পাপের সন্তান – ৩

তিন

বাড়ী ফিরতে অনেক রাত্রি হয়ে গিয়েছিল। এমন একটি দিন মানুষের জীবনে ক’বার আসে! এমন দিন ক’জনের জীবনেই বা আসে! এমন দিনে সময়ের জ্ঞান থাকবার কথা নয়।

সাধারণত মিকার বাড়ী ফিরতে বেশী রাত হয় না, দরজা খোলাই থাকে। কিন্তু আজ-যে রাত্রি অনেক হয়ে গিয়েছে। বাড়ীর মধ্যে বাতির আলো দেখা গেল না। বোধ হয় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। সঙ্গে সঙ্গে মিকার মনটা যেন ধক্ করে উঠল। এ যেন আসন্ন ভবিষ্যতের সুস্পষ্ট সংকেত। মিকা, তোমার জন্য এ দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে, কোনদিন আর খুলবে না। আজ আর দো-টানা নয়। এক পথ, সোজা পথ, সেই পথই তো সে বেছে নিয়েছে। তার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে।

মিকা দরজায় ঘা মারল, কেউ কোন সাড়া দিল না। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। মিকা আবার ঘা মারল।

: কে, মিকা, দাঁড়াও, আসছি।

শদরার কণ্ঠস্বর। একটা বাতি জ্বলে উঠল, একটা দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল। শদরা এগিয়ে আসছে।

: কে?

: আমি মিকা।

: উঃ, বাবা, আচ্ছা মানুষ তুমি। রাত্তির কত হয়েছে জানো? তোমার জন্য বসে বসে আমি দুশ্চিন্তায় মরছি।

বলতে বলতে শদরা দরজাটা খুলে দিল। কোন কথা না বলে মিকা ভেতরে ঢুকে পড়ল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এমন একটা ঘটনা ঘটল, যার জন্য মিকা মোটেও প্রস্তুত ছিল না।

: কে, তুমি কে? তুমি তো মিকা নও!

শদরা ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল। তার হাত থেকে বাতিটা পড়ে নিভে গেল। একরাশি অন্ধকার যেন ওৎ পেতে বসে ছিল। বাতিটা নিভতেই সেই অন্ধকার ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সব কিছু একাকার করে ফেলল।

শদরা আরও ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল। আঃ, কি মুস্কিল, পাগল হয়ে গেল নাকি শদরা, এমন করছে কেন?

তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস্ ফিস্ করে বলল,

: চুপ, চুপ, অমন করছ কেন? দেখছ না আমি মিকা?

কিন্তু কে শোনে সে কথা! আরও ভয় পেয়ে শদরা তাকে দু’ হাতে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু কেমন করে শদরার ফুলের মত নরম হাত দু’টি মিকার হাতের মধ্যে ধরা পড়ে গেল।

মিকা শিউরে উঠল। অন্ধকারের মধ্যে কি যেন একটা ষড়যন্ত্র ছিল। সেই নিঃশব্দ নৈশ প্রকৃতির রহস্যময় গোপন মর্মকোষ থেকে উৎসারিত এক মদির সুরভি মিকাকে মত্ত করে তুলল। কখন শদরাকে পুরুষের সবল মুষ্টিতে সে তার বুকের কাছে টেনে নিয়ে এসেছে, কখন সে তার যৌবনের অপরূপ রহস্যে রহস্যময় অনুটিকে দৃঢ় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেছে, সে কথার সে কি জানে! এক মুহূর্তে কত কি-যে হয়ে যায়! প্রকৃতি তার পথের বাঁকে বাঁকে কত যে ফাঁদ পেতে রেখেছে, তাকে এড়িয়ে যাবে সাধ্য কি!

মিকা যেন গানের মতই বলে উঠল,

ওরে অবুঝ। এবার বুঝেছ, আমি কে? আমি মিকা—তোমার মিকা।

শদরা এবার বুঝেছে। আর তার কোন সংশয় নেই, এ-যে তারই মিকা। কিন্তু কোন কথা সে বলতে পারল না। কি বলবে? তার বুকের অস্থির তরঙ্গ মিকার বুকে ভেঙ্গে পড়ছে। এ কোন কূলভাঙ্গা নদী, সব ভেঙ্গে ফেলবে, কিছু রাখবে না। মিকা অনুভব করল শদরা কাঁপছে, তার বুকের উপর মাথা এলিয়ে দিয়ে ভীরু কপোতের মত থর থর করে কাঁপছে।

