পাপের সন্তান – ২৩

তেইশ

তীরশথ বলছিলেন, তোমরা পরজাতীয়দের আক্রমণের হাত থেকে জেরুজালেমকে রক্ষা করার জন্য প্রাচীন গেঁথে তুলেছিলে। তোমরা বুঝতে পেরেছিলে নগরীকে রক্ষা করতে হলে প্রাচীর না হলে চলবে না। পরজাতীয়েরাও সে কথা ভালভাবেই জানত, সেইজন্যই তারা এ কাজে বাধা দেবার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলে। কিন্তু তোমরা তাদের সেই সমস্ত ষড়যন্ত্র চূর্ণ করে দিয়ে প্রাচীর গেঁথে তুলেছ। তাই জেরুজালেম আজ সুরক্ষিত। তাই হেরুজালেমের নগরী পুনর্গঠিত হয়ে উঠেছে। তাই হাজার হাজার নির্বাসিত ইহুদী আবার প্রভুর নগরীতে এসে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ কথা তোমরা মান?

ওরা বলল, মানি।

নেহেমিয়া বললেন, ঠিক সেইরকমই আমাদের ইহুদী সমাজকেও বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করবার জন্য তাদের গণ্ডীবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই গণ্ডী হচ্ছে সমাজবিধান! এ কথা তোমরা মানো?

একটু চিন্তা করে হানানি বলল, হ্যাঁ, মানি। সমাজ থাকলে তার একটা গণ্ডী থাকতে হয়। প্রত্যেক সমাজের নিজ নিজ গণ্ডী আছে, আর তা থাকবার প্রয়োজনীয়তাও আছে।

: প্রত্যেক সমাজকে নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। আমি আমার ইহুদী সমাজের কথাই বলছি। মোশি প্রবর্তিত সমাজবিধান আমাদের ইহুদী সমাজের গণ্ডী। এই বিধান থেকে ভ্রষ্ট হয়েছিল বলেই ইহুদীদের দুর্গতি ভোগ করতে হয়েছে, আজও হচ্ছে। আর এ ইহুদী সমাজকে যদি আবার তার সেই সনাতন বিশুদ্ধ রূপে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে আবার সেই সমাজবিধানকে সর্বজনমান্য করে তুলতে হবে, আর যে-পাপ আমাদের সমাজের বুকে এসে আশ্রয় নিয়েছে, নির্মমভাবে তাকে নির্মূল করে তুলতে হবে।

হানানি একটু ইতস্তত করে বলল, কিন্তু সেই সমাজবিধানের মধ্যে যদি এমন কোন কথা থাকে যা সমর্থনযোগ্য নয়, যা ন্যায়নীতির বিরোধী তবু কি তাকে মাথা পেতে নিতে হবে?

: আশ্চর্য তোমার ধৃষ্টতা হানানি। এই সমাজবিধান তোমার আমার মত সাধারণ মানুষের, এমন কি স্বয়ং মোশিরও সৃষ্টি নয়, এ হচ্ছে স্বয়ং যিহোবার আজ্ঞা। তাকে তুমি সংশোধন করতে চাও, এ কথা বলতে তোমার ভয় হোল না? ক্ষুদ্র মানব সন্তান, যিহোবার চেয়েও তুমি দূরদর্শী? তাঁর এই অনুশাসনের উপরেই ইহুদী সমাজ দাঁড়িয়ে আছে। এর এক চুল হেরফের করবার অধিকার কারু নেই।

মিকা চুপ করেছিল। এবার সে মুখ খুলল।

: তাই বলে আমাদের প্রতিবেশী সমাজে গ্রহণ করবার মত ভাল জিনিস যদি কিছু থাকে, আমরা কি তা গ্রহণ করব না?

নেহেমিয়া বিদ্রূপের হাসি হেসে বললেন, কি ভাল জিনিস? যেমন ভালো কন্যা?

