নরম নদীর নারী
ভালোই চলছিল সব, এর মধ্যে একদিন জরির আব্বার খুব অসুখ করল। বুকে খুব ব্যথা। হাঁটতে-চলতে দম ফুরিয়ে আসে। মহিষবাথানের ডাক্তার কয়েক মাস চিকিৎসা করে একদিন হাত তুলে দিলেন। হাল ছেড়ে দেওয়া গলায় বললেন, সামর্থ্য অনুযায়ী যা যা করার ছিল তিনি তা করেছেন। রোগ বেশ জটিল। তাই তাঁর আর কিছু করার নেই। এখন বড় শহরের বড় ডাক্তারের কাছে না নিয়ে গেলে এই পেশেন্টকে নাকি বাঁচানো যাবে না।
আনিস কাঁদো কাঁদো মুখে এসে ধরল আমাকে। বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে জরির আব্বাকে। জরির হাত খালি। ওদিকে আনিসের বাবার এক মাস আগেই হার্নিয়া অপারেশন হয়েছিল। বাবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে আনিসের পকেট ফাঁকা।
আমি চুপ করে থাকলাম একটু। আমি নিজেও আমির ওমরাহর বাড়ির ছেলে নই। মাস গেলে বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয় আমাকেও। কিন্তু জরির বিপদে পাশে না দাঁড়ালে কি চলে! আমি বললাম, চিন্তা কোরো না, আমি আছি।
সেদিনই বিকেলবেলা বেরোলাম। মহিষবাথানে এটিএম নেই। আছে মুসাফিরগঞ্জে। বাসে চেপে গেলাম সেখানে। বাস স্ট্যান্ড থেকে নেমে বড়রাস্তার ধারে এটিএম। যা টাকা ছিল তার প্রায় সব টাকাই কুড়িয়ে কাঁচিয়ে তুলে দিলাম জরির হাতে। জরি কৃতজ্ঞতায় কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। ভরা রাস্তার মধ্যে আমার দুটো হাত ওর উষ্ণ করতলের মধ্যে নিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। আমি আমার পকেট থেকে রুমাল বের করে ওর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললাম, এভাবে কাঁদতে হয় না। তুমি কি বোকা নাকি? তোমার সামনে এখন অনেক শক্ত লড়াই। মনের জোর রাখো।
জরি আর ওর আম্মি ওর আব্বাকে নিয়ে গেল শিলিগুড়ি শহরে। লম্বা ডিগ্রিওয়ালা ডাক্তার সব ধরনের পরীক্ষা-টরিক্ষা করিয়ে বললেন, হার্টের জটিল সমস্যা। অপারেশন করতে হবে। দেরি করা যাবে না মোটেই। তাতে খরচও প্রচুর।
জরি এল আমাদের মেসে। আলাপ আলোচনা করে ঠিক হল অপারেশন যদি করতেই হয় তবে এখানে নয়, সবচাইতে ভালো জায়গায় যাওয়াই ভালো। আমি দক্ষিণ ভারতের এক হসপিটালের নাম বললাম। ওখানে শুনেছি ভাল ট্রিটমেন্ট হয়।
হর্ষ বলল, চেনা একজন ভেলোরের এক হসপিটাল থেকে হার্টের জটিল অপারেশন করিয়ে এসেছে। সে এখন ভালো আছে। একজন নামকরা হার্ট সার্জন আছেন সেখানে, কাগজ-টাগজে ইন্টারভিউ বেরোয়, তাঁর হাতযশ ভাল। আনিসও খোঁজখবর নিল। স্থির হল সেখানেই যাওয়া হবে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিছুটা জমি ছিল জরির আব্বার। এমন পারিবারিক বিপর্যয়ে সেই জমি বিক্রি করা ছাড়া গতি নেই। নইলে অপারেশনের টাকা জোগাড় হবে না।
যে এক্স-মিলিটারি ভদ্রলোক আমাদের রামের বোতল এনে দিতেন ক্যান্টনমেন্ট থেকে, তিনি একবার কথায় কথায় বলেছিলেন তিনি মহিষবাথানে জমি খুঁজছেন। তাঁর সঙ্গে গিয়ে দেখা করলাম আমি আর আনিস। দুজন মিলে রাজি করিয়ে ফেললাম জরিদের জমি কেনার জন্য।
জমিজমা যেটুকু ছিল সেসব বিক্রি করে জরিরা দক্ষিণ ভারত গেল। ওর দুলাভাই আর ছোট চাচা গেল সঙ্গে। আমি আর আনিস মহিষবাথানে পড়ে থাকলেও নিয়মিত মসজিদে যেতাম জরির আব্বার আরোগ্য কামনা করতে। জরি রোজই ফোন করে আপডেট দিত। একদিন বলল, ডাক্তার পরশু অপারেশন করবেন। আমরা যেন দোয়া করি ওর আব্বার জন্য।
অপারেশনের আগেরদিন জরি কাঁদছিল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। আমি আর আনিস সাহস জোগালাম ওকে। ফোনের ওপারে থাকা জরির উদ্দেশে বললাম, তোমার আব্বার খারাপ কিছু হতেই পারে না। সব ঠিক হয়ে যাবে। জরি বলল, তাই যেন হয়।
আমাদের কথাই মিলল। তিন ঘণ্টা ধরে অপারেশন হল। ডাক্তার ওটি থেকে বেরিয়ে এসে হাসিমুখে বললেন, আর কোনও সমস্যা নেই। পেশেন্ট এবার ভালো হয়ে যাবে। এক বছর পর একবার শুধু চেক আপে আসতে হবে। জরি ফোন করে সুসংবাদ দিল আমাদের। স্বস্তির শ্বাস ফেললাম সকলে।
ফ্লাইট বড়লোকদের জন্য। গরিবের আছে ট্রেন। দেখা গেল এক মাসের মধ্যে বেঙ্গালুরু থেকে মহিষবাথান ফেরার ডাইরেক্ট ট্রেনের টিকিট নেই। এদিকে জরির আব্বার মন কেমন করছে ঘরে ফেরার জন্য। কান্নাকাটি করছেন অসুস্থ মানুষটা। আব্বাকে কাঁদতে দেখে চোখের জল ফেলছে জরি আর ওর আম্মি। আমি জরিকে বললাম, ব্রোকারের সঙ্গে কথা বলো। দ্যাখো তারা কী বলে।
জরি বলল, আজ সকালেই দালালের সঙ্গে কথা বলেছি। ওরা দ্বিগুণ টাকা চাইছে। আমি বললাম, আমি টাকার জোগাড় করছি, চিন্তার কারণ নেই।
জরি ধরা গলায় বলল, সত্যি? আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলাম। বাবার শেখানো কথাগুলো মনে পড়ে গেল। মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে তার চাইতে বড় আনন্দ আর কিছুতে নেই। জরি ছিল এমন এক নারী যার জন্য সব কিছু করা যায়। আমি জরির শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শুনতে শুনতে বললাম, সত্যি।
ব্যাংকে গিয়ে জরির আব্বার অ্যাকাউন্টে টাকা ট্রান্সফার করলাম। দালাল ধরে ডাবল দাম দিয়ে রেলের টিকিট করিয়ে জরিরা ফিরে এল মহিষবাথানে। যেদিন সকালে ওদের আসার কথা সেদিন ভোরবেলা রেল স্টেশনে চলে গেলাম আমি আর আনিস।
জরির আব্বা শুনেছিলেন যে, আমি চিকিৎসার টাকা দিয়েছিলাম, ট্রেনের টিকিটের টাকাও আমিই পাঠিয়েছি। তিনি স্টেশনের মধ্যেই আমাকে জড়িয়ে ধরলেন আপ্লুত হয়ে। নিমন্ত্রণ করলেন তাঁদের বাড়ি যাওয়ার জন্য। আনিসকেও বললেন তাঁদের বাড়ি আসতে।
পরের রবিবার অফিস ছুটি। আমি আর আনিস সন্ধেবেলা গিয়ে মিঠাই খেয়ে এলাম জরিদের বাড়ি থেকে। জরির আম্মি চমৎকার সেমাইয়ের পায়েস করেছিলেন। সেটাও খেলাম তৃপ্তি করে। অনেক গল্প হল। হাসাহাসি হল। খুব আনন্দ হল সেদিন। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হল না।
একদিন আমরা বিকেলবেলা কোয়ার্টার্সের সামনের মাঠে দু-দলে ভাগ হয়ে ভলিবল খেলছিলাম, জরি এল ছুটতে ছুটতে। খেলা থামিয়ে কোর্টের বাইরে এলাম। জরি ঘামছে রীতিমতো। কেঁপে যাওয়া গলায় জানাল, ওর আব্বার বুকে আবার ব্যথা উঠেছে। আমাদের খেলা শিকেয় উঠল। আমি আর আনিস তড়িঘড়ি পোশাক বদলে নিলাম। দে ছুট ওদের বাড়ি।
জরিদের বাড়িতে তখন মানুষের ভিড় জমে গেছে। ভিড় সরিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখি ওর আব্বা বুক চেপে ধরে বসে আছে ঘরের মেঝেতে। আত্মীয় পরিজনরা নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করছে। কী করা হবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কেউ। এ তো আর শহর নয় যে ফোন করলেই অ্যাম্বুল্যান্স চলে আসবে হুটার বাজিয়ে। অফিসের ড্রাইভার গণেশকে ফোন করে বললাম চটপট গাড়ি নিয়ে আসতে। মুসাফিরগঞ্জে নিয়ে যেতে হবে পেশেন্টকে।
গণেশ চটজলদি গাড়ি নিয়ে এল ঠিকই কিন্তু এবার আর সময় পাওয়া গেল না। রাস্তাতেই শেষ শ্বাস পড়ল জরির আব্বার। ততদিনে চিকিৎসা চালাতে চালাতে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছে ওদের পরিবার।
