পাপের সন্তান – ২০

কুড়ি

পবিত্র নিসান মাসের চতুর্বিংশ দিবসের পর্ব সুসম্পন্ন হয়ে গেল। পাপস্বীকার, মার্জনাভিক্ষা ও নিয়মস্থাপন অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলে পর হানানি আর মিকা ফিরে আসছিল। দু’জনেরই মন চিন্তাযুক্ত, গতি মন্থর।

: মিকা, হাজার হাজার লোক নিয়ম ও সংকল্প সানন্দে গ্রহণ করল, কিন্তু আমি পারলাম না।

: কেন হানানি?

: তুমি তো আমার জীবনের সব কথা জানো না, তাই তুমি এই প্রশ্ন করছ।

: তুমি একদিন বলেছিলে আমাকে বলবে সব কথা। কিন্তু কই, তোমার-যে সময়ই হয় না, এত ব্যস্তবাগীশ লোক তুমি। না, আর কোন কথা শুনব না, আজই তোমাকে বলতে হবে।

: আজই? বেশ তো। কিন্তু আমার ভয় হয়, শেষ পর্যন্ত তোমার ধৈর্য থাকবে তো?

: আর বেশী ভূমিকা করো না হানানি, আরম্ভ করো। হানানি, তুমি আমার বন্ধু, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কিন্তু তোমার জীবনের সুখদুঃখের কোন কথাই তো আমি জানতে পারি নি!

: আচ্ছা, তবে শোনো। আমি তরুণ বয়সে বাবিলে এক দাসের বাজারে বিক্রী হয়ে যাই। আসিরীয়ার এক সম্পন্ন চাষী আমাকে কিনে নিয়ে যান। তুমি তো জান না ক্রীতদাসের জীবন কি দুঃসহ, কত লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে তাকে জীবন পাত করতে হয়! কিন্তু তা-হলেও আমার প্রভু আমার সঙ্গে মোটামুটি ভাল ব্যবহারই করতেন। এ কথা যদি স্বীকার না করি, তাহলে আমি বেইমানী করব। আমি দিনভর পরিশ্রম করতাম, পেট ভরে খেতাম আর দিনে দিনে বলিষ্ঠ ও হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠছিলাম। আমার প্রভু নিজে রোগাপটকা লোক, তার গায়ের মাংস জমত না। আমার স্বাস্থ্যপূর্ণ চেহারার দিকে তিনি মাঝে মাঝেই ঈর্যার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন। আমি তা বেশ বুঝতে পারতাম। আমার কিন্তু তাতে ভালই লাগতো।

একদিন তিনি বললেন, হানানি, আমার ভাতের গুণ আছে রে, বেমাত্রায় খেয়ে খেয়ে তুই-যে ঘাড়ে গর্দানে আমার ষাঁড়টার চেয়েও তাজা হয়ে উঠেছিস্ দেখছি। নবান্নের ভোজের জন্য ষাঁড়টাকেই মনস্থ করে রেখেছি। কিন্তু তার আর দরকার দেখছি না। তোর ঘাড়ে আর পিঠে যে-পরিমাণ মাংস জমেছে তাতে তোকে দিয়েই পুরো সমাজকে ভোজ খাওয়ানো চলে। বলেই তিনি হা হা করে হাসতে লাগলেন। তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, কথাটা আমার একটুও ভালো লাগে নি। কিন্তু ক্রীতদাসদের এ সব কথা গায়ে মাখলে চলে না। বয়সে কাঁচা হলেও এটুকু বোঝবার মত বুদ্ধি আমার হয়েছিল। কাজেই আমিও প্রভুর এই রসিকতায় তার চাইতেও বেশী জোরে হেসে উঠলাম।

যাই হোক, এ সব নিয়ে আমার তেমন কোন অসুবিধা হচ্ছিল না। আমি দেখেছি তো অন্যান্য ক্রীতদাসের চেয়ে আমি অনেকটা ভালই ছিলাম। মারপিট-যে খাই নি তা নয়, যথেষ্ট মার খেয়েছি। তবে আমার কানও কাটা যায় নি বা কেউ লোহা পুড়িয়ে গায়ে ছ্যাঁকাও দিয়ে দেয়নি। কিন্তু এটুকু সুখও আমার সইল না।

হানানি একটু স্থির হয়ে কিযেন ভাবল, শেষে বলল, অদ্ভুত এই সংসার মিকা, কত বিস্ময়-যে এখানে আছে। সে সব দিনের কথা মনে করলে হাসিও আসে, কান্নাও পায়। আমার প্রভুর স্ত্রী আমার চেয়ে বয়সে অনেকটা বড় ছিলেন। আমার প্রভুর ঠিক বিপরীত, স্বাস্থ্যের প্রাচুর্যে যেন একেবারে ফেটে পড়ে। জানি না কেন চিরদিন তাকে একটু ভয় করেই এসেছি। আমার প্রভুর চেয়েও বেশী। হ্যাঁ, এখনও তাকে মনে করলে আমার ভয় হয়।

সেদিন সারা আকাশ মেঘে ঢাকা, টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। দিনের বেলাই অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। আমার প্রভু বাইরে কোথায় গেছেন, এ বেলা আর ফিরবেন না। আমার হাতেও কোন কাজ নেই, বসে বসে আপনার দুর্ভাগ্যের কথাই চিন্তা করছিলাম, এমন সময় প্রভুর স্ত্রী আমার কাছে এসে ডাকলেন, হানানি, আয়, আমার সঙ্গে আয়।

