পাপের সন্তান – ১০

দশ

ওরা একটা বিশাল প্রান্তরের মাঝে এসে পড়ল। থমকে দাঁড়াল মিকা।

: শদরা, যা ভয় করেছিলাম তাই হয়েছে। আমরা পথ হারিয়ে অন্য দিকে চলে এসেছি।

: তাই নাকি? বেশ তো! কিন্তু আমরা পথ হারাই নি, পথ হারিয়েছ তুমি। আমি কি পথ চিনি যে, পথ হারাব?

: কি জানি, কেমন করে কি-যে হয়ে গেল। ওরা বলছিল— অহবার দিকে যেই নদীটা গিয়েছে তার বাঁকের ধারে আমরা আমাদের তাঁবু খাটাব। তুমি, আর যে- মেয়েটাকে চুরি করে আনবে, তোমরা দু’জনে রাত্রিবেলা সেইখানে গিয়ে আমাদের সাথে মিলিত হবে। সোজা উত্তর দিকে চলে যাবে, পথ হারাবার কোন ভয় নেই।

: বটে, মেয়েটাকে তুমি চুরি করেছ, না মেয়েটা তোমাকে চুরি করেছে? সত্যি করে বলো।

: আহা, না হয় তাই হলো, তা বলে অত লোকের কাছে সে কথা বলা যায় নাকি?

: আচ্ছা, থাক, তবে না হয় নাই বললে। কিন্তু দেখ দেখ, মজা দেখ—শদরা হাতে তালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল।

: কি, কি, এই তেপান্তরের মাঝখানে কি এমন মজা দেখলে তুমি?

: আরে, ওই-যে দেখ না গো, চোরের মত কেমন উঁকি-ঝুঁকি মারছে।

: চোরের মত? কই? কে?

মিকা সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গেই তার পোশাকের তলা থেকে দীর্ঘ তীক্ষ্ণধার ছুরি বের হয়ে এল।

: আহা বীর পুরুষ, রাখো তোমার ছুরি। ওই দেখো না, ওই যে চাঁদটা গাছের আড়াল থেকে উঁকি চাঁদ, এতক্ষণ কোথায় ছিলে? আর আমি সারা রাস্তায় অন্ধকারে হোঁচট খেয়ে মরেছি।

মিকা এবার বিপদের গুরুত্বটা বুঝে শিউরে উঠল।

: শদরা, সর্বনাশ হয়েছে, আমাদের বরাবর সামনের দিকে চাঁদ। তার মানে এতক্ষণ সোজা পুবে চলে এসেছি আমরা। অথচ আমাদের যাবার কথা উত্তর দিকে।

: ওগো চোর, তুমি কেমন চোর? তোমার পুব উত্তর জ্ঞানও নেই? এখন কি করবে?

: হাসির কথা নয় শদরা। এই অঞ্চলটা মোটেই ভাল নয়। প্রতি পদে বিপদের আশঙ্কা। শদরা, তোমাকে পুরুষের পোশাক পরে নিতে হবে।

: কেন, এখানকার এরা মেয়েদের বুঝি বেশী পছন্দ করে না?

: আরে না, বড় বেশী পছন্দ করে। পেলে আর ছাড়তেই চায় না মোটে। বিপদ তো সেখানেই। তোমাকে নিয়ে গেলে আমার চলবে?

: ও, চলবে না বুঝি? তাহলে বেশ, দাও, পুরুষের পোশাকই পরব। কিন্তু তোমরটা আমার গায়ে অনেক বড় হবে যে।

: না না, বড় হবে না। আমি তোমার মত করেই ছোট পোশাক বানিয়ে নিয়ে এসেছি।

: সে কি, কেন?

: অসময়ে কাজে লেগে যায়। দেখলে তো এখন?

: ও মা, এত হুঁশ তোমার? এদিকে তো দিগ-বিদিক জ্ঞান নেই।

: আরও একটা মতলব ছিল। অনেক দিন থেকেই সাধ ছিল, তোমাকে একবার ছেলের পোশাক পরিয়ে দেখব।

: কেন গো, এমন শখ কেন?

: ও আমার একটা খেয়াল। নাও, পরো। পরতে পারবে তো নিজে?

পোশাকটা হাতে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল শদরা। কতক্ষণ অমনিভাবে কেটে গেল। অধৈর্য হয়ে উঠল মিকা।

: কি, দাঁড়িয়ে রইলে যে, পোশাকটা পরছ না?

