নীল কস্তুরী আভার চাঁদ
আমার কথা এই ফাঁকে একটু বলে নিই। আমার বাড়ি রফি আহমেদ কিদোয়াই রোডে। বাবার নাম কাদের, মায়ের নাম মঞ্জুরা। বাবা ছিল শপিং মলের সিকিওরিটি গার্ড। টিফিনের জন্য দিনে বরাদ্দ আধঘণ্টা সময়। সে সময়টুকু ছাড়া দাঁড়িয়ে থাকতে হতো সর্বক্ষণ। একটা টিউমারের মতো হয়েছিল কোমরে, মেরুদণ্ডের কাছে। ফলে দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না বেশিক্ষণ। কোমরে ব্যথা করত। কিন্তু বসার ফুরসত নেই। সিসিটিভি-তে সারাক্ষণ নজর রাখা হচ্ছে। পান থেকে চুন খসলেই চাকরি চলে যাবে।
ঘরে ঘরে বেকার। লক্ষ কোটি লোক অপেক্ষায় আছে চাকরির জন্য। সে যতই স্বল্প বেতনের হোক না কেন। আমার বাবাও কম পরিশ্রম করত না। অথচ এত পরিশ্রম করে মাস গেলে জুটত সামান্য ক’টা টাকা। সেই টাকায় সংসারই চলত না, ডাক্তার দেখানো তো দূরের কথা। এত অভাবের মধ্যেও আমাকে পড়াশোনা করিয়েছে বাবা। সে কারণে মানুষটার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
সংসারের চাকা যাতে ঠিকঠাক চলে তার জন্য আমার মা আয়ার কাজ করত। এক্সাইড মোড়ের কাছে এক আয়া সেন্টারে নাম রেজিস্টার্ড করানো আছে। সেখান থেকে ওরা মা’কে পাঠায় পেশেন্টের বাড়িতে। সেখানে বারো ঘণ্টার টানা ডিউটি।
পুলিশ ফাঁড়ির মেজোবাবু সেদিন বলছিলেন গ্রামের লোকের মানসিকতা ছোট। বড় শহরের মানুষের মন নাকি উদার। কিন্তু আমি জানি কথাটা ঠিক নয়। খোদ কলকাতার বুকেও জাতধর্ম নিয়ে বাছবিচার থাকে বহু লোকের। কাজে গিয়ে নিজের নাম বলার পর মা’কে ফিরে আসতে হয়েছে বহু বাড়ি থেকে।
আমাদের টানাটানির সংসার। কিন্তু আমার বাবা-মা আমাকে কখনও বুঝতে দেয়নি, আমাদের অভাব আছে। কখনও এমন হয়নি, ইদে আমি নতুন জামা পাইনি। দুটো সেট হতো না ঠিকই, একটাই হতো, কিন্তু ইদ এলে জানতাম আমার নতুন জামা হবেই হবে। আর আমাকে তখন দেখে কে! মনে হতো এই দুনিয়ার আমিই বাদশাহ।
আনন্দে উত্তেজনায় সারা রাত এপাশ-ওপাশ করতাম। ঘুম হতো না রাতে। বারবার গন্ধ শুঁকতাম নতুন জামার। মনের মধ্যে একটা আনচান। কাল সকাল হলেই নতুন জামা দেখাব সবাইকে। বাবা আর মায়ের আনন্দ যেন আমার থেকেও বেশি।
মালদার চাঁচলে আমার দাদাজান মইনুদ্দিন চৌধুরীর বাড়ি। দাদাজান কাঠের কাজ করতেন। রোজগার আহামরি না হলেও অভাব ছিল না। উঠোনের একদিকে ছিল পাকঘর, অন্যদিকে ইটের গাঁথনি দেওয়া স্নানঘর। দুটো মাত্র থাকার ঘর। মাথায় টিনের চাল। বাড়িতে লোক ছিল আট- দশজন। গাদাগাদি করে শুতে হতো ছোট্ট দুটো ঘরে। মালদা জেলায় গ্রীষ্মকালে আমপাকা গরম পড়ে। চাঁচলেও বৈশাখ মাস পড়লে তুমুল গরম পড়তে শুরু করল। সেসব দিনে খুব কষ্ট হতো। সিলিং ফ্যান ছিল না। ডেকোরেটরের কাছ থেকে একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড ফ্যান কেনা হয়েছিল কয়েক বছর আগে। বাবা ওই বাড়িতেই বড় হয়েছে।
একদিন দাদাজানের চোখের অসুখ ধরা পড়ল। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানা গেল রেটিনায় জল জমছিল। ইঞ্জেকশন নিতে হতো কয়েক মাস পরপর। অনেক খরচ তাতে। চিকিৎসা করাতে গিয়ে সব টাকা শেষ হয়ে গেল। আমরা কলকাতায় চলে এসেছিলাম আগেই। দাদাজানের বাড়িতে থেকে গেল আমার দুই কাকা। দুজনেই আর্থিক দিক দিয়ে কমজোর। ধরাবাঁধা রোজগার নেই। একজন কাঠ মিস্ত্রি, অন্যজন কৃষিকাজ করে। তাই বাবা মাসে মাসে মানি অর্ডার করত দাদাজানকে।
চাঁচল রাজবাড়ির একটা সাবেকি ঐতিহ্য আছে। চাঁচলের রাজা রামচন্দ্র রায়চৌধুরী সাড়ে তিনশো বছর আগে তাঁর রাজবাড়িতে দুর্গাপুজো চালু করেছিলেন।
এখন রাজবাড়িতে আর পুজো হয় না। পুজো হয় তিন কিলোমিটার দূরের পাহাড়পুরের দুর্গামন্দিরে। দেবী এখানে চতুর্ভুজা সিংহবাহিনী। রাজমন্দিরে রয়েছে রাজ আমলের অষ্টধাতুর মূর্তি। সারা বছর সে মূর্তি পুজো করা হয়।
পাহাড়পুরে পুজো হয় মৃন্ময়ী দেবীর। ষষ্ঠীতে হয় দেবীর বোধন। সপ্তমীর সকালে ঢাক, সানাই, কাঁসর-ঘণ্টা বাজিয়ে শোভাযাত্রা করে রাজবাড়ির মন্দির থেকে মূলদেবতা সিংহবাহিনীকে পাহাড়পুরের মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। দেবী সেখানে পূজিতা হন চণ্ডী রূপে।
এই প্রতিমার সঙ্গেই পুজোর তিনদিন অষ্টধাতুর সিংহবাহিনী দেবীর পুজো হয়। দশমীর সন্ধ্যায় মহানন্দার সতীঘাটে হয় নিরঞ্জন। এই পুজোর একটা বিশেষত্ব আছে। সাড়ে তিনশো বছর ধরে লণ্ঠন জ্বালিয়ে দেবীকে পতিগৃহে যাওয়ার পথ দেখান স্থানীয় মুসলিম মানুষজন।
আমার দাদাজান তাঁর পূর্বপুরুষের দেখানো পথে দেবীকে আলো দেখিয়ে বিদায় জানাতেন। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলছে। এখন একইভাবে দেবীকে বিদায় জানায় আমার কাকারা। আমিও বাবার হাত ধরে বেশ কয়েকবার সাক্ষী থেকেছি সেই উৎসবের। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ এক বিরল নজির। সতীঘাটে এলে বোঝা যায়, জাতপাত শেষ কথা নয়, মানুষই শেষ কথা। আনিসের বলা কথাগুলোই হয়তো ঠিক। মৃত্যুর পর যখন চেতনা নিভে যায়, তখনই শুরু হয় মানুষের পবিত্রতম যাত্রা।
আমি সরকারি স্কুলে পড়তাম। প্রাইভেট টিউটর রাখার ক্ষমতা বাবার ছিল না। স্কুলের ফিজ দিতে হতো না ঠিকই তবে বইখাতা, ইউনিফর্ম এসবের পেছনেও খরচ কম নয়। অসুখ-বিসুখ আছে। মাস গেলে এক টাকা বাঁচানোই ছিল চ্যালেঞ্জ। এত অভাবের পরও ইদ এলে আমার জন্য উপহার কিনে আনত বাবা। নিজেদের জন্য কিছু কিনত না।
ইদে আমার জামাটা ফুলহাতা হতো বরাবর। ফুলহাতা কেন? উত্তরটা সহজ। গরমে জামা পরতাম হাতা গুটিয়ে। শীতে জামার হাতা খুলে। মোট কথা, ওই একটা জামাতেই যাতে সারা বছর চলে যায়। গরিব মানুষ এমনই হয়। তার ইচ্ছে অনিচ্ছে অভিলাষ বলে কিছু থাকতে নেই। ছোটবেলা থেকেই সেটা জেনে বড় হয়েছি আমি।
এত অভাব অনটনের মধ্যেও মাকে দেখতাম সামর্থ্য অনুযায়ী ইদের বাজার করতে। হয়তো গাদাগুচ্ছের চুড়ি, দোপাট্টা কিনেছে অন্যদের জন্য কিন্তু নিজের জন্য কিছু কেনেনি। বাবাও যে সবসময় মাকে নতুন একটা কিছু কিনে দিতে পারত তা নয়। আমি মায়ের কোল ঘেঁষে শুতাম রাত্রে। বলতাম, মা, তুমি কিছু কিনলে না কেন নিজের জন্য? তোমার নতুন জামা হয়নি, তাও তোমার মুখ থেকে হাসি মুছে যায় না কেন? মা আমার চুল ঘেঁটে দিয়ে বলতেন, একটা কথা জেনে রাখিস, তোর কিছু থাকুক না থাকুক, মুখের হাসি আর মনের আনন্দটা যেন কখনও না হারায়।
আনন্দ ভরপুর হতো ইদের দিন যখন আমি আর বাবা পরোটা আর ভুনা খেতে যেতাম। ডায়মন্ড হোটেল বলে একটা খাবারের দোকান ছিল, ম্যাজেস্টিক আর ক্রাউন সিনেমা হলের কাছে। এখন সেই হোটেল বোধ হয় উঠে গেছে। আর পাঁচটা প্রিয় জিনিসের মতোই মুছে গেছে কলকাতার বুক থেকে। কিন্তু ইদের দুপুরে সেখানে আমাদের বাপ-ব্যাটার যাওয়াগুলো আমার এখনও মনে আছে।
রমজানের রোজার শেষে উৎসবের রাতে যে চাঁদ উঠত তা দেখে দু’চোখ জুড়িয়ে যেত। নক্ষত্রের জরি দিয়ে সাজানো আকাশে সে ছিল নীল কস্তুরী আভার এক আশ্চর্য চাঁদ, যার দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়।
আমার আজও মনে আছে বাবার সঙ্গে ধর্মতলার টিপু সুলতান মসজিদে যাওয়ার কথা। ওই একটা রাস্তা, সারা বছর তার রূপ একরকম, ইদের দিন একেবারে আলাদা। বিশাল ব্রাউন পেপার বিছিয়ে একসঙ্গে মসজিদে নামাজ পড়ছে শয়ে শয়ে মানুষ। সে এক দেখার মতো দৃশ্য। বাবার পাশে আমি হাঁটু মুড়ে বসা।
ছবির মতো স্পষ্ট দেখতে পাই সেই সব রঙিন দিনগুলোকে। বাবার গালে কয়েকদিনের বাসি দাড়ি। নতুন জামা হয়নি। পুরনো রং জ্বলে যাওয়া পোশাক। কিন্তু মুখে লেগে আছে অমলিন হাসি। বাবার সেই হাসিমুখটা আমার আজও বড্ড মনে পড়ে। অভাব কখনও স্পর্শ করতে পারেনি লোকটাকে। বাবার গায়ের গন্ধ যেন এক জন্ম দূর থেকে আজও ভেসে আসে আমার নাকে।
ইদের দিন নামাজ পড়ার পর বাবা আমার হাতে খুচরো পয়সা ধরিয়ে দিত। আমি মসজিদের পাশে বসে থাকা আমাদের থেকেও অভাবী লোকগুলো, যারা ছেঁড়া জামাকাপড় পরে ‘আল্লা কে নাম পে দে দে বাবা’ বলত কাতর গলায়, তাদের হাতে পঞ্চাশ পয়সা, এক টাকা, দু’টাকার কয়েন—যা পারতাম দিতাম। সব পয়সা শেষ করে বাবার কাছে গিয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে খালি হাতের মুঠো দেখিয়ে বলতাম, আমার সব পয়সা শেষ।
বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলত, সাবাস বেটা! তখন ছোট ছিলাম বলে বুঝতাম না, কিন্তু এখন অনুভব করি, সেই ছোটবেলা থেকেই বাবা আমাকে জীবনের সহজ পাঠ শেখাত। বাবা আমাকে ঘাড়ে হাত দিয়ে বুঝিয়ে বলত, মানুষের কোনও ছোটখাটো উপকার করতে পারলে, কিংবা মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে পারলে যে আনন্দ পাওয়া যায় তার কোনও তুলনা হয় না।
