চৌদ্দ
: তোমাদের ঘর পছন্দ হয়েছে মিকা?
: তীরশথ, আমার পছন্দ অপছন্দের বালাই নেই। আমি একটু মাথা গুঁজে পড়ে থাকতে পারলেই সন্তুষ্ট।
: তুমি তো সন্তুষ্ট, কিন্তু দানিয়েল?
মিকা হেসে বলল, দানিয়েল কি এখনও দানিয়েলই আছে? আমাদের নতুন সংসার পত্তন করবার সঙ্গে সঙ্গে এখন সে নতুন হয়ে দেখা দিয়েছে। তাকে এখন দেখলে আপনি চিনবেন?
: তাই তো, সেই কবে থেকে জিজ্ঞাসা করব ভাবছি। কিন্তু এমন সমস্ত গোলমেলে ব্যাপার এসে জোটে যে, শেষে আর মনেই থাকে না। আর দু চার দিনের মধ্যেই তো প্রাচীর তোলার কাজ শুরু হয়ে যাবে, তখন আর সময় পাব কিনা কে জানে! শেষ কালে হয়তো আর শোনাই হবে না। না, তুমি এখনই বলে ফেল।
: কি বলব?
: বারে, দুষ্টু ছেলে, তুমি জান না কি বলবে! বলবে তোমার দানিয়েলের কথা।
: কি আশ্চর্য তীরশথ, আপনি আমার চেয়ে বয়সে বড়, মর্যাদায় বড়, গুণে বড়— সব দিক দিয়েই বড়, আপনি আমাদের সকলের শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্র। আপনার সঙ্গে এ সব কথা বলা কি আমার শোভা পায়? অথচ কি আশ্চর্য দেখুন, আপনাকে বলবার জন্যই মনটা কেমন ছটফট করছিল।
: বাঃ, তাই নাকি? শুনে বড় খুশী হলাম। এখন বলো, তোমার দানিয়েলের আসল নামটা কি?
: শদরা।
নেহেমিয়া একটু চমকে উঠলেন
: দাঁড়াও, দাঁড়াও মিকা, উহুঃ, এ নাম তো ইহুদী নাম নয়। মিকা, তুমি বলছ কি? এ নাম-যে ক্যালদীয়!
মিকা হেসে বলল, ক্যালদীয়ই তো। শদরা তো ইহুদী নয়, শদরা-যে ক্যালদীয়।
: তুমি বলছ কি? ক্যালদীয়? ছি, ছি, ইহুদীর চিরশত্রু ক্যালদীয় হয়ে সে তোমার সঙ্গে এসেছে কেন? তুমিই বা তাকে নিয়ে এলে কেন? তার বাপ, মা, আত্মীয়স্বজন, স্বজাতি সব রইল বাবিলে, আর সে তোমার সঙ্গে কেন?
মিকা মাথা নীচু করে বলল, আমরা পরস্পরকে ভালবাসি।
এ কেমন ভালবাসা! নেহেমিয়া যেন গর্জন করে উঠলেন, এ কেমন ভালবাসা, যে- ভালবাসা সমাজ, স্বজাতি আর ধর্মকে ভুলিয়ে দেয়। এ কেমন মেয়ে?
মিকা মাথা তুলল না, কিন্তু দৃঢ়কণ্ঠে বলল,
: তীরশথ, সে আমার স্ত্রী, সে তো আমার সঙ্গে আসবেই।
: স্ত্রী? তুমি তাকে বিয়ে করেছ?
: হ্যাঁ, করেছি। একটু আমতা আমতা করে বলল মিকা।
: ওর বাপ মা এতে সম্মতি দিয়েছিলেন?