বোধ হয় কোন কাজ করাবার জন্য ডাকছেন, এই কথা মনে করে আমি তাঁর পেছন অনুসরণ করে চললাম। তিনি তাঁর শয়নকক্ষে প্রবেশ করলেন, আমিও তাঁর পেছন পেছন গেলাম। ঘরে ঢুকেই তিনি দরজাটা খিল দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। একটা জানালা খোলা ছিল, তাও বন্ধ করে দিলেন। ভয়ে আমার প্রাণ কেঁপে উঠল। আমার প্রভু যখন আমাকে কোন দোষে বা বিনা দোষে মারেন, তখন তার আগে এমনিভাবেই দরজা জানালা বন্ধ করে নেন। কিন্তু এ পর্যন্ত প্রভুপত্নী কোন দিন আমার গায়ে হাত তোলেন নি। কি এমন অপরাধ করলাম আজ! কই, কিছুই মনে পড়ছে না তো।

তুমি বোধ হয় আমার সেই ভয়ের কথা শুনে মনে মনে হাসছ আমারও আজ হাসি পায়। কিন্তু মনে রেখো আমার বয়স তখন সবে মাত্র আঠারো কি উনিশ এবং আমি একজন মূর্খ ক্রীতদাস। সংসারের ক’টা খবরই বা জানবার সুযোগ হয়েছিল! ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি শুধু এইটুকুই জেনেছি যে, কেউ যদি তোমাকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা জানালা বন্ধ করে দেয়, তবে বুঝতে হবে, প্রস্তুত হও। এবার তোমার উপর প্রহার বর্ষণ শুরু হবে। আমিও সে জন্য মনে মনে প্রস্তুত হচ্ছিলাম।

আঃ, তোর ওই নোংরা জামাটা খুলে ফেল না!

আমি কথাটা বুঝতে না বুঝতেই তিনি অধৈর্য হয়ে এক হ্যাঁচকা টানে আমার জামাটা টেনে খুলে ফেললেন। সেই টানে জামার একটা অংশ ছিঁড়ে গেল।

আহা, ছিঁড়ে গেল জামাটা! প্রভুর কাছে এজন্য আবার কত বকুনিই না খেতে হবে!

প্রভুপত্নী আমার কাছে এসে আমার ঘাড়ের বুকের আর হাতের মাংসপেশীগুলো টিপে টিপে দেখলেন, তারপর হাত বুলিয়ে দেখলেন। এ আবার কি? দাসের বাজারে দেখেছি ক্রেতারা দাসদাসীদের এমনি করেই পরখ করে দেখে!

: আঃ, কি সুন্দর! এই তো মরদের বাচ্চা, আর ওটা একটা কি, না-মরদ কোথাকার! বুঝলি, রে বুঝলি, ও তোকে আমার চাই-ই। তোকে ছাড়া আমার চলবে না।

আমি এমন বোকা, তখনও কিছু বুঝতে পারছি না। তবে মনে হচ্ছিল, বোধ হয় মারবে না। কিন্তু কি করতে চায়! ঠিক সেই সময় আমার মনে পড়ে গেল প্রভুর কথাটা—তোর ঘাড়ে আর পিঠে যে-পরিমাণ মাংস জমেছে, তাতে তোকে দিয়েই পুরো সমাজকে দিব্যি ভোজ খাওয়ানো চলে।

প্রভুপত্নী হঠাৎ আমার হাত ধরে আমাকে তার কাছে টেনে নিয়ে এলেন, ওরে, এইখানে আমার সঙ্গে আয়, আমার এই বিছানার উপরে আয়।

এ বলে কি! দুধের ফেনার মত ধপধপে সাদা বিছানা, আমাকে সেখানে যেতে বলছে। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, কেন, আমি ওখানে যাব কেন?

আমি কিছু বুঝতে না বুঝতেই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বিছানার উপর টেনে নিলেন।

: ওমা, কেমন বোকা, রে, কিছু বোঝা না তুমি, দুধের খোকা! ওরে, আমি তোর সঙ্গে শয়ন করব। দেখ দেখি, আমাকে তোর ভাল লাগে না?

অতি নির্বোধ আমি, কিন্তু সেই নির্বোধেরও এবার চোখ ফুটল। আমার সমস্ত রক্ত ঝিন্ ঝিন্ করে উঠল। যৌবনের উন্মেষের পর এই প্রথম নারী স্পর্শ! কিন্তু কই, আমার সমস্ত দেহ মন আনন্দে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল না তো। আমি আতঙ্কে ঘেমে উঠলাম। এ বাঘিনী কি আমায় খেয়ে ফেলবে। আমি ভরে কাঁপতে কাঁপতে বললাম, কর্ত্রী, এমন কথা বলবেন না, এ-যে মহাপাপের কথা। আপনি আমাকে যেতে দিন।

: কোথায় যাবি তুই? এইখানেই তোকে থাকতে হবে। এত ভয় কি রে? কর্তা তো এ বেলা আর আসবে না। শুধু আমি আর তুই।

আমি সংসার-সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ। তবু মনে পড়ল একবার দেখেছিলাম বটে। এই পাড়াতেই একটি যুবক সাদ তার প্রভুর বয়স্কা কন্যার সঙ্গে নিরালায় বসে ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলছিল, এই অপরাধে সবাই মিলে পিটতে পিটতে তাকে মেরেই ফেলল। আমি নিজের চোখে দেখেছি। সেই দৃশ্যটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। পাগলা কুকুরকে যেমন করে পিটিয়ে মারে, তেমনি করে ওরা তাকে মারল। আঃ, সে কি আর্তনাদ! সে দৃশ্য আমি ভুলতে পারি না। আর আজ যদি কেউ ঘুণাক্ষরে আমার এই কথা জানতে পারে, আমার দশাটা কি হবে!

