আট
সুসান রাজপ্রাসাদে পারস্যরাজ আর্তাসারেকসের পানপাত্র-বাহক নেহেমিয়া তাঁর দিনপঞ্জী লিখে চলেছিলেন—
আচার্য ইষ্রা সুসান রাজপ্রাসাদের নেহেমিয়ার নিকট থেকে সর্বশেষ এই লিপি প্ৰাপ্ত হয়েছেন।
“আমি হ্যাকলিয়ার পুত্র নেহেমিয়া। আমি সুসান রাজপ্রাসাদের একজন পরিচালক—আমি সম্রাটের পানপাত্র-বাহক।
হানানা ও আর কয়েকজন ইহুদী ভাই যাহুদা থেকে এসেছিলেন। আমি তাঁদের কাছে যাহুদা আর জেরুজালেমের ইহুদী ভাইদের কুশল-প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলাম। তাঁরা অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন, শেষে কপালে করাঘাত করে বললেন, হায়, হায় আপনি কি তাদের দুর্দশার কথা জানেন না?
: কই না, আমি তো কিছুই জানি না। কেমন করেই বা জানব?
তখন তাঁরা আমাকে তাঁদের মর্মান্তিক দুঃখের কাহিনী সবিস্তারে খুলে বললেন। তাঁদের কথা শুনে আমি মাটিতে বসে পড়ে কাঁদতে লাগলাম। কয়েকদিন ধরে অবিশ্রান্ত বিলাপ করলাম, উপবাস করলাম আর শেষের দিনটি সমস্ত রাত্রি ধরে আমাদের পিতৃপুরুষের প্রভু যিহোবার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করলাম,
হে প্রভু, হে স্বর্গরাজ্যের অধীশ্বর, হে মহান ও ভয়ংকর যিহোবা, তুমি আমার নিবেদন গ্রহণ কর। আমি জানি, যারা তোমাকে ভালবাসে, যারা তোমার আদেশ পালন করে চলে, তুমি তাদের সঙ্গে তোমার পবিত্র চুক্তি রক্ষা করে চলো, আর তাদের উপর তোমার করুণা দ্বারা বর্ধিত হয়।
হে প্রভু, তুমি প্রসন্ন হও। আমার দিকে তুমি তোমার চক্ষু-উন্মীলিত করো, আমার কথায় কর্ণপাত কর। তোমার এই অধম কিংকর দিবারাত্রি তোমার কাছে যে-প্রার্থনা জানাচ্ছে তুমি তা পূর্ণ করো।
হে প্রভু, আমরা ইসরায়েলের সন্তানগণ তোমার বিরুদ্ধে জঘন্য পাপ করেছি। আমরা তোমার আপন ভৃত্য মুসা মারফৎ আমাদের জন্য যে-সমস্ত অনুশাসন ও বিধিব্যবস্থা নির্ধারিত করে দিয়েছিলে, আমরা তা উল্লঙ্ঘন করেছি, এ কথা আমি স্বীকার করি। তুমি তোমার আপন ভৃত্য মুসাকে বলেছিলে, যদি তোমরা এই সমস্ত আজ্ঞা লঙ্ঘন কর, তবে আমি তোমাদের বিতাড়িত করে পৃথিবীর জাতিসমূহের মধ্যে বিকীর্ণ করে দেব। কিন্তু প্রভু, তুমি আরও বলেছিলে, আমি ক্রোধবশে তোমাদের যত দূরেই নিক্ষেপ করে থাকি না কেন, আবার আমি তোমাদের সবাইকে একত্র করে নিয়ে আসব সেই দেশে, যে-দেশে আমি তোমাদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম।
হে প্রভু, আমরা তোমার সেই অধঃপতিত সন্তান-দল। আমরা অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে তোমার প্রসাদ লাভের আশায় কম্পিত চিত্তে প্রতীক্ষমাণ আছি, তোমার বিপুল মহিমা ও সবল হস্ত আমাদের এই দুর্গতি থেকে উদ্ধার করবে।
হে প্রভু, তোমার এই আজ্ঞাবহ ভৃত্যের প্রার্থনায় কর্ণপাত করো। হে ভীষণ, তুমি ক্ষমাশীল হও, তোমার প্রচণ্ড ক্রোধ করুণায় বিগলিত হয়ে যাক। আমাদের এই দীর্ঘ দুঃখরাত্রির অন্তে নতুন প্রভাতের সূর্যোদয় দেখা দিক।