: না, তাঁদের অমতেই।
: তবে এ বিয়ে নয়। আন্য যে-কোন নাম দিতে পার, কিন্তু এর নাম বিয়ে নয়। মেয়ে বাপের সম্পত্তি। তার সম্পত্তি তুমি চুরি করে নিয়ে এসেছ, একে বিয়ে করা বলা চলে না।
: তীরশথ, শদরা শিশু নয়। সে বিচারবুদ্ধি-সম্পন্ন পূর্ণবয়স্কা।
নেহেমিয়া ভ্রূ কুঞ্চিত করে বললেন, তুমি ভুল করেছ। মেয়েরা কখনও ছেলে নয়, মেয়ে মেয়েই। যতই বয়স হোক না কেন, পিতা বা স্বামীর ইচ্ছার দ্বারাই তাদের চালিত হতে হয়। স্বামীর বিচার-বুদ্ধি তাদের জন্য নয়। এইটাই যিহোবার বিধান। আর এই নিয়মের উপরেই সমাজশৃঙ্খলা দাঁড়িয়ে আছে। আর এ না হলে সমাজ ভেঙ্গে তচনচ্ হয়ে যাবে।
মিকার মনটা বিস্বাদ হয়ে গেল। এ রকম সে কখনই ভাবতে পারে নি। নেহেমিয়ার মত এমন হাসিখুশী, উদার স্বভাবের লোক, অথচ—। মিকা আর কোন কথা বলল না। নেহেমিয়াও চুপ করে রইলেন। দু’জনের মাঝখানে একটা গুরুভার নিস্তব্ধতা থম থম করতে লাগল।
হঠাৎ খচ করে কি একটা যেন নেহেমিয়ার বুকের মধ্যে কাঁটার মত বিঁধল। সদ্যোস্নাত দানিয়েল বিদ্যুতের মত তার চোখের সামনে ঝিলিক মেরে উঠল। সঙ্গে সঙ্গেই কত কথা মনে পড়ল—সেই অস্থিরতা, সেই কামনাঘন রাত্রিগুলো, সেই যন্ত্রণা, সেই অনুতাপ। সাধুপুরুষ, প্রবীণ হয়েও তুমি সেদিন এই কালি গায়ে মেখেছিল। তোমার লজ্জা হয় না, আজ তুমি ন্যায়দণ্ড হাতে দিয়ে এই তরুণের বিচার করতে বসেছ?
নেহেমিয়া মিকার মুখের দিকে চাইলেন। পঞ্চমীর চাঁদ মৃদু জ্যোৎস্না বিকীর্ণ করছিল। এক টুকরো মেঘ চাঁদকে ঢেকে ফেলেছে। মিকার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ মেঘটা সরে গেল, আর একমুঠো জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়ল মিকার মুখে। অপূর্ব সুন্দর মুখখানি। মুগ্ধ হয়ে গেলেন নেহেমিয়া, আর কোনদিন তো তাকে এমন করে লক্ষ করে দেখেন নি। এ মুখ দেখে শদরা যদি বিশ্বসংসার ভুলে গিয়ে থাকে, সে কি তার দোষ? হঠাৎ মনে পড়ল, মিকা আর শদরা, বুঝি পরস্পরকে ভালবাসবার জন্যই ওদের সৃষ্টি হয়েছিল। এইটাই সহজ, এটাই সুন্দর, এইটাই স্বাভাবিক।
মিঠে মিঠে বাতাস বইছে। আর সেই বাতাসে কি একটা বুনো ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। নেহেমিয়ার কঠিন মনটা, কে জানে কেন, নরম আর শিথিল হয়ে এল। কে যেন তাঁর কানের কাছে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল— নেহেমিয়া, এত বেশী বিচার করতে যেয়ো না। বিচার নয়, দরদ দিয়ে দেখ। ভাগ্যিস্, কেউ অপরের মনটাকে দেখতে পায় না। কিন্তু তোমার কাছে তো তুমি ধরা পড়ে গিয়েছ। সেইদিন সেই অস্থির উদভ্রান্ত বিনিদ্র রজনীতে তোমার দেহের বেলা-ভূমিতে দানিয়েলের সুকোমল ভঙ্গুর দেহখানি যদি তরঙ্গের মতই এসে ভেঙ্গে পড়ত, তখন তুমি—তুমি কি করতে? কার চোখে ধুলো দেবে ভণ্ড? তুমি কি যিহোবার মত পবিত্র? তুমি কি যিহোবার মত নির্মল আর নির্মম? তুমি মানুষ, সাধারণ মানুষ, এ শিক্ষা কি তোমার এখনও যথেষ্ট হয় নি!