শদরা দাঁত মুখ খিঁচিয়ে উঠল,

: তোমার মাথার মধ্যে কিছু আছে? আহাম্মক কোথাকার! একটা মেয়ের মুখের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে বলছে কিনা—কই, পোশাকটা পরছ না?

মিকা একটু অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল,

: আহা, আমার কাছে আবার লজ্জা!

শদরা ফোঁস করে উঠল,

: তুমি একেবারে কচি শিশু না বুড়ো অথর্ব যে, তোমাকে দেখে লজ্জা করবে না! একটুও কাণ্ডজ্ঞান নেই। তুমি আমাকে এখন থেকেই জ্বালাতে আরম্ভ করলে?

: তবে কি করব ছাই বলোই না। চোখ বুজে থাকব? বেশ তো, এই বুজলাম চোখ।

: তোমাকে বিশ্বাস আছে! যাও, এখান থেকে যাও। বিশ হাত তফাতে চলে যাও। তারপর মুখ ফিরিয়ে দাঁড়াও। তারপর চোখ বন্ধ করো—

: তারপর?

: তারপর যখন বলব ‘এসো’, তখন ফিরে আসবে। তার আগে যদি একটি পা বাড়াও বা মুখ ফেরাও বা চোখ খোলো, তাহলে—

: তাহলে?

তাহলে নির্ঘাত খুনোখুনি হয়ে যাবে।

: ও বাবা, খুনোখুনি?

: হবেই তো।

শদরার নির্দেশ যথাযথভাবে প্রতিপালন করে মিকা ফিরে এসে দেখল শদরা নেই, তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে একটি নতমুখ কিশোর। অদ্ভুত পরিবর্তন! চেনাই যায় না যে। মিকা অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

: আহ্, অমন করে তাকিয়ে আছ কেন? আমার বিশ্বম হাসি পাচ্ছে। না না, আমার কেমন যেন লজ্জা করছে।

: বা রে, আমি দেখব না বুঝি?

: কত আর দেখবো? এখনও তোমার শখ মিটল না? কেমন লাগছে, সত্যি করে বলো না?

: চমৎকার!

: তুমি বড় মিছে কথা বলতে পারো। আচ্ছা, লোকের কাছে তুমি আমায় কি বলে ডাকবে? মিকা একটু ভেবে বলল, তোমার নাম? তোমার না—মদানিয়েল।

: বাঃ, বেশ তো! আর তুমি আমার কি হও?

: বড় ভাই।

: বড় ভাই? বেশ তো! কিন্তু আমি-যে ইহুদীদের ভাষায় ভাল করে কথা বলতে পারি না।

: বাঃ, তা কি করে পারবে! আমরা দু’জনেই-যে ছোটবেলা থেকেই ক্যালদীয়দের বাড়ীতে প্রতিপালিত হয়েছি।

: ওঃ, তাই তো, মনেই ছিল না যে। কিন্তু মিকা, তা যেন হোল, কিন্তু এখন আমরা কি করব? এখন কি আমরা আবার সোজা উত্তর দিকে মুখ করে যাত্রা করব?

: না শদরা, আজ আর যাব না। অনেক হেঁটেছ তুমি। আর এখন হয়তো যতই চলব, ততই দূরে সরে যাব। কাল সকালে কোথায়, কত দূরে চলে এসেছি বুঝে নিয়ে তারপর যা হয় করব। কিন্তু আমার ভয় হয়, কাল আমরা বোধ হয় ওদের ধরতে পারব না।

: ভয়টা কি? নাই বা পারলাম। ভালই তো। অত ভিড়ের মধ্যে গিয়ে কি হবে? আমরা দু’জনেই কি যথেষ্ট নই?

: তুমি বুঝছ না শদরা, বড় দীর্ঘ আর বিপজ্জনক এই পথ। এক সঙ্গে দল বেঁধে না গেলে পদে পদে বিপদ। আমাদের সঙ্গে দরকারী জিনিসপত্র কিছুই নেই। তা ছাড়া খাবে কি?

: কেন, আমাদের সঙ্গে তা অনেক সোনা আছে, আমাদের অভাব কিসের?

: জনবিরল এই দীর্ঘ দুর্গম পথে সোনা খেয়ে থাকতে পারবে? তা ছাড়া এই দস্যুসংকুল পথে সোনাই-যে বিপদ ডেকে আনে।

: এখন আমরা কি করব তাহলে?