রাত্রি কখন ভোর হয়ে গিয়েছে। রাজপ্রাসাদের দেউড়ীর প্রহরীদের পাহারা পরিবর্তনের সময় নির্দেশক ঘণ্টা বেজে উঠল। আমি প্রার্থনা শেষ করে উত্থান করলাম।
রাজ-প্রাসাদের প্রমোদকক্ষে সম্রাট আর সম্রাজ্ঞী পাশাপাশি বসে হাস্যকৌতুক করছিলেন। আমি পানাত্ৰ-বাহকত নেহেমিয়া পাত্র পূর্ণ করে তাঁদের সামনে ধরলাম। গলিত সোনার মত উজ্জ্বল সেই দ্রাক্ষারস পাত্র পূর্ণ করে ফেনিয়ে ফেনিয়ে উঠছিল। তার মদির গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। সম্রাট আর সম্রাজ্ঞী অনুগ্রহের হাসি হেসে আমার হাত থেকে সুরাপাত্র গ্রহণ করলেন। কিন্তু আমার প্রিয় প্রভু সম্রাট আর্তাসারেকস, সেই পাত্র তাঁর ওষ্ঠে স্পর্শ করা মাত্র আমার দিকে চেয়ে চমকে উঠে আস্তে তার হাতের পাত্র নামিয়ে রাখলেন। রানী বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাঁর মুখের দিকে তাকালেন।
: নেহেমিয়া, তোমার কি হয়েছে? তোমার মুখ অমন শুকনো কেন? তোমার চোখ অমন ভারী ভারী কেন? এই আলোকোজ্জ্বল প্রভাতে তোমার মুখে এ কি বিষাদের ছায়া? বল নেহেমিয়া, কি হয়েছে? তুমি কি অসুস্থ?
রানী দরদ-ভরা চোখে আমার দিকে তাকালেন।
: না প্রভু, আমি তো অসুস্থ নই।
: তবে তোমার কি হয়েছে, বলো। নিশ্চয়ই তোমার প্রাণে কেউ আঘাত দিয়েছে। সেই ব্যথা তুমি চেপে রাখতে পারছ না। নেহেমিয়া, তুমি চিরদিন আনন্দময়, তুমি সবাইকে আন্দ দিয়ে এসেছো। কিন্তু আজ তোমার কি হয়েছে? তোমার এমন চেহারা তো আমি আর কোনদিন দেখি নি।
আমি ম্লান হাসি হেসে বললাম,
: সম্রাট, যিহোবা আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন। আপনার জীবন আনন্দময় হোক। আমার প্রতি আপনার অনুগ্রহ অপরিসীম। কিন্তু আপনিই বলুন, আমাদের মত লোকের জীবনে কি সত্য সত্যই আনন্দ থাকতে পারে? আপনি চিরদিন আমার হাসি মুখ দেখে এসেছেন। আমাদের হাসতে হয় তাই হাসি, এ হাসি তো অন্তর থেকে উঠে আসে না। এ হাসি শুধুই লোক-দেখানো হাসি।
কেন নেহেমিয়া, সুসানে কি আনন্দ নেই?
: আছে সম্রাট, কিন্তু হতভাগ্য ইহুদীর জন্য নয়। আমরা কি করে ভুলে থাকবো যে, আমাদের পবিত্র নগর যার বুকের মাঝে আমাদের পিতৃপুরুষেরা চিরঘুমে ঘুমিয়ে আছেন, সেই নগর বিধ্বস্ত, উচ্ছন্ন, শ্রীহীন! তার প্রাচীর ভগ্ন ধূলি-লীন, পুর-দ্বারগুলো ভস্মীভূত। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে জেরুজালেম নগরীর নাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে বসেছে। আর আমরা আমাদের সেই প্রাণপ্রিয় পবিত্রভূমি থেকে চিরতরে নির্বাসিত। আমরা তবু হাসি, আনন্দ করি, উৎসব করি—কিন্তু এই হাসি আর আনন্দ আর উৎসবে আমাদের অন্তর কি কখনও সাড়া দিতে পারে?
