সূর্য নক্ষত্র নারী
সপ্তাহ দুয়েক ছুটি নিয়ে বাড়ি থেকে ঘুরে এলাম। কিন্তু ফিরে আসার পর মহিষবাথান যেন আমাকে আরও বেশি করে গিলে খেতে লাগল। ফেলে আসা মুহূর্তগুলো ভিড় করত মাথায়। বিষণ্ণ লাগত।
বাকি সহকর্মীদের কথা ছেড়ে দিলাম, মহিষবাথান ফার্মের গোয়ালারা, আমাদের ক্যাম্পাসের কোয়ার্টার্সে যাঁরা থাকতেন, তাঁরাও আনিসের কথা বলাবলি করতেন সবসময়। আমি আর আনিস ফি-শুক্রবার মসজিদে যেতাম। যিনি আজান দেন, মসজিদের সেই মুয়াজ্জিন ইফতিকার সাহেবের বয়স সত্তরের ওপর। তাঁর সঙ্গে যেদিন এই ঘটনার পর প্রথমবার দেখা হল, বয়স্ক মানুষটি চোখের জল আটকে রাখতে পারলেন না। কেঁদে ফেললেন ঝরঝর করে।
জরির কথাও বলত এলাকার সকলে। এমন একটা অল্পবয়সি ঝলমলে মেয়ের এমন করুণ পরিণতি হবে সেটা কে কল্পনা করতে পেরেছিল। হর্ষ আর তরুণকেও কেউ ছুপিয়ে দিয়েছিল বিষাদের ধূসর রঙে।
আগে আমাদের অবসর কাটত নিজেদের মধ্যে ক্রিকেট ফুটবল ভলিবল খেলে। সেসব বন্ধ হয়ে গেল। তাস খেলতেও ইচ্ছে করত না।
একটা সময় কবিতা পড়তাম। জীবনানন্দ ছিলেন পছন্দের কবি। তাঁর কবিতায় দুটো-তিনটে শব্দ পরপর জুড়ে গিয়ে যে কী অদ্ভুত ম্যাজিক তৈরি করে সেসব নিয়ে আবোলতাবোল ভাবতাম। নিজের মতো করে সৃষ্টি করে নিতাম অর্থবাহী কোনও দ্যোতনা। তেমনই একটি কবিতায় পড়া ‘সূর্য, নক্ষত্র, নারী’, এই শব্দগুলি আমার ভেতরমহলে ঢুকে পড়ত। অন্যমনস্ক হয়ে যেতাম থেকে থেকে।
পকেটে ডিগ্রির কাগজ আছে। চাকরির বয়সও পার হয়ে যায়নি। এই শাপগ্রস্ত জায়গায় তবে খামোখা পড়ে থাকব কেন? খবরের কাগজে কর্মখালি বিজ্ঞাপন দেখে পরীক্ষা দিতে শুরু করলাম। ভাইভা অবধি গিয়েও ফিরে এলাম দু-এক জায়গা থেকে। হাল ছাড়লাম না। কয়েকটা ওয়াক-ইন ইন্টারভিউ দিলাম। বেলগাছিয়ার এক অফিস থেকে ই-মেল এল একদিন। এক মাসের মধ্যে কাজে যোগ দিতে বলেছে। মাইনেপত্রও মন্দ নয়। মনে হল হাতে চাঁদ পেলাম আমি।
দিন কেটে যায় দেখতে দেখতে। মহিষবাথানের খবর পেতাম হর্ষ আর তরুণের কাছ থেকে। সেবার এপ্রিল মাসের শেষদিকে ভোট। মহিষবাথানের রাজনৈতিক দলের ক্যাডারদের মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে গেল ইংরেজি নতুন বছর পড়তে না পড়তেই।
মহিষবাথান শান্ত জায়গা। এতকাল একটাই রাজনৈতিক দলের প্রাধান্য ছিল। অন্য দল যে তলে তলে নিজেদের সংগঠন কবে কীভাবে শক্ত করে নিয়েছে সেটা এতদিন জানা যায়নি। বোঝা গেল এবার। যত ইলেকশনের দিন এগিয়ে আসতে লাগল তত রাজনীতির উত্তাপ বাড়তে লাগল মহিষবাথানে।
নির্বাচনের দিন রক্তক্ষয় হল বিস্তর। মারদাঙ্গা লাঠালাঠিও হল। বহু লোকের রক্ত ঝরল। বেশ কয়েক দফার ইলেকশন সেবার। ভোট গণনা মাসখানেক বাদে। ভোটের পরেও কিছুদিন হিংসার ঘটনা ঘটে থাকে। ঘরছাড়ারা ঘরে ফেরে। সেসব নিয়ে অশান্তি হয়। মহিষবাথানেও হল। একদিন তার পাটও চুল। যখন সকলে মনে করেছিল এবার শান্তি ফিরেছে, ঠিক সে সময় ঘটে গেল একটা ভয়ানক ঘটনা।
ইলেকশন মিটে যাবার মাস তিনেক পরের ঘটনা। জরিকে যে নিকে করবে বলে খেপে উঠেছিল, সেই সিরাজুল ইসলামকে আশ্বিন মাসের এক ভোররাতে পাওয়া গেল মহিষবাথান জঙ্গলে। তাতাসি নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে দুজন জেলে দেখতে পেয়েছে সেই দৃশ্য। জোড়া ডুমুরগাছে সিরাজুলকে ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছে কেউ।
মহিষবাথান কেঁপে উঠল সেই ঘটনায়। খবরের কাগজ বড় করে নিউজ করল। টিভিতে দেখানো হল খবর। দুই যুযুধান পলিটিকাল পার্টির চাপান-উতোর চলল।
সিরাজুলের দলের নেতা মিডিয়াকে বললেন, এটা অন্য দলের কাজ। তারাই ষড়যন্ত্র করে বিশিষ্ট সমাজসেবী সিরাজুলকে খুন করেছে।
প্রতিপক্ষ দলের নেতা বললেন, সিরাজুল যদিও ক্রিমিনাল, কিন্তু তাঁদের দল খুনের রাজনীতি সমর্থন করে না। সিরাজুলের পার্টির মধ্যেই রয়েছে আলাদা লবি। এই খুনের ঘটনার পেছনে দ্বিতীয় লবির হাত আছে।
হর্ষ আর তরুণের মুখে শুনতাম, হাটেবাজারে চায়ের আড্ডায় তখন নাকি একটাই প্রসঙ্গ। পুলিশ কয়েকজন সন্দেহভাজনকে তুলে নিয়ে গেলেও উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে ছেড়ে দিতে বাধ্য হল সকলকে।
সিরাজুল একা চলাফেরা করত না কখনও। যেখানে যেত সঙ্গে এক-আধজন শাকরেদ থাকত। সেদিন সিরাজুল পার্টি অফিসে খোসমেজাজেই ছিল। বিকেলবেলা পার্টি অফিস থেকে বেরিয়ে নিজের এসইউভি গাড়ি ড্রাইভ করে বেরিয়ে পড়েছিল। সঙ্গে কেউ ছিল না। সে বাড়ির দিকে নয়, গিয়েছিল জঙ্গলের দিকে। কিন্তু কী করতে গিয়েছিল, তাও ড্রাইভার না নিয়ে, তার কোনও ব্যাখ্যা নেই। সিরাজুলের ফোন ঘেঁটে কোনও হদিশ মিলল না। পুলিশ আদাজল খেয়ে নেমে পড়ল খুনের তদন্ত করতে। এই হাই-প্রোফাইল খুনের ঘটনায় আনিস আর জরির কেসটা চাপা পড়ে গেল।
দোতারা আনিসের বাবার জীবনসঙ্গী। কন্ঠ, ভাব আর দোতারা—এই তিনে মিলে মনসুর আনসারি। লালনের গানেই বিভোর। মানুষের গান, আত্মবোধনের গান, গৌরপ্রেম, ইসলামি গান—সব ধরনের গানেই বিচরণ। জয়দেব কেঁদুলির মেলায় বাবার হাত ধরে আনিস গেছে ছোটবেলায়। বিজ্ঞান মানুক বা না মানুক, অনেকের ধারণা মকরসংক্রান্তির পুণ্য লগ্নে অজয়ের জলে স্নান করলে নাকি যে কোনও রোগ নিরাময় হয়, এই তিথিতে অজয়ের জলে নাকি এমনই গুণ জন্মায়।
আনিস এই কথাটা বলেছিল আমাকে একবার। সে নাকি ছোটবেলায় জ্বরজারিতে ভুগত খুব। দু’দুবার টাইফয়েড হয়েছিল। ম্যালেরিয়াতে একবার নাকি যায় যায় অবস্থা হয়েছিল। গোরভাঙা থেকে নদিয়া হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল তাকে। যমে মানুষে টানাটানি চলেছিল কয়েকদিন। তার পর সে প্রাণে বাঁচে। মজার ব্যাপার হল, কেঁদুলির মেলায় গিয়ে অজয়ের জলে স্নান করার পর আর কখনও তার জ্বর আসেনি।
বাউল ফকির গানের প্রতি তার ভালবাসা জন্মগত। গান তার কাছে শ্বাস নেওয়া-ছাড়ার মতোই স্বাভাবিক। স্বরগ্রামের ওপর স্বচ্ছন্দ দখল ছিল আনিসের। যেমন গানের গলা তেমনি ভাবের গভীরতা। দোতারা বাজিয়ে খালি গলায় আনিস আমাদের গান শোনাত। একটা গান ছিল ওর খুব প্রিয়। সেই গানটাই গুনগুন করত বেশিরভাগ সময়।
‘তোমার পথ ঢেকেছে মন্দিরে-মসজিদে।
আমি কেমনে সেথা যাই রে।
যেদিকে যাই যেদিক তাকাই।
আমার পথ আটকায় রুখে দাঁড়ায়
গুরুতে-মুরশেদে।।’
আমি জিগ্যেস করতাম, এই গানের কী অর্থ?
আনিস বলত, বেদব্রাহ্মণ, কোরান-পুরাণ, মোল্লা-মৌলবি—সব সরিয়ে রেখে, মানুষকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে জীবনমুখী দর্শন গড়ে তুলতে চাওয়া হয়েছে এই গানে। সমন্বয়ই তার মূল সুর। আস্থা রাখা হয়েছে মানুষের চৈতন্যের ওপর। আশ্রয় পেতে চেয়েছে মানুষের কাছে। ঘুম ভাঙাতে চেয়েছে মূক ও বধির সমাজের। একই রজঃবীজে যখন মানুষের সৃষ্টি তাহলে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকবে কেন? আনিস গলা ছেড়ে গাইত—
‘সহজ মানুষ ভজে—
দেখ না রে মন দিব্যজ্ঞানে।
পাবি রে অমূল্য নিধি বর্তমানে।।’
আমি বাউল-ফকির তত্ত্ব বুঝি না। তরুণ বা হর্ষেরও এসবে আগ্রহ নেই। কিন্তু আমরা তাস খেলা থামিয়ে মুগ্ধ হয়ে শুনতাম আনিসের গান।
এক-একদিন ইচ্ছে হলে নেচে নেচে গান গাইত আনিস। গান শেষ করে বলত, সহজ মানুষের খোঁজেই বাউলের পথচলা। ধর্মের গণ্ডিতে তাকে বাঁধা যায় না। জীবন ফুরিয়ে যায় তবু পথ ফুরোয় না। সহজ মানুষ হল মনের মানুষ। তার বাস দেহভাষ্যে। যা কিছু প্রচলিত তার বিরুদ্ধে তার জেহাদ। প্রতিবাদের মাটিতেই বাউলের জন্ম। প্রতিবাদেই লালিত হতে চায় একজন বাউল। পোশাকে-আশাকে কিংবা জীবনচর্যা দিয়ে সে রেখে যায় তার নীরব প্রতিবাদ।
আমি জিগ্যেস করতাম, বাউল ফকিরের জগৎ নাকি রহস্যময়। সত্যিই কি তাই?
আনিস বলত, বাউল-ফকিরের অন্তরমহলে ঢুকতে হলে দেহভুবনে ফিরতে হবে। পড়াশোনা করতে হবে। কাছ থেকে মিশতে হবে বাউল ফকিরদের সঙ্গে। তবেই রহস্যে ঘেরা গূঢ় এক জগৎ ধরা পড়বে চোখে। কিন্তু মজা হল, কেউই খোলসা করে বলবে না কিছু। তার কারণ, রূপক আর প্রতীকের আড়ালে এখানে গোপন রাখা হয় সাধনতত্ত্বকে। কাম, প্রেম, সম্ভোগ, নিষ্কামী হওয়ার সাধনা, বিন্দুধারণের রহস্য, রজঃবীজের গতিপ্রকৃতি, শ্বাসপ্রশ্বাসের খেলা নিয়ন্ত্রণ—সব পর্দাই উদ্ভাসিত এখানে। সেই গোপন ঘরে ঢোকার চাবি দিতে পারেন এক ও একমাত্র গুরু।
আমি প্রশ্ন করতাম। ওকে বলতাম, কিন্তু দেহকে বাদ দিয়ে নিজেকে জানা যাবে কী করে?
আনিস বুঝিয়ে বলত, দেহতত্ত্ব এগিয়েছে নানাভাবে। দেহজমি, দেহঘর, দেহতরী, দেহনদী, তার ঝড়তুফান যেমন এসেছে তেমনই এসেছে গভীর স্রোত, বাঁকানদীর পিছল ঘাট, তন্ত্রের ধারণা ‘ত্রিবেণী’, কুমিরের প্রতীকে কাম, জোয়ার-ভাটার প্রতীকে রজঃপ্রবাহ, দেহের চাঁদের বিভিন্ন কলা, অমাবস্যা, পূর্ণিমা ইত্যাদি। এসেছে ফসল, খেত, সার, বীজ, হাল, লাঙল, ঢেঁকি, মরাই ইত্যাদি রূপকল্প। সাদা চোখে তুমি যা দেখছ এ মোটেই তা নয়।
আমি অবাক হয়ে জিগ্যেস করতাম, ত্রিবেণী আবার কী বস্তু? তুমি কি তন্ত্র-মন্ত্রের সাধনা করো? ব্যাপার কী আনিস, তুমি কোনও তান্ত্রিকের পাল্লায় পড়েছ নাকি!
আনিস বলত, সেসব জেনে তুমি কী করবে? ওসব ছেড়ে আসল কথা শোনো আমার কাছে। বাউলরা হল কায়াবাদী, আর তাদের দর্শন দেহনির্ভর। সে কারণেই এত সহজে অসাম্প্রদায়িকতার মূলে পৌঁছতে পেরেছে। মাতৃশক্তিকে সম্ভ্রমের আসনে বসিয়েছে এই দর্শন। মহীয়সী মর্যাদা পেয়েছে নারী বা প্রকৃতি। জাফর, নারী কিন্তু ভোগের কোনও উপকরণ নয়। সৃষ্টির চিরপ্রবাহিনী স্রোত আর পুরুষের নিয়ন্তা হিসেবে এখানে নারী প্রতিষ্ঠিত।
আমি প্রতিবাদ করে বলতাম, এটা তুমি ঠিক বললে না। কামিনী আর কাঞ্চনকে কেন্দ্র করেই ঘুরছে গোটা দুনিয়া। যত যুদ্ধবিগ্রহ, তার প্রায় সবই নারীকে কেন্দ্র করেই। তুমি পুরুষের চোখে নারী ভোগের উপকরণ নয় বলছ?
আনিস বলত, বাউলদের বিশ্বাস, নারীদেহে রজঃপ্রবৃত্তির প্রথম তিনদিনে অধর মানুষের পূর্ণ উপস্থিতি ঘটে। প্রকৃতির রজে খেলা চলে তার। চতুর্থ দিনের শেষে আবার স্বস্থান বা সহস্রারে ফিরে যাওয়া অধরের সান্নিধ্যে আসার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়। এই তিনদিন কামরহিত দেহমিলনে তাকে পাওয়া যায়।
আমি বলতাম, কামরহিত দেহমিলন? সে তো সোনার পাথরবাটি। আনিস রহস্যমেশানো হাসি হেসে বলত, অনেকেই নানা কথা বলে না জেনে। কিন্তু বাউল ফকির দর্শনের গুহ্য কথা বুঝতে গেলে তোমাকে এদের সঙ্গ করতে হবে। নইলে বুঝবে কী করে?
আমি বলতাম, গ্রামবাংলার নানা জনপদে আজও যে অগুনতি বাউল ফকির শিল্পী ঐতিহ্য রক্ষা করে চলেছেন তা আমি জানি। লোকগান আজকাল যখন পণ্য হয়ে উঠে নাগরিক বিনোদন জোগান দিচ্ছে তখন এঁরাই তো একতারা, দোতারা, ডুগি, খমক আর বাঁশিতে বাংলার চিরায়ত সম্পদকে বাঁচিয়ে রাখছেন। তুমি কি আমাকে বাউল ফকির জগতের রহস্যময় তত্ত্ব বুঝিয়ে বলবে?
আনিস স্মিতমুখে বলত, ছেড়ে দাও জাফর। তুমি এ জগতের লোক নও, তুমি এসব বুঝতে পারবে না।