দু’টি পরিপুষ্ট হাত আমাকে পিষ্ট করে ফেলছিল। আমার শরীর যেন অবশ হয়ে আসছিল। তবুও আমি আমার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে সেই হাতের বাঁধন খসিয়ে বেরিয়ে এলাম। প্রভুপত্নী সেই হ্যাঁচকা টানে বিছানা থেকে মেঝের উপর পড়ে গেলেন। পেছন ফিরে চেয়ে দেখবার সময় ছিল না। আমি বন্ধ দরজা খুলে ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেলাম।

সারা দিন বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ালাম। পেটে দানাপানি কিছুই পড়ল না। কিন্তু কোথায় বা আর যাব! গৃহপালিত পশুর মত সন্ধ্যার সময় ঘরের ডাকে ঘরেই ফিরে এলাম। দেখলাম, প্রভু ফিরে এসেছেন। মুখখানা জলদগম্ভীর। দেখেই আমার বুক

ধড়ফড় করে উঠল। বুঝলাম, প্রভুপত্নী আমার নামে তাঁর কাছে কিছু লাগিয়েছেন। কিন্তু কি কথা বলবেন তিনি? তাও জানতে দেরী হোল না। বাড়ীতে একটি দাসী আছে, বয়সে তরুণী, নাম আলামা। প্রভু তাঁর অবসর সময়ে তাকে উপভোগ করে থাকেন, এ কথা সবাই জানে। প্রভুপত্নীর এতে কোন আপত্তি নেই। প্রবু তাঁর ক্রীত-দাসীকে উপভোগ করবেন, এতে কারই বা কি বলার থাকতে পারে! প্রভুপত্নী প্রভুর কাছে লাগিয়েছেন, আমি নাকি অসৎ উদ্দেশ্যে সেই দাসীটির উপর বল প্রয়োগ করতে চেয়েছিলাম। আরও জানতে পারলাম, আলামাও নাকি সেই কথা স্বীকার করেছে।

ঠাকুরের ভোগে কুকুরের দৃষ্টি! গর্জন করে উঠলেন প্রভু। তার পর আমি যেই ঘরে থাকতাম, সেই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে প্রভু আমার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালেন। চাবুকের পর চাবুক পড়তে লাগল। দাঁতে দাঁত চেপে নিঃশব্দে সহ্য করলাম সব। কিন্তু শুধু চাবুক মেরেই তাঁর তৃপ্তি হোল না। শেষ পর্যন্ত হিংস্র পশুর মত আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

আমি চিৎ হয়ে পড়ে গেলাম, আর আমার বুকের উপর, পেটের উপর লাথি পড়ছে লাগল। আমি ইচ্ছা করলে ওর সরু গলাটা মুঠ করে ভেঙ্গে ফেলতে পারতাম। কিন্তু ক্রীতদাস কি কখনও তার প্রভুর গায়ে হাত তুলতে পারে? এমন কথা কেউ কোনদিন শুনেছে? কাজেই আমি আর কি করব! প্রহারের বিরাম ছিল না। ক্রমে আমার চোখের সামনে সব কিছু ঝাপসা হতে হতে শেষে একেবারে মিলিয়ে গেল।

আমার যখন জ্ঞান ফিরে এল, তখন শরীরে অসহ্য বেদনা, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছিল। কাতর কণ্ঠে বললাম—’জল’! কিন্তু কে দেবে জল? একবার এ কাত একবার ও কাত হয়ে ছটফট করতে লাগলাম। কোনমতেই স্বস্তি নেই। কতক্ষণ এভাবে কাটল জানি না। হঠাৎ খুট করে একটা শব্দ শুনে চেয়ে দেখলাম, আমার ঘরের দরজাটা আস্তে খুলে গেল। কে? আশ্চর্য হয়ে দেখলাম—আলামা। নিঃশব্দ পায়ে সে আমার ঘরে এসে প্রবেশ করল। ওর হাতে একটা ক্ষীণ-শিখা বাতি। সেই বাতির আলো মুখে পড়তেই আমি কে চিনলাম। বিরক্তিতে, বিতৃষ্ণায় মুখ ফিরিয়ে নিলাম।

সে বুঝল। আমার মাথার কাছে বসে করুণ কণ্ঠে বলল, হানানি, আমার উপর রাগ করো না। আমায় তুমি ক্ষমা করো। আমি জানি তোমার নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমি কতদূর অন্যায় করেছি। কিন্তু আমি কি করব! আমি-যে অসহায়— তোমার চেয়েও অসহায়। সর্বনাশী এ কথা বলতে আমাকে বাধ্য করেছে। তুমি তো জানো না, কি হিংস্র এই বাঘিনী, ও না করতে পারে এমন কাজ নেই।

