ঊনত্রিশ
খুব ভোরে অন্ধকার থাকতেই পাখীর কিচিরমিচির শব্দে মিকার ঘুম ভেঙ্গে গেল।
: মিকা, ওঠ, ওঠ, দেখ আমরা কোথায় এসেছি। এ দেশের নাম কি মিকা
: মিসর।
: এ্যা, মিসর! মিসরে এসে গেছি আমরা!
: দেখছ না, ওই-যে নীল নদের নীল জল খলখল করে হেসে চলেছে। এ নদী নীল নদ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। শদরা, আমরা কবার নদীর কথা মনে পড়ছে।
: আমারও, মিকা, আমারও।
জেরুজালেম ছেড়ে দিনের পর দিন চলতে চলতে অবশেষে ওরা মিসরে এসে পৌঁছেছে। মাঝখানে কতগুলো দিন কেটে গেছে, কে জানে! দিনের হিসেবে কে রাখে!
: এখানে আমাদের কেউ চিনবে না তো মিকা?
: না, শদরা, আমাদের কে চিনবে?
: মিকা, আমরা সংসারে কার কাছে এমন কি অপরাধ করেছি যে, এই লজ্জা আর কলঙ্ক কালিমা চিরদিনের মত আমাদের মুখে আঁকা হয়ে রইল। কেন আমাদের এই লাঞ্ছনা? ইহুদী আর ক্যালদীয় কেউ আজ আর আমাদের গ্রহণ করবে না। ওরা আমাদের পাথর ছুঁড়ে মারবে। যেখানে যাও, যে-রাজ্যে যাও, এ কথা শুনলে সবাই দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবে। আর সেই দুর্ভাগ্য বহন করে হয়তো কত দীর্ঘকাল আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।
: শদরা, দেবতা আর মানুষ সবাই আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। নির্দোষ হয়েও আমরা সমস্ত মানুষের কাছে ঘৃণার পাত্র। এর বিচার আমরা কার কাছে চাইব? শদরা, এ সংসারে বিচার নেই।
: তারা ঘৃণা করে করুক, কিন্তু আমি ভাবছি, শেষ পর্যন্ত আমরা আমাদের নিজেদের ঘৃণা করব না তো? মিকা, সত্যি করে বলো, তোমার মনে কোন গ্লানি নেই তো?
: না শদরা, তুমি আমায় বিশ্বাস করো।
: তেমনি করে সহজভাবে এখনও তুমি আমাকে তোমার বুকে টেনে নিতে পারবে?
: পারব শদরা।
: তুমি আমায় ছলনা করছ না তো?
: না শদরা, না। তবে শোন তুমি। সেই ভয়ংকর রাত্রিতে আমি তোমার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। আমি মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম, সেই রাত্রি যেন আর ভোর না হয়। কিন্তু তার পর দিন প্রস্ফুট দিবালোকে সকলের মিলিত ঘৃণা আর আক্রমণের মুখে তুমি আমি এক হয়ে গেলাম।
: আর সেই ভয়ংকর রাত্রিতে আমি কি ভাবছিলাম জান? ভাবছিলাম, আত্মঘাতিনী হয়ে তোমাকে এই লজ্জা আর কলঙ্কের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে যাব। কিন্তু তোমাকে একা ফেলে রেখে যেতে বড় মায়া লাগল মিকা। বেদনায় আমার বুকটা টনটন করে উঠল। আমি পারলাম না।
: শদরা, তার পরের কথা শোন। জেরুজালেম ছেড়ে পথ চলতে চলতে সূর্যোদয়ে কুয়াশার মত আমার মনে গ্লানি ক্রমে ক্রমে কেটে যেতে লাগল। আমার মন সুস্থ হয়ে উঠল, সাহসী হয়ে উঠল। ভাবলাম, নিষ্পাপ আমরা, নিষ্কলঙ্ক আমরা, আমরা কেন ওদের কাছে মাথা নীচু করে থাকব? কে, কবে, কোথায় তার অসংযত প্রবৃত্তি চরিতার্থ করবার ফলে এক সন্তানের জন্ম দিয়েছিল—তার দায়-দায়িত্ব কি আমাদের বয়ে নিয়ে চলতে হবে? বাইরের লোকের কাছে যা-ই হই না কেন, আজ আমার নিজের মনে কোনই গ্লানি নেই।
: তুমি আমার বাঁচালে মিকা। তোমার জন্য এ ক’দিন কত-যে চিন্তা করেছি, পাছে তুমি ভেঙ্গে পড়। কত-যে ইচ্ছা হয়েছে, তোমাকে আমার বুকের কাছে টেনে এনে সান্ত্বনা দিই। কিন্তু ইতস্তত করেছি। কি জানি তুমি যদি
: কি আশ্চর্য, তোমার সম্পর্কে আমিও তো এমনি করেই ভেবেছি শদরা।
: জান মিকা, কাল রাত্রিতে হঠাৎ এক সময় ঘুম ভেঙ্গে গেল। তোমার দিকে চেয়ে দেখলাম, তুমি একা বড় অসহায়ের মত এক দিকে পড়ে আছ। জ্যোৎস্নার আলোয় ধোয়া তোমার মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। মিকা, আমার দু’চোখ জলে ভরে এল। আমি আর সইতে পারলাম না। আমি তোমার কাছে সরে গেলাম। তার পর সেই ভয়ংকর রাত্রির পর এই প্রথম তোমাকে সাগ্রহে আমার বুকে টেনে নিলাম। আর কি আশ্চর্য মিকা, ঘুমের মধ্যেও তুমি যেন আমায় চিনলে, আর তুমি তোমার মুখখানি আমার বুকের মধ্যে গুঁজে দিলে। আমার সমস্ত প্রাণ ভরে গেল। আঃ, কি সুন্দর সেই ঘুমন্ত মুখখানি! আকাশে ভাঙ্গা চাঁদ মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছিল। তারই আরো ক্ষণে ক্ষণে তোমার মুখের উপর এসে পড়ছিল। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল আমার গর্ভের কোমল বিছানায় এই রকম একটি শিশু ঘুমিয়ে আছে— তোমার মত মুখ, তোমার মত চোখ, তোমার মত সব। মাধুর্যের ভারে আমার সমস্ত চেতনা যেন অবশ হয়ে এল।
মিকা, এইখানেই এই নীল নদের তীরে আমরা আমাদের কুটির বেঁধে তুলব। সে দিন এমনি একটি কুটিরই তো তুমি চেয়েছিলে, যেখানে থাকব শুধু তুমি আর আমি, আর—
মিকা বলল, আর হ্যাঁ, ফুলের মত একটি শিশু।
ভোরের পাখীগুলো আবার এক সঙ্গে কলঝঙ্কার দিয়ে উঠল। হঠাৎ কোথা থেকে একটা দমকা বাতাস গাছের শাখাপল্লব দুলিয়ে হু হু করে বয়ে গেল। সেই বাতাসে নীল নদের জল মর্মরিত হয়ে উঠল।
***
