গোপন নদীর কিনারে – ১

ভুটান পাহাড়ের মাথা থেকে ঝাঁপ খেতে খেতে দোলনা নদী নেমে এসেছে হেমগুড়ি গ্রামে। ভুটানে এই নদীরই নাম ডুলুং। এখন যেখানে কনকচাঁদ দাঁড়িয়ে আছে, আগে সেই জায়গাটা দিয়ে দোলনা নদী বয়ে যেত। কালে কালে নদীর গতি বদলেছে। দোলনা সরে গেছে অন্যদিকে। পুরোনো মজা খাতটার নাম গোপন নদী। কে, কবে এই নাম দিয়েছে কে জানে! তবে এমন লাগসই নাম আর হয় না।

বর্ষাকালে অবিশ্রাম বৃষ্টি হলে বা পাহাড় থেকে হড়পা বান নেমে এলেও এই খাত শুকনোই থাকে। তবে ক্বচিৎ কদাচিৎ ভুটান পাহাড়ের মাথায় মেঘভাঙা বৃষ্টি হলে, সম্ভবত তখনই জল ঢুকে পড়ে গোপন নদীতে। আর একবার যদি গোপন নদীতে জল আসে তবে বুক কেঁপে ওঠে সকলের। এর অর্থ হেমগুড়ির কারও না কারও মাথার ওপর ঘনিয়ে এসেছে সর্বনাশের মেঘ। দু-চারদিনের মধ্যেই অপঘাতে মরতে হবে কাউকে না কাউকে।

শহুরে মানুষ হাসবে। নিছক গ্রাম্য কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেবে কথাটা। কিন্তু কনকচাঁদ জানে, প্রকৃতির খেলা বড় রহস্যময়, তা বোঝার সাধ্য মানুষের নেই।

এর আগে যতবার মজা খাতে জল এসেছে ততবারই হেমগুড়ির কারও না কারও চরম ক্ষতি হয়েছে। তার কাকা তিলু মণ্ডল যেমন। তিলু সাপের চামড়া বিক্রি করত। যেমন পরিশ্রম করতে পারত খেতেও পারত খুব। যজ্ঞিবাড়িতে তার খাওয়া দেখতে লোক জড়ো হয়ে যেত। একটা গোটা পাঁঠা নাকি একাই খেয়ে ফেলতে পারত দশাসই চেহারার তিলু। সেই মানুষটা একবার সাপ ধরতে গিয়ে দেখেছিল গোপন নদী দিয়ে জল বইছে তিরতির করে। বাড়ি এসে চোখ বড় বড় করে সবাইকে বলেছিল সে কথা। দু’দিনের মাথায় তিলু মারা গিয়েছিল গোক্ষুরের কামড় খেয়ে। তার ঊরুর কাছে জাত সাপটা ঢেলে গিয়েছিল অনেকখানি বিষ।

বনবিহারি রায়ের বউ শোভার ঘটনাটা আবার কনকচাঁদ শুনেছে তার বাপের কাছে। বাড়ি মেরামতির কাজে হাত দিয়েছিল কালীমন্দিরের পুরোহিত যুগলকিশোর চক্রবর্তী। ইট কিনতে ইটভাটায় গিয়েছিল সে। মজা খাত আর দোলনা নদী যেখানে মিশেছে সেখানে। ফেরার সময় দেখে গোপন নদীতে সকলের অলক্ষ্যে জল এসেছে। তখন কে জানত শোভার শেষের সময় ঘনিয়ে এসেছে। শোভা আর পাঁচজনের মতো ছিল না। সবসময় কেমন একটা ঘোরের মধ্যে থাকত। এক কথা জিগ্যেস করলে অন্য জবাব দিত। ফুলকির জন্ম দেবার পর বাড়াবাড়ি শুরু হয়।

ঘটনাটা ঘটল যুগলকিশোরের গোপন নদী দিয়ে জল বইতে দেখার পরদিন। ভোরবেলা ঘুম ভেঙে বনবিহারি দেখে তার পাশে শোভা নেই। নেই তো নেই, তার খোঁজ আর পাওয়াই গেল না। পুলিশ তদন্ত করে বলল, শোভা ভোররাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দোলনা নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল। নদীর স্রোত তাকে কোথায় নিয়ে গেছে কে জানে।