: তুমি বলো না।

: না, তুমিই বলো।

: বেশ, তবে শোনো, আমার সঙ্গে খাবার আছে, এসো, দু’জনে মিলে খাই। তুমি ক্লান্ত–কাল থেকে অনেক হাঁটতে হবে। খেয়ে নিয়ে এসো আমরা দু’জন ঘুমিয়ে পড়ি। আর এইখান থেকেই শুরু হয়ে যাক মিকা আর শদরার সংসার-জীবন।

: কিন্তু মিকা, একটা কথা, আমাদের-যে এখনও বিয়ে হয় নি।

: বা রে, হয়ে গেছে তো।

: ও মা, কবে, জানি না তো?

: সেই দিন, সেই-যে অন্ধকার রাত্রিতে আমি তোমার দরজায় গিয়ে ঘা দিলাম, আর তুমি নিজ হাতে সেই বন্ধ দরজা খুলে দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালে—

: বুঝেছি।

আমি তোমাকে গ্রহণ করলাম, তুমি আমাকে গ্রহণ করলে। আর বাকী রইল কি?

: কিন্তু কেউ-যে জানল না।

: নাই বা জানল। আমরা দু’জন কি আমাদের দু’জনের পক্ষে যথেষ্ট নই? শদরা, তুমি এতে রাজী নও? আবার অনুষ্ঠান করে ঘোষণা করতে হবে?

শদরা দুই হাত দিয়ে মিকার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, : মিকা, তুমি যা বলো, তাই। হ্যাঁ, তাই হবে সবচেয়ে ভাল। না, আমি আর কোন অনুষ্ঠান করতে চাই না। কোন আইনের সাহায্যে নয়, কোন সাক্ষী রেখে নয়, আর কাউকে আমরা এর মাঝে আনতে চাই না। তুমি আর আমি স্বেচ্ছায় মিলেছি। একমাত্র মৃত্যু ছাড়া আমাদের এই বন্ধন আর কেউ ছিন্ন করতে পারবে না।

মিকা শদরার শেষ কথাটি পুনরাবৃত্তি করে বলল, হ্যাঁ, একমাত্র মৃত্যু ছাড়া আমাদের এই বন্ধন আর কেউ ছিন্ন করতে পারবে না।

কথা বলতে বলতে ওদের খাওয়া শেষ হয়ে গেল।

: মিকা, আমরা কোথায় শোব?

: দেখছো না, পৃথিবী তার এই দু’টি পথভ্রষ্ট সন্তানের জন্য স্নেহের আঁচল বিছিয়ে দিয়েছেন। শুয়ে পড়ো শদরা, তার কোলে শুয়ে পড়ো।

: মিকা, কি আশ্চর্য! খোলা আকাশের নীচে এই উন্মুক্ত প্রান্তরের মধ্যে আমাদের এই নতুন জীবন শুরু হয়ে গেল। সংসার থেকে কত দূরে এসে আমরা আমাদের সংসারের পত্তন করলাম।

: আর কে জানে, কোথায় হবে এর পরিণতি।

: মিকা, ও কথা থাক। আজকের এই মুহূর্তটি আমার জীবনকে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। আমি তৃপ্ত। মিকা, ঘুমাই?

: ঘুমাও।

ওরা ঘুমিয়ে পড়ল। আর সারা রাত্রি ধরে ওদের উপর চাঁদের সুধা ঝরে ঝরে পড়তে লাগল।

সকালবেলা ডাকাডাকিতে মিকার ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ মেলতেই দেখতে পেল, রোদ উঠে গেছে। আর দেখল, তিনজন সশস্ত্র পারসিক সৈনিক অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে, আর দুর্বোধ বিদেশী ভাষায় পরস্পর বলাবলি করছে।

এ কোথায় এসে পড়েছে সে, অবাক হয়ে সেই কথাই সে ভাবছিল। একটু একটু করে সব কথা তার মনে পড়ল। এই-যে, তার পাশেই বালকবেশী শদরা ঘুমিয়ে আছে। আহা, ভারী ক্লান্ত, কচি মুখখানি শুকিয়ে গেছে। আর একটু ঘুমোবে? নাঃ, তা আর হয় না, জাগিয়ে দিতেই হবে। আস্তে করে সে শদরাকে নাড়া দিল। শদরা ধড়ফড় করে উঠে বসল। চোখ কচলাতে কচলাতে বলে চলল,

: আমি একটা মজার স্বপ্ন দেখছিলাম মিকা, ঠিক সেই সময়টাতেই তুমি আমাকে জাগিয়ে দিলে। এমন সুন্দর স্বপ্নটা নষ্ট করে দিলে তুমি!