কে বলবে, কখন-যে শদরা গাছের গায়ে জড়ানো লতার মত বাহু-বেষ্টনে মিকার গলা জড়িয়ে ধরছে। কে জানে, কখন-যে তার মুখখানি স্ফুটনোন্মুখ কুঁড়িটির মত যেন আলোকের অভীপ্সায় সূর্যের দিকে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠছে। মন্ত্রমুগ্ধ মিকা সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে মাথা নোয়াল। যৌবনের সঞ্চিত আবেগ তার পর্ণপুটে যেন নিঃশেষ করে ঢেলে দিল। আর শদরা পূর্ণ শতদলের মতই প্রস্ফুটিত হয়ে উঠল।

মুহূর্তের জন্য স্বর্গ পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছিল। কিন্তু মুহূর্তের জন্যই। শদরার প্রাথমিক চেঁচামেচিতে ভেতর থেকে ক্রীতদাসেরা ছুটে আসছে। ওদের হাঁক ডাক শোনা গেল। ওদের হাতের বাতির আলোর একটি দীর্ঘ রেখা দরজা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। ওরা এসে পড়েছে। আলিঙ্গনবদ্ধ প্রাণী দু’টি জ্যা-মুক্ত ধনুকের মত ছিটকে দু’দিকে সরে দাঁড়াল।

লাঠি সোঁটা নিয়ে হৈ হৈ করতে করতে দু’জন ক্রীতদাস রঙ্গমঞ্চে এসে প্রবেশ করল। মিকার মাথাটা নির্ঘাত ফাটত, কিন্তু শদরা মাঝখানে গিয়ে পড়তেই দৈবক্রমে মাথাটা বেঁচে গেল।

: আমি মিকা, মিকা।

: মিকা? মিকা ভাই, আপনি? তা আপনি ইহুদীর পোশাক পরে এসেছেন কেন? ও, দিদিকে ভয় দেখাবার জন্য বুঝি? তাই তো দিদি ভয় পেয়ে চেঁচামেচি লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আমরা ভাবলাম চোর ডাকাত এসেছে বুঝি।

শদরা হাসল। মিকাও হাসল। এতক্ষণে মিকা বুঝতে পেরেছে এই বিপত্তির মূল কারণটা কোথায়। সে-যে ইহুদী পোশাক পরে এসেছে এ কথাটা মনেই ছিল না।

একজন দাস শদরার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

: খুব ভয় পেয়েছিলেন দিদি? তা ভয় তো হবেই, আমরাই কেমন চমকে গিয়েছিলাম। দেখছিস, দিদি এখনও কাঁপছেন।

মিকা শদরার দিকে চেয়ে দেখল, সত্যিই কাঁপছে শদরা। কিন্তু মিকা বুঝল এ কাঁপন ভয়ের কাঁপন নয়। মিকার নিজের বুকের মধ্যেও তো এই একই কাঁপন তরঙ্গিত হয়ে চলেছে। যেন আহত বীণার তারের মত কাঁপছে আর সংগীত বিকীর্ণ করছে।

গোলমালে শদরার বাবার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। তিনি বিছানা থেকে মাথা তুলে ব্যস্ত হয়ে হাঁক ডাক করতে লাগলেন,

: কি রে, কি হয়েছে, কি হয়েছে? আঃ, সবগুলো সমান গাধা, কেউ যদি কোন উত্তর দেবে।

শদরা তাঁকে আশ্বস্ত করে বলল,

: কিছু না বাবা, কিছু না, তুমি ঘুমাও। একটা মাতাল ইহুদী দরজার কাছে এসে গোলমাল করছিল, ওরা ভাগিয়ে দিয়েছে।

: ও, এই ব্যাপার! তিনি নিশ্চিন্ত হয়ে পাশ ফিরে ঘুমালেন। ক্রীতদাস দু’জন হাসতে হাসতে চলে গেল।

: মিকা, খেতে চলো।

: না শদরা, আমি আর খাব না, আমি খেয়ে এসেছি।

: মিছে কথা বলছো।

: না না, মিছে বলি নি। সত্যি আমি খেয়ে এসেছি।

: সত্যি? আচ্ছা, তা হলো যাও, লক্ষ্মী ছেলের মত ঘুমিয়ে পড়ো গিয়ে। অনেক রাত হয়েছে।

: যদি ঘুম না আসে?

: কি?

একটু যেন চমকে উঠল শদরা।

: যদি ঘুম না আসে?

শদরা কোন উত্তর দিল না। একটু সময় নিঃশব্দে কেটে গেল। মিকা প্রশ্ন করল, কিছু বলছো না যে?

: কি বলব?

: কি বলবে? যদি ঘুম না আসে, তুমি আমায় ঘুম পাড়িয়ে দেবে?

শদরা চুপ করে রইল।

: কি, চুপ করে রইলে যে?