শুধু তাই নয়, দুলাল রায়ের মা যেবার ভেদবমিতে মারা যায়, রাজু ঘোষের মেয়ে ফলিডল খেয়ে আত্মহত্যা করে, কিংবা রতু কর্মকারের বাড়িতে যে বছর ডাকাত পড়ে, গোটা পরিবারের সবাইকে কুপিয়ে খুন করে ডাকাতরা, প্রতিটা ক্ষেত্রেই মজা খাতে জল এসেছিল তার আগ দিয়ে।

এখন কনকচাঁদ বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে দেখছিল নদীটাকে। ডাবের ভেতর যেমন করে জল আসে তেমনি করে কবে যে এই মরা খাতে জল এসেছে কে জানে। তার মানে হেমগুড়িতে খারাপ কিছু হতে চলেছে। খুব খারাপ।

চারদিকে লম্বা ঘাস। জায়গায় জায়গায় ধবধবে সাদা। পোকায় চাটা মাথার মতো এই জায়গাটা। খাবলা খাবলা সাদা চুল, মাঝে মাঝে চুল উঠে গিয়ে মসৃণ তেলতেলে টাক। সামনে যতদূর দু’চোখ যায় মুচকুন্দ, শেয়াকুল, বাবলার সারি আর ফণীমনসা, বনতুলসী, বাসকের ঝোপঝাড়। বাবলা, লিচু আর আমগাছের মতো দুটো-একটা বড় গাছও গজিয়েছে প্রকৃতির খেয়ালে এখানে ওখানে।

হাতে চটের থলে। ভেতরে শান দেওয়া ইস্পাতের ছুরি। টেরিকটের প্যান্ট হাটু অবধি গোটানো। প্যান্টের পকেটে শক্ত পাটের দড়ি। জ্যৈষ্ঠ গিয়ে আষাঢ় এসেছে। পাহাড়ে হয়তো বৃষ্টির মেঘ এসে পৌঁছেছে কিন্তু সমতল এখনও তপ। মেঘের দেখা নেই। এই সময়টা গর্ত ছেড়ে সাপেরা বেরিয়ে আসে। রোদ ঘন হয়ে আসার আগ অবধি চলাচল করে। এ সময় ছাইরঙের ব্যাং ঘোরে মাঠেঘাটে। ধানি ইঁদুর চরে বেড়ায়। পোকামাকড়ও থাকে কিছু। মাটি তেতে ওঠার আগে সেসবই মুখে তোলে সাপেরা। রোদের তেজ বাড়লে ঢুকে পড়ে গর্তে।

সকাল থেকে আকাশ পরিষ্কারই ছিল। এখন কনকচাঁদের চোখ গেল ওপরে। ভুটান পাহাড়ের দিক থেকে ছাই ছাই মেঘ উড়ে আসছে। ভাবগতিক ভালো নয়। যে কোনও মেঘের দল সময় দখল করে ফেলবে পুরো আকাশটাকে। কমলা গোল টিপের মতো সূর্যটা এখন ঠিক তার পিঠের দিকে। হাতে সময় নেই। পুবদিকে পিঠ দিয়ে সে হাঁটছে পা টিপে টিপে। তার মধ্যেই কড়া নজর রাখছে। দেখছে আশেপাশে কিছু চকচক করছে কি না। সজাগ থাকছে। খেয়াল রাখছে কানে কোনও বিজাতীয় শব্দ এলে যাতে সতর্ক হতে পারে।

নদীর এই মজা খাতটায় সাপের রাজত্ব। বহুদিন পর আজ ফের এদিকে এসেছিল কনকচাঁদ। চোখ সরু করে তাকিয়ে ছিল সামনের দিকে। এবার উৎকর্ণ হল সে। গাছের পাতা নড়ার শব্দ ছাপিয়ে সরসর শব্দ হচ্ছে না? ওদিকে কিছু একটা চকচক করছে মনে হচ্ছে যেন! কী ওটা? সতর্ক চোখে তাকাল কনকচাঁদ। হ্যাঁ, সাপই তো। দাঁড়াশ সাপ। কনকচাঁদ হাঁটছিল পা টিপে টিপে। যেন কোনও শব্দ না হয়। নিঃশব্দে সাপটার কাছে গিয়ে এক ঝটকায় তার ল্যাজের ডগাটা ধরে তুলে ধরল শূন্যে। সাপটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই খপ করে বাঁ হাত দিয়ে তার মাথাটা মুঠোয় চেপে ধরল। চাপ দিল আস্তে আস্তে। ঘাড়টা ভেঙে দিল সাবধানে, সামান্য মোচড়ে।

বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে কপালে। সাপের মাথাটা ঘষল মাটিতে। দু-চারবার ঘষতেই জীবটার মুখে রক্ত উঠে এল। শুকনো লতার মতোই নির্জীব সাপটা এলিয়ে পড়ল ঘাসজমির ওপর। উবু হয়ে বসে পড়ল কনকচাঁদ। মৃত সাপটাকে দেখে খারাপ লাগছে। কিন্তু মন খারাপকে লাই দিয়ে মাথায় তোলা যাবে না। এবার শুরু হবে তার আসল কাজ। চোখের পলক ফেলার আগেই চটের থলে থেকে ছুরিটা বের করল সে। এক নিমেষে ধড় থেকে আলাদা করে দিল সাপের মাথাটা। চিৎ করে সাপের লম্বালম্বি দেহটা চিরে দিল। নিপুণ হাতে ছাড়িয়ে নিল চামড়া। উল্টেপাল্টে দেখল ভালো করে। না, কোথাও কোনও খোঁচাখুঁচির দাগ নেই।

কনকচাঁদের ঘেমো মুখে ফুটে উঠল স্বস্তির হাসি। চামড়াটা নিখুঁত। ভালো দাম জুটে যাবে এটার জন্য। চামড়ায় ছোট্ট কোনও দাগ থাকলেই হতো মুশকিল। পাইকার কেষ্ট সর্দার টাকা দিত না। এর আগে এমন হয়েছে। তার মুখের ওপরই কেষ্ট তাচ্ছিল্য করে ছুড়ে দিয়েছে সাপের চামড়া। গালমন্দ করে ভাগিয়ে দিয়েছে তাকে। কখনও-কখনও তার কাকুতি-মিনতিতে যদিও বা কেষ্ট সর্দার সাপের চামড়া কিনেছে, সেক্ষেত্রে কমিয়ে প্রায় অর্ধেক করে দিয়েছে দাম। তাকে হাত পেতে নিতে হয়েছে সেই টাকা। উপায় নেই।

হেমগুড়িতে এই একজনই পাইকার। সে মাল না কিনলে যেতে হবে কয়েক কিলোমিটার পাশের গ্রাম বামনটারিতে। তাতে সময় লাগবে। গাঁটের কড়ি খসবে। হ্যাপাও কম নয়।

কনকচাঁদ সাপ ধরতে শিখেছে তার বাপের কাছ থেকে। দুলু মণ্ডল তাকে শিখিয়েছিল কেমন করে সাপ ধরতে হয়। কীভাবে হাতের মোচড়ে ভাঙতে হয় তার ঘাড়। কীভাবে ছাড়িয়ে নিতে হয় চামড়া। তার বাপই তাকে শিখিয়েছিল সাপ মারার পর দেরি করলে চলবে না মোটেই। দেরি হয়ে গেলে বা জলে ভিজলে পচতে শুরু করবে চামড়া। তখন সে হাফ-প্যান্ট পরে, বাপের সঙ্গে কেষ্ট সর্দারের আড়তে গিয়েছিল। তার মনে আছে, ফুট পাঁচেক মাপের একটা দাঁড়াশ সাপ ধরেছিল দুলু। ইঞ্চি মেপে সাপের চামড়াটাকে কেষ্ট পাঠিয়ে দিয়েছিল নুনঘরে। জনাচারেক মহিলা কাজ করে সেখানে। সাপের চামড়ায় নুন ভরে রাখে যাতে চামড়া শক্ত থাকে। দুলু তাকে বুঝিয়ে বলেছিল, যে ঘরে সাপের চামড়ায় নুন ভরা হয় তাকে বলে নুনঘর।

দুলু মণ্ডল সেই ছোটবেলাতেই তাকে স্পষ্ট বলে দিয়েছিল, তুই দাঁড়াশ কিংবা ঢ্যামনা ধর যত খুশি। পাইকার তার জন্য ভালো দাম দেবে তোকে। আর একটা কথা জেনে রাখিস বাপ, গো-সাপের চামড়ার অনেক দাম। তুই যতদূর ভাবতে পারিস তার চাইতেও বেশি। গো- সাপের চামড়া বিদেশে যায়। সাদা চামড়ার লোকেদের কাছে তার কদর বেশি। একটা গো-সাপ ধরতে পারলে বুঝবি তুই লটারি পেয়ে গেলি। কাজেই ছোটখাটো সাপ ধরে লাভ নেই। যত বড় সাপ ধরবি তত পয়সা। ইঞ্চি মেপে দাম দেবে পাইকার।

কনকচাঁদ কথাটার মর্ম বুঝতে পেরেছিল। দুলু বুঝিয়ে বলেছিল, তবে আর যা-ই কর, ভুলেও জাত সাপের ধারেকাছে যাস না। ও সাপের চামড়া বড় পাতলা। দাম তো পাবিই না উল্টে জানটাও চলে যেতে পারে। একবার তোর শরীরে বিষ ঢেলে দিলে আর রক্ষে নেই। আমার ভাই তিলুর মতো সাপ এই তল্লাটে কেউ ধরতে পারত না। সে অকালে মরেছিল জাত সাপের ছোবলে। ওঝাকে আনানো হয়েছিল। বামনটারির নাম করা গুণিন। কিন্তু সে কিছু করার সময় পেল না। মুখে গ্যাঁজলা উঠল, সকলের চোখের সামনে তিলুর দম বেরিয়ে গেল।

আকাশ ঢেকে গেছে মেঘে। ছাই রঙের মেঘের রং বদলে গেছে। পাঁশুটে রং ধারণ করেছে আকাশ। গাছের পাতা একটুও নড়ছে না আর। দমবন্ধ গুমোট। গুমগুম শব্দ ভেসে আসছে কানে। শব্দ করে বাজ পড়ছে দূরে কোথাও। যে কোনও সময় বৃষ্টি নামবে। চটের থলের মধ্যে সাপের চামড়াটাকে পুরে নিয়ে হনহন করে হাঁটছিল কনকচাঁদ। আড়তে পৌঁছতে হবে তাড়াতাড়ি। চটের থলেটা ভিজে গেলে হবে মুশকিল। চামড়া একবার পচতে শুরু করলে ভালো দাম পাওয়া যাবে না। জুটবে না চাল-ডাল-আনাজ কেনার পয়সা।

একটা অবোলা প্রাণীকে মেরে ফেলতে কারই বা ভালো লাগে! কিন্তু এটাই কনকচাঁদের জীবিকা। তার আজও মনে আছে, প্রথম যেদিন সে সাপ মেরেছিল সেদিন কী ভীষণ অস্বস্তি হয়েছিল। আলু-পটলের তরকারি হয়েছিল ঘরে। তার প্রিয় খাবার। কিন্তু সেদিন খেতে ইচ্ছে করছিল না মোটেই। দু’গরাস ভাত মুখে পুরেছিল অনেক কষ্টে। সঙ্গে সঙ্গে বমি হয়ে গিয়েছিল পুরোটা। তার ভেতরটা ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল সেদিন।

গোঙাচ্ছিল সে। হিক্কা উঠে গিয়েছিল কাঁদতে কাঁদতে। তার বাপ নিঃশব্দে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। কিছুক্ষণ কাঁদতে দিয়েছিল ব্যাটাকে। কনকচাঁদের পিঠে হাত রেখে নরম গলায় বলেছিল, চোখের জল মুছে নে। জেনে রাখ, বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছু করতে হয় মানুষকে।

দুলু আজকাল ঘরেই থাকে বেশি। সাপ ধরা ছেড়ে দিয়েছে। সাপের ওঝা নয়, ‘কারিগর’ হিসেবে তাকে চেনে হেমগুড়ির লোক। সকলে বলাবলি করে, দুলু যেমন সাপ চেনে বিষও নামায় তেমনি। রাতবিরেতে ও তার কাছে ছুটে আসে সাপে কাটা রুগির বাড়ির লোক। হাত-পা ধরে সাধে। তার টাকাপয়সার খাই নেই। মর্জি হলে তবেই যায় সাপে কাটা রুগির বাড়ি। যে যা দেয়, নেয়। হাতের বাইরে চলে যাওয়া কেস বুঝলে রুগিকে দেরি না করে নিয়ে যেতে বলে হাসপাতালে।

গোপন নদী যেখানে দোলনা নদীর সঙ্গে গিয়ে মিশেছে সেই জায়গাটা পাকা রাস্তা থেকে দেখা যায় না। অমল দাসের ইটভাটা লাগোয়া ধানখেতের দিকটায় গেলে তবেই দেখা যায়। নদীর এদিকের পাড়ে ফি-বছর মাঘ মাসে মেলা বসে। ওপারে শ্মশান।

বহু বছর আগে এক তান্ত্রিক এসে ঘাঁটি গেড়েছিল সেখানে। লাল মুলোর মতো গায়ের রং, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, কাঁধ অবধি জটাজূট, লাল চোখ। লোকে কপালে হাত ঠেকিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে সাধুর নাম উচ্চারণ করত। বলত গাউকি বাবা। হিন্দুস্থানি সাধু, কথা বলত হিন্দিতে। তার এক চেলা একদিন এসেছিল দুলুর কাছে।

গাউকি বাবার শঙ্খিনী সাপের হাড় চাই। হয়তো তন্ত্রসাধনার কাজে লাগবে। দুলু সময় চেয়ে নিয়েছিল এক সপ্তাহ।

সাপ ধরতে রোজ সকালে বেরিয়ে পড়ত দুলু। কপাল জোরে দু’দিনের মাথায় সে একটা মরা শঙ্খিনীর দেখা পেয়ে গিয়েছিল গোপন নদীর তীরে, একটা আশশ্যাওড়ার ঝোপের মধ্যে। বিশাল সেই সাপের চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে পাইকারের কাছে বিক্রি করেছিল দুলু। গাউকি বাবার কাছে নিয়ে গিয়েছিল সাপের হাড়টা। সাধু প্রসন্ন গলায় বলেছিল, খাঁটি জিনিস এনেছিস বেটা। কত পারিশ্রমিক চাস বল। দুলু জিভ কেটে বলেছিল, ছি ছি! এ কী বলছেন সাধুবাবা, আপনার কাছ থেকে টাকা নিলে নরকেও আমার জায়গা হবে না।

কিছুদিন সেই তান্ত্রিকের সঙ্গ করেছিল দুলু। সারাদিন সাপ ধরার ধান্দায় এদিক-ওদিক ঘুরত। সন্ধের পর চলে যেত শ্মশানে। গভীর রাতে বাড়ি ফিরত। অমাবস্যা তিথি হলে সারা রাত পড়ে থাকত গাউকি বাবার আস্তানায়। কনকচাঁদ তখন ছোট। চেনা বাপের অচেনা মূর্তি দেখে ভয় পেত। হাজার ডাকলেও বাপের ধারেকাছে ঘেঁষত না।

সাধু হেমগুড়ি ছেড়ে চলে গেল একদিন। যাবার আগে দুলুকে শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিল কিছু গুপ্তবিদ্যা। সেই থেকে এই এলাকার কাউকে অপদেবতা ভর করলে ডাক পড়ে দুলু মণ্ডলের। ধূপধুনো, শুকনো লঙ্কা, পদ্মযোনির শিকড় পুড়িয়ে ধুনি জ্বালিয়ে মন্ত্র পড়ে। হেমগুড়ির লোক বলে দুলু মণ্ডলকে নাকি ভূতেও ভয় পায়।

হাঁটার গতি বাড়াল কনকচাঁদ। বেলাবেলি পৌঁছতে হবে কেষ্ট সর্দারের কাছে। গোপন নদীর ধার বরাবর কিছুটা গেলে বাঁ হাতে অনেকটা ধানিজমি পার করার পর অমল দাসের ইটভাটা। আলপথ ধরে হাঁটছিল কনকচাঁদ। যা আশঙ্কা করছিল তা-ই হল। শুরু হল উথাল-পাথাল বৃষ্টি। বাজ পড়তে শুরু করল প্রচণ্ড শব্দে। হাতে ধরা চটের বস্তাটা আঁকড়ে ধরল সে। যতটা আগলে রাখা যায়। বস্তাটা ভিজে গেলে চামড়ায় পচন ধরবে। তখন এত ভালো জিনিসের দাম পাওয়া যাবে না। পরিশ্রমটাই মাটি হয়ে যাবে।

এমন সময় কুকুরের ডাক কানে এল কাছ থেকে। আওয়াজটা জোরালো। অবাক হল কনকচাঁদ। দেশি কুকুর নয়, বড় জাতের কুকুর। চাষাভুষো শ্রেণির লোক থাকে এই গ্রামে। বিলিতি কুকুর পোষার শখ বা সাধ্য হেমগুড়ি গ্রামের মানুষের নেই। কনকচাঁদের গায়ের রোম দাঁড়িয়ে গেল। কেউ কি চিৎকার করে উঠল? কেমন ধুপধাপ শব্দ শোনা গেল না? কেউ কি পালাচ্ছে? কুকুরটা কি তাড়া করছে কাউকে কনকচাঁদ দেখল কালো প্যান্ট-নীল জামা পরা কেউ ঝোপঝাড় ভেঙে উদভ্রান্তের মতো দৌড়চ্ছে। বৃষ্টির ঝালরের মধ্যে স্পষ্ট কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তার মধ্যেও লোকটার পিঠ দেখতে পেল সে। পেছন পেছন বিশাল চেহারার খয়েরি মতো একটা চারপেয়ে জন্তু ছুটছে। শব্দটা দ্রুত মিলিয়ে গেল।

হেমগুড়ি শান্তশিষ্ট গ্রাম। এখানে চুরি-ডাকাতি হয়নি বহুদিন। রাজনৈতিক আকচা-আকচি তেমন নেই। খুন-জখমের মতো ঘটনা ঘটে না বললেই চলে। পুলিশের এদিকে আসার দরকার পড়ে না। সেই জায়গায় কী এমন ঘটনা ঘটল? মুখ ফেরাল কনকচাঁদ। ধানখেতের ওদিক থেকে ক্ষীণ গোঙানির মতো কেমন একটা শব্দ ভেসে আসছে না? হ্যাঁ, তা-ই তো। ওদিকে ফণীমনসা আর আশশ্যাওড়ার ঘন ঝোপ। তার আড়ালে কিছু কি পড়ে আছে? পা টিপে টিপে এগোলো কনকচাঁদ।

সামনে গিয়ে চক্ষুস্থির কনকচাঁদের। ধানখেতের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে আছে এক যুবতী। গায়ে একটা সুতো অবধি নেই। মেয়েটাকে কি মার্ডার করে রেখে গেছে কেউ? বৃষ্টিফোঁটা পড়ছে অবিরাম। সেই জলে স্নান করছে উপুড় হয়ে থাকা শরীরটা। গায়ের রং ফর্সা নয়, তামাটেও নয়, কালোই বলা যায়। মেয়েটার মুখটা দেখা যাচ্ছে না। ঢোক গিলতে গিয়ে কনকচাঁদ দেখল সে ভুলে গেছে কী করে ঢোক গিলতে হয়। অবশ হয়ে গেছে তার মুখের তালু, জিভ, মস্তিষ্ক। মুখ দিয়ে যে কোনও শব্দ বের করবে, সে ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে সে।

ঝিমঝিম করছে মাথা।

কনকচাঁদের বন্ধুদের কেউ কেউ টাউনের বেশ্যাপল্লীতে গিয়ে যৌন অভিজ্ঞতার স্বাদ নিয়ে এসেছে। সেসব দুঃসাহসিক গল্প তাদের মুখে শুনে বুক ঢিবঢিব করেছে তার। মেয়েছেলে নিয়ে ফূর্তি করার মতো না আছে তার কলজেতে দম, না আছে টাকা। তবে তার মোবাইল ফোন আছে। হাতে বাড়তি পয়সা এলে নেটপ্যাক ভরে তাতে। বন্ধুরা তাকে ন্যাংটো মেয়েদের রগরগে ভিডিও পাঠায়। সেসব চালিয়ে কনকচাঁদ ঘরের দরজা বন্ধ করে স্বমেহনের স্বাদ নেয়। তবে জীবনে এই প্রথম কোনও জামাকাপড় না পড়া কোনও রক্ত-মাংসের যুবতীকে সে সামনে থেকে দেখল।

মেয়েটার চোখদুটো আধখোলা। মুখ থেকে গড়িয়ে নামছে কষে মতো কিছু। মেয়েটা কি তার চেনা? হেমগুড়িরই কেউ কি? উবু হয়ে বসল কনকচাঁদ। টের পেল তার বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। চটের

ব্যাগটা খসে পড়ল আলগা হাত থেকে। কী সর্বনাশ, এ তো বনবিহারি রায়ের মেয়ে ফুলকি।