বলতে বলতে সৈন্যদের দিকে চোখ পড়তেই তার কথা বন্ধ হয়ে গেল। একটু ত্রস্ত হয়ে সে মিকার কাছে ঘেঁষে বসল। আর সন্দেহভরা দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকাল।

“তোমরা কে?” একজন সৈন্য অরামীয় ভাষায় প্রশ্ন করল।

মিকা উত্তর দিল : আমরা ইহুদী।

: তা তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু এই জনশূন্য মাঠের মাঝখানে তোমরা এমনভাবে পড়ে আছ কেন? তোমাদের ভয় নেই প্রাণে? তোমরা কোথায় যাচ্ছিলে?

: যাহুদায়?

: যাহুদা কি এখানে? কোত্থেকে এসেছ?

: বাবিল থেকে।

: তবে এই দিক দিয়ে এসেছ কেন? এই কি যাহুদার পথ?

: আমরা একটা দলের সাথে মিলে একত্র হয়ে যাব বলে যাত্রা করেছিলাম। কিন্তু দিক ভুল করে উল্টো দিকে চলে এসেছি। সেই জন্যই সেই দলের সাথে দেখা হয় নি।

: তারপর সারা রাত এইখানেই ঘুমিয়ে ছিলে?

: কি আর করব?

: এখন তোমরা কি করতে চাও?

: আমরা যাহুদায় যাব।

: পাগল নাকি! এভাবে তোমরা যাহুদায় যেতে পারবে না। তোমাদের সঙ্গে যা কিছু আছে, সব লুটপাট করে নিয়ে নেবে। তা ছাড়া প্রাণের ভয়ও আছে। তোমরা বাবিলে ফিরে যাও।

: না না, বাবিলে-যে আর কোন ইহুদী নেই। সবাই যাহুদার দিকে যাত্রা করেছে। আর একজন সৈন্য বলল,

: একটা কাজ করতে পারো। তোমাদের একজন ইহুদী-নেতা যাহুদায় চলেছেন। তাঁকে যাহুদায় পৌঁছে দেবার জন্য সম্রাট আমাদের পাঠিয়েছেন। তোমরা তাঁকে বলে দেখতে পারো। যদি তিনি রাজী হন, তোমরা নির্ভাবনায় তাঁর সঙ্গে যাহুদায় চলে যেতে পারবে।

মিকা সাগ্রহে বলে উঠল, আমাদের নিয়ে চলুন, তাঁর কাছে। কোথায় আছেন তিনি?

সৈন্যটি আঙ্গুল দিয়ে দেখাল : ওই-যে দেখছ নদীটা, ওর পারেই আমরা তাঁবু খাটিয়েছি। মিকা দেখতে পেল, দূরে চিকচিক করছে নদীর জল। আর তার পারে একটা তাঁবুর মতই দেখা যাচ্ছে বটে। কাল রাতে এ তাদের চোখে পড়ে নি।

মিকা মনে মনে যহোবার উদ্দেশে ধন্যবাদ জানাল।

শদরা, ওঠো, তোমার জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও। চলো, আমরা এদের সঙ্গেই যাই। চাপা হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল শদরার মুখ। সে স্বর নীচু করে বলল,

: শদরা নেই। শদরা মরে গেছে, মনে নেই বুঝি?

: ওঃ হো, তাই তো, দানিয়েল, হ্যাঁ, দানিয়েল, তাড়াতাড়ি করো।

ওরা সৈন্যদের সঙ্গে তাঁবুর ধারে এসে পৌঁছল। কাছেই ছোট্ট নদীটি কুলকুল করে

বয়ে যাচ্ছে। মিকা আর শদরার একই সঙ্গে মনে পড়ে গেল কবারের কথা। কবার! আর কি তাকে কোনদিন দেখবে!

বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হোল না। বেরিয়ে এলেন নেহেমিয়া। হাসিখুশী মুখখানি। দেখার সঙ্গে সঙ্গেই মিকা তাকে ভালবেসে ফেলল। এক একটা মানুষ থাকে যাদের মনটা স্বচ্ছ হয়ে মুখের উপর ভেসে ওঠে, চিনে নিতে দেরী হয় না। নেহেমিয়া সেই জাতের লোক।

কোন রকম ভূমিকা না করেই নেহেমিয়া সোজাসুজি প্রশ্ন করলেন,

: কি গো, যাবে নাকি তোমরা আমাদের সঙ্গে? আর বলতে হবে না, তোমাদের সব কথাই আমি শুনেছি।

“হ্যাঁ, যাব।”—মিকা আর শদরা একই সঙ্গে বলে উঠল।

হাসলেন নেহেমিয়া : বেশ, বেশ, আমার তো ভালই হোল তোমাদের দু’জনকে পেয়ে। সারা পথ গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। তোমরা দু’টি ভাই বুঝি?

