নীল হাওয়ার সমুদ্রে
জরির পানপাতার মতো মুখে কৈশোরের চাপল্য মাখা। তাক লাগানো সুন্দরী জরি। সেই সৌন্দর্যের মাত্রা এই দু’বছরে আরও বেড়েছে। নীল হাওয়ার সমুদ্রের তীরে দাঁড়ানো এই অপরূপা নারীর দিকে তাকিয়ে ছিলাম অপলক চোখে। মনে মনে ভাবছিলাম পৃথিবীর ইতিহাস ঘাঁটলে যত যুদ্ধবিগ্রহের নজির পাওয়া যায়, তার প্রায় প্রত্যেকটির পেছনে রয়েছে কোনও না কোনও সুন্দরী রমণী। জরিও এমনই এক রূপসী নারী যাকে জয় করার জন্য রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়া যায়। তছনছ করে দেওয়া যায় সব। লন্ডভন্ড করে দেওয়া যায় জগৎ সংসার। ওলটপালট করে দেওয়া যায় দুনিয়া। তাতে যদি কেয়ামত নেমে আসে তো আসুক। আমি মুখে একটা নিরীহ ভাব ফুটিয়ে বললাম, হঠাৎ এ কথা কেন বললে জরি?
জরি স্থির গলায় বলল, পাল্টা প্রশ্ন কেন করছেন জাফর ভাই? আমি যা জিগ্যেস করছি তার উত্তর দিন আগে। কেরামন আর কতেমিন কারা আপনি জানেন?
আমি বললাম, জানি। শুনেছি চিত্রগুপ্ত যেমন তিনশো পয়ষট্টি দিন মানুষের পাপপুণ্যের হিসেব করে চলেছে ঠিক তেমনি হল কেরামন আর কতেমিন। তারাও আমাদের জাগতিক পাপ-পুণ্যের অ্যাকাউন্ট্যান্ট। আল্লার দূত হল ফেরেশতা। হাদিশ বলছে ফেরেশতা আলো দিয়ে তৈরি। ফেরেশতা বিভিন্নরকম চেহারা ধারণ করতে পারে। আল্লার নির্দেশ পালনেই তারা ব্যস্ত থাকে সর্বক্ষণ।
জরি বাচ্চা মেয়ের মতো হাততালি দিয়ে বলল, একদম ঠিক। সবই তো দেখছি জানেন আপনি জাফর ভাই। আসলে আমাদের সকলের দুই কাঁধের দুদিকে এই দুই ফেরেশতা বসে থাকে চব্বিশ ঘণ্টা। তাদের খালি চোখে দেখা যায় না। মনের চোখ দিয়ে তাদের অস্তিত্ব অনুভব করতে হয়।
কেরামন সারাক্ষণ করে চলেছে আমাদের পুণ্যের হিসেব। কতেমিন তেমনি ব্যস্ত আছে যারা পাপী তাদের পাপের অঙ্ক লেখায়। আপনার দুই কাঁধে হাত দিন। নিজেই অনুভব করতে পারবেন আমি ঠিক বলছি কি না।
আমার মাথার দু’পাশের রগ দপদপ করছে। জরি কি জাদুটোনা কিছু জানে? এতক্ষণ কিছু বুঝিনি, এখন আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আমার দুই কাঁধে কিছু যেন বসে আছে। হাত দিলাম আলগোছে। কিছু টের পেলাম না। জরি রাস্তার পাগলির মতো হেসে উঠল খ্যালখ্যাল করে। স্বাভাবিক হাসি নয়, রক্ত হিম করে দেওয়া হাসি। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল আমার।
আনিস বলল, আচ্ছা জাফর, তুমি কি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ো?
আমি বললাম, একটা সময় পড়তাম। তুমি তো জানো, মহিষবাথানের দিনগুলোতে ভোরবেলা উঠতে হতো মোষ ধোয়াতে। সূর্য ওঠার আগে ফজরের নামাজ পড়তাম। ফি-শুক্রবার মসজিদে যেতাম। তুমিও তো যেতে আমার সঙ্গে। তবে আজকাল নামাজ পড়া হয় না। কাজের এত চাপ যে, সময় বের করতে পারি না। হঠাৎ এ কথা বলছ কেন?
আনিস বলল, তুমি আর আমি এক কোয়ার্টারে থেকেছি। একসঙ্গে মসজিদে গিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়েছি। পাশাপাশি বসে নামাজ পড়েছি। একসঙ্গে রোজা রেখেছি। রোজা ভেঙে ইফতার করেছি। খেলাধুলো করেছি। আড্ডা মেরেছি। দিনের পর দিন গল্প করেছি নিজেদের মধ্যে। আমার সমস্ত সিক্রেট শেয়ার করেছি তোমার সঙ্গে। তুমিও তো তোমার মনের সব কথাই আমাকে বলেছ। কী, তাই না?
আমি বললাম, হ্যাঁ নিশ্চয়ই। আমরা তো বন্ধুই।
আনিস ম্লান হেসে বলল, না জাফর, তুমি তা করোনি। আমরা যদি সত্যিই বন্ধু হতাম, তবে জরির প্রতি যে তোমার দুর্বলতা আছে সে কথা আমাকে বলতে। আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি, তুমি জরিকে পাওয়ার জন্য এত দূর যেতে পার।
আনিস যে এমন একটা অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ আচমকা তুলবে সেটা আঁচ করতে পারিনি। অথচ আন্দাজ করা উচিত ছিল আমার। নিজেকেই নিজে ধিক্কার দিলাম। আনিস যখন ব্যাপারটা জেনে গেছে তার মানে জরিও সব জানে। এ তো ভারি লজ্জার ব্যাপার হল! তবুও না বোঝার অভিনয় করে বললাম, কী বলতে চাইছ একটু খুলে বলবে?
আনিসের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। সেই হাসিটাকে কান অবধি পৌঁছে দিয়ে বলল, আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি সব। আমি আর জরি মহিষবাথান ছেড়ে বেরিয়ে যাবার ক’দিন বাদেই তুমি জরিদের বাড়িতে গিয়েছিলে। ভালোমানুষের মতো জরির ছোট চাচির সঙ্গে গল্প জমিয়ে সিরাজুলের ফোন নম্বর জোগাড় করেছিলে।
আমি বললাম, কী আবোলতাবোল কথা বলছ? কে সিরাজুল?
জরি এখন আর হাসছে না। পাথরের মতো শক্ত মুখচোখ। বলল, সে কী জাফর ভাই! সিরাজুলের কথা ভুলে গেলেন আপনি? তার সঙ্গেই তো আমার নিকে ঠিক করেছিল আমার চাচি। তারিখও ঠিক হয়ে গিয়েছিল। আপনার মনে নেই?
আমি অস্ফুটে বললাম, হয়তো বলেছিলে, কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছি। জরি বলল, আমরা মহিষবাথান ছেড়ে বেরোবার পর আপনি আমাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা করেছিলেন আমার ছোট চাচির সঙ্গে। চাচির কাছ থেকে ফোন নম্বর নিয়ে সিরাজুল ইসলামকে ফোন করেছিলেন প্রথমে। সে তখন মুসাফিরগঞ্জের বাইরে কোথাও ছিল ব্যবসার কাজে।
ক’দিন বাদে আপনাকে দেখা করতে বলেছিল। আপনি সপ্তাহখানেক বাদে মুসাফিরগঞ্জ গিয়ে দেখা করেছিলেন তার সঙ্গে। অফিসের গাড়ি নেননি, সকলে জেনে যাবে বলে। বাস ধরে গিয়েছিলেন। আমি আর আনিস যে রামপুরে হুমায়ূন ভাইয়ের রেল কোয়ার্টার্সে লুকিয়ে আছি সেটা আপনি সিরাজুলকে বলে দিয়েছিলেন।
আমি অতল জলে পড়ে গিয়েছি। কী করে এসব জানল, ওরা দুজন? কে বলল ওদের এসব কথা? সিরাজুল তো খুন হয়ে গেছে। তার আগে এসব কথা ওদের দুজনকে বলে দিয়েছিল কি?
জরি ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, এভাবে কেন আমাদের পিঠে ছোরা মারলেন জাফর ভাই? আমরা যে আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম জাফর ভাই!
আমি চুপ। মুখে কথা জোগাচ্ছে না। আনিস বলল, তোমার কাছ থেকে আমাদের খোঁজ পেয়ে সিরাজুল ওর ছেলেদের পাঠিয়েছিল আমাদের খোঁজে। দুজন এসেছিল হুমায়ূন ভাইয়ের রেল কোয়ার্টারসে। আমরা মিথ্যে পরিচয় দিয়েছিলাম। তারা বিশ্বাস করেনি। নিজেদের মধ্যে কিছু বলাবলি করে ফিরে গিয়েছিল।
তখনই মনে হয়েছিল ওরা ফিরে আসবে আবার। তাই দেরি না করে আমি আর জরি এক কাপড়েই বেরিয়ে পড়েছিলাম। অসম যাওয়ার বাস ধরে চলে গিয়েছিলাম গুয়াহাটি।
আমার কপালে ঘামের দানা ফুটে উঠছে। ইটচাপা ঘাসের মতো ফ্যাকাসে রং ধারণ করছে আমার মুখ। গুমোট লাগছে। মনের মধ্যে কাঁটা হয়ে বিধছে অপরাধবোধ। ভেবে দেখলাম, আর লুকোচুরি খেলে লাভ নেই। ধরা যখন পড়েই গিয়েছি তখন স্পষ্ট কথা স্পষ্ট বলাই ভাল। কোদালকে কোদাল বলতে এত সংকোচ কীসের! আমি মুখের প্রত্যেকটা পেশি শক্ত করে বললাম, এসব অবান্তর কথা এতদিন পর আজ উঠছে কেন?
জরি হাহাকার করে বলে উঠল, অবান্তর কথা!
আনিস বলল, অবান্তর কি না সেটা পরের কথা, তার আগে কথাটা ভুল না ঠিক সেটা আগে বলো।
আমি কেটে কেটে বললাম, স্বীকার করছি আমি জরিকে ভালোবেসেছিলাম। এমন মেয়েকে পাওয়ার জন্য দুনিয়া ওলট-পালট করে দেওয়া যায়। আনিস, তুমি একটা হাঁদাগঙ্গারাম, গর্দভ। এতটাই নির্বোধ যে, তুমি সেটা বুঝতে পারোনি। তুমি তখন জরির প্রেমে এতটাই ডুবে ছিলে যে, অন্য কোনও দিকে তাকাবার মতো তোমার হুঁশ ছিল না।
জরি ক্লান্ত গলায় বলল, কখনও আপনি তো আমাকে কিছু বলেননি জাফর ভাই!
আমি স্থির চোখে জরিকে দেখতে দেখতে বললাম, তুমি কি নিজে থেকে কিছু বুঝতে পারোনি কখনও?
জরি ধীর গলায় বলল, মেয়েদের জন্মগত একটা বাড়তি ইন্দ্ৰিয় থাকে। আর পাঁচজন মেয়ের মতো সেটুকু বোধ আমার আছে। আপনি যে আমার প্রতি দুর্বল সেটা আমি যে একেবারেই বুঝিনি তা নয়।
আমি বললাম, তাহলে তুমি আমার কাছে কখনও কিছু জানতে চাওনি কেন?
জরি বলল, আমি আন্দাজ করেছিলাম কিছুটা। কিন্তু আমি ভুলও হতে পারি ভেবে আপনাকে নিজে থেকে কখনও কিছু বলিনি। এমনকী, আনিসকেও কখনও বলিনি আমার ধারণার কথা।
আমি জরির চোখে চোখ রেখে বললাম, তুমি আমাকে বলো জরি, কাউকে ভালোবাসা কি অন্যায়?
জরি বলল, একেবারেই না। যে কেউ যে কাউকে ভালোবাসতেই পারে। ভালোবাসার মধ্যে কোনও অন্যায় নেই। ভালোবাসার মতো পবিত্র কিছুও নেই। কিন্তু জোর করে ভালোবাসা অর্জন করা যায় না কখনও। আপনি তো আমাকে কখনও কিছু বলেননি জাফর ভাই! কেন বলেননি?
আমি একটা শ্বাস গোপন করে বললাম, বলার সুযোগ আর দিলে কোথায়। তোমরা দুজন তখন নিজেদের নিয়ে এতটাই মশগুল ছিলে যে বাকি দুনিয়ার দিকে তোমাদের নজর ছিল না। যার প্রেমে তুমি গলা অবধি ডুবে আছ সে যে তোমার নখের যোগ্য নয় সেটাও বোঝার ক্ষমতা তোমার ছিল না।
আনিস যে আহত হয়েছে তা ওর মুখচোখ দেখে বুঝতে পারছি।
আমার দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে। আমিও কথাটা বলে ফেলে হকচকিয়ে গেছি। এতদিনের ছাইচাপা আগুন বেরিয়ে এসেছে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো। কিন্তু মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া কথা আর ধনুকের জ্যা থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া তির কোনওটাই ফিরিয়ে আনা যায় না।
আমি অস্ফুটে বললাম, আমি ঠিক এভাবে বলতে চাইনি। আই অ্যাম সরি। আই অ্যাম রিয়ালি সরি। কিন্তু যেটা বলেছি সেটা মিথ্যে নয়। কথাটা অপ্রিয় হলেও সত্যি।
আনিসকে বাজপড়া গাছের মতো দেখাচ্ছে। আমার দিকে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে। বিধ্বস্ত গলায় বলল, কী বলছ তুমি জাফর! আমি জরির নখের যোগ্য নই?
ক্ষয়াটে চাঁদের আলো এসে পড়েছে জরির মুখে। হাওয়ায় উড়ছে ওর রেশম রেশম চুল। জরি আমাকে একদৃষ্টে দেখছে। আমি যে এমন একটা কাজ করতে পারি সেটা যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে জরি বলল, আনিস যে আমার যোগ্য নয়, এ কথাটা আপনার কেন মনে হল জাফর ভাই?
পিন পড়লেও শব্দ শোনা যাবে এখন। ওরা দুজন যখন জেনেই ফেলেছে তখন ভালোই হয়েছে। এবার আর লজ্জা, জড়তা বা সংকোচের কোনও ব্যাপার নেই। আড়াল আবডাল করার বা ঢাকাচাপা দেওয়ারও কিছু নেই। আমি বললাম, বলব? সহ্য করতে পারবে তো আমার কথা?
জরি হাসল। ওর গজদাঁত দেখতে পেলাম। আমার চোখে চোখ রেখে বলল, আপনি বলুন জাফর ভাই। আমরা শুনছি।