নেহেমিয়ার শক্ত আঁটসাঁট মনটা যেন কেমন ঢিলে আর এলোমেলো হয়ে এলো। মনের তন্তুগুলো যেন আলগা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে, নেহেমিয়া সামলাতে পারছে না। গুছিয়ে নিতে পারছেন না।
সংসারে আপনার বলতে কেউ নেই নেহেমিয়ার। স্নেহ, ভালবাসা, প্রেম ঢেলে দেবার পাত্র কোনদিনই তিনি খুঁজে পান নি। বুক যেন ভারী পাথর হয়ে আছে। আজ তিনি অনেকের শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্র। কিন্তু ‘আপনার’ বলে কাকে তিনি জড়িয়ে ধরবেন? স্বর্ণময় উজ্জ্বল পানপাত্র, লোকের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, কিন্তু ভেতরের প্রাণরস দ্রাক্ষাসুরা নিঃশেষিত নয় কোন দিনই, কিন্তু তিনি তার স্পর্শ পান নি। আর আজ মিকাকে কি-যে ভাল লাগছে তাঁর! কেন? তিনি তো জানতেন না মিকাকে ভেতরে ভেতরে তিনি কখন এতো ভালবেসে ফেলেছেন! মেন সুন্দর, এমন মধুর, এমন বিশ্বস্তপ্রাণ একটি ছেলে যদি তাঁর থাকত!
মিকা চমকে উঠল, নেহেমিয়া কখন তাকে আদর করে কাছে টেনে নিয়েছেন। মিকা যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না। বিস্ময়ে, সঙ্কোচে আর আনন্দে তার মুখের দিকে চেয়ে মিকা বলল, কি, কি তীরশথ?
: কিছু না, কিছু না মিকা, তোমাকে যা বলেছি সব ভুলে যাও। তোমরা দু’জন সুখে থাক, সুখী হও।
এ কি বলছেন তীরশথ? হঠাৎ এক মুহূর্তের মধ্যে এমন পরিবর্তন তাঁর কি করে হোল? সে তার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
পরক্ষণেই নেহেমিয়া চিন্তিত আর বিমর্ষ মনেই বললেন,
: কিন্তু মিকা, আমার ভয় হয়, তোমরা হয়তো অনেক দুঃখ পাবে।
: কেন তীরশথ!
: কেন, সে কি তুমি বোঝ না? কিন্তু তুমি আমার একটা কথা শোন মিকা। তুমি ওর—কি যেন ওর নাম শদরা না?
: হ্যাঁ, শদরা।
: তুমি লোকের কাছে শদরার আসল পরিচয় দিও না। ও যেন সবার কাছে আপনাকে ইহুদী মেয়ে বলেই পরিচয় দেয়।
: কেন? কেন একথা বলছেন?
: তুমি কি বোঝ না, প্রতিটি ইহুদী প্রতিটি ক্যালদীয়কে কি বিষদৃষ্টিতে দেখে? ও- যে আজ ছিন্নমূল। সকলের ঘৃণা আর বিদ্বেষের পাত্রী হয়ে এই সমাজে ও কি করে বাঁচবে?
: কেন আমি তো আমি। আমার ভালবাসা ওর জীবনকে কি পূর্ণ করে তুলতে পারে না?
: তা কি কখনও হয় মিকা? সংসারের সবাইকে বাদ দিয়ে সবার বিরুদ্ধতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন আর একজনের জীবনকে পূর্ণ করে তুলতে পারে না।
এসব কথা মিকা কখনোই খুব ভাল করে ভেবে দেখে নি। কিন্তু তার মনে হোল, নেহেমিয়া যেন ব্যাপারটাকে একটু বেশী বাড়িয়ে দেখছেন। প্রতিটি ইহুদী প্রতিটি ক্যালদীয়কে ঘৃণা করে, একথা কি ঠিক? তাই যদি হবে, মিকা কি করে শদরাকে এমন করে ভালবাসল? আচ্ছা, তার কথা না হয় বাদই গেল। কিন্তু নেহেমিয়া? নেহেমিয়া কি ঘৃণা করে শদরাকে
নেহেমিয়ার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে এইসব কথা ভাবতে ভাবতে মিকা তার ঘরের দিকে ফিরে চলেছিল। আজ তাদের জেরুজালেমের প্রথম দিন। সমস্তটা দিন লোকজনের ভিড়ে, আনন্দে উত্তেজনায় কেমন করে-যে কেটে গেল! কিন্তু জেরুজালেমে এসে শদরার প্রথম দিনটা কেমন কাটল, সে খোঁজ কি সে নিয়েছে? মনে পড়ল মন্দিরের সামনে প্রভুর বন্দনার সময় শদরার সেই দুর্বোধ একগুঁয়েমি। কেন অমন করল সে? মাটির উপর লুটিয়ে পড়ে কেন অমন করে সে কাঁদল? আর তারপর নেহেমিয়ার ঘোষণা শুনে সবাই যখন আনন্দে উন্মত্ত, তখন সকলের একান্তে গাছটার তলে বসে অমন বিষণ্ন মনে কি কথা ভাবছিল সে? আহা, হয়তো বা ওর দেশের কথা আর বাবা, ভাইবোনদের কথা মনে করে ওর মন অমন উতলা হয়ে উঠেছিল। কিন্তু মিকা তো তাকে কোন সান্ত্বনা-ই দেয় নি। কি নিষ্ঠুর আর স্বার্থপর সে। আজ ঘরে গিয়ে মিকা ওর মুখে হাসি ফোটাবেই। মিকার মনে পড়ল শদরা কতদিন তাকে বলেছে—মিকা, তুমি কি-যে যাদু জান, যখন তুমি আমার কাছে এসে দাঁড়াও, আমার কি-যে হয়, আমি একটুও মন ভার করে থাকতে পারি না। আমার সমস্তটা মন যেন একসঙ্গে হেসে ওঠে।
ঘরের কাছে এসে বন্ধ দরজাটার উপর ঘা মারল মিকা। সঙ্গে সঙ্গে আর একটি রাত্রির কথা মনে পড়ে গেল। সে ছিল এক অন্ধকার রাত্রি। আজকের মত চাঁদের আলো ছিল না। কিন্তু সেই অন্ধকারের সরোবরে যেন আলোর পদ্ম ফুটে উঠল। সেদিন সেই প্রথম ওরা আপনাদের নিবেদিত দেহ পরস্পরের কাছে উৎসর্গ করল। সেই প্ৰথম পরিচয়। রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল মিকা।
আজ এতদিন বাদে তাদের দু’জনের মাঝখান থেকে দানিয়েল চলে গেছে। এতদিন বাদে আজ সে ফিরে পাবে শদরাকে। ছদ্মবেশের কৃত্রিম বাঁধ ভেঙ্গে গিয়ে তার যৌবন বন্যা দুকূল ছাপিয়ে উছলে উঠছে। আজ মিকা কোন সংকোচ রাখবে না, কোন সংযম মানবে না, ঝাঁপিয়ে পড়বে সেই বন্যায়— ডুবে যাবে, তলিয়ে যাবে, মরে যাবে। সেই মধুর মরণ মরবার জন্য তার প্রতিটি অঙ্গ উন্মুখ হয়ে উঠেছে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজাটা খুলে গেল। শদরা এসে দাঁড়িয়েছে। ঠিক সেই রাত্রির মতই মিকা সাগ্রহে দুহাত বাড়িয়ে তাকে গ্রহণ করল। কিন্তু কই, শদরা কোন সাদা দিল না তো! একখানা আড়ষ্ট দেহ, যেন জীবনের চিহ্নমাত্রও নেই। মিকার অধীর আকর্ষণে দু’জনের মধ্যে ব্যবধান আর রইল না। কিন্তু শদরাকে একান্তভাবে কাছে পেয়েও মিকার মনে হোল, শদরা কোথায় হারিয়ে গেছে। এ তো শদরা নয়, এ যেন আর কেউ।
নীরস শুষ্ক কণ্ঠের একটি উক্তি শোনা গেল—মিকা, ক্ষমা করো, আমি বড় ক্লান্ত।
এ কি সম্ভাষণ! মিকার সমস্ত শরীর যেন হিম হয়ে গেল। শিথিল হয়ে খসে পড়ল বাহুর বন্ধন। কয়েকটি মুহূর্ত দু’জনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর শদরা মৃদু কণ্ঠে বলল, চলো, খেতে চলো। রাত্রি অনেক হয়েছে।
শদরা আগে আগে গেল। মিকা নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করল। নিঃশব্দে দুজনের খাওয়া শেষ হয়ে গেল।
শদরা আবার তার মুখ খুলল
: চলো, শোবে চলো।
: না, বোসো শদরা। আগে বল, তোমার কি হয়েছে?