মিকা বলল, হ্যাঁ।

: দেখেই বুঝেছি। দু’টি যেন এক ছাঁচে গড়া।

শদরা আর মিকা বিস্ময়ভরা চোখে পরস্পরের দিকে তাকাল। লোকটা বলে কি! এমন কথা এই প্রথম তারা শুনল।

: তুমি?—মিকা, আর তুমি? –দানিয়েল? বেশ বেশ। তা তোমাদের সঙ্গে জিনিসপত্র কি আছে?

এই কাপড়চোপড় যৎসামান্য, মিকা বলল।

: দামী জিনিস যদি কিছু থাকে, আমার কাছে রেখে দাও, নইলে চুরি হয়ে যেতে পারে। শদরা সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে মিকার মুখের দিকে তাকাল, আর তার হাতের পুঁটলীটা শক্ত করে চেপে ধরল।

: তোমার হাতে ওটা কিসের পুঁটলী দানিয়েল?

শদরা একটু ইতস্তত করল। কোন কথা না বলে আবার ঘাড় বাঁকিয়ে মিকার মুখের দিকে তাকাল। অর্থাৎ কি বলবে, তুমিই বলো।

মিকা হেসে বলল, কিছু না, ও সোনা।

: কিছু না, সোনা? নেহেমিয়ার অট্টহাসিতে তাঁবুটা যেন কেঁপে উঠল।

: দেখি, দেখি দানিয়েল, তোমার পুঁটলীটা দাও তো!

শদরা অনুপায় হয়ে একটু চিন্তিত মনেই পুঁটলীটা নেহেমিয়ার হাতে তুলে দিল।

: ইস্, এ-যে অনেক সোনা। এত সোনা কোথায় পেলে তোমরা?

মিকা উত্তর দিল, পূর্বপুরুষের সঞ্চয়।

: কে আছে আর তোমাদের?

: কেউ নেই। শুধু আমরা দু’টি ভাই। আর আমাদের কেউ নেই।

: আহা। জানো মিকা, তবু তো তোমরা দু’জন আছ। আর আমি একেবারে একা। এ সংসারে আমার কেউ নেই।

নেহেমিয়া এমন সুরে কথাটা বললেন যে, ওদের দু’জনের মনের মধ্যে গিয়ে যেন ঘা মারল। দু’জনে একই সঙ্গে নেহেমিয়ার মুখের দিকে তাকাল। নেহেমিয়া আবার বললেন,

হ্যাঁ, আমি বড় একা। তা দানিয়েল, তোমাদের কাছে এটা “কিছু না–সোনা”, কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে এটা বড় দামী জিনিস। এ তোমরা কোথায় রাখবে! আমার কাছেই সাবধানে রেখে দিই, কি বলো? দানিয়েল, আমাকে তুমি বিশ্বাস করো তো?

এবার দানিয়েল আর কোন ইতস্তত করল না, ঘাড়টা একটু কাত করে মিষ্টি করে হাসল, অর্থাৎ রেখে দিন আপনার কাছেই।

: দানিয়েলের বড় লজ্জা, না মিকা? বেশী কথা বলতে চায় না।

: ‘হ্যাঁ, ও বড় লাজুক’, বলে মিকা হাসতে লাগল।

দানিয়েলের গাল দু’টি লাল হয়ে উঠল।

শদরা কোন দিনই লজ্জাবতী নয়। কিন্তু পুরুষের পোশাক পরবার সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে একরাশ লজ্জার বোঝা ওর ঘাড়ে চেপে বসেছে। আর মনে মনে বিষম আড়ষ্ট বোধ করছে। কি জানি কখন ধরা পড়ে যায়! বিশেষ করে তার মেয়েলী গলাটাকে সে কেমন করে চাপা দেবে? এইজন্য সে সহজে কথা বলতে চাইছিল না। কিন্তু এ তো আর দু’এক দিনের ব্যাপার নয়? এ ভাবে ক’ণ্নি চলতে পারে! ভেতরে ভেতরে বিষম উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল সে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *