আটাইশ
হানানি আর নহিমা কথা বলছিল।
: তার পর?
: তার পর তীরশথ শান্তিরক্ষকদের বিদায় দিয়ে দিলেন। বাকী রইলাম, শুধু আমরা চারজন—ওরা দু’জন, তীরশথ আর আমি। জেরুজালেমের সীমান্ত ছাড়িয়ে আমরা চারজন এগিয়ে চললাম। অনেক দূর এগিয়ে গেলাম। আমাদের কারু মুখে কোন কথা ছিল না। শেষে সূর্য যখন অস্ত গেল, যাহুদার শস্য-সবুজ প্রান্তরে গোধূলির ধূসর ছায়া নেমে এল, তখন মিকা দাঁড়িয়ে পড়ল। এতক্ষণ বাদে এইবার সে প্রথম কথা বলল।
বলল, আর নয়, এইবার আপনারা ফিরুন।
তীরশথ বললেন, আমরা আর একটু যাই না! কি করুণ মিনতির সুর! মিকা দৃঢ় কণ্ঠে বলল, না, আপনারা ফিরে যান।
: তার পর?
: তার পর ওরা দু’জন আমাদের কাছে বিদায় নিয়ে আমাদের পেছনে ফেলে এগিয়ে চলল। কিন্তু কয়েক পা গিয়েই মিকা হঠাৎ ফিরে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমিও ওকে জড়িয়ে ধরলাম। কিন্তু একটু সময়ের জন্যই। তার পর সে আমার হাত ছাড়িয়ে একটু হেসে চলে গেল। আঃ, কি সেই হাসি! নহিমা, ওর মুখের সেই হাসি আমি কোন দিন ভুলতে পারব না।
: কিছুই বলল না?
: না, কিছুই না। আমিও কোন কথা খুঁজে পেলাম না। তীরশথও না।
: আর শদরা?
: শদরা সারা পথে কোন কথা বলে নি। কারু দিকে চোখ তুলে তাকায় নি। শুধু বিদায় নেওয়ার সময় তীরশথের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল—যাই। তারপর ওরা পায়ে পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল দূরে—আরও দূরে—আরও দূরে—। আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। ক্রমে ওরা সন্ধান অন্ধকারে মিশে গেল। আর ওদের দেখা গেল না। একটা আশ্চর্য কথা শোন নহিমা। বিদায়-মুহূর্তেও আমাদের কারু চোখে এক বিন্দু অশ্রু ছিল না।
ওরা কেথায় যাবে? নহিমা জিজ্ঞাসা করল।
হানানি বলল, সে কথা কে বলবে! ওরাই কি তা জানে? কে জানে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে ওদের বাকী জীবন হয়তো কেটে যাবে। আকাশে আজ চাঁদ নেই, অন্ধকার রাত্রি, এই অন্ধকার ভেদ করে ওরা এগিয়ে চলেছে। ওদের জীবনে কি আর কোন দিন সূর্য উঠবে?—ওরা কোথায়, ওরা কোথায় নহিমা?
: ওরা ঘুমিয়ে পড়েছে।
: মিকা ওদের বড় ভালবাসত।
: হ্যাঁ, ওরাও তাঁকে ভালবাসত। জান, আজ সারাদিন ওরা আমার কাছে শুধু চাচার কথাই জিজ্ঞাসা করেছে। কোন দিন তো এমন করে না। কে জানে, কি বুঝেছে ওরা।
: হ্যাঁ, তার পর শোন নহিমা। ওরা চলে গেল। আমি ডেকে বললাম, তীরশথ, এবার চলুন। আমরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলাম। তবু তিনি আমার এই কথা শুনতে পেলে না। আমি আবার ডাকলাম। এবার তিনি চমকে উঠে বললেন, কি বলছ?
বললাম, এবার চলুন।
তিনি বললেন, হ্যাঁ, চলো।
আমরা দু’জনে নগরের দিকে ফিরে আসতে লাগলাম। নগর সীমান্তে যখন এসে পৌঁছেছি, তখন তিনি কি করলেন জান?
কি? কি করলেন?
বললেন, আমি আর চলতে পারছি না হানানি। আমি এখানে একটু বসব। বসে বিশ্রাম নেব।
: তাতে এত আশ্চর্য হবার কি আছে? সারা দিনের এত হাঙ্গামা —
না, না, এ কথা বলে আমাকে কেউ বোঝাতে পারবে না। তীরশথের লোহার মত স্বাস্থ্য। তাঁর কোন দিন বিশ্রামের প্রয়োজন হয় না। আমি বুঝলাম এ দুর্বলতা কিসের। বুঝলাম, সে তার সমস্ত শক্তি হরণ করে নিয়ে গিয়েছে। বললাম, তীরশথ, সমস্ত জেরুজালেমের মানুষ যার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, ব্যক্তিগত দুঃখে তাঁর কি ভেঙ্গে পড়লে চলে? তার উত্তরে তিনি কি বললেন জানো?
: কি বললেন?
: বললেন, জেরুজালেমের মানুষ আজও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, তুমি কি তাই মনে করো হানানি? আমি কিন্তু তা মনে করি না। কিন্তু আমি কি তাদের রক্ষা করতে পারব? আমার ভয় হয়, আমি যেন হেরে যেতে বসেছি। শত্রু আমাদের ব্যূহের গভীরে প্রবেশ করেছে—এরা আমাদের দুর্বলতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে পথ করে নিয়েছে। আমি এত দিন বুঝেও বুঝতে চাই নি। তার ফল এখন হাতে হাতে পাচ্ছি।
নহিমা বলল, এ সব কী কথা হানানি। আমি-যে এর কিছুই বুঝতে পারছি না।
হানানি বলল, এখন থাক, পরে বুঝিয়ে বলব। তীরশথ কি বললেন, সে কথা আগে শোন। তিনি বললেন, ওদের পরিকল্পনা সুদূরপ্রসারী। ওরা সুকৌশলে ওদের জাল ছড়িয়ে চলেছে। আমি বললাম, তীরশথ, বাদ-প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে আপনি আমাদের প্রতি কিছুটা বিরূপ হয়েছিলেন। কিন্তু এই সংকটের দিনে সে কথা মনে রেখে আমাকে যেন দূরে সরিয়ে রাখবেন না। তীরশথ বললেন, না, সে ভুল আশা করি আর হবে না, আমি তোমাকে দূরে সরিয়ে রাখব না। কিন্তু ওরাই তোমাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবার জন্য চেষ্টা করে চলেছে। যে-অস্ত্র ওরা তৈরী করেছে, এখন তাতে শান দিয়ে চলেছে। এ কথা অস্বীকার করতে চাই না, বুঝেই হোক আর না বুঝেই হোক, আমিও এই ব্যাপারে ওদের কিছুটা সাহায্য করেছি। এখন বুঝতে পারছি, নারগেল শারেজেরের এই চিঠি না এলেও ওরা মিকার উপর এই আঘাত হানতই। কুয়োর ধারে শদরার উপর যে-হামলা হয়েছিল তা থেকেই এর ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। আজ মিকা গেল। কাল তোমার পালা। ওদের সেই প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে।
ভীরশথ এত সমস্ত কথা বললেন! মহিমা আশ্চর্য হয়ে বলল।
হানানি ম্লান হাসি হেসে বললেন, হ্যাঁ, বললেন। ষড়যন্ত্রটা এত দিনে তাঁর চোখে ধরা পড়েছে। কিন্তু বড় দেরী হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে যে-ক্ষতি হয়ে গিয়েছে, জানি না তার প্রতিকার করা সম্ভব হবে কি না।