: আমার? কি হবে? আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার তুমি কখনও করেছ?
শদরা মাথা নীচু করে উত্তর দিল, না করি নি।
: তবে বলো, কি হয়েছে?
: বলে লাভ নেই, তুমি বুঝবে না।
: আমি বুঝব না? তোমার কথা বুঝব না আমি? তবে কে বুঝবে? শদরা, বলো আজ সকালে প্রভুর মন্দিরে অতগুলো লোকের সামনে অমন করলে কেন তুমি?
: কি করেছি আমি?
: তুমি আমাদের সঙ্গে প্রার্থনা করতে বসলে না। যে-সব লোক উপস্থিত ছিল, তারা দেখে কি মনে করল? আমি ডাকলাম, তুমি শুনলে না। আমি হাত ধরে টানলাম, তুমি আমার হাত ছুঁড়ে ফেলে দিলে। আমি আর উপায় না দেখে জোর করে তোমাকে টেনে বসালাম, আর তুমি কেঁদে ভাসিয়ে দিলে।
: মিকা, তুমি তোমার কথা বলেছ, এবার আমি বলব?
: বলো।
: আমি যদি তোমাকে আমাদের বাল মেরোডাকের মন্দিরে গিয়ে বলতাম—‘মিকা, প্রার্থনা করো।’ তুমি করতে?
: কক্ষনো না।
: যদি আমি তোমাকে হাত ধরে অনুরোধ করতাম?
: না, তবু না।
শদরা একটু ম্লান হাসি হেসে বলল, মিকা, এবার তুমি তোমার প্রশ্নের উত্তর পেয়েছ!
মিকা কোন উত্তর দিল না। চুপ করে রইল। এমন কথা তো সে ভাবতেই পারে নি। যেদিন তারা দু’জনে বাবিল থেকে যাত্রা করেছিল, সেদিন তাদের কারু মনেই তো এ প্রশ্ন ছিল না।
শদরা বলল, এই একটি দিনে আমার উপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে গেল। মিকা, তুমি আমার প্রিয়তম। কালও ছিলে, আজও আছ। তুমি আমার মনের কথা দরদ দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করো। হয়তো বুঝতে পারবে না। কিন্তু তবু আমি তোমার কাছে বলতে চাই। তোমাকে না বললে, কার কাছেই বা বলব!
: বলো।
: মিকা, আমরা দু’জন দু’জনাকে ভালবেসেছিলাম। আমি জানতাম মিকা ইহুদী আর শদরা ক্যালদীয়। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম, এ শুধু একটা কথার কথা। সবচেয়ে বড় সত্য হচ্ছে এই যে, শদরা মিকাকে আর মিকা শদরাকে ভালবাসে। আমি মিকার জন্য দেশত্যাগী হলাম। আমার জন্মভূমি আর আমার স্বজনদের ছেড়ে চলে আসবার সময় আমার প্রাণ কি কাঁদে নি? কেঁদেছিল। কিন্তু আমি আমার মিকাকে অবলম্বন করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। ভেঙ্গে পড়ি নি। সেদিন আমরা বোঝা উচিত ছিল, কিন্তু আমি বুঝেও বুঝতে চাই নি যে, মিকার কাছে সবচেয়ে বড় সত্য যিহোবা আর ইহুদী জাতি। শদরাকেও সে ভালবাসে, সে ভালবাসা মিথ্যে নয়, কিন্তু সে ভালবাসা গৌণ। এ কথা তুমি অস্বীকার করতে পারো মিকা?