আলামার অশ্রুসজল ব্যাকুল আবেদন আমাকে অভিভূত করে ফেলল। আহা, কার উপর রাগ করব! আমরা-যে একই পথের সাথী। এ-যে আমার চেয়েও দুঃখী।

বললাম, আলামা, আমাকে একটু জল দাও।

: আহা রে, জল খাবে? একটু অপেক্ষা করো, নিয়ে আসছি।

একটু বাদেই সে ফিরে এল। শুধু জল নয়, কিছু খাবারও নিয়ে এসেছে। আমি চোঁ চো করে জলটা পান করে নিলাম। তৃষ্ণাটা একটু নিবৃত্ত হতেই তীব্র ক্ষুধা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল।

: হানানি, এইটুকু খাবার খেয়ে নাও, তোমার জন্য এনেছি। আহা, সারা দিনভর কিছুই তো খাও নি। ওর কণ্ঠ থেকে মমতা ঝরে পড়ল। আবাক হয়ে গেলাম, এত স্নেহ আর দরদ ওর মধ্যে কোথায় লুকানো ছিল, এত দিন তো টের পাই নি! এমন আদর করে কেউ তো কোন দিন আমাকে খেতে বলে নি! আমি খেয়ে চললাম। আর সে কথা বলতে লাগল,

হানানি, তুমি হয়তো আমাকে ঘৃণা কর। কর্তা আমাকে সবার সমুখে পথের কুকুরীর মতই ব্যবহার করেন। লোকে দেখে হাসে, তা কি আমি বুঝি না? কিন্তু আমি কি করব, কোথায় যাব? আমি-যে মেয়েমানুষ! আমি যদি তোমার মত পুরুষ হোতাম হানানি, আমি কবে পালিয়ে চলে যেতাম, এখানে থেকে এ লাঞ্ছনা সহ্য করতাম না।

আমি অবাক হয়ে বললাম— পালিয়ে! বল কি তুমি!

: কেন নয়? এই বিরাট পৃথিবীতে আর কি জায়গা নেই? হানানি, শোনো আমার কথা, এই সর্বনাশীর বিষনজরে যখন পড়েছ, তোমার ক্ষমা নেই, ও তোমাকে গন্ধে গন্ধে মারবে। স্বামীকে ভেড়া বানিয়ে রেখে তার চোখের আড়ালে এমনি করে কত ছেলের সর্বনাশ করে চলেছে ও। ওর কোন্ কথা আমার জানা নেই? শোনো হানানি, তুমি এখানে থেকো না। আজই তুমি এখান থেকে পালিয়ে যাও। তুমি পুরুষ মানুষ, তোমার এত ভয় কি?

এত দিন গৃহপালিত পশুর মত পড়ে পড়ে মার খেয়েছি, আর বোঝা বয়ে চলেছি, কিন্তু আশ্চর্য, পালাবার কথা এক দিনও তো মনে হয় নি। সেজন্য আমি আলামার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। মুক্তির মন্ত্র সেই তো আমাকে শুনিয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। কিন্তু যাবার সময় মনটা হঠাৎ কেমন করে উঠল।

জিজ্ঞাসা করলাম—আলামা, তুমি?

আমি? হানানি, আমার কথা ভেবো না। আমি এখানেই পচে গলে মরব। তুমি যাও, যাও হানানি, এই সর্বনাশীর খপ্পর থেকে পালাও তুমি।

না, আমি হঠাৎ বেঁকে বসলাম, আমি তোমাকে এখানে ফেলে রেখে যাব না, তোমাকে আমার সঙ্গে যেতেই হবে।

আমার কথা শুনে আলামার মুখখানি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কে জানে, কি মনে করে কতক্ষণ ধরে অপলক দৃষ্টিতে সে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল।

আমার মনে হোল, আলামাকে আমি যেন এই প্রথম দেখলাম। এমন তো কোন দিন দেখি নি।

: বলো, বলো, তুমি আমার সঙ্গে যাবে?

আলামার দুই চোখ থেকে দুই বিন্দু অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে করুণ ভঙ্গীতে মাথা নেড়ে বলল,

তা আর হয় না, হয় না হানানি। আমার যাওয়ার পথ নেই। দুঃখ করোনা ভাই, কিন্তু তুমি এই-যে কথা ক’টি বললে, এ আমার বাকী জীবনের সম্পদ হয়ে রইল।

: কেন, কেন হয় না আলামা?

সে বলল, না, হয় না। বহুদিনের অত্যাচার আর লাঞ্ছনার ফলে আমি কালব্যাধিতে আক্রান্ত। দেখছ না আমি দিন দিনই শীর্ণ হয়ে যাচ্ছি? হানানি, তুমি যাও, আমি এই রুগ্‌ণ দেহ নিয়ে তোমার পথে বোঝা হব না। আমার আর বেশ দিন বাকী নেই। হানানি, ভাইটি আমার, তুমি প্রার্থনা করো, আমি বহু দুঃখ পেয়েছি, আর দুঃখ তিনি যেন আমাকে না দেন। এবার যেন তিনি আমার তাঁর কাছে ডেকে নেন।

দু’চোখের জল ভরে বিদায় নিয়ে এলাম। আজও তার কথা ভুলতে পারি নি। মিকা জিজ্ঞাসা করল, হানানি, আলামা কি ইহুদী?

: না, না, সে আমোনীয়।

: ইহুদীদের জাত শত্রু?

: তাই তো সবাই বলে। কিন্তু আমি কি তাকে কোন দিন শত্রু বলে মনে করতে পারব? তার কাছেই তো জীবনে প্রথম স্নেহের স্পর্শ পেয়েছিলাম। স্নেহ, ভালবাসা কাকে বলে, তা তো আগে জানতাম না।

অনেকক্ষণ নিঃশব্দে কেটে গেল। মিকাই প্রথম নিস্তব্ধতা ভাঙ্গল।

: তারপরেই বুঝি চলে এলে যাহুদায়?

: হ্যাঁ, চলে এলাম। কত দেশ বিদেশ ঘুরে, কত দুর্যোগের মধ্য দিয়ে, কত ঘাট আর আঘাটা পেরিয়ে শেষে যাহুদায় এসে পৌঁছলাম। সে সব কথা থাক। আসিরীয়া ছাড়ার দুই পরে এখানে এলাম। আশা ছিল, যদি কোন রকমে একবার যাহুদায় গিয়ে পৌঁছতে পারি তবে আমার ইহুদী ভাইয়েরা নিঃসন্দেহে আমাকে আদর করে ডেকে নেবে। আমি-যে ইহুদী এই বোধটা আমার বরাবরই টনটনে ছিল। যখন তাদের কাছে এসে আমার কথা বললাম, তারা বিরাট মোটা এক বংশাবলী-পুস্তক খুলে আমাকে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করতে লাগল—তোমার গোত্র কি, তোমার বংশতালিকা কি? তুমি কার সন্তান? তুমি যাজক, লেবীয়, নথিনীয় বা সাধারণ ইহুদী, কোন, পর্যায়ের ইত্যাদি, ইত্যাদি। আমি উত্তর দিলাম, আমি তো এত সব কথা জানি না। আমি শুধু এই জানি যে, আমি ইহুদী।

তারা প্রশ্ন করল, তুমি কি ছিন্নত্বক?

আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি ছিন্নত্বক।

তারা বলল, ইহুদী ছাড়াও তো আরও অন্যান্য ছিন্নত্বক জাতি আছে। তুমি-যে ইহুদী তার বিশেষ প্রমাণ কিছু দিতে পারো?

আমি বললাম, না, তা আমি পারি না।

তারা বলল, তবে আর আমরা কি করতে পারি, বলো। এমন তো সবাই বলতে পারে, আমরা ইহুদী। এই বলে ওরা বংশাবলী-পুস্তক গুটিয়ে রেখে যে-যার কাজে মন দিল। আমি বহু দূর থেকে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়ে এসেছিলাম। সে সম্পর্কে কেউ কোন কথা আমাকে বলল না।

ঘুরতে ঘুরতে জেরুজালেমে এলাম। কেউ আমাকে চেনে না, অজানা লোককে কেউ ঠাঁই দিতে চায় না। এ তবে আমি কোথায় এলাম? অভিমানে আমার মন ভরে গেল। বুক ফেটে কান্না ঠেলে উঠতে লাগল। কেউ আমার দিকে ফিরে চাইল না। পরজাতীয় লোক মনে করে আমাকে কেউ কাজও দিতে চাইল না। আমি নগরের বাইরে চলে গেলাম।

সে দিন মধ্যাহ্নে ক্ষুধাতৃষ্ণায় ধুঁকতে ধুঁকতে রাস্তার ধারে একটা কুয়ো দেখতে পেয়ে সেখানে গেলাম, যদি একটু জল খেতে পারি। কিন্তু কি দিয়ে জল তুলব? আমার সঙ্গে-যে জল তোলবার মত কিছু নেই। চারদিক খাঁ খাঁ করছে রোদে। কুয়োটার কাছেই দুটো তিনটো খেজুর গাছ গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা তাদের তলায় একটু ছায়া বিছিয়ে দিয়েছিল। আমি সেখানে বসে মাথা বাঁচাতে চেষ্টা করলাম। সারাদিন রোদে ঘুরে ঘুরে আমি আর পারছিলাম না। ক্ষুধায় শরীর ঝিমঝিম করছে, পিপাসায় গলা কাঠ হয়ে আসছে। ভাবলাম, বসে থাকি, যখন কেউ জল ভরতে আসবে তখন তার কাছে চাইব।

কিন্তু যাদের জল নেবার কথা, তারা কখন জল নিয়ে চলে গেছে। এই অসময়ে এখন আর কে আসবে? তবু বসে রইলাম। যতক্ষণ কেউ না আসে,

উঠব না, এইখানেই বসে থাকব। বেলা যখন একটু হেলে পড়ল, দেখলাম, একটি মেয়ে কলসী নিয়ে আসছে। আমি উৎসুক হয়ে উঠলাম। মেয়েটি দড়ি টেনে টেনে জল তুলছিল আর ওর হাতের কাঁকন ঠুনঠুন করে বাজছিল। মেয়েটির মুখখানি আমার চোখে বড় ভাল লাগল।

কাছে ভিতে কোন লোক নেই, চারদিক ঝিমঝিম নিঃসাড়, কোথায় দূরে ঝোপের আড়ালে একটা ঘুঘু ডেকে চলেছে। আমি কুয়োর ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম। মেয়েটি আমাকে তখনও দেখতে পায় নি।

বললাম, ওগো মেয়ে, আমাকে একটু জল দেবে?