: আচ্ছা, যাও।

তার শোবার ঘরে বসে মিকা কত কি আকাশপাতাল ভাবছিল! ঘুম? ঘুম কি আর আজ আসবে চোখে? শদরা বলেছিল, আচ্ছা, যাও! কিন্তু সে কি সত্য সত্যই আসবে? ওকে এভাবে আসতে বলাটা কি ভাল হয়েছে? কে জানে, কি মনে করেছে? কেনই বা সে তাকে আসতে বলল? মিকা, আর কি চাও তুমি তার কাছে? সে হয়তো তোমার মনের ভেতরকার ক্ষুধিত পশুটার উগ্রমূর্তি দেখতে পেয়ে ভয় পেয়েছিল। তুমি যখন আসতে বললে, সে কতক্ষণ চুপ করে রইল। হ্যাঁ, সে চুপ করেই রইল। আর তুমি জোর করে তার মুখ থেকে কথা আদায় করে নিলে। হয়তো বা অনিচ্ছায়, বাধ্য হয়েই সে কথা দিয়েছে। কেমন যেন কথাটা আপনা থেকে ফস্ করে বেরিয়ে গেল। এমন কথা বলবার জন্য সে তো প্রস্তুত ছিল না।

কিসের জন্যই বা প্রস্তুত ছিল সে? অথচ একটি অসতর্ক মুহূর্তে কিনা ঘটে গেল। সে যেন কোন এক অদৃশ্য শক্তির তাড়নায় অসহায়ের মত দুরন্ত প্রবৃত্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে বসল। এত দুর্বল সে? এতই অসংযমী? ছি ছি, কি ভাবছে শদরা!

কিন্তু শদরা কি তার সেই উদ্বেল আবেদনে সাড়া দেয় নি? তাই যদি না হবে, তবে এত আনন্দের জোয়ার কোন উৎস থেকে উৎসারিত হয়ে আসছে? সমস্ত গ্লানি ও অনুশোচনাকে ছাপিয়ে উৎসবের মঙ্গল সংগীত মনের আকাশ ব্যাপ্ত করে এমন করে বেজে উঠবে কেন? সেই অস্পষ্ট অন্ধকারের মধ্যে তার কণ্ঠলগ্ন মুখখানির দিকে সে চেয়ে দেখেছে। সেই ঊর্ধ্বমুখী উন্মুখ মুখখানি, তৃপ্তির আবেশ-মাখা সেই নিমীলিত দু’টি চোখ। না, সে কখনো ভুল করে নি।

অদ্ভুত, অচিন্তনীয় এই শদরা! বিধাতার অপরূপ সৃষ্টি। সে কতদিন আগেকার কথা, ছোট মেয়েটি তার পেছন পেছন ফিরত। অতি অনুগত সঙ্গিনীটি। কোঁকড়া চুলগুলো এলোমেলো হয়ে বাতাসে যখন উড়ত, কি সুন্দর লাগত তাকে দেখতে। প্রজাপতিটির মত। মিকা তার অবাধ্য চুলগুলো বেঁধে দিত। ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিত। মনে পড়ে মেয়েটা একদিন ঘাড় বাঁকিয়ে তার মুখের দিকে দুষ্টু চোখে চেয়ে হেসেছিল আর বলেছিল—মিকা, তুমি আমায় ভালবাসো? তার উত্তরে মিকা তাকে বলেছিল— হ্যাঁরে, খুব—খুব ভালবাসি।

কিন্তু সেই ভালবাসা বেশী দিন টিকল না। মিকার জগৎটা দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল, সে লেখাপড়ায় মন দিল। বন্ধু বান্ধব জুটল। তার মনের পরিসর দিন দিন বেড়ে যেতে লাগল। আর তার আড়ালে সেই মেয়েটা চাপা পড়ে গেল। সে যেন আর মিকার চোখেই পড়ত না। কিন্তু আড়ালে পড়ে গেলেও ছোট্ট মেয়েটা আর ছোট্ট রইল না। কেমন করে সেই চঞ্চল মেয়েটি পায়ে পায়ে এগোতে এগোতে বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ কখন যৌবনের দ্বারদেশে এসে প্রবেশ করল। মিকা তাকে দেখেছে। ভালই লেগেছে, তবে ওই পর্যন্তই। কিন্তু হঠাৎ একদিন তাকে চমকে উঠতে হোল।

দু’বছর আগেকার কথা। কবার নদীর ওপারে পশ্চিম দিগন্তে সূর্য তখন নেমে পড়েছে। অপূর্ব একটি অপরাহ্ণ। মিকার মনটা আজ যেন কেমন সুরে কথা কয়ে উঠছে। আজ সে বাঁশী বাজাবে। একটু বাদেই আকাশের বুকে লক্ষ লক্ষ হীরা-মণি- মুক্তার ফুল ফুটে উঠবে, আর তার ছায়া পড়বে কবারের জলে। ঝির ঝির করে বাতাস বইবে, নদীর ধারে নুয়ে-পড়া বাইশী গাছটার পাতাগুলো প্রথমে থরথর করে কেঁপে উঠবে, তারপর দুলতে থাকবে তার ডালগুলো, আর তার চাপা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছড়িয়ে পড়বে চারদিকে। কবার কি আর চুপ করে রইবে! মর্মর ছন্দে গেয়ে উঠবে গান। আর সেই সুরে সুর মিলিয়ে বেজে উঠবে মিকার বাঁশি।

বুঝতে পারে না মিকা, কেমন করে ওঠে যেন মনটা। কোথা থেকে এক সৃষ্টি-ছাড়া সুর তার ভেতরে এসে কাঁপন লাগায়। বলে, বাজাও, আমাকে বাজাও, আমি-যে বেজে উঠতে চাই।

মাঝে মাঝে অসীম শূন্যতায় ভরে আসে মন। মনে হয় তার কেউ নেই। শূন্য আর ফাঁকা এই পৃথিবী। আর এই পৃথিবীতে তার চেয়েও বড় মিথ্যা সে নিজে। কেন সে এসেছে, কে তাকে এনেছে। কি ফল বেঁচে থেকে?

আবার মাঝে মাঝে সেই মনটাই কেমন করে সুপক্ক আঙ্গুলের মত নিটোল আর পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। রসের ভারে ফেটে পড়তে চায়, অপ্রকাশের বেদনায় টন্‌ টন্‌ করে ওঠে বুকটা। বলে, আমার এত আছে, এসো, আমি তোমাকে অঞ্জলি পূর্ণ করে দেব, এত ভার যে আমি একটা বইতে পারছি না। তোমাকে না দিয়ে আমার মুক্তি নেই।

কাকে ডেকেছিল সেদিন মিকা? কাকে সর্বস্ব ঢেলে দিতে চেয়েছিল? কে সে? মিকা তো তার সন্ধান জানে না। তাই তো সে এক দিশাহারা ভ্রমরের মত এক অজানা কুসুমের গন্ধে মাতাল হয়ে গুঞ্জন করে ঘুরে ঘুরে মরছিল। কোন্ দূর, বহুদূর এক দুর্গম রূপকথার দেশে কোন রাজপুরীর এক গোপন উদ্যানে সে ফুল ফুটে আছে। সৃষ্টি- বেদনায় চঞ্চল মিকা উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়, কূল কিনারা খুঁজে পায় না।

আর সেই সময় সে তার বাঁশী বাজাতে বসে।

তাই সেদিন সে তার বাঁশীটা খুঁজতে ঘরে ফিরে এসেছিল। কিন্তু ঘরে ঢুকতেই যে- দৃশ্য দেখল, তাতে সে থমকে দাঁড়াল। তার ঘরের জানালার ধারে বাইরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। কচি খেজুর পাতার মত নরম সোনালী তার রঙ। অপরাহ্ণের শেষ রক্তিম আভাটুকু তার উপর অপূর্ব শ্রী ঢেলে দিয়েছে। দ্রাক্ষার স্তবকের মত তার কোঁকড়ানো চুলগুলো গুচ্ছে গুচ্ছে নেমে এসেছে। মেয়েটি মুখ ফিরিয়ে আছে। তার গ্রীবার বঙ্কিম ভঙ্গীটি ধূসর গোধূলির আঁচলার উপর যেন সোনালী রেখায় ফুটে উঠেছে।

এ আর কেউ নয়, শদরা। মিকা তা ভাল করেই জানে। কিন্তু এই মেয়েটিকে সে চেনে কি? বিস্মিত আর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল মিকা। তার পরিচিত, অতি পরিচিত শদরা যৌবনের লাবণ্য-প্রস্রবণে অবগাহন করে আজ এ কোন্ নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে? এত ঐশ্বর্য কোথায় পেল সে? উচ্ছ্বসিত তরঙ্গ যেন ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে। মিকা তার দিকে চেয়ে চোখ ফিরাতে পারছে না। তার কাছে সে যেন আজ এক রহস্যের সমুদ্র।

শদরা যখন ছোট ছিল, সে তাকে কত আদর করেছে। ওই কোঁকড়া চুলগুলোকে কতদিন সে নিজের হাতে বিন্যস্ত করে দিয়েছে, ফুল দিয়ে সাজিয়েছে, তার হাত ধরে কবার নদীর তীরে ঘুরে বেড়িয়েছে। আর মেয়েটা যখন বড় বেশী জ্বালাতন করেছে, তখন চুমু খেয়ে তাকে শান্ত করেছে। আর আজ যদি সে ওকে একটুমাত্র স্পর্শ করে, মিকার মনে হল—তার সমস্ত শরীরে আগুন ধরে যাবে।

ও কি এমনি করেই মুখ ফিরিয়ে থাকবে? ও কি একবারও তার দিকে তাকাবে না? কিন্তু সত্য সত্যই সে যদি তার দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ায়, তখন কি বলবে সে, কি করবে সে? মিকার বুক দুরু দুরু করে উঠল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, যেন তার ডাক শুনতে পেয়ে শদরা ঘুরে দাঁড়াল, আর তার চোখ দু’টি মিকার চোখের সঙ্গে মিলল 1

একটি মুহূর্ত! কিন্তু কে জানে কেন মিকার চোখের পাতা ভারী হয়ে নেমে এল।

শদরা হাসল। কিন্তু মিকা হাসতে পারল না। গুরুভার সঙ্কোচের পাহাড় যেন তার উপরে চেপে বসেছে।

: মিকা, তুমি এখন যে? তুমি তো এ সময় বাড়ী থাকো না। আমি চুরি করে তোমার ঘরে এসেছিলাম। তুমি তো এখন আর আমায় ডাকো না।

সহজ স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে শদরা। কিন্তু মিকার মুখে কথা আটকে যাচ্ছে। তার বুকের মধ্যে একটা তোলপাড় চলছে।

: আমি—আমি একটা জিনিস খুঁজতে এসেছিলাম।

: খুঁজতে? কি খুঁজতে? আমাকে নয় তো?

মিকা ঘাবড়ে গিয়ে নিতান্ত নির্বোধের মতই বলে ফেলল—

: না, না, তোমাকে নয়, আমার বাঁশীটা খুঁজতে এসেছিলাম।

: ও, বাঁশী? আমাকে তুমি খুঁজবে না, এ আমার বোঝা উচিত ছিল। মিকা, আমি যদি তোমার বাঁশী হতাম, তখন তুমি আমায় খুঁজতে। আর তোমার স্পর্শে হয়তো আমি বেজে উঠতাম। আমি-যে বাজতে পারছি না।

এ অবাক কি! কোন্ মেয়ে এমন কথা এমন করে বলতে পারে! এ কি বিদ্রূপ? বোধ হয় তাই হবে। আর তা যদি না হয়? এর উত্তরে কি বলবে মিকা? মিকা নিঃশব্দে ঘামতে লাগল।

শদরা হাসল। বড় মধুর সেই হাসি। মিকা বুঝল, বিদ্রূপ নয়। এই হাসির মধ্যেই সব কথা রয়ে গেছে। কিন্তু কেমন করে বলতে হয়, মিকা তো তা জানে না।

: তোমার সংকোচ হচ্ছে, না মিকা? আমি অনেক বড় হয়ে গিয়েছি? কিন্তু কই, আমার তো কোন সংকোচ নেই। তোমার সংকোচ হয় কেন, বলো না?

: না, না, সংকোচ কিসের?

: ও, তবে বুঝি অবহেলা? তাই তুমি আর আমার দিকে ফিরেও তাকাও না। মিকা, তোমার মনে আছে, তখন আমি খুব ছোট। একদিন এমনি এক সন্ধ্যায় কবার নদীর তীরে দাঁড়িয়ে তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম—মিকা, তুমি আমায় ভালবাসো? তার উত্তরে তুমি বলেছিলে – হ্যাঁ রে, খুব ভালবাসি। তার সাক্ষী আছে কবার নদী, সাক্ষী আছে বাইশী গাছটা। আমি কিন্তু সে কথা ভুলি নি। ধ্রুব সত্যের মত আজও তাকে আঁকড়ে ধরে আছি। সেদিনকার সেই কুঁড়িটা-যে আজ ফুল হয়ে ফুটতে চাইছে।

: শদরা, আমি তো একথা ভাবতে পারি নি। আমার মত একটা তুচ্ছ লোক —

: বাজে কথা রাখো। ও সব আমার ভালো লাগে না। আসল কথা কি জান? তুমি ঘুমিয়ে ছিলে। তোমার ঘুম না ভাঙ্গালে এমনি ভাবেই তুমি ঘুমিয়ে থাকতে—কে জানে কতদিন। আর এই নির্লজ্জ ও মুখরা শদরা ছাড়া কে তোমার ঘুম ভাঙ্গাবে? তারই-যে সব চেয়ে বড় দায়।

সত্য কথাই বলেছিল শদরা। নির্লজ্জ ও মুখরা শদরা ছাড়া কেই বা তার সংকোচ ভাঙ্গতে পারত, কেই বা তার সুপ্ত প্রেমকে এমন সহজ সুরে জাগিয়ে তুলতে পারত! আর সেই দিন থেকে মিকার রিক্ত ও ভূষিত জীবনকে মধুতে ভরে দিয়েছে শদরা। ওগো মধুমতী, এত মধু তুমি কোথায় পেলে?

কিন্তু কেই বা ভাবতে পেরেছিল, নীল নির্মেঘ আকাশের পেছনে অমন বস্ত্ৰ লুকিয়ে থাকতে পারে! অকস্মাৎ মেঘ গর্জন করে উঠল। বিদ্যুৎ ঝলসাল, আর কোথা থেকে একটা ঝোড়ো হাওয়া দু’জনের কত সাধে-গড়া পুষ্পবিতান ছিঁড়ে খুঁড়ে তচ্‌চ্ করতে লাগল।

ইহুদী মিকা ক্যালদীয় শদরার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চাইল। কিন্তু এ বাঁধন ছিঁড়তে গেলে হাড়ের উপর থেকে মাংস ছিঁড়ে আসে যে। আসে আসুক, তবু মিকা তার জাতিকে ছাড়তে পারে না। জাতির জন্য সে তার চরম বলি দিতে প্রস্তুত। প্রাণ নয়, প্রাণের চেয়েও বেশী—শদরাকে। শদরা যে ক্যালদীয়। কোন ক্যালদীয়কে কোন ইহুদী ভালবাসতে পারে না, ভালবাসা উচিত নয়, ভালবাসা পাপ।

শদরা বলে—মিছে কথা। আমি কোন দিন কোন ইহুদীর শত্রু নই, কোন ইহুদী কোন দিন আমার শত্রু হতে পারে না। শদরা বলে—মিকা, তুমি কি দেখতে পাও না, আমার চেয়ে আপনার লোক তোমার আর কেউ নেই? কোন ইহুদী নয়।

শদরা বোধ হয় ঠিক কথাই বলেছিল। আজ একটু আগেই সেই সত্যই কি প্রমাণিত হয়ে গেল না? যাকে ঘৃণা করবার জন্য, যার কাছ থেকে দূরে সরে থাকবার জন্য প্রাণান্তকর সংগ্রাম, তাকেই সে আজ স্বেচ্ছায়, সাগ্রহে, সবলে আপনার বুকে টেনে নিয়েছে। অথচ আজই রাত্রিতে কত লোকের আনন্দ ধ্বনির মাঝখানে সে ইহুদীর মহামন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিল। আজই সে প্রথম জাতীয় আচ্ছাদন গ্রহণ করেছিল। কিন্তু শদরাকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারল না তো! ইহুদী মিকা আজ ক্যালদীয় শদরাকে গ্রহণ করেছে। ফেরবার পথ খোলা রাখে নি।

হায় যিহোবা, এ কি পাপ? যদি তাই হবে, তবে সমস্ত মন এমন নির্মল আনন্দে পূর্ণ হয়ে উঠছে কেন? কেমন করে সেই একটি মুহূর্ত এই নিঃশব্দ রাত্রিকে এমন করে সংগীতময় করে তুলেছিল?

: এত গভীরভাবে কি ভাবছ মিকা?

: কে?—চমকে উঠল মিকা।

: আমি শদরা।

: শদরা, তুমি এসেছ?

: হ্যাঁ, তুমি আসতে বলেছিলে আমায়, মনে নেই?

: বলেছিলাম।

: কেন?

: কেন, সে কথা-যে ভুলে গেছি।

: আমার কিন্তু মনে আছে। বলেছিলে—যদি ঘুম না আসে চোখে, ঘুম পাড়িয়ে দেবে। ঘুমোবে মিকা ঘুমোবে?

: না, মিছে কথা বলেছিলাম। আমি ঘুমোতে চাই না।

: কি চাও তুমি?

: কি চাই?… কি চাই?… আমি সমস্ত রাত্রি এই ভাবেই বসে থাকতে চাই। শুধু তুমি আমার পাশে থেকো।

: তুমি যদি তাই চাও, আমি তাই করব। মিকা, আমি নীচে তোমার পায়ের তলায় একটু বসি—বসব?

: কেন শদরা, পায়ের তলায় কেন?

: আমার সাধ হয়েছে তাই। মিকা, তোমার কোলে আমার মাথা একটু রাখতে দেবে? অনুমতির অপেক্ষা না করেই শদরা মিকার কোলে মাথা গুঁজলে। শিউরে উঠল মিকা। জানালা দিয়ে আকাশের বুকে তারাগুলো দেখা যাচ্ছিল। মিকার মনে হোল ওরাও যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে।

মিকার কোলে মাথা রেখে শদরা একটু সময় স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল। সে কি কান্না! ওরে শদরা, এত কান্না তোর কোথায় জমে ছিল!

: শদরা, শদরা, অমন করে কাঁদছ কেন?

শদরা কোন উত্তর দিল না। চোখের জলে মিকার কাপড় ভিজে উঠল। কি করবে মিকা? শদরার কেঁপে কেঁপে ওঠা মাথার উপরে আলগোছ করে হাতটা রাখল। শদরার কান্না তাতে আরও বেড়ে গেল।

: শদরা, কি হয়েছে, কেন অমন কাঁদছো?

মাথা না তুলেই অশ্রু-সজল কণ্ঠে শদরা বলল,

: বাধা দিও না। আমাকে একটু প্রাণভরে কাঁদতে দাও। এ যে আমার বড় সুখের কান্না। কতক্ষণ ধরে এইভাবে একটানা কান্নার পর শদরা শান্ত হোল।

মাথা তুলে লঘুকণ্ঠে বলল,

: এবার আমি হালকা হয়েছিল। বলো, তুমি এবার কি বলবে বলো।

: অমন করে কাঁদলে কেন শদরা? আমাকে বলবে না?

: তোমাকে যদি না বলি, কাকে বলব তবে? ওরে নিষ্ঠুর, এতদিন যে-কান্না তুমি আমায় কাঁদিয়েছ, তা যেন পাথর হয়ে বুকের মাঝে জমে ছিল। এতদিনে সেই কান্না বেরোবার পথ পেয়েছে। আমি ভিখারীর মত বারবার তোমার কাছে গিয়েছি। তুমি অন্যমনা হয়ে বারবার আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছ। আমি লজ্জিত হয়ে ফিরে এসেছিল। আর আজ তুমি অযাচিতভাবে নেমে এলে বন্যার মত। এতদিনের সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে ফেলে তুমি আমাকে তোমার উদ্দাম প্রবাহে ভাসিয়ে দিলে। আমার কূল ভেঙ্গে গেল, মূল খসে গেল, আমি যেন তোমাতেই লীন হয়ে গেলাম, তবু আমি কাঁদব না?

: একটা আশ্চর্য কথা শুনবে শদরা? যে-সময় সবচেয়ে বেশী করে ভাবছিলাম, কি করে এই ক্যালদীয় মেয়েটার মোহ কাটিয়ে দূরে সরে যাব, ঠিক সেই সময়েই—

: ঠিক সেই সময়ই তোমার তরী ডুবল, না মিকা

: তবে শোনো, সত্যি কথা বলি। জেনে শুনে মিথ্যার আশ্রয় যেন আমরা না নিই। আজ এই জাদুমাখা নির্জন রাত্রির অন্ধকারে শদরাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে মনটা বিষম বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে, যাক-তরী ডুবে, চাই না আমি কূলের দিশা, আমি আমার ভবিষ্যতের সকল স্বপ্ন ভুলে গিয়ে শদরার গভীর জলে আপনাকে ডুবিয়ে দেব। কিন্তু কাল প্রস্ফুট দিবালোকে যখন ইহুদী সমাজের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াব, আর যখন তারা প্রত্যাশাভরা চোখ মেলে আমার দিকে তাকাবে, তখন এই দু’পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে কি এক অসহ্য যন্ত্রণা! এই যন্ত্রণা কি আমাকে চিরকাল বহন করে চলতে হবে? বিজয়িনী বাবিল-কন্যা, তুমি কি আমাকে ওদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে চাও?

শদরা কতক্ষণ চুপ করে কি ভাবল। শেষে বলল—

: মিকা, মিথ্যা বলব না। যদি পারতাম, নিতাম। কিন্তু আমি অনেক ভেবে দেখেছি তা আর সম্ভব নয়। তুমি যতই বল না কেন তুমি মনে প্রাণে ইহুদী নও। হয়তো একদিন বুঝবে। কিন্তু আজ তুমি তা কিছুতেই মানবে না। আমি আজ যদি তোমাকে আমার একান্ত করে ধরে রাখতে চাই, আমি পারব না। শুধু তোমাকে দুঃখ দেব। আর নিজেও দুঃখ পাব। না, আমি সে চেষ্টা করব না। তুমি তোমার যা কর্তব্য বলে মনে করো, করে যাও, শুধু আমাকে তোমার জীবনের সাথী করে নাও।

মিকা শদরার কপালে একটি চুম্বনচিহ্ন এঁকে দিল। শদরা হেসে বলল,

: এই বুঝি তার পুরস্কার?