মিকা নিরুত্তর হয়ে রইল।
: তোমাকে ধন্যবাদ মিকা। তুমি আমার কথার প্রতিবাদ করো নি বলে। তুমি তো ছলনা করতে জানো না। তোমার কোন দোষ নেই, তোমার বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই, কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর খেলায় কি এক বিচিত্র জালে জড়িয়ে পড়েছি আমরা, সেই কথাটিই তোমাকে বুঝিয়ে বলতে চাই।
: বলো, শদরা, বলো।
: বাবিল থেকে যাহুদা যাত্রাপথের সেই মধুর স্মৃতি আমার জীবনে চিরউজ্জ্বল হয়ে থাকবে। তুমি আমাকে অনেক দিয়েছ, সে কথা আমি কোন দিন অস্বীকার করব না। কিন্তু যেই-মাত্র তুমি নদী পেরিয়ে যাহুদার মাটি স্পর্শ করলে, আমি দেখলাম, সঙ্গে সঙ্গে তোমার চেহারা বদলে গেল। আমি পরিষ্কার দেখলাম, মিকা আর সেই মিকা নেই, পুরোপুরি ইহুদী হয়ে গিয়েছে। আর সেই সঙ্গে বিপরীত তরঙ্গ অনুরূপভাবে আমার উপরে এসে আঘাত করল, আর আমাকে জানিয়ে দিল—‘ওরে শদরা, তুমি-যে ক্যালদীয়।’ কি আশ্চর্য, আমি কোন দিন এমন প্রবল ভাবে অনুভব করি নি যে, আমি ক্যালদীয়। মিকা, চেয়ে দেখলাম তোমার সঙ্গে আমার ব্যবধান বেড়েই চলেছে। আর অনুভব করলাম এই হাজার হাজার লোকের মাঝে আমি বিচ্ছিন্ন, আমি একক। আমি আর্তনাদ করে উঠলাম, আমি বিভ্রান্ত হয়ে এ কোথায় এসে পড়েছি? যিহোবা আর ইহুদী জাতি, তারা আমার কে?
মিকা একটু ইতস্তত করে কাতর কণ্ঠে বলল, শদরা, মিকাকে ভালবেসে কি তুমি ইহুদী জাতিকে ভালবাসতে পার না? সে কি কোন মতেই সম্ভব হতে পারে না?
শদরা একটু হেসে বলল, বিচার করে কথা বোলো মিকা। শদরাকে ভালবেসে তুমি কি ক্যালদীয় জাতিকে ভালবাসতে পারো? সে কি সম্ভব?
মিকা একথার কোন উত্তর খুঁজে পেল না।
: মিকা, মনে আছে, আজই সকালে তোমাকে কি বলেছিলাম? বলেছিলাম, তুমি আমার ক্ষমা করো, আমি আর এমন করে কখনও ভাবব না। কিন্তু তখন আমি ভুল বলেছিলাম। আমার ধারণা, আমরা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলাম, আমরা দু’জনে একটা কঠিন সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছি। একটু বাদেই এ কথাটা প্রমাণিত হয়ে গেল। মন্দিরের কাছে এসে যখন দাঁড়ালাম, তুমি আমাকে বললে, যিহোবার কাছে প্রার্থনা করো। সঙ্গে সঙ্গে আমার সমস্ত অন্তর বিদ্রোহী হয়ে উঠল। কেন? যিহোবা আমার কে? কোন্ দুঃসাহসে সে আমার কাছে প্রার্থনা দাবী করে? আমার মনে পড়ল বাবিলের সেই আলোকোজ্জ্বল, উৎসবমুখর, স্বর্ণমণ্ডিত মন্দির—মনে পড়ল সর্বশক্তিমান বাল মোরোডাকের জ্যোতির্ময় কাঞ্চনমূর্তি। আমার পূর্বপুরুষেরা বংশ বংশ ধরে তাঁকে অর্চনা করে এসেছেন। আমি শৈশব থেকে তাঁরই বন্দনাগান গেয়ে এসেছি, মিকা, এ তো তোমার অজানা নয়। আমি তোমার ভালবাসার আকর্ষণে আমার দেবতার মন্দির ছেড়ে দূরে, বহুদূরে চলে এসেছি। কিন্তু দেবতা আমার হৃদয়ে বিরাজমান ছিলেন। আমি সজ্ঞানে সে কথা ভেবে দেখে নি। কে জানে হয়তো বা তিনি এমনি অলক্ষ্যেই থেকে যেতে না। কিন্তু যেই-মাত্র তুমি বললে যিহোবাকে বন্দনা করতে সঙ্গে সঙ্গে আমার মনের আকাশে আমার দেবতার জ্যোতির্ময় রূপ ফুটে উঠল। আমি কেমন করে আমার দেবতার প্রতিস্পর্ধী যিহোবার কাছে মাথা নোয়াব? যখন তুমি জোর করে আমায় টেনে বসিয়ে দিলে, আমার মনে হোল, এ তো আমার মিকা নয়, এ যেন ধর্মোন্মাদ ইহুদী জাতি যিহোবার মন্দিরের পাষাণচত্বরে আমাকে চুলে ধরে আছড়ে ফেলে দিল। মিকা, তোমার মনে রইল না, এই দূর বিদেশে পরজাতীয়দের মধ্যে তুমিই আমার একমাত্র অবলম্বন, আমার একমাত্র আশ্রয়, আর আমার কে আছে?
মিকা অস্থির হয়ে উঠল
: শদরা, থামো, আর বোলো না, আমি আর সইতে পারছি না।
: আর বলব না? না মিকা, আমাকে বাধা দিও না, বলতে দাও। আমাদের এক ঘরে বাস করতে হবে, এক শয্যায় রাত্রিযাপন হবে, সারাজীবন পাশাপাশি চলতে হবে, আমরা যদি পরস্পর মন খুলে কথা বলে মনের বোঝা হালকা করতে না পারি, আমরা কি পাগল হয়ে যাব না? শোন মিকা, আর একটু শোন। তোমরা সভা করলে, সভা করে কত কথা বললে, আর প্রতি কথার সঙ্গে সঙ্গে আমার স্বজাতীয় ক্যালদীয়দের গাল দিলে মিকা, তুমি বাবিলে থাকতে ক্যালদীয়দের বিরুদ্ধে কত কথা আমাকে বলেছ। আমি বেদনা বোধ করেছি, কত সময় মুক্তকণ্ঠে তাদের নিন্দাও করেছি। কিন্তু কি আশ্চর্য, আজ যখন আমার স্বজাতীয় ক্যালদীয়দের বিরুদ্ধে কোন কথা বলো তোমরা, আমি কি যে দারুণ অন্তর্জালা বোধ করি! ক্যালদীয়দের বিরুদ্ধে তোমাদের এই আক্রমণ যেন আমার গায়ের উপর এসে পড়ে। তোমরা প্রতিমুহূর্তেই আমাকে স্মরণ করিয়ে দাও যে, আমি ক্যালদীয়! এ কেমন হোল মিকা? এই ভাবেই কি আমার জীবন চলবে? এমন তো আমি ভাবতে পারি নি।
: শদরা, একটা কথা বলি? বলো রাগ করবে না?
: দেখ মিকা, একদিনে আমরা কত দূরে সরে গেছি, পরস্পর কথা বলতে ভয় পাই। কে জানে রাগ হয়তো বা করতেও পারি। তা-হলেও কথা তো বলতেই হবে। চেপে রাখলে কি দ্বিগুণ হয়ে উঠবে না?