চমকে উঠে এদিক ওদিক তাকাল। কে কথা বলছে! শেষে আমার উপর চোখ পড়তেই ত্রস্ত হয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।

: ওগো মেয়ে, আমাকে একটু জল দেবে?

এবার চমকে উঠে সে আমার মুখের দিকে তাকাল। বুঝি ভাবছিল কোথাও কেউ ছিল না, এ হঠাৎ কোথা থেকে নেমে এল। কিন্তু বেশীক্ষণ সে আর তাকাতে পারল না। লজ্জায় মুখ রাঙা হয়ে গেল, চোখের পাতা দু’টি ভারী হয়ে নেমে এল। হঠাৎ সচকিত হয়ে সে একবার চারদিকে চেয়ে দেখল। না, কোথাও কেউ নেই।

: ওগো মেয়ে, আমাকে একটু জল দেবে? কথাটা যেন আমাকে নেশার মত পেয়ে বসেছিল। এবার সে আর সাড়া না দিয়ে পারল না। সলজ্জ কণ্ঠে বলল, এসো, হাত পাতো, আমি জল ঢেলে দিচ্ছি।

মেয়েটি জল ঢালতে লাগল, আর আমি অঞ্জলি ভরে পান করে চললাম। সে ঢেলেই চলেছে, আমারও নিবৃত্তি নেই। আমার তৃষ্ণা আর ক্ষুধা এই দিয়েই মিটিয়ে নিতে হবে যে। মেয়েটি জল ঢালতে ঢালতে কি মনে করে থেমে গেল। আমার মুখের দিকে একটু তাকিয়ে থেকে শেষে বলল, তুমি এত জল খাচ্ছো কেন? তোমার ক্ষিদে পেয়েছি বুঝি? তুমি কিছু খাও নি?

ওর চোখেও ধরা পড়ে গেছি। আমি কোন উত্তর দিলাম না।

: তুমি চলো, ঐ-যে কাছেই আমাদের বাড়ী। আহা, তুমি না খেয়ে থাকবে কেন?

: তুমি কাদের মেয়ে?

: আমরা? আমরা কনানীয়। আর তুমি?

: আমি ইহুদী।

মেয়েটির মুখের ভাব যেন কেমন হয়ে এল : ও, তুমি ইহুদী? তোমরা তো আমাদের বাড়ীতে খাও না?

আমি হেসে বললাম, না, আমি খাই। আমার কোন বাধা নিষেধ নেই।

মেয়েটি খুশী হয়ে বলল, তবে চলো।

: তুমি তো বলছ, কিন্তু তোমার বাড়ীর লোকেরা কি বলবে?

: আমার বাবা খুব ভালো লোক। অতিথিদের খাওয়াতে বড় ভালবাসেন। তিনি তোমাকে দেখে খুব খুশী হবেন।

শেষ পর্যন্ত ওর সঙ্গই নিলাম। পথ চলতে চলতে আমাকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার ঘর কোথায়? তুমি কোথায় থাকো?

আমি বললাম, আমার ঘর নেই। আমি পথে পথেই থাকি।

: সে কি গো! তোমার ঘর নেই? তোমার বাপ মা ভাই বোন … বউ, তারা সব কোথায়?

: কেউ নেই, আমার কেউ নেই।

: আহা!

নহিমার বাবা সত্যসত্যই খুব অতিথিবৎসল। আমাকে খুব আদর আপ্যায়ন করে খাওয়ালেন। শেষে আমার সমস্ত ইতিহাস শুনে বললেন, তোমার যখন কেউ নেই, আমার এখানেই থেকে যাও না। কেন এ বয়সে বৃথা এখানে ওখানে ঘুরে মরবে? আমার কাজের লোকের দরকার। তুমি চাষের কাজ জানো তো?

: হ্যাঁ, আমি তো সেই কাজই করতাম।

: তবে তুমি থেকেই যাও। তোমাকে দেখে আমার মনে হচ্ছে, তুমি কাজের লোক হবে। থেকেই গেলাম। আশ্রয় খুঁজে ফিরছিলাম, যিহোবার ইচ্ছায় আশ্রয় পেয়ে গেলাম। শুধু কি আশ্রয়? সঙ্গে সঙ্গে নহিমাকেও। আমাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে বেশী সময় লাগল না। নহিমার যেন আর দেরী সইছিল না। আর আমার? আমারও তাই।

নহিমা আর আমি প্রায়ই গোপনে গোপনে চুরি করে একত্রে মিলতাম। একদিন তেমনি এক সময় সে আমার মাথার চুলগুলো নিয়ে খেলা করতে করতে বলল, জান, আমি তোমাকে যখন প্রথম দেখি, তখনই তোমাকে —

আমি তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমিও কিন্তু তখনই তোমাকে—

নহিমা প্রশ্ন করল, কি তখনই আমাকে? বলেই ফেল না ছাই।

আমি আমার কথায় শেষ অংশ পূরণ করে দিলাম—আমি তখনই তোমাকে ভালবেসে ফেলেছিলাম।

নহিমা চোখ পাকিয়ে বলল, ও, এই তোমার কথা। আমি কিন্তু তা বলছিলাম না মোটেই। আমি বলছিলাম, আমি যখন তোমায় প্রথম দেখি তখনই তোমাকে একটা অপদার্থ বলে মনে করেছিলাম।

বা রে, আমি কি অপদার্থ নাকি?