সম্রাট মাথা নীচু করে বসে রইলেন। কতক্ষণ কোন কথা বললেন না। সুরাপাত্র একদিকে অবহেলিত হয়ে পড়ে রইল। আর আমি দেখলাম রানীর চোখ দু’টি ছলছল করে উঠল।
: কিন্তু নেহেমিয়া, এ তো শুধু আজকের কথা নয়। তোমার মনের এতদিনকার পুঞ্জীভূত বেদনা আজই বা কেন এমন করে জেগে উঠলো? কই, আমি তো আর কোনদিন তোমাকে এমন দেখি নি।
আমি বললাম : আপনি সংগত কথাই বলেছেন। আচমকা দক্ষিণ থেকে একটা দমকা বাতাস এসে আমার সেই চাপা-দেওয়া আগুনটাকে আবার নতুন করে জ্বালিয়ে তুলেছে। ক’দিন হয় জেরুজালেম থেকে আমার কয়েজন ইহুদী ভাই এসেছিলেন। তাঁদের দসঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসা করলাম—যাহুদা আর জেরুজালেমের বার্তা কি? যারা ওখানে ছিল, আর যারা বাবিল থেকে ফিরে গিয়েছে, আমার সেই সব ভাইয়ের কুশল তো?
: তারা কি বলল?
: তারা যা বলল, তার চেয়ে বেশী কাঁদল। ওরা কথা বলছিল আর ওদের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। ওরা বলল—আমরা স্বদেশে পরবাসী। বিদেশী রাজপুরুষের শাসন আর প্রতিবেশী পরজাতীয়দের উৎপাতে আর অত্যাচার আমাদের প্রাণান্ত। আমাদের ভাল ভাল জমি যা কিছু ছিল, ওরা জোরজুলুম করে সব দখল করে নিয়েছে। নিজেদের বিত্ত তাদের হাতে ছেড়ে দিয়ে আমরা এখন তাদের কাছে গোলামী করে মরছি। ওরা আমাদের জাতির ইতিহাসকে মুছে ফেলে দিতে চাইছে। আমরা আমাদের জেরুজালেমকে বাসযোগ্য করতে আর প্রাচীর গেঁথে তুলতে মন দিলাম। তখন ওরা তাতেও বাদ সাধল। ওরা আমাদের ভয় দেখিয়ে হুমকি দিল। তাতেও যখন আমরা নিবৃত্ত হোলাম না তখন ওরা আমাদের বিরুদ্ধে সুসানে সম্রাটের কাছে অভিযোগের পর অভিযোগ পাঠাতে লাগলো। ওরা লিখল – আমরা পারস্যরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছি, আমাদের যেন কোনমতেই নগরের পুনর্গঠন করতে বা প্রাচীর গড়ে তুলতে দেওয়া না হয়। আমাদের দুর্ভাগ্য পারস্যরাজ আমাদের এই মিথ্যা কুৎসাকারীদের কথাই সত্য বলে গ্রহণ করলেন আর তাঁর আদেশে আমাদের আরব্ধ কাজ বন্ধ হয়ে গেল।
ওরা বলল, “চারদিক থেকে আমাদের উপর আঘাতের পর আঘাত পড়ছে। আর আমরা তিলতিল করে মরে চলেছি। এই ভাবেই যদি চলতে থাকে, তাহলে ইহুদী জাতি
পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।”
সম্রাট, আমার বুকের মর্মদেশে ওরা এক বিষাক্ত তীর বিদ্ধ করে দিয়ে গেল। সেই জ্বালায় আমি ছটফট করে মরছি। আর আজ যদি আমার ওষ্ঠাগ্রে হাসি ফুটিয়ে তুলতে না পারি, সে কি আমার দোষ?
রানী, যাঁর হাতের আঙ্গুলগুলো মুদ্রিত পদ্মফুলের কুঁড়ির মতো রাজার করতলে ঘুমিয়েছিল তিনি এবার একটু বিস্ময়- আর প্রশ্ন-ভরা দৃষ্টি নিয়ে রাজার মুখের দিকে তাকালেন। রানীর এই অনুচ্চারিত প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য সম্রাট বললেন, ওরা মিথ্যা বলে নি। হ্যাঁ, আমি জেরুজালেম আর বাবিলের ইহুদীদের কাছ থেকে অনেক আবেদন পেয়েছি, তবু আমি আমার এই আদেশ প্রত্যাহার করতে পারি নি। আমার সাম্রাজ্যের মধ্যে ইহুদী- জাতিকে সুখী ও শান্তিপূর্ণ জীবন থেকে বঞ্চিত করে রাখবো, এ আমার কখনোই কাম্য ছিল না। কিন্তু যাহুদায় বাবিলে আর সুসানে ইহুদীদের প্রতিপক্ষ এতই প্রবল ছিল যে, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এ আদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে নি। নেহেমিয়া, তোমার মনে আছে, একথা তোমাকে আমি একদিন বলেছিলাম?
: মনে আছে সম্রাট।
: নেহেমিয়া, কিছুদিন আগে তোমাকে আমি বলেছিলাম, আমি তোমাদের জন্য আমার পক্ষে যতদূর সম্ভব চেষ্টা করে চলেছি। আজ আমার চেষ্টা অনেকখানি সফলও হয়েছে। এখন আমি যদি সম্মানিত কোরস ও দারিয়ুসের অনুমতিপত্র প্রাসাদে রক্ষিত প্রাচীন দলিলপত্র ঘেঁটে উদ্ধার করতে পারি, তাহলে আমার সংকল্পকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। নেহেমিয়া, তোমার মনে আছে, তোমাকে আমি একথা বলেছিলাম?
: মনে আছে সম্রাট।
: তবে এবার শোন, নেহেমিয়া। আজ ইহুদী সমাজের পবিত্র নিসান মাসের প্রথম দিনে আমি আমার প্রিয় নেহেমিয়ার জন্য একটি পরম মহার্ঘ উপহার সংগ্রহ করে রেখেছি। তাই দিয়ে আমি তোমার মুখে হাসি ফোটাব। শোন নেহেমিয়া, সেই অনুমতিপত্র সম্প্রতি উদ্ধার করা গেছে। আর আমি আমার সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। তোমার কাছেই সর্বপ্রথম আমি সেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলাম। নেহেমিয়া, বল, এবার তোমার মুখে হাসি ফুটবে তো?
সম্রাটের কথা শুনে আমি যেন জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। আমার এতদিনের স্বপ্ন, শুধু আমার নয়, লক্ষ লক্ষ ইহুদীদের স্বপ্ন তবে কি সত্য-সত্যই সত্য হতে চলেছে? সম্রাট আমাকে হাসতে বললেন। আমার কিন্তু প্রাণ খুলে উচ্চস্বরে কেঁদে উঠতে সাধ হচ্ছিল। কিন্তু আমি কোন কিছুই করলাম না। শুধু মনে পড়ে উন্নত হয়ে তাঁদের পায়ের তলায় ভেঙ্গে পড়লাম। আমার সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, পবিত্র নিসান মাসের প্রথম দিবসের সেই স্মরণীয় প্রভাতে যিহোবার আশীর্বাদ যেন এই দু’জনের মধ্য দিয়েই মূর্তিমান হয়ে উঠেছিল।
সম্রাট দু’হাত বাড়িয়ে আমাকে মাটি থেকে টেনে তুললেন।
: নেহেমিয়া, স্থির হয়ে বসে আমার কথা শোনো। আমার আরও বলার কথা আছে।
আবেগে আমার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে, আমার কথা বলবার শক্তি নেই। আমার দু চোখ ফেটে অশ্রু বেরিয়ে আসছে। সামলাতে পারছি না। আমার অবস্থা বুঝতে পেরে তাঁরা দু’জনের দু’জনের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
: নেহেমিয়া, বাবিলের ইহুদীদের নেতা আচার্য ইষ্রার কাছে সেই অনুমতিপত্র পাঠাব। আমি তার একটা খসড়া করেছি। এর পেছনে আমার সাতজন মন্ত্রীর সম্মতি রয়েছে। এই খসড়া তুমি শোনো। শুনলে তুমি সুখী হবে।
রাজাধিরাজ আর্তাসারেকস বাবিলের ইহুদী-নেতা আচার্য ইষ্রাকে জানাচ্ছেন,
বাবিল-নিবাসী ইহুদী-সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিগণ, যদি তাঁরা ইচ্ছা করেন, শ্রেণী- ও বৃত্তি-নির্বিশেষে সকলেই আপনার সঙ্গে যাহুদা অথবা জেরুজালেমে ফিরে যেতে পারেন। আমার মন্ত্রী-বর্গ ও আমি ইহুদীদের প্রভুর উদ্দেশে স্বেচ্ছায় যে-স্বর্গ ও রৌপ্য প্রদান করব, আর আপনারা সমগ্র বাবিল প্রদেশ থেকে এই উদ্দেশ্যে যে-পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য সংগ্রহ করতে পারবেন এবং জেরুজালেমের প্রভুর মন্দিরের জন্য স্বেচ্ছায় যে যা নিবেদন করে, আপনারা সমস্ত কিছুই আপনাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবেন। এই অর্থ দিয়ে আপনারা বৃষ, মেষ, মেষশাবক এবং ভক্ষ্য ও পেয় নৈবেদ্য কিনে জেরুজালেমের প্রভুর যজ্ঞবেদীতে উৎসর্গ করতে পারবেন। অবশিষ্ট স্বর্ণ, রৌপ্য ও অন্যান্য দ্রব্যাদি আপনিও আপনার ইহুদী ভাইরা যে-ভাবে ভাল মনে করেন সেই ভাবেই ব্যয় করতে পারবেন। আর আপনাদের প্রভুর মন্দিরে সেবার জন্য যে-সকল পাত্র আপনাদের দেওয়া হয়েছে, আপনারা তা জেরুজালেমের প্রভুর নিকটে সমর্পণ করবেন।
আর আমি সম্রাট আর্তাসারেকস, আমার ফোরাত নদীর অপর তীরস্থ এলাকার সকল কোষাধ্যক্ষদের এই মর্মে নির্দেশ দিয়ে দিচ্ছি, আপনারা আপনাদের উদ্দেশ্য- সিদ্ধির জন্য তাদের কাছে যা যা চাইবেন, তারা অবিলম্বে আপনাদের তা দেবে। এক শত তালন্ত পর্যন্ত রৌপ্য, এক শত কোর পর্যন্ত গম, এ শত বাৎ পর্যন্ত দ্রাক্ষারস, একশত বাৎ পর্যন্ত তেল ও অনির্দিষ্ট পরিমাণ লবণ তারা অকুণ্ঠভাবেই আপনাদের দেবে। এই প্রসঙ্গে আরও বিজ্ঞাপিত করা হচ্ছে যে, যাজকদের, লেবীয়দের, গায়কদের, দ্বারপালদের নথী-নীয়দের এবং মন্দিরের কর্মে নিযুক্ত অন্যান্য লোকদের নিকট থেকে কোনরূপ রাজস্ব, কর, কিংবা শুল্ক আদায় করা বিধি-সংগত বলে বিবেচিত হবে না।
সম্রাট তাঁর অনুমতিপত্রের খসড়া পাঠ শেষ করে আমার দিকে মুখ তুলে তাকালেন।
: নেহেমিয়া, এবার তুমি সুখী?
আমি আর কি বলব! শুধু বললাম, সম্রাট, এ সৌভাগ্য-যে কল্পনাতীত। আপনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা আমি যে খুঁজে পাচ্ছি না।
: তোমার আর ভাষা খুঁজে খুঁজে কষ্ট করতে হবে না নেহেমিয়া। আমি এমনিতেই বুঝে নেব। কিন্তু বল, আর তোমার কি চাই? নেহেমিয়া, তোমার নিজের জন্য কিছু চাও।
এবার রানী উৎসুক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখেও যেন সেই একই কথা। একবার ইতস্তত করলাম। কিন্তু ইতস্তত করলে তো চলবে না। বললাম,
: সম্রাট, আপনি বাবিল-নিবাসী ইহুদীদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু আপনার বিস্তৃত সামাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন সম্পদে আরও কত ইহুদী নির্বাসিত জীবন যাপন করছে, তাদের গতি কি হবে?
: সংগত কথাই বলেছ। বেশ, আমি তাদেরও অনুমতি দেব। কিন্তু কই নেহেমিয়া, তুমি হেতা নিজের জন্য কিছুই চাইলে না?
: আমার নিজস্ব প্রার্থনাও তো এরই মধ্যে রয়ে গেছে, আপনি কি তা লক্ষ করেন কি?
: কই না তো, আমাকে খুলে বল নেহেমিয়া।
: সম্রাট, আমি তো বাবিল-নিবাসী নই, আমি সুসানের অধিবাসী। আপনার সর্বশেষ অনুমতির মধ্য দিয়ে আপনি আমার মুক্তিও ঘোষণা করেছেন। এইবার আমি আমার পবিত্রতম তীর্থভূমি, আমার স্বদেশে ফিরে যেতে পারব। সম্রাট চমকে উঠলেন,
: নেহেমিয়া, তুমি বলছ কি, তুমি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?
আমি মাথা নীচু করে রইলাম।
: তুমি মুক্তি চাইছ, তুমি কি আমার দাস? তুমি যে আমার অন্তঃপুরের ভাগ্যবিধাতা, তুমি আমার সুখ-দুঃখের সঙ্গী, তুমি আমার প্রিয়তম বন্ধু। তোমাকে ছেড়ে তো কোনদিন আমি থাকি নি। তুমি ছাড়া আমার চলবে কি করে?
আমি মাথা নীচু করে রইলাম।
: নেহেমিয়া, তুমি না গেলেও জেরুজালেমে ইহুদীদের কাজ আটক থাকবে না। কিন্তু তুমি এখানে নেই, একথা-যে আমি ভাবতেও পারি না।
বললাম : সম্রাট, আমি না গেলে ইহুদীদের কাজ আটকে থাকবে না, একথা ঠিক; কিন্তু আমি যদি এই দুর্দিনে আমার জাতির সেবা করবার সুযোগ পাই, তাহলে-যে আমার জীবন ধন্য হয়ে যাবে। এই সৌভাগ্য থেকে আমাকে বঞ্চিত করবেন না।
সম্রাট একটু সময় চুপ করে রইলেন। শেষে ম্লান হাসি হেসে বললেন,
: নেহেমিয়া, জান তোমার প্রার্থনা অপূর্ণ রাখা আমার পক্ষে কোনদিনই সম্ভব নয়। তবে যাও, তুমিও যাও। কিন্তু তার আগে তোমাকে আমার আরও কিছু দেবার আছে।
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাঁর মুখের দিকে তাকালাম।
: হ্যাঁ, আরও কিছু দেবার আছে। সে এক সুকঠিন দায়িত্ব। সম্রাট আর্তাসারেকস তাঁর বিশ্বস্ত ও সুদক্ষ রাজভৃত্য নেহেমিয়াকে জেরুজালেমের তীরশথের পদে নিযুক্ত করলেন। তুমি জেরুজালেমে ফিরে গিয়ে অবিলম্বে সেই হতভাগ্য নগরীর পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করো। জেরুজালেমের শাসনের দায়িত্ব তোমার হাতে ন্যস্ত থাকলে আমিও নিশ্চিন্ত হতে পারব।–থাক, থাক, তোমার আর কৃতজ্ঞতার ভাষা খুঁজতে হবে না। কিন্তু নেহেমিয়া, আমরা তোমার কাছে কি করেছিলাম যে, তুমি আমাদের এই কঠিন শাস্তি দিয়ে গেলে?
আমি বললাম : সম্রাট, আপনার অপরিসীম স্নেহের মর্যাদা রক্ষা করতে পারলাম না। অকৃতজ্ঞ ভৃত্য বলেই চিরদিন মনে রাখবেন।