: তুমি যদি আমার ধর্ম ও জাতিকে গ্রহণ করে নিতে না পারো, তাহলে এই দুঃখ আর গ্লানির বোঝা-যে চিরকালই বয়ে চলতে হবে—তোমাকেও, আমাকেও।
: মিকা, আমাদের মধ্যে এ-রকম কোন শর্ত ছিল কি?
: শদরা, তুমি এমন করে ভুল বুঝো না আমাকে। আমি তো তা চাই নি, আজও চাইতাম না। কিন্তু কি থেকে কি-যে হতে পারে, সে কথা বোঝবার শক্তি আমাদের ছিল নামিকারও না, শদরারও না। আমরা শিশু। আর সংসার বড় জটিল। কিন্তু এখন একটা সমাধানের কথা কি চিন্তা করতে হবে না?
: ঠিকই বলেছ মিকা, সংসার বড় জটিল। যে-ভাবে আমরা ভাবি ঘটনাগুলো সে ভাবে চলে না। সমাধানের কথা বলছ মিকা? আচ্ছা, বাবিলে থাকতে আমি যদি এমনি করে প্রস্তাব করতাম, মিকা, তুমি আমার জাতি ও ধর্মকে গ্রহণ করো, তাহলে তুমি আর আমি দু’জনেই সুখে শান্তিতে থাকব, আমর এই প্রস্তাবের উত্তরে তুমি কি বলতে মিকা?
: প্রতি কথায় এইভাবেই যদি তুমি আমার মুখ বন্ধ করে দাও, তবে আমি আর কি বলব! কিন্তু তুমি অন্তত আমার একটা কথা রাখো শদরা।
: কি কথা মিকা?
: তুমি যা খুশী করো, কিন্তু ক্যালদীয় বলে আত্মপরিচয় দিও না।
: কেন?
: তাহলে হয়তো অনেক দুঃখ তোমায় পেতে হবে। আর সেই দুঃখ থেকে তোমাকে রক্ষা করব, সে শক্তি আমার নেই।
: কি বলে আত্মপরিচয় দেব?
মিকা একটু চুপ করে রইল। শেষে বলল, ইহুদী বলে,
: অসম্ভব, এ আমি পারব না মিকা, এ অনুরোধ তুমি আমাকে করো না। এ-যে জঘন্য আত্মলাঞ্ছনা। এ আমার সইবে না। আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি মিকা, আমার অদৃষ্টে বহু দুঃখ আছে। বেশ, সেজন্য আমি তৈরী হয়েই রইলাম। যা আসে আসুক, আমি ভয় করব না।
: অমন অবুঝ হোয়ো না শদরা। অন্তত কিছু দিনের জন্যও— নেহেমিয়াও এ কথা বলছিলেন।
নেহেমিয়া! শদরা যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। নেহেমিয়া জেরুজালেমের তীরশথ নিযুক্ত হয়েছেন, নগরীর ভালমন্দ নিয়েই ব্যস্ত থাকুন তিনি। কিন্তু আমাদের দু’জনের নিজস্ব ব্যাপারে তিনি কথা বলতে আসেন কেন? আর তুমিই বা এ সব নিয়ে তাঁর সাথে কথা বলতে যাও কেন?
মিকা শদরার উত্তেজনা দেখে বিস্মিত হয়ে বলল,
: তোমার হয়েছে কি শদরা? নেহেমিয়ার নাম শুনলেই তুমি অমন বিগড়ে যাও কেন? এমন চমৎকার লোক।
: হুঁ, চমৎকার লোক!
: তুমি মিথ্যেমিথ্যি তাঁর উপর অনেক চটে গেলে কেন? তিনি তোমার কি করেছেন?
: কি করেছেন? কি আবার করবেন? তুমি অন্ধ, তুমি কিছুই দেখতে পাও না। ওর চোখের দৃষ্টি ভাল নয়। আমি ওকে পছন্দ করি না।
