার প্রাসাদে ইহুদীদের এক নতুন রাজার আবির্ভাব হয়েছে। এ সমস্ত জনরব সত্য কি মিথ্যা, আমি জানি না। কিন্তু এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, এই সমস্ত জনরব অতিরঞ্জিত হয়ে সম্রাটের কানে গিয়ে পৌঁছাবে। আর তার ফল কখনোই আপনার পক্ষে শুভ হবে না। আপনি সুসানের রাজপ্রাসাদের অবস্থান করেছেন, পারস্যরাজ্যের প্রতাপ আপনার কাছে অবিদিত নয়। সেইজন্যই আমি বলছি, আপনি অবিলম্বে এখানে চলে আসুন, আমরা সবাই একত্র হয়ে বসে এই বিষয়টা নিয়ে মন্ত্রণা করে দেখি।”

নেহেমিয়া সনবল্লাটের এই চিঠির উত্তরে লিখে পাঠালেন—আপনি যে-সমস্ত কথা লিখেছেন, তার সবই ভিত্তিহীন। এগুলো আপনাদের মনগড়া কথা মাত্র। কাজেই এই সমস্ত অর্থহীন কথা নিয়ে আপনার সঙ্গে মন্ত্রণা করতে যাওয়ার কোন প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না!

অবশেষে প্রতিপক্ষের প্রকাশ্য ও গোপন সমস্ত চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দিয়ে নেহেমিয়ার দুঃসাহসিক প্রাচীর-নির্মাণ-পরিকল্পনা সম্পূর্ণ হোল। ইহুদীদের কাছে সে এক স্মরণীয় দিন। জেরুজালেমের অধিবাসীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ইলুল মাসের পঞ্চম দিনে সকল-দ্বার-সমন্বিত পূর্ণাঙ্গ প্রাচীর গড়ে উঠল। যাহুদার ইহুদীরা এবার নিঃসংশয়ে উপলব্ধি করল, জেরুজালেম নগরী আবার এক নতুন ইতিহাস রচনা করতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *