গোপন নদীর কিনারে – ৯

হেমগুড়ি গ্রাম্য এলাকা। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো নয়। গাড়ি-ঘোড়া অপ্রতুল। একটা ঝাঁকড়া বটগাছ দাঁড়ানো বড় রাস্তার মোড়ে। তার গায়ে পেরেক দিয়ে লাগানো একটা জং ধরা টিনের সাইনবোর্ড। সিমেন্ট দিয়ে গোল করে বাঁধানো জায়গাটা। ওপরে শেড নেই কোনও। সেখানেই যাত্রীরা বাসের জন্য অপেক্ষা করে। সারাদিনে দু-একটা লজঝড়ে বাস আসা- যাওয়া করে এই পথ দিয়ে। শেয়ারের জিপ আসে কখনও কখনও। প্যাসেঞ্জার কালেভদ্রে ওঠে বা নামে এই স্টপেজ থেকে।

হাইওয়ে অবধি পঞ্চায়েত এলাকা। তার ওদিকে জঙ্গল। রেল লাইন চলে গেছে জঙ্গলের বুক চিরে। রেল স্টেশন নেই। ট্রেন দাঁড়ায় না এখানে। সুবোধদা চন্দ্রচূড়কে বলেছিলেন, তুমি তো যাচ্ছ হেমগুড়ি। ওখানে গেলে নিজেই বুঝতে পারবে উনিশ শতকের পর সভ্যতা অনেকটা পথ হেঁটে এলেও হেমগুড়ি এখনও সেখানেই আটকে আছে।

এখানে এসে চন্দ্রচূড় বুঝতে পারছে সুবোধদা ভুল কিছু বলেননি। এই জায়গাটা সত্যিই অদ্ভুত। বড় রাস্তা থেকে খানিক দূর দিয়ে বয়ে গেছে একটা মরা খাত। এখানে পা রেখে একটা অবিশ্বাস্য কথা শুনেছিল চন্দ্রচূড়। ওই মরা খাতে কখনও জল চলে এলে বিপদ ঘনিয়ে আসে হেমগুড়ির কারও না কারও ঘরে। কেউ না কেউ মারা যায় দুর্ঘটনায়। নদীটার নামও অদ্ভুত। গোপন নদী।

শেষবার এই নদীতে জল এসেছিল গত বছর। তখনই ফুলকির দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটা ঘটেছিল। কাকতালীয় হলেও প্রাণহানি হয়েছিল। ফুলকি বেঁচে গেলেও রেলে কাটা পড়ে মারা গিয়েছিল গৌরব বসাক।

এর মধ্যে একদিন মজা খাতটা দেখতে গিয়েছিল চন্দ্রচূড়। দেখা হয়েছিল দুলু মণ্ডলের সঙ্গে। এককালে জল বইত, এখন বালির রাজত্ব। ঘরবাড়ি নেই। তবে চাষবাস করে কেউ কেউ। আশ্বিন আসার অনেক আগে থেকেই জন্মাতে শুরু করে দেয় কাশের ঝোপ। সাপ চরা করে এদিকে।

বড় নদীতে বর্ষায় জল আসে। যাবার সময় তারা শিকড়-বাকড়ের মতো অজস্র নালা তৈরি করে নেয় মূল নদীতে ফেরার জন্য। এই নদীতেও জল ছিল একসময়। এখন আর আসে না। কখনও জল এলে সেই জল গিয়ে মেশে দোলনা নদীতে। দোলনা নদীও আগের মতো পুরুষ্টু নেই। তার ধারাও ক্ষীণ।

বেলাবেলি এদিকটায় এসেছিল চন্দ্রচূড়। কিন্তু বুঝতে পারেনি, এসব দিকে সন্ধ্যা ঝুপ করে নামে।

গরুর পাল নিয়ে বাড়ি ফিরছিল রঘু। ব্যাংকে আসা-যাওয়ার সূত্রে পরিচয়। হাসল তাকে দেখে। আলো কমে আসছিল। জমাট বাঁধছিল অন্ধকার। শুকনো ঝোপঝাড় দাঁড়ানো ছিল দেওয়ালের মতো। এক ঘাস কাটুরে ঘাস কাটছিল আপনমনে। তাকে পাশ কাটিয়ে গোপন নদীর কিনার দিয়ে আরও খানিকটা গিয়ে পৌঁছনো গেল অমল দাসের ইটভাটায়।

ইটভাটার কাছে ধানখেত। নদীর ধারে একটা সারসের মতো বড়সড় চেহারার পাখিকে দেখতে পেল চন্দ্রচূড়। ছবি তুলে রাখল মোবাইলে। তটিনীর দাদা তিমিরের ফোটোগ্রাফির ঝোঁক আছে। পাখির ছবি তোলে। তিমিরকে পাঠাবে এক সময়। জানতে চাইবে এটা ড্যামজেল ক্রেন কি না। তবে এই বিশালাকার সারস যে পরিযায়ী পাখি তাতে কোনও সন্দেহ নেই। শীতকালে হয়তো দল বেঁধে এসেছিল এদিকে। হাওয়ায় ভেসে দলছুট হয়ে গেছে। বাকিরা শীতশেষে হিমালয় পার হয়ে ফিরে গেছে নিজেদের দেশে। এই পাখিটা রয়ে গেছে। স্থানীয় লোকেরাই হয়তো যত্ন করে। খেতে দেয়। পাখিটা হয়তো বেঁচে আছে পরের শীতের অপেক্ষায়, দলের সঙ্গে দেখা হবে এই আশায়।

ফিরে আসছিল চন্দ্রচূড়। হামিদুলের সঙ্গে দেখা। হামিদুলের রিকশায় উঠে পড়ল সে। গল্প করতে করতে ফিরে এল ঘরে। চিনুদি চিঁড়ের পোলাও বানিয়েছে ঘি গরমমশলা দিয়ে। রান্নাঘরে গিয়ে চা দিয়ে চিঁড়ের পোলাও খেল চন্দ্রচূড়। নিজের দোতলার ঘরে গিয়ে আয়েশ করে একটা সিগারেট ধরাল। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে একবার ফোন করল তটিনীকে। লাইন খারাপ। ফোন গেল না। আধঘণ্টা পর আবার চেষ্টা করল। এবারও নেটওয়ার্ক খারাপ।

বনবিহারির হাঁফের দোষ আছে। ছোটবেলায় পড়ে গিয়ে হাঁটুতে চোট পেয়েছিল। পূর্ণিমা অমাবস্যায় ব্যথাটা টাটায়। তখন বাইরের উঠোনে এসে বসে থাকে। খকখক করে কাশে। এখনও বিড়বিড় করে কী সব বলছিল। চিৎকার করে বলছিল, যাহ্! যা তো এখান থেকে! চন্দ্রচূড় আর পারল না। সিগারেট ফেলে নেমে এসেছিল নীচে। বনবিহারির উদ্দেশে বলল, কাকে তাড়াচ্ছেন? কিছু তো নেই আশেপাশে!

বনবিহারি অপ্রস্তুত গলায় বলল, আমি তো ভাবলাম খৈরি! আর বলবেন না, বয়স তো কম হল না। চোখে ছানি পড়েছে। ভালো দেখতেও পাই না আজকাল। ছানি কাটাতে গেলে যেতে হবে শহরে। ইচ্ছে করে না।

দোতলায় উঠে এল চন্দ্রচূড়। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল নীচে বসে থাকা বনবিহারিকে। আবছা আঁধারে সব কিছুই রহস্যময় লাগে চন্দ্রচূড়ের। এই বাড়ির মানুষগুলো অদ্ভুত। খৈরি নামের কুকুরটাও কি কিছু কম? আর ফুলকি? এতদিন হল এই বাড়িতে সে আছে ফুলকি তার সঙ্গে একটা কথাও আজ অবধি বলেনি। শুধু চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে থেকেছে তার মুখের দিকে। সেই দৃষ্টি দেখলে গা ছমছম করে। চন্দ্রচূড় নিজেও চায় না এই মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে। ফুলকিকে দেখলেই তার কেন যেন গৌরব বসাকের অপমৃত্যুর কথা মনে পড়ে।

মোবাইলের নেটওয়ার্ক পরিষেবা ভালো হল দশটার পর। কথা হল তটিনীর সঙ্গে। কল ড্রপ হয়ে যাচ্ছিল মাঝেমধ্যেই। ফুলকির ব্যাপারেই কথা হচ্ছিল। তটিনী বলছিল, আমার মনে হয় এক বছর আগের ট্রমা আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি বেচারি। সে কারণেই এমন আচরণ করে। ওকে নিয়ে কেউ ডাক্তারের কাছে যাচ্ছে না কেন?

চন্দ্রচূড় বলল, এখানকার লোক মনে করে ডাক্তার কিছু করতে পারবে না। যদি ফুলকিকে ভূতপ্রেত ধরে থাকে তবে দুলু মণ্ডলই যা করার করবে। আসলে এই হেমগুড়ি যেন এই পৃথিবীরই বাইরে। সূর্য ডোবার পর থেকেই গোটা এলাকা নিঝুম হয়ে পড়তে থাকে। বাড়ি থেকে বড় একটা বেরোয় না কেউ। পুরো জায়গাটাই ভূতুড়ে হয়ে যায়। আমাদের ওদিকে এত আলো, এত গাড়ি-ঘোড়া, এত হৈহট্টগোল, তার মধ্যে নাগরিক জীবনের স্ট্রেস। অন্য কিছু ভাবার সময়ই থাকে না। কিন্তু এখানে সন্ধের পর কিছু করার থাকে না। তখন একটু হলেও আনক্যানি ফিল হয়।

তটিনী বলেছিল, মানুষ যে ভয় পায় তার কারণ হল পরিবেশ। এমন নিস্তব্ধ নির্জন জায়গায় তো গা ছমছম করবেই। ওসব কথা থাক। অন্য কথা বলো। তোমার ঘরের কাছেই তো জঙ্গল, নদী আর পাহাড়। তোমাদের ব্যাংকের গাড়ি আছে না? সেই গাড়ি নিয়ে একদিন জঙ্গল বা পাহাড় ঘুরে এসো। একঘেয়েমি কাটবে। ভালো লাগবে।

চন্দ্রচূড় বলেছিল, একদিন প্ল্যান আছে যাওয়ার। উইকেন্ডে তো এখানে থাকাই হয় না। থাকলে যাওয়াই যেত। এখানকার গোপন নদীটা আমাকে টানে খুব। নদী তো নয়, মজা খাত। নদীটাকে নিয়ে একটা কিংবদন্তি আছে বলেই হয়তো একটা বাড়তি আকর্ষণ জন্মেছে মনের মধ্যে। ওদিকটায় যাই মাঝেমধ্যে। আলাপ হয় লোকাল মানুষজনের সঙ্গে। যে সাপ মেরে চামড়া বিক্রি করে সেই কনকচাঁদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। সাপ মারা যে অপরাধ সেই বোধ তার বিলক্ষণ আছে। সে কথাই বোঝাচ্ছিলাম সেদিন। কিন্তু পেটের বালাই বড় বালাই। কনকচাঁদ নিজেও টাকা রোজগারের অন্য কোনও রাস্তা খুঁজছে।

দুলু মণ্ডলের সঙ্গেও পরিচয় হয়েছে। আগে সাপের চামড়া বিক্রি করত। এখন তন্ত্রসাধনা করে। লোকে বলে ‘কারিগর’। দুলু মণ্ডলকে আমার চিটিংবাজ টাইপ মনে হয়নি। আর তাই খটকা লাগছে।

খটকা বলতে?

ফুলকির হার্ট সেদিন কিছুক্ষণ কাজ বন্ধ রাখলেও ব্রেন-ডেথ হয়নি। এটা কোইন্সিডেন্স যে, দুলু মণ্ডল যখন ঝাড়ফুঁক করছিল তখনই ফুলকি চোখ মেলে। ঝাড়ফুঁক না করলেও হয়তো চোখ খুলত। কিন্তু আমার খটকার জায়গাটা হল, ফুলকির জ্ঞান ফেরার পর তার গলার আওয়াজ বদলে গেল কী করে?

সেটা গেস করতে পারি। সেদিন গৌরব যখন রেপ করার পর ফুলকির গলা টিপে ধরেছিল তখন হয়তো মেয়েটার ভোকাল কর্ডের ক্ষতি হয়েছে। এই লজিক যদি অ্যাবসার্ড মনে হয়, তবে আরও একটা যুক্তি দিতে পারি। ফুলকির ভোকাল কর্ডে কোনও নডিউল ফর্ম করে থাকতে পারে। তা থেকে স্বর বদলাতেই পারে। কোনও ভালো ইনএনটি ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেই সেটা ক্লিয়ার হয়ে যাবে। শোনো, তুমি একটু বেশিই ভাবছ। ফুলকি আর পাঁচজনের মতোই একটা নরমাল মেয়ে। ওর মধ্যে ভূত-প্রেত-জিন কিছুই ঢোকেনি।

তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি, যে ঘরে অচেতন ফুলকি চোখ মেলে তাকিয়েছিল সেই জানঘরে গিয়েছিলাম একদিন। তবে হতাশ হয়েছি। সাদামাটা একটা ঘর। ইন্টারেস্টিং কিছু নয়। এই গ্রামীণ হাসপাতালে ইনফ্রাস্ট্রাকচার খারাপ। রুগি ভর্তি থাকে কম। একটু ক্রিটিকাল কেস এলেই পেশেন্টকে রেফার করে দেওয়া হয় শহরের হাসপাতালে বা মেডিক্যাল কলেজে। তবে এত কিছুর পরও পেশেন্ট যে খারাপ হয় না তা নয়। মারাও যায় কেউ কেউ।

তটিনী একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তুমি তো বেশ কিছুদিন কাটিয়ে ফেললে হেমগুড়িতে। একটা কথা ভেবে বলো তো, ফুলকির কুকুরটা এই নিয়ে ক’দিন এল?

চন্দ্রচূড় বলেছিল, বার পাঁচেক হবে হয়তো। তবে যেদিন যেদিন খৈরি আসে সেদিন গভীর ঘুমের মধ্যেও জেগে উঠি আমি। বিকট একটা গন্ধ ভেসে আসে পাশের ঘরটা থেকে। এটা শুধু যে কুকুরের গায়ের গন্ধ তা নয়, এই আঁশটে গন্ধটা রক্তেরও। কিংবা কে জানে, পচা-গলা মাংসেরও। কখনও মর্গে গেছ তুমি?

না। কেন বলো তো?

আমার পাশের বাড়ির এক ভদ্রমহিলা গলায় দড়ি দিয়েছিল। আমি কলেজে পড়তাম সে সময়। তখন গিয়েছিলাম। কী বিশ্রী গন্ধ! এ বাড়িতে খৈরি এলে অবিকল মর্গের গন্ধ পাই আমি। কুকুরটা ফিরে যায়। নীচে নেমে যায় ফুলকি। পরদিন সকাল হলে আমি পাশের ঘরটায় গিয়ে উঁকি দিই। প্রায়ই দেখি ঘরের চৌকিটার ওপর পাতা তোশকের ওপর কিংবা ঘরের কাঠের পাটাতনে লেগে আছে জমাট বাঁধা রক্তের দাগ। পচা-গলা মাংসের টুকরোও দেখতে পাই। এ যে কোথায় এসে পড়েছি তাই ভাবি। ভালো একটা বাড়ির সন্ধানে আছি। পেলেই এখান থেকে কেটে পড়ব।

ঘরদোর ঝাড়পোঁছ করে না এরা?

করে তো। রোজই করে। সকাল হলেই তো দেখি বনবিহারি নিজে গোবরজল দিয়ে উঠোন ধোয়া-মোছা করে। বনবিহারির বিধবা দিদি কাঠের সিঁড়ি মোছে। তার পর দোতলার দুটো ঘরই মোছে ফিনাইল জল দিয়ে। কোণের ঘরটা পরিষ্কার করতে গিয়ে পচা মাংস বা হাড়ের টুকরো কুড়িয়ে পায় এক-একদিন। সেসব দেখে রেগে কাঁই হয়ে যায় বুড়ি। শাপশাপান্ত করতে থাকে কুকুরটাকে।

তটিনী শ্বাস ফেলল বড় করে। বলল, তোমার খুব স্ট্রেস যাচ্ছে। আমার মনে হয় তোমার একটু হাওয়াবদল দরকার। তুমি এই উইকেন্ডে জলপাইগুড়ি আসছ তো?

আসছি। শুক্রবার দুপুরের বাস ধরে রাতের দিকে বাড়ি পৌঁছব।

কেন বলো তো?

তটিনী বলেছিল, গুড দেন। সোমবার ভোরবেলা আবার হেমগুড়ি ফিরবে, তাই তো? তাহলে রবিবার তো ফ্রি-ই আছ?

আছি।

তটিনী বলল, এক কাজ করো, এই রোববার তুমি মালবাজার চলে এসো। আমি তো আপাতত এখানেই আছি। দেখা হবে। আর সেদিন কী কথা হয়েছিল আমাদের, মনে আছে?

কী কথা?

তটিনী হাসল, এই রবিবার বিকেলে আমরা রয় অ্যান্ড কাজিনের টি বুটিকে গিয়ে চা খাব আড্ডা দিতে দিতে। পে কিন্তু আমি করব। ঠিক হ্যায়?

চন্দ্রচূড় হো হো হেসে বলল, ওকে ম্যাম।