মিকা আর হানানি তাঁর এই উক্তি শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। তীরশথ তাদের উদ্দেশ করে এমন করে ব্যঙ্গ করতে পারলেন! মিকা এ-কথার কোন উত্তর দিল না। কিন্তু হানানি নিঃশব্দে মাথা পেতে নিল না। ধীর স্থির ভাবে যেন শুনে একটি একটি করে শব্দ ছাড়তে লাগল।

: তীরশথ, আমরা আপনার চেয়ে বয়সেও ছোট, মর্যাদায়ও ছোট। আপনি আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র। কিন্তু যখন সমগ্র জাতির ভাগ্য নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় লিপ্ত আছি, তখন আপনার মুখ থেকে এ-রকম তরল উক্তি আমরা কখনো প্রত্যাশা করি না।

এ-যে তিরস্কার, নেহেমিয়া চমকে উঠলেন। হানানির এই কঠিন বাক্যের আঘাতে তিনি একটু সময় স্থির হয়ে রইলেন। পরে আপনাকে সামনে নিয়ে বললেন,

তোমরা কি আমার এই উক্তিকে তরল বলেই মনে করছ? কিন্তু আমি তা মনে করি না। কেননা, পরজাতীয় মেয়েদের কেন্দ্র করেই ইহুদী সমাজের সংকট বিশেষভাবে প্রকট হয়ে উঠেছে। হ্যাঁ, ওরা আমাদের শত্রুদের তীক্ষ্ণ বর্শাফলকের মত সমাজের প্রাচীর ভেদ করে অসংখ্যা ফাইলের সৃষ্টি করেছে। আর সেই সমস্ত ফাটলের মধ্য দিয়েই ভ্রান্ত চিন্তা, মিথ্যা ধর্ম, দুর্নীতি ও কদাচারে দুষ্ট বায়ু এসে প্রবেশ করছে, তাঁর ফলে সারা ইহুদী সমাজটাই দূষিত হয়ে উঠেছে। প্রথম পিতা আদমের কথা স্মরণ কর। নারীর দুষ্ট প্ররোচনার মধ্য দিয়েই শয়তান তাঁর মনের মধ্যে প্রবেশ করতে পেরেছিল। শোনো হানানি, শোনো মিকা, আজ যারা আচার্য ইষ্রার এই কঠোর শুদ্ধি আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বা গোপনের কথা বলে চলেছে, আমি হিসেব করে দেখেছি, তারা সব ক’জনাই পরজাতীয়ার স্বামী। এটা কি একটা লক্ষণীয় বস্তু নয়?

মিকার তর্কস্পৃহা উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল, আর তক্কের ঝোঁকে এত দিন যে-সব কথা সে কখনোই বলত না, বরঞ্চ অন্য কেউ বললে প্রতিবাদ করত, সেই সমস্ত কথাই এখন বলে চলল। মিকা হানানির মত ইহুদীশাস্ত্র-সম্পর্কে এতটা অভিজ্ঞ নয় যে, শাস্ত্রের নজীর দেখিয়ে তর্ক করবে, কিন্তু ইহুদী সমাজের বাইরের কতগুলো খবর সে হানানির চেয়েও বেশী রাখে। সে তর্কের ভিত্তিটাকে প্রশস্ততর করে নিয়ে এল।

: তীরশথ, ইহুদী সমাজের বাইরেও মানুষ আছে। তাদেরও সমাজ আছে। আপনি আমি চোখ বন্ধ করে থাকলেই তারা মিথ্যা হয়ে যায় না। মিসরীয়, বাবিলীয়, পারসিক, গ্রীক, রোমক প্রভৃতি সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখুন। তাদেরও সমাজবিধান আছে, কিন্তু পরজাতীয়দের সংস্পর্শের সম্পর্কে এমন আতঙ্ক তাদের মনে নেই। কিন্তু তা- সত্ত্বেও দেখুন, তারা সকল দিক দিয়ে এগিয়ে চলেছে, আর আমরা ইহুদীরা অধঃপতনের শেষ সীমানায় পড়ে খাবি খাচ্ছি।