: হ্যাঁ।

শদরার তরল কণ্ঠ এবার যেন একটু গম্ভীর হয়ে এল।

: কিন্তু শোন মিকা, তুমি আমার অবস্থাটা বুঝতে পারছ না। আমি জানি জীবনভর বহু দুঃখের বোঝা বয়ে আমাকে চলতে হবে। আমার যে অনেক বাধা। কিন্তু কি করব, তবু আমাকে তোমার সঙ্গ নিতে হবে, এই-যে আমার নিয়তি।

মিকা একটু ইতস্তত করে বলল,

: একটা জনরব শুনছি। সমস্ত ইহুদীদের নাকি যাহুদায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে।

: এ কি সত্য? আহা, ওরা ওদের দেশে ফিরে যাক্, ওরা সুখী হোক।

: সত্যি কি না জানি না। জনরব মাত্র। কিন্তু যদি সত্যি হয়, আমাকেও তো চলে যেতে হবে।

: তুমি কোথায় যাবে? তুমি কেন যাবে?

: যাব না? বল কি? অমন বারবার করে ভুলে যাও কেন যে আমিও একজন ইহুদী।

: হুঁ, চলে যাবে, যাহুদায় চলে যাবে। আর আমি? আমি কি করব?

সেই কথাই তো তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি।

: তুমি বলো, আমি কি করব?

: তুমি যাবে আমার সঙ্গে?

: তোমার সঙ্গে যাহুদায়?… হ্যাঁ, যাব।

: তোমার স্বদেশ, স্বজাতি, স্বজন সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে কষ্ট হবে না?

: কষ্ট? সে কথাও কি জিজ্ঞাসা করতে হয়? খুব কষ্ট হবে। আমি জানি তুমি আমাকে অনেক কষ্ট দেবে, চিরদিন কষ্ট দেবে। কিন্তু তবু আমাকে যেতেই হবে। এই- যে আমার নিয়তি।

: শদরা, এই সুন্দর পৃথিবীতে এত দুঃখ কেন? যাকে ভালবাসি, তাকে এত দুঃখ দিতে হয় কেন? কেন আমি তোমার কাছে এলাম! শদরা, আমি তোমার দুর্ভাগ্য।

দু’জনের মাঝখানে একটা বিষণ্ণ আবহাওয়া থমথম করতে লাগল। শদরার ভাল লাগল না। সে দু’হাত দিয়ে মিকার মুখখানিকে তার বুকের উপর চেপে ধরল।

: তুমি বুঝি নিজে এসেছিলে? তুমি তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আকাশ-কুসুমের স্বপ্ন দেখছিলে। আমি তোমাকে ঘুম ভাঙ্গিয়ে জাগিয়ে তুললাম, আর বললাম—বোকা ছেলে, আকাশের দিকে চেয়ে কি দেখছ? আমার দিকে তাকাও। যে-ফুল তুমি চাও, সে তো আমার মধ্যেই ফুটেছে। কত করে তোমাকে আমার কাছে নিয়ে এলাম, তবে তো তুমি এলে। আর সেজন্য যদি দুঃখ ভোগও করতে হয় তবু আমার তো কোন অভিযোগ করা চলে না। আমার কাজের ফল আমিই ভোগ করব।

ঘন কেশের অরণ্যে হারিয়ে গেছে মিকা। শদরার বুকে তরঙ্গের দোলা। পৃথিবীটা কি দুলছে? আচ্ছন্নের মত পড়ে রইল ওরা। কতক্ষণ এ ভাবে কেটে গেল মিকা বলতে পারে না।

: অনেক হয়েছে, এবার চোখ মেলো।

মিকা কি ঘুমিয়ে পড়েছিল? অমন করে ঘুম পাড়ালে কেউ কি ঘুমোতে পারে?

: তুমি কেমন সুন্দর ঘুমিয়ে পড়লে! ঘুমিয়ে পড়লে তোমাকে ভারী সুন্দর দেখায়। কিন্তু তুমিই-যে আমার সর্বনাশ! ইম একবার তোমার মুখের দিকে আর একবার আকাশের এই তারাটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম। জানো মিকা, ওই-যে তারাটা জ্বলজ্বল করছে। ওটাই আমার ভাগ্যের তারা, আমার নিয়তি। গণৎকারেরা গুণে বলেছে, ও আমার জন্য অনেক দুঃখ বয়ে নিয়ে আসবে। আমি ভাল করেই বুঝতে পারছি, গণৎকারেরা মিথ্যে বলে নি

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *