১
‘খ্যাপা, তোর আপন খবর
না দেখে তুই যাবি কোথা
ও তুই কূল হারাবি মূল হারাবি
মিছেই ঘুরে মরবি ধাঁধায়।।’
শাল, সেগুন, ওদাল, চিকরাশি, লালি, দুধে-লালি, টুংয়ের মতো অজস্র গাছের সমারোহ মহিষবাথানের এই জঙ্গলে। তার মধ্যে সাদা শিরীষ গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি ছোট্ট এই কটেজ। লাল টালির দোচালা। কোমর অবধি কাঠের রেলিং দিয়ে ঘেরা বারান্দা। কটেজের একফালি বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে খালি গলায় গান গাইছে আনিস। সুরে ঋদ্ধ গায়কি।
কৃষ্ণপক্ষের ক্ষয়াটে চাঁদ উঠেছে আকাশে। বোতল সবুজ অন্ধকারে অপার্থিব দেখাচ্ছে জঙ্গলটাকে। কটেজের পেছন দিয়ে বয়ে গেছে এক নদী। দূর থেকে তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সীসের মতো রং। নদীর নামটি ভারি সুন্দর, তাতাসি। গানে বিভোর আনিসের মুখে অস্পষ্ট জ্যোৎস্না এসে পড়েছে বলে, তৈরি হয়েছে এক রহস্যময় সিল্যুয়েট। এতদিনের চেনা, তবুও এই মুহূর্তে সামনে বসা মানুষটাকে আমার অচেনা লাগছে।
আনিসের গানের গলা ভরাট। স্বরে একটুও আঁশ নেই। গান গাইবার সময় সুর তাল লয়ের নড়চড় হয় না। আনিস নদিয়ার গোরভাঙা গ্রামের মানুষ। কখনও সেখানে যাওয়া হয়নি, তবে আনিসের মুখেই শুনেছি ওর বাবার নাম মনসুর আনসারি। যাঁরা বাংলার বাউল ফকিরদের জগতের খোঁজ রাখেন, তাঁরা নাকি এই নামের সঙ্গে পরিচিত। লালন, আজহার কিংবা অন্য পদকর্তাদের গানের সঙ্গে নিজেকে মনসুর উজাড় করে দেন চণ্ডীদাসের পদেও।
আনিসের মা নেই। তার মায়ের মৃত্যু হয়েছিল তার ছোটবেলায়। দুরারোগ্য কোনও রোগ হয়েছিল। আনিসের বাবা আউল-বাউল গোছের মানুষ। কৃষিকাজ করে পেট চলে। মূলধন বলতে কিছু নেই। প্ৰতি মরশুমেই ধার করতে হয় এর-তার কাছ থেকে। সেই ধার আর শোধ হয় না। ফলে ফি-মাসেই আনিসকে টাকা পাঠাতে হয় বাবার কাছে।
মনসুর গানপাগল মানুষ। বাবার কাছে ছোটবেলায় গানের তালিম নিয়েছিল আনিস। তার শৈশব, কৈশোর কেটেছে সুরের মধ্যে। প্রথাগত লেখাপড়া করার সঙ্গে সঙ্গে কখন যে সুর তার জীবনকে বেঁধে ফেলেছে তা সে নিজেও জানে না। আনিস বেতের চেয়ারে নিজের শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে বলল, এটা কার গান জানো জাফর?
সন্ধের ছায়াঘন রঙে গাঢ় ছোপ ধরতে শুরু করছে। রাত নামছে মহিষবাথানের জঙ্গলে। জোনাকির ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে এক গাছ থেকে অন্য গাছে। খানিক আগেও ভেসে আসছিল পাখিদের পাখসাট, ঝিঁঝির ডাক। কানে আসছিল সরীসৃপের বুক ঘষটে চলার অশ্রুত শব্দ, বুনো জন্তুর নিঃশব্দে চলাচল করার অস্পষ্ট আওয়াজ। শকুনের ডাকও কানে এসেছিল একবার। অবিকল বাচ্চার কান্নার শব্দ, যা শুনলে গায়ে কাঁটা
দেয়।
যতক্ষণ আনিস গান গাইছিল ততক্ষণ নিথর নিস্তব্ধ ছিল আরণ্যক পরিবেশ। গান থামার সঙ্গে সঙ্গে ফের বিজাতীয় শব্দ ভেসে আসতে শুরু করল কটেজের আশপাশের জঙ্গল থেকে। আনিসের উল্টোদিকে একটা কাঠের চেয়ারে বসে আছি আমি। বিশাল আকৃতির কোনও পাখি ডানা ঝাপটে চলে গেল আমাদের কটেজের পাশ দিয়ে। চমকে উঠেছিলাম সেই শব্দে। মুখ ফিরিয়ে দেখলাম আনিসকে। আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ে বললাম, লালন ফকির?
আনিস খুশি হল। সায় দিয়ে বলল, ঠিক। এমন গান কে আর বানাবেন লালন ছাড়া! বাউলগান হল এমন এক আয়না যা মানুষকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তাই নিজের মুখ দেখতে হলে লালনেরই হাত ধরতে হয়। অনুভব করা যায়, মানুষই শুরু মানুষই শেষ। মানুষের সঙ্গেই আমাদের পথচলা।
বিদায়লগ্নে যে মানুষটা জানাজা পড়ে কিংবা নাভিকুণ্ড খুঁজে দেয়, তার কাছে আমাদের অশেষ ঋণ। জেনে রেখো জাফর, মানুষ ছাড়া এই ভুবনে আমাদের কোনও গতি নেই।
আমি বললাম, সে তো বটেই।
আনিস বলল, লালনেরই আর একটা গান ধরি, দুর্লভ মানবজনমের গান। শোনো তবে—
‘এমন মানবজনম আর কী হবে।
মন যা কর ত্বরায় কর এই ভবে।।’
মন্ত্রমুগ্ধের মতো গান শুনছিলাম। নিবিষ্ট গলায় দরদ দিয়ে গান গাইছিল আনিস। একসময় গান থামল। আনিস বলল, এই লাইনগুলো তো নিশ্চয়ই শুনেছ আগে। খুবই পরিচিত গান। গানের কথাগুলো শুনে মনে হয় কী সহজ অথচ কী গভীর এর দর্শন, তাই না?
আমি বললাম, বাউল ফকির নিয়ে তো আমার পড়াশোনা নেই। তবে শুনেছি এঁদের গান নাকি দেহযোগাত্মক। এ হল রজঃবীজের অন্তর্সম্পর্ক নির্ণয়ের সাধনা। সাধনসঙ্গিনী ছাড়া নাকি এই সাধনা হয় না। যদি কিছু না মনে করো তবে একটা কথা বলি। অনেকে মনে করে এ হল অবাধ যৌনতার বা ব্যভিচারের লাইসেন্স। তাই কি?
আনিস একটু ক্ষুন্ন হল। হাত নেড়ে বলল, এ অত সহজ জিনিস নয়, জাফর। এ হল কামকে প্রেমে রূপান্তরের সাধনা। গুরু যেমন নির্দেশ দেবেন, তাঁর শেখানো পথে করণকৌশল আয়ত্ত করে, শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে, দেহ আর মনের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব এনে এই সাধনা করতে হয়। একদল মানুষ চিরদিনই দেহবাদী সাধনার অপব্যবহার করে এসেছে। বাউলদর্শনও তার বাইরে নয়।
আমি কিন্তু-কিন্তু করে বললাম, তবে অনেকে যে বলেন এ হল কাম পরিতৃপ্তির সাধনা…।
আনিস আমার কথা থামিয়ে দিয়ে বলল, পুরুষ-প্রকৃতির উলটো সাধনাই বাউল মতের লক্ষ্য। এতে ধীরে ধীরে কাম কমে আসে। বিজ্ঞান মানুক বা না মানুক, এর পেছনে রয়েছে নানা অন্তঃস্রাবী রসের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া। নানারকম হরমোনের জটিল কারসাজি। তাই দেহের রহস্যকে জানতে গেলে প্রথাগত মানসিকতার বাইরে বেরিয়ে আসতে হয়। ভরসা করতে হয় নিজস্ব অনুভব আর শুভবোধের ওপর। বুঝলে জাফর, জীবন হল চেতনের খেলা। দুদিনের এই জীবন। তারপর তো অচেতন। সেখানে মানুষে মানুষে কোনও ভেদ নেই। কী হল জরি, তোমার চা হয়নি এখনও?
শেষ কথাটা যার উদ্দেশে হাঁক দিয়ে বলা, সে চায়ের ট্রে নিয়ে বারান্দায় এসেছে। সুগন্ধি দার্জিলিং চা। আমার দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, আমি আপনাদের কথা শুনছিলাম ভেতর থেকে। জাফর ভাই, দুদিনের তো এই জীবন। তাহলে মানুষে মানুষে এত ভেদাভেদ কেন বলতে পারেন? কেন এত ঈর্ষা আর হানাহানি? কেন এত রক্তক্ষয়?
আমি চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে বললাম, মানুষ ঈর্ষাকাতর জীব। অন্যের সাফল্য উদযাপন করতে গেলে যে মানসিক উদারতা দরকার তা আর ক’জনের থাকে! যেমন ধরো, কেউ কিছু অ্যাচিভ করেছে। ধরা যাক পার্থিব কিছু, হয়তো নিজের যোগ্যতাতেই তা করেছে। সেটা নাম-যশ-প্রতিষ্ঠা হতে পারে, জাগতিক সাফল্য হতে পারে, ধনদৌলত হতে পারে, পছন্দের নারী হতে পারে…। কিন্তু তা দেখে কিছু মানুষ জ্বলে যাচ্ছে গোপন ঈর্ষায়! কিছু মানুষের চরিত্রই তো এমন।
জরি বলল, সত্যিই তাই। কেউ হয়তো সকলের সামনে আপনার প্রশংসা করছে, কিন্তু সেটা সে করছে বুকে পাথর চাপা দিয়ে। এদিকে আড়ালে হা-হুতাশ করছে। ভেতরে ভেতরে জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। মনে তুমুল আক্ষেপ। ওপরওয়ালার কাছে অনুযোগ করে বলছে, ও কেন এই সাফল্য পেল? আমি কেন পেলাম না? আমি থাকতে অন্য কেউ কেন কিছু পাবে? অথচ সে একবারও যাচাই করে দেখছে না, সে তা পাওয়ার যোগ্য কি না।
আমি বললাম, যে ঈর্ষাকাতর মানুষ, সে তেমনই থেকে যাবে সারা জীবন। কেউ তার স্বভাব বদলাতে পারবে না। কিছু করার নেই। এটাই দুনিয়ার নিয়ম।
আনিস বলল, ঠিক। আর এটাই হল ট্র্যাজেডি। এই জায়গা থেকেই মানুষের অস্তিত্বের গভীরে গিয়ে নাড়া দেয় আমাদের বাংলার বাউল ফকিরদের গান। কী সহজ করে বলা কথাগুলো, অথচ গানের অর্থ কী গভীর! এখানেই লুকিয়ে আছে আমাদের লোকদর্শনের প্রাণশক্তি।
দু’বছর পর দেখা। অনেক বদলে গেছে আনিস। ভারী শরীর ছিল, মেদ ছেঁটে ফেলেছে অনেকটাই। একমুখ দাড়িগোঁফ ছিল, এখন ক্লিন- শেভেন। গায়ের রং আগে তেমন পরিষ্কার ছিল না, এখন ত্বকে বেশ জেল্লা এসেছে।
কালো ফুল-প্যান্ট পরে আছে। হাফ-হাতা নীল শার্ট। সরু ফ্রেমের চশমার কাচের আড়ালে বুদ্ধিদীপ্ত চোখের মণিদুটো জ্বলজ্বল করছে। উল্টোদিকের মানুষের ভেতর অবধি পড়ে নিতে পারে এমন অন্তর্ভেদী চোখ। আনিস চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে বলল, আবার যে আমাদের দেখা হবে সেটা কি তুমি কখনও ভেবেছিলে জাফর? সত্যি করে বলো তো?
জরি একটা সবুজ সালোয়ার পরে আছে। সেই রঙেরই ওড়না। আনিসের চেহারায় অনেকটা বদল এলেও জরি বিশেষ বদলায়নি।
বালুঘড়ির মতো শরীরের গঠন ছিল। ভারী বুক, সরু কোমর, গুরু নিতম্ব। এমন শারীরিক আকর্ষণ যে কোনও পুরুষের হৃদপিণ্ডের গতি বাড়িয়ে দিতে পারে। তামা মেশানো পেতলের মতো গায়ের রং, মরাল গ্রীবা, টিকালো নাক—সব যেমন ছিল তেমনই আছে। রেশমের মতো চুলের ঢাল কথা বলার সময় চোখের ওপর চলে আসত। তখন মাথা ঝাঁকিয়ে অবাধ্য চুল পেছনদিকে সরিয়ে নিত জরি। সেই শরীরী ভঙ্গিও রয়ে গেছে অবিকল। আয়ত দুটো চোখে কৈশোরের চাপল্য মাখা। গোলাপ-পাপড়ির মতো ঠোঁট। শব্দ না করে হাসছে জরি। সাদা গজদাঁত দেখা যাচ্ছে।
জরি হেসে বলল, আপনি কী ভেবেছিলেন জাফর ভাই? দুনিয়াকে আলবিদা জানিয়ে বেহেস্তে চলে গিয়েছি আমরা?
কী বলি এই প্রশ্নের উত্তরে? চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে কাপটা নামিয়ে রাখলাম!
বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেছে এই কটেজে এসেছি। কিন্তু এতদিন বাদে ওদের দুজনের সঙ্গে দেখা হওয়ার যে চমক, তাও আবার এমন এক আরণ্যক পরিবেশে, তার সঙ্গে এখনও ধাতস্থ হতে পারিনি। গলার ভেতরটা শুকিয়ে বালির মতো খরখরে হয়ে গেছে। বিব্রত একটা ভাব আমার মুখে ফুটে উঠল। আমতা আমতা করে বললাম, না, ঠিক তা নয়, আসলে…।
আনিস পায়রা ওড়ানো হাসি হেসে বলল, থাক হয়েছে। জরি, তুমি একটা কাজ করতে পারবে? ঘর থেকে চটপট একটা আরশি নিয়ে আসতে পারবে?
জরি অবাক হয়ে বলল, আরশি! আরশি দিয়ে কী হবে?
আনিস চোখ মটকে বলল, জাফরকে ওর থতমত খাওয়া মুখটা একবার দেখাব। ওকে কেমন দেখাচ্ছে ও নিজেই দেখুক।
একটা পাখি তীক্ষ্ণ শব্দে শিস দিয়ে ডানা ঝাপটে চলে গেল কটেজের বারান্দার একেবারে পাশ দিয়ে। চমকে উঠেছিলাম সেই শব্দে। সম্বিৎ ফেরার পর দেখি, আমার দিকেই হাসিহাসি মুখে তাকিয়ে আছে আনিস আর জরি। ওরা মজা পেয়েছে আমাকে অপ্রস্তুত অবস্থায় দেখে।
এদিকে আমার মুখে কোনও কথা জোগাচ্ছে না। এখনও হজম হচ্ছে না ব্যাপারটা। জরি হাসি সামলে বলল, থাক জাফর ভাই, বুঝেছি। আর মিথ্যে মিথ্যে সাফাই গাইতে হবে না।
চুপ করে গেলাম। সত্যি বলতে কী, জরি তো কথাটা নেহাত মিথ্যে বলেনি। আমার পক্ষে কী-ই বা ভাবা সম্ভব ছিল সেদিন? আমার জায়গায় অন্য কেউ হলেই বা কী ভাবত। ধূসর মৃত্যুর মুখ থেকে এমন করে যে কেউ ফিরে আসতে পারে, সেটা সেদিন শুধু আমি কেন, সকলেরই ভাবনার বাইরে ছিল।
কৃষ্ণপক্ষের ক্ষয়াটে চাঁদের আলো এসে পড়েছে আনিস আর জরির মুখে। আশ্বিন মাস। একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে এক পশলা। এখন মেঘ কেটে গেছে। হালকা পলকা কিছু সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে। দু-চারটে তারা দেখা যাচ্ছে। দুর্গাপুজো আর ক’দিন পর। আকাশ সেজে উঠছে শারদ উৎসবের জন্য। আনিস আর জরিকে দেখতে দেখতে দু’বছর আগের এমনই এক আশ্বিন মাসের এক ঝিমধরা দুপুরের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল বারবার।