নেহেমিয়া ভ্রূভঙ্গী করে কঠিন সুরে উত্তর দিলেন

: বাবিলের শিক্ষায় শিক্ষিত তুমি মিকা। পরজাতীয়দের শেখান বুলি এখনও তুমি ভুলতে পারো নি। এগিয়ে যাওয়া কাকে বলে? বিলাস ব্যসনের উপকরণ সৃষ্টি করে তোমার নাম কি এগিয়ে যাওয়া? যারা যিহোবাকে চিনল না, সত্য ধর্মকে উপলব্ধি করতে পারল না, দুর্নীতি আর কদাচারে ডুবে রইল, সেই অশুচি বিধর্মী পরজাতীয়েরাই আজ তোমার কাছে আদর্শ? হানানি, তোমারও কি এই মত নাকি? আমার কথা যদি জিজ্ঞাসা করো, আমি বলব—হে যিহোবা, তুমি আমাদের এদের সংস্পর্শ থেকে বাঁচাও।

হানানি তিক্ত হাসি হেসে বলল, আপনি চাইলে কি হবে! চির দিন আপনারা তাই চেয়ে এসেছেন, কিন্তু আপনারা তাদের আটকে রাখতে পেরেছেন কি? আপনাদের সমস্ত আপত্তি ও বিতৃষ্ণাকে অগ্রাহ্য করে অশুচি ও বিধর্মী মিসরীয়রা এসেছে, আসিরীয়রা এসেছে, ক্যালদীয়রা এসেছে, পারসিকরা এসেছে, আরও অন্যান্য আক্রমণকারী পরজাতীয়েরা এসেছে, শুধু যে প্রাচীরই তারা ভেঙ্গেছে তা নয়, আপনাদের সমাজবিধানকে ভেঙ্গে তচনচ করে দিয়েছে। আমাদের হাজার হাজার ভাই-বোনদের তারা গলায় দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে গিয়েছে, হাটে হাটে পশুর মত বিক্রী করেছে। ইহুদী মেয়েরা আজ বিদেশীদের উপভোগ্যা—তারা বিদেশীদের ঘরে উপপত্নীর জীবন যাপন করছে। কোন্ জায়গা থেকে শুদ্ধি করতে শুরু করবেন। এর কোন কূল পাবেন? এর কোন থই পাবেন? বারিল থেকে যে-সব ইহুদীরা ফিরে এসেছে, তাদের সঙ্গে বিবাহযোগ্যা মেয়ে কটি ছিল? তারা সব কোথায় গেল? তাই তো বাবিল-প্রত্যাগত ইহুদী যুবকেরা অনেকেই এখানে এসে পরজাতীয়দের মধ্য থেকে জীবনসঙ্গিনী খুঁজে নিতে বাধ্য হয়েছে।

: আর তাই তুমি সমর্থন করছ?

: না, আমি সমর্থন বা অসমর্থন কিছুই করছি না। আমি শুধু যা ঘটেছে, তাই বর্ণনা করছি মাত্র। আপনাদের ছেলেদের একান্ত আহ্বানেই এই সমস্ত মেয়েরা তাদের ঘরে এসেছিল। তারা তুকতাক করে বা বশীকরণের মন্ত্র দিয়ে তাদের ভোলায় নি। আর আজ এই হতভাগিনী মেয়েগুলোকে আর আমার ও আপনার চেয়েও পবিত্র ফুলের মতই নিষ্পাপ তাদের শিশুগুলোকে লাঞ্ছনা ও মৃত্যুর মুখে বিসর্জন দিয়ে আপনারা আপনাদের নিজেদের ছেলেদের ধুয়ে মুছে বিশুদ্ধ করে ঘরে তুলছেন। এত বড় অবিচার ও নিষ্ঠুরতা যিহোবা কি ক্ষমা করবেন? এই যিহোবা কি এদেরও সৃষ্টি করেন নি?

এবার নেহেমিয়া বড়ই বিপন্ন বোধ করলেন। এইখানেই-যে তাঁর দ্বন্দ্ব, যে-দ্বন্দ্বের সমাধান করতে গিয়ে তাঁর হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে। আহা, এই অসহায় মেয়েগুলো আর তাদের নিষ্পাপ শিশুগুলো! এদের এমন করে পথে ভাসিয়ে দেওয়া এ কি মানুষের কাজ? আচার্য ইষ্রার সঙ্গে এই নিয়ে তাঁর দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। আচার্য যিহোবার প্রতিনিধি ও ভাষ্যকার। যিহোবার বাণী দিয়ে তিনি তাঁর মুখ বন্ধ করে দেন। নেহেমিয়া সেখানে নিরুত্তর। কিন্তু তাঁর অন্তরের মানুষ যে সে কথা মানতে চায় না। নেহেমিয়ার অন্তরে তাই যিহোবা আর মানুষের সংগ্রাম চলে। কিন্তু যিহোবা পরম শক্তিশালী, মানুষ মাথা তুলতে পারে না, কিন্তু তার বেদনায় নেহেমিয়ার অন্তর জর্জর হয়ে ওঠে।

অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত নেহেমিয়া অবাক হয়ে দেখেন, দু’টি লোকের মনে কোন দ্বন্দ্ব নেই। এক জন আচার্য ইষ্রা। তিনি সোজা একটি পথ ধরে আছেন, সেই পথ যিহোবার পথ— দয়া, মায়া, ভালবাসার স্থান সেখানে নেই। আচার্য তাই অবিচলিত। আর একটি লোক হানানি। নেহেমিয়ার মনে হয়, এও একটি পথ পেয়ে গেছে। তার মনে কোন কুণ্ঠা নেই, সংশয় নেই। তার নিরুদ্বিগ্ন ও সপ্রতিভ চোখ মুখ থেকে এই কথাই যেন ফুটে উঠছে। আর এদের দুই জনের পথের মাঝখানে পথের উপর পড়ে ছটফট করছেন নেহেমিয়া। কে তাঁকে পথের সন্ধান দেবে? হায় তীরশথ, শত শত লোকে নির্দেশের জন্য যাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, আজ তাঁর এই অবস্থা!

হানানির শেষ কথাটি নেহেমিয়াকে ভাবিয়ে তুলল। এত বড় অবিচার ও নিষ্ঠুরতা কি যিহোবা ক্ষমা করবেন? হানানির মুখেও সেই যিহোবার নাম, যাঁর নামে আর্চা ইষ্রা তাঁর এই অনুশাসন জারী করেছেন। আচার্য ইষ্রার যিহোবা আর হানানির যিহোবা যেন পাশাপাশি তার কাছে এসে দাঁড়াল। কাকে তিনি বেছে নেবেন? আচার্য ইষ্রার পক্ষে শাস্ত্র আর হানানির পক্ষে দয়া, মায়া, ভালবাসা অর্থাৎ মানুষের মনের কোমল ভাবাবেগ। কিন্তু যিহোবা যে-কোঠিন্য ও শক্তির প্রতিমূর্তি, তাঁর কাছে কোমলতার প্রশ্রয় নেই। নেহেমিয়া মনে মনে আপনাকে দৃঢ় করে তুললেন।

হানানি কিন্তু তখনও বলেই চলেছে—রক্তের বিশুদ্ধতা! বাবিল আর অন্যান্য অঞ্চল থেকে প্রত্যাগত যে-সমস্ত ইহুদীরা আজ রক্তের বিশুদ্ধি রক্ষার জন্য পবিত্র যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, তাদের কত জনের দেহে-যে পরজাতীয় রক্ত বইছে, সে কথা আপনিও জানেন না, তারাও হয়তো জানে না। একটা কল্পিত বংশতালিকা সামনে ধরে যে যার আপনার জন্মের সাফাই গাইছে।

নেহেমিয়া ধমক দিয়ে উঠলেন : সাবধান হানানি, শুধু কল্পনা বা অনুমানের উপর নির্ভর করে লোকের নামে এ সমস্ত অপবাদ দিও না।

মিকা বলল, তীরশথ, আপনি রাগ করছেন কেন? এ তো শুধু কল্পনা বা অনুমানের কথা নয়। এমন দুটো চারটে সত্য ঘটনা আমি নিজেও জানি। যদি আরও বেশী শুনতে চান, বাবিলের পাগলা-বাবার কাছে খোঁজ করবেন। তাঁর কাছ থেকে এই ইতিহাস এত বেশী পাবেন যে, শেষে শুনতে চাইবেন না।

বাস্তব অবস্থার সাথে মোকাবিলা করতে গিয়ে যতই ঘা খাচ্ছিলেন, নেহেমিয়ার মেজাজ ততই গরম হয়ে উঠছিল। আপনার সঙ্গে আপনার যে-লড়াই তার উত্তাপটা বাইরে এসে প্রকাশ পেতে রাগল। হানানি আর মিকাকেও যেন ভূতে পেয়েছিল, তারাও সমানে কথার পিঠে কথা ছুঁড়তে লাগল। যাদের তিনি একান্ত স্নেহের পাত্র ও বিশ্বস্ত অনুচর হিসেবেই দেখে এসেছেন তাদের এমন সমানে সমানে উত্তর করবার ঔদ্ধত্যটা নেহেমিয়া বরদাশত করতে পারছিলেন না। কথার পিঠে কথা বাড়তে বাড়তে শেষ কালে তর্কটা এমনই এক পর্যায়ে গিয়ে উঠল যে, উভয় পক্ষই সুবুদ্ধি-প্রণোদিত হয়ে আর বেশী দূর না এগিয়ে সেইখানেই ক্ষান্ত হোল। কিন্তু উভয় পক্ষের মনই তিক্ত হয়ে গেল এবং একটা প্রবল বিরুদ্ধতার ভাব উভয় পক্ষের মাঝখানে থম থম করতে লাগল। আলোচনাটা শুরু করবার সময় তারা কল্পনাও করতে পারে নি যে, তার এই পরিণতি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ওরা চলে গেল। নেহেমিয়া বসে রইলেন। এ কি হোল! এমন কথা কে ভাবতে পেরেছিল, হানানি আর মিকা, তারাও তাঁকে ছেড়ে চলে যাবে, চিরদিনের জন্য চলে যাবে! তাঁর ডান হাত আর বাঁ হাত, দুটো হাতই ভেঙ্গে দিয়ে চলে যাবে। কে বলল যাবে? ওরা কি সে কথা বলেছে? না, মুখ ফুটে স্পষ্ট করে সে কথা বলে নি। কিন্তু নেহেমিয়া ওদের চোখে মুখে সেই কথা পড়তে পেরেছেন। কিন্তু আপোষের পথ তো নেই। ওরা পাথরের মত শক্ত, ওরা ভাঙ্গবে, কিন্তু নুয়ে পড়বে না। হানানি আর মিকাকে তাঁর চিনতে বাকী নেই। এত শক্তি ওরা কোথায় পেয়েছে? এ শক্তি কি? শয়তানের শক্তি?

ওরা যদি চলে যায়, কে আর তাঁর রইল! নেহেমিয়ার মনে হোল তাঁর শরীর অবসন্ন হয়ে আসছে। আর কি তিনি সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে পারবেন? ওরা-যে শুধু নিজেরা চলে গেল তাই নয়, তাঁর দৃঢ় বিশ্বাসের মূলে এমন কঠিন আঘাত দিয়ে গেল, যার প্রতিক্রিয়া চলতে থাকবে। ওরা চলে যাবে? কোথায় চলে যাবে?

“তীরশত আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন।” চমকে উঠলেন নেহেমিয়া। এমনি মিষ্টি সুরে কে তাঁকে অভিবাদন জানাল! নাঃ, কেউ তাঁকে ডাকে নি। চলে-যাওয়া দিনের স্মৃতি। মনশ্চক্ষে ভেসে উঠল ছবিটি—ছেলে মেয়ে, ছোট বড় সবাই মিলে দল বেঁধে প্রাচীর গেঁথে তুলছে। শাদা ঘোড়ার সওয়ার হয়ে নেহেমিয়া ঘুরে ঘুরে তদারক করছেন, এমন সময় তাঁর কানে এল— “তীরশথ, আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন।” ছেঁড়া ময়লা কাপড় পরা মেয়েটি। মাথায় ঝুড়ি বয়ে নিয়ে চলেছে।

শদরা! মাঝে মাঝেই এমন হঠাৎ করে ওর কথা মনে পড়ে যায় কেন? এক এক সময় এক মূর্তি নিয়ে এসে দেখা যায়। কোথায় যাবে শদরা? কিন্তু এ নিয়ে তাঁরই বা এত চিন্তা কেন? আচার্য ইষ্রা তো স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, পরজাতীয়াদের সম্বন্ধে সমাজের কোন দায়িত্ব নেই। কিন্তু কই, তিনি-যে তেমন করে ভাবতে পারছেন না। কেন পারেন না? হায় পরজাতীয়া, তোমরা কেমন করে জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে গেলে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *