গোপন নদীর কিনারে – ৭

বিস্তীর্ণ মজা খাত। জল নেই একটুও। এককালে ভুটানের ডুলুং নদী এই খাত দিয়ে বয়ে যেত। বেশ খানিকটা পথ গিয়ে মিশত দোলনা নদীতে। ওদিকটায় ধানখেত। কাছেই অমল দাসের ইটভাটা। নদীর তীরে সবজি লাগিয়েছে কেউ। সবজি বাঁচিয়ে আল দিয়ে চলতে হয়। যারা সবজি লাগিয়েছে সেই দু-এক ঘর মানুষ খেতের দেখ-ভাল করার জন্য ঘর বেঁধে আছে।

ঘর বলতে খড়ের ঘর। বাইরে এক চিলতে উঠোন। সেই উঠোনে টুকুর টুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটা বাচ্চা মুরগি। দুটো ছাগলছানা। একটা দেশি কুকুর। একজন মাঝবয়সি বউ কোমরে হাত রেখে চোখ সরু করে তাকিয়ে দেখছে তাদের।

সূর্য অস্ত গেল এইমাত্র, দিকচক্রবালের ওপারে। গোধূলির আলোয় এই বিশাল বিস্তার স্নান করছে।

অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে গোপন নদীর দিকে চলে এসেছিল চন্দ্রচূড়। গোপন নদী যেখানে দোলনা নদীতে গিয়ে মিশেছে সেখানে দুলু মণ্ডলের সঙ্গে দেখা। দুলু একাই বসেছিল নদীর ধারে। জলে পা ঢুবিয়ে। চেনা মানুষ দেখে পাশে গিয়ে বসেছিল চন্দ্রচূড়। দুলু একটা বিড়ি ধরিয়েছিল। সুখটান দিচ্ছিল চোখ বন্ধ করে। বিড়িতে গাঁজা পোরা আছে। গাঁজার গন্ধে ম ম করছে জায়গাটা। ট্যাঁক থেকে একটা বিড়ি বের করে এগিয়ে দিল চন্দ্রচূড়ের দিকে। হেসে বলল, চলবে?

চন্দ্রচূড় হাত উল্টে বলল, এখন ইচ্ছে করছে না।

দুলু মণ্ডল বলল, আমাদের তো সারা বছর কোনও না কোনও পুজো লেগেই থাকে। দুর্গাপুজো, কালীপুজো যা-ই হোক, দোলনা নদীর এই জায়গাটায় ঠাকুর ভাসান হয়। আরও একটু এগিয়ে এসে বসুন। এখানে হাঁটুজলও নেই। একটা বড় পাথরে বসে জলে পা ডোবান, আরাম পাবেন।

দুজন পাশাপাশি বসে আছে নদীর তীরে। নদীর ওপারে শ্মশান। দুলু মণ্ডল বলল, নদীর এ পারে মেলা বসে। মাঘ মাস পড়লে দেখবেন। বহু লোক আসে।

দুলু মণ্ডল নদীর জলে বিড়ির শেষ অংশটুকু ফেলে দিয়ে বলল, ওই শ্মশানেই একবার এসেছিল গাউকি বাবা। মানুষটা আমার জীবনটাই বদলে দিল। আগে সাপ মেরে চামড়া বিক্রি করতাম পাইকারের কাছে। এই করেই পেট চলত। গাউকি বাবা বুঝিয়ে বলল, আমাদের প্রত্যেকের ভেতর আছে মূলাধার চক্র। সেখানে ঘুমিয়ে আছে একটা সাপ। তাকে বলে কুলকুণ্ডলিনী। বেটা, তুই সাপ ধরা ছেড়ে সেই কুলকুণ্ডলিনীর সাধনা কর। আরও অনেক কিছু বলল। আমার ভাবনা-চিন্তা আর আগের মতো রইল না।

চন্দ্রচূড় বলল, কুণ্ডলিনীর কথা আমাদের শাস্ত্রে আছে শুনেছি। তাকে জাগানোই নাকি সাধকের উদ্দেশ্য। সত্যি?

দুলু মণ্ডল বলল, গাউকি বাবা জ্ঞানী মানুষ। তিনি বলতেন সৃষ্টির দুটো দিক। একদিকে শূন্যতা, অন্যদিকে বস্তুজগৎ। কুণ্ডলিনীকে বলে শক্তি। সেই শক্তি এসেছে শূন্যতা থেকেই। এই শক্তিকেই আমরা বলি শিব। শিব হল সাধকের শরীরের শূন্যতা। তার ভেতরই শক্তি জাগছে। একে বলে কুলকুণ্ডলিনী জাগা। এই শক্তিই আমাদের ইচ্ছে, ক্রিয়া আর জ্ঞান। এই শক্তিকে আয়ত্ত করাই সাধক জীবনের মূল উদ্দেশ্য। আমার কী মনে হয় জানেন, আগের জন্মে অনেক পুণ্য করেছিলাম তাই এমন পুণ্যাত্মার কাছাকাছি এসেছিলাম।

চন্দ্রচূড় বলল, গত বছর কায়েতপাড়ার বনবিহারি রায়ের মেয়ে ফুলকির ওপর অমানুষিক অত্যাচার করেছিল একজন। হাসপাতালে নিয়ে যাবার পরও ডাক্তাররা তার নাড়ি খুঁজে পায়নি। তখন শুনেছি আপনি এসে ক্রিয়াকর্ম করেন, ফুলকি চোখ খোলে। কিন্তু মেয়েটার মধ্যে নাকি একটা পরিবর্তন এসেছে। আগে সারাদিন বাইরে বাইরে থাকত, এখন ঘর থেকে বেরোয় না, কথা বলে না কারও সঙ্গে। লোকে বলে ফুলকির মধ্যে অন্য আত্মা এসে ঢুকেছে। আপনি জানেন সে কথা?

দুলু মণ্ডল নিচু গলায় বলল, ফুলকির শরীর আর মনের ওপর দিয়ে বিশাল ঝড় গেছে। ঝড় গেলে তার ছাপ তো পড়েই। ফুলকিকে অপদেবতা ভর করেনি। তবে শোভার ব্যাপারটা ছিল আলাদা। শোভা এই দোলনা নদীরই জলে ডুবে নিখোঁজ হয়েছিল। লাশ আর পাওয়া যায়নি। যে ঘরে ওরা দুজন থাকত সেই ঘরে বনবিহারির থাকতে অসুবিধে হচ্ছিল। সে আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল ওর বাড়িতে। বনবিহারির সঙ্গে এক পাঠশালায় পড়েছি। ওর অনুরোধ ফেলি কী করে।

চন্দ্রচূড় বলল, একটা কথা জিগ্যেস করব? ভূত-প্রেত এসবের অস্তিত্বে আপনি বিশ্বাস করেন?

না করার তো কিছু নেই। দেবতা যেমন আছে অপদেবতাও আছে। কাউকে অপদেবতা ভর করলে যেমন তাড়াতেও পারি, আবার ইচ্ছে করলে আবাহন করে নিয়েও আসতে পারি।

দুলু মণ্ডলের দুই চোখ লাল। গলাটা খাদে নিয়ে গিয়ে বলল, আমি আর যুগলকিশোর দুজনই বনবিহারির বন্ধু। ওর বিয়ের আগে থেকেই রায়বাড়িতে আমাদের যাতায়াত ছিল। আমরা দুজনই জানি, বিয়ের পর শোভার সঙ্গে বনবিহারির সম্পর্ক দানা বাধেনি কখনও। তবে ঝগড়াঝাঁটি করার মেয়ে শোভা ছিল না। বনবিহারি হুলুস্থুল বাধালে শোভা চুপ করে থাকত। ফুলকির জন্মের পর দুজনের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়ে যায়। বনবিহারি ওর বন্ধুদের সন্দেহ করত। অপ্রিয় পরিস্থিতি এড়াতে আমরা দুজনই ওর বাড়ি যাওয়া ছেড়ে দিই। তবে শোভা নিখোঁজ হবার পর যখন বনবিহারি এসে আমাকে ধরল আমি আর না করতে পারলাম না। আমি ওর বাড়ি গিয়ে গিয়ে যা ক্রিয়াকর্ম করার করি। সে সময় শোভার বিদেহী আত্মা যদি এসেও থাকে, সে ফিরে গেছে প্রেতলোকে।

চন্দ্রচূড় বলল, একটা অনুরোধ ছিল আপনার কাছে। ফুলকির কুকুরটা বন-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। রাতে এক-একদিন আসে বনবিহারি রায়ের বাড়িতে। কুকুরটা এলে ফুলকি দোতলার কোণের ঘরটায় গিয়ে আদর করে কুকুরটাকে। পচা একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে বাড়ি জুড়ে। আমার বমি পায় সেই গন্ধে। আমি বনবিহারি রায়কে বলেছি। আমল দেয়নি। মুশকিল হল, হেমগুড়িতে মাথা গোঁজার মতো আস্তানাও তেমন নেই। আপনার সন্ধানে কিছু থাকলে একটু দেখবেন তো।

দুলু মণ্ডল উঠে পড়ল। চন্দ্রচূড়ের দিকে তাকিয়ে আলগা গলায় বলল, ঠিক আছে দেখব। চলুন, এবার ফেরা যাক।