অপদার্থ ছাড়া কি? এতদিন হয়ে গেল তোমার কোনই উদ্যোগ নেই। সেই প্রথম দিনে আমায় যদি ভালোই বেসে থাকো, তবে বাবার কাছে মনের কথাটা খুলে বলে মত নিয়ে নিতে পারো না?

: কি বলব?

: আহা, কি বলবে, সে কি আমি জানি! তুমি পুরুষমানুষ, তুমি জান না?

: আমি জানব কি করে? আমি কি আর কোন দিন এ কথা কাউকে বলেছি না কি?

: আর আমার কাছে বলার সময় তো খুব। তখন কি করে বলো? আগে আর কোন মেয়ের কাছে এ সব কথা বলেছিলে?

শেষ পর্যন্ত কি বলতে হবে না হবে, নহিমাই কিন্তু আমাকে শিখিয়ে পড়িয়ে তৈরী করে দিল। আর আমি মুখস্থ করা কথাগুলো কোন মতে গিয়ে আবৃত্তি করলাম।

বুড়ো শুনে মিঠিয়ে মিঠিয়ে হাসল। মনে মনে যেন ঠিক এই রকমই আশা করছিল।

শেষে বলল, বাবা, আমাদের সমাজের নিয়মে বিয়ে করব বললেই বিয়ে কথা যায় না। মেয়ে নিতে হলে মেয়ের মূল্য বাবদ শ্বশুর বা মেয়ের অভিভাবকের কাছে কয়েক বছর খাটনী খাটতে হয়। সাধারণত পাঁচ বছর, এমন কি কেউ কেউ সাত বছর পর্যন্ত খাটে। তবে আমি তোমাকে অত খাটাব না। যে-ভাবে কাজ করছ, সেই ভাবে আর দু বছর তুমি পেটে ভাতে কাজ করো। এই দু বছর কাজ দেখিয়ে যদি তুমি আমাকে খুশী করতে পারো, তাহলে আমিও তোমাকে খুশী করে দেব।

আমি ওই কথা শুনেই মহা-খুশী হয়ে ফিরে এলাম। বেরিয়ে আসতেই নহিমা এসে আমাকে পাকড়াও করল, কি হোল?

আমি কৃতিত্বের আনন্দে বললাম, হয়ে গেছে, সব ঠিক হয়ে গেছে। কোন চিন্তা নেই। নহিমা ধমক দিয়ে বলল, কি ঠিক হয়ে গেছে, ভাল করে বলো।

: তোমার মূল্য বাবদ-তোমার বাবার কাছে আমাকে দু বছরের জন্য কাজ করতে হবে। দু বছর পরে—

: দুবছর পরে দু-ব-ছ-র! ও বাবা, আর এত দিন এইভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে—? এই তোমার সব কিছু ঠিক হয়ে যাওয়া? তা তুমি কি বললে?

: আমি আবার কি বলব! এর পরে আমি আর কি বলতে পারি?

: নাঃ, তুমি একটা কি মানুষ! বাজারে একটা জিনিস কিনতে গেলে দরাদরি করতে হয় না! তোমাকে দু বছর বলল, আর তুমি কোন কথা না বলে তাই মেনে নিলে? ইস্, তোমার যদি একটু বুদ্ধি থাকে। আমি হোলে দু বছর থেকে অন্তত এক বছরে নামিয়ে আনতে পারতাম।

: তবে তুমি গেলেই পারতে।

: সেইটাই ভুল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সে ভুল তো আমার নয়, সৃষ্টিকর্তা কি ভুলেই- যে তোমাকে পুরুষ করে বানিয়েছিলেন!

বুঝলে মিকা, তখন আমি এমনি বোকাই ছিলাম। কিছুটা তোমার মত। তবে হ্যাঁ, এ কথাও ঠিক, নহিমার মুখের মিষ্টি গাল খাবার জন্যও বোকা সেজে থাকতাম। কিন্তু এখন হানানি কি আর সেই হানানি আছে! বাজারে এখন তার চালাক বলেই নাম। কিন্তু কেউ তো জানে না, এ সমস্তই নহিমার হাতের গুণ। নহিমা কিন্তু এতে বিশেষ খুশী নয়। সে বলে, আমি যেই বোকাটাকে এক দিন ভালবেসেছিলাম, আমার আদরের বোকাটা কোথায় গেল? এর চেয়ে আমার সেই তো ছিল ভাল। আজ আমার সুখের সংসার। একটি মেয়ে, দু’টি ছেলে আর নহিমাকে নিয়ে আমি পরম সুখে আছি। কিন্তু মিকা, আমার ভয় হচ্ছে, শুধু আমার নয়, অনেক ইহুদীর সংসারেই হয়তো আগুন লাগবে।

মিকা শঙ্কিত হয়ে প্রশ্ন করল, কোন হানানি, এ কথা বলছ কেন?

: আজ নিয়ম স্থাপন পর্বে যে-সমস্ত নিয়ম-সম্পর্কে সংকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, তা তোমার মনে আছে?

: না, সব এখন মনে পড়ছে না।

: এই নিয়মটি স্মরণ করো—পরজাতীয় লোকদের সাথে আপনাদের কন্যাদের বিবাহ দেব না, আর আমাদের পুত্রদের জন্য তাদের কন্যাও গ্রহণ করব না।

মিকা হানানিকে আশ্বস্ত করবার জন্য বলল, ও, এই কথা। আরে এ তো ভবিষ্যতের জন্য নিয়ম। যাদের বিয়ে ইতিপূর্বে হয়ে গেছে তাদের সম্পর্কে তো আর এ কথা বলা হয় নি। এ কি কখনও হতে পারে! এ নিয়ে তুমি মিথ্যে ভাবছ।

: তোমার কথা সত্য হোক, সর্বান্তঃকরণে সেই কামনাই করি। কিন্তু আমি আজ এই পর্বের শেষে জন কয়েক দায়িত্ব-সম্পন্ন ব্যক্তিকে যা বলাবলি করতে শুনলাম, তা কিন্তু সন্দেহ জাগাবার মতই। তুমি কি খবর রাখ, প্রাচীর গড়ে উঠবার পর জেরুজালেমে এই নিয়েই সবচেয়ে বেশী আলোচনা চলেছে? আর এ তো দু একটি পরিবারের প্রশ্ন নয়, এখানকার বহু ইহুদী পরিবার আজ পরজাতীয়দের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ।

: সেইজন্যই যা হয়ে গেছে, তা নিয়ে কেউ বেশী ঘাঁটাঘাঁটি করতে যাবে না। এটা চাপা পড়ে যাবে।

: মিকা, আমি কিন্তু তোমার মত নিশ্চিন্ত হতে পারছি না। তুমি তো নতুন ইহুদী, ইহুদী সমাজকে কিছুই চেন না। এই ইহুদী সমাজকে আমি যতই দেখি, ততই বিস্মিত। হচ্ছি। এরা ধার্মিক নয়, এরা ধর্মোন্মাদ, এরা বাইরের শুচিতা নিয়ে মাতামাতি করে, কিন্তু ভিতরে ক্লেদ জমিয়ে রাখে। এদের কূপমণ্ডূকতা ও অন্ধ আত্মাভিমান এদের পৃথিবীর সকল জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন ও কোণঠাসা করে রেখেছে।

হানানির কথা শুনে মিকা অবাক হয়ে গেল। সে বলল, হানানি, এ সব তুমি বলছ কি? কোন ইহুদীর মুখ থেকে ইহুদী সমাজ-সম্পর্কে এ রকম তীব্র মন্তব্য আমি আর কখনও শুনি নি। এ কথা সত্য, বালিলে বসে যে-আদর্শ ইহুদী সমাজের স্বপ্ন আমি দেখেছিলাম সে স্বপ্ন আমার ভেঙ্গে যাচ্ছে। কিন্তু ইহুদী সমাজের যে-চিত্র তুমি তুলে ধরলে, আমার মনে হয় সেটা যেন একটু বেশী অতিরঞ্জিত। তুমি কোন কারণে আজ একটু উত্তেজিত হয়েছ।

: না মিকা, এ উত্তেজনার কথা নায়। বহু দুঃখের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই এই সমস্ত কথা আমার মনে জাগে। আমার বিশ্বাস, আর কিছু দিনের মধ্যেই তুমিও আমার মতই তিক্ত সুরে এই সমস্ত কথাই বলতে শুরু করবে।

: তুমি আমায় ভয় দেখিও না হানানি। এমনিতেই মাঝে মাঝে আমার কেমন আতঙ্ক হয়। যেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। কত প্রশ্ন আজ আমার সামনে! কিন্তু কোনটারই সদুত্তর খুঁজে পাচ্ছি না।

: আরে দেখো, দেখো, কথায় কথায় আমাদের বাড়ীর কাছে এসে পড়েছি। যাবে মিকা আমাদের বাড়ীতে? দেখবে আমার নাহিমাকে আর আমার ছেলেমেয়েগুলোকে? চলো না, ওরাও তোমাকে দেখে খুব খুশী হবে।

মিকা একটু আপত্তি করে বলল, না ভাই, আজ নয়, আর এক দিন সময় করে আসব। আজ বাড়ীতে একটু কাজ আছে।

তার মনে পড়ছিল, শদরার সাথে আজ সারা দিন একবারও দেখা হয় নি। হানানির মুখে নহিমার কাহিনী শুনতে শুনতে শদরার কথা ওর বার বার করে মনে পড়ছিল। কে জানে, কি করছে শদরা! হয়তো ঘরের কোণে বসে কাঁদছে। ইহুদীদের পর্ব আর আনন্দ উৎসবের দিনে এমনি করেই ও আত্মগোপন করে থাকে। হয়তো সেই দিনই তার বাবিলের কথা বেশী করে মনে পড়ে। আহা, মিকার জন্য—শুধু মিকার জন্যই তো সে এই নির্বাসিত জীবন যাপন করছে।

ঘরের দিকে পা বাড়াল মিকা। তার মনটা মেঘাচ্ছন্ন। হানানি যে-আশঙ্কার কথা বলছিল, তার বোঝা তার উপরেও চেপে বসেছে। এ কথা-যে তার পক্ষেও সমভাবেই প্রযোজ্য। হানানিকে আশ্বস্ত করতে গিয়ে সে যেন আপনাকে আপনি আশ্বাস দেবার চেষ্টা করছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *